মানবিক ছোটগল্পকার । মুম রহমান

মানবিক ছোটগল্পকার । মুম রহমান

হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প নিয়ে বাংলাদেশে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা করেছেন মুম রহমান। হুমায়ূনের ছোটগল্পকে তিনি দেখেছেন বিশ্বের সেরা ছোটগল্পকারদের সঙ্গে এক কাতারে মিলিয়ে। যে জনপ্রিয় উপন্যাসিক, টিভি নাট্যকার, নির্মাতা ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূনকে আমরা চিনি তার বাইরে অন্য এক হুমায়ূনকে আবিষ্কার করেছেন মুম রহমান। সেই আবিস্কারের পথ ধরেই হুমায়ূনের ছোটগল্প ভুবন নিয়ে এই লেখা। চারপর্বের ধারাবাহিকে চিনে নিন ছোটগল্পের এক মহামানবকে যিনি আদতে ভীষণ মানবিক ।

🌱

মানবিক ছোটগল্পকার । মুম রহমান

🌱

খৃস্টের জন্মেরও পাঁচশত বছর আগে এসকাইলাস যখন প্রমিথিউস বাউন্ড নাটক রচনা করেন, তখন সেখানে দেখতে পাই, স্বয়ং দেবতা প্রমিথিউস মানুষের জন্য আগুন চুরি করে আনেন দেবরাজ জিউসের কাছ থেকে। চরম শাস্তি পেলেও সে একবারও অনুশোচনা বা ক্ষমা প্রার্থনা করে না। কারণ দেবতা হয়েও সে বুঝেছিলো, মানুষের বিকাশে কেবল একটু আগুনের দরকার, একবার আগুনের স্পর্শ পেলে সে সভ্যতার চাকাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ধ্রুপদী সাহিত্যের সূচনাকালেই যখন কাহিনীর কেন্দ্রবিন্দুতে দেব-দেবীর আবির্ভাব, নিয়তি আর অলৌকিকের হাতে বন্দী সব কিছু তখনও নাট্যকার-কবিরা মানবতারই জয়গান গেয়েছেন। এসকাইলাসেরও আগে অন্ধ কবি হোমার তার ইলিয়াড আর অডেসি’র মহাকাব্যিক জয়যাত্রায় মানুষকে বড় করে দেখেছেন। প্রাচ্যে তথা প্রাচীন ভারতে মানবতা আরও প্রকট। কেননা, রামায়নে দেখি স্বয়ং ভগবান মানুষ রূপে রাম হয়ে পৃথিবীতে নেমে আসেন। মহাভারত কিংবা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভগবান কৃষ্ণও মানব অবতার হয়ে পৃথিবীতে আসেন। তাই বাংলার সাধক গানেও মানবতার জয়গান বেজে ওঠে, ‘‘এমন মানব জনম আর কী হবে, মন যা করো ত্বরায় করো এই ভবে।’’

টিকে থাকার সংগ্রাম, বেঁচে থাকার উদ্দম, সৃষ্টিশীলতার ভাঙচুর, ভালবাসার আনন্দ-বেদনা  এইসব নিয়েই মানুষ নিজেকে করে তুলেছে মানবিক। মানবিকতার চারটি চরিত্রের কথা বলেছেন ই এম ফর্স্টার। তার মতে কৌতুহল, খোলা মন, সুরুচিতে আস্থা আর মানুষ জাতির উপর বিশ্বাস এই হলো মানবিকতার চারটি দিক। মানুষের বিজয় যাত্রা আর আবিষ্কারের আড়ালে আছে কৌতুহল, নতুনকে বরণ করে নেয়ার খোলামন, সুরুচি দিয়ে মানুষ হয়ে ওঠে সুকুমার ও সভ্য আর বিশ্বাস গড়ে তোলে মানব সভ্যতা। মানবিকতার এই সব গুণাবলী আমরা দেখি, সাহিত্যের নবীনতর শাখা ছোটগল্প সমূহে। বিশ্বব্যাপী সেরা ছোটগল্পকারদের গল্পে মানবিকতা সবচেয়ে বড় বিষয়। ফরাসী ছোটগল্পের রাজা মোঁপাসার ‘নেকলেস’-এ আমরা মানুষের আস্থা-বিশ্বাসের চিত্র যেমন দেখি তেমনি আন্তন চেখভের ‘চুম্বন’ গল্পে দেখি মানুষের ভালবাসা আর বেদনার যুগলবন্দী। ছোটগল্পে চেখভ-মোঁপাসা’র সমমান দেয়া হয় রবীন্দ্রনাথকে, যার হাতে শুধু বাংলা ছোটগল্প সৃষ্টিই হয়নি, লালিত-পালিতও হয়েছে স্বগৌরবে। কাবুলিঅলা, পোস্টমাস্টার, অনধিকার প্রবেশের মতো গল্পে রবীন্দ্রনাথের মানবিকতা সুস্পষ্ট। বিভূতিভূষণের ‘পুঁইমাচা’ গল্পে মানবিক সুখ-দুঃখ, জীবন মৃত্যুর আকুতি দেখি, দারিদ্র্য আর শ্রেণী বৈষম্যের বিরাট বেদনাভার দেখি ‘তাল নবমী’ গল্পে। তারাশঙ্করের ‘তারিণীমাঝি’ বেঁচে থাকার তীব্র আকুতি এবং সব কিছুর পরে সার্ত্রের অস্তিত্ত্ববাদ মেনে নিয়েই বেঁচে থাকার জন্য প্রিয়তম স্ত্রীকেও হত্যা করে। মানিকের ‘প্রাগৈতিহাসিক’ মানুষকে আদিম আর বন্য যুগে নিয়ে যায়। মোদ্দা কথায়, বিশ্ব সাহিত্য এবং তার সাথে তাল মিলিয়ে বাংলা সাহিত্যে মানবিকতার নানা বহু বর্ণিল চিত্র এঁকেছেন গল্পকাররা। 

রবীন্দ্রনাথের হাতে বাংলা ছোটগল্পের যে যাত্রা কালক্রমে মানিক, বিভূতি, তারাশঙ্কর  এই তিন বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়িয়ে, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জগদীশ গুপ্ত, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ হয়ে হুমায়ূন আহমেদের হাতে ঠাঁই পেয়েছে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের ছোটগল্পের মানচিত্রে তিনি একাই একটি বিশাল ভূ-খ- দখলের দাবীদার হতে পারেন। পূর্ববর্তী লেখক সৈয়দ শামসুল হক এক মূল্যায়ণ করেছেন ‘‘হুমায়ূন আহমেদ আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দীর্ঘ জীবন লাভ করবেন তার ছোটগল্পের জন্য। তার কিছু ছোটগল্প কেবল বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে তো বটেই, সমগ্র বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষিতেও অসাধারণ। জীবনের ছবি তিনি এঁকেছেন অনবদ্যভাবে।’’ জীবন আর মানবিকতার প্রেক্ষিতে দেখলে হুমায়ূনের ছোটগল্প আর বাঙময় হয়ে ওঠে। 

রবীন্দ্রনাথের  ছোটগল্পের আলোচনা প্রসঙ্গে মোতাহার হোসেন সূফী উল্লেখ করেছিলেন, ‘নর-নারীর সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, আশা-আকাঙ্খা, পাওয়া না পাওয়ার মর্ম’ ফুটে উঠেছে তার গল্পে। রবীন্দ্রভক্ত হুমায়ূন আহমেদের গল্পেও মানুষের ছোটছোট সুখ-দুঃখ, আশা-বেদনার চিত্রায়ণ ঘটেছে অনবদ্যভাবে। সাহিত্য গবেষক চ ল কুমার বোস হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেনে ‘‘মানুষের ক্ষুদ্র চাওয়া পাওয়া, সুখ-দুঃখ, মিলন ও বিষাদই তার গল্পের উপজীব্য।’’ সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ-বেদনার দরদী চিত্রায়ণের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় ছোটগল্পের মানবিক পরিপ্রেক্ষিত। বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী ছোটগল্পকার রবীন্দ্রনাথের মতো হুমায়ূন আহমেদও তার একাধিক ছোটগল্পে মানবিক চিত্রায়ণ ঘটিয়েছেন স্বার্থকভাবে। 

হুমায়ূন আহমেদের রচনা কর্ম বিশাল। তারমধ্যে ছোটগল্পের সংখ্যাই হয়ে শতাধিক। এইসব ছোটগল্পের বিষয় হিসাবে ওঠে এসেছে মধ্যবিত্ত জীবনের চালচিত্র, দারিদ্র্য, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ, সাধারণ মানুষের প্রেম। এর বাইরেও তিনি রহস্য, অদ্ভূত রস, অতিপ্রাকৃত, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, প্রহসন, শিশুতোষ, ভূতের গল্প ইত্যাদি নানা ধরণের গল্প রচনা করেছেন। তবে তার গল্পের ধরণ বা বিষয় যাই হোক না কেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি মানবিকতা প্রধান উপজীব্য করে তুলেছেন।  মুহম্মদ আবদু হাই ও সৈয়দ আলী আহসান ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘হূমায়ূন জীবন ও জগতকে দেখেছেন এক মায়াবী দৃষ্টিকোণ থেকে। জীবনের ছোট-খাট সুখ-দুঃখ ও নিতান্ত তুচ্ছ ঘটনাও তাঁর এই মায়াবী দৃষ্টির ছোঁয়ায় হয়ে উঠেছে অসামান্য হৃদয়গ্রাহী।’ আমরা তার কিছু ছোটগল্প আলোচনা করলেই বুঝতে পারবো যে তিনি যথার্থই মানুষের ছোট-খাট অনুভূতিকে দরদী ছোঁয়ায় এঁকেছেন, অন্যদিকে শেষ পর্যন্ত মনুষত্ব ও মানবিকতাকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। 

‘অপরাহ্ন’ গল্পটির কথা ভাবা যাক। আবু ইসহাক সাহেব রিকশায় উঠেছেন ঝিকাতলা যাবার জন্য, কিন্তু রিকশাওয়ালার বাবরি চুল এবং চড়া রোদে কম ভাড়ায় যেতে চাওয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়েন। তার ধারণা হয়, এই রিকশাওয়া নিশ্চয়ই মেয়ের বিয়ে কিংবা এই ধরণের অজুহাত দেখিয়ে পরে বেশি টাকার জন্য আব্দার করবে। রিকশাওয়ালার সঙ্গে গল্প জমানোর চেষ্টা করতেই তিনি বিস্মিত হয়ে জানলেন তার নামও ইসহাক। শুধু তাই নয়, তার মতো রিকশাওয়ালারও দুই মেয়ে। কথাবার্তার এই পর্যায়ে রিকশাওয়ালা রাস্তার পাশে হঠাৎ রিকশা দাঁড় করিয়ে দিলো। সে অসুস্থ হয়ে গেলো, মূহূর্তেই রক্ত বমি শুরুকরলো। রিকশাওয়ালার এক কথা, ‘সাব আপনে আমার রিকশাটা দেখবেন। গরিব মানুষ রিকশা গেলে সর্বনাশ।’ রিকশাওয়ালার শরীর ক্রমশ খারাপ হতে লাগলো। অনেকেই উৎসাহ দেখালেও আবু ইসহাক কাউকে রিকশার দায়িত্ব দিলেন না, নিজে রিকশা টেনে টেনে নিয়ে গেলেন সায়েন্স ল্যাবরেটরির পুলিশ ফাঁড়িতে। রিকশাওয়ালাকে দুই তরুণ নিয়ে গেলো পিজি হাসপাতাল। আবু ইসহাক হাসপাতালে এসে দেখলেন ইমার্জেন্সির বেঞ্চের উপর রিকশাওয়ালাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে, সে মৃত। তিনি কী করবেন বুঝতে পারছেন না। নির্লিপ্ত ডাক্তারকে প্রশ্ন করলেন, ‘ওর রিকশাটি আমি থানায় দিয়েছি। এখন কী করব? কাকে খবর দেব?’ তিনি কোন উত্তর পেলেন না। এদিকে তার বাড়ি ফিরতে হবে। মেয়ে ইন্দ্রানীর দাঁতে ব্যথা, তাকে নিয়ে যেতে হবে ডেনটিস্টের কাছে। তিনি এক বোতল ঠা-া পেপসি খেলেন। ছটা বাজতে দেরী নেই। অতএব আরেকটা রিকশায় উঠলেন। এবারের রিকশাওয়ালাটি বয়সে তরুণ। তার নাম সামসু। ‘‘ইসহাক সাহেব কোমল স্বরে বললেন, ‘তুমি কেমন আছ সামসু?’ 

