নৃমুণ্ডের মীমাংসা | রাজা সরকার | পর্ব ৫

নৃমুণ্ডের মীমাংসা | রাজা সরকার | পর্ব ৫

🌱

১১

ধলাবাবুর খুড়তোত ভাই শান্তি গতকাল রাতে এসে বাড়ি পৌঁছল। কাকা খবর পাঠিয়েছেন ধলাবাবুকে। শান্তির সঙ্গে কথা আছে।

সকালের কাজকর্ম ও খাওয়া সেরে একটি আলোয়ান গায় দিয়ে ধলাবাবু তার ছুডু কাকার বাড়িতে গেল। শান্তি ধলাবাবুকে দেখে বলল—কেমন আছ দাদা। প্রণামও করল। ধলাবাবু শান্তির কাছ থেকে কলকাতার খবরাখবর নিল।

ধলাবাবু বারকয়েক কলকাতায় গিয়েছে আগে। কিন্তু কোনোবারই দিন ছয় সাতের বেশি থাকা হয় নি। তবু কেন জানি মনে হয় কলকাতা তার খুব চেনা। শান্তি যখন বিভিন্ন এলাকার খবর দিচ্ছিল মনে হচ্ছিল যেন সব তার চেনা। শান্তির মুখে রাজাবাজার, কলুটোলা, মানিকতলা, শ্যামবাজার নামগুলো শুনে কেন জানি মনে হচ্ছিল রক্তপাত, হানাহানিরতে মাখা এইসব পথঘাটের এক পথিক  কি আমিও ছিলাম ! এমন স্বকল্পিত ছবি মনে পড়ছিল। তবু বেশিক্ষণ এইসকল বর্ণনা তার ভাল লাগে না। 

কিন্তু এইসময়ের শিয়ালদহ ইস্টিশনের কথা শুনে মনটা খুবই  দমে গেল। সেই ইস্টিশন কতবার দেখেছি, তা নাকি এখন উদ্বাস্তু  মানুষের ভিড়ে এক সাক্ষাৎ নরক। হায়রে মানুষ, মানুষের স্বাধীনতা, দেশভাগের সুখ—এইতো তার পরিণতি—-

শান্তির কথার মধ্যে বেশ দ্রুততা আছে। সে এইসকল বর্ণনা শেষ করে একসময় জিজ্ঞেস করল—তুমি কী ভাবতাছ দাদা—এই দেশে কি থাকতে পারবা?

দেখ, থাকতে পারাডা নিজের উপর। থাকতে পারা যাবে না—এই কথাডা হুনি খুব চতুরতার সঙ্গে মানুষের মধ্যে ছড়ানো অইতাছে। তাই মানুষের মনে এই কথাডা খুব সহজে ভাসতাছে।  থাকতে গেলে থাহনের ভয়ডা দূর কইরাই থাকতে অইব—নাইলে দেশবাড়ি ছাইড়া যাওনই ভালা। থাকার জন্য আজ পর্যন্ত তো কোনো লড়াই করতে হয় নাই। অকৃপণ প্রকৃতির দান আছে এই ভূমিতে—সামাজিক আর্থিক বৈষম্য হয়তো আমরা  যুগ যুগ ধরে তৈরি করছি—যে কারণে সব মানুষ হয়তো বাঁচার সহজ স্বাদ পায় নাই—কিন্তু সহজে বাঁচার সম্ভার ও সম্ভাবনা দুই-ই ছিল, আছেও—অহন হালে যে বিপর্যয় নাইম্যা আইছে তাতো আর স্থায়ী অইতে পারেনা—আর অইলেও সেইটারে মোকাবেলা করনের লাইগ্যা আর তার লগে থাকার জন্য প্রয়োজনে মনডা খানিক শক্ত না হয় করলামই—তাই ভাবতাছি এইসব অহনও—

তুমি তো কথাডা জটিল কইরা ফেললা দাদা। দেশটা তো ভাগই হইছে হিন্দু আর মুসলমান আলাদা যাতে থাকতে পারে তার লাইগ্যা। তয় দেশডা যহন ভাগ হইয়াই গেছে তহন তুমি থাকবা কিবায়, বা থাকবা ক্যান। তোমার জন্য ত হিন্দুস্তান করা অইছে। অহন তুমি সহজেই সেইখানে চলে যাইতে পারতাছ। এদিকে দাঙ্গাহাঙ্গামা একটা অইলে কিন্তু অসুবিধা অইয়া যাইব যাওনের। আগে থাকতে সব কিছু গুছাইয়া লওন ভালা না?

তুইন কথাডা এত সরল কইরা লইছচ যে দেশ ছাড়াডা আর একটা বাড়ি বদল করা যেন একই কথা। হৃদয়পুর না থাইক্যা ধর বারহাট্টায় গিয়া থাকলাম আর কি। দেশছাড়ার অনেক কয়টা দিক আছে। তুইন দেশ আর রাষ্ট্রের মধ্যে গুলায়া ফেলছস।

দেশরাষ্ট্রএই কথা দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। এই দেশরাষ্ট্রকথা দুটি পরস্পর নিকট আত্মীয়  হলেও তাদের মধ্যে অনেক  পার্থক্য। যা কোনোদিন বিলীন হয় না । কারণ একটির থেকে আরেকটির জন্ম হয়। অর্থাৎ দেশের থেকে  রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু রাষ্ট্রের থেকে দেশের জন্ম হয় না কখনো। দেশ স্থায়ী, কিন্তু রাষ্ট্র অস্থায়ী। রাষ্ট্র নির্মাণ করা হয় সাময়িক কারণে, কিন্তু দেশ নিজে নিজেই মানুষের প্রয়োজনে যুগ যুগ ধরে গড়ে উঠে। দেশের সঙ্গে মানুষের সত্তার সম্পর্ক, রাষ্ট্রের সঙ্গে মানুষের আইন তথা সংবিধানের সম্পর্ক।  রাষ্ট্রের বাইরে গেলে মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্র থাকে না, দেশ থাকে। একজীবনে মানুষের রাষ্ট্র বদল হলেও দেশ বদল হয় না।

দাদা তুমি তো মাথা আউলা কইরা দিলা ।

একটু চেষ্টা কর বুঝন যাইব—দেশ ছাড়লে মানুষের আর কিছু থাকে না। মানুষ এরপরও বেঁচে থাকবে বা থাকতে পারে—কিন্তু বাকি জীবনে সে আর দেশ পাবে না। আর দেশ না পাইলে জীবন যে কী হয় সেইডা বাকি জীবনে সে আর পূরণ করতে পারবে না। অনিকেত হয়েই ঘুরে বেড়াবে আর বুঝবে ক্ষণে ক্ষণে।

কিন্তু দাদা অহন যেডা ইণ্ডিয়া, সেইডাও ত তুমার দেশই আছিল । তাইলে এইহান থাইক্যা চইলা গেলে কি দেশ ছাইড়া যাওয়া অইল?

কথাডাত যুক্তি আছে। ভাল কইছস। কিন্তু ইণ্ডিয়াটাও ব্রিটিশের তৈরি করা একটা রাষ্ট্রই আছিল। সেটাও অনেকগুলো দেশীয় ভূখণ্ড জোড়া দিয়া তৈরি অইছিল ইণ্ডিয়া রাষ্ট্র। তখন আমাদের কাউরে নিজস্ব ভূমি বা চৌদ্দপুরুষের ভিটামাটি ত্যাগ করতে হয় নাই—মানুষ তার দেশীয় ভূখণ্ডের ভেতরেই থেকে যেতে পারছিল। তাই তখন এই দেশ বিচ্ছেদের প্রশ্নটা তৈরি হয় নাই। 

দাদা তোমার কথার লগে পারতাম না। কিন্তু একটা কথার উত্তর দেওতো—নোয়াখালির রায়ট থাইক্যা শুরু কইরা যে সব রায়ট এই এতদিন ধইরা হিন্দুদের উপর অইল বা অইতাছে, তার মইধ্যে আমরা পড়লে কি অহনও থাকতে পারতাম এই বাংলায়?  

কথাটার অনেক উত্তর হয়। তোর পছন্দের সহজ উত্তরটা অইল–না, থাকতে পারতাম না। কিন্তু একটু ভাইবা দেখ নোয়াখালিতে যখন রায়ট অইতাছে তখন পাশের জেলার হিন্দুরা আগেভাগেই পলাইতে শুরু করছে। ক্যান, কেউ একবার ভাবলনা ক্যান যে অন্তত আত্মরক্ষার জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর দরকার—সেই দরকারে সংঘবদ্ধ হওয়া দরকার—সেইটা কোনো রাজনৈতিক দল বা কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাথাতেও আসলো না। শুধু খবরের কাগজে দাঙ্গার বিবরণ পইড়া পশ্চিম বাংলার কিছু হিন্দুত্ববাদীরা ঐহানকার নিরপরাধ মুসলমানদের উপর হামলা করল। আরে ওই মুসলমান আর নোয়াখালির মুসলমান কি এক অইল! তোদের যদি সৎসাহস  থাকত, তয় সকলে মিইল্যা সম্প্রীতির মিছিল কইরা নোয়াখালির  দিকে আইলে না ক্যান—তাইলে ত বুঝতাম যে তরা মানুষের ভালা চাস—বলতে গেলে কোনো রাজনৈতিক দল—কমিউনিস্ট, কংগ্রেস, হিন্দুত্বের দল—কোনোদলই হেই সাহস দেখাইল না—একলা গান্ধীজি তার নিজ আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে লগে কয়ডা লোক লইয়া আইসা নোয়াখালির অগ্নিকুণ্ডের মাঝখানে খাড়ইল। দেশের  নেতা—মানুষের নেতা  অইতে গেলে   এই রকম আদর্শের জোর আর বুকের পাটা লাগে—   

