ঘরে ঘরে সব জানলা বন্ধ | গোলাম ফারুক খান

ঘরে ঘরে সব জানলা বন্ধ | গোলাম ফারুক খান

🌱

‘যাও উত্তরের হাওয়া’র মৃদুভাষী কবি অরুণকুমার সরকারের আপাত-নিরাসক্ত কিন্তু বিধুর পঙক্তিমালা যখন-তখন স্মৃতি থেকে উঠে এসে বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ইদানীং। চোখ ভিজিয়ে দেয় এই গূঢ় ব্যঞ্জনাময় বাণী :

‘যারা আর নেই
দেবে নাকো সাড়া
তাদের পাড়ায়
কেন কড়া নাড়া
ঘরে ঘরে সব
জানলা বন্ধ
দরজা ঠেললে
স্মৃতিকবন্ধ
ঘুম থেকে উঠে
ঘুমিয়ে পড়বে
শুধু আলোছায়া
হেলবে দুলবে
দেখবে অবাক
ভুতুড়ে চিত্র
ধন্য জীবন
তুমি বিচিত্র।’

যাঁরা অতিমারির এই প্রলয়ঝড়ে হারিয়ে গেছেন চিরদিনের মতো, হাজার বার ডাকলেও আর সাড়া দেবেন না জানি, কবির নিষেধ সত্ত্বেও এখনো তাঁদের বন্ধ দরজায় গিয়ে কড়া নাড়তে ইচ্ছে করে। এমন নয় যে, নিজের বাড়ির পাশেই তাঁদের বাড়ি কিংবা নিত্য যোগাযোগ ছিল তাঁদের সঙ্গে। কিন্তু বাইরের দূরত্ব যত দুস্তরই হোক না কেন, তাঁদের ঘর তো বাঁধা ছিল মনের আঙিনায়। তাঁদের কাজগুলোই তো মাঝখানে  তৈরি করে রেখেছিল নিত্য যোগাযোগের এক নিবিড় সেতু।   সেই অর্থে প্রতিদিনই দেখা হতো, কথা হতো, অনেক ভাব-বিনিময় এমনকি তর্কবিতর্কও হতো। কিন্তু তাঁদের সব দরজা-জানালা আজ বন্ধ। দরজা ঠেললেই ঘুম থেকে স্মৃতিকবন্ধ জেগে ওঠে। দাঁতে দাঁত চেপে আমরা সহ্য করছি এই অনিঃশেষ বিয়োগবেদনা।

কজনের কথা বলব! এ যেন এক দুর্বার মৃত্যুরথ একের পর এক উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সব মানুষকে। তার কোনো মায়া নেই, মোহ নেই, করুণা নেই। এই তো সেদিন মৃত্যুর অন্ধশকটে আরোহণ করলেন কবি ও মনীষী শঙখ ঘোষ (১৯৩২-২০২১)। উত্তর-প্রজন্মের জন্য কী মর্মস্পর্শী ও প্রজ্ঞাদীপ্ত আকুতি জানিয়ে রেখেছিলেন তিনি অনেক আগেই:

‘এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম
আজ বসন্তের শূন্য হাত —
ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।

…   …   …

না কি এ শরীরের পাপের বীজাণুতে
কোনোই ত্রাণ নেই ভবিষ্যের?
আমারই বর্বর জয়ের উল্লাসে
মৃত্যু ডেকে আনি নিজের ঘরে?’

সন্ততির কল্যাণের জন্য সম্রাট বাবরের ভাষ্যে ব্যাকুল প্রার্থনা জানিয়ে কবি অন্তর্হিত হলেন। কিন্তু আমরা যারা বেঁচে আছি, তাদের কিন্তু ভাবতে হবে ‘বর্বর জয়ের উল্লাসে’ প্রাণপ্রকৃতিকে ধ্বংস করে, উচ্ছৃঙখলতার জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিয়ে আমরাই আজ নিজের ঘরে মৃত্যুকে আবাহন করেছি কিনা।