গল্পের শেষে অংশে এসে লেখক বর্ণনা দিচ্ছেন, ‘সামসু অবাক হয়ে পেছনে তাকাল। কোনো জবাব না দিয়ে দ্রুত প্যাডেল চাপতে লাগল। সামনেই ট্রাফিক সিগন্যাল। অনেকক্ষণ সবুজ বাতি জ্বলছে। ওটি লাল হবার আগেই তাকে পার হয়ে যেতে হবে। যাত্রীদের আজেবাজে প্রশ্নের জবাব দেবার সময় নেই।’

এই একটি গল্পের মধ্যে লেখক মানব জীবনের গুণাগুণ, দায়বদ্ধতা, মানবিকতা, সাফল্য, ব্যর্থতা ইত্যাদি তুলে ধরেছেন অতি সূচারুভঙ্গিতে। সামনের ট্রাফিক সিগন্যালের মতো মানুষ দ্রুতই এগিয়ে যেতে চায় সব বাধা পেরিয়ে। পেছনে একটি লাশ রেখে, একজন রিকশাওয়ালার সর্বস্ব রিকশাটিকে রেখে আবু ইসহাক ছটার মধ্যে মেয়েকে নিয়ে ডেনটিস্টের কাছে পৌঁছতে চান। রিকশাওয়ালা লাল সিগন্যালের আগেই পৌঁছাতে চায় তার গন্তব্যে। তবুও এই তাড়াহুড়া, প্রতিযোগিতা কিংবা স্বার্থপরতার জীবনে অচেনা রিকশাওয়ালার রিকশাটি টেনে নিয়ে যান আবু ইসহাক, তার জন্য হাসপাতালে যান, মানুষের জন্যে ক্ষণিকের তরে হলেও মানুষের পথচলা থামে। মানুষ দাঁড়ায় মানুষের পাশে। একজন আরোহী আরেকজন রিকশাচালক দুজনেরই নাম আবু ইসহাক, দুজনেরই দুটো কন্যা সন্তান আছে কিন্তু ভিন্ন শ্রেণী, পেশা কিংবা জগতের দুটো মানুষকে ক্ষণিকের মানবিকতায় একটানে এক সুতোয় গেঁথে ফেলেন হুমায়ূন আহমেদ।

মানুষ ধবংস হয়ে যায় কিন্তু পরাজয় মানে না। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের দ্য ওল্ড ম্যান এ- দ্য সি উপন্যাসে আমরা বুড়ো সান্তিয়াগোকে শেষ শক্তি দিয়ে বিশাল মাছটিকে তীরে আনতে দেখি। “A man is not made for defeat…a man can be destroyed but not defeated.” আক্রমণ থেকে শেষপর্যন্ত মাছটিকে অক্ষত না-রাখতে পারলেও সে মাছটি নিয়ে তীরে ফিরে আসে এবং সবাই বুঝতে পারে সান্তিয়াগো কতো বড় মাছ ধরেছিলো। হুমায়ূন আহমেদের ‘খেলা’ গল্পটি যেন মানুষের এই অপারজেয় শক্তি আর স্পৃহার কথাই বলে। ‘খায়রুন্নেসা গার্লস হাই স্কুলের থার্ড স্যার, বাবু নলিনি রঞ্জন একদিন দুপুরবেলা দাবা খেলা শিখে ফেললেন।’ বন্ধু জালাল সাহেবের অনুরোধে নিজের অপছন্দের এই খেলাটি শিখেই তিনি জালাল সাহেবকে পরপর তিনবার হারিয়ে দিলেন। এরপর থেকে শুরুহলো তার নিরবচ্ছিন্ন জয়যাত্রা। ‘তাঁর বিদায় উপলক্ষ্যে মানপত্রে লেখা হলো – বাবু নলিনি রঞ্জন দাবার জগতের এক মুকুটহীন সম্রাট। তিনি বাংলাদেশে দাবার চ্যাম্পিয়ন জনাব আসাদ খাঁকে পরপর তিনবার পরাজিত করে দাবার জগতে এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।’ স্কুল কমিটির সেক্রেটারি ও পৌরসভার চেয়ারম্যান সুরুজ মিয়া তার বিদায় অনুষ্ঠানে স্কুল কমিটিকে একটি পনের হাজার টাকার চেক তুলে দেন। কিন্তু শর্ত দেন, ‘যদি কেউ নলিনি বাবুকে হারাতে পারে তাকে এই টাকা দেয়া হবে। আর যদি কেউ হারাতে না পারে, তাহলে স্কুল ফান্ড নলিনি বাবুর মৃত্যুর পর এই টাকাটা পাবে।’ কিন্তু আশ্বিনের এক সন্ধ্যায় প্রবল হাপানির টান নিয়ে নলিনি বাবু তাঁর জীবনের শেষ দাবা খেলাটি খেলতে বসলেন দীর্ঘদিনের বন্ধু জালাল সাহেবের সঙ্গে। জালাল সাহেব বহু কষ্টে তাকে রাজী করিয়েছেন এ খেলায় হারার জন্য, কারণ হারলে জালাল সাহেব পনের হাজার টাকা পাবেন, যা দিয়ে হতদরিদ্র নলিনি বাবুর চিকিৎসা করাবেন, শীতের জন্য কিছু গরম কাপড় কিনে দেবেন। নলিনি বাবু হারার জন্যেই খেলতে বসলেন। কিন্তু খেলতে খেলতেই তিনি যেন হুশ হারিয়ে ফেললেন। ‘জীবনের শেষ খেলাটিতে বহু চেষ্টা করেও তিনি হারতে পারলেন না। সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় প্রায় বিনা চিকিৎসায় নিয়ামতপুরের গৌরবের মৃত্যু হলো – ১২ নভেম্বর ১৯৭৫ সন। রোজ মঙ্গলবার। খায়রুন্নেসা গার্লস স্কুল সে উপলক্ষে দুদিন ছুটি থাকল।’ নলিনি বাবু মৃত্যু বরণ করলেন, কিন্তু একটাবারের জন্য দাবা খেলায় হার মানলেন। এই একবার পরাজিত হলে তিনি হয়তো বেঁচে থাকতেন, কিন্তু সে বেঁচে থাকা হতো তেলাপোকাটির মতো, ধুকে ধুুকে বিবর্তনের তালে তাল মিলিয়েই টিকে থাকা। কেবল টিকে থাকা মানুষের ধর্ম নয় বলেই, মরণশীল মানুষও অমর হয়, হুমায়ূন মানুষের সেই অমরত্বের সন্ধান করেছেন সাধারণ মানুষের সংগ্রামের মধ্যে। কোথাকার কোন এক নলিনি বাবু, তিনি এক মহাকাব্যিক বীর হয়ে ওঠেন ‘পরাজয়’ নয়, ‘মৃত্যুকে বরণ করে। 

‘‘উনিশ শ’ একাত্তর’ গল্পে আমরা দূর্বল নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর পাকিস্তানীদের নির্যাতনের চিত্র। হানাদার বাহিনী একটি গ্রাম দখল করে। গ্রামের শিক্ষক আজিজ মাস্টার পালাতে পারে না তার অন্তঃসত্তা ছোটবোনকে রেখে। সে তবু বোনকে টেনে নিয়ে যেতে চায়, আজিজ মাস্টারের মা এতে করে তার কাপুরষতা নিয়ে গালি দেয়। এই ভীতু আজিজ মাস্টারের কাছে নীলগঞ্জের মুরব্বিরা আসে। সে যেহেতু শিক্ষত, ইংরেজি জানে, তাকে যেতে বলে মিলিটারিদের কাছে। আজিজ মাস্টারের মেজরের সামনে যায়। মেজর তাকে প্রশ্ন করে, জবাবে খুশি না হয়ে চড় মারে, জানতে চায়, সবাই কোথায় লুকিয়েছে। আজিজ মাস্টার তার বউকে লুকিয়েছে কিনা জানতে চাইলে সে জানায় সে বিয়েই করেনি। চল্লিশ বছরেরও বিয়ে করেনি শুনে মেজর তার সঙ্গে মজা করে, তার ‘যন্ত্রপাতি’ ঠিক আছে কিনা জানতে চায়, এক পর্যায়ে তার পায়জামা খুলে ফেলা হয়। শুরুতে আজীজ মাস্টার মিথ্যা করে বলে সে পাকিস্তান ভালবাসে, পাকিস্তানীদের ভালবাসে, কিন্তু মেজর বলে, সত্যি কথা বললে তাকে ছেড়ে দেবে। সে তখন জানায়, সে পাকিস্তানিদের অপছন্দ করে, সে বাংলাদেশ চায়। মেজর দেশদ্রোহী হিসাবে তাকে মৃত্যুদ- দিতে চায়। আজীজ কিছু বলে না। মেজর অবশেষে তাকে বলে কাপড় পরে বিদায় হতে বলে। গল্পটি এখানে এসেই মোড় পাল্টে ফেলে। আজীজ মাস্টার কাপড় পড়ে না, হঠাৎ একদলা থুথু মেজরের গায়ে মারে। আবার এগিয়ে এসে আরেক দলা থুথু ফেলে মেজরের সার্টে। কিন্তু মেজর কিছু বলে না, সে শান্ত স্বরে সবাইকে বলে, অনেক বিশ্রাম হয়েছে, এবার রওনা হওয়া যাক। গল্পের শেষ হয় এভাবে ‘সৈন্যদল মার্চ করে এগুচ্ছে। মেজর সাহেবের মুখ অসম্ভব বিবর্ণ। পেছনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একজন নগ্ন মানুষ।’’ বর্বর পাকিস্তানী সৈনিকদের উদ্দত অহং ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদী চেতনার প্রতীকি প্রকাশ ঘটেছে আজিজ মাস্টার চরিত্রের মধ্য দিয়ে। সস্বস্ত্র মেজর আজিজ মাস্টারের গায়ে নির্ভয়ে থুথু ছুড়ে মারে নগ্ন আজিজ মাস্টার। মৃত্যুর ভয়কে উপেক্ষা করে সে তার ঘৃণা প্রকাশ করে। সবচেয়ে ভীরুমানুষটিও যে দেশমাতৃকার অপমানে প্রয়োজনে সাহসী হয়ে উঠতে পারে, মৃত্যু ভয়কে তুচ্ছ করে তীব্র ঘৃণার প্রকাশ করতে পারে এ গল্পে তার নজির বিদ্যমান। হুমায়ূন আহমেদ এই গল্পের মধ্যে শুধু স্বাধীন দেশ নয়, সামগ্রিক অর্থে মানুষের স্বাধীনতার স্বাদ তুলে ধরেছেন। 

বিশ্ব সভ্যতায় টিকে থাকার সংগ্রামে মানুষ সবচেয়ে এগিয়ে, কারণ সে পরাজয় মানতে জানে না। পরাজয় নিশ্চিত জেনেও মানুষ হাল ছাড়ে না, সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষটিও জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যায় বীরের বেশে। এমনি এক বীর বক শিকারি আজরফ। ‘শিকার’ গল্পের নায়ক আজরফ। ভাটি অ লের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে এ গল্প। ‘‘ধান আর গানের দেশ আমাদের ভাটি অ ল। ভূপ্রকৃতি যেমন, তেমনই এর জীবন ধারা, আর শখ-সৌখিনতাও দেশের অন্য এলাকা থেকে ভিন্ন। আলাদা আলাদা কৌশলে পাখি ধরা এই এলাকার মানুষের প্রিয় ব্যসন। পোষা বক দিয়ে প্রলুব্ধ করে জংলি বক ধরা তার একটি। পাখি শিকারের এই কৌশল বিপদজনক বলেই হয়তো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেকের কাছে অতি প্রিয়। বক শিকারের এই ধারা প্রায় বিলীয়মান। এতে জংলী বকের তীক্ষ্ণ ঠোঁটের আঘাতে চোখ হারানো এক সাধারণ ঘটনা। শিকারী কিন্তু এতে দমিত হয় না। বক শিকারী আজরফ আর তার পোষা বক আনুফাকে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প ‘শিকার’। গাল্পিকের মুন্সিয়ানায় ছোটগল্পের সংক্ষিপ্ত পরিসরও পাঠককে এতো অচেনা জগতে মুগ্ধ করে রাখার জন্য অপর্যাপ্ত মনে হয় না। 

