ভেঙে মোর ঘরের চাবি, নিয়ে যাবি কে আমারে |আল মাকসুদ

ভেঙে মোর ঘরের চাবি,

নিয়ে যাবি কে আমারে |আল মাকসুদ

🌱

দুঃসময় নিশ্চয়ই। নির্ভার হওয়া যায় না। যাবে কি কখনো? সেও অনিশ্চিত। তবুও জীবনের গতি-অগতি চলছে নিয়মের অনিয়মের বিরোধের বৈপরীত্যের অথবা সমঝোতার সঙ্গে। কে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত- আমি, তুমি, সে, তিনি, আমরা, নারী- নাকি সবাই? একজন শিশু, শিক্ষার্থী, নারী, বৃদ্ধ, মা (তার অবশ্য পরিচয়-পরিধি বিস্তৃত; কখনো গৃহিণী, স্ত্রী, কখনো কর্ত্রী), বাবা নিয়ে একটি পরিবার। কে এখানে অধিক ভারাক্রান্ত? কার যাতনা বেশি? উত্তর আছে কি কারো কাছে? বিশেষভাবে কাউকে হয়তো চিহ্নায়ন করা দুরূহ। এ কোন্ স্বাস্থ্যহীন সমাজ-বিশ্ব? ঋতুবদলের পালায় পরিবর্তন আসে; জীবন গতি পায়। প্রকৃতি বদলে যায়। প্রকৃতি বদলের পালা যেনো সাঙ্গ হয়েছে এ বছরের শুরু থেকেই। সহজ কিছু নেই; সহজেরে ভালোবাসি কী করে? কে বলে দেবে উপায়- নেই উত্তর; সুতরাং অনুপায়। এরপর হেঁটে চলো তোমার সীমানা অব্দি। অথবা থেমে যা্ও। থেমে কে যায় উসাহী মন জানতে চায়। ‘পরের জাগা, পরের জমি ঘর বানাইয়া আমি রই’-আসলেই কি তাই নয়? আমার প্রসঙ্গ মূলত- এ সময়ের পরিবার। এবং পরিবারে সম্ভাব্য কে কে থাকতে পারেন- তার একটি ধারণা দিয়েছি।

তবে, বলি সে কথা- কথার মারপ্যাঁচ নয়, একেবারে সাদামাটা কিছু ভাবনা। এর সঙ্গে মনোবিজ্ঞান দর্শন মনঃসমীক্ষণ কোনোটারই প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ যোগাযোগ নেই। কারণ ভাবনাটা একান্ত আমার। অভিব্যক্তির বিলাসী বর্ণনার চেয়ে বাস্তবতার বীক্ষণে যদি কিছু নির্মাণ করা যায়-কথাগুলো সে বিষয়ের। সময় এখন করোনার অধীন। কোভিড-১৯ নিয়েছে কেড়ে আমাদের চলিষ্ণু অবাধ সময়কে কিংবা আমরাই দিয়ে দিয়েছি আমাদের সময়-অসময়কে। এজন্যই তো বন্দি। বন্দিত্বে হতাশা নৈরাশ্য গ্লানি বিকার কতোকিছুই তো আসতে পারে। আবার নিরন্তর অবসর কাউকে বানিয়ে দিয়েছে কবি (শোনা কথা- করোনার কারণে কারও কারও তিন/চারটে বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত। এবং জীবনে এই প্রথম অবসরের তাড়নায় কবিতায় হাত-এ কথা বলছেন সগর্বে। কী সাংঘাতিক কথা! ভেবে পাই না, এতো প্রতিভা-প্রজ্ঞা এতোদিন ছিলো কোথায়?)- যেনো নিরন্তর অবসর পেলেই কবি হওয়া যায়-কেননা আলস্যই কবিতা লেখার উপাদান- উপাধানও বটে! অদ্ভুত! আসলে কিন্তু ঘটে চলছে সম্পূর্ণ বিপরীত কিছু। যার সরল নাম ‘পীড়ন’। পীড়ন বুঝতে না পারাটা অসুস্থতা। এ্ররাও মানসিক ব্যাধিগ্রস্ত।