দীর্ঘ, সুফলা জীবন শঙখ ঘোষের। কীর্তিমান অধ্যাপক ছিলেন। বন্ধু, অনুজ ও শিক্ষার্থীদের অনেকেই ইতিমধ্যে ছেড়ে গেছেন তাঁকে। শারীরিক অসামর্থ্যও দেখা দিয়েছিল কিছুদিন ধরে। কিন্তু প্রখর ও জাগ্রত ছিল মন, এখনো উজ্জীবিত ছিল কল্পনা। শতবর্ষ থেকে অল্প দূরত্বে থেকেও সৃষ্টিশীল ও কর্মিষ্ঠ ছিলেন তিনি। চৌত্রিশটি কাব্যগ্রন্থ, তেতাল্লিশটি গদ্যগ্রন্থ, অনেক সুসম্পাদিত বই এবং অজস্র অনুবাদ ও বক্তৃতার বিশাল সম্ভার থাকার পরও তাঁর কাছে আমাদের প্রত্যাশা শেষ হয়নি। চেয়েছিলাম তিনি আরো অনেকদিন থাকুন আমাদের পাশে। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হতে থাকুক তাঁর কাব্য ও গদ্যসংগ্রহ। ক্রমাগত বাঁকবদল হোক তাঁর কবিতার। ‘দিনগুলি রাতগুলি’ (১৯৫৬) থেকে শুরু করে যে যাত্রা এসে যতিচিহ্ণ রেখেছে ‘এও এক ব্যথা উপশম’ (২০১৭)-এ, তা আরো সামনে এগিয়ে যাক। রবীন্দ্রবিচারের ফেনায়িত আবেগ দূরে সরিয়ে যে নির্মোহ অনুসন্ধিৎসা ও সত্যদৃষ্টির আলোতে তিনি গড়ে তুলেছিলেন নতুন ব্যাখ্যা-ভাষ্যের এক সুরম্য সৌধ, তা আরো উঁচু ও প্রসারিত হবে বলেই ভাবতাম আমরা। ভাবতাম, রবীন্দ্রনাথের ঈশ্বর যে আমাদের ‘আমি’রই একটা আবরণমুক্ত রূপ কিংবা নানাভাবে আমাদের সমকালীন প্রবহমান জীবনকে যে সবসময় ছুঁয়ে থাকে রবীন্দ্রনাথের লেখা, সে সম্পর্কে অনেক নতুন চিন্তার ঝিলিক আমরা তাঁর কাছে পাব। ভাবতাম, কাকে বলে নির্মাণ আর কাকে বলে সৃষ্টি, আধুনিকতা ও আধুনিকবাদের মধ্যে আসলে কী পার্থক্য, কীভাবে ঘটে ঐতিহ্যের বিস্তার, শিল্পসাহিত্য ও সমাজচিন্তায় ভিন্নরুচি ও ভিন্নমতের অধিকার কতটুকু — এসব বিষয়ে আরো অনেক কিছু বলবেন তিনি। আরো খুলে বলবেন শব্দ ও সত্যের সম্পর্ক কিংবা কতটুকু শক্তি ধারণ করে নিঃশব্দের তর্জনী। কিন্তু হঠাৎ পর্দা নেমে এল মঞ্চে। যেন-

‘নিবে গেল দীপাবলী; অকস্মাৎ
অস্ফুট গুঞ্জন/স্তব্ধ হল প্রেক্ষাগারে।’ (সুধীন্দ্রনাথ দত্ত)

তাঁর নিজের ভাষায় বললে, ‘এখন সব অলীক।’ এইসব নতুন অভিজ্ঞানের জন্য অতঃপর কার দিকে তাকিয়ে থাকব তা ভেবে পাই না।

শঙখ ঘোষের অল্প কিছুদিন আগেই গেলেন তাঁর অনুজপ্রতিম, অভিন্নহৃদয় বন্ধু অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত (১৯৩৩-২০২০)। কবিতা ও সাহিত্যের সপ্তসিন্ধু দশদিগন্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন দুজন একসঙ্গে। ছন্দেমিলে লিখতেন বলে একদা অন্য বন্ধুরা মজা করে এই অসাধারণ জুটির নাম দিয়েছিলেন ‘কুমুদরঞ্জন-করুণানিধান।’ অর্থাৎ পুরোনো দিনের দুই ছন্দপ্রিয় কবির নামে। সাঁওতাল পরগনার পাহাড়-দিগন্তের ডাক বুকে নিয়ে শান্তিনিকেতন ও কলকাতা হয়ে জার্মানিতে ঘর বেঁধেছিলেন যে বিশ্বনাগরিক অলোকরঞ্জন, তাঁর কথা মনে পড়লেই সামনে এসে দাঁড়ান এক সুদর্শন ‘যৌবনবাউল।’ গুনগুন করে যেন গাঢ়স্বরে বলেন:

‘তুমি যে বলেছিলে গোধূলি হলে
সহজ হবে তুমি আমার মতো,
নৌকো হবে সব পথের কাঁটা,
কীর্তিনাশা পথে নমিতা নদী!
গোধূলি হল।
তুমি যে বলেছিলে রাত্রি হলে
মুখোশ খুলে দেবে বিভোরবিভা
অহঙ্কার ভুলে অরুন্ধতী
বশিষ্ঠের কোলে মূর্ছা যাবে!
রাত্রি হল।’

যৌবনেই বাউলের আত্মপরিচয় গ্রহণ করলেও তাঁর আশা-ভালোবাসা-প্রত্যয় ছিল গভীর। অস্তিবোধ ছিল নিরঙ্কুশ। তাই তো তখনই বলতে পেরেছিলেন:

‘পটভূমিকা অন্ধকার আপন স্বত্ব অধিকার
রাখুক, আমি শরীর নোয়াব না,
একটিমাত্র  রাখাল যাক এ মাঠ একলা পড়ে থাক
নীরবে, আমি এ মাঠ ছাড়ব না।
মরণমদমাতাল ডোম সবি করুক উপশম
শ্মশানে, আমি জীবন ছাড়ব না।’

কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবন ছাড়তে হলো তাঁকে। তাও আবার অপঘাতে। এখন আর কে বলবে ‘স্বচ্ছ এই শালিখের মতো/কবে হবে আমার হৃদয়’ কিংবা ‘মাঠে মাঠে ওই ঝুমুর কাঁপছে চাষির জীবনশৈলী/ওরে মন, কেন গেলিনা সেখানে, নিজের মনের গোপনে রইলি?’ ‘রক্তাক্ত ঝরোকা,’ ‘ছৌ-কাবুকির মুখোশ,’ ‘গিলোটিনে আলপনা’ এবং অন্যান্য বইয়ে তাঁর কবিতার শিল্পরূপের যে বিকাশপথ বাঁধা হয়েছিল তা শেষবিন্দুতে পৌঁছুল। এই সামান্য শ্রদ্ধাঞ্জলির অবকাশে তাঁর লেখা আরো একটি প্রিয় কবিতা স্মরণ না করে পারছি না:

‘আমি কোনোদিন পাগল বলি না ওকে
বেসুরো গলায় রামপ্রসাদের কলি
গেয়ে ঘুরে গেল জনক রোডের গলি —
সময়ের ছায়া পড়ে না তো ওর চোখে।
ও কিছু বলতে চেয়েছিল কোনোদিন
রৌদ্রের মতো পরিচ্ছন্ন করে;
বলতে পারেনি, আকাশে আত্মলীন
সময় পড়েছে বৃষ্টির মতো ঝরে।
এখানে আমিও বলতে এসেছি কিছু,
সম্ভাবনায় আজো আমি অরুণাভ;
বলতে যে আমি পারব না, তাও জানি।
আমি একদিন উন্মাদ হয়ে যাব।’

অলোকরঞ্জনের বাক-চমৎকৃতিতে মুগ্ধ হয়ে গুরু দেবীপদ ভট্টাচার্য তাঁর গদ্যভাষার নাম দিয়েছিলেন ‘অলৌকিক।’ নিজস্ব মুদ্রা এবং পরিভাষায় অনন্য হলেও তাঁর গদ্য অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ ও দ্যুতিময়। কিন্তু হায়, আর তো অলোকের ‘অলৌকিক’ ভাষায় লেখা হবে না নতুন কোনো প্রবন্ধ বা স্মৃতিকথা!

অতিমারির মৃত্যুযানে প্রথমদিকের এক আরোহী আনিসুজ্জামান (১৯৩৭-২০১৯)। আমাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ কুশীলব বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই খ্যাতিমান অধ্যাপক। সংস্কৃতির লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মশালটি যাঁরা উনিশ শ একাত্তরের মহালগ্ন পর্যন্ত বয়ে নিয়ে এসেছিলেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একষট্টিতে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন, সাতষট্টিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, সেই সময়ে বাংলা ভাষা সংস্কারের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সক্রিয়তা এবং তারপর মুক্তিযুদ্ধ — সবকিছুতে তিনি ছিলেন এক প্রত্যয়ী যোদ্ধা। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের বাংলা ভাষ্য রচনায়ও তাঁর ভূমিকা ছিল মুখ্য। অনেক ঝড়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের যে দীর্ঘ পথচলা, সেখানেও তিনি সদাদৃশ্যমান, সক্রিয় যাত্রী হিসেবেই ছিলেন।