ভাটি এলাকার এমন আকর্ষণীয় ও বিশ্বস্ত ছবি আমরা এর আগে কেবল জিবরাইলের ডানা খ্যাত শাহেদ আলীর কিছু গল্পে প্রত্যক্ষ করেছি।’’

পিতা মতি মিয়ার কথা ‘পাখি-মারারা চোখ না যাওয়া পর্যন্ত ফিরতে পারে না’’ শুনেই হয়তো শেষ মুহূর্তে আজরফ তার পোষা বক আনুফাকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু আনুফা যায় না। বরং সে ডাকতে থাকে আর ঝাকে ঝাকে বক নেমে আসতে থাকে। গল্পের শেষাংশে লেখক টানটান উত্তেজনার সৃষ্টি করেছেন, ‘‘মাথার উপর উড়তে থাকা বকগুলি দ্রুত নিচে নেমে আসছে। আজরফ হাত বাড়াল। আসছে ওরা নেমে আসছে। এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত কাঁপিয়ে তারা ডাকল কক কক।’’ শিকারী আজরফ জানে এই ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে আসা বকদের একটিই হয়তো আজ তার চোখ খুবলে নেবে, সে তবু নড়ে না। তাকিয়ে থাকে। মানুষের আদিম শিকারের মগ্ন নেশায় সে বুদ। শিকার ও শিকারীর অদল-বদল হতে পারে যে কোন মুহূর্তে, বক শিকারী আজরফের চোখদুটো হতে পারে বকের ঠোঁটের শিকার। তবু নির্ভীক, নির্বিকার, অথবা কে জানে নিয়তি তাড়িত। 

নিয়তি, দারিদ্র্য কিংবা প্রকৃতির কাছে মানুষ কখনো বা অসহায়। কখনো কখনো পরিস্থিতি আর পরিবেশের কাছে হার মেনে যায় মানুষ। জ্যাঁ জ্যাক রুশো বলেন, “It is too difficult to think nobly when one thinks only of earning a living.” তাই জীবন সংগ্রামের কাছে আপাতভাবে মানুষ বিপর্যস্ত হয়। তবু তার ভেতরের মানবিকতা মরে না। ‘সুলেখার বাবা’ গল্পটি দ্রারিদ্র্যের সঙ্গে মানবিক স্নেহ-মমতার নিরন্তর লড়াইয়ের এক করুণ চিত্র। অভাবের তাড়নায় নাম পরিচয়হীন লোকটা নিজের সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছিলো। তাকে যথেষ্ট টাকা দেয়া হলেও সন্তানের জন্যে তার মন টানে। সন্তানকে দেখতে আসে সে। পরিচ্ছন্ন, উচ্চবিত্ত, সুংস্কৃত ঘরের সন্তান সুলেখা জানে না, সামনে বসে থাকা নোংরা লোকটি আসলে তার বাবা। সুলেখার মা তার হাত দিয়ে টাকা পাঠিয়ে লোকটিকে বিদায় হতে বলে। লোকটি টাকা নেয় না। সুলেখা তার মাকে প্রশ্ন করে ‘‘ঐ লোকটি কে মা? তাকে তুমি বকছ কেন?’

সুলেখার মা তার জবাব দিলেন না।’’

দারিদ্র্য আর অভাবের কাছে মানবিক মায়া যখন পরাজিত হয় তখন হয়তো কারো কাছেই কোন জবাব থাকে না। জবাবহীনতা দিয়েই ‘সুলেখার বাবা’র গল্পটি শেষ হলেও পিতৃস্নেহ শেষ হয় না। বেঁচে থাকার জন্য, পরিবারের আর সদস্যদের বাঁচিয়ে রাখার জন্যে নাম না-জানা যে লোকটি এক সময় নিজের সন্তানকেই বিক্রি করে দিয়ে ছিলো সে আজ আর মেয়েকে দেখতে এসে টাকা নিতে পারে না, নিষেধ স্বত্ত্বেও, আরও সন্তান থাকা স্বত্ত্বেও মেয়েকে সে ভুলতে পারে না। তার জন্য কেবল মন টানে।

‘জুয়া’ গল্পের দরিদ্র শিক্ষক প্রণব বাবুও অভাবের কাছে অসহায়। পুত্র সুবল মানুষ হয়নি, কন্যাকে কলকাতায় বিয়ে দিয়েছেন। সুবল বাবার কাছে এসে কিছু টাকা চায়, নইলে তার বিপদ হবে বলে। তিনমাস ধরে প্রণব বাবুর স্কুলে বেতন হয় না। হেডস্যার কমিশনের লোভে সব শিক্ষককে দিয়ে পাঁচটি করে লটারির টিকেট কিনিয়েছেন। প্রণব বাবু হঠাৎ করেই সেই লটারির টিকিট জিতে যান। পকেটে দুই লাখ টাকার টিকিট, অথচ এদিকে সুবল তিনশ টাকার জন্য হাত পাতে, বাজারের করিম মিয়া দুইশ এগার টাকার পাওনার তাগাদা দেয়, তবু তিনি কাউকে কিছু বলতে পারেন না। দীর্ঘ দিনের দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত প্রণব বাবু আকস্মিক এতো অর্থ প্রাপ্তিও যেন তাকে কোন ভরসা দেয় না। এক পর্যায়ে প্রবাসী মেয়েটার কথা ভেবে তিনি কাঁদতে থাকেন। ছেলে আশ্বাস দেয়, সব ঠিক হয়ে যাবে।

‘‘প্রণব বাবু ধরা গলায় বললেন, ‘কিছুই ঠিক হয় না।’

তার কথাকে সমর্থন করেই যেন ঘরের ভেতর থেকে তক্ষক ডেকে উঠল। বাইরে মাছের চোখের মতো মরা জ্যোৎস্না।’’

গল্পের শেষে এসে, প্রকৃতি আর পরিবেশ যেন চিরকালের মানব আবেগের সঙ্গী হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের মতো হুমায়ূনের কোন কোন গল্পেও প্রকৃতি আর মানব জীবন অবিচ্ছেদ্য হয়ে ওঠে। তিনি একাধিক গল্প উপন্যাসের নাম গ্রহণ করেছন রবীন্দ্রনাথ থেকে। তার একাধিক ব্যক্তিগত লেখা, স্মৃতিচারণ, গ্রন্থ উৎসর্গে রবীন্দ্র স্তুতির অভাব নেই। রবীন্দ্র প্রভাব তার ছোটগল্পে থাকাও তাই স্বাভাবিক। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছেন, ‘‘শুধু উপন্যাস নয়, ছোটগল্পের তার সিদ্ধি ছিল ঈর্ষণীয়। ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যগুলো তার প্রতিটি গল্পে প্রতিফলিত এবং প্রতিটি গল্পের শেষে রবীন্দ্রনাথের না শেষ হওয়ার বিষয়টি ছিল যেন মূখ্য।’’

ভয়াবহ দারিদ্রের কাছে মানবিকতার স্খলনের আরেকটি বিস্ময়কর গল্প ‘খাদক’। গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলে লেখকের সামনে হাজির করা হয় খাদক মতিকে। মতি এই এলাকার গর্ব, সে একাধিক মেডেল পেয়েছে, সে এক বসায় আস্ত গরুখেয়ে ফেলার খেলা দেখায়। মতি রেকর্ড গড়ার জন্য আস্ত গরুখেতে থাকে। অথচ তার অভূক্ত সন্তানেরা না-খেয়ে থাকে। লেখক যখন প্রশ্ন করেন, তার সন্তানেরাও খাদক কি-না, মতি জবাব দেয়,‘‘ জ্বি-না। তারা না-খাওন্তির দল। খাইতে পায় না। কাজকাম তো কিছু করি না, খাওয়ামু কী? তারা হইল গিয়ে আফনের দেখক।’’

‘‘খাদক’ অতিশোয়ক্তি আর জীবন নিয়ে প্রহসনের গল্প। মানুষের বাজীর কাছে মানবিক গুণও তুচ্ছ। খাদক গল্পে হুমায়ূন সেই স্বাক্ষরই এঁকেছেন।’’ একটি লোক জীবিকার প্রয়োজনে, অন্যকে মুগ্ধ করে অর্থ উপার্জনের জন্যে আস্ত গরুখেতে বসে, পাশেই তার অভূক্ত সন্তানেরা তাকিয়ে তাকিয়ে মাংসের স্তুপ নিঃশেষ হতে দেখে এমন গল্পের প্রেক্ষাপট বিশ্বসাহিত্যে যথার্থই দূর্লভ। 

‘‘পিশাচ’ গল্পে উঠেছে মানবিকতার এক দূর্লভ ছবি। মকবুল নির্বিবাদে মানুষ হত্যা করতে পারবে, মামাতো বোন কইতরীর স্বামীকে হত্যা করে ভালবাসার পাত্রীকে ছিনিয়ে আনতে পারবে বলেই পিশাচ-সাধনায় মত্ত হয়েছে। সিদ্ধির জন্য আটটি কাক পানিতে চুবিয়ে মারতে হবে। খাঁচায় করে কাক নিয়ে ঘুরছে মাসের পর মাস। কিন্তু একটা কাক মারার নির্মমতাও আয়ত্ব করতে পারছে না। মকবুলের এই ব্যর্থতা – মানবিক মূল্যবোধেরই জয়গাঁথা।’’

নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জীবনের ছোটখাটো ঘটনার চিত্রায়নে হুমায়ূন এক কূশলী। ‘ফেরা’ নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের ছোট্ট এক মানবিক দলিল। এ গল্পে আসলে তেমন কোন ঘটনাই নেই, একরাতে এক পরিবারের ভাত খাওয়ার সাধারণ চিত্র। এই পরিবারটি ভাল মতে খেতে পায় না। জরী, পরী, দিপুকে নিয়ে হাসিনার সংসার। জরী প্রতিদিন এক জিনিস দিয়ে ভাত খেতে চায় না, একটা ডিম ভাজি হলেও সে খুশি, তার সাথে ছোট ভাই দিপুও খেতে চায় না। ভাত নিয়ে রাগ করে। অন্যদিকে অসুস্থ্য পরী মরিচ দিয়ে হলেও একটু ভাত খেতে চায়। কিন্তু তাকে দুধ দেয়া হয়। এরমধ্যে ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দিপুর বাবা সুখবর নিয়ে আসে, তার বেতন বেড়েছে চল্লিশ টাকা। সেই খুশিতে সে একটি মাছ নিয়ে এসেছে। 

নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে একটি মাত্র রুইমাছ আনন্দধারা বইয়ে দেয়, এক মুহূর্তে দারিদ্র্য ও বেদনা কাটিয়ে জোছনার আলো প্রকটিত হয়ে ওঠে। একটু আগেও হাসিনার কাছে অভাব জর্জরিত যে জীবন বিষাদময় ছিলো সে হাসিনা এখন চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত হয়। ‘‘বাসন-কোসন কলতলায় রাখতে গিয়ে হাসিনা অবাক হয়ে দেখে মেঘ কেটে অপরূপ জোছনা উঠেছে। বৃষ্টিভেজা গাছপালায় ফুটফুটে জোছনা। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সেদিকেই। অকারণেই তার চোখে জল এসে যায়।’’ মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে প্রকৃতির এ এক নিদারূণ বন্ধন। গল্পগুচ্ছ প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসুর মন্তব্যটি ‘মানব জীবন বিশ্বপ্রকৃতির পটভূমিকায় প্রসারিত’  এ গল্পের সাথেও মিলে যায়। 