দাদা তোমার কথা শুনতে থাকলে মনে লয় শুনতেই থাহি—অত সুন্দর কইরা বুঝাও—- 

আমি দেশ ছাড়বোনা—এই কথাডা হুনি তরে কইতাম পারতাম না। এই কথা কইয়া বেক মানুষরে লইয়া বিপদে পড়ার ইচ্ছা আমার নাই। তয় দেশ ছাড়ার আগে শেষ একটা চেষ্টা ত করন লাগব থাইক্যা যাওনের। আমরার বর্ণ হিন্দুদের ত ভাই বলতে গেলে পাহাড় প্রমাণ ভুল বা অন্যায় আছে—-অহন আমি সেইসব ভুল অন্যায় লইয়া পড়তাছি না—তয় একটা জিনিস দেখতাম চাই যে এই   অঞ্চলের বোঝদার মুসলমান মানুষ আমরারে চায় কি চায় না। তাদের অভিমতটা কী। আমিত বলব ভুল বা অন্যায় যা আমাদের হিন্দুদের আছে তাতে অন্তত এই অঞ্চলের মুসলমানরা সেই অনুপাতে আমাদের উপর তারার ক্রোধ প্রকাশ করে নাই। জানিনা আগামী দিনে করবে কি করবে না। তয় আমার পর্যবেক্ষণে কিন্তু অন্য একটা জিনিসও ধরা পড়তাছে যে, ক্রোধের তলায়  লোভ। উপরে সাম্যের রাজনীতির প্রলেপ দিয়া লোভটাকে ন্যায্য করে তুলতে ক্রোধের আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। এইটা  যাই হোক রাজনীতি না, বা রাজনৈতিক পন্থা না। তয় পাশাপাশি শ বছর   ধরে থাকা একটা মানুষের প্রতি আরেকটা মানুষের যদি সত্যি কোনো অন্তরের টান না থাকে তবে তো আমরা জাত ধর্ম নির্বিশেষে নিজেরাই একটা বড় মিথ্যা।

—-দাদা আছি কয়দিন। তুমার লগে আরো বওন লাগব এই সব কথা শোনার জন্য। তো এখন একটা কথা বইলা রাখি যে আমি একটা সম্পত্তি বিনিময়ের চেষ্টা করতেছি । আমার এক জানাশোনা উকিল আছে। সে এইসব জমিটমির উকিল, অহন এই সময় হে সম্পত্তি বিনিময়ের কাজ কর্ম করে। তার কাছেই দুইটা সম্পত্তির খোঁজ পাইলাম। আমারে নাম ঠিকানা দিয়া দিছে । একটা সম্পত্তি আছে হুগলি জেলায় আরেকটা আছে বর্ধ্মানে। তুমারে এইবার লইয়া যাইতাম চাই—ওই দুইডা সম্পত্তি দেহনের লাইগ্যা। বাবারও তাই মত। বাবারেও নিয়া যাইতে চাইছিলাম, তো বাবা  কয় যে—আমি আর কয় দিন, থাকবা তুমরা সগলে—ধলারে লইয়া যাও—হে বুঝদার আছে—দেইখ্যা আসুক গিয়া।

, কাকার লগে এইতা নিয়া কথা অইছে আমার—তয় দেহি, ভাইব্যা দেহি—তুই আমরার ঘরের দিক একবার আইয়িচ—-আইজ উডিরে ভাই—একটু কাম আছে—

ধলা উঠে আসার সময় কোথা থেকে শ্যামলী দৌড়ে এসে বলল—কী অইল—দাদাভাই যাইতাছ গা যে—ভাত খাইয়া যাইতা না—

ধলা হেসে উঠল। বলল—তুই যাইছ আমরার ঘরে—তোর নিমন্ত্রণ আছে

হাছা কইতাছ!

হাছা না মিছা গিয়াই দেইখ্যা আয় না—

আমি অহনি যাইয়াম–

তার আগে ক —এই আমরা যে এতক্ষণ বইয়া কথা কইলাম—আমরারে চা দিলে না যে—

হায় হায়—তুমি চা খাইতা—বও বও দাদাভাই– ভুল অইয়া গেছে—অহনি চা কইরা আনতাছি

নারে পাগলি—লাগবে না—এমনি কইলাম—কাজ আছে আমি গেলাম।

শরিকদের মধ্যে ধলার জেনারেশনে ধলাই সবার বড়। আর বড় বলে তাকে সব ভাই বোনেরাই সমীহ করে। প্রয়োজন ছাড়া কথা কয় না। ব্যাতিক্রম শ্যামলী। সে এই চার শরিকের বাড়ির সকলের সঙ্গে নিঃসংকোচে কথা বলে। আর ধলাবাবু যাকে অন্য ভাইবোনরা কিছুটা ভয়ও করে, শ্যামলী তার সঙ্গে কথা ত বলেই, পারলে রসিকতাও করে। সারাদিন মায়ের ভাষায় ধিঙ্গি মেয়ে সে, এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়াচ্ছে আর মুখে খই ফোটাচ্ছে। এ বাড়ির অতসীদি তার প্রাণের বন্ধু। কোনো মুখরোচক খাদ্যবস্তু সে অতসীদিকে না দিয়ে খায় না। একদিন শ্যামলী আমমাখা নিয়ে এসে অতসীদিকে ডাকল। বলল—এই অদি গাছতলায় আইও। অতসী তাদের বাড়ির ভেতরের দিকের আমগাছতলায় বাঁশের মাচার গিয়ে বসে। বলে– -ওই ছেরি কী আনছস আন দেহি।

শ্যামলী বাধ্য মেয়ের মত অতসীর হাতে আমমাখার বাটিটা তুলে দিল। অতসী অল্প একটু তুলে নিয়ে মুখে দিল।

লবন কম অইছে মাখাতে অদি?

না না ঠিহই আছে—তোর কম লাগতাছে?

না না—।

মুখে আমমাখা নিয়ে হুশহাস করতে করতে বলল–এই হুন না,   তুমার নাহি বিয়ার কথা অইতাছে— 

তরে কেডায় কইল—আমি ত হুনি নাই কিছু—

এই হুন না, তুমার অনেক অনেক দূরে বিয়া অইলে মন খারাপ লাগত না?

তরে এইসব কথা কেডায় কইছে, আগে ক ত হুনি

এই হুন না, তুমি নাকি গাঙের জলে ভাইস্যা আইছ—জেডিমার পেডের থাইক্যা অও নাই—

শ্যামলী তুইন কইলাম দিন দিন খুব পাকনা অইতাছস!  

ক্যান, আমার ত বিয়া ঠিক অইয়া আছে—পাকনার কিতা দেখলা

ও তাই—তাইলে ত তর পাকনামি মাইন্যা লওনই লাগব

আমার বিয়া অইলে তুমি আমার লাইগ্যা কানতা না—

কানতাম কেরে—তুইন স্বামীর ঘরে যাইবে—হ, একটু মন খারাপ অইব তহন—

রায়ট না থামলে নাহি বিয়া অইত না—রায়ট কবে থামব জান অদি–

কবে থামব কিবায় কইয়াম বইন—এক কাজ কর—তুইন দাদাভাইরে জিগাইতে পারছ–

, , ঠিহই কইছ—দা-ভাই তো জানতে পারে—উহু, তাইনে যদি জিগায়, কেরে রে—রায়ট দিয়া তর কি কাম—তখন?

অদি—তুমি খালি ভুল বুদ্ধি দেও—বাদ দেও জিগানোর কাম নাই—ছিঃ দা-ভাই কী মনে করবে—ও মাগো কী লজ্জার কথা—

 হঠাৎ শ্যামলীকে যেন খুব লজ্জায় পেয়ে বসল—‘অদি আমি গেলাম’–বলে একদৌড়ে ওদের বাড়ির দিকে চলে গেল।

অতসী আমতলার মাচার উপর বসে ভাবতে লাগলো শ্যামলীর কথাটা—তুমি নাকি গাঙের জলে ভাইস্যা আইছ—জেডিমার পেডের থাইক্যা অও নাই—।

অনেক ছোট বয়সে একবার এই কথাটা যেন কে বলেছিল। অতসীর হয়তো মনে আছে। সেদিন অতসী তার মাকে জড়িয়ে ধরে কী কান্না! সুমতির সেদিন মহাবিব্রতকর অবস্থা। কোনো মতে মেয়েকে সামলালেন। বললেন—তরে ক্ষ্যাপানোর জন্য কইছে রে পাগলী

না না ক্ষ্যাপানোর জইন্য খালি আমারে কয় ক্যান—আর কাউরে ত কয় না?

মোক্ষম প্রশ্ন। সুমতি এর উত্তর পরিষ্কার করে না দিয়ে অতসীকে খুব আদর করলেন। বললেন—আবার গাঙে ভাইস্যা আওনের কথা কইলে তুই্ন কইবে আমি দেবতার ঘর থাইক্যা আইছিলাম তো—সেইর লাইগ্যা গাঙে দিয়া ভাইস্যা আইছিলাম। এই রহস্যজনক লম্বা কথা তখনকার অতসী মনে রাখে নি, কাউকে বলেও নি। এখন অতসী বড় হয়েছে। বুঝতে শিখেছে। সমাজ সংসারের কিছু কিছু রহস্য তার কাছে ফাঁস হয়ে গেছে। এইতো কিছুদিন আগে সুমতি তাকে খুব আদর করে বুঝিয়ে বললেন যে—মারে, তুইন আমার নিজের মাইয়া—তর পাঁচ/ছয়মাস বয়স থাইক্যা তুইন আমার  কোলে—এইটুকুন আছিলি—আমার সোনা মাইয়াডা অহন কত বড় অইছে অহন—

ছয় মাস বয়স! ওই ছয় মাস কই আছিলাম?

এখান থেকেই অতসীর প্রশ্ন শুরু হয়। সুমতি জানতেন একদিন এই সব প্রশ্নের উত্তর তাকে দিতে হবে। তিনি তৈরিই ছিলেন। উত্তর দিতে তাই দ্বিধা করেন নি। অনেক রাত পর্যন্ত সেদিন প্রশ্নোত্তর পর্ব চলে। অতসী উত্তর শুনে কাঁদে নি। শেষে শুধু একবার জিজ্ঞেস করেছিল—আমার সেই মা অহন কোথায় আছে জান?

 

১২

ধলাবাবু কদিন পর সন্ধ্যার দিকে বন্দ থেকে ফিরে বৈঠকখানায় বসলেন। বসে বংশীকে তামাক দিতে বললেন। বংশী তামাক সেজে  দিয়ে গোয়াল ঘরে কাজ করতে গেল। একটা গাইয়ের বাচ্চা হয়েছে কদিন আগে। 

শীতকালে তামাক খেতে বেশ লাগে। এই অভ্যেসটা তার গত কয়েক বছরের। বাসন্তী মুখে গন্ধ পায় বলে মাঝে মাঝে আগে রাগ করত। বলত—তুমার মত কলেজে পড়া শিক্ষিত ছেলে তামুক খায়—বাপের জম্মে শুনি নাই—লোকে কি কয়—-হ্যাঁ।  

ইদানীং বংশীকে দিয়ে একটু ভাল তামাক আনায়। সে নিজে তামাক তেমন চেনে না। বংশী চেনে। সাপ্তাহিক হাটের বাজারসদায় করতে গিয়ে তামাক নিয়ে আসে। বংশীও তামাক ভক্ত। বড় কর্তার আমল থেকেই সে খায়। তার একটা সৌখিন ছোট্ট ডাবা হুকা আছে।

এতক্ষণ একা একা ধলাবাবু খুব সুখ করে তামাক টানছিল। এরমধ্যে ভাই শান্তি এসে ঢুকলো। ঢুকেই বলল—বাহ্‌— দাদার এই  বৈঠকখানাটা তো বেশ ভাল। তোমাদের আড্ডাটাড্ডা হয় এখনও—-

হয়–তো–কেন রে?

