কবি শামীম রেজা || দ্যুতিময় ৫০ || গদ্য: মুহম্মদ ইমদাদ 🔸সরোজ মোস্তফা

শামীম রেজার কবিতা
মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবনকে দাঁড় করিয়ে দেবার
একটা চোরাগুপ্তা অথচ সোনালি ইস্তেহার

🌱 মুহম্মদ ইমদাদ

‘…প্রতিভা-
প্রণয়ী দোয়েলা আমার, কুষ্ঠরোগের ছোঁয়াচে ঘায়ে পঙ্গু
কইরাছে তোমায়, ক্ষমতার দুপুরে মক্ষিকার শরীরের
মত বিষাক্ত করেছে ভোগে; তারপরও অন্তহীন ধৈর্যে
জাইগা ওঠো নতুন স্নান শ্যাষে প্রতিমার বেশে, যে-
পাড়ে আমি দাঁড়ায়ে রাত্রি করেছি পান, সেইপাড়ে, সুবর্ণ
নদীটার ধারে।’
কবি শামীম রেজার ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’ কাব্যগ্রন্থের এই আশ্চর্য স্তবকটি কেন আমরা গ্রহণ করালাম তাঁর কবিতা নিয়ে একটু আলোচনার আগে তা বুঝতে হলে আমাদের নিচের কথাগুলো বলতে হবে।
সান্দ্র বতিচেল্লির ‘ভেনাস’ জীবনানন্দের কবিতায়— ‘ব্যবহৃত—ব্যবহৃত হ’য়ে শুয়োরের মাংস হ’য়ে যায়’।
রিলকের কবিতায় পরিণত হয় একটা মরা শুশুকে আর বোদলেয়ার ভেনাসের দ্বীপে, সিথেরায় গিয়ে দেখেন একটা ফাঁসির কাষ্ঠ আর তাতে ঝুলে আছে তারই মৃতদেহ।
এরকম হয়/হলো কেন?
অর্থাৎ সুন্দরের পতন ঘটে গেছে পৃথিবীতে। মানবিক-প্রাকৃতিক বিপর্যয় গ্রাস করেছে পুরো গ্রহকে। আর তা টের পেয়ে গেছেন পৃথিবীর কবি ও শিল্পীরা।
আধুনিক কবিতার মনন তাই বিষাদগ্রস্ত। যেন শাদা আকন্দফুল ফোটা এক গোরস্তান। তাই বোদলেয়ারের হৃদয় পৃথিবীর কোথাও খুঁজে পায় না তার বসবাসের স্থান। সে বাস করতে চায় পৃথিবীর বাইরে কোথাও। সে চিৎকার করে ওঠে আর বলে, ‘যেকোনোখানে, এই পৃথিবীর বাইরে যেকোনোখানে।’ পুরো গ্লোবের কোনো রাষ্ট্র/নগর নেই তার বসবাসের যোগ্য। বোদলেয়ারে তাই মনে হয়, পৃথিবী একটা হাসপাতাল। এলিয়ট দেখেন, আকাশে সন্ধ্যা শুয়ে আছে টেবিলে শায়িত অচেতন রোগীর মতন। কবিতার অন্তর বেদনায় ভরে ওঠে। জননীর মতো দুঃখই হয়ে ওঠে আধুনিক কবিতার প্রধান বিষয়। সুন্দরের আরাধনার অবসর পায় না সে। ভেনাসকে আঁকার বদলে আমাদের আঁকতে হবে গোয়ের্নিকা।
কিন্তু শামীম রেজা, ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণ নগরে’, সম্পূর্ণ নতুন এক লিখন ও ভাষা ভঙ্গিমায় এমন এক ভেনাস/উর্বশীকে আঁকলেন যে কি না—
‘অন্তহীন ধৈর্যে/জাইগা (ওঠে) ওঠো নতুন স্নান শ্যাষে প্রতিমার বেশে’ ।
যেকোনো পতন/বিপর্যয়/বিনাশ/ধ্বংসের সামনে দাঁড়িয়ে শামীম রেজা রচনা করলেন একটি ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি, জেগে ওঠার গান। তাঁর ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণ নগরে’র প্রতিটি পৃষ্ঠায় তিনি বর্ণনা করেছেন দুঃখ/দুঃস্বপ্নের ছবি আর ছবির পরেই ভোরের পায়ের আওয়াজ অথবা ভোরই। তাঁর কবিতা পড়তে পড়তে আমাদের মনে পড়ে রিলকের সেই অলৌকিক পঙক্তি, ‘কোনো বিশ্বাস নেই, নেই প্রয়োজন। উঠে দাঁড়াবার নামই অস্তিত্ব।’ তিনি আমাদের পায়ের তলায় মাটিকে অনুভব করতে দেন। আমরা দাঁড়াই। মৃত্যুর বিরুদ্ধে। স্বপ্নের পক্ষে।
.
তাঁর কবিতা পড়ে আমরা জেনে উঠি—
করু-বর্ষের আসা-যাওয়ার মাঝেও নদীর জন্ম হয়;
অথবা, আগুন-জলের ভিতরও মৃত্যু আসে না;
অথবা, শুঁড়িখানার ঠিকানা-হারানো বালক যে নিজেরে কোনো অজানা খাঁচায় খুঁজে মরে, তারও মনের অন্দরে শুকতারার মত বেঁধে থাকে প্রিয় কোনো নারী বা দেশ;
অথবা, মৃত্যুর শীতল শিস বয়ে যাচ্ছে যার ভিতরে সেও খুব চিনতে পারে তার প্রিয়তমার আত্মার জোছনা;
অথবা, পাখিদের কান্নায় যখন থেমে যায় দোলনচাঁপার গন্ধ, তখনও ‘রাজহাঁসের কলরবে আউশের ক্ষেত রূপসাগরের পাড়ে/অপরূপ দৃশ্য হয়া নামে দোয়েলা নদীর ধারে।
.
শামীম রেজা এই দীর্ঘকবিতার প্রতিটি খণ্ডে রচনা করেছেন রাত্তির পিঠে দিনের ছবি। দুঃখের পিঠে স্বপ্নের। আর এই মর্মে, তাঁর কবিতার মন ও মনন দুইই অভিনব বাংলা কবিতায়। আর কণ্ঠস্বর? তাঁরই। নিজের। ফলে খুব সহজেই, খুব আন্তরিকভাবেই আমরা বন্ধুদের ডাকতে পারি তার কবিতার স্বপ্নের দিকে, বলতে পারি, চলো বন্ধু, পইড়া ফেলি শামীম রেজার আশ্চর্য কবিতাগুলি!
.
‘…চারিদিকে অনন্ত কনভয়, করু-বর্ষ আসে করু-
বর্ষ যায়, তারপরও তোমার মাটির টানে রাত্রি আর দিনে
মৃতদের ঘুম ভাইঙা নতুন নতুন নদীর জন্ম হয়।’
.
…একবার
কমলদহে প্রিয়তমার শরীর দাহ হলে কমলারঙের আগুন
ছড়ায়েছিল পূর্ণতোয়ার জলে; আর আমি সেইদিন
থেইকা সাঁতার কাটছি আগুন-জলের ভিতর, তাতেও
মৃত্যু আসে না। এমন পৃথিবীতে ঘুম আসে না-মৃত্যু
আসে না।
.
যখন রাত্তির নাইমা আসে মনের গভীরে আমার,
শুকতারা গাঁইথা থাকে আকাশের ঘরে, তুমিও তেমনি
বাঁইধা থাকো মনের অন্দরে; আর আমি শুঁড়িখানার
ঠিকানা-হারানো বালক, নিজেরে খুঁইজা মরি কোনো এক
অজানা খাঁচায়।…
.
…মৃত্যুর শীতল শিস বইয়া যায় ভিতরে আমার।
… … …
…আর সবাই যখন মৃত দ্বীপ ভেবে রাইখা
যায় প্রাচীন পৃথিবীর অপার শাখায়, তখন আমি চিনতে
পারি প্রিয়তমা দোয়েলারে, আত্মার জোছনায় জ্বইলা
ওঠে সে, বেহুলার চোখে সুবর্ণ নদীটার ধারে।
.
…চারিদিকে পাখিদের কান্নায়
দোলনচাঁপার কামুক ঘ্রাণ বন্ধ হইয়া আসে; তারপরও
রাজহাঁসের কলরবে আউশের ক্ষেত রূপসাগরের পাড়ে
অপরূপ দৃশ্য হয়া নামে দোয়েলা নদীর ধারে।
.
উদ্ধৃতি বাড়িয়ে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটানোর মানেই হয় না। কারণ, এই কাব্যগ্রন্থ ইতোমধ্যে হাজার হাজার পাঠকের অন্তরে ঠাঁই করে নিয়েছে। শুধু ছোট্ট করে বলি, পুরো কবিতাটিই যেন মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবনকে দাঁড় করিয়ে দেবার একটি চোরাগুপ্তা অথচ সোনালি ইস্তেহার।
এই সোনালি ইস্তেহারের রচয়িতা, কবি শামীম রেজা ৫০তম জন্মদিন পালন হচ্ছে। এই সুযোগে বলি,
কবি শামীম রেজা পৃথিবীর সেই আশ্চর্য বস্তু যাকে আমরা ফুল বলে চিনি। কারণ ফুল ফোটামাত্র যাকে কাছে পায় মুহূর্তে তারই বয়সী হয়ে যায়। যে কারণে ফুলের কাছে সবাই যেতে পারে। ফুলের কাছে যেতে ভয় পায় না কেউ। ফুল সবাইকেই তার সৌন্দর্য এবং সুগন্ধি দিয়ে যায় অকাতরে আর বিমোহিত করে। শামীম রেজা সেই ফুলেরই যেন সহোদর ফুলই।
.
৫০তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা প্রিয় শামীম ভাই।
.
আপনার শতায়ু কামনা করি।