‘জলছবি’ গল্পটিও মধ্যবিত্ত জীবনে একটি চাকরি ও প্রমোশনের প্রভাব ও প্রত্যাশা ফুটে উঠেছে নিবিড়ভাবে। কেরানী জলিল সাহেব অফিসে আলু ভাজা রুটি দিয়ে লা  সারেন, তাকে সবাই মিস্টার পটেটু ভাজা বলে। সেকশন অফিসার নাজমূল হুদা তাকে পছন্দ করেন না। প্রায়ই হেনস্তা করেন। ডেসপাস সেকসনের মিষ্টি মেয়েটিও তার সঙ্গে আলু ভাজি নিয়ে রসিকতা করে। প্রভিডেন্ড ফান্ডের টাকা উঠিয়ে বাবার শেষ চিকিৎসা করেছেন। বাবা বাঁচেনি, কিন্তু জলিল সাহেব সদাই এক অনিশ্চয়তা আর ভয়ের মধ্যে জীবন যাপন করেন। এই অবস্থায় একদিন অফিস যেতে গিয়ে বাসে ওঠার সময় তার জুতার তলা খুলে যায়। জুতা ঠিক করে অফিসে আসতে তার দেরী হয়ে যায়। এরমধ্যে বড় সাহেব তাকে খোঁজ করেছে শুনেই তিনি ঘামতে থাকেন। তার মনে হলো, নিশ্চয়ই তার চাকরি চলে গেছে। অথচ বড় সাহেব তাকে প্রমোশনের খবর দিলেন। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য তাকে এতোটাই কাবু করে ফেলেছে যে সে এ খবর হজম করতে পারে না। স্যার হ্যান্ডশেকের জন্যে হাত বাড়ালে সে কিছুই বুঝতে পারে না। ‘যখন পারলেন তখন তাঁর চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল। তিনি ধরা গলায় বললেন, ‘স্যার জুতাটা ঠিকমতো সেলাই করেনি। একটা পেরেক উঁচা হয়ে আছে। খুব ব্যথা লাগছে।’ দীর্ঘদিনের কেরানী হঠাৎ অফিসার গ্রেডে প্রমোশন পেয়ে আত্মস্থ হতে সময় নেন। এরপর সবাই বিরানী আর টিকিয়া দিয়ে লা  করে। জলিল সাহেবের তখন ইচ্ছা করে ডেসপাস সেকশেনর মেয়েটিকে ডেকে দেখাতে যে, আজ তার টিফিন বাটিতে আলুভাজি, রুটির সঙ্গে একটি গুড়ের সন্দেশ আছে, মেয়েটি দিয়ে দিয়েছে। ‘মেয়ে জাতটা হচ্ছে মায়াবতীর জাত। শুধু শুধু মায়া দেখায়। জলিল সাহেবের চোখ আবার ভিজে উঠল। ডেসপাস সেকশনের মেয়েটি বলল, ‘স্যার আপনার কষ্ট হচ্ছে। আপনি বরং জুতাটা খুলে রাখুন।’ 

এই গল্পে বাম পায়ের জুতার তলা খুলে পরা, জুতা সারাতে গিয়ে অফিসে দেরী হওয়া, অফিসে বড় স্যারের সামনে প্রমোশনের কথা শুনে জুতার পেরেকের কথা বলা, পছন্দের মেয়েটির মুখে জুতা খুলে রাখা এই সবই যেন দরিদ্র, সাধারণ মানুষের জীবনের এক প্রতীকি উপস্থাপন। লেখক নিম্নমধ্যবিত্ত কেরানী জীবনকে জুতার সঙ্গে সূচতুরভাবে মিলিয়ে দিয়েছেন। মানবিকতা এখানে জুতার তলা আর বেরিয়ে থাকা পেরেকের মধ্যে আটকে আছে। 

একদিকে মানুষের অমিত সম্ভাবনা, অন্যদিকে পরিবেশ ও পরিস্থিতির সামনে অসহায়ত্ব  মানবিকতার শক্তি ও দূর্বলতা দুটোই ফুটে ওঠেছে হুমায়ূন আহমেদের গল্পে। তবু শেষ পর্যন্ত এই সব গল্পের মধ্যে ‘মানুষ মরে যাবে তবু পরাজিত হবে না’ হেমিংওয়ের সেই বাণীই প্রমাণিত হয়। 

‘জলছবি’, ‘সুলেখার বাবা’, ‘জুয়া’ ‘ফেরা’ গল্পসমূহের মধ্যে মানবিকতার আরেকটি দিক আমরা লক্ষ্য করি, সেটি বাৎসল্য রস। লক্ষ্যণীয় এই সবগুলো গল্পই পিতৃস্নেহ প্রকটিত। হুমায়ূনের গল্পের অন্যতম আরেকটি দিক এই বাৎসল্য রস। নূন আনতে যাদের পান্তা ফুরায় তাদের হৃদয়েও ভালবাসার কোন অভাব হয় না। নিম্নবিত্ত অথবা মধ্যবিত্ত, যেই প্রেক্ষিতেই গল্প রচনা করুন না কেন, মানবিক মায়া, বাৎসল্য, স্নেহ, করুণা ধারায় ভরে ওঠে তার প্রতিটি গল্প। 

‘‘সৌরভ’ গল্পে নিম্ন মধ্যবিত্তের আয় নিয়ে আজহার খাঁ সংসারের খরচ চালিয়ে ছেলেমেয়েদের কোনো সখই প্রায় পূরণ করতে পারেন না। বড়ো মেয়ে লিলি একটা জিনিস এনে দেওয়ার জন্যে পিতাকে অনেক দিন ধরেই বলছে। পিতার আয়ের কথা জেনেও মেয়ের এই অহেতুক আব্দার তাকে বিরক্ত করে। অভিমানী মেয়ে করে একদিন তার জমানো তিনটা দশ টাকার নোট দিয়ে পিতাকে জিনিসটা এনে দেওয়ার জন্য বললো। লজ্জা ও হতাশার এক মিশ্র অনুভুতি নিয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন। তাঁর মনে হলো লিলি যেন তাঁকে লজ্জা দেওয়ার জন্যেই তিনটা দশ টাকার নোট দিয়ে জিনিসটা এনে দিতে বললো। তাঁর আরো মনে হলো তিনি কুকুরের জীবন অতিবাহিত করছেন। তখন ঝপ্ ঝপ্ করে বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টির ধারা ঝরছে। এক দোকানে গিয়ে মেয়ের আব্দার করা ‘ইভিনিং ইন প্যারিস’ নামের সেন্টের শিশিটা খুঁজে পান, কিন্তু ছাব্বিশ টাকা পঞ্চাশ পয়সা দাম দিতে গিয়ে দেখেন তাঁর পকেটে লিলির দেয়া টাকাগুলো নেই, পড়ে গেছে, অন্য পকেটে মাত্র আড়াই টাকা আছে। নির্বিকার দোকানী যথাস্থানে জিনিসটা রেখে দেয়। আজহার খাঁ খুবই ব্যথিত হন। মেয়ে শখ করে একটা জিনিস চেয়েছে, তার দেয়ার সামর্থ নেই, মেয়ে টাকা জমিয়ে দিয়েছে, সে টাকা তিনি হারিয়ে ফেললেন। উদভ্রান্তের মতো তিনি রাতের রাজপথ বেয়ে ছুটে চলেছেন। পিতার বেদনার সাথে মিলিয়ে তখন প্রবল বৃষ্টি ঝরছে। বৃষ্টিতে ভিজে তিনি বন্ধু রফিকের কাছে টাকা ধার করার জন্যে গেলেন। যেমন করেই হোক মেয়ের জন্যে  জিনিসটা কিনতেই হবে। তিনি তখন অনুভব করলেন তাঁর জ্বর এসে গেছে। বন্ধুর সহানুভূতি ও টাকা নিয়ে তিনি দোকানীর ঘুম ভাঙ্গিয়ে সেন্টের শিশিটা যখন জোগাড় করলেন তখন রাত সাড়ে বারোটা বাজে। রিকশায় করে বাসার কাছে আসতেই তিনি লক্ষ্য করেন হারিকেন জ্বালিয়ে লিলি আর লিলির মা তাঁর জন্যে উৎকন্ঠিতভাবে দাঁড়িয়ে আছে। রিকশা থেকে নামতে গিয়ে আজহার খাঁ হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। সেই সঙ্গে শিশিটা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলো। চারদিকে সুবাস ছড়িয়ে পড়ে।

‘‘তিনি ধরা গলায় বললেন, লিলি তোর শিশিটা ভেঙ্গে গেছে রে। লিলি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো, ‘‘আমার শিশি লাগবে না। তোমার কি হয়েছে বাবা?’’

বাবা ঘরে ঢুকলেন। গভীর রাতে তিনি জ্বরে আচ্ছন্ন। হারিকেনের রহস্যময় আলো জ্বেলে উৎকন্ঠিত মেয়ে লিলি আর লিলির মা জেগে আছেন। জানালা দিয়ে ঠা-া হাওয়া আসছে। ‘‘আর সেই হাওয়া সেন্টের ভাঙা শিশি থেকে কিছু অপরূপ সৌরভ উড়িয়ে আনল।’’

গল্প এখানে শেষ হলেও, এই সৌরভ পাঠকের মনে ছড়িয়ে থাকে দীর্ঘকাল। সেন্টের শিশির এই সৌরভ যেন প্রকারান্তরে পিতা ও কন্যার ভালবাসার সৌরভ, দরিদ্র পরিবারে ভালবাসার সৌরভ। 

সমালোচক আজহার ইসলাম লিখেছেন, ‘‘সংসারের অনেক যন্ত্রণার মধ্যেও বাৎসল্যের এই ছোঁয়াটুকু না থাকলে তো পুরো সংসারটিই মিছে হয়ে যায়। হুমায়ুন আহমেদ অদ্ভুত কৌশলে কন্যার প্রতি যেমন পিতার বাৎসল্যের ছবি অঙ্কন করেছেন তেমনি সংসারের ভারে ন্যুব্জ পিতার প্রতিও উৎকন্ঠিত কন্যার, যেন ছেলের প্রতি এক মায়ের, বাৎসল্য সঞ্চার করে মায়া আর মমতার এক অপরূপ ছবি পাঠককে উপহার দিয়েছেন।’’

‘অংকশ্লোক’’ গল্পের জালালুদ্দিন বি.এ.বি.টি অঙ্ক নিয়ে নানা রকম শ্লোক তৈরি করেন। তাকে সবাই পাগলা মাস্টার নামেই চেনে। এককালে তাকে মুসলমান যাদব, অংকের জাহাজ বলা হতো। পাটীগণিতের যে কোন অঙ্ক তিনি মুখে মুখে করতে পারতেন। কিন্তু এখন প্রায় পাগল হয়ে গেছেন। ‘‘দিনরাত কবিতা-টবিতা লেখেন অঙ্কশ্লোক। মেয়েটা মারা যাবার পর মাথাটা খারাপ হয়ে যায়। খুব আদরের ছিল মেয়েটি। নাইনে পড়তো। অঙ্কে কাঁচা ছিলো বলে বাবার কাছে খুব বকা খেতো। মেয়েটা বাবাকে অসম্ভব ভয় করতো। মেয়েটা মরবার আগে বাবাকে বললো, এখন তোমাকে কেন জানি ভয় লাগছে না বাবা। আগে ভয় লাগত। অঙ্ক ভয় লাগতো, সেই সঙ্গে তোমাকেও লাগত। এখন একটুও ভয় লাগছে না। 

মেয়েটার মৃত্যু স্যারকে খুবই এফেক্ট করে। মাথায় একটা চিন্তা ঢুকে যায় কি করে ছাত্রদের অঙ্ক ভীতি দূর করা যায়। আস্তে আস্তে মাথাটাই খারাপ হয়ে যায়।’’

বর্তমানে তিনি বিশাল খাতায় অঙ্ক শ্লোক লিখছেন, যেগুলো দিয়ে বই করবেন, বইয়ের নাম রেখেছেন ‘নুরুন নাহার’, তার কন্যার নামে নাম। দশ হাজার শ্লোক সম্পন্ন হলেই তিনি পুস্তক প্রকাশ করবেন। তার দুঃখ, এই বইটা আরো পনেরো বছর আগে লিখতে পারলে তার কন্যার কাজে লাগতো। গল্পের শেষ লাইনে এসে তিনি লেখকের কাছে প্রার্থনা করেন, ‘একটু দোয়া রাখবেন। কাজটা যেন শেষ করতে পারি।’ 

