ঝড়ু-পিন্টু-ভানু আখ্যান | জুয়েল মোস্তাফিজ

ঝড়ু-পিন্টু-ভানু আখ্যান | জুয়েল মোস্তাফিজ

🌱

ঝড়ু পাল

কত হলে একশ হয়? এক’শ কি কোনো সাপ? বাইম মাছ দেখতে কেমন, কত হলে বাইম মাছ হয়? আমি হাড় গণনার হাটে যাবো, দমের যাতাকলে পা কাটব। কত হলে পা হয়? একশ কি কোনো পা? কালো ধানের মাঠি দেখতে কেমন? পানি নাকি হাসতে জানে, একশ’র সাথে কয়’শ হলে পানি হয়? যাদু পুরের কি তে আমি আমার বয়স কাটব, সময়ের গলা কাটতে কামার পাড়া যাবো। কত হলে কামার পাড়া যাবো?… সামনে দিয়ে কে যাই, কে যাই? ‘কাকা আমি ধিবরের ছেলে ধিরেন।’ ‘তোমার হয় নাই….’

গোয়ালবাড়ি থেকে হাঁটলে একটু কাছে, যে কোনো উঠতি বাজার থেকে গাড়ি ছাড়লে অনেক দূর। মানুষ থেকে দৌড় দিলে শত শত বাঁক, জীবন থেকে হামাগুড়ি টানলে এইতো আর একটু… মহানন্দার পাড় ঘেষে কচ্ছপের মতো শুয়ে আছে পাল পাড়া। পাল পাড়ার প্রবেশ পথটা খাদ্যনালীর মতো বাঁকা, দুই ধারে পড়ে আছে অসংখ্য মাটির তৈরি ভাতের হাড়ি। হাড়িগুলোর কোনটার পেট ফাটা, কোনোটার মাথাভাঙা। এরই ভেতর দিয়ে এক পা দু’পা করলে চোখে পড়বে বয়স থেকে অনেক উচু একটা তেতুল গাছ। গাছের গোড়াটা মাটির শানে বাধা; তার উপর কাঠের টুলে বসে একা একা কথা বলছে ঝড়ু পাল ‘কে যাই… কে যাই…?’ ‘বাবা আমি শ্রীমতি তোমার বউ মা, রোদে হাড়ি শুকায়।’ ‘তোমার উত্তর হয় নাই…’

তেঁতুল গাছের বাপের নাম কি ছিল? কত হলে বাপ হয়? বাপগুলো দেখতে কেমন? মানুষের চেহেরা কয় ভাগ? দাঁত থাকলে কি হয়? কত হলে মানুষ হয়? ‘কে যাই… কে যাই… ‘বাবা আমি জয় চাঁদ, তোমার ছেলে, হাড়ি নিয়া হাটে যায়।’ ‘তোমার উত্তর হয় নাই….’

পাল পাড়ায় কে নামে আগে? রাত নাকি ভোর? কোথায় আছিস হট্টিটি পাখি? একবার সামনে দিয়ে যা। আচ্ছা ভাদ্র মাস কয় মাসে হয়? তের বছর কয় বছরে আসে? কোথায় আছিস ঊনিশ বছর চক্কর মেরে যা। ‘কে যাই?… কে যাই?… ‘ঝড়ু আমি মগজের পুরানা শব্দ; কেউ যায় না…’

ছেলেটি যাচ্ছে জাহাজে। ওর মা আছে, মাটি নেই। চোখের ইশারা ভাগ হলে ওকে চেনা যাবে। কত আর হবে; হয় পাল পাড়া, না হয় বটডাঁড়া। ছেলেটি জাহাজে যাবে কাঠে কাঠে কাঁটা মারতে। ওদের ঘরে সব রিতুতেই বর্ষা, ওরা বৃষ্টিকে ভাত মনে করে খালি ভুল করে। ওদের ভাত জিদ ধরেছে ছেলেটিকে যেতেই হবে জাহাজে। জাহাজ কোথায় যাবে ওরা জানে না। তবুও ঘরের বর্ষা মোচন করতে ছেলেটির গায়ে তেল মাখাচ্ছে ওর মা। ছেলেটাতাই মায়ের কাছে নিচ্ছে বিদায়। আর জাহাজে ওঠার আগে তার মাকে বলে যাচ্ছে,জাহাজে অনেক ভাত আছে মা, দেখিস আমি তোর জন্য অনেক ভাত আনবো, কিছু আনবো পেটে কিছু আনবো পিঠে। আমাদের ঘরে আর বর্ষা ঢুকবে না।…
জাহাজের তল্লাটে কাঠে কাঠে কাটা মারছে ছেলেটা। পার হচ্ছে ভারি ভারি বেলা। জাহাজ চলছে, ছেলেটার গায়ে-গতরে কিলবিল করছে শ্রমের টিকটিকি। দিন যায় রাত আসে কাটায় কাটায় ভরে ওঠে কাঠ। বহুদিন বাদে ছেলেটার বাসনা হয় ঘরে ফেরার। ঘরে ফেরার জন্য ছেলেটা একদিন শ্রমের কাছে গিয়ে বলল, ‘এই শ্রম আমি মায়ের কাছেফিরব’ শ্রম ছেলেটিকে বলল ‘তুমি মায়ের কাছে ফিরবে ফিরো কিন্তু জাহাজ তো আর পেছনে ফিরবে না। ফিরতে চাইলে জাহাজ থেকে নামো। ছেলেটি দেখে জাহাজ থেকে তার মায়ের দূরুত্ব বেড়েছে ঢের।
ছেলেটি এবার তার শ্রমের কাচা মুদ্রা গুনে দেখে পঞ্চাশ। শ্রমের কাছে গিয়ে বলে ‘ওরে শ্রম এই দ্যাখ পঞ্চাশ মুদ্রা, আমাকে জাহাজ থেকে নামাও। শ্রম ছেলেটিকে বলে— ‘পঞ্চাশ! কিন্তু এখান থেকে তোমার ঘরে ফিরতে খরচ হবে একশ।’ ছেলেটা তার জমানো পঞ্চাশ মুদ্রাকে এক’শ করতে আবারো কাঠে কাঠে মারতে লাগলো কাটা। আর ভাবলো এইতো আর পঞ্চাশ, ফিরব এবার মায়ের কাছে…।’ পার হলো আরো এক মাস। ছেলেটার জমলো একশ মুদ্রা। এক মাসে জাহাজ এগিয়ে গেল আরো কিছু দুর। ছেলেটার ঘরে ফেরার মুদ্রা বাড়ল একশ পঞ্চাশ। ছেলেটা তার জমানো একশ মুদ্রা কে একশ পঞ্চাশ করতে কাঠে কাঠে মারতে লাগলো আরো এক মাস। কিন্তু জাহাজ এগুলো আরো কিছু দূর। ঘরে ফিরতে বাড়লো দুশো মুদ্রা। ছেলেটা কাঠে কাঠে কাটা মারতে লাগল মাসের পর মাস। ঘরে ফেরার মুদ্রা বাড়তে লাগলো আরো আরো…

‘কোন দিক সামনের দিক? কত দূর থেকে কত দূর হলে সামনে হয়। ছেলেটা কবে ফিরবে? ছেলেটার কত জমলো?’ ‘কে ফিরবে, কি জমলো বাবা? এই আমি জয়চাঁদ হাট থেকে ফিরলাম, হাটে এখন টিনের কদর, মাটির হাড়ি কে কিনে? সন্ধ্যা আবার ফিরে এল, চল বাবা ঘরে যাবে।’
ঘরে যাবার কথা শুনে ঝড়ু পাল বলে ওঠে ‘জাহাজ কি ঘরের দিকে মুখ নিয়েছে? জয়চাঁদ বলে ওঠে ‘জাহাজ? জাহাজ কই দেখলা বাবা? এই বলে শ্রীমতি আর জয়চাঁদ ঝড়ু পালের বসে থাকা টুলের দুই প্রান্ত ধরে নিয়ে যায় ঘরে। ঝড়ু পাল টুলের মাঝখানে বসে টলমল করতে থাকে। আর তার গায়ের চামড়ার ভাজে ঝন ঝন করে বাজতে থাকে অসংখ্য অচল মুদ্রা। ঝড়ু পাল ঘরের এক চালার দড়ির খাটে জমা রাখে গা। তার গায়ে জমানো অচল মুদ্রার ঝনঝন শব্দ ভিটার সদর দরজা দিয়ে বের হয়। এরপর পালপাড়ার এ ঘর ও ঘরে ধাক্কা খেয়ে হাঁটতে থাকে প্রতিদিনের আলকাপের আসরে…

‘‘দেরে নারে দেরে…
নারে দেরে না…

কালকাটা কালের কথা
কি বলিব আর
কাটল জনম এমন দাঁতে
না থাকে তার ধার…

দুনিয়াটা চইল্যা গেল
বেনিয়াদের কাছে
টিনের হাড়ি বহুত খুশি
পেলাস্টিকের মাছে…

দেরে নারে দেরে…
নারে দেরে না…’’

দুই.
আরো একটা ভোর নামে পাল পাড়ায়। ঝড়ু পাল রাতভর এক তরফা শুয়ে থাকে। অধির হয়ে ওঠে আরেক তরফায় যাওয়ার জন্য। তার চোখের ভেতর আলোগুলো সরিসৃপের মতো ঢুকার চেষ্ঠা করে। ঝড়ু পালের চোখের ঢাকনা আলোর সাথে পাল্লা দিয়ে একবার জিতে আরেকবার হারে। ঝড়ুর চোখ বলে ওঠেে ‘আসবি আয়?’ ঝড়ুর চোখকে আলো বলেে ‘আমরা ভোরের আলো চলে যাব’। ঝড়ু পাল বলে ওঠে ‘ শ্রীমতি শ্রীমতি এখন কি সবখানে ভোর নেমেছে?’ শ্রীমতি ঝড়ু পালের দিকে সমস্ত দৃশ্য গড়িয়ে দিযে বলেে ‘হ্যাঁ বাবা সবখানেই ভোর নেমেছে, প্যাটে-পিন্ধনে সবখানেই ভোর।’ ঝড়ু পাল শ্রীমতির দিকে হট্টিটি পাখির ছায়া গড়িয়ে দিয়ে বলে ওঠে ‘তোমার উত্তর হয় নাই…’

এই বলে অনুভব করে নিজের মুখটা, পেট, পিঠ; নিথর হাত দিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখে পেটে-পিন্ধনে কোনো ভোর নেমেছে কি না। একটু বাদে তার চোখ দেখতে পায়, শ্রীমতি আর জয়চাদ টুল হাতে এগিয়ে আসছে। ঝড়ু বুঝতে পারে আরেক তরফা এসেছে। এই তরফাটাকে শ্রিমতিরা ভোর বলে ডাকে…. ঝড়ু পালকে দড়ির খাট থেকে বহু কসরত করে টুলের উপর বসায় জয়চাঁদ। শ্রীমতি ধরে আরেক প্রান্ত। টুলের মাঝখানে টলমল করতে করতে তেঁতুল গাছের গড়ায় পৌছায় ঝড়ু পাল। শুরু হয় আরো একটা দিন…

কি হলে ভোর হয়? ভোর না হলে কি হয়? সবখানে কি ভোর নামে? রসুলপুর কত দূর? কোথায় কোথায় ভোর নেমেছে? কে যাই? কে যাই? ‘ওরে আমার কপাল, সাত সকালে চৌদ্দ-পরুষের সাথে দেখা। আমি ফুরকুনি বুড়ি, ঘটির জল ভরতে ঘাটে যাই, আমার কামাসূত কাপড়ের মিস্ত্রী ছিল, গুঢ়ি পাড়ায় দহার উপর আমাদের ঘর, পা থাকতে কত যাইতেন ঝড়– বাবু? হাইরে আপনার আলকাপের গলা, ওই গলাই একবার জোয়ার নামলে হাইল্যা ছাড়ত হাল. পোয়াতি ছাড়ত ছাইল্যা।…’

ঝড়ু পাল মনের ভেতর এমন কাউকে ডাকে যে তাকে বলে দিবে হাইল্যা কেমন ছিল? কিভাবে মাঠে চাষ হত, ফুরকুনি নামে এই দুনিয়াতে কেউ ছিল কিনা? ঘাটের পথ কোন পথে থাকে, ফুরকুনি বুড়ির মুখ কার মতো। আর পোয়াতি? ঝড়ুর সামনে খাপে খাপে দৃশ্য আসে; এক মাস দুই মাস বাড়ছে মাঠের পেট, সাত মাইস্যা পেটের উপর চলছে চাকা। কলিজা বের করে চিৎকার করছে ফুটু বহির‌্যা  ‘ওইদ্যা বৈ… ওইদ্যা… ধরো রে… মারো রে… সাত মাইস্যা মাঠ আমার শেষ হইয়্যা গেল রে… ’ মাঠের নিু ভূমিতে জমলো রক্ত… চাকা খাইলো, চাকা আইলো, ঝড়ু পালের দৃশ্য ভেদ করে গড়তে লাগলো হাজারো চাকা, অমনি ঝড়– পাল বলে উঠলো ‘কে যাই? কে যাই? ‘ঝড়ু আমরা দুনিয়ার গতি, আমাদের তুমি চিনবা না…’