🏵️🏵️🏵️🏵️🏵️🏵️🏵️🏵️🏵️

 

বাংলা কবিতার মূলধারাতে আস্থা রেখেছেন কবি শামীম রেজা

🌱সরোজ মোস্তফা

এমন কবিতাও আছে, যে-কবিতা পড়লে মনে হবে লেখাটিতে একটি জাতির স্বপ্ন, বিশ্বাস এবং ভৌগোলিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকারকেই বহন করছেন কবি। লেখাটিতে নিজের মাটির প্রাকৃত ধারণাকেই ঢেলে দিয়েছেন কবি। মনে হবে আপন ভাষার ঐতিহ্যিক মাধুর্য নিয়ে মাটির টাট্কা ঘ্রাণে কবিতাটি এই মাত্র ভূমিষ্ট হয়েছে। মনে হবে আত্মভাষার নিজস্বতায় উপনীত হয়ে কবিতাটিতে কদমে কদমে লালিত হয়েছে পৈত্রিক ভাবের ঘনত্ব। জীবন পরিধি আর অভিজ্ঞতার পরিসরে সেই কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে জেগে উঠেছে কবির আত্মভাষা। আত্মভাষা ছাড়া নিজের কবিতা লেখা যায় না। কবিতা তো আকাশ থেকে নামে না। মাটিতে দাঁড়িতে কবিকে লিখতে হয় মাটির রাধার কথা। কবিতা তো, অদৃশ্যের সঙ্গে দৃশ্যের সংলাপ। নিজের জায়গা না বুঝলে খাতায় নামে না নিজের কবিতা । নিজের সুরেই স্পষ্ট হয় নিজের অশথ-বটের ছায়া। নিজের সুরেই স্পষ্ট হয় জগৎ-পরিচয়। নদীর সাথে দরদী না হয়ে; জমিনের পবিত্র হিজলের ছায়াকে না বুঝে কবিতা লেখা যায় না। সমকালীন বাংলা কবিতায় শামীম রেজার কবিতায় বিভাসিত হয়েছে প্রাকৃত জনের নির্জন জীবন ধারা। আপন দেশের গ-িতে অবগাহন করতে করতে কবিতার প্রসারণ ভূমিতে কবি সৃজন করেছেন বাংলা কবিতার নিজস্ব কাব্যকলা ও রোমান্টিক রেণু।