সেটা কেমন? তার নমুনা : শিশু চেয়েছিলো জীবনের অবসর-কিন্তু তার সঙ্গে এক টুকরো খেলার মাঠও, এবং তার প্রিয় খেলার সাথি। তা কি পেয়েছে? পায়নি। শিক্ষার্থী চেয়েছিলো না হোক ক্লাস-পরীক্ষা, অবসরের নৌকোয় চড়ে দেবো পাড়ি অজানার উদ্দেশে। পাড়ি জমাতে পারলো কই। আলস্য জড়িয়ে ধরলো। গেমস, ফেসবুকিং, টিভি দেখা, ইদানীং কিছু অনলাইন ক্লাস (অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মতো) গিলছে। অপেক্ষাকে উপেক্ষা, উদ্বেগকে উইথড্র আর উৎকণ্ঠাকে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো ঘরের মেয়ে সন্তানটি। মানে নারী। সে কি পারলো? বরং প্রত্যক্ষ করলো- আসলে আমার আর ভাইয়ের মাঝে ফারাক আছে বৈকি! ভাই বহির্মুখী। যায় আসে-ওর বন্ধুরাও আসে; রাত গভীর হলেও সমস্যা নেই। দিন দুপুর হলেও তাকে নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। সে পুরুষ, আমি নারী- আমার বারণের গণ্ডি অপরিমেয়। নিরাপত্তার অভাব, দৃষ্টিভঙ্গির ঘাটতি, চিন্তার স্থূলতা, সামাজিক-সংস্কারের এক তরফা নীতি, আর-বহুকালের লালিত ‘মূল্যবোধ’- জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে। সুতরাং, ‘মেনে নাও। মানিয়ে চলো।’   

প্রবীণ ভদ্রলোক বসতেন পাড়ার চায়ের দোকানে; অবসরের সঙ্গী পেনশনভোগী আরও অনেকেই-এখন কেউ নেই। সবাইকে কম-বেশি নিষেধের বড়ি গিলতে হয়েছে। বাড়ির বৃদ্ধা সবাইকে নিয়ে আড্ডা দিতেন-এই অচলায়তন ভেঙেছে এখন; সবার হাতে এনড্রয়েট সেট-নতজানু হয়ে টিপছে আর হাসছে, গম্ভীর হচ্ছে; কারও প্রশ্নের, আলাপের জবাবে বলছে-হুম, হ্যাঁ, ওই আর কি- এসব অবজ্ঞামিশ্রিত শব্দাবলি। আর, স্টারজলসা সিরিয়াল নিরন্তর ভরসা মায়ের। অপরদিকে তার কর্মের পরিধিও গেলো বেড়ে নানা অনুষঙ্গের আব্দারে। আড়ালে-আবডালে বড়ো হলো একটি শিশু; পা দিলো অ্যাডোলেসনস্ পিরিয়ডে-জানতেও পারলো না কেউ- তার মনঃকষ্ট। দীর্ঘ গৃহবাসে খুব দ্রুতই সবার রুচির স্বাদ পাওয়া গেলো ভিন্ন ভিন্ন; চুলা জ্বলে উঠলো বিবিধ রঙে। আদা চায়ের স্বাদ মিটে গেলে চাই একটু দুধ-চা। আর যদি হয়- এলাচ চা, মন্দ কি! মায়ের আনন্দ নিরানন্দ হলো কিনা- কেউ জানে না। অনাকাক্ষিত গর্ভবতী হয়ে ওঠার সংবাদকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। বাবা যথাতথা। ভালোই। কোথাও কোনো কিছু বাদ যায় না। অফিস, আড্ডা পূর্ববৎ। 