তিন
বেলা বাড়ে পাল পাড়ায়। এ পাড়ার কাঁচা হাড়িতে রোদ লাগলে পেটের নাড়ি নড়ে ওঠে। একচালা দো’চালা ঘর থেকে হাড়িগুলো রোদে শুকায় বউ-বেটিরা। পাল পাড়ার বাপ ছেলেরা কেউ গণনা জানে কেউ জানে না। এরা সবাই আলকাপের পোঁকা। গণনা জানে এমন কেউ এপাড়ায় ঢুকলে ঘর গুনে পায় ১৯ খানা। আবার এক চালা দো’চালা করে গুনলে লাগে গোলমাল, সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩ খানা। শুধু ঘর নয়, যে কোনো গননা উঠলে এই পাড়ার একটা অভিমান হয়ে ওঠে। পাল পাড়ায় ছয় এর ব্যাবধান লেগেই থাকে। কখনো ঘর গণনায় ছয় বাড়ে কখনো কমে। একবার কোনো এক আদমশুমারিতে পাল পাড়ার মানুষের সংখ্যা ছিল অমমিাংসিত। ঝড়ু পালকে গুনতে গিয়ে সংখ্যা খাচ্ছিল হিমশিম। গণনাকারী যখন ঝড়ুকে এক হিসেবে গুনছিল তখন ঝড়ু তাতে বাধ সাধে। ঝড়ু গননাকারীকে বলছিল ‘আমার উপরের অংশ নড়েচড়ে, নিচের অংশ নড়েচড়ে না। তার মানে আমি অর্ধেক। নড়েচড়ে না অংশ কি মানুষ? আর যদি গুনতে হয় তাহলে আমার বসে থাকা কাঠকেও মানুষ হিসেবে গুনতে হবে।’ আর এভাবেই শুমারির খাতা থাকে অমিমাংসিত। ঝড়ুকে গুনতে গিয়ে কখনো অর্ধেক, কখনো এক, আবার কখনো দেড় হয়। আর অমনি ঝড়ু পাল বলে উঠে কে যাই? কে যাই…. ‘কাকা আমরা গননা। তুমি আমাদের চিননা।’ ‘তোমার উত্তর হয় নাই…’

মেঘ ঢাকো ঢাকো করলে পাল পাড়ার ঘরে ঘরে কাঁচা মাটিগুলোর জীবন শুকায়া যায়। জয় চাঁদদের কলিজাতে পানি জমে। মাটি গলে গেলে তাদের জীবন গলে যাবে। পাল পাড়ার মাটি কেবল ভাতের হাড়ি হতে জানে, মাড়ের শানকি হতে জানে। তাইতো বেলা বাড়ার সাথে সাথে আর সবার মতো জয়চাঁদও মাটি নিয়ে বসে গেছে। আর ক’দিন বাদে রথের মেলা। জয়চাঁদের স্বপ্ন এবারের মেলায় কিছু শখের হাড়ি আর টিয়া পাখি বানাবে। ঠিক তাই জয়চাঁদের হাতের যাদু আর মাটির খাম খেয়ালি চরকা ঘুরে মাটি নিয়ে। পাল পাড়ার নামে রোদ। জয়চাঁদ সখের হাড়িতে লাগায় খড়ি মাটির প্রলেপ। মাটির ঘোড়া, টিয়া পাখি, রাজকন্যারা রোদের মুখে হাসতে থাকে। দুই আঙুলের চাপে এক একটা ট্যাপা পুতুলের জন্ম দেয় শ্রীমতি। সেই ট্যাপার মুখে লাল বাদামি রঙ মাখায় সে। কিন্তু শ্রীমতির মন ভরে না। তার মনের আকৃতি কিছুতেই যেন ট্যাপার মুখে আটকায় না। শ্রীমতি যখন ট্যাপা পুতুলের গায়ে বাদামি রঙ তুলে তখন তার মনে পড়ে তার গর্ভের একটা ট্যাপা পুতুলের কথা। তার গায়ের রঙ ছিলো কালো। পলি মাটির মতো। কোনো এক ভাদ্র মাসে পাল পাড়ায় ঢুকে পড়া বানে গর্ভের পুতুলটা গলে গিয়েছিল। শ্রীমতি সেই থেকে ঠ্যাপা পতুল বানায়। সেই থেকে ট্যাপা পতুলের জন্ম। গর্ভের পুতুলটার মতো মাটির পুতুল তৈরি করার চেষ্টা করে শ্রীমতি। কোনোটা হয় কোনোটা হয় না। শ্রীমতির ইচ্ছে করে ট্যাপাগুলোর গায়ে পলির রঙ মাখতে। কিন্তু রথের মেলায় কালো রঙের ট্যাপা বিকোয় না। গেল বছর অনেক কালো কালো ট্যাপা পুতুল বানিয়ে জয়চাঁদ কে দিয়েছিল মেলায়। কিন্তু কালো বলে কোনোটায় বিকোয়নি। শ্রীমতি সেইসব ট্যাপাগুলোকে তার বিয়েতে পাওয়া ট্রাংকের ভেতর রেখে দিয়েছে। মাঝে মাঝে ট্রাংক খুলে ট্যাপাগুলো দেখে শ্রীমতি। আর গর্ভের সেই ট্যাপা পুতুলটার কথা মনে করে।
এদিকে জয়চাঁদ তার বাবার মতো একটা টিয়া পাখি বানাতে চেষ্টা করছে সেই ভোর থেকে। কিন্তু কিছুতেই বাবার মতো টিয়া বানাতে পারছে না। টিয়ার দেহের বাঁকটা বাবার হাতে যেভাবে মোচড় দিয়ে উঠত; তা কিছুতেই জয়চাঁদের হাতে খেলে না। জয়চাঁদ টিয়ার পাখাটায় খুব করে উড়াল দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু পাঁজরের বাঁধনটা কোনো ভাবে বাধে না। পায়ের টান টান নেশাটা হয়েও হয়না। জয়চাঁদ বার বার চরকা থেকে উঠে। বাবার কাছে যায়। বাবার হাত ছুয়ে এসে আবার বসে। কিন্তু নাহ! ছোট বেলা বাবার পাশে বসে দেখা সেই টিয়া যেন আর নেই। একবার রাগ করে টিয়ার মাটি আছড়ে মারে চরকায়। আরেকবার সেই এবড়ো থেবড়ো মাটি নিয়ে বাবার সামনে তুলে ধরে। বলে ‘বাবা কিভাবে তুমি টিয়া বানাতে বলো দেখি? ক’দিন বাদে মঙ্গলবার, রথের মেলা। টিয়া পাখি না হলে কি রথের মেলা জমে?

ঝড়ু পাল ঠাহর করতে পারে না মঙ্গলবার কি জিনিষ? টিয়া পাখি কি জিনিষ? হা করে জয়চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চাহনি একটা টিয়া পাখি হয়। একটা মঙ্গলবার হয়। রথের মেলার দিকে ঝড়–পালের চাহনি হাটতে থাকে, ধির পায়ে। মেলা বসার আগে ঝড়–পালের চাহনি বসে বসে অপেক্ষা করে রথের মেলায়। রোদে শুকাতে দেওয়া হাড়িগুলো উপুড় করতে করতে শ্রীমতি ঝড়– পালের সামনে গিয়ে পৌছে। ঝড়–পাল শ্রীমতিকে দেখে দেখার পদ্ধতি ঠাহর করে বেড়ায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে বলতে লাগে

‘মঙ্গলবার কি জিনিষ? রথের মেলা কোয়ায় হয়? টিয়া পাখি মাটির কেন? মাটি কোন রকমের পাখি? মাটি কোথায় থাকে, মাটি কি খায়? শ্রীমতি শ্রীমতি কে যায়? শ্রীমতি বলে ‘বাবা আমি, রোদে হাড়ি ওলোট পালট করি, ডান থেকে বামে যাই।’ ঝড়ু পাল চুপ করে বোঝার চেষ্টা করে ডান থেকে বামে কিভাবে যাওয়া যায়? কোন দিক ডান দিক? কোন দিক বাম দিক?…

আর এভাবেই যাই যাই করতে থাকে বেলা, শ্রীমতি হাড়ি নিয়ে রোদের পিছে পিছে দৌড়াতে থাকে। মাঝখানে বসে থাকে ঝড়ু পাল। ঝড়ু পালের ডান দিকে ছায়া থেকে বাম দিকের রোদে হাড়িগুলো সরিয়ে নিচ্ছে শ্রীমতি। এই জন্য ঝড়ু পালের সামনে দিয়ে বার বার আসা যাওয়া করছে। আর ঝড়ু পাল বার বার কে যাই? কে যাই? করছে। শ্রীমতি ঝাড়া পায়ে হাটতে হাটতে দিচ্ছে উত্তর ‘বাবা আমি, আমি যাই।’ ঝড়ু পাল বলে উঠে ‘তোমার উত্তর হয় নাই।’

বেলাটা যায় যায়। শ্রীমতি আবার ঝড়ুর সামনে দিয়ে যায়, আবার ঝড়ু পাল বলে উঠে ‘কে যাই?’ শ্রীমতির হাত ফসকে ভাতের হাড়ি ভাঙে। থমকে গিয়ে বলে উঠে ‘বাবা আমি শ্রীমতি, হতভাগ্যের এক খণ্ড মাটি। চরকায় উঠে তস্তরি হতে চাইছিলাম। এখন খালি হাত ফসকে ফসকে ভাঙি।’
ঝড়ু পাল কয়েকবার ঢোক গিলে, হাত চোখ গিলে নেয় কয়েক হাজার ডুমুর। শ্রীমতি শেষ কয়েকখান হাড়ি নিয়ে আবারো অতিক্রম করে ঝড়ু পালকে। অমনি ঝড়– পাল বলে ওঠে ‘কে যাই? কে যাই?’ শ্রীমতির রক্তগুলো বিরক্ত হয়ে ছিটকে পড়ে। বলে উঠে ‘বাবা আমি, আমি, আমি।’

ঝড়ু পাল একা একা বলতে থাকে ‘আমি কার নাম? শ্রীমতি কি আমি? আমি’র নাম কি?’ হাড়ি থেকে শ্রীমতির রোদ গুটিয়ে যায়, ঝড়ু পাল বলতে থাকে ‘কে যাই? কে যাই? উত্তর করার কেউ থাকে না। ফাকা জায়গাটা হো হো করে হাসতে থাকে…

চার
সন্ধ্যা নামছে পাল পাড়ায়। ঝড়ু পালের সামনে খসে খসে পড়ছে সময়। ঝড়–র চোখ দেখতে পাচ্ছে কাঁটালাগা সময়ের মাথা, মরে যাওয়া ষাড়ের তলপেট। গ্রহ নক্ষত্রের ছেঁড়াফাটা জামা। ঝড়ুর পিঠের মধ্যভাগ ভীষণ চুলকিয়ে উঠেছে। ঝড়ু তার পেছনের দাঁড়িয়ে থাকা তেতুল গাছকে বলে উঠছে ‘ওরে তেতুল গাছ, কতকাল হইল আমি থাকলাম বসে, তুই থাকলি দাঁড়িয়ে, জায়গাটা বদল হইল না।’