আমার মনে হয় বাংলা কবিতায় তিনি মাইনর পোয়েট কিংবা মেজর পোয়েট হতে চাননি। নিজের লেখার অভিমুখী হয়ে বাংলা কবিতাই লিখতে চেয়েছেন। বিশ্বভাবনার অলীক আয়োজনে স্বতন্ত্র স্বরের প্রত্যাশী না হয়ে নিজের দেশের কথায় অবতীর্ণ হতে হতে জনগ্রাহী এবং জনসংস্কৃতির কবিতাই লিখেছেন। কবিতার নির্জন প্রার্থনায় নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভূচিত্রই তাঁর অনুসঙ্গ। কবিতার অক্ষরগুলোতে, ভাষায় নির্মিত জীবন ধ্বনিতে উঠে এসেছে ভূমিপুত্রদের যাপিত জীবনের নিঃশ্বাস। কবিতায় মায়পথ কিংবা অধিমানসের কারবার থাকেই। কিন্তু দেশীয়তার বর্ণগন্ধ কিংবা পথরেখা আভাসিত না হলে সে কবিতায় মৌলিকত্ব কিংবা আন্তর্জাতিকতাও স্পষ্ট হয় না। জীবধর্মে মানুষ সহজাত; সেই সহজাত ধর্মে প্রত্যেক জীবনের একটা ঐকতান আছে; সেই ঐকতানে ভূমির কবিতাও আন্তর্জাতিক। 

কবি জন্মেছেন বাংলা কবিতার অমর নদী ধানসিঁড়ির জলধারা বিধৌত সাউদপুর গ্রামে। দক্ষিণবাংলার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতিই তাঁর কবিত্বের প্রেরণা ও উৎস। দক্ষিণবঙ্গীয় কিসসা-কাহিনি, ছেলে ভুলানো ছড়া কিংবা পরানকথার ঘুমপাড়ানিয়া ভাষায় বয়ানে বয়ানে কবি বাংলা কবিতার লিরিকাল শক্তিতেই আস্থা রেখেছেন। কবিতার ধ্যান ও পরিচর্যায় নদী তীরবর্তী শোষিত, বি ত, নির্যাতিত মানুষের অত্যাচার ও দুঃখের কাহিনিকেই ধারণ করেছেন। ধারণ করেছেন তাদের স্বপ্ন, প্রেম, টুকরো টুকরো ব্যর্থতা ও আশা-নিরাশার সংলাপ।

শামীম রেজার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পাথরচিত্রে নদীকথা’। গ্রন্থের নামের ভিতরেই কবি সমর্পন করেছেন কবিধর্ম আর কাব্যধারার সাধনকথা। এই শব্দবন্ধেই স্পষ্ট হয়েছে আত্মদীক্ষার অপূর্ব বীক্ষণ। আভিজাত্যের দ্যোতনা পেরিয়ে এ যেন লোকায়ত জীবনের গূঢ় উচ্চারণ। একটা কবিতায় অরুণ মিত্র বলেছেন ‘পাথরগুলো খুঁটিয়ে দেখি/ যদি কোন ঝর্ণার ছোপ কোথাও লেগে থাকে’। কালের পাথরে যে জনপদ-মানুষের জীবনাচার ও নদীকথা লেগে থাকে তারই বাস্তবিক বয়ান এই গ্রন্থ। পাথর যেন সময়ের প্রতীক; যার পৃষ্টায় পৃষ্টায় স্পষ্ট হয়ে আছে জীবনের পরিসর। যেন ইতিহাসের পৃষ্টায় পৈত্রিক ক্ষরণ। ক্ষরণের এই গানই গীতল ধ্বনিতে উচ্চারিত হয়েছে বাংলার নিজস্ব রোমান্টিকতায়।

 

দুই/

শামীম রেজার কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয় জীবনের সাথে জীবনের, প্রান্তিক সুরের সাথে চিরায়ত বোধ ও সংস্কৃতির একটা সেতুপথ স্থাপিত হয়েছে। চিরসুন্দর একটা বয়ানিক ভাষায় সময়কে ধারণ করে মানুষ ও মানুষের ইতিহাসের প্রতি সহমর্মিতা সৃষ্টিই হল কবির কবিতার মূল লক্ষ্য। এই আত্মদর্শনে সমর্পিত হয়ে ‘পরানী ও মথুরার মাঠ’ কবিতায় কবি স্বচ্ছন্দে বলে যান যুবক কুমারের চিরায়ত প্রেমগাঁথা। ওপাড়ার মথুরার মাঠে প্রেম তার নির্জনে ফল্গুধারা;  এ পাড়ায় বসে যুবককুমার তাই রাধার মূর্তি গড়ে। এপাড়ার-ওপাড়ার প্রেমের এই বাস্তবিক আখ্যানকেই লিখেছেন কবি। বৈষ্ণব কবিতা থেকে মৈমনসিংহগীতিকা হয়ে বাংলা কবিতার পুষ্পরেণু ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’ কিংবা রূপসী বাংলার অমৃত জগতের উত্তরাধিকারকেই বহন করেছেন কবি। সংস্কৃতির গহীন থেকে উঠে এসেছে কবির পংক্তিমালা। ‘পাথরচিত্রে নদীকথা’ কাব্যগ্রন্থের ‘পরানী ও মথুরার মাঠ’ কবিতাটি পড়লেই বুঝা যায় কবির কাব্যভাষার উৎস এবং ক্রমবিকাশমান ধারা।