ফিরে আসি মেয়েটির কথায়- তারও প্রেম হয়েছিলো, ছিলো সখা-সখী, ভালোও বেসেছিলো কাউকে; তবে এখন দর্শনলাভের দ্বার বন্ধ; কারণটা দার্শনিক নয়,-সামাজিক (হয়তো তখন গুনগুনিয়ে বলে-‘আমার যদি বেলা যায় গো বয়ে, জেনো জেনো/আমার মন রয়েছে তোমার লয়ে)। ভা্ই দেখা করে এলো, আড্ডাও চললো বন্ধুর সঙ্গে, হয়তো প্রেমিকার সঙ্গেও- তাতে কোনো আরক্তি-বিরক্তি কারও নেই। মেয়েটি যাবে কোথায়? তার ইচ্ছেগুলো জখমে রূপ নেয়; জখম ভেতরের রূপ- দেখে না কেউ। এরই মাঝে কারও কারও জীবনে বিয়ের ফুল ফুটলো। কোভিড বাসর। আরেক বন্দিখানা। মুক্তির চেয়ে বন্ধনই কি ভালো ছিলো? একি স্বামিগৃহ, নাকি সবার মনোরঞ্জনের নাট্যমঞ্চ? ভাবনা টাল খেয়ে পড়ে থাকে। চিন্তাস্থিত ভাবনা রবীন্দ্রনাথে গিয়ে ঠেকে- ‘বিবাহ জিনিষটা মিষ্টান্ন দিয়েই শুরু হয়, কিন্তু সকল সময় মধুরেণ সমাপ্ত হয় না (চিরকুমার সভা : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।’ মনস্তাপ বাড়ে- রাত বাড়ে, সংশয় বাড়ে। মিথ্যে মনে হয় জীবন, জীবনের চাওয়া-পাওয়া। অথচ ছিলাম যখন একা, কিংবা বন্ধুদের নিয়ে এক কাপ চায়ে ভাগ বসিয়েছিলো আরও জনাকয়েক। সেই তো ছিলো মোহন-মদির। ভাবনাটা এমনই- ঘরের ওই মেয়েটির।

অবশেষে কী দাঁড়ালো- না তেমন কিছুই নয়। একাকীত্ব নিজেই একা হয়ে গেলো। একটি জীবন স্বাধীনতাহীনতায় একটু স্বাধীকার চাইলো। পেলো না। বিকলাঙ্গ সময় চিত্তকেও বিকলাঙ্গ করলো। মানসিক শক্তি এক ধরনের ভীতিও। ঘরে-বাইরে বস্তুত কেউ নেই। দ্রৌপদীর ভাগ্য-নিয়তি মেনে নিয়েছিলো যতোটা পঞ্চস্বামীকে, মন ততোটা মেনে নেয়নি, একদিনও এক মুহুর্তও। তবুও কবি ব্যাসদেব দ্রৌপদীকে মহীয়সী করে তুলেন আচারে-চরিত্রে-আখেরে পরাজয় কেবল নারী বলে; কেবল ধনঞ্জয় (অর্জুন)কে ভালোবাসতেন সবার চেয়ে বেশি-এই অপরাধে(অপরাধ নয়, শাস্ত্রমতে পাপ)। আহা দ্রুপদনন্দিনী কৃষ্ণা! শকুন্তলা, আন্না, রোহিণী, ভ্রমর, বিনোদিনী, লাবণ্য, কুমু, দেসদিমোনা, অচলা, পার্বতী, সুধারানী-এমন অসংখ্য নারীর দৃষ্টান্ত টানা যাবে; এরা সবাই বৃহত্তর অর্থে পরাজিত। তখন অবশ্য কোভিডের অত্যাচার ছিলো না-তবে সামাজিক শাস্ত্র-বিধির খামতি ছিলো না।