ঝড়ু দেখে সন্ধ্যার হাওয়া তেতুল গাছের পাতায় খেলছে। বৃষ্টির মতো ঝরছে তেতুলের চুলচিরনির পাতা। পাতাগুলোর উপর ঝড়ুর মুমুর্ষ দৃশ্য ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে চোখে। ঝড়ু বার বার তার জিহ্বার কাছে গিয়ে ফিরে আসছে তবু ’জীবন’ শব্দটি উচ্চারণ করতে পারছে না। কেন জানি তার আকাঙ্খা তীব্র হয়ে উঠছে অন্তত একবার ‘জীবন’ শব্দটি উচ্চারণ করতে। কিন্তু নাহ! ঝড়ু পাল মনের চরকায় চড়ে কখনো তার তের বছরে, কখনো উনিশ বছরে গিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। নাহ! কখনো কি ‘জীবন’ শব্দটি উচ্চারণ করেনি সে। ’জীবন’ উচ্চারণ করতে গেলে কতটুকু হা করতে হয়। কীভাবে জীহ্বা বাঁকাতে হয়। বুকের বাতা ভেঙে কিভাবে বাতাস আসে চোয়ালে? নাহ! কোনোভাবেই ‘জীবন’ কমলার আকৃতি খুঁজে পাচ্ছে না ঝড়ু পাল।
ঝড়ুর ভেতরটা বাহির হয়ে আসছে। কাঁচা বাঁশ ভাঙার মতো মড় মড় করছে। রাগে ক্ষোভে দুনিয়াটাকে দিচ্ছে গালি ‘ ওরে দুনিয়া যদি পারতাম আমার পা তোর কপালের মোটা কাটায় ঝুলিয়ে রাখতাম।’ ঝড়ুর চোখ দেখতে পাচ্ছে, দুনিয়াটা একটা তেতুল কাঠের জোড়া দরজা, তার কপালে পোতা আছে মোটা একটা কাঁটা। সেই কাটায় ঝুলছে ফিঙে পাখির গলা। আর এভাবেই নানা ভাবনার ভেতর ঝড়ু কিছুতেই আয়ত্তে আনতে পারছেনা ‘জীবন’ কিভাবে উচ্চারণ করতে হয়।
আকাশ মেঘ মেঘ করে। অন্ধ হয়ে আসে সন্ধ্যা। জয় চাঁদ, শ্রীমতি কাচা হাড়ি পাতিল সাটাসাটিতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। জয়চাঁদ আকাট-বাকাট স্বরে বলে ‘শ্রীমতি রথের মেলার ঝাঁকা?’ ‘হ্য তুলেছি, পৌণ ঘরের উত্তর কড়ে’। ‘ট্যাপা পুতুল?’ ‘কবুতরের খাপে’ আর ভাতের হাড়ি? ‘সব তো আর ঘরে ঠাই হয়নি, কিছু থেকে গেল তুলসি তলায়’। জয়চাঁদ ধুতি সামলাতে সামলাতে আবারো বলে উঠে ‘শ্রীমতি পশ্চিমের মেঘের গতি ভাল না, পাতিলগুলোর বোধ হয় আর রক্ষা নাই।’ শ্রীমতিরা হাড়ি পাতিল সামলাতে সামলাতে বেমালুম ভুলে গেছে, তেঁতুল তলায় তাদের আরো একটা ফাটা হাড়ি থেকে গেছে। মেঘ থেকে চিলিক পড়ছে। কে জানে হাড়িটা গলে যাবে কি না। পশ্চিমা মেঘ থেকে ফুটফাট বৃষ্টি যেন পাল পাড়ায় নেমে আসা বোমা। জয়চাদ শ্রীমতি ছুটে আসে তেঁতুল তলায়। দেখে ঝড়ু পাল একা একা কে যাই? কে যাই করছে। আর বৃষ্টির ফোটাগুলো ঝড়ু কে বলছে ‘ ঝড়ু আমরা পশ্চিমা মেঘের পুত্র, মাথা খাইতে যাই। আমাদের তুমি চিনবা না।’
ব্যাস বৃষ্টিার ফোটা অজস্র হতে লাগলো। ঝড়ুর বসে থাকা টুলের একপ্রান্ত ধরল জয়চাঁদ, আরেক প্রান্ত শ্রীমতি। এরপর ডাঙ্গাডুলি করে ঘরের দিকে চলতে লাগল তারা। টুলের মাঝখানে বসে ঝড়ু পাল টলমল করতে লাগলো। ঝড়ু পাল প্রতিদিনের মতো পৌছালো আরেক তরফায়….

ঝড়ু পাল তার দড়ির খাটে একতরফা শুয়ে শুয়ে ‘জীবন’- এর নেশাটা সামলাতে পারে না। তুমুল বৃষ্টি মাথায় করে পালপাড়া ততক্ষণে কাবু হয়ে গেছে। হাড়িগুলো গলে যাচ্ছে। ঝড়ু পাল হৃৎপিণ্ডটাকে উজানে ঠেলে দিয়ে আবারো ’জীবন’ উচ্চারণ করার চেষ্টা করছে। নাহ! কিছুতেই হচ্ছে না। চালার পানি ছিটে ছিটে পড়ছে ঝড়ুর বুকে। ঝড়ু নিশ্বাস বৃষ্টির দিকে ছুটে গিয়ে কিছুক্ষণ ভিজে আসছে। আর ‘জীবন’ কিভাবে উচ্চারণ করতে হয় তার কৌশল ভেতর থেকে মুখে আনার চেষ্টা করছে। এই করতে গিয়ে তার মুখ-বিবরের কলক্বজা নিথর হয়ে আসছে। নাহ! ঝড়ুর জিহ্বা লম্বা হতে হতে দশ হাত হয়। দাঁতগুলো মাড়ির ভেতর নাম লুকায়। চোয়াল দুটো জোঁয়াল হারা ঘাড়ের মতো জোঁতা ছিঁড়ে বের হয়। তবু ‘জীবন’ উচ্চারণ আর হয়না। তবু ঝড়ু প্রাণখাটা মজুরিপনা, ফুসফুস থেকে বাতাস ছাড়ে, সেই বাতাস মুখের ভেতর অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে ধাক্কা খায়। ঝড়ু আকাট-বাকাট করে। তার বাকযন্ত্র ‘জীবন’ উচ্চারণ করতে গিয়ে উচ্চারণ করে ‘তালা’। জীবন এর বদলে তালা? ঝড়ু অবাক হয়ে চারিদিকের দৃশ্য ঠাহর করে। আবারো চেষ্টা করে জীবন উচ্চারণ করতে। কিন্তু যতবার ‘জীবন’ উচ্চারণ করতে যায়, ততবার তার বাকযন্ত্র তাকে ফাঁকি দিয়ে উচ্চারণ করে দেয় তালা। জীবন? তালা? হ্যাঁ তালা। জীবনের বদলে ঝড়ুর বাকযন্ত্রে উচ্চারিত হলো তালা…

পাঁচ
জীবন উচ্চারণে ক্ষান্ত হলো ঝড়ু পাল। দীর্ঘ ক্ষান্তির পর ঝড়ু দেখল, তার কাত হয়ে থাকা চোখের সামনে তালা যাচ্ছে, তালা আসছে… এক তালা আরেক তালার গলা ধরে লুটেপুটি খাচ্ছে। আদরে আদরে বড় হচ্ছে তালার বাচ্চা। উঠতি তালাটা দুই বাহু আকড়ে ধরে মাস্তানি করছে। বাড়তি তালাটা ঘাড় আর মাথাটাকে টেনে ধরে ফূর্তি করছে। হরেক রকম, তালা’য় তালা’য় দহরম-মহরম। ঝড়ুর সামনে দিয়ে পিঁপড়ার মতো লাইন দিয়ে যাচ্ছে তালার দল। যেতে যেতে তুলছে চাবির ঝনঝনানি। এক অপরের সাথে প্যাচ লেগে বলছে ‘জগত হইল খাঁচার আড়া আমরা তার পাগলপারা।’
এই করতে করতে তালাগুলো দেখতে পায় কাত হয়ে থাকা ঝড়ু পাল যেন একটা তোপন্তর। তার দেহে ঝুলে যাবার মতো কোনো কব্জা নাই। তাইতো জোয়ান তালাটা ঝড়ুর চোখের পলকে ঢুকে পড়ে। অমনি ঝড়ু চোখ বন্ধ করে বলে ওঠে ‘কে যাই? কে যাই?’ তালার দল বলে ওঠে ‘ঝড়ু আমরা। মানে এক কব্জা ধরি। আরেক কব্জা মারি। আমরাই জীবন’…

ঝড়ু পাল এবার দড়ির খাটে শুয়ে শুয়ে প্রথমে তার ভিটার সদর দরজায় দিয়ে ঢুকে। দেখে, দুই পাল্লার দরজাতে ঝুলছে একটা পিতলের তালা। এই দেখে, ঝড়ুর মগজের ভেতর একটা বিকট শব্দ খসে পড়ে। ঝড়ু শব্দটাকে জমা রাখে তার গণনার খাতায়। সদর দরজা পার হয়ে ডান দিকে তাকায়, দেখে বহুদিনের পড়ে থাকা একটা কাঠের বাক্স। বাক্সটার তলা খোলা, উপরটা ঢাকনা ওয়ালা। ঢাকনার দুই প্রান্তে ঝুলছে দুটি তালা। ঝড়ু এবার বাম দিকে তাকায়, এক’পা দু’পা করে সামনে পড়ে ছেলে জয়চাঁদের ঘর। দেখে ওই ঘরের বুকের মাঝ বরাবর ঝুলছে চায়না একটা তালা। ঝড়ু চায়না তালাটার গায়ে হাত দিয়ে উপরের দিকে তাকায়, দেখে দরজার কপালে ঝুলছে একটা ইন্ডিয়ান তালা। ঝড়ুর মগজে একটা-দুইটা-তিনটা-চারটা বিকট শব্দ। ঝড়ু শব্দগুলো কুড়িয়ে জমা রাখে তার গণনার খাতায়।
ঝড়ু পাল জয়চাঁদের ঘরে ঢুকে দেখে, চড়া রঙের বার্ণিশ করা টিনের একটা ট্রাঙ্ক, বুঝতে পারে বহুদিন আগে শ্রীমতির বাবা এই ট্রাঙ্কটা উপহার দিয়েছিল। ঝড়ু ট্রাঙ্কটা হাতড়ায়, হাতে বাধে একটা বাচ্চা তালা। তালাটা খটমট করে ঝড়ুকে বলে ওঠে ‘ঝড়ু আমি তালার বাচ্চা, আমি কোথাও যাই না।’

ঝড়– জয়চাঁদের ঘরের চালায় চোখ রাখে, দেখে আলকাতরা একটা বাঁশের সাথে আরেক বাঁশের তালা মারা। অবাক হয়ে নিচের দিকে চোখ ফেরাতেই ভেসে ওঠে শ্রিমতির ঘুমন্ত মুখ। ঝড়ু দেখে, শ্রিমতির মুখটা যেন বড় একটা তালা; গলার সাথে লেগে আছে। ঝড়ু পাল শ্রীমতির কানের দিকে তাকায়, দেখে দুই কানে দুটি তালা ঝুলছে। নাকের দিকে দেখে, সেখানেও লেগে আছে ক্ষুদ্র এক তালা।
এবার ঝড়ু জয়চাঁদের নিশ্বাসের দিকে এগিয়ে যায়, দেখে জয়চাঁদের নিশ্বাস তালার ছিদ্র বেয়ে বড় কষ্টে আসা-যাওয়া করছে। ঝড়ু জয়চাঁদের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। এক’পা দুই’পা করে পৌঁছায় উত্তর ভিটায়। ওটা পৌন ঘর। হাড়ি পোড়ে সপ্তাহে। চারিদিক খোলা। ঝড়ু পাল পৌন ঘরের মাঝখানে দাড়ায়। দেখে, খড়ের চালা ভেদ করে একটা বাশের কি বেরিয়ে আছে। কি র মাথায় ঝুলছে জয়চাঁদের শার্ট। ঝড়ু শার্টটি হাতে নেয়। নেড়ে চেড়ে দেখে শার্টের বুকের উপর সাতটি তালা। শার্টের হাতে একটি করে দুটি তালা। ঝড়ুর মগজে বিকট শব্দ বাড়তে থাকে…
ঝড়ু এবার পৌন ঘর থেকে দক্ষিন ভিটায় যায়। ওটা পোড়া হাড়ির একচালা ঘর। ঘরের মাঝখানে টানানো আছে পাটের দড়ি। দড়িতে পাশাপাশি ঝুলছে শ্রিমতির ব্লাউজ, জয়চাঁদের ধুতি। ঝড়ু ব্লাউজ টেনে দেখে, ব্লাউজের বুকের উপর পাঁচটি তালা। ঝড়ু ভাবে জয়চাঁদ আর শ্রিমতির ১২ তালার জীবন।
আর এভাবেই ঝড়ুর গণনার খাতা ভরতে থাকে তালায় তালায়… ঝড়ু পুব ভিটায় করমচা গাছের কাছে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে দেখতে পায়, গাছটা যেন মাটির সাথে তালা মারা। ব্যাস্ ভিটামাটি ঘুরতে না ঘুরতে ঝড়ুর মগজ ভরে যায় তালার স্তুপে। এভাবে ঝড়ু পাল পাড়ার এবাড়ি ওবাড়ি যায়। দেখে তালা আর তালা। তালা গুনে হাপিয়ে ওঠে ঝড়ুর মন। ফিরে আসে খাটের এক তরফায়।
ঝড়ু পাল তার তালা গনা ক্লান্ত মনকে হাত বুলিয়ে দেয়। তালার চাপায় বিভ্রম যেন আর কাটে না। ঝড়ু এবার তার মনকে পালাপাড়ার মাথার উপর চলে যাওয়া পুলের উপর পাঠায়। পুলের ডান পাশে মহানন্দা নদী, বাম পাশে মরিচার বিল। মাঝখানে স্লুইস গেট। ঝড়ু স্লুইস গেটের উপর দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকায়। দেখে, নদীটা ধীর। আগের দিনে স্রোতের তোড়ে নদীর বুক ধড়ফড় করত। অথচ নদীর বুকে স্রোতে কারা যেন তালা দিয়েছে। বিলের দিকে তাকিয়ে দেখে, মাথা নিচু করা হাইব্রিড ফসল। খরায় খরায় ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির। এই ফসলের মাঠ যেন তালা মারা। নাহ! ঝড়ুর দৃষ্টি ফিরে আসে স্লুইস গেটের উপর। দেখে, স্লুইস গেট একটা পানি আটকানো তালা। এই পুলটা নদী ও বিলের মাঝখানে তালা হয়ে শুয়ে আছে। ঝড়ু পাল তালা মারা মাঠ-ঘাট থেকে ফিরে আসে দড়ির খাটে। তার বুকটা ধড়ফড় করছে। তবে কি মানুষের বুকও তালা মারা?
ঝড়ুর মন এবার পালপাড়ার বাহির পথে হাটতে থাকে। চুনারি পাড়া পার হয়, গুড়ি পাড়া, দহাপাড়া অতিক্রম করে। বাইশ পুতুল তলায় গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে গিয়ে দেখে নানা রঙের মানুষ থৈ-থৈ করছে। এক মানুষ আরেক মানুষকে ছোট করে বড় হচ্ছে। মরে যাচ্ছে মানুষের বুকের ধড়ফড়ানি। কারা যেন মানুষের বুকে তালা মেরেছে। বাইশ পুতুলের উচু মাটির ঘর। ওই ঘরের চর্তুদিকে ঝুলছে তালা। থানে দাড়িয়ে থাকা দূর্গা, কার্তিক , গণেশ, স্বরস্বতি, ওদের হাতে পায়ে ঝুলছে তালা।
নাহ! বাইশ পুতুল থেকে ঝড়ু হাটতে থাকে গঞ্জের দিকে। খেয়া ঘাটের পথে যেতে পাড়ি দেয় ধোপা পাড়া। কিন্তু তার সেই ঘাট আর নেই। এখন নদীর উপর মহাসড়ক। যেন নদীর দুই কূল আকড়ে ধরে আছে একটা উড়াল তালা। ওই তালার উপর হাঁটতে হাঁটতে গঞ্জে পৌছায় ঝড়ু পাল। সেখানকার অচেনা প্রবাহ দেখে তার মাথা গোলমাল হয়ে ওঠে। দেখে, মসজিদ আটকে আছে তালায়। বিদ্যায়লয় ঝুলছে তালায় তালায়…। এই দেখতে দেখতে ঝড়ু দালানে ধাক্কা খায়, কোঠায় কোঠায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে। গঞ্জের ঘর বাড়ি থেকে সমস্ত তালা বেরিয়ে এসে ঝড়ু পালকে ঢেকে ফেলে। ঝড়ুর মগজে অবিরত বজতে থাকে বিকট শব্দ।
অবশেষে ঝড়ুর মন ফিরে আসে দড়ির খাটে। তালায় তালায় ঝড়ু বকতে থাকে অঘোরে ‘বয়স হলো আঠারো তালা হলো ছত্রিশ। দাঁত হলো বত্রিশ, তালা হলো চৌষট্রি।’ আর এই বকতে বকতে ঝড়ুর চোখের সামনে চিথল, পাবদা উড়াল মারে… এমন সময় ঝড়ুর চোখে কে যেন তালা মারে। ঝড়ু তালাবন্দি হয়ে চোখের ফতা উল্টিয়ে দেয়। অঘোরে বলতে থাকে ‘তালা কি জিনিস? তালার জন্ম কোথায়? ঘাটে-মাঠে-বুকে কারা তালা দিয়েছে? ‘কে যাই?… কে যাই?… ’ ‘ঝড়ু আমি বহমান কাল, আমারে তুমি চিনবা না’, ঝড়ু পাল একা একা বলতে থাকে ‘তোমার উত্তর হয় নাই, তোমার উত্তর হয় নাই’।