চুলের কাজল দেহ বেয়ে মধ্যরাতে নামে

ও পাড়ার কুমারীরা চোখ বোঁজে

                             অলস আঁধার

মায়াময় বাঁশরিতে হিমায়িত ঘুম আনে

ও পরানি মথুরার মাঠে বসে তুমি ভাবছো

পামরী লেগেছে আমার বীজধানে

                               সর্পিল সময়

শুকনো মাল লতা চেয়ে আছে বর্ষার আশায়

 

শেষরাতে শাঁখাভাঙা গোঙানিতে বধূ

ফিরে পেল নাগরের পাখিসুর

সর্পিনী মেঘ

এভাবে ফেলেছে গিলে চিরচেনা চাঁদের শরীর

 

ও পরানী দেখেছো কি? মথুরার মাঠে বসে তুমি নির্জন 

সাঁকোর শরীর এলিয়ে আমি 

কলমি শাবক

কিভাবে ভেসে আছি নদীজলে, অবলা অঘন

 

সখী আমার অন্যের বধূ…. চারদিকে তার ঘর

কানে বাঁধে শাঁকধ্বনি 

                        বায়ুসন্তরণ

 

কে যেন করেছে খেলা আমি যে তার অবহেলা

আমি তার ফেলে আসা বেলা

 

ও পরানী বলে দাও তুমি, আমি কার নির্ঝর

আমি কার পুতুল কোথায় আমার কাদামাখা ঘর

(পরানী ও মথুরার মাঠ; পাথরচিত্রে নদীকথা)

 

এই কবিতার প্রেম নিসর্গে বাংলাদেশকেই খুঁজে পাই। এই কবিতায় পরাবাস্তবের চর্চা নেই, নেই যুদ্ধোত্তর ক্লান্ত সমাজের অবিশ্বাস, নেই প্রগতিবাদের ধোঁয়ায় নাগরিক সমাজের তীর্যক আস্ফালন। প্রেমে ও শরীরে এক হলেও র্ধাা ও ম্যাডোনাকে এক করার কিছু নেই; প্রেমে-আবেদনে-নিবেদনে গান ও গায়কীতে তারা ভিন্ন ভিন্ন। দেশ ও মাটির লাবণ্যে রূপে ও দৈহিক গড়নেও তারা ভিন্ন ভিন্ন; লৌকিক স্বর ও নির্জনতায়, সংহত চরণে শামীম রেজার কবিতায় এভাবেই উপস্থিত হয়েছে প্রেম ও বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বাস্তবতা।

 

তিন/

জীবনের মতো কবিতাতেও কবির প্রমোশন হয়। বলতে পারি, সময়কে অবগাহনের ভেতরেই জেগে উঠে কবির নীলনলিনী। মানে ধ্যানের জগৎটা, ভাষা ও বোধের জগৎটা অনন্ত মগ্নতায় হৃৎকলমের নিবেদনে স্বচ্ছন্দেই প্রকাশিত হয়। যে-কোন প্রধান কবির সারাজীবনের রচনা সম্ভারের দিকে তাকালে সহজেই অনুভব করা যায় যে খুব ধীরে ধীরে কিন্তু মগ্ন-সচেতনতায় গড়ে উঠেছে তাঁর নিবিষ্ট কাব্যধ্যান ও কাব্যভাষা। শামীম রেজার সব কবিতা পড়ে ফেললে দেখা যাবে বাংলা কবিতার প্রবহমান ঐতিহ্যিক উত্তরাধিকারকে ধারণ করে কবি নতুন সময়ের কবিতা লিখছেন।

সময়ের কবিতা বলে আলাদা কিছু-কি আছে! আছে, কবি সময়ের একটা সেনসিটিভিটকে ধারণ করে। সময় কিংবা শাসক একটা কুহক তৈরি করে মানুষকে দাবিয়ে রাখে। কবি সময় কিংবা শাসকের বিপরীতে একটা সত্য বহন করে। কবির চেনানো পথে সত্যের আলোয় আলোকিত হয়ে মানুষ বলে, ‘ভাবছি, ঘুরে দাঁড়ানোই ভালো’। মানুষ তাই ঘুরে দাঁড়ায়। ইতিহাস তৈরি করে। কবির কবিতায় তাই ইতিহাসের অশ্রু ও অক্ষর মাখানো থাকে। মাটিতেই লেগে থাকে সময়ের রক্ত ও দুঃখের ইতিহাস। ‘মৃতদের পাঁজরের দাঁড়টানা বাতাসে কীর্তনীয়া নদী কীর্তনখোলায় ওঠে উত্তাল ঢেউ’ (কীর্তনীয়া নদী কীর্তনখোলা)। ‘চন্দ্রদ্বীপের পান্থপুরাণ’ কবিতার ‘ক’ অংশের নামকরণ সরাসরি ‘ইতিহাস বৃক্ষ: এক’ ও ‘ইতিহাস বৃক্ষ: দুই’। সে ইতিহাসে রয়েছে রক্তদানের গরিমা। এই রক্তদান শাসকের অত্যাচারে, এই রক্তদান ক্রীতদাস আহরণকারী জলদস্যুদের অত্যাচারে। এই মৃত্যু গভীরভাবে নিজেকে বাঁচানোর তাগিদে।  লেখকের দেশপ্রেম ও ইতিহাসপ্রীতিতেই নেমেছে এই পংক্তিমালা। 