না, বলছিলাম এই অবস্থায় মানুষ জন আসে তো–

কী কস—আইত না কেরে—তুই যা ভাবতাছস তেমন অবস্থা এদিকে অহনও অয় নাই—

 

কথা বলতে বলতেই ওমর এসে ঢুকলো। ওমর শান্তিকে দেখে চিনতে পারলো। বলল—কী ভাই আছ কেমন—কইলকাতার অবস্থা কেমন—

কইলকাতার অবস্থা আলাদা কিছু না—তবে বড় শহর তো—অস্থিরতা থাকেই আর কি—

এইদিক থাইকা লোকজন নাকি ওইবর চইলা যাইতাছে—

, যাইতাছে ত—শুনি হিন্দুদের নাকি আর এই দিকে থাকতে দিব না

হু—কথাডা এক্কেরে মিছা না—কিছু কিছু জেলায় এইরম একটা হিড়িক উডাইতাছে কিছু লোক—তয় আমার মনে হয় হিন্দুরা এত সহজে চইলা না গেলে পারত

আসলে যাইতাছে ত ভয়ে—প্রাণের ভয়ে আর মান ইজ্জতের ভয়ে— আর ওই হিড়িকটা তো এইহানের গভমেন্ট থামানোর কোনো চেষ্টা করতাছে বইলা মনে হয় না—আবার কেউ কেউ কয় এর পেছনে নাহি গভমেন্টেরও হাত আছে।

এতডা আমি অহনও জানতে পারি নাই—তয় অইতেও পারে—নাইলে মানুষ বাড়িঘর সহায় সম্বল ফেলায়া এভাবে যাইতাছে—-

 ধলাবাবু এতক্ষণ চুপ করে ওমর আর তার ভাই শান্তির কথা শুনছিল। বংশীকে ডাক দিয়ে হুকোটা তার হাতে দিয়ে সে বললো—আমরার এই নেত্রকোণা অঞ্চলের মানুষ অহনও খুব বেশী যায় নাই ক্যান—কারণডা তরার কি মনে হয়–

শান্তি—এইহানে এখনও ভয় ভীতি দেখানো বা দাঙ্গা হাঙ্গামা এখনো তেমন হয় নাই বইলা—

ধলা—হ্যাঁ এইডা একটা বড় কারণ। তয় আরেকটা কারণ আছে। পূববাংলার সবচেয়ে অনুন্নত অঞ্চলগুলার মইধ্যে নেত্রকোণা একটা। নেত্রকোণা অঞ্চলের সমাজ কাঠামোডাতে কখনই খুব বড় জমিদারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ আছিল না। এক সুসুং দুর্গাপুরের জমিদারেরা ছাড়া। তারার আধিপত্য আছিল বেশীরভাগটাই গারোপাহাড় সংলগ্ন আদিবাসী সমাজের উপর। ফলে জমিদারীপ্রথা উইঠ্যা যাইব কইরা যে আওয়াজ অহন হুনা যায়, আর যার জইন্য অন্যান্য অঞ্চলের অনেক হিন্দু জমিদারেরা যেমন স্বাধীনতার আগের থাইক্যাই যাই যাই করতাছে, তারার আগের থাইক্যা কইলকাতায় বানানো বাড়ি ঘরে গিয়া উডনের লাইগ্যা, সেইডা যাই কও এইহানে, মানে এই অঞ্চলে অয় নাই। ফলে ধর গিয়া সামন্ত সমাজের মাথা স্বরূপ যে জমিদারেরা আছিল, তাঁদের একটা নিয়ন্ত্রণ আছিল হিন্দু সমাজের মাথার উপর। তো যহন সেই মাথাগুলা চইলা গেল বা  চইলা যাইতে লাগল, তখন অনেক অঞ্চলের হিন্দুদের অবস্থা অইল মাথাহীনের লাহান।  ফলে আমরা যে মাঝে মাঝে বলিনা দাঙ্গা  হাঙ্গামার লাইগ্যা হিন্দুরা কোন প্রতিরোধ করে নাই—নীরবে প্রাণ লইয়া পলাইতেছে—এইহানে একটু ভাবলে দেহা যায় যে, যে  সমাজের মাথা নাই বা দুর্বল, সেই সমাজ এই সময় প্রতিরোধ করব কিবায়—সমাজগুলা চলতই তো সমাজপতির মুখের দিকে, কথার দিকে চাইয়া  চাইয়া। তো সমাজপতিই যেহানে নাই, সেইহানে সবাইরে নিয়া জোট বাঁধব কেডায়। এইডা অইল গোড়ার কথা। তো   আমরার এই অঞ্চলে যেমন বৃহৎ জমিদারেরা ছিল না, সেই কারণে এই প্রশ্নগুলাও তেমন ভাবে আসে নাই। এর মধ্যে আবার এই সব অঞ্চলে  যহন রাজনীতিটা আসে তখন সেইডা শ্রমিক কৃষকের কথা কইয়া আইছে। কিন্তু ধর্মসাম্প্রদায়িকতার কথাগুলা গ্রাহ্য করে নাই। না অইলে বুঝস না অত বড় ঐতিহাসিক তেভাগা  আন্দোলনের পরিণতি অইল গিয়া মুসলীম লিগের  পতাকার তলা। রাতারাতি হিন্দু কৃষিশ্রমিক আর মুসলমান কৃষিশ্রমিক কমরেডগিরি ফালাইয়া পরস্পরের শত্রু অইয়া গেল। কমিউনিস্ট পার্টির থাইক্যা মুসলীম লিগ আপন অইয়া গেল। অথচ এই তেভাগার কৃষকরাই তো তারার আন্দোলনকে আরো গৌরবময় কইরা ফেলতে পারতো যদি  তারা একযোগে এই ধর্মসাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াইতে পারত।

এ ছাড়াও এই নেত্রকোণা অঞ্চলের একটা প্রাচীন ঐতিহ্য আছে। আমার ত মনে হয় এই অঞ্চলের মানুষগুলার মইধ্যে পুরাণো লোক গাঁথাগুলা অহনও ক্রিয়া করে। মহুয়া, মলুয়ার দেশ—এই অঞ্চলের  মানস নির্মাণে মৈমনসিংহ গীতিকার একটা প্রভাব রইয়া গেছে। হিন্দু মুসলমানের সম্প্রীতির কাব্যধারা মানুষকে ধর্মীয় বিভেদ  থেকে অহনও দূরে রাখতাছে। না অইলে এত খাড়াখাড়ি বিভেদের সময় মানুষের এই সংযম লক্ষ্য করার মত। তার উপর অনেক আগে  থেকেই অনুন্নত প্রত্যন্ত ভাটি অঞ্চল বইলা বহিরাগত মানুষের উপস্থিতি এখানে খুবই কম। ধর্মীয় বিরোধ কম থাকা বা না থাকার এটাও একট কারণ হতে পারে বলে আমার মনে হয়।

তো ভাই এই হলো ধর্মসাম্প্রদায়িকতার যুগে হিন্দুদের অবস্থা এই পূববাংলায়। আরো কত কথা আছে—-এই ধর্মসাম্প্রদায়িকতা লইয়া। আমরার সভ্যতার যে অসভ্যতাগুলা আছে তাতো আর কইয়া শেষ করন যায় না—আরেকদিন সময় পাইলে কইয়ামনে ১৯৩৫ এর ভারত শাসন আইন নিয়া। আমাদের যুক্ত বাংলার শাসন ক্ষমতা যখন মুসলমান নেতাদের হাতে চইলা গেলবলতে গেলে তখন থাইক্যাই দেশ ছাড়নের পায়তারা শুরু অইছিল এই জমিদার জোতদারগুলার—- ।

একসময় তো ভাবতাম রাজনীতিতে এই সব নিয়া খোলাখুলি কথা হোক। গোপনীয়তা বর্জন কইরা আস হিন্দু মুসলমান দুই ভাই—দোষ ত্রুটি খুঁইজ্যা বাইর করি, বিসর্জন দিই—-

ধলা অনেকটা বইলা একটু চুপ করলো।

আফজল এতক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়েছিল। এই সুযোগে সে বলল—ছুডু কত্তা একটু বাড়ির ভিতরে যান—আম্মাজানে ডাকতাছুইন আফনেরে।

ধলাবাবু উঠে দাঁড়িয়ে শান্তি ও ওমরকে বলল—তরা বয় আমি আইতাছি—এই বলে ধলাবাবু বাড়ির ভেতরে চলে গেল।

ওমর আর শান্তি মুখোমুখি চেয়ারে। ধলাবাবু চলে যাওয়াতে তারার মূল আলোচনাটা থেমে গেল।  তবু কিছুক্ষণের নীরবতা ভঙ্গ করে ওমর শান্তিকে জিজ্ঞেস করলো—তুমি কি কইলকাতায় মেসে থাক?