🌱

পিন্টুকাকা

এক

আমরাতো অনেক মানুষ দেখেছি কিন্তু কোনো দিন মানুষ দেখিনি। মানুষরা সম্ভবত কোনো মানুষ দেখতে পায় না। কারণ সেওতো একটা মানুষ। গাছেরা কোনো দিন গাছ দেখতে পায় না পাখিরা যেমন কোনো দিন পাখি দেখেনি। মাটি কি কখনো বুঝতে পারে সে মাটি? তাহলে এতো দিন কাকে দেখলাম? কি দেখলাম? আমরা যখন গাছের দিকে তাকাই তখন কি আমরা গাছ দেখি নাকি নিজের আত্মপ্রতিকৃতি চোখে পড়ে। ধরা যাক গাছেরা যখন মানুষ দেখে তখন কি তারা মানুষ দেখতে পায়? সম্ভবত গাছেরাও মানুষের ভেতর গাছ দেখে।

এসব কথা বলছিলেন পিন্টু কাকা। আমরা অবাক হয়ে শুনছিলাম। কত প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়েছিলো পিন্টু কাকাকে, কিন্তু তা করতে পারিনি। কারণ সেইদিন তার তালের রসে পানি মেশানো হয়েছিলো, কাকা বলছিল পৃথিবীটা আর থাকবে না। এই পৃথিবী মদের মর্ম জানে না, এই জগত পানির চেহারা দেখেনি। আমরা আবারো প্রশ্ন মুখে এগিয়ে গিয়েছিলাম, তার আগেই পিন্টু কাকা বলতে লেগেছিলো, আমার চোখের তিন ভাগ, এক ভাগ দেখে, এক ভাগ কাঁদে আরেক ভাগ গোলাপ ফুল। এই কথা বলেই পিন্টু কাকা গান গাইতে লাগলো…

কেন কান্দ তাহার তরে…                                                                                                                                                  পতি ধন তার নাই কি ঘরে                                                                                        চোখের পানি ঝইরা পড়ে                                                                                                                                                নদীর পানি গায়,                                                                                                                 আওলা চুল বাতাসে উড়ে                                                                                                                               ঘোমটা নাই মাথায়…

 

এই গান শেষ হতে না হতে কাকা চলে গেলো তার আপন পথে। কেউ কেউ বললো পাগলা, মাতাল… কেউ কেউ বললো পিন্টুতো আলকাপ গানের দহরিদার ছিলো, তাই একটু আধটু গান জানে। আমরা ভেবেছিলাম, মানুষ কেন মানুষ দেখতে পায় না? গাছেরা কীভাব মানুষ দেখে। সেদিন কোনো উত্তর মেলেনি ঠিকই কিন্তু পুনরায় পিন্টু কাকার দেখা মিলেছিলো। দেখা মিললে কি হবে, তাকে যেন আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম না। কারণ পিন্টু গাইছিল গান, সোনার দেশের সোনার কন্যারে, কন্যার রূপ ঝলমল করে, নিলুয়া বাতাসে উড়ে কন্যার শাড়ির অঞ্চল রে, সোনার দেশের সোনার কন্যারে। যখন তার গান থামলো, তখন তাকে বলেছিলাম, কাকা আপনি কি মানুষ? আমরা কি আপনাকে দেখতে পাচ্ছি? কাকা বলেছিল, আমি তো অদৃশ্য, তোমরাও তো অদৃশ্য। এখন বলো একটা অদৃশ্য কীভাবে আরেকটা অদৃশ্যকে দেখে? খুব প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়েছিল, পিন্টু কাকা, আপনার হাত পা আর পুরো দেহটাই তো দেখা যাচ্ছে, তথাপি আপনি কীভাবে অদৃশ্য? কিন্তু সে প্রশ্নের আগেই কাকা বলেছিলোÑ বাপ মানুষের দেহ হচ্ছে জমাট অন্ধকার, এই অন্ধকার দেখা যায় না। এই যে তোমরা আাকে দেখতে পাচ্ছ না তার কারণ তোমার চোখ নানান ভাগে বিভক্ত। তুমি ঠিকই মৃতদের দেখতে পাবে কারণ তোমার চোখ ওই ব্যক্তিকে দেখার ক্ষেত্রে কোন প্রকার ভাগ হয় না।

আর এভাবেই পিন্টু কাকা বিশ্বাস করতো মানুষ মানুষকে দেখতে পায় না। যাকে তাকে সে বলে বেড়াতো তুমি একটা অদৃশ্য। এমন কথায় পিন্টু কাকাকে পাগল কিংবা মাতাল বলে ক্ষমা করে দিতো সবাই। কিন্তু পিন্টু কাকা কাউকে ক্ষমা করতো না।

ধরা যাক, গত রাতে পিন্টু ঘুমাতে পারেনি, এই জন্য সে দায়ী করতো তার নিজের চালানো নৌকা কে? পিন্টু কাকার ঘুমের জন্য কেন তার নৌকা দায়ী? এই প্রশ্নের উত্তর কোথাও পাওয়া যেত না। মাঝে মাঝে পিন্টু কাকা এসব প্রশ্নের উত্তর করতো নিজের মতো করে। যা শুনে মনে হতো পিন্টু কাকাকে সত্যি সত্যি আমরা দেখতে পাই না। তার ঘুম চুরি করে নৌকাটা নদীর ধারে ঘুমায়। কারণ নৌকাটার তল ফুটা হয়ে গিয়েছে। নৌকাটার দীর্ঘদিন গলা বাধা রয়েছে অভাবের খুঁটিতে। পিন্টু কাকা কতদিন ধরে ধরে আমাদের গল্প শুনতো! বলতো তোমরা আসলে কে? আচ্ছা নদী মানে কি? তোমরা কি জানো! তোমরা কি নৌকার গতি হজম করতে পারো? জানো আমার নৌকাটা ভীষণ তৃষ্ণার্ত ছিলো। বহুদিন পানির ওপর ভেসে বেড়িয়েছে, কিন্তু কখনো পানি খেতে পাইনি। তার পাকস্থলি থেকে আমি পানিগুলো তুলে ফেলতাম। সে বহুদিন আমার সঙ্গে থেকে তার হাড় ক্ষয় করেছে। একদিন বুক ফেড়ে দিল প্রাণ ভরে পানি খেল। আমি উঠলাম ডাঙ্গায়। ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারছি না মানুষ পানি খেলে কি তার দেহের গতি বাড়ে? নৌকা পানি খেলে তার আর গতি থাকে না। এই বলে চলে যেতো, কি ভেবে ফিরে এসে বলতো, তোমাদেরও কিন্তু প্রকৃত গতি নেই কারণ তোমরাও জীবনের নামে অনেক পানি খেয়েছ। আমরা আশ্চর্য হতাম লোকটা কি বলছে নিজেই জানে না, তৎক্ষণাৎ মনে প্রশ্ন জাগতো পিন্টু কাকা কি বলছে আমরাও কি জানি? আলকাতরা মাখা কাঠের নৌকা নিয়ে তার অনুভূতি তৎক্ষণাৎ ভাবিয়ে তুলতো। কে জানে আমাদের তৎক্ষণাৎ ভাবনাগুলোই পিন্টু কাকার আজীবনের ভাবনা। পৃথিবীতে হয়তো কোনো কিছুরই মানে নেই। পিন্টু কাকারও কোনো মানে হয় না। একদিন পিন্টু কাকাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম একই কথা,Ñআপনি কি জানেন আপনার মানে কি? কাকা বলেছিল কেউ কি জানে নাই দেখতে কেমন? এই যে, কেউ নাই ব্যাপারটা দেখতে পাই না তবু কীভাবে নাই ব্যাপারটিকে অনুভব করে। আবার অনুভব যদি ধাবনের অস্ত্র হয় তাহলে কেউ কি অনুভব দেখতে পেয়েছে? তাহলে কিসের মানে? কে কার মানে জানে। আর এভাবেই পিন্টু কাকাকে কিছু বলে কোন যশ পাওয়া যেত না। তার সোজা কথা আঁকাবাকা হয়ে ঘুরতো আমাদের মগজের ভেতর। আর খুব আশ্চর্য হতাম যখন সে বলতো, কোনটা স্বপন? ঘুমের ভেতরের দৃশ্য নাকি জেগে থাকার দৃশ্য। কেননা ঘুমের ভেতর যে দৃশ্য আছে তা কিন্তু জেগে থাকা দৃশ্যের মতোই কীর্তিকর। ফলে ঘুমের ভেতর সহজেই বোঝা যায় এটাই আসল, জেগে গলে মনে হয় স্বপ্ন। আর জেগে থাকার দৃশ্যগুলো ঘুমের ভেতর মনে হয় স্বপ্ন। ফলে আমার কোনো মানে নেই, যেভাবে মানে নেই জগতের। নইলে গতরাতে ঘুমের ভেতর দেখেছিলাম একটা ঘোড়া, ঘোড়ার দেহের ভেতর চারটা জানালা, ঘোড়াটা পেছন দিকে দৌড়াচ্ছে, কারণ সামনের দিকে নাকি যুৎসই কোনো গতি নেই। ভেবে পাচ্ছিলাম না, ঘোড়ার দেহের ভেতর জানালা কেন? আর কেনই বা ঘুমের ভেতর দেখা ওই ঘোড়ার দৌড়ঝাঁপ পেছন দিকে। যখন জেগে থাকি তখন নিজের মনকে ওই ঘোড়ার মতো লাগে। কিন্তু ঘুমের ভেতর দেখলাম ঘোড়াটা অবিকল মনের পেছন দিকের মতো। জগতে বাকি সব যেন স্থির। ঘুমের ভেতর জগতে সব কিছুই চলিষ্ণু। স্বপ্নের ভেতর ঘোড়াটা যখন দৌড়াচ্ছিল তখন একবার তার পা ছিলো একবার তার পা ছিলো না। পা গুলো হয়ে যাচ্ছিল তার দেহের জানালার সিক কাঠি। ভেবে পেলাম না এই রকম কেন দেখছিলাম? সম্ভবত ঘুমের ভেতর যখন দেখেছিলাম তখন চোখও ছিল চলিষ্ণু জেগে জেগে যখন দেখি তখন চোখ থাকে স্থির। ফলে কোনটা স্বপ্ন? ঘুমের ভেতর নাকি জেগে থাকার ভেতর? এবার তোমরাই বলো এই যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমরা কথা বলছি, এটা ঘুমের ভেতরের দৃশ্য নাকি জেগে থাকার কোনো বাস্তব দৃশ্য? এভাবেই ভেবে নাও নাÑ ঠিক এই মুহূর্তে জোনাকিরা ঘুমিয়ে আছে। সন্ধ্যা লেগে যাওয়া পর্যন্ত তারা ঘুমাবে, আর তারা এই দৃশ্যটাই এখন স্বপ্নের ভেতর দেখছে, আমাকে দেখছে জানালাওয়ালা ঘোড়া, দ্রুত পেছনের দিকে দৌড়াচ্ছি, আমার দুই পা আমার ঘাড়ের ওপর ওঠে হয়েছে কফিনের বাঁশ। হয়তো তোমাদের দেখছে, তোমরা মাথার ভরে হেঁটে যাচ্ছো, তোমাদের মনের উত্তর দিকে লেগেছে আগুন, দক্ষিণে লেগেছে মৌমাছি, পশ্চিমে ভাঙছে পাহাড়। তোমরা জোনাকিকে ভয় দেখাচ্ছো, জোনাকিরা স্বপ্নের ভেতর চমকে চমকে উঠছে, জেগে যাওয়ার চেষ্টা করছে। জোনাকিরা হয়তো এই দৃশ্যটাই দেখছে- যে, জোনাকিদের বাচ্চাকাচ্ছা কিভাবে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া যায় এই প্ল্যান তোমরা করছো আমার সাথে। অথচ ভেবে দেখো জোনাকিরা ঘুম থেকে জেগে দেখবে, তোমরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছো ‘আমার মানে কি?

