সম্পর্ক-সম্পর্কিত সাদাসিধা ভাবনা | অঞ্জন আচার্য

সম্পর্ক-সম্পর্কিত সাদাসিধা ভাবনা | অঞ্জন আচার্য

🌱

কেবল ভালোবাসা দিয়ে কোনো একটি সম্পর্ককে চিরস্থায়ী করা যায় না সম্পর্ক টিকে থাকে কিছু বাস্তব উপাত্তের ওপর সেই উপাত্তগুলোকে বোঝাতে আমার নিজের তৈরি একটি শব্দ আছে ওটা দিয়েই বরং সম্পর্কের হিসাবনিকাশ কষিফুসশব্দটির সঙ্গে পরিচয় আছে কমবেশি আমাদের সবার তুচ্ছ বা অসার অর্থে ব্যবহার করে থাকি এই অর্থহীন শব্দটি কিন্তু তা যদি ইংরেজিতে লেখা হয়, তবে কী দাঁড়ায়? FUSH. আপাতদৃষ্টিতে শব্দটিও অর্থহীন মনে হতে পারে এটিকে ভেঙে বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাবো– F-তে Faith (বিশ্বাস বা আস্থা) + U-তে Understanding (বোঝাপড়া বা মতের মিল) + S-তে Sharing (ভাগাভাগি বা অংশগ্রহণ) + H-তে Honor (শ্রদ্ধাবোধ) একটি খাট কিংবা টেবিলের যেমন চারটি পা থাকে, তেমনি একটি সম্পর্কের চারটি পা আমার কাছে এই শব্দচতুষ্কোণ যদি কোনো কারণে খাটের বা টেবিলের চার পায়া একটি ভেঙে যায় বা ক্ষয়ে যায়, তবে মুহূর্তেই কাৎ হয়ে পড়ে পুরো শরীর সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাই 

আমার কাছে ভালোবাসা হলো স্রেফ খাটের ওপর বিছানো সুদৃশ্য বেডকভার, কিংবা টেবিলের ওপর রাখা সুন্দর টেবিলক্লথের বৈ কিছু নয় ওটা সম্পর্কের শরীরকে ঢেকে রাখে ময়লা হলে ধুতে হয়, পুরোনো হলে ফেলে দিয়ে নতুন কিছু পাততে হয় মানে ভালোবাসায় আনতে হয় বৈচিত্র্য, অভিমানকে ঝেরে ফেলে থাকতে হয় পাশে বেডকভার বা টেবিল ক্লথের মতো ভালোবাসার কাজ হলো সৌন্দর্য বাড়ানো; স্থায়িত্ব টিকিয়ে রাখা নয় আবেগীয় ভালোবাসা দিয়ে সম্পর্ক বেশি দূর এগুনো যায় না ভালোবাসা একসময় আটকে থাকে ভালোবাসাতেই এটি ছাড়া সম্পর্কটিতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না 

সম্পর্কের মধ্যে স্পেস একটা বড় বিষয় নয়তো একসময় হাঁসফাঁস হয়ে ওঠে সবকিছু ফলে অন্তরালে সম্পর্কের শরীর ঘুণে ক্ষয়ে যায় ভালোবাসার চাদরে তা ঢেকে রাখা হয় ঠিকই; কিন্তু তা কেবলই লোকদেখানো সে আর কত দিন? বাতাস এলে উড়িয়ে দেয় চাদর (আস্থা অর্থে) তার ওপর বসতে গেলে বা কিছু একটা রাখতে গেলে ভেঙে পড়ে হুড়মুড় করে 

বিষয়ে আমার বাস্তবজীবনের একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার করি কয়েক দিন আগে সপরিবারে বেড়াতে গিয়েছিলাম এক বন্ধুর বাড়ি উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবার সুবিশাল দুতলা বাড়ি সামনে বিস্তৃত আঙিনা বন্ধুর স্বামীটি পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বহুজাতিক একটি কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা খুব আন্তরিক মিশুক মানুষ বন্ধুটি কোমল মনের গোছানো গৃহিণী ছোট্ট শিশুসন্তান নিয়ে আপাতদৃষ্টিতে সুখী এক ছিমছাম পরিবার বাড়িটিতে স্বামীর দিকের এক বৃদ্ধ পিসিমা ছাড়া আছেআগস্টনামে একটি আদুরে কুকুর তাদের ভাষ্য, আগস্টও তাদের পরিবারের সদস্য ঘটা করে তার জন্মদিনও পালন করা হয় প্রতি বছর যাই হোক, তুমুল আড্ডায় খাওয়াদাওয়ায় বেশ সুন্দর একটি সময় কাটলো আমাদের স্বামীটির একটি বিচিত্র শখ আছে অফিস শেষে কিংবা ছুটির দিনে বাড়ির একটি ঘরে কাঠের কাজ করা, নানা রকম আসবাব তৈরি করা নিজেকেকাঠমিস্ত্রিপরিচয় দিতে বেশ অহং বোধ করেন বলাটায় একধরনের স্বচ্ছন্দ্য আছেযা আমার ভালো লেগেছে একরকম জোর করেই আমাকে নিয়ে গেলেন তার সেই আসবাব তৈরির কারখানাটি দেখাতে