, এতোদিন ছিলাম—তবে এই কিছুদিন আগে আমার মেসোমশায়ের বাসায় গিয়া উঠেছি—মেসের খাওয়ায় শরীর টিকছিল না।

কইলকাতার মুসলমানের সংখ্যা কি অহন খুব কইম্যা গেছে।

খুব না হইলেও কিছু মনে হয় কমেছে।

কইলকাতার বড় রায়টটাতো তুমি দেখছ নিশ্চয়ই

, দেখছিই তো—বড় বীভৎস সেই সব দৃশ্য—না দেখলে ওই সব বর্ণনা করে বোঝান যাবে না—স্বাভাবিক মানুষ হঠাৎ করে উন্মাদ হয়ে গেলে যা হয়—আমি ভাবি সাধারণ মানুষের মধ্যে এই উন্মত্ততা জন্মায় কী ভাবে—।

হ্যাঁ ঠিকই কইছ—খবরে কাগজে আমরা যেটুক পড়ছি, তাতেই তো শিউড়ে উঠছি—

এমন না যে তারা আগের থেকেই একটা মারামারির মধ্যে ছিল- –হঠাৎ করে ঘটনাটা ঘটিয়ে দিল কিছু মানুষ—আসলে প্ল্যান করে বাইরে থেকে অবাঙালি লোক নিয়া আইসা এইসব করানো অইছে—এইটা আমার শোনা কথা যদিও—উফ্‌ বাদ দাও ওমরদা—এই সব কইতেও আর ভাল লাগে না—শুনতেও আর মন চায় না। রাজনীতির উপর ঘিন্না ধইরা গেল, যাই কও। 

বুঝতে পারছি—থাক বাদ দাও—অন্য আলাপ করি—তা তুমি বিয়া টিয়া করবা না—

করব—তার আগে এদিকে কী অবস্থা হয় না দেখে কী করে—

এদিকে কী অবস্থা—

এই ধর এই দিকে থাকা হয় কি না হয়—

থাকা অইব না ক্যান—যেমন আছে সবাই তেমনি থাকবে

নিশ্চয়তা কই

ভাইরে নিশ্চয়তা কি বাইরের কেউ দিয়া যাইব—নিশ্চয়তা নিজেরারই তৈরি করন লাগে—

সেইটা কি এদিকের হিন্দুরা পারবে—মনে হয় না—না হইলে দেখো না এইদিক থাইকা যত হিন্দু ওইদিকে যাইতাছে, ওইদিক থাইকা কিন্তু সেই পরিমানে মুসলমান এদিকে আসতাছে না। পরিমানের তারতম্যটা কিন্তু দেখার মত।

খুব ভাল একটা কথা তুললা ভাই। নিজের জায়গায় থাকার ইচ্ছাডা বা তার জন্য লড়ার ইচ্ছাডা থাকা চাই।

কথা ঠিক, কিন্তু ওখানকার সামাজিক রাজনৈতিক তৎপরতার মধ্যে মুসলমান বিদ্বেষটা এক পেশে নয়, মিশ্র আকারে আছে—কিন্তু যেটা খুব পজেটিভ আছে, সেটা হল  গভমেন্ট এই বিদ্বেষের বিরুদ্ধে একশ ভাগ। যেটা এদিকে হচ্ছে না। এদিকে গভমেন্ট যদি হিন্দুদের মনে কিছুটা আত্মবিশ্বাস তৈরি করে দিতে পারত যেআমরা আছি তোমাদের নিরাপত্তার জন্য, তাহলে মনে হয় এই গণ  দেশত্যাগের মানসিকতাটা বদলাইতেও পারত। কিন্তু সেটা ত হওয়ার নয়। দেশটা ভাগই হইছে দ্বিজাতিত্ত্বের ভিত্তিতে। একটা ধর্মভিত্তিক জাতি রাষ্ট্র তৈরির ইচ্ছায়। অথচ কী আশ্চর্যের ব্যাপার দেখ পাকিস্তানের দুই অংশে যত মুসলমান আছে তার থেকে ইন্ডিয়াতে মুসলমান বেশি বিনে কম নাই। ভাগাভাগির এই সমীকরণ কি কেউ মনে রাখতেছে এই সময়। এটাকেই আমার বলতে ইচ্ছা হয়

ধর্মের নামে উন্মার্গগামী হওয়া। আর যদি তাই হয় তো মানুষ যাবে কোথায় !!

বেশ ভাল বললা—তবে আমার একটা কথা, আজ ওই দিকে একটা ইন্ডিয়া আছে বইলাই কি এদিকের বাড়িঘর জমিজমা ছাইড়া ওইদিকে চইলা যাওন লাগব—নিজের জায়গা, বংশ পরম্পরায় গড়ে ওঠা দেশ সমাজ–এগুলার জন্য কি কিছু করার নাই? আজ ওইদিকে যদি ইন্ডিয়া না থাকত, তাইলে এই সব মানুষ কোথায় যাইত—হ্যাঁ খুব বেশি অইলে এক জেলার থাইক্যা আরেক জেলায় যাইত—তা এইডা এই সময়ও তো করতে পারে, পারে না? বলছি যে মাইগ্রেশনটা দেশের মধ্যেই অইতাছে না কেন?—হ্যাঁ যত সহজে কইতাছি সমস্যাটা হয়তো অত সহজ না। একটা রাষ্ট্রে রাজনৈতিক শক্তিই সবচাইতে বড় শক্তি। কিন্তু তার প্রতিপক্ষওতো থাকে। ছিলও তো । তারাওতো এই গণদেশত্যাগের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারত। অদ্ভুত ব্যাপার এই দুঃসময়ে তারার কোনো কথা নাই।

হ্যাঁ ওমরদা–তোমার আমার মত একই। কিন্তু তবু এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মর্মান্তিক দৃশ্যগুলা হয়তো আমাদের দেখতেই হইব।  

যাক তাইলে চল উঠি —নাহি—ধলাদা তো মনে অয় কাজে আটকাইছে–

, লও যাই—আইয়াম নে পরে সময় কইরা—তুমি আছ তো কয়দিন—-

আছি—

ধলাবাবুর সঙ্গে অনেকদিন পর তার মা সুমতির অনেক কথা হলো। এবং সেটা একান্তেই বলা যায়।  

সুমতি আগের দিনের কিছুটা লেখাপড়া জানা মহিলা। সংসারের সব কিছু সে এই প্রান্তিক গ্রামের গৃহবধূদের থেকে একটু অন্যরকম বোঝে। ছয় মাসের অতসীকে সে যেদিন কোলে তুলে নিয়েছিল সেদিনই বোঝা গিয়েছিল যে, সে এই সংসার, বাৎসল্য, কর্তব্য, ও মানবিকতাজনিত বিষয়গুলোকে একটু আলাদা করেই বোঝে। দেশভাগজনিত অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ইদানীং তাঁর কেন জানি মনে হচ্ছিল কয়েকটি কথা ধলাকে বলে রাখা দরকার।

ধলাবাবু সোজা মায়ের ঘরে গিয়ে দেখে মা বিছানায় বসে আছে। যা তিনি এই সকালের দিকে করেন না। তাই ধলাবাবু প্রথমেই জিজ্ঞেস করল —কী অইছে মা—শরীর খারাপ করছে নাহি—। এই বলে মায়ের গায়ে কপালে হাত দেয় ধলা। সুমতি ছেলের কথায় হেসে দিলেন। বললেন—আরে না না শরীর ঠিকই আছে—অত ব্যস্ত অইচ না—কয়ডা কথা তোর লগে কইয়াম ভাবতাছিলাম—তাই ডাইক্যা পাডাইলাম আরকি—তুই বয় তো, বয়—

, বইলাম—অহন কও তো কী এমন জরুরী কথা–

প্রথম কথা অইল তুইন শান্তির লগে কি কইলকাতা যাইতাছস?

, যাওনের তো কথা—ক্যান মা—

যাওয়া তো বিনিময়ের লাইগ্যা ওইদিগের সম্পত্তি দেহন—এই নিয়া তরে তো আমার কিছু কওনের নাই—তো দেশের অবস্থা কি খুবই খারাপ অইয়া যাইতাছে—আমরার কি যাওনই লাগব—কিছুতেই কি এইহানে থাহন যাইত না—এইডি একটু ভালা কইরা বুইজা কাম করন আর কি—আমার যে বাবা একবারেই মন সায় দেয় না এইহান থাইক্যা যাওনের—এই কথাডা তুইন একটু মনে রাখিচ আর কি। এইসব উথাল পাতালের মধ্যে আমার ইচ্ছার কোন দাম নাই জানি, তবু তোর কাছে কথাডা কইয়া রাখলাম। আর হুজুগের মাথায় কিছু কইর না যে

মা, তোমার এই কথা তো আমিও ভাবতাছি যে, আমরও মন  একবারেই সায় দেয় না এইহান থাইক্যা যাওনের। পাশাপাশি আবার ভাবি ভরসা কই যে থাকব। থাকতে থাকতে যদি শেষে একটা দেশের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক অইয়া পড়ি—আমরার পরের প্রজন্মের ভবিষ্যৎ কী হবে—আমিও বিষয়ডা ভাবতাছি—তুমি চিন্তা কইর না।

বিনিময় করলে কি চাইর শরীকের এক লগে অইব নাহি ভাগে ভাগে—

ছুডু কাকা ছাড়া অন্য কাকা জেডারাতো এই নিয়া কিছু কয় না—

তারা না কইলেও তুইন যদি শান্তির লগে সম্পত্তি দেহনের লাইগ্যা যাচ তাইলে তারার সঙ্গে তুই নিজে গিয়া একবার কথা কইয়া আইবে—জ্ঞাতিগুষ্টি তো—সবই তো রক্তের সম্পর্ক—এইভাবে খালি দুই ঘরের জন্য কিছু করার আগে তারারে না জানানোটা অন্যায় অইব বাবা।

ঠিকই কইছ—আমি কাইলই একবার যাব তারার বাড়িত।

বাবা এইসব তো তুই-ই করবি—তোর উফরে ভরসা করন যায় যে ঠিকমত ভাইব্যা চিন্তা কইরা কাম করবি—কিন্তু আমি অন্য  একটা কথা কইতে চাইছিলাম যে অতসীর বিষয়ডা নিয়ে কী করণ যায়—

ক্যান অতসীর কী অইছে—

অইব আর কিতা —বছর ত ষোল পার অইতে তো অইল—আর ত রাহন যায় না—বিয়া টয়া তো দেওন লাগে—এইডা বড় চিন্তা না—কিবায় কি অইব আমি তো ভাইবা পাই না। ছুডুবেলা ছয় মাসের অনাথ শিশুরে যে কোলে লইছিলাম তহন কি আর ভাবতে পারছিলাম দিনকাল অমন অইয়া যাইব—তার উপর মাইয়াডার বাপ মায়ের পরিচয় লইয়াও তো একটা সংকট আছে—আমার মাথায় তো আর কুলায় না।

মা, অতসী তোমারই কোলে মানুষ হওয়া মেয়ে। সেই অর্থে আমার বোনও সে। জাতধর্মের সংকটটাও আমার মাথায় আছে। তবু এর বিয়ার কথাডা ভাবতে তো হয়ই। মা, তুমি এইডা আমার উপর ছাইড়া দেও। শুধু শুধু এই নিয়া দুশ্চিন্তা কইর না তো। আমি দেখতাছি—কয়ডা দিন একটু ভাবি—তোমারে জানাইয়ামনে।

আরেকটা কথা বাবা, তুই একটু নকুল মাঝিরে খবর দেইচছে– -হে যেন একবার আমার লগে দেহা করে।

হঠাৎ নকুল মাঝি কেন মা—

আছেরে বাপ, কারণ আছে—অতসী যেদিন জানছে তার জন্মদাত্রী মা আমি না, অন্য কেউ, —সেদিন থাইক্যাই হে খোঁজ করে হেই বেডির—নাড়ির টানরে বাবা—এ কি ভুলন যায়! তাই ভাবতাছি  আমারও বয়স অইল—মাইয়াডার এই আহেংকাডা যদি পুরণ করতে পারি তো শান্তি পাই—তুই দেখিস বাবা নকুলরে যদি একটা খবর দেওন যায়—অতসীর জন্মদাত্রী মায়ের নাম পিয়ারী—