দুই.

পিন্টু কাকার সাথে আমাদের মাঝে মাঝে দেখা হতো। আর বেশিরভাগ সময় অকারণেই সামনে এসে পড়তো পিন্টু কাকা। পিন্টু কাকা সামনে এলেই কেবল তাকে নিয়ে মস্তিষ্ক আগ্রহী হয়ে উঠতো। নচেৎ কখনোই হয়তো পিন্টু কাকার কথা মনেও আসতো না। যদিও কে যেন আমাদের শিখিয়েছে অপ্রত্যাশিত ব্যাপারগুলোই অকারণ। যা কিছু প্রত্যাশিত তা কোন না কোনভাবে কার্যকারণ। তারপরেও হয়তো অকারণ শত কারণের উৎস। পিন্টু কাকা হয়তো জগতে একটা অকারণ হতে পেরেছে। তার ভেতর শত শত অনিয়ন্ত্রিত কারণগুলো অকারণের রূপ নিয়েছে। নইলে পিন্টুর অকারণগুলো কেনইবা জগতের কারণগুলোকে লজ্জায় ফেলে। একদিন হঠাৎ আমাদের আড্ডায় তার কথা মনে পড়লো। ভীষণ হাস্যরসের ভেতর পিন্টু কাকা জ্ঞানের কাছে হাসির পাত্র হলো। কেউ কেউ বললো পিন্টুতো এই চায়ের দোকানে দুপুরবেলা থালা বাসন ধৌত করতো কিন্তু বিগত সাতদিন তাকে থালা বাসন ধুইতে দেখা যায়নি। কিন্তু কোথায় গেল পিন্টু? তার তো ঘর সংসার নেই, তার জন্য আহা করবার কোন প্রাণীও তো জগতে নেই। উন্মুখ হয়ে উঠল আমাদেরও কৌতুহল। কোথায় গেল পিন্টু কাকা। কেউ কেউ বললো কদিন আগেও এক নাপিতের দোকানে তাকে দেখা গিয়েছিলো। সে নাকি নাপিতের দোকান থেকে কিছু চুল পলেথিনে ভরে নিয়ে এসেছিল। বসেছিলো ডোম পাড়ার জোলার ভেতর। মিলিয়ে মিলিয়ে দেখছিল কার মাথার চুল এগুলো। চুলের গোড়া দেখে দেখে ওই মাথাগুলো সনাক্ত করছিলো। পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে তাকে দাঁড় করিয়েছিলো। আর ওই পথচারীকে বোঝাচ্ছিল চুলগুলো যখন মাথায় মাথায় ছিলো তখন ঠিকই এদের একটা পরিচয় ছিলো, কিন্তু এখন সেই পরিচয় এই চুলগুলো হারিয়ে ফেলেছে। মাত্র কিছু সময়ের ব্যবধানে এই চুলগুলো পরিচয়হীন। এখন আর বোঝা যাচ্ছে না এরা কোন মাথার কোন মর্যাদার চুল। তবে এদের দুটো পরিচয় স্পষ্ট, বৃদ্ধ মাথা আর জোয়ান মাথা। তারপর থেকেই পিন্টুকে কেউ কোথাও দেখেনি। না পিন্টু কোথাও যায়নি, হয়তো কেউ তাকে সন্ধানই করেনি। কারণ পিন্টু যথেষ্ট অকারণ। জগতে সবাই কারনমুখি আমরা একবার অকারণের বশভূত হলাম। দেখা পেলাম পিন্টু কাকার। গা গরম, জ্বরে তার সমস্ত অকারণগুলো কারণ হয়ে বেরুচ্ছে দেহ থেকে। আমরা বললাম ‘কাকা আপনার তো জ্বর? উঠুন, এই ভাঙা স্কুলের বারান্দায় শুয়ে থাকলে তো আপনি আর বাঁচবেন না? কাকা বললো- তোমরা কারা? আমরা বললাম আমরা-‘আমরা’, ওই প্রথম দেখলাম কাকা আমাদের কথার পিঠে আর অকারণ করলেন না। প্রচণ্ড জ্বরে সে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছেন। কিন্তু তাকে আর উঠাতে পারা গেল না। জ্বরের শেকড় বাকড় স্কুলের বারান্দা ভেদ করে পাতালে পৌঁছেছে। লক্ষ্য করলাম জ্বরে যেখানে তার ভুল বকবার কথা সেখানে সে চুপচাপ কোঁকাচ্ছে। অথচ সুস্থ মাথায় সে কতই না জ্বরের ঘোরে থাকে। তবে উত্তর পেতে বেশি সময় লাগে নি। জ্বর নাশক ওষুধ যখন তার গলা দিয়ে নামছিল ঠিক তখনই সে আমাদের উপহাস করছিল। বার বার প্রশ্ন করছিল। বলতে পারো কোনটা জ্বর? তোমার সুস্থ শরীর না আমার জ্বরের শরীর। এমন অকারণের মুখে আমাদের আর কিছু বলার কারণ ছিলো না। ফলে কাকা বলা শুরু করলো- এই যে ধরো তোমার সুস্থ শরীর, এমনতো হতে পারে ওটাই আসল জ্বর। তুমি ওই জ্বরে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়েছো, যে তোমার আর অসুবিধে হচ্ছে না। এমনতো হতে পারে আমার জ্বর আসার আগে আমি অভ্যস্ত জ্বরে ছিলাম এখন কয়েকদিনের জন্য যখন জ্বরহীন হলাম তেমনি গায়ের তাপ বেড়ে গেল। হয়তো এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু এই স্বাভাবিকতায় আমি তুমি অভ্যস্ত না। এই জন্য এই ওষুধ খেয়ে আবার চির অভ্যাসের কাছে ফিরে যাচ্ছি। ভেবে পেলাম না পিন্টু কাকা একি বলছে! সত্যি সত্যি কি আমরা এমন জ্বরে অভ্যস্ত হয়ে আছি। কেবল জ্বর হলেই দুই তিন কিংবা ৭ দিনের জন্য আমরা সুস্থ হয়ে উঠি। দেহের ভেতরতো বিদ্যুৎ আছে, তাপ আছে, ওটা বাড়লেই তো আমরা তাকে জ্বর বলি। তাহলে কি ‘কারনসিংহ’, সকল মানুষই অভ্যস্ত জ্বরে আক্রান্ত, মাথা আর গোলমাল করিনি, কাকাকে অভ্যস্ত জ্বরে ফেরার কামনা করে চলে এসেছিলাম সেদিন।

তার কয়েক দিন বাদে, আবার অকারণ, পিন্টু কাকা তাড়ি খেয়েছে ভানু মাঝির পয়সায়। ঠিক ঠাক সামনে পড়েছে। যেই বলেছি পিন্টু কাকা কেমন আছেন? কাকা সেই বলতে শুরু করেছে-কে পিন্টু? পিন্টু তো ‘নাই’, নাম হলো জীবনের কলঙ্ক, জগতের কলঙ্ক হলো যার যার নাম আছে। পৃথিবীতে যার যার নাম আছে, তারা পৃথিবীর কেউ নয়, তারাই পৃথিবীর কলঙ্ক। বলোতো এই যে আমি গলাভরে তাড়ি খেলাম, কত কত ফোটা আমার ভেতরে গেল, প্রত্যেক ফোটার আলাদা আলাদা নাম কি? তাদের কিন্তু আলাদা আলাদা কোনো নাম নেই। তারা সবাই একসঙ্গে ‘তাড়িরস’ এই তাড়িগুলো আমার ভেতর ঢুকেছে, আমাকে প্রকৃত ভালোবাসে বলে। তোমরা মানুষ বটে, তবে তোমাদের আলাদা আলাদা নাম আছে। তোমরা ফোটা ফোটা তাড়ির রসের মতো এক হতে পারো না, তোমরা কারো ভেতর যেতে পারো না। তোমরা প্রকৃত ভালোবাসা শেখনি। তাইতো তোমাদের কারো নাম ‘পিন্টু’ কারো নাম ‘ভানু’, তোমরা যদি এই তাড়ির ফোটাগুলোর মতো কারো ভেতর ঢুকতেও চাও তবে দেখবে তার গলায় কেবল তোমাদের নামগুলো আটকে গেছে। এই যে দেখনা, জগতে কত গাছ আছে, তাদের নামও আছে আলাদা আলাদা, এই নামগুলো তারা নিজেরা দেয়নি, দিয়েছে মানুষ। তারা কেবল তাদের নাম দিয়েছে, ‘আমরা গাছ’। গাছেরা জানেই না তাদের নাম নিম, কাঁঠাল, জারুল। জারুল বলে ডাকলে গাছগুলো ফিরে তাকায় না। বট বলে ডাকলেও ওই গাছের ঘুমও ভাঙে না। গাছগুলো যথেষ্ট আÍজ্ঞানী, অথচ কোন বিদ্যালয়ে তাদের নাম ধরে রোলকর হয়নি। তোমরা মানুষরা নিজের নাম নিজে রেখেছো, যেমন ধরো বটগাছ কিন্তু কখনোই আমার নাম রাখেনি ‘পিন্টু’। আমার পিতামাতা আমার একটা নাম দিয়েছে, তারাও আমার মতো মানুষ। গাছেরা, অবলা প্রাণীরা, কখনোই নিজের নাম রাখেনি, কারণ তারা আÍজ্ঞানী। গাছেরা কিন্তু গাছকে গাছ বলে ডাকে, গাছেদেরও কিন্তু কথা আছে। দেখনা গাছের সন্তানরূপি চারাগাছ আছে। তোমরা কিন্তু আমাকে পিন্টু বলে ডাকলে। তোমরা জাননা, কিছুক্ষণ আগে আমার ভেতর ঢুকে পড়া তাড়িরসগুলো আমাকে এখন মানুষ মানুষ বলে ডাকছে, আমি এখন তাড়িরসের শত শত ফোটাগুলোর সাথে কথা বলবো, তারা আমাকে প্রতিনিয়ত আদ্য কথা শোনায়, তোমাদের তো নাম আছে, নামের সাথে নামের কোনো আদ্য কথা নেই-আচ্ছা তোমরা কি কখনো আমাকে মানুষ মানুষ বলে ডাকতে পারবে?

