সুখী মানুষের চেহারা || জাহেদ আহমদ

সুখী মানুষের চেহারা || জাহেদ আহমদ

🌱
“সুখী মানুষের ভিড়ে হারালে কোথায় … হারালে কোথায় …”
(ফিডব্যাকের গান; অ্যালবাম : বঙ্গাব্দ ১৪০০; কণ্ঠ : লাবু রহমান; কথা : আহমেদ ইউসুফ সাবের; সুর : ফিডব্যাক)

শুকনা গাছের ডালটা, কাঠির মতো দেখতে হাত-দুয়েক লম্বা, হাত থেকে নামিয়ে রেখে পুঁটলির গামছাগিঁট খুলতে শুরু করে লোকটা। তাকানোর মতো অত দর্শনীয় কোনো ব্যক্তিসুরত নয় যে সে দৃষ্টি আকৃষ্ট করবে। যেখানে ছিলাম বসে, রৌদ্রধাঁধানো দুপুরবেলায়, সেখানটাতে এতক্ষণ জনমনিষ্যি দ্বিতীয় ছিল না কেউ বক্ষ্যমাণ নিরুদ্দেশ্য রচনার দৃশ্যভোক্তা ছাড়া। গাছডালের কঞ্চি হাতে লয়ে যে-লোকটা দৃশ্যপটে এসেছে, সে এই নিধুয়া পাথারের পরাবাস্তব নির্জন-অখণ্ডতার দৃশ্যমান খণ্ড হয়ে এল। ফলে একটু সবিরক্তি দৃষ্টি কুঁচকে এলেও চোখ গেল লোকটার দিকে। একেবারে পয়লা দেখেই চিত্তাকর্ষক মনে হয়েছে এমন মোটেও নয়; কিন্তু অচিরে সে মনোযোগের কেন্দ্রে এসে যাবে, এবং শুধু তা-ই নয়, এমনকি কথা বলিয়ে নেবে রীতিমতো তার নিকটে টেনে নিয়ে যেয়ে। ব্যাপারটার শুরু পুঁটলিবাঁধা টিফিনবাটি দিয়ে।

একডাব্বার টিফিনবক্স যেমন হয়, ঠিক সে-রকম না হলেও অনেকটা কাছাকাছি দেখতে একটা অ্যালুমিনিয়ামবাটি গামছাপুঁটলি-বাঁধা শ্যাওড়াগাছের গোড়ায়। ডানহাতের কঞ্চিডালটাকে একপাশে রেখে লোকটা বাটিটা সামনে এনে যতনে আগে নিজে বসে, পরে বাটিটা বসায়, এরপরে একই যতনে গিঁট খুলে গামছা কান্ধে রেখে বাটির ঢাকনাটা খুলিয়া পাশে রেখে দেয়। এরপর কান্ধে-ফেলা গামছা মাটিতে বিছায়। এরপর প্রধান বাটির ভিতর থেকে বেরোয় আরেকটা মিনিসাইজ্ বাটি, ছিল সেই মিনিবাটিটা ভাতগম্বুজের মাঝখানে গর্ত করে রাখা। বাটিতে একটু সুরুয়াসিক্ত তরকারি। কিসের তরকারি ডিটেলে খেয়াল করা যায় নাই। কিন্তু দুইপাশে, সেই ভাতস্তূপের দুইকোণে, আরও ভর্তা-ভাজি ছিল দুইপদ। সব বুঝেশুনে দেখে নিয়ে যেন লোকটা সামনের দিকে একবার তাকায়। এতক্ষণ চোখ তুলিয়া তাকাইতে দেখা যায় নাই একবারও তারে। যেদিকে তাকায়, সেদিকে ক্যামেরার ভিয়্যুফাইন্ডার নিয়া যাইতেই দেখা গেল একপাল খাঁকি ক্যাম্পবেল্ ডাক্। পোকার মতোই পিলপিল করছিল উহাদের অ্যাক্রোব্যাটিক্ গলা আর ঠ্যাংগুলো। লক্ষ করে বোঝা গেল, কয়েকটা সবেমাত্র ডাকলিং বয়স পার করেছে। বেশ বড়সড় সংখ্যায় ডাকলিংই হবে মনে হলো। সংলগ্ন অল্পজলো জমিনের ধার ধরে তারা মাটিতে চঞ্চু ঢুকিয়ে ফের মুখ উঠিয়ে নিচ্ছিল। শব্দ শোনার মতো নৈকট্য তখনও আমাদের ভিতর তৈরি হয়ে ওঠে নাই। কিন্তু চোখ দূর থেকে ফেরায়ে ফের বাটিনিকটে নেবার প্রাক্কালে লোকটার সনে একবার কি চোখাচোখি হলো? সন্দেহ সত্ত্বেও একটা হ্যালোসূচক হাসি দিলাম। মনে হলো না হ্যালোসূচক স্মাইলের সভ্যতার কদর লোকটা জানে। একটু কি ক্ষুণ্ণ হলাম মনে মনে?

