হুমায়ূন আহমেদের কবিতা-চমক | সৌমিত্র শেখর

হুমায়ূন আহমেদের কবিতা-চমক | সৌমিত্র শেখর

🌱

হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮–২০১২) যে কবিতা লিখতেন, তাঁর অনুরাগী অনেক পাঠক তা জানেন না। এর কারণ, তিনি সাধারণত স্বীকারই করতে চাইতেন না, প্রকাশ্যে– তাঁর কবিতার কথা। কিন্তু তিনি কবিতা লিখতেন, এমন স্বীকারোক্তি আছে তাঁরই এককালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু শাহরিয়ার কবিরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে। তিনি সে সাক্ষাৎকারে, ‘আপনি লেখালেখি শুরু করলেন কিভাবে’– এমন এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন: ‘সব চেয়ে আরলিয়েস্ট লেখার কথা যদি বলেন, সেটা তো স্কুল ম্যাগাজিনে লেখা দিতে হয়– গল্প কবিতা কোনটাই তখন বাদ দেয়া হয় নি।’ (শাহরিয়ার কবির, অন্তরঙ্গ হুমায়ূন আহমেদ, ১৯৯২, ঢাকা) হুমায়ূন আহমেদের গল্প বা কথাসাহিত্য লেখার সূচনা যদি সেই স্কুলজীবন থেকে হয়ে থাকে, তাহলে কবিতার সূচনাও তখন থেকেই। ১৯৭০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন। অর্থাৎ তাঁর শিক্ষাজীবনের সোনালি সময় কেটেছে ষাটের দশকে, এবং অনুমান করি– স্কুল বা কলেজ ম্যাগাজিনের বাইরেও তিনি হয়তো কবিতা লিখে থাকবেন। অনেকেই তাঁকে শুধু এ কারণে ‘কবি’ বলতে হয়তো রাজি হবেন না। তারা বলবেন, কবি হওয়ার জন্য কাব্যগ্রন্থ চাই; হুমায়ূনের কোনো কাব্যগ্রন্থ নেই। এ সব তর্কে আমি জড়াতে চাই না। হুমায়ূন আহমেদ নিজে যেখানে তাঁর কবিতা লেখার ব্যাপারে এতোটা নীরব, সেখানে ‘কে হায় তাঁকে কবির আসন দেবে, কার পড়েছে দায়!’ কিন্তু আমি যখন হুমায়ূন আহমেদের ‘গৃহত্যাগী জোছনা’ নামের কবিতার কার্ড-সংকলন হাতে পাই, একে কাব্যগ্রন্থের সাথে তুলনা না করে আমার উপায় থাকে না এবং হুমায়ূন আহমেদকে ‘কবি’ না বলে পারি না। আমি অবশ্য শুধু এ কারণে হুমায়ূন আহমেদকে ‘কবি’ বলছি তা নয়। তাঁর উপন্যাসের যে ভাষা, সে ভাষাতে কাব্য-আবেশ যথেষ্ট, কবি না হলে এমন ভাষায় গদ্য লেখা যায় না। তাঁর উপন্যাসে যে স্বরচিত কবিতার ব্যবহার, নাটক বা সিনেমায় যে প্রচুর গান লেখা, এ সবই হুমায়ূন আহমেদের কাব্যশক্তির পরিচায়ক নিঃসন্দেহে। আমার বিবেচনায় ‘গৃহত্যাগী জোছনা’ কার্ড-সংকলনটি একটি গ্রন্থের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করে আছে। এটি প্রথম প্রকাশ হয় ১৯৯৬ সালের এপ্রিলে; প্রকাশক কাকলী প্রকাশনী, ঢাকা। প্রচ্ছদশিল্পী সমর মজুমদার। মূল্য ৫০ টাকা। এর স্বত্ব গুলতেকিন আহমেদের।