🌱

ভানু মাঝি

‘আমার নদী আছে অথচ তাতে পানি নেই, এর চেয়ে বড় বিস্ময় পৃথিবীতে আর কিছু নেই…’ বিস্ময়ের সভায় ভানু মাঝির কণ্ঠ বাতাস ভেদ করে ওঠে। আর আলোর গুহায়, পাষাণ অন্ধকারে ধাক্কা খেয়ে সেই কণ্ঠ হয়ে যায় চিৎকার। বহুদিন থেকে ভানুর চিৎকারগুলো কখনো ঘোড়া হয়ে যাচ্ছে, কখনো কাঁচা কাঁচা রক্তের ভেতর হয়ে উঠছে মৌমাছি। কাল থেকে কালে ভানু মাঝির চিৎকারকে কেউ কেউ বনবিড়াল হতেও দেখেছে…

এক
ভানু যে ঘাটের মাঝি, সেই ঘাটের দুঃখ ছিল গরম ভাতের মতো। সব মাঝিই নৌকা ভরে পার করে মানুষ, ভানু মাঝি খালি ডোঙা নিয়ে ঘুড়ে বেড়ায় ঘাটের এ মাথা ও মাথা। কখনো ভোলা মনের পাল্লায় পড়ে যদি তার মনে ধরে, তবেই দু-একজন মানুষ পার পায় ভানুর ডোঙায়। কিন্তু ভানু মাঝির পারাপারের মতিগতি বোঝা বড় দায়। মাঝ নদীতে হঠাৎ সে বলে বসত, ‘পারাপার এখানেই বন্ধ, এবার নামতে হবে বাছা!’ ব্যস! মুশকিলে পড়ত ভানুর ডোঙায় পার হওয়া মানুষগুলো। মাঝ নদীতে পারাপার বন্ধ! এ কোন মাঝি? প্রশ্ন উঠত মায়া-দয়ার। উত্তর আসত, মায়া হলো বিপদের জানালা, দয়া হলো হঠাৎ রেগে যাওয়া মরুভূমি। ভানু মাঝির দুই চোখ হয়ে যেত এক। বলত,¬ ‘এই হলো মাঝ নদী, এই জায়গাটা পৃথিবীর পাকস্থলী, এখানেই প্রকৃত পারাপারের মর্ম আছে, নেমে যাও, নামতে হবে।’
নাহ! কোনো কিছুতেই ভানু মাঝিকে বোঝানো যেত না- ‘এবারের মতো পার করো মাঝি। আর এ ডোঙায় উঠব না।’ ভানু মাঝি বলত, ‘আমি তো তোমার মতোই মানুষ। আমি পার করার কে? বরং তোমরা এই ডোঙার ঊর্ধ্বমুখী চোখ দেখো, সে পার করবে কি না! আমি ডোঙার তেরো ধারার চোখ দেখে বুঝেছি, ডোঙাটা পার করবে না। মাঝ নদীতে যেকোনো নৌকা বড় একটা চোখ হয়ে ওঠে, এরপর সেই চোখ খেয়ে ফেলে তোমার আমার গন্তব্যের দৃশ্য।’
এমন কথার পর ভাবনা হয়ে যেত ডানাভাঙা পায়রা, আর সহসা বোঝা যেত না, কোথায় ডোঙার চোখ, তাতে কী এমন মহাকাণ্ড! তবে কি ডোঙার কোনো মন আছে, মনের আছে ভুতুড়ে কোনো ছুরি, যা দিয়ে সে পারাপারের গোপন গন্তব্য কেটে ফেলে? মানুষ তাহলে কে? ভানু মাঝির বুকভরা দাবি- ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ডোঙার মন আছে, মনের ভেতর ছুরি আছে, কেননা ডোঙাটা পানিতে ভাসে। নদীর মন যদি ডোঙার মনে বাসা না বাঁধত, তাহলে কিছুতেই সে পানিতে ভাসত না। ডাঙায় চরে বেড়ানো মানুষের যদি মন থাকে, তবে পানিতে ভেসে বেড়ানো নৌকার কেন মন থাকবে না?’
আর এই সব কারণে ভানু মাঝির ডোঙায় পার হওয়ার জন্য তেমন কাউকে পাওয়া যেত না। ভানু সকাল থেকে সন্ধ্যা নিজের ডোঙায় নিজেই পার হতো অসংখ্যবার। আবার কখনো কখনো ডোঙার তেরো ধারার চোখ ভানুকে নামিয়ে দিত মাঝ নদীতে। মাঝ নদীতে নেমে গিয়ে ভানু মাঝি গলা ছেড়ে বলত, ‘এ নদীর নাম মহানন্দা’, ‘এ পারের নাম জানমারি’, ‘ওপারের নাম যৌবনকৌবন’। নদীর মাঝখানে এসব নামের কোনো চিহ্ন নেই। এই নামগুলো নদীতে ভাসেও না, ডোবেও না। মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা। এই নামগুলো ভানু মাঝির জীবনের মতো। নদীর নাম? আমি বিশ্বাস করি না। নদীর দুই পাড়? এটা হতে পারে না। নদীর নাম যাবে মানুষের মগজে, দুই পাড় হবে এক। নদী একটা কবর, তার পানিগুলো মরা…
এই করতে করতে ডোঙার তেরো ধারার চোখের ইশারায় ভানু মাঝিকে তুলত তার ডোঙায়। ভানুর অবান্তর আবদারগুলো শুনে নদীর দুই পারের মানুষ হাসত হো হো করে। ভানু হাসিগুলোকে দেখতে পেত- কিছু বিপদ মুখে মুখে নেচে উঠছে। এরপর বিপদের নাচ থেকে চোখ ফিরিয়ে চুমু খেত ডোঙার তেরো ধারার চোখে। তার ডোঙাটার সাথে পরম মমতায় বলত কথা- ‘তুমি আমার ঘাটের ঘোড়া… ঘাটের হাসি হাটে উঠলে দুনিয়া আন্ধার। দুনিয়াটা তোর পিঠে চড়ে আছে রে ডোঙা, তাই তো বিপদের রূপ ধরে পাড়ের মানুষের মুখে এত হাসি। এ পারের দুনিয়া ওপারে যায়। ডোঙা, তুই বল, তোর পিঠে কি আর আছে মানুষের ঠাঁই?’
আর এভাবেই কেউ যদি ভানুকে বলেছে, ‘ভনুু মাঝি, খালি ডোঙা নিয়ে কোথায় যাও?’ তবে ভানু তাকে উত্তর দিয়েছে, ‘দুনিয়াটা পার করি। খালি দেখলা কই? ভরাট চোখে কি আর খালি দেখা যায়? খালি দেখতে খালি হতে হয়। জানমারির ঘাট থেকে দুনিয়া যাবে যৌবনকৌবনে… আমি তা-ই পার করি। একবার খালি হয়ে দেখে যাও, দুনিয়াটা কত ভারী। রাতের দুনিয়া ডোঙাটাকে কঁকিয়ে তোলে। ভোরের দুনিয়াটা পরের ঘরের ধর্মের মতো, আমার ডোঙাটা যে কবে ডোবে…’
ভানুর শঙ্কা নদীর অন্তরে ঢুকে বেরিয়ে আসছে তিন কোনা মাছ হয়ে। এই শঙ্কাগুলোকে মাছ হতে দেখে ভানুর লাগছে ভয়। এবার নদীর মাছগুলো ভানুর শঙ্কার ভেতর ঢুকে বেরিয়ে আসছে পান-তাবিজের খরা হয়ে। খরাগুলো হয়ে যাচ্ছে শাদা শাদা দাঁতওয়ালা পোকা। পোকাগুলো নদীর তলপেট কাটছে বিকট শব্দে। ব্যস! ভানুর মগজের নুনগুলো করছে দিগি¦দিক ছোটাছুটি। আর ভানু দেখতে পাচ্ছে, উল্টো, ডোঙার ভেতর ডুবে যাচ্ছে নদী!

দুই
ভানু মাঝির ঘাটের ওপর হাট বসে সপ্তাহ ঘুরে। নদীর দুই পারের ক্রেতা-বিক্রেতারা গমগম করে সেই হাটে। ভানু মাঝি ঘাটে বাঁধে ডোঙার গলা, আর নিজের গলাটা নিয়ে পড়ে শঙ্কায়। ভানু ভাবে, কেন সে কেবলই ডোঙার গলা বাঁধল, অথচ সে মানুষ বলে তার গলা কেউ বাঁধল না। নদীর কিনারে তার চোখ ভাগ হয়, সেই চোখ একবার তাকায় ডাঙায়, আরেকবার তাকায় নদীতে। নদীতে মৃদু স্রোত আছে বলে ডোঙাগুলোর গলা বাঁধা, আর ডাঙায় প্রবল স্রোত থাকা সত্ত্বেও কারো গলা বাঁধা নেই… অবশেষে ভানু কোথা থেকে যেন খুঁজে আনে নদী আর ডাঙার স্রোতের তফাৎ।
ডাঙার স্রোতে কখনো মানুষের গলা বাঁধতে দেখেনি ভানু মাঝি। অথচ ডোঙার গলা সে বেঁধে রাখে ঘাটে। ভানু মাঝি দেখতে পায়, ডাঙার স্রোত প্রবল বেগে ছুটছে, স্রোতের ওপর মানুষ ভাসছে মরা মাছের মতো। ডাঙার স্রোতের আকর্ষণে কমে আসছে নদীর স্রোতের গতি। ভানু মাঝি এবার নদীর কিনারে হাঁটু গেড়ে বসছে আর উঠছে। তার এক চোখ রাখছে ঘাটে, আরেক চোখ ছেড়ে দিচ্ছে হাটে। আর এভাবেই তার চোখ দেখতে পাচ্ছে ডাঙার প্রবল স্রোতে নদী হয়ে পড়ছে স্রোতহীন। অথচ নদীতে ডোঙা বাঁধা, ডাঙায় কোনো মানুষের গলা বাঁধা নেই। ভানু ভাবতে থাকে, নদীর স্রোতে যদি ডোঙাটার গলা বাঁধা না থাকত তবে ডোঙাটা এ ঘাট থেকে ভেসে গিয়ে অন্য কোনো ঘাটেও কেবল ডোঙাই থাকত। কিন্তু ডাঙার স্রোতে এক হাটের মানুষ আরেক হাটে ভেসে গিয়ে আর মানুষ থাকে না… ভানুু মাঝি ডাঙার স্রোতে নিজের গলা শক্ত করে বেঁধে হাটের ভেতর ঘুরে বেড়ায় একা একা। হাটের ভেতর ভানু মাঝি সবাইকে ধরে ধরে বলে, ডাঙায় প্রবল স্রোত, দয়া করে তোমার গলাটা বাঁধো, তুমি হারিয়ে যাচ্ছ বাজারে। কে শোনে কার কথা। উল্টো ভানুু মাঝি ডাঙার স্রোতে ধাক্কা খায়।
ফলে ভানু হাটের ভেতর না থাকে ক্রেতা না থাকে বিক্রেতা। তবু সে হাটের ভেতর হারানো মানুষগুলোকে ধরে ধরে বলে, ‘নুন কিনে কী হয় ভাই? হলুদ কখনো বিক্রি করা যায়?’ ডাঙার প্রবল স্রোতে সাঁতার কেটে ঘাটে ফিরে আসে ভানু মাঝি। ডোঙার ওপর চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে দেখতে পায় নদীর স্রোতগুলো বাতাসহীন পতাকার মতো নেতিয়ে পড়েছে। ভানু মাঝি তার ডোঙাটাকে বলছে, ‘এই ডোঙা, কহুকণ্ডল পাখির গল্পটা শুনবি? এক যে ছিল এক কুহুকণ্ডল পাখি। আতা গাছের বাম ডালে ছিল তার বাসা। কহুকণ্ডল পাখির দুটি ছানা ছিল। একদিন দুপুর বেলা, উজান বাগানের সুফল খাইল ওই পাখি। তারপর সন্ধ্যাবেলা মুখ দিয়ে রক্ত উঠল তার। ভোর হতে না হতে মরে গেল কুহুকণ্ডল পাখি। এই ডোঙা, ঘুমিয়ে পড়লি নাকি? শুনছিস তো? তারপর ওই ছানা দুটির কি হলো?…’
আর এভাবেই ভানুর অসমাপ্ত গল্পের ভেতর ঘুমিয়ে পড়ত ডোঙাটা। ডোঙা জেগে উঠে ভানুর ঘুমের ভেতর ছেড়ে দিত অসমাপ্ত গল্পের শেষটুকু। ভানু ঘুম থেকে দেখতে পেত, ডাঙার স্রোত নদীর স্রোতের সাথে পাঞ্জা লড়ে হেরে যাচ্ছে। হঠাৎ জেগে গিয়ে দেখত, নদীর স্রোত দাঁড়িয়ে আছে। আর এই করতে করতে ভানুর কপালে ভাঁজ পড়ল। মাথার চুল হয়ে গেল শাদা। পরনের পাতলা ধুতিতে শক্ত গিঁট আর যেন লাগে না…