—‘পিয়ারী‘! —-নামটা আগে শুনছি কি না মনে নাই। যাই হোক নকুল কাকারে খবর পাডাইয়ামনে—তয় একদিন অতসীর পিয়ারী মায়ের গল্পটা শুনতে হবে তোমার লগে বইয়া। 

সুমতি মনে মনে ভাবে আশ্চর্য মনভোলা ছেলে আমার। সে যখন নাইন কি টেন এ পড়ে, থাকে নেত্রকোণায়, তখনই তো বাড়িতে এলো অতসী। মাঝে মধ্যে নেত্রকোণা থেকে যখন দুএকদিনের জন্য বাড়িতে আসত, তখন চোখে নিশ্চয়ই পড়ত। কিন্তু সেই উড়নচণ্ডী বয়সে কি তার কার বাচ্চা, কী সমাচার, এই নিয়ে মাথা  ঘামানোর সময় ছিল ! আজ এখন সে অতসীর পিয়ারী মায়ের গল্প শুনতে চায় এতদিন পর। 

 

১৩

শেষ বিকেলের দিকে ধলাবাবুকে দেখা গেল দক্ষিণের বন্দে ধীরে ধীরে হাঁটছে। পরণে সাদা পাজামা। গায়ের চাপানো আছে ঘিয়ে রঙের আলোয়ান। চরে বেড়ানো গরুর দল নিয়ে কামলা রাখালরা ঘরের দিকে ফিরছে। সারা বিকেল বাচ্চারা দাপিয়ে খেলে এখন দমছুট হয়ে পড়েছে। তারাও ফিরছে ঘরে। কুয়াশার আস্তরণ এই বসন্তেও ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলছে চরাচর। দক্ষিণের এই বন্দের শেষদিকে শুরু হয়েছে বিল। তার কিছুটা আগেই একটা বিশাল লম্বা আইল, যা অনেকটা বাঁধের মত পূব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত। ছোটবেলা থেকে ধলাবাবু এটাকে দেখে আসছে আর জাঙ্গাল নামে চিনেও আসছে। বসন্তের সময় বিলের জল অনেক সরে গেছে। জায়গাটা বেশ শুকনো এখন। বিলের দিকে মুখ করে ধলাবাবু আজ জাঙ্গালের উপর বসে পড়লো। এমন সে আগেও বসেছে। কিন্তু ইদানীং এখানে বসলে তার বুকের ভেতর কেমন কষ্ট হয়। ভেতর থেকে যেন হু হু করে কেউ। ভেতর থেকে যেন এক বেদনা এই চরাচর ছেড়ে চলে যাওয়ার অধিবাস গাইতে চায়।  বিলের উপর নেমে আসা আকাশের নীলিমা এখনও, আজও সত্য—একদিন এই সত্য, এই নীলিমা আমিও হারাবো!

 

সানে বান্ধা পুষ্করিণী গলায় গলায় জল

পাইক্যা আইছে শাইলের ধান সোনার ফসল

তা দিয়া কুটিয়া খাইলাম শালিধানের চিড়া

এই দেশ না ছাইরো ভাইরে আমার মাথার কিরা” (মঃগী) 

ধীরে ধীরে ছায়ার মত অন্ধকার নামে। অতসীর কথা মনে হয়। অতসীর কথা ভাবার জন্যই তো আজ এই বৈকালিক ভ্রমণে সে এসেছিল । একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মাকে জানাতে হবে। নিজের ছেলেমেয়ের থেকে এই পালিত মেয়েটাই যেন মাকে বেশী বেশী ভাবাচ্ছে।

অথচ অতসীর নামটা মনে আসতেই এক লহমায় অতসীর ভাবনাটাও শেষ হয়ে গেল।

ভাবনাটা এরকম যে অতসীর বিয়ে দিতে হবে——।

 

অতসীর জন্মদাত্রী মায়ের নাম পিয়ারী আর জন্মদাতা বাপের নাম রফিক। অদ্ভুত! জন্মসূত্রে মুসলমান শিশুকন্যাটি মানুষ হলো তার হিন্দু মায়ের কাছে। এই সত্য সংসারে মাত্র কয়েকজনই জানে। আজ এটা ভাবতে খুব অবাক লাগে যে ওইসময় মোহনলাল আর সুমিতা নকুলমাঝির কথায় একটি শিশুর দায়িত্ব নিজেদের উপর তুলে নেন সব জেনেশুনে ! আজ এই সময়, এই ভাগাভাগির সময়,এই ভূতগ্রস্থ সময়ে এই মানসিকতার কথা ভাবতে শরীরমন যেন যুগপৎ পুলকে বিষাদে অবশ হয়ে আসে। মনে হয় যেন এই স্নেহ কুয়াশার আঁধারে ডুবে যাওয়া চরাচরকে বলি—আমরা এখনও আছি—প্রাণের মূল্যের কাছে সর্বস্ব বাজি রেখে এখনও আছি। ভেদাভেদের আস্তরণটা এখনো সরাও, এখনো সময় আছে —অতসীর মুখে হাসি ফুটুক—তার একটার জায়গায় দুটো মা হোক—

নকুল মাঝিকে খবর দেয়া হয়েছিল। ধলাবাবু বংশীকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছিল। এখন শুকনোর দিন। পায়ে হেঁটে রাস্তা চার/পাঁচ মাইল হবে। এত রাস্তা ডিঙিয়ে নকুল মাঝি কদিন পর এক সকালে এসে হাজির। কিছুটা বয়সের ছাপ পড়লেও নকুলের শরীর সেই পাকানো বেতের মতই। চুলে পাক ধরেছে। একটা খাটো ধুতি পরনে, গায়ে একটা খদ্দরের আলোয়ান—উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে সে আগের মতই ডাকলো—কই  বৌঠাকরুন—আমি আইয়া পড়ছি। বলতে বলতে সে বারান্দায় উঠে একটা পিঁড়ি টেনে নিয়ে বসে পড়লো। বাসন্তী রান্নাঘর থেকে শুনতে পেয়ে বেরিয়ে এসে বলল—কাকা বওহাইন—মা বোধ হয় আহ্নিক করতাছেন—অহনি অইয়া  পড়বাইন—আফনে একটু বওহাইন।

একটু পরে নকুলের সামনে এক থালা মুড়ি আর গুড় দিয়ে গেল বাসন্তী। সঙ্গে এক গেলাস জল। বলে গেল—মায়ের লগে কথা কইয়া যাইনগা না যে—বেইন্যা ভাত চাইড্ডা খাইয়া যাইয়েন।

নকুল বাসন্তীর কথায় হাসল। বলল—আইচ্ছা মা, আইচ্ছা —

এই সময় হঠাৎ ই ঘর থেকে বেরিয়ে এলো অতসী। বারান্দায় নকুলকে দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল।

নকুল দেখল একটা লাল শাড়ি পরা কিশোরী তাকে দেখে যেন লজ্জা পেয়ে গেল।

নকুল বলল—কেমন আছ মা? অনেকদিন বাদে দেখলাম তুমারে—আমারে চিনছ তো?

মাথা একদিকে কাত করে অতসী জানাল নীরবে।

নকুল বলল—মা আমারে আরেক গেলাস জল দিতে পার?

অতসী—হ, দিতাছি। বলে অতসী জল আনতে রান্নাঘরে চলে গেল।

নকুল একটা লম্বা শ্বাস ফেলল। সেই বর্ষার দিনে কুন্দা করে লইয়া আসা মাইয়াডা—কোলের মধ্যে গুটিসুটি অইয়া শুইয়া  থাকা—তোর কপাল মা, এমন ভাল ঘর পাইছিলে—-নাইলে যে কিতা অইত—নকুল ভাবতে ভাবতে আনমনা অইয়া পড়লো। হঠাৎ একটা কিশোরী কণ্ঠের ডাকে সম্বিত ফিরল—কাকা জল আনছি—-

কিছুক্ষণ পর সুমতি ঘর থেকে বেরিয়ে নকুলকে নিয়ে আমতলায় গিয়ে বসলেন। খানিক নিভৃতে কথা বলার জন্য এই জায়গাটা উত্তম। অতসীকে দিয়ে দুটো মোড়া আনিয়ে নিলেন। অতঃপর পারস্পরিক কুশলাদি বিনিময়ের পর সুমতি জিজ্ঞেস করলেন—নকুল, যে কারণে তোমাকে খবর দিয়া আনাইছি, সেইটা হল যে, মাইয়া এখন বড় অইছে—বুদ্ধিসুদ্ধিও অইছে—অহন তার আসল পরিচয়ডা  তো আর বেশি দিন তার কাছে গোপন রাখা যায় না—তাই তারে একদিন কইছি—বুদ্ধিমতি মাইয়া আমার—বুঝছে সবই—কিন্তু তার আগের মা অহন কোথায় আছে তার খোঁজ খবর করছে এক দুই দিন । আমার ইচ্ছা এই খবরডা তারে দেওনের—হাজার অইলেও গর্ভধারিণী মা—নাড়ির টান একটা আছে। তা পিয়ারীর খোঁজ কি তুমি আর লইতে পারছ—মুসলমান পরিবারের ভিতরে গিয়া তার খবর লওন তো সহজ কাম না—তবু অহন যদি সম্ভব হয় তুমার পক্ষে—

বৌঠান নিজে তো যাই নাই—যাওন যায়ও না—হউক না বন্ধুর বউ—তবু তার খোঁজ করার একটা ইচ্ছা আমার মনের মইধ্যে আছিলই—কারণ মাইয়াডা তো হে জানে আমার কাছেই আছে—তাই এই খবরডা তারে দেওনের যে তুমার মাইয়া দুনিয়ার সেরা কোল পাইছে—আমার বৌঠানের কোল—ভালা আছে, মাইয়া ভালাই থাকব উপরঅলার দয়ায়।

তো কয়েকমাস পরে একদিন আমার খোঁজে একজন আইছিল, পরিচয় দিছিল হে পিয়ারীর বড় ভাই, নাম রহমত। তারে শুধু এইডা কইয়া দিছিলাম যে মাইয়া আমার কাছে নাই, তয় মাইয়া ভালা আছে—এইটুকই। কিন্তু কোথায় আছে, কার কাছে আছে এইতা কিছু কই নাই। 