রেলিশ করে খেয়ে শেষ করল লোকটা। দানা খুঁটে খুঁটে খাওয়া বোধহয় ব্যাপারটাকে বলা যায়। আমি অবশ্য লোকটার লাঞ্চের আধাঘণ্টা আগেই খেয়ে নিয়ে এই দিকটায় হাভানা চুরটের খোঁজে বেরিয়ে বেমক্কা আবহমান বাতাসের স্রোতবহা হাওরের মুখোমুখি হয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় উদাস হয়েই ছিলাম কয়েক পল। লোকটাকে দেখে উঠি ঠিক তখনই। কিন্তু লোকটার কায়কারবার দেখে একটু কৌতূহলী হয়ে ফের সচেতন হই, নিজেরে সামলাই, ডিউরিং মধ্যাহ্নভোজন কারো সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ তো কোনো ভদ্রজনোচিত আচরণ হতে পারে না। হাজার হোক আমি তো ভদ্রলোক। ভিতরে সদরঘাট হলেও বহির্দেশে বাবুটি ফিটফাট। অন্তত দর্পণে তেমনই তো দেখায়; এবং জনশ্রুতিও তা-ই।

কিন্তু লোকটার খানাপিনা শেষ হলে পরে কাছে ভিড়ি। ইন্টার্ভিয়্যু করি বলতে পারতাম, হয়তো পেশার খাতিরে সেইটাই বলব কখনো কোনো ওয়ার্কশপের শেয়ারিং সেশনে, কিন্তু বক্ষ্যমাণ গল্প তো পেশার পুংটামির বাইরে থেকে একটু গলা বাড়ানো বকের কিংবা সারসের ব্যাপার। শাঁসালো পার্ডিয়াম্ অফার করবে যারা, তাদিগেরে ব্যাপারটা বানিয়ে বানিয়ে আরেকটু রসডুবন্ত গোল্লা পাকায়া বলা যাবে যেন অফারারদের পয়সাটা হালাল হয়। এক্ষণে ফ্রিতে একেবারে সংক্ষেপে দায় সারি।

স্ত্রী আছেন সংসারে। লক্ষ্মীমন্ত মহিলা। দুই মেয়ের বিয়ে থা দিয়া সারা। তারা স্বামীর ঘর করে বেশ বছরভর। নাইওর আসে বছর ঘুরানে বারদুই। বিশেষ দায়দায়িত্ব নাই আর তার সংসারে। থাকার মধ্যে আছে কেবল কয়েকটা প্রাণী নিয়া দায় নিতিকার। একশ’ দশটা হাঁস। আর চারখানা ছাগল। এরাই তার রোজকার দায়িত্ব ও দায়। এ-ই তার জাগতিক সম্পদ। রোজ সকালে বেলা চড়চড়িয়ে বেড়ে যাবার আগেভাগে স্বীয় কুঠি থেকে বের হন তিনি তার একশ’ দশ প্লাস্ চারখানা প্রাণের পরিপুষ্টি সাধনে। বেরোনোর প্রাক্কালে গিন্নি টিফিনগাট্টিটা আগায়ে দেন। দুপুরে খেয়েদেয়ে ছাগলগুলা ছায়ার ঘাসে খুঁটি বেঁধে দড়িটুকু লম্বা বহরে রেখে হাঁসগুলোর গতিবিধি নিরিখ করে যদি বোঝেন যে এদের গুগ্লিশামুকের যোগান বা ঘাসপোকার সোয়াদ নিয়া আদৌ সমস্যা হচ্ছে না তাহলেই নিজে ঠাঁইনাড়া না-হয়ে শ্যাওড়া বা হাওরের দূর দূর ছড়ানোমেলানো কোনো-একটা করচ কিংবা হিজলের ছায়ায় জিরায়ে নেন। আসরের আজানের আগে আগে বেলাবেলি একশ’ দশ প্লাস্ চার প্রাণকোম্প্যানি নিয়া বাড়ির পানে রওনা দেন। মোটামুটি থিতু তিনি এই রুটিনেই।