পিতৃস্নেহের এমনি ফল্গুধারা ঝরে পড়েছে তার আরেক গল্প ‘আনন্দ-বেদনার কাব্য’-তে। রিক্তশ্রী পৃথিবী নামের একটি কাব্যগ্রন্থ ও কবিকে নিয়ে এই গল্প তৈরি হয়েছে। লেখক গ্রন্থটির ভূমিকা পড়েন ‘‘দীর্ঘ পাঁচ বছর পূর্বে রিক্তশ্রী পৃথিবীর পা-ুলিপি প্রস্তুত করি। সেই সময় আমার অতি আদরের জ্যেষ্ঠ কন্যা মোসাম্মৎ নুরন্নাহার খানম (বেনু) উক্ত গ্রন্থের জন্যে প্রচ্ছদচিত্রটি অঙ্কন করে। অর্থাভাবে তখন গ্রন্থটি প্রকাশ করিতে পারি নাই। আজ প্রকাশিত হইল। কিন্তু হায় আমার বেনু মা দেখিতে পাইলো না।’’ এই গ্রন্থ এবং গ্রন্থের কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা নিয়েই লেখক গল্পটি লিখেছেন। রিক্তশ্রী পৃথিবী কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো তেমন মান সম্পন্ন নয়। ‘রিক্তশ্রী পৃথিবীতে মোট এক শ’ তেরোটি কবিতা আছে। প্রতিটি কবিতার নীচে রচনার স্থান, তারিখ এবং সময় দেয়া আছে। অনেকগুলোর সঙ্গে বিস্তৃত ফুটনোট।’ সেই সব ফুটনোটে কোথাও লেখা আছে বড় শ্যালকের বাড়িতে খরস্রোতা নদী দেখে কবিতাটি মনে মনে রচিত, কোথাও বাসর রাতে লেখা কবিতার কথা আছে। লেখক এই কাব্যগ্রন্থ পড়ার অভিজ্ঞতা এভাবে বর্ণনা করছেন, ‘কবি কত বিচিত্র বিষয় নিয়ে কত আজেবাজে জিনিসই না লিখেছেন। ইরানের শাহকে নিয়ে পর্যন্ত একটা কবিতা আছে। কী আছে এই স্বৈরাচারী রাজার মধ্যে যে তাকে নিয়ে পর্যন্ত একটা কবিতা লিখতে হলো? তিনটি কবিতা আছে মহাসাগর নিয়ে। কিন্তু কবি সাগর-মহাসাগর কিছুই দেখেননি।’ পুরো কবিতার বইটি নিয়েই লেখক হাল্কা চালে কথা বলেছেন এবং এর কাব্য সৌন্দর্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু শেষ কবিতাটির কথা দিয়ে লেখক গল্পটি শেষ করেছেন এভাবে ‘‘শেষ কবিতাটির নাম ‘মাগো’। কবিতাটি নুরুন্নাহার খানমকে নিয়ে লেখা। ফুটনোট থেকে জানতে পারি, মৃত্যুর আগের রাতে সে যখন রোগ যন্ত্রণায় ছটফট করছিলো তখন তার অসহায় বাবা এই কবিতাটি লিখে এনেছিলেন মেয়েকে কিঞ্চিৎ ‘উপশম’ দেবার জন্যে। কবিতাটি ক্ষুদ্র এবং রচনাভঙ্গি অন্য কবিতার মতোই কাঁচা। কিন্তু প্রতিটি শব্দ চোখের গহীন জলে লেখা বলেই বোধ করি কবিতাটি দুঃখী বাবার মতোই হাহাকার করে ওঠে। সেই হাহাকার বিশ্বব্রহ্মা- ছাড়িয়ে চলে যায় অদেখা সব ভূবনের দিকে। একটিমাত্র কবিতা লিখেও কেউ-কেউ কবি হতে পারেন। অল্প কিছু পঙ্ক্তিমালাতেও ধরা দিতে পারে কোনো এক মহান বোধ, মহান আনন্দ, জগতের গভীরতম ক্রন্দন। সেই অর্থে আমাদের ‘রিক্তশ্রী’র কবি একজন কবি।’’

যে মহান বোধ, যে মহান আনন্দ ও জগতের গভীরতম যে ক্রন্দনের কারণে রিক্তশ্রী’র কবি একজন কবি হয়ে ওঠেন সে বোধ, সে আনন্দ ও বেদনা কন্যা হারানো এক পিতার হৃদয় নিঃসৃত। পিতৃস্নেহের এমন সরল প্রকাশ বিশ্ব সাহিত্যে যথার্থই দূর্লভ বিবেচনা করি। 

‘কবি’ গল্পেও একজন আত্মভোলা কবি জোবেদ আলীর কথা জানা যায়, যার কন্যা জ্বরাক্রান্ত। জোবেদ আলী একটা প্রেসে প্রুফ রিডারের কাজ করে। সারারাত কাজ করে বাসায় ফিরে দেখে কন্যার জ্বর কমে গেছে, কিন্তু কন্যার আব্দারের সামান্য সাগর কলাটি সে আনতে পারেনি। কিন্ত সে নিয়ে তার কোন আক্ষেপ নেই, বরং ঝড়-বৃষ্টির রাতে আত্মভোলা কবি খাতা কলম নিয়ে কবিতা লিখতে বসে যান। এদিকে মেয়ের জ্বর বাড়ে, অসুস্থ মেয়ে’র ‘বাবা’ ডাক তার কানে পৌঁছয় না। মেয়েটি দেখে তার কবি বাবার চোখ দিয়ে আবেগে পানি পড়ছে। কিন্তু কবির এই আবেগকে সে বোঝে না। ‘শিশুরা অনেক কিছুই বুঝতে পারে, আবার অনেক কিছুই বুঝতে পারে না।’ এই একটি বাক্য দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ তার গল্প শেষ করেন। কিন্তু পাঠকের বোধের আরেকটি নতুন দিগন্ত খুলে যায়, এ গল্পে। আবেগাপ্লুত কবি পিতার প্রতি অসুস্থ কন্যার দরদী ডাক না-পৌঁছালেও পাঠকের হৃদয়ে তা পৌঁছে যায়। 

‘সুলেখার বাবা’, ‘সৌরভ’ ‘অঙ্ক শ্লোক’, ‘আনন্দ-বেদনার কাব্য’- সবগুলো গল্পের কেন্দ্র জুড়ে রয়েছে পিতা ও কন্যার মধূর সম্পর্ক। গল্পকারের অন্তর নিঙড়ানো পিতৃস্নেহের পরিচয় এই গল্পগুলোর পরতে পরতে বিদ্যমান। 

‘বুড়ি’ গল্পেও বাৎসল্য রসের প্রকাশ দেখি, অবশ্য ভিন্নতর প্রেক্ষিত ও পটভূমিতে। আমেরিকার নিঃসঙ্গ এক বৃদ্ধা এলিজাবেথ গ্যারাজ সেল থেকে ব্যাগ পাইপ কিনে নিয়ে আসে এবং মাঝরাতে তা বাজাতে থাকে। তার সঙ্গী বোর্ডাররা এতে মহা বিরক্ত। কিন্তু এলিজাবেথ নির্বিকার। এলিজাবেথ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলে সবাই তাকে কার্ড নিয়ে দেখতে যায়। বুড়ি তখন লেখকের কাছে স্বীকারোক্তি দেয়, ‘ব্যাগ পাইপ কেন বাজাতাম জান? একা একা থাকতে এতো খারাপ লাগত! কুৎসিত বাজনাটা বাজালেই তোমরা কেউ না কেউ আসতে খানিকক্ষণ কথা বলতে পারতাম। স্যরি! তোমাদের কষ্ট দিয়েছি।’’ এই একটি স্বীকারোক্তির মাধ্যমে পুরো মার্কিন সমাজে বৃদ্ধদের নিঃসঙ্গতা, অসহায়ত্ব এবং তাদের অন্তরে লুকানো ভালবাসার পিপাসা বড় জ্বলন্ত আর প্রকট হয়ে প্রকাশিত হয়। আর সম্পূর্ণ ভিন্ন দেশের প্রেক্ষাপটে লেখক এলিজাবেথকে আমাদের চেনা মাতৃস্নেহের আদলে গড়ে তোলেন। সুদূর আমেরিকার এক বৃদ্ধা যেন বাংলাদেশের শ্বাশত জননী হয়ে ওঠেন।

এইসব স্নেহধারা আর করুণা ও মায়ার আবরণে হুমায়ূন আহমেদ তার গল্পে মানবিকতার এক ভিন্ন জগত তুলে ধরেন। ‘‘ছোটগল্পের স্বল্প পরিসরে তিনি আলো ফেলেছেন জগত ও জীবনের এদিক ওদিক। আর প্রতিটি আলোকপাতেই উঠে এসেছে এই জীবনের, তা সে যত নিরানন্দই হোক, অনিন্দ সৌন্দর্য কিংবা শ্বাশত সত্যের ছবি।’’

‘গোপন কথা’ গল্পটি বেদনা বিধূর প্রেমের গল্প হলেও এর আড়ালেও রয়েছে মানুষের মহত্ব ও ভালবাসার ক্ষমতার প্রকাশ। খুব সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেলো মঞ্জুর। তখন চারদিকে আলো আঁধারের এক অদ্ভুত পরিবেশ। সে মুগ্ধচিত্তে ভাবছে, আজ কিছুতেই মন খারাপ করবে না, রাগ করবে না। ঠিক তখনি দেখা গেলো পাশের চৌকিটাতে বাকের সাহেব কুৎসিত ভঙ্গিতে শুয়ে আছেন। মশারির মধ্যেই তিনি নাক ঝারলেন। মঞ্জু তাকে বললো, আজ এই এগারোই বৈশাখ তাঁর জন্মদিন। বাকের সাহেব বললেন, ‘আম কাঁঠালের সিজনে জন্মেছেন।’ জন্মদিনের সকালটা একটা শুভেচ্ছা দিয়ে শুরুকরতে পারলো না মঞ্জু। তবু এই সুন্দর সকালটি বিফল হতে দেবে না মঞ্জু। সে ভাবলো, আজ সন্ধেবেলা নীলুর বাসায় যাবে, বহুদিনের জমানো গোপন কথাটি আজ বলবে। আর ঠিক তখনি বাকের সাহেব বাথরুম থেকে ফিরে এসে বললে, ‘পায়খানা কষা হয়ে গেছে ভাই।’ জন্মদিনের চমৎকার সকালটি যেন ক্রমাগত অসুন্দরে ভরে যেতে থাকলো। তবু মঞ্জু না-খোশ হয় না। কেননা, তখন আকাশে হালকা নীলের ছোপ ধরেছে। পাখিরা কলরব করছে। কথক মঞ্জু ভাবলো,- ‘গোপন কথা বলার জন্যে এরচে, সুন্দর দিন আর হবে না।’ সে ছুটে গেলো নীলুদের বাড়িতে। কিন্তু নীলুর তার দিকে মনই নেই। সে ব্যস্ত ভুতের গল্প শুনতে। নীলুর ছোটবোন বিলুর মাষ্টার দু’বোনকে ভুতের গল্প শোনাচ্ছেন। সেই ভূতের গল্পতেই মশগুল নীলু। মঞ্জু বারবার চেষ্টা করেও নীলুর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলো না। মনমরা হয়ে সে ঘরে ফিরে এলো। গোপন কথাটি গোপনই রয়ে গেলো। কিন্তু ঘরে ফিরেও কী শান্তি আছে! সে ঘরে ফিরে দেখে অন্ধকারে বাকের সাহেব শুয়ে আছে। তাকে ঢুকতে দেখেই ক্লান্ত স্বরে বললো, শরীরটা খারাপ করছে ভাই। বমি হয়েছে কয়েকবার। একটু সাবধানে আসেন, পরিস্কার করা হয় নাই।’’ মঞ্জু অনেক রাত পর্যন্ত নোংরা পরিস্কার করলো। অনেক রাতে শুতে গেলে জানতে পারে দরিদ্র বাকের সাহেব এই অসুস্থতার মধ্যেও তার জন্মদিনের উপহার হিসাবে এক প্যাকেট সিগারেট উপহার হিসেবে এনে রেখেছে। নীলুকে না-বলা প্রেমের বেদনা মুহূর্তে বাকের সাহেব আর মঞ্জুর সম্পর্কের উজ্জ্বলতায় হারিয়ে যায়। মঞ্জু তাই বাকের সাহেবকে প্রশ্ন করে, একটা গোপন কথা শুনবেন ভাই?। ‘বাকের সাহেব বিছানায় উঠে বসলেন। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। আজ বোধহয় পৃথিবী ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। যে গোপন কথাটি বলা হয়নি সেটি আমি বলতে শুরুকরলাম। আমার ভালোই লাগল।’’ এবং শেষ পর্যন্ত এই ভাল লাগার বোধ পাঠকের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। মঞ্জু’র অব্যক্ত প্রেমের গোপন কথাটির সঙ্গী হয়ে উঠেন পাঠক। আর সাধারণ একটি প্রেমের গল্পকে মানবিক সম্পর্কের উচ্চতায় নিয়ে যান হুমায়ূন অনায়াসেই। গোপন কথাটি আর গোপন থাকে না। মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা কোন না কোনভাবে ছড়িয়ে পড়ে। 