তয় কিছুদিন—ধরেন আমার বাড়িত মাইয়া রাইখ্যা বাপের বাড়ি যাওনের বছরখানেকের মধ্যেই হুনছি পিয়ারী ভাবীর শাদি অইছে। তারপরতো আর সেই রহম খবর পাই নাই। 

সেদিন নকুলের কুন্দা থেকে কোনোমতে নেমে বাপের বাড়ির চেনা পথ ধরেই পিয়ারী বাপের বাড়ির যায়। মা ছাড়া বাড়ি আর পড়ো বাড়ির মধ্যে তফাৎ কী—শরীরটা টানতে টানতে নিয়ে  গিয়ে পিয়ারী নিঃশব্দে তাদের দাওয়ায় বসে পড়লো। বাড়ির চার ভাইবউ এর মধ্যে কেউ কি তাকে দেখে নাই—নিশ্চয়ই দেখেছে। কিছুক্ষণ পর হাতে এক গেলাস জল নিয়ে এগিয়ে এল রহমতভাইয়ের বউ। বলল—রানতাছিলাম তো—তুমারে দেখছি বেড়ার ফাঁক দিয়া—আইতে দেরী অইল—কই তুমার মাইয়া কই—।

এই প্রশ্নটা শুনে পিয়ারী ঠিক কাঁদতে পারল না—তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল তো পড়ছিলই, এবার পড়লো  দীর্ঘশ্বাস—মাটির বারান্দায় কয়বার হাত দিয়ে শুধু নিষ্ফল আঘাত করল—বলল—কার কথা কও ভাবী–হেরে তো ফালাইয়া দিয়া আইছি—আল্লারে কইয়া আইছি তারে দয়া কইর আল্লাহ—ভাবীগো—এক অভাগীর ঘরে আরেক অভাগী আইছিল—কেমনে বাঁচি, কেমনে  বাঁচাই—মাডি কামড়াইয়া পইড়া আছিলাম স্বামীর ভিডায়—কিন্তু থাকলে কী অইব—শেয়াল কুকরের অভাব নাই গো ভাবী—মাইয়া মাইনষের  জীবন—-

মাইয়াডারে কই রাইখ্যা আইছ—লইয়া আইতা—আমরার পুলাপানের লগে থাকত, বড় অইত— 

ভাবী থাউক—আর এই কথা কইও না—আমিও আর কইতে পারি না—

আবার এক গেলাস জল চেয়ে খেল পিয়ারী। জল খেয়ে ধীরে ধীরে সে মাটির বারান্দাতেই শুয়ে পড়লো। শুয়ে পড়লো, না বসে থেকে  পড়ে গেল, বোঝা গেল না। চোখ বোজা। তার ভাইবউ ডাকে— পিয়ারী আফা ও পিয়ারী আফা—হুইয়া পড়লা যে—শরীল খারাপ—উড  লও—ঘর গিয়া বিছনাত হুও—ও আফা–আফা—

আফা আর সারা দেয় না। ভাইবউ অন্যদেরও ডাকে। কেউ আসে, কেউ আসেনা। বাড়ির বেডাইনরা কেউ বাড়িত নাই। ভয়ের ব্যাপার। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে কাটার পর কে যেন কইল–চোহে মুহে পানি দেও, পানি দেও—

শেষে পানি দেওয়াতেই চোখ খুলল পিয়ারী। উঠে বসল। আঁচল দিয়ে চোখ মুখ মুছে পিয়ারী সবার দিকে ভাষাহীন চোখে তাকায়।

পিয়ারীর অবস্থা দেখে উপস্থিত কারো কারোর মায়া লাগল। মনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থ পিয়ারীর অবর্ণনীয় অবস্থার সামনে দাঁড়াতে পারল না। মাইয়া মাইনসের জীবন একটু আধটু সবাই যেন অনুভব করলো। তারা কেউ কেউ  পিয়ারীকে ধরে ধরে তুলে নিয়ে গিয়ে স্নান করিয়ে নিজেদের শুকনো কাপড় দিল। সঙ্গে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে দিল। খেতে তেমন পারল না। কোনোমতে সামান্য খেল।

পিয়ারী তখনও বাক্যহারা, চোখের ভাষা অন্তর্হিত।

ভাইবউদের একজন এসে পিয়ারীকে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। যন্ত্রচালিতের মত পিয়ারী বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো ও ঘুমিয়ে পড়লো। 

এদিকে বেলা গড়িয়ে যাওয়ার পর বাড়ির পুরুষ মানুষেরা এল। যার যার কাজের থেকে ফিরে এসে খাওয়া দাওয়া করল। কেউ একবারও পিয়ারীর কথা জিজ্ঞেস করল না। বউদের কাছে শুনে শুধু হু হা করল।

সন্ধ্যের পর শ্বশুরের ঘরে ডাক পড়ল রহমতের।

আব্বা ডাকছেন আমারে—

, বও—ডাকছি এই জন্যে যে পিয়ারী বাড়ি আইছে—তয় এইহানে হে বেশিদিন থাকত না। আমি তার বিয়ার চেষ্টা করতাছি। ত যেডা কওনের লাইগ্যা তুমারে ডাকছি, হেইডা অইল বাড়ির সকল বৌমাদের কইয়া দিবা পিয়ারীর যত্ন আত্তি তারা যেন ঠিক মত করে —তার লগে কোনো ঝগড়া বিবাদ যেন তারা না করে—কী কইলাম বুঝতে পারছ?

জ্বী আব্বা—

ঠিক আছে অহন যাও।

 

পিয়ারীর আব্বা মঈন মিয়া বরাবরের কড়া ধাতের মানুষ। ঘোরতর বিষয়ী হলেও তার জীবনে কথাবার্তার স্থান খুব অল্প। পিয়ারীর  বিধবা হওয়ার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি পিয়ারীর ভবিষৎ ছকে ফেলেন। সেই ছকের কেন্দ্রে আছে পিয়ারীর শাদি।  মাইয়ামানুষের স্বামীর পায়ের তলায় বেহেস্ত। মাইয়ামানুষের এই সংসারে একলা থাকা নাজায়েজ। মানুষের মরণ আল্লার হাতে। মানুষের কিছু করণের নাই।যুবতী মাইয়ার এক স্বামী মারা গেলে আরেক স্বামীর ঘর করতে হবে, এটাই সংসারের বিধান। এর মধ্যে বেড় লাগায় বাচ্চাকাচ্চা। সেই জন্যই তিনি খবর পাঠিয়েছিলেন যে এই বাড়িতে আসতে হলে বাচ্চা ছাড়া আসতে হবে। পিতৃহীন বাচ্চার দায়িত্ব বাচ্চার পিতার সংসারের উপরই বর্তায়। বাচ্চা তাদের কাছে থাকুক। ঝাড়া হাত পা মাইয়া আমার কাছে আসুক। আপত্তি নাই। কিন্তু এই নিধানের ফলে বাচ্চাটিকে নিয়ে যে কী হতে পারে বা এরমধ্যে কী কী ঘটে গেছে, কত চোখের জল গড়িয়েছে—এসব তাঁর কাছে নেহাতই অকাজের। 

তিনি তাঁর ছকের মধ্যে একটি পাত্রও ঠিক করে রেখেছেন। তার নাম বিলাল আহমেদ। পাশের গ্রাম নিয়ামতপুরে বাড়ি। নিয়ামতপুরের বাজারে বড় গালামালের দোকান। জমিজমা সহায় সম্পত্তি আছে। তাঁর দুই স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান বর্তমান। এবার উনি তৃতীয় বিবাহ করতে উদ্যোগী হয়েছেন। বয়স বেশী। হউক বেশি। কত আর বেশি— বেডা মাইনষের বয়সটা কোনো কথা না।

 

মঈন মিয়ার কথা সংসারে অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়। ভাবীদের যত্ন আত্তিতে পিয়ারী ক্রমে এক বিষন্ন সুন্দরী হয়ে উঠতে লাগলো।  মাঝে  মধ্যে তার মাথা কিছুটা বিগড়ায়। মাথা বিগড়ালে সে আর কাঁদে না, শুধু বিড় বিড় করে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে। ঘরের ছোট্ট জানালাটা দিয়ে যে এক চিলতে পথ দেখা যায়, সেদিকে সে তাকিয়ে থাকে সারাদিন।

তারমধ্যে একদিন সে রহমতের বউকে বলে—ভাবী, ভাইরে একটু কইবা একদিন হরিপুরের নকুল মাঝির বাড়িত যাওনের  লাইগ্যা—মাইডারে ওইহানে ফালাইয়া আইছি—আমার কইলজাডাগো ভাবী আমার কইলজাডা ফালাইয়া আইছি—। বলতে বলতে  অনেকদিন পর  ডুকরে কেঁদে ওঠে।—একটু দেইখ্যা আইত—ভাইয়ে দেখলেই আমার দেহা অইব—ভাবী কইবা একটু তারে—

ভাবী রহমতকে বলেছিল ঠিকই। কিন্তু রহমতের সেই অনুরোধ রাখতে রাখতে দিন চলে গেছে। ভাবীর মুখে একদিন সে খবর পিয়ারী  পেয়েছিল ঠিকই—কিন্তু তার পরদিনই ছিল তার বিবাহ। 

খবরটা ছিল এরকম যে, রহমতের পরিচয় পর্ব জেনে নকুল মাঝি শুধু এইটুকুই বলেছিল যে—মাইয়া তো আমার কাছে নাই, ভাই—তয় ভাবীরে কইনযে তার মাইয়া খুব ভালা আছে। ভাল মায়ের কোল পাইছে। 

মেয়ে কোথায় আছে, কার কাছে আছে, এসবের কোনো হদিস সে দেয় নি। রহমতও যতটুকু নয় ততটুকু কর্তব্যপালনব্যাতীত আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।

পিয়ারী বিয়ের আগের দিন এই খবর পাইয়া বুক থেকে পাষাণ নামিয়েছিল কিনা, না আরো কোনো সুদূরের উদ্দেশ্যে আকুলতাকে ভাসিয়ে দিয়েছিল কিনা বোঝা যায় নি। তবে সে সেই রাতে অনেক  ঘুমিয়েছিল।

 

১৪

আইচ্ছা নকুল, ঠিকই আছে—তুমি অহন একটু দেখ যে হের মায়ের খোঁজডা একটু লওন যায় কি না। তুমারে কইয়া রাহি যে মাইয়াডার দিকে তাকাইলে ওর থাইক্যা কষ্ট আমার আরও বেশি অয়। ছেরিরে তার মায়ের লগে একবার দেহা করাইতে পারতাম তয় শান্তি পাইতাম মনে।