কিন্তু চলে তো? চলে মানে! রীতিমতো দৌড়ায়। এবং সুখেই, বললেন তিনি, চোখেমুখে ঠিকরোয় একসহস্র সোনার আশ্রফির মতো শোকরগোজার। গড়ে পাঁচচল্লিশটা আণ্ডা পাড়ে হাঁসগুলো রোজ। ছাগল চাইরটার হিসাব হচ্ছে এফডিআর। মানে, একটা সাম্বৎসরিক ম্যাচুরেশনের পরে এই ফিক্সড ডিপোজিট ক্যাশ করেন তিনি। বিশহাজার মেরেকেটে বক্রি ঈদের মরশুমে। বেশ তো, বলেন তিনি, হোয়াট এল্স্ কিসিমের একটা ভাবলেশছাড়া ভাব ফুটতেও দেখা যায় কি চেহারায় তার? কিন্তু সত্যিও তো যে এরপরে আর কী চাই! কিন্তু মেয়েজামাইরা বায়নাক্কা জ্বালাযন্ত্রণা করে না? আলহামদুলিল্লা, জানান তিনি, না। আর করলেও অসুবিধা নাই। হি ইজ্ কনফিডেন্ট এনাফ যে মেয়েদের জামাইদিগেরেও বসায়া বসায়া খাওয়াতে পারবেন। দ্যাটস্ অল্ ফ্রম্ হিম্। ওয়েল্, না, আরেকটু আছে। সেইটুকু পার্ডিয়াম্-দেনেওয়ালাদেরে গছিয়ে দেয়া যাবে সময়সুযোগে। এইখানে এটুকুই বিজ্ঞপ্তিবিশেষ যে পাঁচচল্লিশ অ্যাভারেজে ক্যাম্পবেল্ হাঁসের আণ্ডা আর বিশহাজারের ব্ল্যাক্ বেঙ্গল্ ছাগির এফডিআর দিয়া আপনি কি নির্দ্বন্দ্ব বলতে পারবেন যে আপনি সুখী? কিসে পারবেন, বলেন তো? অটবির ভুয়া ফার্নিচারে? ক্যাডিলাকে পারবেন বোধহয়। আমার অবশ্য লিমো লাগবে; ডোন্ট মিসিন্টার্পেট মি ড্যুড, লিমো বলতে লিমোজিন্ বুঝায়েছি। ক্লিয়ার?

এতক্ষণের গল্পটা বানানো। পরাবাস্তবতাচ্ছাদিত। কোনো-একটা ব্যাঙ্কের সাহিত্যপুরস্কার জোটানোর নিমিত্তে কায়দা বাগিয়ে লেখা গালগপ্পো। তবে এহেন অবাণিজ্যিক গল্পচরিত্রের সঙ্গে দেখা আপনার হয়ে যেতেও পারে হয়তো যদি আপনি ডিপ্ হাওরের কোনো স্বল্প-ভদ্রালোকিত লোকালয়ে যেয়ে থাকেন কখনও। সুনামগঞ্জ বা নেত্রকোনা অ্যারিয়ার গভীর হাওরে এমন বলিষ্ঠ চরিত্রগুলা পাওয়া যায় আজও। যদিও খর্ব হতে হতে আমরা ক্যারেক্টার হিশেবে খেলো হয়ে গেছি বহুকাল হলো।

তবে এইধারা গালগল্পে জ্যাকধরা ব্যাঙ্কঅ্যাওয়ার্ড জুটিয়ে ফেলতে পারলেও গল্পমার্কেটে এর বিপণন বিষয়ে তেমনটা আশ্বস্ত করা যাবে না আপনাকে। কেননা কবিতাক্ষেত্রে যেমন স্যুয়িটেস্ট স্যংস্ হচ্ছে সেইগুলোই যেগুলো আমাদেরে স্যাডেস্ট থট উপহার দেয়, তেমনি গল্পেও দুঃখদুর্দশা দেখাইতে হয়। আদারোয়াইজ্ গল্পের বাংলা কিংবা ইংরিজিবাজারে ব্যাগ ভরা যাবে না আলোচকের মুহুর্মুহু ধন্য-ধন্য ধ্বনিযোগে। অ্যানিওয়ে। যে-লোকটা নিজেরে সুখী ডিক্লেয়ার করেছে, সে সুখের কি-ইবা জানে, সেই লোকের সুখসংজ্ঞা আর আমার-আপনার সুখসংজ্ঞা তো সমান মাপের নয়। কিন্তু পঁয়তাল্লিশটা আণ্ডা আপন হস্তে এ-জীবনে গুনে-গুনে তুলি নাই রেকাবিতে আমি। কাজেই ওই লোকের সনে নিজেরে মেলাব কোন মুখে?

মেলাতে বয়েই গেছে, এইটুকু ঠোঁট-উল্টানো ভঙ্গিমায় একশ’ দশটা হাঁস প্লাস্ চাইরটা ছাগলের প্রতিপালক বয়সের-গাছপাথরহারা সাহসী ঋজু চরিত্রের লোকটাকে পেছনে রেখে আমি সিটি কর্পোরেশনের হন্তদন্ত ঘোড়দৌড়ান্ত সুখী মানুষের ভিড়ে নিজেরে হারাতে দিয়ে চেনা ছকের ভেতরে এসে আশ্বস্ত হই।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

রেলগাড়ি অথবা মুখোশের গল্প | মোর্শেদ শেখ

Sat Apr 17 , 2021
রেলগাড়ি অথবা মুখোশের গল্প | মোর্শেদ শেখ 🌱 চারদিকে মানুষের ভিড়। নানা রকম মানুষ। নারী-পুরুষ। নানা বয়সের। সবাই তাকে পাক খেয়ে ঘুরছে। পাকটা থেকে থেকে বেশ ঢেউ তুলছে। আর নিজেকে মনে হচ্ছে সে পাকে হাবুডুবু খাওয়া নৌকার মতো। এরকম একটা পাক প্রায় একযুগ আগে সে দেখেছে। তখনও দাদা বেশ চলতে পারে। […]
Shares