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হুমায়ূন আহমেদের একটি ভিন্নতর গল্প ‘শীত’। উল্লেখ্য, শীতকে উপজীব্য করে বিশ্ব সাহিত্যে একাধিক মানবিক গল্প রচিত হয়েছে। টলস্টয়ের ‘হোয়াট ম্যান লিভ বাই’ গল্পে কিংবা চার্লস ডিকেন্সের ‘আ ক্রিসমাস ক্যারল’ উপন্যাসে শীত এসেছে প্রতীকিভাবে। হুমায়ূনের গল্পেও শীত এসেছে দারিদ্র্য, গ্লানি আর বেদনার নগ্ন প্রকাশ নিয়ে। গল্পের অসহায় বৃদ্ধ মতি মিয়া শীতের কষ্ট সইতে পারে না। তাই সোহাগীর সি.ও রেভিন্যু রশীদ সাহেবের কাছে শহীদ পুত্রের দোহাই দিয়ে কম্বল আনতে যায়। পুত্র হারানো মতি মিয়ার শহীদের জনক হিসাবে গর্ব করে আবার শহীদ পুত্রের নাম ভাঙিয়ে শীতের প্রকোপ কাটাতে কম্বল ভিক্ষা করে আনে। শীত তো কেবল একটু অজুহাত আসলে মতি মিয়ার এই পরাজয় রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থার কাছে। শহীদ সন্তানের পিতা ভিক্ষা কম্বলের ওমে উষ্ণ হয় আর নাতী ফরিদকেও কম্বলের নিচে ডেকে নেয়। কিন্তু শহীদ মেছের আলীর বিধবা স্ত্রী এ লজ্জা, গ্লানির অন্তঃদহনে দগ্ধ হয়। 

মানুষ চায়, চিরকালই তার ভাবনা, বোধ, অভিজ্ঞতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়–ক। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ‘জনক’ গল্পে হুমায়ূন মানব ইতিহাস, ঐতিহ্য বিস্তারের কাহিনী তুলে ধরেছেন ঘরোয়া ভঙ্গিতেই। মুক্তিযোদ্ধা মতি প াশ বছর বয়সে এসে পুত্রের জনক হয়েছে। সন্তান জন্মদানের ধকলে স্ত্রী জয়গুন কাতর, মরার মত ঘুমায়। রাতে পুত্র মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেনের ঘুম ভেঙে গেলে সে-ই ভেজা কাথা পাল্টে দেয়। পুত্রের সাথে ইংরেজিতে কথা বলে, ‘কি রে ব্যাটা কান্দ কেন? নটি বয়। ভেরী নটি বয়?’ ‘ঠোঁট বাঁকা কেন ব্যাটা? ক্ষুধা লাগছে? হাঙ্গার?’ যুদ্ধের সময় সে কিছু ইংরেজি শিখেছিলো। ছেলেকে এই সব ইংরেজি শোনায়। ঘুম থেকে উঠিয়ে বউ জয়গুনকে মুরাদ খালির যুদ্ধে সে কীভাবে এসেছে রাত জেগে জেগে তা শোনাতে চায়। সে চায়, তার মৃত্যুর পর এই সব গল্প যেন ছেলেকে তার মা বলতে পারে। ছেলে স্বাধীন দেশে জন্মেছে এই জন্য মতি খুব গর্ব বোধ করে। ক্লান্ত জয়গুন ঘুমিয়ে পড়লেও দুধের শিশুকে কোলে নিয়ে মতি যুদ্ধের নানা অপারেশনের গল্প শোনায়। ‘গল্প বলতে বলতে মতি মিয়ার চোখ জলে ভর্তি হয়ে আসে। চোখ ভর্তি অশ্রুর কারণেই বোধহয় শিশু পুত্রটিকে তার অন্যরকম মনে হয়। তার বড় মায়া লাগে। মতি মিয়ার শিশুপুত্র চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। মনে হয় বাবার গল্পটা সে বুঝতে পারছে।’’ এ যেন গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হস্তান্তরের এক ব্যক্তিগত দলিল। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ছেলের অন্তরে গেঁথে দিতে চায় মতি। তাই ছেলের নামও রেখেছে শহীদ সহযোদ্ধার নামে। মানুষ এইভাবেই তার প্রজন্মকে, তথা সমগ্র মানব জাতিকে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ধরিয়ে দেয়। 

হুমায়ূন আহমেদের রহস্য ও অতিপ্রাকৃত গল্পগুলো অ্যালান পো’র রহস্য জগতের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে অ্যালান পো’র মতো তার জগত রহস্যময় হলেও অন্ধকার আর বিকৃত নয়। তাই কবর থেকে জেগে ওঠা কিশোরের গল্প ‘ছায়াসঙ্গী’-তেও আমরা মানবিকতা দেখি। শীতে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গেলে লেখকের সঙ্গে পরিচয় হয় মন্তাজ মিয়ার। সে ছোটখাট চুরি করে। লেখকের একটি কলম চুরি করলে তাকে প্রচন্ড মার দেয়া হয়, কিন্তু লেখক বলেন,এই কলমটি তিনিই তাকে দিয়েছেন। এতে মন্তাজ মিয়া বিস্মিত হয়। এই মন্তাজ মিয়ার সঙ্গে লেখকের সুসম্পর্ক হয়। কিন্তু সে যখন বুঝতে পারে, মন্তাজ তাকে কবরে থাকার অভিজ্ঞতা, সেখান থেকে বেঁচে আসার অদ্ভূত রহস্য প্রকাশ করবে না তখন জোর করে না। বরং এই শিশুটির প্রতি এক মানবিক মায়া বোধ করে। হুমায়ূন আহমেদের অদ্ভূত রসের গল্পের জগতে প্রাণীদের একটা বিশেষ ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। ‘কুকুর’ গল্পে একজন আলীমুজ্জামানের কথা জানতে পারি। যৌবনে তিনি একটি কুকুর ছানাকে বাঁচাতে চেষ্টা করেছিলেন। একদল পথ শিশু কুকুর ছানাটির গলায় ঘুংঘুর বেঁধে, গায়ে কেরোসিন ঢেলে সেটিকে আগুনে ফেলে দেয়, কুকুরটি পুড়বে, ঘন্টি বাজবে, খুব আনন্দ হবে। কুকুরটির গায়ে আগুন দেয়ার পর আলীমুজ্জামান ছুটে যান। কুকুরটিকে বাঁচাতে পারেননি, নিজেও ভয়াবহ আহত হন। গল্পের রহসম্যয় দিকটি শুরুহয় এর পর থেকেই। মাঝে মাঝেই রাত বিরাতে শওকত সাহেবের বাসার সামনে অসংখ্য কুকুর দেখা যায়। তার বোন মজা করে বলে, তিনি কুকুরকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন বলে কুকুররা কৃতজ্ঞতা জানাতে আসে, কুকুরদের রাজা সে। কিন্তু বিস্ময়কর হলো এই সব কুকুরের মধ্যে আগুনে পোড়া প্রায় কয়লা হয়ে যাওয়া কুকুরটিও থাকে। অবশ্য সে কুকুরটিকে শওকত সাহেব ছাড়া আর কেউ দেখতে পায় না। এই গল্পের মধ্যে শিশুদের অযৌক্তিক নিষ্ঠুরতা যেমন মানব চরিত্রের একটি দিক তুলে ধরে অন্যদিকে শওকত সাহেবের মহত্বও প্রকাশিত হয়। 

১৯৭৩ সালে বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা’ হুমায়ূন আহমেদ রচিত প্রথম সায়েন্স ফিকশনই শুধু নয়, এটি বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রথম সায়েন্স ফিকশন। বাংলা সাহিত্যের ম্রিয়মান এই ধারাটিতে তিনি নতুন প্রাণ দিয়েছেন। শীত ও অন্যান্য গল্প গ্রন্থে সংকলিত ‘যন্ত্র’ গল্পটি তার প্রথম সায়েন্স ফিকশন। আজকের বাংলাদেশে প্রকাশক ও পাঠকের কাছে সায়েন্স ফিকশন একটি স্বীকৃত ঘরাণা। বলা যায়, হুমায়ূন একক চেষ্টাতেই এটি শুরু করেছিলেন। কথা  সাহিত্যিক আহমাদ মোস্তফা কামাল তার এই রচনাগুলো সম্পর্কে বলেন, ‘তিনি যখন সায়েন্স ফিকশন লিখেছেন সেগুলোকে নিয়ে গেছেন এক ভিন্ন উচ্চতায়। সেগুলো শুধু বিজ্ঞান বা ফিকশন থাকেনি, তাঁর হাতের ছোঁয়ায় হয়ে উঠেছে মূল্যবান মানবিক দলিল। তাঁর রচিত সায়েন্স ফিকশন এই একটি জায়গায় পৃথিবীর অন্য সব সায়েন্স ফিকশন থেকে আলাদা।’

‘যন্ত্র’ গল্পটিতে দেখা যায়, মানুষ অমরত্বে পর্যায়ে চলে গেছে। পৃথিবীতে এখন জনসংখ্যা ভয়াবহভাবে নিবারণ করা হচ্ছে। মানুষের কোন কাজ নেই, সব কাজ রোবট করে। এক বৃদ্ধ ব্যক্তি তার সি ত সব টাকা দিয়ে একটি যন্ত্র কিনে আনেন। পি থার্টি টু নামের এই যন্ত্র প্রতিদিন এক ঘণ্টার বেশি ব্যবহার করে যন্ত্র কেনার কথা জানালে স্ত্রী তাকে শুভেচ্ছা জানায়। বলে, ‘আচ্ছা, তোমার যন্ত্র তোমার জীবনকে আনন্দময় করে তুলুক। আমাদের মতো দম্পতিদের যন্ত্রের আনন্দের প্রয়োজন আছে।’ লেখক জানাচ্ছেন, ‘তাদের মতো দম্পতি পৃথিবীতে অসংখ্য আছে যাঁরা সন্তান জন্মাবার অধিকার পাননি। মানজাতির স্বার্থে তা করা হচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে পৃথিবীর জনসংখ্যা কমিয়ে আনার একটি শর্তই হচ্ছে একদল সন্তানহীন দম্পতি।’ ভদ্রলোক তার সাতানব্বুই তলার সাজানো ফ্লাটে পি থার্টি টু যন্ত্রটি চালু করেন। ‘পি থার্টি টু যন্ত্রটি বেশ কিছু শ্বাপদ জন্তুর মস্তিষ্কের স্মৃতি ধরে রেখেছে। এই স্মৃতি বায়ো কারেন্টের মাধ্যমে মানুষের মাথায় সঞ্চারিত হয়।’’ গল্পের শেষে লেখক জানাচ্ছেন, ‘‘অমর মানুষেরা এখন দিনরাত ঘরেই বসে থাকে। তাদের কাজ করার প্রয়োজন নেই। কাজের জন্যে আছে রোবট শ্রেণী। চিন্তাভাবনারও কিছু নেই। অমরত্বের বেশি আর কিছু তো মানুষের চাইবারও নেই। এখনকার মানুষ দিনের পর দিন একই জায়গায় একই ভঙ্গিতে বসে থাকে। পি থার্টি টু যন্ত্র লাগিয়ে পশুদের জীবনের অংশ বিশেষ যাপন করতে তাঁদের বড় ভালো লাগে। এই তাঁদের একমাত্র আনন্দ।’’ মানুষের জীবন থেকে আশা-আকাঙ্খা, চাওয়া-পাওয়া, আনন্দ-বেদনা এই সব মানবিক বোধ হারিয়ে গেলে মানুষ যে পশু হয়ে উঠবে, যন্ত্রই হয়ে উঠবে মানুষের পাশবিক আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু এই গল্প তাই প্রকাশ করে। 

অঁহক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে হুমায়ূন বিজ্ঞানের বহু তথ্য আর কল্পনার অবাধ সম্মিলন ঘটিয়েছেন। কিন্তু সাধারণ বৈজ্ঞানিক কাহিনী থেকে এটি আলাদা হয়ে ওঠে অঁহকদের আলোচনায়। তারা মানুষ সম্পর্কে বলে, ‘‘এরা অতি নিম্নশ্রেণির বুদ্ধিহীন প্রাণীদের মতোই খাদ্য থেকে শক্তি সংগ্রহ করে। কাজেই তারা চিন্তা বা শিক্ষার সময় পায় না। তারা তাদের সময়ের একটি বড় অংশ ব্যয় করে খাদ্য সংগ্রহ, খাদ্য পরিপাক ও খাদ্য বর্জনে।’

‘ভাল বলেছ, এদের আর কী ত্রুটি আছে?’