দিবস-রজনী দুঃস্বপ্ন। ঘর ভাঙছে। সংসার ভাঙছে। দূরত্বটাকে গভীর অর্থে দূরত্বেরও অধিক করে তুলেছে ‘করোনা’। মানুষ সামাজিক জীব; অথচ এখন স্বাস্থ্যবিজ্ঞান বলছে-‘সামাজিক দূরত্ব মেনে চলুন।’ অসামাজিক থাকাটাই সভ্যতা, শিষ্টাচার। ব্যাপারটা কেবল কষ্টেরই নয়; কৌতূহলেরও। একদিন দূর- নিকট হয়েছে বলে বিজ্ঞানের জয়গানে মুগ্ধ হয়েছি। এখন নিকট- দূর হয়েছে জেনে আত্মতুষ্টি অনুভব করি। কারণ এখানে প্রশ্নটা বাঁচা-মরার। তবে আমরা কী পেলাম?

মশারিটা টানাও আজ, ঘরেই তো থাকো, বিছানাটা একটু পরিষ্কার আর মাঝেসাঝে ফ্লোরটা। হ্যাঁ ওয়াশরুমটাও যদি পারো- করো। মানলো কি সবাই? ও হ্যাঁ- এতো ঘনঘন মোবাইল কল, কার সঙ্গে কথা- ‘কী কথা তাহার সাথে, তার সাথে?’ আরে রাখো- সব বিষয়ে ইন্টারফেয়ার করো না তো। ও আচ্ছা, উচিত কথা বললেই ইন্টারফেয়ার? কিছু বলবো না; এই-ই শেষ। আসলে শেষ কিন্তু হলো না। বরং এখান থেকেই তা অনিঃশেষ হয়ে উঠলো কথা। তুচ্ছ খুনসুটি- কিন্তু যথেষ্ট শক্ত, বেয়াড়া। এবং এ ধরনের লিলিপুট চিন্তার দাপট ও দৌরাত্ম্য উভয়ই সমাজ-স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি-এটা আমরা জানি না এমন নয়। বাইরে সামাজিক দূরত্ব, ঘরে মানসিক দূরত্ব। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসে চিড় ধরতে সময় ক্ষেপণ হলো না। কী ভয়ঙ্কর পরিণতি সভ্য মানুষের তথাকথিত দম্ভের! কোভিড আক্রান্ত না হয়েও অবশেষে যে রোগে আক্রান্ত হলো- তা কোভিডের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। এর কিন্ত ‍কোনো রেমেডি নেই। কারণ ডাক্তার সাহেব নিজেও এ রোগে আক্রান্ত। সবকিছুর নেপথ্যে কিন্তু ‘করোনা’ই ‘ভিলিয়ান অব দ্য পিস’ নয় এখন আর-এখানে ক্রমশ যুক্ত হচ্ছে নানামাত্রার অনুষঙ্গ। সর্বত্র মানসিক মন্বন্তর বিরাজ করছে কিংবা এই মন্বন্তর চরিত্রবদলের নয়- বৈশ্বিক বিজ্ঞান-শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে ব্যক্তি-মানুষের স্যানিটিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে ক্রমান্বয়ে। 

সক্রোধে বলি- ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি, নিয়ে যাবি কে আমারে…’ 

৯ আশ্বিন ১৪২৭

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০          

     

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

শালার সাহিত্য  | সৌমিত্র শেখর

Wed Nov 4 , 2020
শালার সাহিত্য  | সৌমিত্র শেখর 🌱 লেখার শিরোনাম পড়ে বাঙালি পাঠক চমকে উঠতে পারেন কিন্তু ঢাকার আদি বাসিন্দা কুট্টি বা সুব্বাসিরা চমকাবেন না মোটেই। তারা অবশ্য বলতে ভালোবাসবেন: ’হালার ছাহিত্য’। কুট্টি বা সুব্বাসিদের কথায় পড়ে আসছি। আগে বলি, এই লেখাটি লেখার সময় ঢবঢবির মায়ের কথা খুব মনে পড়েছে।  শুধু ঢবঢবির […]
Shares