জ্যোৎস্না হুমায়ূন আহমেদের খুব প্রিয় অনুষঙ্গ। রবীন্দ্রনাথের ‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে’– গানটি তাঁর একটি টিভি-সিরিয়ালের ভাবনা-সঙ্গীতে (থিম-সঙ্-এ) পরিণত হয়েছিল। নিজে অবশ্য তিনি ‘জ্যোৎস্না’ শব্দটির বদলে ‘জোছনা’ লিখতেই ভালোবাসেন। তাঁর উপন্যাসের নামকরণে ‘জোছনা’ এসেছে, এই কবিতা-কার্ডের নামেও এসেছে ‘জোছনা’। ‘জ্যোৎস্না’ আর ‘জোছনা’ আপাতত এক মনে হলেও সংস্কৃত শব্দটি যখন তদ্ভব হয়ে যায় তখন যেন সেখানে যুক্ত এক অন্য রকম নরম সৌন্দর্য! ‘জ্যোৎস্না’য় যেমন আলোর তীব্রতা, ‘জোছনা’য় তেমনি আলোর স্নিগ্ধতা। হুমায়ূন আহমেদ বোধ করি সেই স্নিগ্ধতার অভিলাষী। তিনি জোছনার মধ্যেও নানা মাত্রা অনুসন্ধান করেন, জোছনা তাঁকে আহ্বান করে নানা সুর ও স্বরে। ‘গৃহত্যাগী জোছনা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন:
‘প্রতিপূর্ণিমার মধ্যরাতে একবার আকাশের দিকে তাকাই
গৃহত্যাগী হবার মত জোছনা কি উঠেছে?’
এর পরই তিনি বলেছেন: ‘বালিকা ভুলানো জোছনা নয়’, ‘নবদম্পতির জোছনাও নয়’, ‘কাজলাদিদির স্যাঁতস্যাঁতে জোছনা নয়’, ‘কবির জোছনা নয়’– তবে কী? বলেছেন:
‘আমি সিদ্ধার্থের মত গৃহত্যাগী জোছনার জন্যে বসে আছি।
যে জোছনা দেখামাত্র গৃহের সমস্ত দরজা খুলে যাবে–
ঘরের ভেতর ঢুকে পড়বে বিস্তৃত প্রান্তর।
প্রান্তরে হাঁটব, হাঁটব আর হাঁটব–
পূর্ণিমার চাঁদ স্থির হয়ে থাকবে মধ্য আকাশে।
চারদিকে থেকে বিবিধ কণ্ঠ ডাকবে– আয় আয় আয়।’
হুমায়ূন আহমেদ সত্যি দরজা খুলে-যাওয়া জোছনার প্রত্যাশী। তিনি যখন অন্ধকার চান তখন সে অন্ধকারও গভীর, যে অন্ধকার আলো জন্মদানের প্রসববেদনায় কাতর: ‘তাকে যেতে হবে আরো গভীর অন্ধকারে। / যে অন্ধকার– আলোর জন্মদাত্রী।’ (–কাচপোকা) অর্থাৎ তাঁর অন্ধকারও এক অর্থে আলো। এই আলোর পথযাত্রী হুমায়ূন আহমেদের কল্পনাশক্তি অসাধারণ! তিনি লিফ্টকে তুলনা করেছেন লোহার তৈরি বাসরঘরের সঙ্গে– নিজেকে ভেবেছেন লখিন্দর:
‘তার সঙ্গে আমার দেখা কপাটহীন একটা অস্থির ঘরে।
ঘরটা শুধু ওঠে আর নামে।
আমি তাকে বলতে গেলাম– আচ্ছা শুনুন, আপনার কি মনে হচ্ছে না
এই ঘরটা আসলে আমাদের বাসর ঘর?’ (–বাসর)
বেহুলা-লখিন্দরের লোকপুরাণকে হুমায়ূন আহমেদ নিয়ে এসেছেন আধুনিক যন্ত্রের সংস্পর্শে এবং মিশিয়ে দিয়েছেন নাগরিক জীবনের সাথে। লোককথা ও লোকপুরাণ হুমায়ূন আহমেদের খুবই আগ্রহের বিষয়, এখানেও সে প্রমাণ আছে। লোককথা ও লোকপুরাণের সঙ্গে কথ্যশব্দ ও আঞ্চলিক উচ্চারণ তাঁর প্রিয়। এই প্রিয়তার প্রমাণ আছে কবিতাতেও:
‘তিনি শায়িত ছিলেন গাঢ় কব্বরে
যার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বেঁধে দেয়া,
গভীরতা নয়।
কব্বরে শুয়ে তাঁর হাত কাঁপে পা কাঁপে
গভীর বিস্ময়বোধ হয়।
মনে জাগে নানা সংশয়।
মৃত্যু তো এসে গেছে, শুয়ে আছে পাশে
তবু কেন কাটে না এ বেহুদা সংশয়?’ (–কব্বর)
পুরো কবিতাটাই এ-ই। এখানে কবরের গভীরতা এবং সংশয়ের বহুবিচিত্রতা নিয়ে প্রশ্ন করে হুমায়ূন আহমেদ পাঠকের প্রচলিত বোধকে জিজ্ঞাসার জালে জড়িয়েছেন নিশ্চয়, কিন্তু এই কবিতাটি যে দুটো শব্দের উপর দাঁড়িয়ে আছে তা হলো ‘কব্বর’ ও ‘বেহুদা’। কথ্যশব্দের এমন সাবলীল ব্যবহারের ফলেই বোধ করি শব্দ দুটো কবিতার মুখ্যশব্দে পরিণত হয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদ চমক সৃষ্টি করার মানুষ। হঠাৎ করেই তিনি যদি একদিন তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করে চমকে দিতেন সবাইকে, অবাক হওয়া কিছু ছিল না। সেটা হলে খুশিই হতেন সবাই। কারণ তাঁর যে সামান্য কিছু কবিতা আমি পড়েছি এবং নাটক-সিনেমায় তাঁর লেখা গান শুনেছি তাতে আমার মনে হয়, ভাবনার সুতোয় শব্দের মণি গাঁথতে তিনি খুবই পারতেন। শুধু প্রয়োজন ছিল তাঁর ইচ্ছে আর আয়োজনের।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

বাংলার শত্রু বাঙালির ভেতরে | সৌমিত্র শেখর

Sat Feb 20 , 2021
বাংলার শত্রু বাঙালির ভেতরে | সৌমিত্র শেখর 🌱 বাংলা কাব্যের তুলনায় গদ্যের বয়স কম। অবশ্য সারা পৃথিবীর সব ভাষাতেই গদ্যের আয়োজনটা পরে হয়েছে। আমাদের গদ্য প্রতিষ্ঠার সূচনাতে এর রূপ ও রীতি নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিভক্তি ও সাহিত্যিক লাঠালাঠি হয়ে গিয়েছিল। একপক্ষ বাংলা গদ্যকে সংস্কৃতের অবোধ বালকে রূপান্তরিত করার জন্য, অন্যপক্ষ […]
Shares