তিন
নদীর পারের হলদার পাড়ায় ভানু মাঝির একটা কুঁড়েঘর আছে। ওই ঘরে মাঝে মাঝে ভানুু থাকে। মানুষের ভেতর ভানুর আপনজন বলতে কেউ নেই। তবে ভানু বিশ্বাস করে, ওই কুঁড়েঘরে তার ভাঙা কিছু আপনজন আছে। কুঁড়েঘরের ভেতর পুরনো নৌকার ভাঙা কাটপাটগুলোকে ভানু আপনজন বলে জানে। তখন নদীর যৌবনকাল বাপ-দাদার রেখে যাওয়া পঙ্খীরাজ নৌকা। ওই নৌকা স্রোতের পক্ষ-বিপক্ষ জানত। তারপর নদীর যৌবন নৌকাটাকে ফাঁকি দিল। নদীর তলপেটে জেগে ওঠা ইট-পাথরে ফাঁড়ল নৌকাটার বুক। সেই থেকে ভানুর কুঁড়েঘরে নৌকাটা খণ্ড খণ্ড হয়ে পড়ে আছে। সেই থেকে ভানু তার কুঁড়েঘরে ভাঙা নৌকার কাটপাটে পুরনো এক নদীর মায়া অনুভব করে। কুঁড়েঘরের ভেতর ভাঙা কাঠে লেগে থাকা সেই নদীর গন্ধ শোঁকে ভানু। হলদারপাড়ার প্রতিবেশীরা ভানুর ঘরটাকে ‘নদীকানার ঘর’ বলে ডাকে। ভানু তার প্রতিবেশী লোকজনকে ডাকে জগৎকানা বলে। আর এভাবেই হলদারপাড়ায় নতুন কারো পা পড়লে তার আর বোঝার উপায় নেই ভানুর সঙ্গে হলদারপাড়ার সম্পর্ক কী? মানুষ ভানুকে কোনো সম্পর্ক ছাড়ায় সম্বোধন করে ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্কে… কেউ তাকে ডাকে তাওই, কেউ বা বিহায়, কেউ বা ডাকে খালু বলে, কেউ বা ভাতজা। এমনকি কেবল মাছ ধরতে শিখেছে এমন বালকরাও ভানুকে খেপাত তাহই ডেকে। আর এই সব সম্বোধনে ভানু রেগেমেগে কখনো লাল, কখনো আবার হয়ে যেত শাদা। তার মুখ থেকে ছুটত গালি। গালি শুনে হলদারপাড়ার মানুষরা খুব প্রীত হতো। একটু থেমে আবার তাকে বলত ‘ও তাহই, আমার বিহাই বেটা, কেমন আছো?’ ব্যস! ভানুর রাগগুলো টেংরা মাছের মতো উজানে দিত ঝাঁপ। বলত, ‘দূর, তোর পায়রা মার্কা সম্পর্ক, ডাঙার স্বভাবে আর থাকব না।’ অগত্যা ভানুর রাগগুলো প্রতিশোধ নিত নদীতে। তার চওড়া বৈঠা দিয়ে পেটাত নদীর পিঠ। বলত, ‘কুত্তার বাচ্চা নদী, তুই আমারে ডাঙার মানুষের তাহই করলি!’ আর এ রাগে ভানু মাসের পর মাস নদীর কিনারে শুয়ে-বসে পার করত জীবন। হলদারপাড়ায় সহসা ফিরত না। ভানু হলদারপাড়ায় না ফিরলেও ‘তাহই’ ডাকটি হলদার পাড়া থেকে ছড়িয়ে পড়ল, হাট-ঘাটে… যেখানেই ভানু, সেখানে তাহই। আর যেদিকে তাহই, তার উল্টো দিকে ভানু।
একদিন ভানু মাঝি তার ডোঙা বাইছে মাঝ নদীতে। পাশের নৌকা থেকে আসছে আওয়াজ- ‘ভানু তাহই, ও ভানু তাহই, বেলা এখন কোন দিকে যায়?’ ভানু ওমনি ডোঙা থেকে লাফ দিত নদীতে, ডুব দিত দম থাকা পর্যন্ত। এই দৃশ্য যারা দেখত তাদের প্রশ্ন জাগত, ভানুুকে তাহই বলে ডাকলে কেন সে খেপে ওঠে? ভানু কি কখনো তার মাকে মা বলে ডাকেনি? তার বাবাকে সে কী বলে ডাকত? ভানুর কাছে এসব উত্তর জানার জন্য আমরা তার পিছে পিছে ঘুরেছি। কখনো ভানুকে পাওয়া গেছে, কখনো জলজ্যান্ত দাঁড়িয়ে থেকেও তাকে পাওয়া যায়নি…
সেবার ভাদ্র মাস। নদীর তলপেটে দু-একটা ঢোঁড়া সাপের আনাগোনা। ভানুর মুখ উঠল নিলামে। ভানু মাঝি নিজেই এর-ওর কাছে বলে বেড়াচ্ছে, তার চেহারাটা বিক্রি করে দেবে। প্রতি রাতে নাকি ভানুর চেহারা ভানুকে ধোঁকা দিচ্ছে। ভানু মাঝি নদীর পারের মানুষ ধরে ধরে বলছে, ‘বলো দেখি আমার মুখ বিক্রি করে কত পাব? এই মুখ যেনতেন হবে না। বলো না কোন বাজারে এ মুখের দাম বেশি?’ আর এভাবেই নদীর দুই পারে চলছে কানাঘুষা, ভানু মাঝি তার মুখ বিক্রি করে দেবে।
সপ্তাহ ঘুরে আবার ঘাটের পারে হাটের দিন। ভানু মাঝি হাটের মাঝখানে নিজের মুখ বিক্রি করবে বলে দাঁড়িয়ে আছে। ক্রেতাদের চাল কিনতে দেখে দৌড়ে যাচ্ছে। চাল ক্রেতার কাছে গিয়ে ভানু বলছে, ‘চাল কিনে কী করবেন? কেনেন না একটা মাঝির মুখ।’ এরপর মাছ ক্রেতার কাছে গিয়ে ভানু হাঁটু গেড়ে কাকুতি-মিনতি করছে, ‘ও ভাই, সারা জীবন মাছ কিনলেন, এবার একটা চেহারা কেনেন। মাছগুলো পানিতে থাকে, এই চেহেরা থাকে তারও ওপরে। ভাই, হাত দিয়ে ধরে দেখেন, চেহেরার নাম ভানু, ভানুর নাম নদীকাটা মুখ।’
হাট শেষ হয়, ক্রেতারা চাল ডাল নিয়ে ঘরে ফেরে। ভানু মাঝি নিজের মুখ বিক্রি করতে না পেরে ফিরে আসে তার ডোঙার কাছে।
নদীর দুই পারে যেখানে মানুষের জটলা, সেইখানেই ভানুর চেহারা। কেউ ভানুকে ডাকে নদীর বাচ্চা নদী বলে, কেউ বা ভানুর চেহারা মাছকাটা বঁটিতে তুলে দেখে তামাশা। আর আমরা বিপাকে পড়েছি ভানু মাঝি ডোঙার তেরো ধারার চোখ নিয়ে। কী আছে ভানুর ডোঙার তেরো ধারার চোখে?
একদিন ভানুর ডোঙার কাছে দাঁড়ালাম আমরা। দেখার চেষ্টা করলাম তেরো ধারার চোখ, যে চোখের ইশারায় ভানু মাঝ নদীতে গিয়ে আর চলে না। কিন্তু ভানুর ডোঙার তেরো ধারার চোখ দেখার চোখ সম্ভবত আমাদের ছিল না। আমরা দেখলাম, ভানু মাঝি তার ডোঙার দিকে দৌড়ে আসছে, ডোঙার কাছে আমাদের দাঁড়াতে দেখে তার চেহারা হয়ে যাচ্ছে ঘুঘু পাখির পাকস্থলীর মতো। হঠাৎ ভানু মাঝি আমাদের বলল, ‘তোমরা কারা? এবার বলো, কোনটা চাও- ভানুর ডোঙায় পারাপার, নাকি তার চেহারা?’ আমরা বললাম, তেরো ধারা চোখ। ভানু তার ডোঙায় উঠতে বলল আমাদের। আমরা তার ডোঙার তেরো ধারার চোখের সন্ধানে নানা রকম দৃশ্য হলাম। কেউ হলাম রংধনু, কেউ হলাম তরবারির ছটা। ভানু তার ডোঙাটাকে নদীর কিনারা থেকে কিছু দূরে গড়াল। তারপর বলল, ‘তোমরা বলতে পারো, মানুষের ওজন আর নদীর ওজনের তফাত কত?’ এ কথা শুনে আমরা হকচকিয়ে উঠলাম আর কী যেন বলতে গেলাম। ভানু আমাদের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে বলতে লাগল- ‘জানি, তোমরা কেবল তোমাদের নিজেদের নামের ওজন নিয়ে বাজার দর করো, অথচ তোমাদের দেহের ওজনের সাথে নামের ওজনের কোনো মিল নেই।…’
তোমরা কথা বলতে পারো বটে, ব্যথা বলতে পারো না। এই যে নদী, কথাও বলতে পারে, ব্যথাও বলতে পারে। সবাই নদী পার হয় অথচ জীবনভর দেখছি নদীটা পার হতে পারছে না। আমি এ নদীটাকে পার করতে চাই। রাতে চক্র লাগলে নদীর মুখ ফোটে। নদীটা আমাকে এক চক্রলাগা রাতে বলেছে, ‘ভানু, কেবলই কি মানুষ পার করবি? আমারে পার করবি না? তুই কেমন মাঝি ভানু, নদী পার করতে পারিস না?’ আমি জানি না, নদীটা পার হয়ে কোথায় যাবে? আমি নদীটা পার করতে চাই। জানি নদীটা পালিয়ে গেলে তোমার আমার ওজন কমে যাবে…
ভানু মাঝির এসব কথা শুনে মনে হয়েছিল, কথা আর ব্যথা বলার পদ্ধতি আমাদের জানা নেই। আমরা ভানু মাঝিকে বলেছিলাম, রাতে চক্র লাগে কবে? আর কিভাবেই বা নদী কথা বলে? ভানু মাঝি আমাদের বলেছিল, ‘এই যে আমার ডোঙাটা দেখছ, মাঝরাতে এই ডোঙা কথা বলে। ডোঙার কথার সঙ্গে মানুষের কথার কোনো মিল নেই। আর এ কারণেই ডোঙার তেরো ধারার চোখ দেখে আমি সহসা মানুষ পার করি না। ডোঙার কথার সঙ্গে মানুষের কথার মিল না হলে পারাপার কী করে হয় বলো? ডোঙার কথা হলো তিন কোনা, মানুষের কথা গোল গোল। ডোঙার কথার তিন কোনার এক কোনা চলে যায় মাটির ভেতর, আরেক কোনা খেলা করে ঘামের সাথে, অন্য কোনা ঊর্ধ্বমুখী। আর মানুষের কথার গোলকপিণ্ডে থাকে হয় প্রশ্ন, না হয় উত্তর। বড় জোর চাওয়া অথবা নাপাওয়া।’ আচ্ছা, তোমাদের কাছে কি কোনো আগুন আছে? মানুষের গোল গোল কথাগুলো পোড়াতে পারবে? আমি বুঝি না, কেন তোমরা কথা বলো? নদীর ওপর এই ফাঁকায় তাকাও, দেখবে মানুষের গোল গোল কথাগুলো কেবলই ফুটবল।
নাহ! ভানুর ডোঙার তেরো ধারার চোখের সন্ধান আমরা পেলাম না। ফিরে আসার সময় মনে হচ্ছিল, নদীর ওজন, মানুষের ওজন, মানুষের পারাপার, নদীর পারাপার। ডোঙার তিন কোনা কথা, মানুষের গোল গোল… আর এসব ভাবতে ভাবতে নদীর দিকে ফিরে দেখছিলাম বারবার। আর ভানু মাঝি বারবার বলে উঠছিল, ‘নদীর দিকে তাকিয়ে কী দেখ? এ নদীর দুই কিনারা এক হবে, নদী যাবে হাসপাতালে…