‘এদের সভ্যতা যন্ত্রনির্ভর সভ্যতা। এরা আমাদের মতো যন্ত্রমুক্ত না। মহান শিক্ষক আপনি বলেছেন যন্ত্রনির্ভর সভ্যতাই নিম্ন সভ্যতা। এই সত্যটি সব সময় মনে রাখবে।’’

এই কয়েকটি মন্তব্যে মানব সভ্যতার বিকাশের দূর্বলতা যেমন প্রকাশিত হয়ে পড়ে তেমনি উন্নত প্রাণী হিসাবে আমাদের আত্মশ্লাঘাতেও ঘা লাগে। গল্পকার এখানেই অন্য দশজন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীকারদের থেকে ভিন্ন, স্বকীয়।

সরসতা হুমায়ূন সমগ্র লেখনী একটি বড় বৈশিষ্ট্য। হাস্যরস, কৌতুক তার বহু গল্পের পরতে বিদ্যমান। ‘‘তার গল্পের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হাস্যরস ও ব্যঙ্গরূপ। খুব কঠিন কথাও হাস্যরস ও ব্যঙ্গরূপের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।’’ তবে সরাসরি তিনি শ্লেষ, কৌতুক, প্রহসনের আঙ্গিকও ব্যবহার করেছেন দুয়েকটি গল্পে। এ প্রসঙ্গে ‘মন্ত্রীর হেলিকপ্টার’ ও ‘ফজলুল করিম সাহেবের ত্রাণকার্য’ গল্পদুটি উল্লেখযোগ্য।

‘‘মন্ত্রীর হেলিকপ্টার’ গল্পের ফর্মটি স্যাটায়ারিক। রাষ্ট্রিয় ক্ষমতায় অধিষ্ট হয়ে একজন মন্ত্রীর আত্মম্ভরিতা এবং নিজের গ্রামের মানুষের সামনে তার ঐশ্বর্য এবং ক্ষমতা প্রদর্শনের অভিলাস ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয়েছে। শুধু চটুল জনপ্রিয়তার লোভে মন্ত্রী হেলিকপ্টারের একজন অসুস্থ রোগীকে নিয়ে যাওয়া চিকিৎসার জন্য, পথিমধ্যে তার অবস্থার আরও অবনতি, পুনরায় তাকে নিয়ে গ্রামে প্রত্যাবর্তন। কিছু সময় পর রোগীটির মৃত্যু এবং জানাযায় অংশ নিয়ে মন্ত্রীর রাজধানী যাত্রার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রনেতাদের ভাড়ামি, শঠতা ও অমানবিকতাকে তীব্রভাবে বিদ্রুপ করা হয়েছে।’’ ক্ষমতার লোভ, প্রচারমুখিতা আর রাজনীতির কূটিলতায় মানবিক মূল্যবোধ কীভাবে ভুলুন্ঠিত হয় এ গল্প তার নজির হয়ে থাকবে। ‘‘মন্ত্রীর হেলিকপ্টার’ রাজনৈতিক দূরদর্শিতার আড়ালে সাধারণ মানুষের দূর্ভোগের গল্প। যাদের ভোটে মন্ত্রীরা ক্ষমতার শিখরে ওঠেন, সময়ে তাদেরকে মনে বোঝা, রাজনীতিবীদরা বক্তৃতার তোড়ে শ্রোতার মন ভোলান, কিন্তু তাদের দুঃখ কষ্ট শোনার সময় তাদের কখনোই হয় না।’’ পলিটিক্যাল স্যাটায়ার হিসাবে বাংলা সাহিত্যে শুধু নয় বিশ্ব সাহিত্যে এটি একটি উজ্জ্বল সংযোজন।

হুমায়ূনের ‘ফজলুল করিম সাহেবের ত্রাণকার্য’ গল্পটি কোথায় যেন আবুল মনসুর আহমেদের ‘রিলিফওয়ার্ক’ গল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়। দুটি গল্পেই বিদ্যমান তীব্র শ্লেষ হয়তো এর অন্যতম কারণ। বন্যা কবলিত স্থানে প্রতিমন্ত্রী ফজলুল করিম সাহেব ত্রাণ দিতে যাবেন। কিন্তু দুপুর বারোটা পর্যন্ত সারেং-এর খোঁজ পাওয়া গেলো না। একটা দশ মিনিটে ল  ছাড়া হলো। বায়ান্নটা তাবু, এক হাজার কৌটা কনসানট্রেটেড টমেটো জুস যা ইতোমধ্যে গুদামে থেকে পচে গেছে, পাঁচশ বোতল ডিস্টিল ওয়াটার, মেডিক্যাল সাপ্লাই, রান্না করা খিচুরি, প্রায় পাঁচ হাজার টাকা, লুঙ্গি, গামছা, শাড়ি ইত্যদি নিয়ে তিনি একটু গভীরের দিকে যেতে চান। কারণ সবাই কাছাকাছি জায়গা থেকে ত্রাণ দিয়ে ফিরে যায়, তিনি এইজন্য দূরে যেতে চান, যারা ত্রাণ পায়নি এখনও তাদের কাছে পৌঁছতে চান। কিন্তু দীর্ঘ যাত্রার পর তারা কোন শুনকো জায়গা খুঁজে পেলো না। ইতোমধ্যেই সকাল সাতটায় রান্না করা খিচুরি টক হয়ে গেছে। ফজলুল করিম সাহেব নোনতা বিসকিট আর চা দিয়ে লা  সারলেন। বিকেল হয়ে গেছে। টক খিচুরি নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। সাহায্য করার মতো কাউকে পাওয়া যায়নি। রাতে ডাকাতির ভয় আছে, অতএব ল  ঘুরাতে বলা হলো। ফজলুল করিম সাহেবের পিএস হামিদ জানালো, সারেং-এর খরচ, লে র তেলের খরচ, ভিডিও ম্যান ভাড়া করা, চা, বিস্কিট, কলা ইত্যাদি বাবদ চার হাজার সাতান্ন টাকা খরচ হয়ে গেছে, সাহায্য দেয়ার জন্য আছে সাতাশি টাকা তেপ্পান্ন পয়সা। ফেরার সময় কলার ভেলায় ভাসা একটা পরিবার পাওয়া গেলো। তাদেরকে সাতাশি টাকা তেপ্পান্ন পয়সার পুরোটা দেয়া হলো, একটা করে শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা দেয়া হলো। তাবু দিতে চাইলে তারা নিলো না, কারণ তাবুর ভারে তাদের ভেলা ডুবে যাবে। এরা ভেলা থেকে লে  উঠে এলো, একটি বাচ্চা মেয়ে বমি করতে লাগল। ফজলুল করিম সাহেব কলেরার ভয়ে ক্যাবিনে গিয়ে দরজা দিলেন। তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। পরদিন পত্রিকায় ছাপা হলো ‘অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থায় জনশক্তি দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী জনাব ফজলুল করিম একটি ত্রাণদল পরিচালনা করে বন্যা মোকাবিলায় বর্তমান সরকারের অঙ্গীকারকেই স্পষ্ট করে তুলেন। দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পুরো চব্বিশ ঘণ্টা অমানুষিক পরিশ্রম করে তিনি নিজেই অসুস্থ হয়ে বর্তমানে মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসাধীন। জনশক্তি মন্ত্রী জনাব এখলাস উদ্দিন হাসপাতালাতে তাঁকে মাল্যভূষিত করে বলেন – বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের ফজলুল করিম সাহেবের মতো মানুষ দরকার। পরের জন্যে যাঁরা নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পিছপা হন না। এই প্রসঙ্গে তিনি রবি ঠাকুরের একটি কবিতার চরণও আবেগজড়িত কণ্ঠে আবৃত্তি করেন ‘কেবা আগে প্রাণ করিবেক দান, তার লাগি কাড়াকাড়ি।’’ আমাদের দেশের ত্রাণ তৎপরতা, সরকারী আমলা, মন্ত্রীদের ভ-ামিকে তীক্ষ্ণ পরিহাসে তুলে ধরেছেন হুমায়ূন। 

মধ্যবিত্ত জীবন নিয়েও তার রয়েছে কিছু চমৎকার গল্প। সত্যি কথা বলতে কি, হুমায়ূনের লেখায়ই আমরা প্রথমবারের মতো মধ্যবিত্ত জীবনের মানবিক সমস্যা-সংকট-আনন্দ-বেদনা-হাসি-কান্না’র রূপায়ন দেখতে পাই। ‘‘বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের স্পর্শকাতর বিন্দুগুলো হুমায়ূনের মতো এত ভালো করে আর কেউ চেনেননি।  এইখানটায় আমি শরৎচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর মিল খুঁজে পাই। শরৎচন্দ্র যেমন বাঙালি জাতি আবেগপ্রধান স্পর্শকাতর বিন্দুগুলোকে চিনতেন, হুমায়ূন আহমেদ অতোখানি না হলেও বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের হাসি-কান্নার বিন্দুগুলো চেনেন এবং অনায়াসসাধ্য দক্ষতায় তিনি তাঁর পাঠক-দর্শকদের হাঁসিয়ে-কাঁদিয়ে চলেছেন।’’

‘‘নিশিকাব্যে’ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের এক সরল দলিল। আপাত নিরাভরণ এই গল্পের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ মধ্যবিত্ত জীবনের মানবিক আশা-আকাঙ্খা-স্বপ্নকে গেঁথে দিয়েছেন একটি রাতের ঘটনা দিয়ে। শ্বশুর-শাশুড়ী, ননদ-ভাশুর-দেবর পরিবেষ্টিত পরী তার শিশু মেয়েকে নিয়ে নিম্ন মধ্যবিত্তের এই সংসারে বাস করে। গরীব স্বামী আনিস শহরে একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকরি করে। কোম্পানীর প্রতিনিধি হয়ে তাকে কখনো কখনো ট্যুরে যেতে হয়। এবার ট্যুরের কাজটা তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ায় সে এক রাত্রির সময় হাতে নিয়ে স্ত্রী-পরিজনের সাথে মিলিত হতে গ্রামে বাড়িতে আসে। সবাই তাকে পেয়ে খুব খুশি। সুখের কী দুঃখের যে কোনো ঘটনাই ঘটুক না কেন, আনিসের মায়ের স্বভাব কিছুক্ষন কাঁদা। পুত্রের আগমনে আতএব তিনি কাঁদতে শুরুকরেন। শেষ পর্যন্ত আনিসের ধমক খেয়ে তিনি স্বাভাবিক হন। তারপর পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মতো ছেলের কুশলাদি নেন। ছোট বোন রুনুর বিয়ের সম্বন্ধ  এসেছে। খবরটা আনিসকে দেওয়া হলো। আনিস বললো, রুনুর পছন্দ হলে তার কোনো আপত্তি নেই। খাওয়া দাওয়ার পর সবাই গোল হয়ে বসে কিছুক্ষণ গল্পস্বল্প করে। তারপর যে যার ঘরে চলে যায়। খুব সকালে আনিসের ট্রেন ধরতে হবে। ঘরে গিয়ে আনিস ঘুমন্ত মেয়েকে চুমু দেয়। আনিস পরীর জন্য একটি শাড়ি এনেছে। কিন্তু শাড়িটা পরী ননদের জন্যে রেখে দেয়। তারপর তার বিয়ের লাল রঙের শাড়িটা পরে স্বামীর মনের সাধ পূরণ করে। সকালবেলা আনিসের যাবার ক্ষণে রুনু মাকে জিজ্ঞেস করে, ভাবী আজ বিয়ের শাড়ি পরেছে কেন। এই অহেতেুক শাড়ি পরার মধ্যে হয়তো কোনো লজ্জা লুকিয়ে আছে। তাই,- 

“কেউ তার কথার কোন জবাব দিল না। মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী আকাশের চাঁদ, পরীকে অহেতুক লজ্জা থেকে বাঁচানোর জন্যই হয়তো একখন্ড বিশাল মেঘের আড়ালে তার সকল জোৎস্না লুকিয়ে ফেললো”

এই শেষ অংশে মানুষের জীবনের একটি অর্থ খোঁজার প্রয়াস লক্ষ্য করি। হুমায়ূন আহমেদ অত্যন্ত সহজভাবে চলমান জীবনের অনেক অসঙ্গতির মধ্যেও একটি সঙ্গতি যোজনা করে জীবনের প্রতি পাঠকের সহানুভূতি ও মমতা আকর্ষণের প্রয়াস পান।’’