‘এখানে শবের নদী বাঁধভাঙ্গা ঢেউয়ে বোলায় জলের কোলায়/ মৃত্যুদূত সাধের তানপুরা বাজায় হাড়ের নরম ফোকড়ে/ নিয়ত ঝড়ে মনিকুন্তলার পাপড়ি ঝরে শ্মশান শূন্যতায়’। (‘ইতিহাস বৃক্ষ:এক)  

কবিতার ভেতরে প্রবেশ করে এর ঘ্রাণ, ছবি ও পংক্তির ছায়া নেয়া ছাড়া পাঠকের আর করার কিছুই থাকে না। জীবনের কোলাহল মিটিয়ে পাঠক কবিতার কাছে নিজেকেই খুঁজতে আসে। কেন? কতো কতো হাতের মুঠিতে নির্মিত এই পৃথিবীতে মানুষ মূলত শিল্পের ভেতরে নিজেকেই খুঁজতে আসে। জীবনের বহুমুখীতার ভেতরেই লেগে থাকে মানুষের ইতিহাস।

যাকে চিনতাম এতদিন সবুজ মুগ্ধতায়, কাছে গিয়ে কাল

দেখেছি কৃত্রিম চর জেগেছে তার পলিময়ী নদীর ভিতর

এ কেমন ছবি তার এ কেমন সময়!

আসলে জানে না আমার পাখি প্রণয়ী মন

কতটা সময় পার হলে, মানুষ-মানুষ হবে…

হবে নিমগাছ…বর্ণিল বনায়ন

চারদিকে উড়ে ঢোলকলমির বিবর্ণফুল…হাওয়ায় ভাসে ভাঙা ঘাসী নাওয়ের গলুই

উজান গাঙের জলহীন স্রোত ঠেলে আজ আমি কোন আগামীর দিকে

তাকিয়ে বলবো, কত সায়র সময় পার হলে মানুষ

মানুষ হবে? পাবে নিমশ্বাস হবে বিচিত্র সবুজ ( মানুষ ও নিমশ্বাস)

বিষাদে নিমজ্জিত কিংবা নেতিবাদে আচ্ছন্ন কবি নন শামীম রেজা । স্বপ্ন ও ইতিহাসের একটা স্বচ্ছ শিলালিপি গ্রন্থিত হয়েছে কবির কবিতায়। একটা প্রচ- আত্মবিশ্বাসে, ‘ঘুঘুডাক মায়াবী আদরে’ ভাষায় সময় যাপনের স্বপ্ন ও নির্মম সংগীত লিখেছেন। ব্যক্তিকাল, সমাজকাল, এবং বিশ^কাল-একজন কবিকে এই তিন কালে অবগাহন করেই শিল্পের সত্য খুঁজতে হয়; নিজের ভাষায় উদঘাটন করতে হয় স্বপ্ন ও ইতিহাসের চেহারা। কবিকে কেবল সময়ের খেদ ও গভীর অসুখে বসবাস করলে চলে না। কেননা, মানুষের চোখেই লেগে থাকে পরিচিত-অপরিচিত স্বপ্নের বিচিত্রতা। ‘নালন্দা দূর বিশ্বের মেয়ে’ থেকে কবিকে তাই ফিরতে হয় ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’।

এমন পাগলা বয়স, ঘুমরাত্তিরে মাটির বাঁশিবুকে 

ঘুমাইতে পারি না, পাপ স্পর্শ করে না চোখের পাতা

পানশালায় সাতাইশ বছর পইড়া আছি, বেহায়া বাতাস 

পিছন ছাড়ে নাÑঅনুভূতির রহস্য আছড়ে পড়ে বুকে, 

দুঃখের দেয়ালে ধাক্কা মারে; পৃথিবীর বুকেঘুট-ঘুটে 

আন্ধার নিয়া অনিচ্ছায় শুইয়া থাকি কত কত বছর;

চোখের লাই ভাঙে না পুঁথির গয়না পরি সাঁঝবেলায়, 

শামুকের ভিতর দীঘির ঢেউ গুণি; ইন্দ্রপাশা গ্রামের 

মেলায় পাশা শিকারীদের সঙ্গে পাশা-পাশা খেলি, ঘুম 

আসে না; ধূলামাখা চাকতির মতো শবরীর স্তন, সবই 

কলকব্জা মনে হয়, ছেউড়িয়ার ঘাটে সিকিচাঁদ পইড়া 

থাকে দীঘল দৃষ্টির আড়ালে এসব আমার চোক্ষে ধরে 

না। ময়নামতির বৃক্ষ-ডালে মধুরাত্তিরে, জলপ্রণয়ী

পাখি সাঁতারও ভালো লাগে না; লাঙলের ঘষা খাওয়া 

রেখাহীন হাত দেইখা-দেইখা মানুষ-জন্ম ভুইলা যাই, 

আদি-আদিম-একই ঘৃণা কামশ্বাস কোত্থাও 

ভালোবাসা নাই। পদ্মা-সুরমা-কুশিয়ারা-আগুনমুহা কত 

কত নদী নাম বুকে বাজে না, ঘুম আসে না; একবার 

কমলদহে প্রিয়তমার শরীর দাহ হলে কমলারঙের আগুন

ছড়ায়েছিল পূর্ণতোয়ার জলে; আর আমি সেইদিন 

থেইকা সাঁতার কাটছি আগুন-জলের ভিতর, তাতেও 

মৃত্যু আসে না। এমন পৃথিবীতে ঘুম আসে নাÑ মৃত্যু 

আসে না।

(এক; ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’)

 