ঘরটি জিনিসে ঠাসা; নানা আকৃতির কাঠ, সেই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ দেশবিদেশ থেকে করাতহাতুড়ি ইত্যাদি যন্ত্রপাতি কেনা তার শখের অংশ এমন ঘর সাধারণত নোংরা হয়; বসার অযোগ্য থাকে তাই শুরুতে যেতে নিমরাজি ছিলাম তবে আমার ধারণার চুলোয় জল দেখলাম, ঘরটি বেশ গোছানো, পরিষ্কারপরিচ্ছন্ন শুনলাম, বন্ধুটি তার স্বামীর ঘরটি প্রায় দিনই গুছিয়ে রাখে নিজের মতো করে, যেমন করে সে তার শোওয়ার ঘরটি পরিপাটি রাখে

আমরা তো জানি, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণেপ্রবাদটি সম্পূর্ণতা পায় পরের লাইনটি যুক্ত হলে— ‘যদি গুণবান পতি থাকে তার সনে যদিও অনেকে সেটি উল্লেখ করি না পুরোটা চাপিয়ে দিই নারীদের ওপরই তবে কথা হলো, গুণবতী বা গুণবান হলেই কি সংসারে সুখ নিশ্চিত হয়? সুখ তো কোনো বীজগণিত অঙ্ক নয়, যা কষলেই ফল আসবে? এক্ষেত্রে আমার উপরের পর্যবেক্ষণটি দিয়ে বিশ্লেষণ করি সবার সঙ্গে সেটা নাও মিলতে পারে

আবারও বলি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বিশ্বাস, বোঝাপড়া, শেয়ারিংএসব ভালোবাসার উপাদনগুলো সুখের নিয়ামক সত্যি, তার সঙ্গে থাকতে হয় কোমল প্রশ্রয় নামের একটা বোধ ভালোবাসা তো আর নিউটনের সেই আপেল নয়, যে গাছের তলায় বসামাত্রই টুপ করে এসে কোলের ওপর পড়বে ওটা অর্জনের বিষয় বন্ধুটিকে আপাত সুখের মনে হওয়ার পেছনে আমার চোখে যে বিষয়টি ধরা পড়েছে, তা হলো সেই কোমল প্রশ্রয় স্বামীর পাগলামোকে গুরুত্ব দেওয়া, সেটার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো এখানে স্বামীটির জায়গায় বন্ধুটিও হতে পারতো সেক্ষেত্রেও একই কথা কজন মানুষইবা পারে তার সঙ্গীর এমন বিষয়কে নিজের করে নিতে? বিষয়টা একপাক্ষিক হলে যন্ত্রণাদায়ক এবং ক্ষণস্থায়ীতা বলার অপেক্ষা রাখে না 

একটা কথা প্রচলিত আছে, কবি বউকে কবিমনা না হলে বড়ো কষ্টের কারণ হয় যেমনটা ঘটেছিল জীবনানন্দের জীবনে মৃত্যুর পর জীবনানন্দকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন সেসময়ের প্রতিষ্ঠিত কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সুধীন দত্তকে দেখে শোকআবহে লাবণ্য দেবী বিস্মিত হয়েছিলেন পাশে বসা ভূমেন্দ্র গুহকে জিগ্যেস করেছিলেন— “আচ্ছা, তোমার দাদা কি অনেক বড়ো লেখক ছিলেন? সুধীন দত্তের মতো মানুষ এলেন তাকে দেখতে!” 

লাবণ্য দেবীর জন্য বড়ো করুণা হয় একবারের জন্যও কি কৌতূহল হলো না তার সঙ্গীটি কী করেন, কী লিখেন? ট্রাংকের ভেতর ঠাসাঠাসি করে কী এমন গোপন জিনিস রাখেন? জীবনানন্দ অন্তর্মুখী স্বামী ছিলেন সত্যি লাবণ্য তো বহির্মুখী স্ত্রী ছিলেন তিনিদেখিতে গিয়াছেন পর্বতমালা, দেখিতে গিয়াছেন সিন্ধু অথচদেখা হয় নাই তাঁর চক্ষু মেলিয়া একটি ধানের শীষের উপর একটি শিশির বিন্দু সঙ্গীকে দেখতে হয় তারভালোমন্দ মিলায়ে সকলই ভালোবাসতে হয় তার নিপাট সুস্থতা নীরোগ পাগলামোকেও নইলে যে ব্যর্থতা গ্রাস করে সংসারে, তার আগুনে বালিশতোশকসহ পুড়তে হয় দুজনকে প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত

 

পুনশ্চ : ভালোবাসাকে যারা ভালোবাসে, তারা তাদের সম্পর্কটিকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আমার কথাগুলো ভেবে দেখতে পারেন আর যারা তুমুল ভালোবেসেও টেকাতে পারছেন না বা পারেননি তাদের সম্পর্কের বাঁধনটিকে অটুট রাখতে, তাদের প্রতিও রইল একই আহ্বান একবার হিসেব কষে দেখুন তো, মিলে কিনা?

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

ভেঙে মোর ঘরের চাবি, নিয়ে যাবি কে আমারে |আল মাকসুদ

Sat Oct 31 , 2020
ভেঙে মোর ঘরের চাবি, নিয়ে যাবি কে আমারে |আল মাকসুদ 🌱 দুঃসময় নিশ্চয়ই। নির্ভার হওয়া যায় না। যাবে কি কখনো? সেও অনিশ্চিত। তবুও জীবনের গতি-অগতি চলছে নিয়মের অনিয়মের বিরোধের বৈপরীত্যের অথবা সমঝোতার সঙ্গে। কে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত- আমি, তুমি, সে, তিনি, আমরা, নারী- নাকি সবাই? একজন শিশু, শিক্ষার্থী, নারী, বৃদ্ধ, মা […]
Shares