মাইয়ার ত শাদি বিয়ারও বয়স অইতাছে—

, আমরাও ভাবতাছি—দেহি কী করণ যায়–

আইচ্ছা বৌঠাকরাইন উডি তাইলে আইজ—আপনার কথা মনে রাখবাম।

 

নকুল চলে গেল। যাওয়ার আগে সে আগের মতই বেইন্যা ভাত খেয়ে গেল। 

কোনো জায়গা থেকে যেন অতসী লক্ষ্য রাখছিল কখন নকুলকাকা উঠে যায়। নকুল কাকা বাড়ির সীমানা পার হতে না হতেই অতসী এসে তার মাকে জড়িয়ে ধরল ও টানতে টানতে ঘরে নিয়ে গেল। সুমতি হঠাৎ মেয়ের এইরকম উদয় হওয়া দেখেই বুঝতে পারল সে আড়াল থেকে লক্ষ্য রাখছিল। সুমতি বললেন—-আরে ছাড়্‌ ছাড়্‌— আমি নিজেই যাইতাছি—ধইরা নেওনের কী   অইল—

না ছাড়তাম না—তুমারে ঘরে নিয়া গিয়া আগে হুনবাম নকুল কাকার লগে কী কথা অইছে–

কী কথা আবার—আমরার অনেকদিনের চিনা মানুষ—আইছে—এই দুই চাইরডা কথা–

অতসী তার মাকে টানতে টানতে ভেতরের ঘরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসাল। জিজ্ঞেস করল—এইবার কও—

কী কইয়াম—বড়দের কথা ছুডু মাইনষের হুনতে নাই—   

ইস্‌ কী এমন বড় মাইনষের কথা কইলা যে আমি হুনতাম পারতাম না–

তর বিয়ার কথা কইছি—হুনবে হেই কথা—

আমারে বাইল দিও না কইলাম—আমি বুঝি—বিয়ার কথা তুমি নকুল কাকার লগে কইতা না—কইলে দাদাভাইয়ের লগে কইতা—আর আমার বিয়া বিয়া কর ক্যান—আমি বিয়া বইতাম না, কইছি না—তোমরারে ছাইড়া আমি কুনহানে যাইতাম না—কইয়া রাখলাম—। এই কথা কইয়া অতসী আবার তার মাকে জড়িয়ে ধরলো। সুমতি মেয়েকে আদর করতে করতে বললেন—-দেখ মাইয়া কী কয়—মাইয়া মাইনষের স্বামীর ঘর করন লাগে মা—অমন কথা কইতে নাই—

ধূর–তুমি খালি কথা ঘুরাও—আসল কথাডা কইতাছ না। এই বলে অতসী তার মায়ের কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে শুরু করলো।

আইচ্ছা আইচ্ছা কান্দিচ না–এ-তো দেহি অহনও পুলাপানের লাহান করে—চোখ মুছ—কইতাছি।

অতসী তার মায়ের আঁচল টেনে চোখ মুছলো। তারপর বড় বড় চোখ করে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল।

আমি তর হেই মায়ের খুঁজ লইতেছিলাম। অহন কুথায় আছে, কেমন আছে—তুইন একদিন জিগাইছিলে না—আমার হেই মা অহন কুথায়সেই কথা নকুলের কাছে জানতে চাইছিলাম–

নকুল কাকা কী কইলেন?

নকুল কইল সে-তো অনেকদিনের ব্যাপার— অহনকার খবর হে জানে না—তয় কইল চেষ্টা করব খুঁজ লওনের— 

শুধু এই কথা অতক্ষণ ধইরা কইলা তুমরা!

শুধু এই কথা ক্যান—মাইনষের লগে অনেকদিন পরে দেহা অইলে কত কথাই ত অয়—-

 

এইটুকু শুনে অতসীর মুখ আবার কাঁদো কাঁদো হয়ে উঠলো। সে এবার মায়ের কাছ থেকে উঠে চলে যেতে চাইল। সুমতি মেয়ের   এইসব মতিগতি খুব ভাল চেনেন। তাই তিনি অতসীর হাত ধরে আটকালেন। অতসী এবার সত্যি সত্যি কেঁদে ফেলল।

সুমতি এবার কিছুটা অসহায় বোধ করলেন। এই মেয়েকে কী বলেই বা সান্ত্বনা দেবেন তিনি। ভাবলেন এই বয়সে তার মায়ের প্রথম জীবনের কষ্টের কথা শুনলে, এই মেয়ে তো আরো ভেঙে পড়বে। শুধু বললেন—মারে তুই অমন কইরা কান্দলে যে আমার অনেক কষ্ট হয়—অমন কইরা কান্দিস না মা আমার—বড় অইতাছস—সংসারে কত রকমের সুখ দুঃখ কষ্ট আছে—সবই তুইন দেখবি  জানবি—এই বয়সে অমন কইরা কান্দে না মা—তুই কান্দলে আমার যে কত কষ্ট—  

 

১৫

গত শরতে জিন্নাহ সাহেব প্রয়াত হলেন। এই শ্রেণীর একেকজন  মানুষের মৃত্যু হলে এখনও কেন জানি ধলাবাবুর মনে সংশয় জাগে যেএই উপমহাদেশের জন্য এর ফল ভাল  না খারাপ, কোনটা ! তবে এই সকল কোনো কোনো মৃত্যুতে ভাগাভাগির মন্থন থেকে  বিষের উৎপাদন যে  অবারিত হয়ে যায়, তা বোঝা যায়। যেমন গান্ধীজির মৃত্যুর পর দুই পক্ষের দাঙ্গাবাজদেরই আনন্দ হয়েছিল। এবার জিন্নাহ সাহেবের মৃত্যুর পর কট্টর মুসলিম লিগাররাও কি খুশি হয়েছে ! 

মুশকিল হলো আমরা বরাবরই কিছু ব্যক্তিমানুষের উপর নির্ভরশীল হয়ে রয়ে  গেলাম। যুগে যুগে কিছু ব্যাক্তিমানুষ আমাদের এই  উপমহাদেশের জাতিপুঞ্জটিকে একটি সৎ পথে চালনা করার চেষ্টা করে গেছেন। আর তাঁদের জীবনকাল শেষ হলেই আমরা আবার যতটা এগিয়ে ছিলাম ঠিক ততটাই পিছিয়ে পড়তে চাইলাম। অথচ ব্যাক্তিমানুষগুলোর সঙ্গে যে নীতি আদর্শগুলোর চর্চা হচ্ছিল সেগুলোকে আমরা সেই ব্যক্তির প্রয়ানের সঙ্গে সঙ্গেই বিসর্জন দিয়ে দিই।

মনটা ভালো না। পাঞ্জাব সীমান্তের রক্ত ভেসে ভেসে বুঝি এদিকেও আবার আসতে শুরু করেছে। স্বাধীনতার গোটা ব্যাপারটাই যেন একটা অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। শান্তির কাছ থেকে যা খবর পাওয়া গেছিল তার সঙ্গে  ডাকে আসা গত কয়েকদিনের খবরের কাগজের বান্ডিল খোলার পর সেই খবর আরো বর্ধিতই হয়েছে। হত্যা , অগ্নিসংযোগ, নারীহরণ, লুটপাঠ কী নেই—তার সঙ্গে আছে কাতারে কাতারে মানুষের  র‍্যাডক্লিফের দাগানো সীমানা অতিক্রম। আসাম ত্রিপুরা পশ্চিমবঙ্গ এই তিন রাজ্যের দিকেই চলছে উদ্বাসিত  মানুষের স্রোত।  খবরে দেখলাম  নেহেরু চাইছেন না পূববাংলার সংখ্যালঘু হিন্দুরা দেশ ছাড়ুক। কিন্তু তার জন্য তাঁর সরকারের কোনো তৎপরতা নেই। তার দলের নেতারাও আগে আগে দেশ ছাড়ছে। তো এই অংশের হিন্দু সংখ্যালঘুরা কার ভরসায় থাকবে। পাকিস্তান সরকার এই বিষয়ে উদাসীন। খবরে প্রকাশ যে সরকারের প্রচ্ছন্ন মদতেও কোনো কোনো অংশে হিন্দু নির্যাতন বা বিতাড়ন অব্যাহত গতিতেই চলছে।

শান্তি গত দুইদিন দেখা করেনি। আজ এলো। এসেই এক কথা—দাদা ছুটি ত শেষ অইয়া যাইতাছে—কবে যাইবা—আর তো দেরী করণ যায় না।

হু—দেরী অইয়া যাইতাছে, না—চিন্তা করিস না—একটু গুছাইয়া নেই—তরে আমি কাইল কইতেছি কবে রওনা হওন—

তুমি কি আমরার ওই বাড়ির কাকা জেডাদের লগে কথা কইছ–

কইছিলাম—তয় তারা অহনও কিছু ভাবে নাই—এতে একটা চিন্তা হুনি মাথার মধ্যে জাগছে যে —মনে কর আমরা যদি বিনিময় কইরা চইলা যাই–তয় আমরার বাড়ি ঘরে ওইপারের অচেনা মুসলমান থাকতে থাকলে তারার কোনো অসুবিধা অইত না?

অসুবিধা ত অইবই—অচেনা মানুষজন তারা—

তয়?

একটু ভাবি দাদা—রাইতে আইয়া কইয়ামনে

ঠিক আছে—তুই অহন যা–আমার একটু হিসাব নিকাশের কাম আছে—খাতাপত্র খুইল্যা বইছি—-

ঠিক আছে দাদা কাম কর তুমি, আমি গেলাম। 

 

শান্তি চলে গেল। ধলাবাবু একমনে কাজ করে যাচ্ছে। আফজল আর বংশী গিয়েছিল বিলে, মাছ মারতে। একটু আগে বংশী মাছ নিয়ে  ফিরেছে। বর্ষা শেষের দিকে। আকাশ আজ বেশ পরিষ্কার। বৈঠকখানায় বসে কাজ করতে করতে ধলা মাঝে মাঝে সামনের  খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে। মানুষজনের যাতায়াত দেখছে। তাদের এই বৈঠকখনার বাইরের দিকেও বেশ বড় উঠোন।  তারপরে আছে পায়ে চলার রাস্তা। বর্ষাকালে পাশাপাশি গ্রামের সব মানুষজন সাধারণত এই পথই ব্যবহার করে থাকে। শুকনোর সময় আরো কিছুটা দক্ষিণের বড় রাস্তাটাই যাতায়াতের পথ হয়। কিন্তু ওইদিকে জমি নিচু, তাই বর্ষাকালে সেই পথ জলকাদায় ডুবে থাকে।

এই সময় হঠাৎ ধলাবাবুর চোখে পড়ল একজন বোরখাপরা মহিলা  সঙ্গে দুটি বাচ্চা ছেলে। সামনের রাস্তা ধরে যেতে যেতে তারা এই উঠোনে নেমে এসেছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে তাকিয়ে তারা ধীরে ধীরে বৈঠকখানার দিকেই এগুচ্ছে। ধলাবাবু তাদের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তারা বৈঠকখানার বারান্দার সামনে এসে থামল। বাইরের চড়া রোদের কারণে হয়তো তারা ভেতরে বসা ধলাবাবুকে ঠাহর করতে পারেনি। তখন ধলাবাবু উঠে এগিয়ে বারান্দার দিকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন—কাউরে খুঁজতাছুইন আফনেরা?