এই গল্পে হুমায়ূন আহমেদকে আমরা চেকভের রূপে দেখি। ‘জীবনের ছোটখাট জিনিসের শোচনীয় রূপটিকে চেখভের মত এত স্পষ্ট করে সহজাতভাবে আর কেউ কোনদিন বুঝতে পারেনি, মধ্যবিত্ত জীবনের বিশৃঙ্খল মলিনতার মধ্যে যা কিছু লজ্জাকর শোকাবহ তার এমন নিষ্ঠুর বিশ্বস্ত ছবি তার আগে অন্য কোন লেখক মানুষের সামনে তুলে ধরেনি।’

হুমায়ূন আহমেদ তার গল্পে নিটোল কিছু চিত্র এঁকেছেন।‘‘গল্পকে তিনি তত্ত্বভারাক্রান্ত করেন না। কোন বিশেষ জীবন দর্শনের দ্বারাও তিনি তার আচ্ছাদন তৈরি করেন না। ফলে আদ্যন্ত গল্পটিতে নিটোল ছন্দের খেলা কথকতার এক অন্তরঙ্গ সুর।’’ চ ল কুমার বোসের বলেছেন, ‘‘এ কারণে তার গল্পের প্রকরণ জটিলতা বর্জিত। কিন্তু সরল প্রকরণে বর্ণিত তার গল্পগুলোতে জীবন কখনোই লঘু বা তরল নয়, বরং সে জীবন বহুমাত্রায় উন্নীত, এক ব্যঞ্জনাময় গভীর জীবন সত্যের ইঙ্গিতবাহী, ছোটগল্পকার হিসাবে এখানেই তার বিশেষত্ব।’’

পারিবারিক খুনসুটি ও সামাজিক স্তর বিন্যাস এবং মানুষের অসহায়ত্ব, মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা, ঘৃণা, অনুরাগের মিথস্ক্রিয়ায় লিখেছেন ‘জীবনযাপন’’। এ গল্পে অসম বয়সী দম্পতির আর অসহায় স্ত্রীর ছোটভাইয়ের জীবন যাপন চিত্রায়িত। বোনের সংসার টেকানো, আর নিজের একটুখানি আশ্রয়ের জন্য দুলাভাইয়ের যে কোন ধরণের নিপীড়ন মুখ বুজে সহ্য করে কথক। তাই গভীর রাতে বৃষ্টির মধ্যে দুলাভাইয়ের জন্য সিগারেট এনে যখন কথক বোন বিন্দুর সামনে দাঁড়ায়, বিনু জানতে চায়, ‘সিগারেট ভিজে যায়নি!’ তখন অসহায় কথককে গাঢ় স্বরে বলতে শুনি, ‘আমি ভিজেছি, সিগারেট ভিজেনি।’’

এমনি সরলতায় গুরুত্ব জীবন দর্শন তিনি তুলে ধরেন অবলীলায়। মানুষেক্ষ সূক্ষ্মতম অনুভূতি, মহত্ব ও অসহায়ত্ব তার লেখায় একান্তই অন্তরঙ্গভাবে উঠে এসেছে। 

হামীম কামরুল হক যথার্থই আমাদের মনে করিয়ে দেন, ‘‘বোধ করি অনেকেই আমার সঙ্গে একমত হবেন যে তাঁর ছোটগল্পই হল সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সেরা কীর্তি। সেলিম আল দীনকে প্রশ্ন করেছিলাম, শরৎচন্দ্র আপনাকে কী দিয়েছেন? তিনি বলেছিলেন, অনুভূতি, মানুষ সম্পর্কে অনুভূতি, দেখা ও অনুভব করার চোখ; হুমায়ূন আহমেদ থেকেও সেই মানুষের প্রতি, জীবনের প্রতি ভালোবাসা, একই সঙ্গে জীবনের ক্ষুদ্রতা, তুচ্ছতাগুলোকে চিনে নেওয়ার নতুন একটি চোখ তিনি সৃষ্টি করে যেতে পেরেছেন।’’

আর জীবনকে সূক্ষ্ম চোখে দেখার অন্যতম উপাদানই হলো মানবিক গুণ। হুমায়ূন তার গল্পে সাধারণ মানুষকে তুলে ধরেছেন মানুষের অসীম সম্ভাবনা আর নিয়ত সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে সংগ্রামী রূপে। তার প্রকাশ ভঙ্গিটি কখনোই উচ্চকিত নয়। খুব মৃদু কিন্তু জোরালোভাবেই তিনি মানুষের জয়গান গেয়েছেন তার গল্পমালায়। 

মানবিক মূল্যবোধকে তিনি দেখেছেন বহু দিক থেকে, বহু রঙে আর রেখায়। ‘চোখ’ শিরোনামের গল্পে আমরা দেখি, ডাকাত মতি মিয়ার চোখ উৎপাটনের আয়োজন চলছে। খেজুর কাটা দিয়ে এই ভয়াবহ ডাকাতের চোখ তুলে নেয়া হবে। অথচ ভয়ংকর এই ডাকাতটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশা করে হয়তো কোন মানুষের মনে দয়া হবে, সে মুক্তি পেয়ে যাবে। সে আকাঙ্খা করে, অপেক্ষা করে, কোন এক মায়াবতী তার চোখদুটো রক্ষা করতে এগিয়ে আসবে। 

কোন কোন বিপর্যয়ে মানুষকে রক্ষা করতে হয়তো কেউ এগিয়ে আসে না। ‘একজন শৌখিনদার মানুষ’ গল্পে আসমানীর সুদর্শন পুত্র’র জন্যও কোন রক্ষা কবচ নেই। তার বাবা তাকে দুহাজার টাকা বায়নায় ঘেটু দলে দিয়েছে। ঘরে আরও টাকা আসবে। সুলেমান চলে যায় হাশেশ মিয়ার কাছে। ডান্স মাস্টার তাকে শাড়ি, লিপস্টিক আর নারকেলের মালা পরিয়ে মেয়ে সাজিয়ে পাঠিয়ে দেয় হাশেমের ঘরে। হাশেমের স্ত্রী সন্ধ্যা থেকেই কাঁদতে বসে। কিন্তু হাশেম নির্বিকার। ঘেটু দলের বালকদের সঙ্গে রাত্রি যাপন শৌখিন হাশেম মিয়ার বিলাসিতা। কিন্তু এই বিলাসিতার আড়ালের মানবিক বিপর্যয় একমাত্র হুমায়ূনের গল্পেই ফুটে ওঠে। 

‘শৃঙ্খলা’ গল্পে পাগল নসু’র প্রতি হুমায়ূনের দরদ সুষ্পষ্ট। পাগল নসু পাশে শুয়ে থাকা কু-ুলি পাকানো কুকুরটিকে নিয়ে জীবন কাটায়। গভীর রাতে ‘নিউ ঢাকা কাবাব হাউস’-এর সামনে দাঁড়ালে সে আর তার কুকুর পরিত্যক্ত খাবার পায়। কিন্তু হোটেলের মালিক তাকে নিয়ে  নিষ্ঠুরতা রসিকতা করতে ছাড়ে না। নসুর বউয়ের নাম জানতে চায়, কিন্তু নসু পরিবারের নাম বলে না। পরিবার তাকে একদিন ঢাকা শহরে এসে ছেড়ে দিয়ে গেছে, সে বিশ্বাস করে সুস্থ হয়ে গেলে পরিবার তাকে আবার ফিরিয়ে নেবে। কিন্তু পরিবারের নাম সে কাউকে বলে না। সে খুব শৃঙ্খলা পছন্দ করে, ট্রাফিকের কাজ লক্ষ্য করে, কেউ শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তার অস্বস্তি হয়। সে কাউকে বোঝাতে পারে না, শৃঙ্খলা ব্যাপারটা কতো গুরুত্বপূর্ণ। পাগলের মতোজগত নিয়ে এই দরদী গল্প হুমায়ূন তার মানবিকতার ভিন্ন মাত্রা দেখিয়েছেন।  

বিষয় বস্তুর অবিরাম বৈচিত্র্যে হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যেকে নিঃসন্দেহে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। তার মতো এতো ব্যাপক বিষয় নিয়ে খুব কম লেখকই কাজ করেছেন। সেলিনা হোসেনের মতে, ‘‘তার গল্পের মুগ্ধতা, কাহিনী বিন্যাস, নির্মাণ শৈলীর মাধ্যমে একই সঙ্গে সব বয়েসি পাঠকের কাছে একটা আশ্চর্যরকম গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন। সেই সাথে তার লেখার স্নিগ্ধতা, ভাষার গতিশীলতা, সারল্য পাঠকের কাছে ছিল দারূণ আকর্ষণীয়। দ্বিতীয়, তার এই সব কিছুর ভেতরে মানুষকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার বিষয় ছিল, সমাজকাঠামো নির্মাণের পটভূমিতে যে মানুষেরা আমাদের জীবনে অহরহ আনাগোণা করে  তাদেরকে তুলে আনার একটা বিষয় ছিল।’’

মানবিক মূল্যবোধ এবং তার বিচিত্র প্রকাশভঙ্গিতে হুমায়ূন যথার্থই অনন্য ও শক্তিশালী। অন্তত এই দিক থেকে বিবেচনা করে হলেও আমরা ছোটগল্পকার হিসাবে হুমায়ূন আহমেদকে বাংলা সাহিত্যের একজন অনন্য অংশীদারী দাবী করতে পারি। হামীম কামরুলের ভাষ্যমতেই বলতে পারি, ‘‘তাঁর ছোটগল্প বাদ দিয়ে অন্তত বাংলাদেশের সাহিত্যের ছোটগল্পের ইতিহাস লেখাটা ভুল হবে সেটি জোর দিয়েই বলা যেতে পারে।’’

 

🔅🔅🔅🔅🔅

 

তথ্যসূত্র:

হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা, সৈয়দ শামসুল হক, দৈনিক সমকাল, ২১ জুলাই ২০১২

বাছাই গল্প, হুমায়ূন আহমেদ, ভূমিকা ও সম্পাদনা সালেহ চৌধুরী, একুশের বইমেলা ২০১২, ঢাকা, অন্যপ্রকাশ

হুমায়ন আহমেদ সাহিত্যের নতুন যুগের চর্চা করেছিলেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, দৈনিক যুগান্তর, ২১ জুলাই ২০১২

হুমায়ূন আহমেদের ছোটগল্প : জটিল জীবনের সহজ গাথা, মোহাম্মদ নূরুল হক, দৈনিক ইত্তেফাক, ১৮ নভেম্বর ২০১২    

বাংলাদেশের ছোট গল্প : বিষয়-ভাবনা স্বরূপ ও শিল্পমূল্য, আজহার ইসলাম, প্রথম প্রকাশ- এপ্রিল, ১৯৯৬, বাংলা একাডেমী

শিল্পের শক্তি, শিল্পীর দায়, আহমাদ মোস্তফা কামাল, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন, ফেব্রুয়ারি ২০১০

বাংলাদেশের ছোটগল্পের শিল্পরূপ, চ ল কুমার বোস, প্রথম প্রকাশ এপ্রিল ২০০৯, বাংলা একাডেমী

চেখভ গল্প সমগ্র, অনুবাদ : অধ্যাপক মণীন্দ্র দত্ত, বইমেলা ১৪০০, তুলি-কলম, কলকাতা

কথাসাহিত্য সমীক্ষণ, সরদার আবদুস সাত্তার, প্রথম প্রকাশ ফেব্র“য়ারি ১৯৯৭, বই প্রকাশনী

হুমায়ূন আহমেদ: শূন্যতার শিক্ষা, হামীম কামরুল হক, সাপ্তাহিক, সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা, ৬ সেপ্টেম্বর ২০১২, বর্ষ ৫ সংখ্যা

তিনি আমাদের, সেলিনা হোসেন, দৈনিক সমকাল, ২১ জুলাই ২০১২

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

নৃমুণ্ডের মীমাংসা | রাজা সরকার | পর্ব ৫

Sat Nov 14 , 2020
নৃমুণ্ডের মীমাংসা | রাজা সরকার | পর্ব ৫ 🌱 ১১ ধলাবাবুর খুড়তোত ভাই শান্তি গতকাল রাতে এসে বাড়ি পৌঁছল। কাকা খবর পাঠিয়েছেন ধলাবাবুকে। শান্তির সঙ্গে কথা আছে। সকালের কাজকর্ম ও খাওয়া সেরে একটি আলোয়ান গায় দিয়ে ধলাবাবু তার ছুডু কাকার বাড়িতে গেল। শান্তি ধলাবাবুকে দেখে বলল—কেমন আছ দাদা। প্রণামও করল। […]
Shares