চার
সময়ের ওপর উঠছে সময় আর ভানু খাচ্ছে হিমশিম। ভানুর শ্রমের গবাদি পশু ছুটছে দিগি¦দিক। কোনো শ্রম চোখ বন্ধ করে দৌড়াতে গিয়ে দেয়ালে দেয়ালে ফাটাচ্ছে মাথা। কোনো শ্রম কলমিলতার পাতা খেয়ে মেতে উঠছে পাগলামিতে। আবার শ্রমের চুল-দাড়ি কেটে কারা যেন তৈরি করছে চকলেটের ফিতা। তবু কোনো কোনো রাতে জ্যোৎস্না নামতে দেখে ভানু মাঝি তার ঘাম নিয়ে করছে গর্ব। আর ভানুর বিশ্বাস বারবার বলে উঠছে, ‘এই যে দেখছ জ্যোৎস্না এই জ্যোৎস্না শ্রমের গোপন বাষ্প।’ ভানুর চোখ দেখতে পাচ্ছে, নদীর দুই পাড়ে শাদা শাদা খরা খেয়ে ফেলছে সমস্ত সবুজ, শাদা শাদা খরাগুলো সুযোগ বুঝে হয়ে যাচ্ছে জন্তু-জানোয়ার, জন্তু-জানোয়ারগুলো চুষে খাচ্ছে নদীর পানি। কারা যেন সময় মারছে। এক সময় মেরে বড় হচ্ছে আরেক সময়। ভানু মাঝি দেখতে পাচ্ছে, তার বাপ-দাদার সময়গুলোকে পিটিয়ে মারছে এক দানব সময়। ভানু মাঝির ঘুমগুলোতে মসলা মাখাচ্ছে কে যেন। তার শ্রমগুলো কুচি কুচি করে কেটে নেওয়া হচ্ছে কারখানায়।…
ব্যস! সময় হয়ে উঠল পাকা ফল। এর মধ্যে নদীর দুই পারের ঘরে ঘরে উঠল আনন্দের জোয়ার। কারণ সময়ের ফল পাকতে না পাকতে সবার কেবল মা মরে যাচ্ছে। আর মা মরছে বলে, মা-মরা সন্তানের ফেটে পড়ছে খুশিতে। ক’দিন পর পর কেউ না কেউ এসে ভানুকে বলছে, ‘ভানু মাঝি, একটা সুসংবাদ আছে। জানো, গত রাতে আমার মা মরে গেছে। আহা, কি শান্তি!’ ভানু এ কথা শুনে ঘনঘন ঢোক গেলে আর তার চোখকে বলে, ‘এই চোখ, তুই তেলাপোকা হবি? কপালে বসে বসে কত আর মগজ খাবি।’
সেদিন ভানুর গায়ে খুব জ্বর। সে বসে ছিল হলদারপাড়ার তেমাথায়। পেছন থেকে ভানুর সাথের এক মাঝি ভানুর পিঠ চাপড়িয়ে বলল, ‘ভানু, বিধাতা বহুদিন পর আমার হলো। আমার মা-টা মরল। চল এই খুশিতে বিদেশি সন্দেশ খাওয়াব তোকে।’ ভানু এ কথা শুনে তার মুখকে বলল, ‘এই মুখ, তুই কি কেবলই খাবারের গুহা?’ ভানু হতবাক হয়ে উঠল, তার অস্তিত্ব নিতে লাগল উড়ালের প্রস্তুতি। ভানু দেখতে পেল তার অস্তিত্ব একটা কাঠের ঘোড়া, এই কাঠের ঘোড়াটা নিজের হাতে-পায়ে অবিরত পেরেক ঠুটছে। পেরকের গাঁথুনিতে ভানুর বুকে ধক ধক শব্দ। ভানু কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না, ঘরে ঘরে সবার কেবল মা মরে যাচ্ছে কেন? ভানু ঘাটের দুই পারে ঠাহর করতে চেষ্টা করে, সত্যি সত্যি কারো মা কি বেঁচে থাকল না? ভানু সামনে যাকেই পাচ্ছে, তাকেই বুকে জড়িয়ে অনুভব করছে অস্তিত্ব। কিন্তু ভানু টের পাচ্ছে নদীর দুই পারের মানুষগুলোর অস্তিত্ব কাঠের ঘোড়া হয়ে গেছে।
একদিন সন্ধ্যায় ভানু মাঝি বটগাছের শেকড়ে বসে কাঠের ঘোড়ার পা গুনছিল। ভানুর চোখ গোগ্রাসে গিলছিল ভানুর মগজ। ভানু দেখল, তার চোখের সামনে ভেসে ওঠা অন্ধকারগুলো আলোর চোটে ছটফট করছে। অন্ধকারের ওপর চরে বেড়ানো আলোগুলো রাতের শরীরে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিষ। ভানু চিৎকার করে বলছে, ‘ও রে অন্ধকার নষ্ট করল আলো রে…।’ ভানুর তেলাপোকার চোখ আরো দেখতে পাচ্ছে, অন্ধকারগুলো আলোর যন্ত্রণায় হয়ে যাচ্ছে গরম পানি। না, ওই সন্ধ্যায় ভানু বটগাছের শেকড়ে আর বসে থাকতে পারেনি। রাতের অন্ধকারে ভানু নদীর দুই পারে দেখতে পায় অসংখ্য মা-মরা ঘর। মা-মরা ঘরে গিয়ে ভানু মাঝি দেখে, ওই সব ঘরে আলো জ্বলছে। ভানু অনুভব করে, কেবলই কি ঘরে ঘরে মা মরেছে? ভানু দেখে ঘর থেকে পাড়া, পাড়া থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে আরো দূরে, আরো আরো মানুষ সবার মা মরে সাফ।
আরো একটা ভোর। নদীর দুই পারে মা-মরা গন্ধ প্রকট রূপ নিল। ভানু মাঝি তার মাকে রক্ষা করল তার মগজের ভেতর। তার তেলাপোকা চোখ মগজের ভেতর মা পেয়ে হলো ভীষণ খুশি। খেতে শুরু করল মায়ের অন্তরধন। ভানুর অন্তরের বিরুদ্ধে, ভানুর চোখে গজাল অনেক দাঁত। ভানু অবিরত ভাঙছে তার চোখে গজানো দাঁতগুলো। মাকে বাঁচাতে ভানু তার তেলাপোকা চোখের জড় কাটছে অবিরত। অথচ ভানু যতই চোখের জড় কাটে, ততই সে চোখে গজায় মা খাওয়া দাঁত। ভানু অনুভব করল, নদীর পারের প্রত্যেক মানুষের চোখ মা খাওয়া তেলাপোকা। মায়ের মাংস খেয়ে খেয়ে সবার চোখ তরতাজা হয়ে উঠছে। ভানু এবার তার স্বজন-পরিজনের তেলাপোকা হয়ে যাওয়া চোখগুলো দেখে আঁতকে উঠল। ওই চোখগুলো বিস্ময়ভরা রঙের লোভে বসে বসে খাচ্ছে মায়ের প্রাণ।
আর সপ্তাহ ঘুরে হাট নয়। এখন নদীর পারে প্রতিদিন বাজার। হাটের চাল-ডালের দিন শেষ। এবার বাজারে ঝুড়িতে মাকে নিয়ে বসে আছে বিক্রেতারা। ক্রেতারা শাদা শাদা খরা। ওদের বড় মায়ের ক্ষুধা। ভানু মাঝি বাজারে ঢুকে দেখে ঝুড়িতে বসে মাগুলো কাঁদছে, তবু সস্তা করে বিক্রি হচ্ছে অবশিষ্ট বেঁচে থাকা মায়েরা। মুহূর্তেই মা বিক্রি করতে পেরে সন্তানরা করছে উল্লাস। মা বেচে তারা কিনছে রঙিন সাবান। ভানু মাঝি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে, যত মা বিক্রি, তত তার কপালে দাগ। অথচ মা বিক্রেতারদের নিঃশ্বাস ফুটানি মারছে, কালো কালো চশমা পরছে, তাতে ভেসে উঠছে ভিনদেশি হাওয়া…
আর এভাবেই ভানুর কানে বাজতে থাকে মায়ের শেষ নিঃশ্বাসের ভেংরুল। ভানুর পৃথিবী ভানুকে ডেকে বলে, ‘বিদায় ভানু মাঝি, ভালো থাকিস। তবে বেঁচে থাকিস না। যদি বেঁচে থাকিস তবে ভালো থাকিস না।’ ভানু মাঝি পৃথিবীর কথার ধাক্কায় নদীর ওপর আছড়ে পড়ে। নদী ভানুর চোখে আশ্রয় খোঁজে। ভানু নদীর চক্রলাগা রাতের ওপর তার পিঠ চেপে ধরে, যাতে ওই রাতে কোনো আলো না ঢুকতে পারে। তবু জগতের সমস্ত বিষমুখে আলোগুলো ভানুর পিঠ ভেদ করে ঢুকে যায় নদীর চক্রলাগা রাতে। নদী হয় বধির। ভানু এবার নদীর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তার চোখ বদল করার চেষ্টাক করে। আর নদীকে বলে, ‘ওরে নদী, তুই আমার মা, তুই আমার মনচিত্রের রক্ত। তোর চোখ দে, আমার চোখ নে…’

পাঁচ
এরপর বেশ কিছুদিন গেল। বড় বড় অবহেলা ছোট ছোট মানুষ। ঘাটের দুই পারে মাঝি-চাষিরা এখন কাঠের বাক্স। শুরু হলো তামাশা। এসে পড়ল শাদা শাদা খরা। আহা! কি চমৎকার দেখা গেল; উঠে গেল ঘাট। ঘাটের ওপর বাপ-দাখ্খিল বটগাছের শেকড়ে লেগে গেল করাত-কুড়ালের ধার। মরণসভায় শুরু হলো রোল কল- রোল নাম্বার এক? ‘ইয়েস! আমি জানমারি ঘাট, উপস্থিত স্যার।’ রোল নাম্বার দুই? ‘আমি বাপ-দাখ্খিল বটগাছ, আমি কাটা পড়েছি স্যার।’ রোল নাম্বার তিন? রোল নাম্বার তিন? রোল নাম্বার তিন হাজির? খেপে উঠল মরণসভার মাস্টার। বলে উঠল, ‘ওর দম বেঁধে নিয়ে এসো।’ দমের মায়ায় কেঁপে উঠল রোল নাম্বার তিন। প্রাণের ভয়ে বলে উঠল-‘আমি ভানু মাঝির নদী। আমায় মেরো না বন্ধু!’ রোল নাম্বার চার? ‘আগেই মরে সাফ।’ রোল নাম্বার পাঁচ? ‘কত কাল হলো।’ রোল নাম্বার ছয়? ‘আমি তেলে ভাসছি।’ রোল নাম্বার সাত? ‘আমি হাওয়ায় উড়ছি।‘ রোল নাম্বার আট? ‘এই তো আমি মুখে মুখে।’ রোল নাম্বার নয়? রোল নাম্বার নয়? কোথায় রোল নাম্বার নয়? রোল নাম্বার নয় ধুতির নেংটি ধরে দৌড়াচ্ছে, তার পিছে পিছে ছুটছে মরণসভার সমন…

 

লেখক পরিচিতি :

জুয়েল মোস্তাফিজ। কবি ও আখ্যানশিল্পী।                                                                                                                                              ‘ভাতের ভুগোল’, ‘জুয়ার আসরে কোনো আঙুলই মিথ্যা নয়’, ‘হোয়াট আ বিউটিফুল ডেড বডি’,                                                      ‘দুধের পুকুরে ভাসছে কফিন’ ‘মেরাতুন্নেছা মনমহাজনের কথা’র মতো মহৎ গ্রন্থগুলোতেই                                                               উপস্থাপিত হয়েছে কবির দৃষ্টি, মনন ও দার্শনিকতা। সময়ের একটা অনিবায কলমে লিখতে                                                               এসেছেন কবি। দায়ের ভেতরে কবির ভাষা কতোটা মারাত্মক হতে পারে, জুয়েলের কাব্যভাষায়                                                        সেই ক্রন্দন ও ক্রোধ কামার বাড়ির ছোরার মতো চকচক করে।

 

‘মেরাতুন্নেছা মনমহাজনের কথা’য় জুয়েল মৃত্তিক মানুষদের নিয়ে হাজির হয়েছিলেন।                                                                 কাব্য ও কথনের অপূর্ব সারল্য নিয়ে মৃত্তিক-মানুষ তাদের জীবনকে তুলে ধরেন, সেই                                                                          সারল্যেই নির্মিত হয়েছে ঝড়ু-পিন্টু-ভানু আখ্যান। মৃত্তিক-মানুষ মাত্রই এই দার্শনিক                                                                          মহাজনদের চেনেন। আখ্যানশিল্পীর কলমে এই মৃত্তিক-মানুষের চির-পরিচিত ভাব ও                                                                          ভাবুকতা, জ্ঞানের পবিত্র আশ্রমের ছায়া উঠে এসেছে এই লেখায়।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

ঘরে ঘরে সব জানলা বন্ধ | গোলাম ফারুক খান

Thu May 13 , 2021
ঘরে ঘরে সব জানলা বন্ধ | গোলাম ফারুক খান 🌱 ‘যাও উত্তরের হাওয়া’র মৃদুভাষী কবি অরুণকুমার সরকারের আপাত-নিরাসক্ত কিন্তু বিধুর পঙক্তিমালা যখন-তখন স্মৃতি থেকে উঠে এসে বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ইদানীং। চোখ ভিজিয়ে দেয় এই গূঢ় ব্যঞ্জনাময় বাণী : ‘যারা আর নেই দেবে নাকো সাড়া তাদের পাড়ায় কেন কড়া নাড়া […]
Shares