চার/

কবিতার পথরেখায় হাঁটতে হাঁটতে অভিজ্ঞতাকে কল্পনার সরোজমিনে পেয়ে যান কবি। ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণ নগরে’ এরকম একটা সারলিক আর প্রাকৃত ভাষা নিয়েই বাংলা কবিতায় তখন শামীম রেজার আবির্ভাব। ‘পরানের গহীন ভেতরে’র পর কথ্য ভঙ্গিতে ভূমিজ সংস্কৃতি ও  জীবনানুভূতির  এরকম আশ্চর্য প্রকাশ খুব কম কাব্যেই উঠে এসেছে। বাংলা কবিতায় মান ভাষার সাথে কথ্য ও আ লিক ভাষার মিশেলে তিনি একটা ফর্ম তৈরি করেছেন। কোন কবিই মনে হয় পরিকল্পনা করে ফর্ম তৈরি করেন না। জীবন লিখতে গেলে, কল্পনার ভেতরে জীবন উঠিয়ে আনতে পারলে এমনিতেই তৈরি হতে থাকে কাব্যগ্রন্থের ভাষা ও ফর্ম। 

জীবন খুব ছোট্ট। ছোট্ট জীবনের ছোট্ট ছোট্ট বিষাদ ও আনন্দকে জীবনের সহজাত রঙে প্রকাশ করার   কৌশলটা রপ্ত করাই কবির কাজ। একজন কবি পুরো জীবন দিয়ে একটা জীবনই লিখেন। সহজ করে বললে, একজন কবি সারা জীবন মূলত একটা কবিতাই লিখেন। চৌদ্দ বছরের রবীন্দ্রনাথের সাথে আশি বছরের রবীন্দ্রনাথের লেখা একত্রে জোড়া দিলে একটা কবিতাই হবে। সেই একটা কবিতাই রবীন্দ্রনাথ নানা শিরোনামে লিখেছেন।

আমার মনে হয়, কবি শামীম রেজাও নানা শিরোনামে একটা কবিতাই লিখে যাচ্ছেন। এই কথার বিপক্ষে শত যুক্তি হাজির করা যাবে। কিন্তু কবির চক্ষুকে বদলানো যাবে না। যে চোখ কবি শামীম  রেজার, সে চোখ বরিশালের মাটি থেকে এসেছে। সে চোখ কীর্তনখালা সাঁতরে এই নগরে এসেছে। কাজেই নগরের পাপ, ধূলো ও পঙ্কিলতা কিংবা পশ্চিমের তত্ত্ববিদ্যার ময়ূর সিংহাসন কবির নিজস্বতাকে বদলে দিতে পারে না। আমার মনে হয় এই নিজস্ব বোধ ও ভাষাটাই কবি  ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণ নগরে’ কাব্যগ্রন্থে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন।

যখন রাত্তির নাইমা আসে উলঙ্গ সবুজ দ্বীপের শরীরে, ভয়ানক

কাইপা উঠি আমি, যেন ঝড়ে-পড়া সারস-শাবক। মৃত্যুর শীতল

শিস বইয়া যায় ভিতরে আমার। আর দোয়েলা তুই পবিত্র

পুরোহিতের মতন নির্বিকার তাকাও; এ কী দেখি ঢ্যালা উপড়ানো

শাদা চোখ!

 

তোর ঝলসানো চোখে অনুভূতির আংটা আগুন দেখে না কেউ,

দেখে শুধু হাজার বছরের অন্ধকার ঢেউ, মরণ যেথায় থির হইয়া

আছে বরফ রাত্তির দেয়ালে, ঘুমন্ত নদী হেথায় কাঁইপা ওঠে

মধুর আস্বাদে আর তারা ক্রুর হাসি হাসে গ্রহ¯œান শেষে দুর্গম

বনে।

যখন রাত্তির নাইমা আসে হাজার বছরের ক্লেদ কোলে মেখে,

পৃথিবীর কোলাহল থাইমা যায় হাড়ভাঙা কৃষকের নিভন্ত চোখে,

ক্ষিপ্র চিতার থাবা গুড়ি গুড়ি নক্ষত্র ছেটানো আলোয়, তোর

শরীরে স্পষ্ট হয়। মৃত মুনিয়ার দেহে সমস্ত সমুদ্রজল ভর করে

জোয়ার নামাইতে চায় মরা জোছনায়। আর সবাই যখন মৃত দ্বীপ

ভেবে রাইখা যায় প্রাচীন পৃথিবীর অপার শাখায়, তখন আমি

চিনতে পারি প্রিয়তমা দোয়েলারে, আত্মার জোছনায় জ্বইলা ওঠে

সে, বেহুলার চোখে সুবর্ণ নদীটার ধারে।

(তিন; যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে)

 

পাঁচ/

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস নিংড়ানো পটভূমিতে উঠে এসেছে প্রকৃতজনের নিত্যতা, আলো-অন্ধকার, মায়া ও জীবন সংলাপ। আছে আলো অন্ধকারে কার্তিকের সুবাস মাখানো শস্য-শ্যামলা দেশ। পূর্ববাংলার লোকজ ভাষাই স্থান পেয়েছে ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’ কাব্যগ্রন্থটিতে। ক্লাসিক্যাল ও রোমান্টিক ঘরানায় নিবেদিত বয়ানে ভাষার লোকজ ফর্ম এই গ্রন্থে সোনালুর দীপ্তিতে ছড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে ঐতিহ্য আর আধুনিকতার শৈল্পিক মিশেল ঘটিয়েছেন এই গ্রন্থে। কবিতার এই নির্জন পথরেখা ধরে হাঁটতে হাঁটতে ‘সুবর্ণ নদীটির ধারে’ পাঠক খুঁজে পাবেন প্রেম, প্রকৃতি, আত্মআবিষ্কারের মায়াবী আয়না। 