তখন মহিলাটি বোরখার মুখের আবরণটি সরিয়ে আস্তে আস্তে বললেন—হ, এইহানে ধলা মজুমদারের বাড়ি কুনডা ?

এইডাই, আফনে ধলা মজুমদারের বাড়ির সামনেই আছেন—আর আমি ধলা মজুমদার—বলেন কী ব্যাপার–

 

ধলা মজুমদারের বাড়ি আর সামনেই দীর্ঘদেহী স্বয়ং ধলা মজুমদারকে দেখে মহিলা কথা হারিয়ে ফেলেছেন বোঝা গেল।

ধলা মজুমদার তার কথার রেশ ধরেই বললেন—বারান্দায় উইঠ্যা আসেন—আইজ রইদ খুব কড়া—আসেন উইঠ্যা আসেন।

মহিলা একটু ইতস্তত করেও বারান্দার ছায়ায় উঠে আসলেন। বাচ্চাদুটোও উঠে পড়ল।

ধলাবাবু বললেন— এইহানে বওনের কিছু নাই—আফনেরা ঘরে আইসা এই বেঞ্চিডাতে বসেন—। ধলাবাবু ঘরে গিয়ে তার চেয়ারে বসে পড়লেন। মহিলা ও বাচ্চারা কিছুটা ইতস্তত করে ঘরে গিয়ে বেঞ্চিতে বসলো।

ধলাবাবু বংশীকে ডেকে বললেন—ইনাদের জন্য খাওয়ার জল নিয়া আয়—

তারপর মহিলার দিকে ফিরে বললেন—আফনেরার বাড়ি কোন গ্রামে

নিয়ামতপুর

, হে তো অনেকটা দূরের পথ—আইলেন কিবায় 

নাও এ কইরা আইছি

তাইলে নাও তো বোধ করি কুলবাইরার ঘাটে লাগাইছে

অইতে পারে—আমি গেরামের নাম জানি না–

আফনের লগে আর কেউ আসে নাই?

না, আমি একলাই, লগে এই ছেরা দুইডারে লইয়া আইছি।

এরমধ্যে বংশী পিতলের ঘটিতে এক ঘটি জল ও  একটি রেকাবীতে বেশ কিছু বাতাসা ও একটা গেলাস নিয়ে এল। নিয়ে এসে সব একটা টুলের উপর রাখলো। ধলাবাবু বলল—নেন জল খাইয়া নেন

ওদের সবারই পিপাসা লেগেছিল বোঝা গেল। জল খেল সবাই। বাতাসাগুলো শুধু বাচ্চাদুটো খেতে থাকল।

ধলাবাবু এবার জিজ্ঞেস করল—এবার বলেন ত আমার এখানে আফনে কী কামে আইছেন?

মহিলাকে নিরুত্তর দেখে—-

ধলাবাবু আবার জিজ্ঞেস করলেন—আফনের কি কাম না কইলে আমি বুঝবাম কেমনে—

মহিলা নিরুত্তর—

ধলাবাবু আবার জিজ্ঞেস করলেন—কোনো জমিজমার ঝামেলার ব্যাপার—কোনো চিডি পত্র লেহানোর কাম—

মহিলা নিরুত্তর—

ধলাবাবু আবার জিজ্ঞেস করলেন—আফনের বাচ্চারারে কন ত তারার বাপের নাম কওনের লাইগ্যা–

তাও নিরুত্তর।

বাচ্চারা জল বাতাসা খেয়ে এখন আর চুপ করে বসে নেই । তারা ঘর থেকে বারন্দায় যাচ্ছে আসছে, আবার বেঞ্চিতে বসছে।

কোনো উত্তর না পেয়ে ধলাবাবু তাকালেন মহিলা দিকে। খেয়াল করলেন যে মাথা নিচু করে বসে থাকা মহিলার চোখ থেকে জল গড়াচ্ছে। জল গড়িয়ে ফোঁটা ফোঁটা ঝরছে বোরখার উপরে। সেটা লক্ষ্য করে ধলাবাবু বললেন—আফনে কানতাছুইন কেরে—এইহানে আফনের কোনো অসুবিধা নাই, ভয় নাই—আফনে খুইলা কন—আফনে ত আমার নামই করলেন—এইডা আমরারই বাড়ি—অহন কী কামে আইছেন এইডা না কইলে ত খুবই মুশকিলের কথা—আফনে কি আমরার বাড়ির কোনো মহিলার লগে কথা কইবেন—বাড়ির ভিতরে যাইবাইন—না তারারে কাউরে এইহানে ডাকাইয়া আনতাম—কিছু একটা ত কন—

অনেকক্ষণ পর একটা ভেজা গলা শোনা গেল। মহিলা বললেন—আফনের মায়ের লগে একটু কথা কওন যাইব?

যাইত না কেরে, আফনে তাইলে ভেতর বাড়িতে চলেন—আইয়েন আমার লগে—। এই বলে ধলাবাবু উঠে দাঁড়াল।

 

বাড়ির ভেতরের উঠোনে দাঁড়িয়ে ধলাবাবু হাঁক দিল—মা, ও মা— কই তুমি—একটু এইদিকে আসতো।

ধলাবাবুর ভরাট উচ্চস্বর বাড়ির সব ঘর থেকেই শোনা গেল । অসময়ে ধলাবাবুর ডাকাডাকিতে সুমতি বেরোলেন বড় ঘর থেকেবাসন্তী বেরোল রান্নাঘর থেকে। উভয়েই দেখল উঠোনে দাঁড়িয়ে বোরখাপরা একজন মহিলা সঙ্গে দুটো বাচ্চা ও ধলাবাবু। সকলেই অবাক। সুমতিই প্রথম বলল—এই তুমরা আগে বারন্দায় উইঠ্যা আস গো—এই ভাদ্রমাইস্যা রইদ বড় চড়া—উইঠ্যা আস—তারপর সমাচার হুনি । 

ধলাবাবু মায়ের আহবান পেয়ে মহিলা ও বাচ্চাদুটিকে বারন্দা পর্যন্ত  এগিয়ে দিয়ে ফিরে এল বৈঠকখানায়। অর্ধসমাপ্ত কাজ নিয়ে সে আবার ডুবে গেল। মাঝে একবার শুধু বংশীকে ডাকাডাকি করে তামাক আনিয়ে খেল। কাজে বসলে সময়জ্ঞান থাকে না। হিসেব নিকেশের পর ধলাবাবু বসলো কয়েকটা চিঠি লেখার জন্য। দোয়াতের কালি শুকিয়ে যাওয়াতে তাতে খানিক জল ঢেলে কাজ চলল। বংশী মৃদু বকা খেল। দোয়াতের মুখ আলগা থাকার জন্য। চিঠিগুলো লেখা হচ্ছে একটা দিদি রাধিকা ও জামাইবাবুকে উদ্দেশ্য করে। আরেকটা লেখা হচ্ছে কলকাতার দমদমে থাকা পিসিমার উদ্দেশ্যে ও আরেকটা লেখা হচ্ছে ঢাকায় থাকা ধলাবাবুর খুব ঘনিষ্ট বন্ধু সিদ্দিকের উদ্দেশ্যে। চিঠি লিখতে অনেক সময় লাগছে।

এরমধ্যেই একবার বাড়ির কাজের মেয়ে মালতী এসে দাদাবাবুকে স্নান করার তাগাদা দিয়ে গেল। উল্টে ধলাবাবু মালতীর কাছে এই অসময়ে চা চেয়ে বসল।

কিছুক্ষণ পর বাসন্তী চা নিয়ে এসে একচোট  বকাঝকা দিল। বকা শুনতে শুনতে ধলাবাবু বাসন্তীর মুখের দিকে চেয়ে দেখল  বাসন্তীর মুখ চোখ লাল। ভাবলো বুঝি গরমে এরকম হয়েছে। কিন্তু যাওয়ার আগে বাসন্তী বলে গেল—তুমার আইজেই এত কাম পড়ল যে একবার বাড়ির ভিতরে যাইতে পারলা না—একজন মহিলারে যে মায়ের কাছে দিয়া আইসা পড়ছ, জান হে কেডা—কারে দিয়া আইছ—?

ধলাবাবু বোধহয় কাজের চাপে মহিলার কথা ভুলেই ছিল এতক্ষণ। বাসন্তীর কথায় হুস ফিরল। জিজ্ঞেস করল—কেডা?

অহন আমি কইতাম পারতাম না—আমার অনেক কাম—বাড়ির ভিতরে আস জানতে পারবা।

ধলাবাবু বংশীকে ডেকে কাগজপত্রগুলো গুছিয়ে বান্ডিল করতে বলল। খাম তিনটা নিয়ে ঠিকানা লিখল। তাতে চিঠিগুলো ভরে রেখে দিলেন। বংশীর আঠার বাটি নিয়ে এসে খামগুলোতে আঠা লাগিয়ে বন্ধ করে দিল। বিকেলের দিকে বারহাট্টা পোস্ট অফিসে গিয়ে চিঠিগুলো ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ে আসতে হবে তার।

এরপর ধলাবাবু কাগজপত্রের বান্ডিল নিয়ে বাড়ির ভেতরের দিকে চলে গেলেন।

 

 

*চলবে…

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

হুমায়ূন আহমেদের কবিতা-চমক | সৌমিত্র শেখর

Sun Nov 29 , 2020
হুমায়ূন আহমেদের কবিতা-চমক | সৌমিত্র শেখর 🌱 হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮–২০১২) যে কবিতা লিখতেন, তাঁর অনুরাগী অনেক পাঠক তা জানেন না। এর কারণ, তিনি সাধারণত স্বীকারই করতে চাইতেন না, প্রকাশ্যে– তাঁর কবিতার কথা। কিন্তু তিনি কবিতা লিখতেন, এমন স্বীকারোক্তি আছে তাঁরই এককালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু শাহরিয়ার কবিরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। তিনি সে সাক্ষাৎকারে, […]
Shares