কবি শুরু থেকে যে কাব্যভাষাকে দৃশ্যমান করতে চেয়েছেন তাই সার্থকতম হয়ে প্রস্ফুটিত হয়েছে ‘যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে’। আ লিকতার প্রবাহণে কাব্য ও আখ্যানের একটা আলাদা ঘরানা তৈরি হয়েছে এই গ্রন্থে। কবিতা ধারণে সব কবিই আলাদা। ইতিহাস, লোকগল্প ও প্রতীকীভাষা সংযোগে কাব্যগ্রন্থটি বাংলা কবিতায় নতুন অনুধ্যান নিয়ে এসেছে।  আত্মভাষা এবং ঐতিহ্যিক অঅয়োজন নিয়ে কবি নিজেই বলেছেন, 

আমি আমার মুখে ব্যবহৃত ক্রিয়াকে এবং আ লিক বহুল ব্যবহৃত শব্দগুলোর সন্নিবেশ ঘটিয়েছি আমার কবিতায়, যা বাংলা কবিতায় এর পূর্বে জীবনানন্দ ব্যবহার করেছেন। এছাড়া পূর্বাপর অনেক কবিই আ লিক ভাষায় কবিতা লিখেছেন, হয়তো শিল্পও হয়েছে কিন্তু জীবনানন্দ যা করলেন তা কিন্তু একদম তাদের থেকে আলাদা। তিনি বরিশালের আ লিক ক্রিয়া ব্যবহার করেননি, এর কারণ হিসেবে বুঝতে পারি যুগ্মধ্বনির সমস্যা অকাব্যিক বলে, তিনি ক্রিয়া- গেলি¬, খাইল-া; বরিশালের ক্রিয়া চলিত ও সাধুর মিশ্রণে- এ সকল ব্যবহার করেননি, কিংবা সাধু ক্রিয়ার ব্যবহার দেখাননি কবিতায়, নিজের মতো করে তৈরি করেছেন ক্রিয়া যেমন- ঘুমাতেছে, দাঁড়ায়াছে, ছড়াতেছে, হতেছে, চাহোনা, হচ্ছিলো, জুড়োচ্ছে। আর যারা অ লের ভাষাকে কাব্যে রূপান্তর করেছেন তাদের কথা ভিন্ন। জীবনানন্দে অত্যন্ত সর্তকতার সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে, তারপরও তাকে ‘চাষার ভাষা’র অপবাদ সইতে হয়েছে। এটাই স্বাভাবিক, অথচ ঐ সময়েও তার ভাষায় কেউ কথা বলতেন না এখানো বলেন না- তবে তাঁর ক্রিয়া ব্যবহারের মধ্যে মায়া আছে, দুই-একটা প্রচলনও হয়েছে কথ্যে। আমার যেটা মনে হয় ভাষার বিবর্তনের ইতিহাসে ক্রিয়ার ভূমিকাই অগ্রগণ্য। তাই স্বতঃস্ফূর্ত মৌখিক বলা থেকেই এর ব্যবহার আমার কবিতায়’।

অণুর মধ্যে পরমাণুর মতো প্রত্যেক কবিই থাকে ভাষা ও কল্পনার নিজস্ব এক শিল্পজগৎ। সে জগতে অবিরাম পথ চলতে চলতে কথা ও স্বপ্ন গাঁথতে গাঁথতে কবি মূলত নিজের কল্পনা ও সাধনার ইতিকথা লেখেন। কবির এই অনুভব থেকেই বুঝতে পারি একটা সচেতন প্রয়াসে তিনি আ লিক শব্দ ব্যবহার করেছেন। আ লিক উচ্চারণ, মৌখিক ধ্বনির নতুনত্ব, বিশেষ্য, বিশেষণ, অব্যয়, সর্বনাম পদের আ লিক রূপায়ণ করেছেন। ‘নাইমা’, ‘থেইকা’, ‘পুইড়া’, ‘ঝুইলা’, ‘জাইগা’, ‘কইরা’, ‘রাত্তি’র, ‘ঢ্যালা’, ‘দোয়েলা’, ‘নাহান’ ‘আন্ধার’, ‘বায়া’, ‘কারে’, ‘গাইয়া’, ‘দুপার কালে’, ‘কৈতর’। বরিশালের আ লিক ভাষার এমন অনেক শব্দকে তিনি নিজস্ব প্রয়োগে বিন্যস্ত করেছেন। শব্দ প্রয়োগে, ভাষা ও বয়ানে, আখ্যানিক সরলতায় পংক্তিতে পংক্তিতে স্পষ্ট হয় বাংলা কবিতার উত্তরাধিকার।

যখন রাত্তির নাইমা আসে মনের গভীরে আমার, শুকতারা গাঁইথা

থাকে আকাশের ঘরে, তুমিও তেমনি বাঁইধা থাকো মনের

অন্দরে; আর আমি শুঁড়িখানার ঠিকানা-হারানো বালক, নিজেরে

খুঁইজা মরি কোনো এক অজানা খাঁচায়।

যে আমি প্রলয় ছাড়া লড়তে জানি না, বানের জলকে বাগ

মানানোই যার স্বভাব, পূর্বপুরুষের আর্তনাদ খাবি খায় বরফ-

দেয়ালে পশ্চিমে; অন্যদের বদলে দেয়ার যাদুকথা শোনানোই

যে-আমার কাজ; ক্ষুধার্ত ডোমের চোখে শ্মশানের আগুনে

হোলিখেলা দেখতে দেখাও পণ্যমানুষের কলজে ছিঁইড়া

ফ্যালানোই আমার আদর্শ, সেই আমি হাওয়ারে সাথী আর

নদীরে বাহন কইরা একদিন রাইতে শয্যাবাহারী জোছনায়

অজান্তে দিয়াছি সাঁতার! একটি চূড়ান্ত অপেক্ষার পর এইরহম

পরিবর্তন হয় বুঝি সবার? সব হলুদ পাতারা ক্যামন সবুজ হাসে

দিবালোকে, সব অনুভূতিই প্রথম-প্রথম, যেন এক নতুন শৈশব।

যখন রাত্তির নাইমা আসে মনের গভীরে আমার, তুমি বিন্ধা

থাকো হৃৎপি-ের চলমান রক্তের ভাঁজে; আর আমি থমথমে জলে

বাইন্দা-রাখা নক্ষত্র আর তারাদের ছবি মুক্ত কইরা দেই হাত-

ইশারায়; মধুগন্ধা জোছনা আমারে ডাকে, তারা ভোর নামাতে

চায় আর শুকতারা গাঁইথা থাকে আকাশের গায়, আমি হাত

বাড়াইলেই কাছে আসে দূরে চইলা যায়, আসলে সে কোথায়

লুকায়, শুঁড়িখানার ঠিকানা জানি না বইলা পথ হারাই। বলো

তোমায়, কীভাবে স্বপন দেখাই।

(দুই; যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে)

 

ছয়/

কবিতা কি করে? অংকের মতো ফলাফলে না তাকিয়ে নিজেকে জানার ইচ্ছেটাকে জাগিয়ে রাখে কবিতা। ইচ্ছার অনন্ত চক্ষুটাকে জাগিয়ে রেখে কবিতা। শামীম রেজার কবিতাও বোঝায় না; দেখায়। কবিতার টানে ‘অন্ধপাখির পাখনায় ভর করে সোনালু আগুন’। কাবিতার টানে ‘রাত্রি আর দিনে মৃতদের ঘুম ভাইঙা নতুন নতুন নদীর জন্ম হয়’। কবিতায় ভাবনার অণু বিছিয়ে কবি ঘুরে বেড়ান পাঠকের হৃদয়ে। শুধু ভাষার ছান্দিক গঠন কাঠামোতে নয়; ভাষা ও চিন্তার একটা বিশ্বস্ত গহীনে, ইতিহাস ও ঐতিহ্যিরে অনন্ত উৎস থেকেই আমাদের জন্ম; সেই গানকে ভুলে গেলে আত্মবিকাশ হয় না। নিজেকে লেখা যায় না। শামীম রেজা নিজেকে লিখেছেন। নিজের উত্তরাধিকারের সূত্রধরে নিজের মাটিকে লিখেছেন।

কবি মাত্রই পৃথিবীর নাগরিক। জীবনানন্দও বরিশালের গ্রাম থেকে উঠে এসে সময়, স্থানিক ও আ লিকতার প্রতিবেশ নিয়ে, বোধ-বিশ্বাস ও সংস্কৃতি নিয়ে কলকাতার নাগরিক সমাজকে টেক্কা মেরে বিশ্বনাগরিক হয়েছেন। নিজের মাটির ভাঁটফুল, জারুলফুল কিংবা হিজল ফুলের নিবিড়তা দিয়েই কবিতার বোধ ও সৌন্দর্যকে বিস্ময় ছড়িয়ে দিয়েছেন। শিল্প মানুষের জন্য; কবিতাও মানুষের জন্য। শামীম রেজা তাই বাংলা কবিতার মূলধারাতে আস্থা রাখেন। এই ধারাতেই বৈষ্ণব কবিতা, এই ধারাতেই মৈমনসিংহ গীতিকা, এই ধারাতেই জসীমউদ্দীনের মহাজনেরা ফুল ফুটিয়েছেন। প্রকৃত সাধনায় জাগ্রত থাকে নিজস্ব বীজতলা। একটা নিজস্ব দৃষ্টি ও ধারণায় বাংলা কবিতার মূলধারার সেই বীজতলাকেই সবুজ রেখেছেন কবি। এই পথে কবিকে কে হাততালি দিবে কিংবা বিজয়ের মালায় রাঙায়িত করবেন-এই আকাক্সক্ষায় মগ্ন হয়নি কবর কলম। কবি তাই ‘দেশহীন মানুষের দেশ’ লেখেন।

 চোখে দেশ নাই ঘরে দোর নাই মাটি পরদেশি

 দেহে মন নাই মনে খুন খোঁজে খুনি প্রতিবেশি

 

কবির জানালা দিয়ে কবিতার ফুল দেখতে দেখতে আমি হয়তো  চালতা ফুল লিখতে গিয়ে বকুল ফুল লিখে ফেললাম। তবে, দিন শেষে লেখাই পাঠকের দিলে এসে বসে। কবির লেখার কাছে বসেই দেখা যায় কবির ছায়ার বিস্তার। আসুন পাঠক, কবি শামীম রেজার কাব্য সংগ্রহের বিপুল জগত  থেকে ঘুরে আসি। পানের বরজের নীরবতায় কাব্যভূবনে আছে অনন্ত-শান্তি। কবির সাথে সাথে কবিতার পাঠকও সাদা গন্ধরাজ।

🏵️🏵️🏵️🏵️🏵️🏵️🏵️🏵️

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

সুখী মানুষের চেহারা || জাহেদ আহমদ

Mon Mar 22 , 2021
সুখী মানুষের চেহারা || জাহেদ আহমদ 🌱 “সুখী মানুষের ভিড়ে হারালে কোথায় … হারালে কোথায় …” (ফিডব্যাকের গান; অ্যালবাম : বঙ্গাব্দ ১৪০০; কণ্ঠ : লাবু রহমান; কথা : আহমেদ ইউসুফ সাবের; সুর : ফিডব্যাক) শুকনা গাছের ডালটা, কাঠির মতো দেখতে হাত-দুয়েক লম্বা, হাত থেকে নামিয়ে রেখে পুঁটলির গামছাগিঁট খুলতে শুরু […]
Shares