উনিশ শ চৌষট্টি সালে প্রকাশিত তাঁর মহৎ গবেষণাগ্রন্থ ‘মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য’ আমাদের সাহিত্যে প্রতিফলিত মুসলিম মনের এক প্রামাণ্য ঐতিহাসিক মানচিত্র। দুর্লভ, অজানা উপাদান ব্যবহার করে এ বিষয়ে এমন প্রাঞ্জল ও অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ বই বাংলা ভাষায় এর পরে আর লেখা হয়েছে কিনা সন্দেহ। তাঁর ‘পুরোনো বাংলা গদ্য’ নামের বইটিও একটি তাৎপর্যপূর্ণ মৌলিক গবেষণার ফসল। প্রচলিত ইতিহাসে বাংলা গদ্যের সূচনা ধরা হতো ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে। কিন্তু ঢাকায় ইংরেজ কুঠির কর্তা ও তাঁতিদের লেখা চিঠিপত্র ও অন্যান্য দলিল ঘেঁটে আনিসুজ্জামান প্রমাণ করেন যে, কেজো বাংলা গদ্যের ইতিহাস অনেক পুরোনো — তা ষোল শতক পর্যন্ত বিস্তৃত। ‘কাল নিরবধি’ ও ‘বিপুলা পৃথিবী’ নামে প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনীর দুই খণ্ড তো শুধু স্মৃতির সমাহার নয়, প্রজ্ঞা ও সুধার ভাণ্ড। ব্রিটিশ আমলের শেষদিক থেকে শুরু করে আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য আলেখ্য। অনেকগুলো বইয়ে দীর্ঘ ও হ্রস্ব নানা প্রবন্ধে তিনি মৌলিক চিন্তার যে ঐশ্বর্য রেখে গেছেন তা অমূল্য। আরেকজন আনিসুজ্জামান এই ভূখণ্ডে আবার কবে আসবেন? কে জানে!

আমাদের অন্যতম কাছের মানুষ শামসুজ্জামান খানও (১৯৪০-২০২১) চলমান মৃত্যুমিছিলে যোগ দিলেন। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভুবনে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল উপস্থিতি। গবেষক, প্রবন্ধকার, সংস্কৃতিতাত্ত্বিক ও ফোকলোরবিদ হিসেবে দেশে-বিদেশে সুপরিচিত। তিনি বিপুলসংখ্যক বই রচনা ও সম্পাদনা করেছেন। বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি ও জাতীয় জাদুঘরের মতো প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আমাদের লোকসংস্কৃতি গবেষণায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’র পাণ্ডুলিপি সম্পাদনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার দীর্ঘ ঐতিহ্য সম্পর্কেও তিনি কিছু নতুন ভাবনা তুলে ধরার কাজ করছিলেন। তাঁর মতে ভারতবর্ষে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতীচ্য থেকে আসা কোনো আদর্শ নয়, মধ্যযুগে এখানকার শাসনব্যবস্থার মধ্যেই ধর্মনিরপেক্ষতার এক নিজস্ব আদর্শ চর্চিত হয়েছিল। ‘দীনপানাহি’ (ধর্মবিশ্বাস রক্ষা) এবং ‘জাহানদারি’ (ইহজাগতিকতা) — এই দুই নীতির সমন্বয়ে দিল্লীর সুলতানরা ধর্মনির্বিশেষে সকলের অধিকার সংরক্ষণ করে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। পরবর্তীকালে এ অঞ্চলে এই ধর্মনিরপেক্ষ নীতিই সম্প্রসারিত হয়েছে। শামসুজ্জামান খানের বহুমুখি কাজ ও মননচর্চার অবসান ঘটল চিরদিনের জন্য।

এই ধ্বংসলীলায় হারিয়ে যাওয়া আরেকজন গুণী মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক কবি কাশীনাথ রায় (১৯৪৭-২০২১)। এককালের তুখোড় ছাত্র, প্রতিভাবান কবি, মনস্বী প্রাবন্ধিক এবং একজন তিমিরবিনাশী শিক্ষক কাশীনাথ রায় ছিলেন যথার্থ অর্থেই নিভৃতচারী। তিনি সবসময় নিজের অসামান্য দীপ্তিকে ঢেকে রেখে অতি সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে বাঁচতে চাইতেন। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্বে কত বিরল গুণের সমাবেশ ঘটেছিল সেটি খুব ভালো করে জানেন তাঁর শিক্ষার্থী, ঘনিষ্ঠজন ও পাঠকরা। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের মাঝামাঝি, প্রায় কিশোর বয়সে, তখনকার বিখ্যাত কবি আবদুল গনি হাজারী সম্পাদিত ‘পরিক্রম’ পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতা ‘হয়ত পাখিই ওটা’ কাশীনাথ রায়কে পরিণত কবির স্বীকৃতি এনে দেয়। আবদুল গনি হাজারীর মতো বিদগ্ধ কবি-সম্পাদক ‘আশ্চর্য’ সেই কবিতা সম্পর্কে মুগ্ধতা প্রকাশ করেন তাঁর সম্পাদকীয় মন্তব্যে। ‘আমাদের সর্বকনিষ্ঠ কবি’ অভিধায় কাশীনাথ রায়কে বরণ করে নেন।

উনিশ শ পঁচাত্তর সালে তখনকার সাড়াজাগানো সাহিত্যপত্র ‘কণ্ঠস্বরে’ প্রকাশিত তাঁর মর্মভেদী কবিতা ‘চারুবাবু ও কতিপয় বিভ্রান্ত স্থপতি’ পড়ে অনেকেই বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন। সে বছরই বাংলা একাডেমির এক অনুষ্ঠানে কবি আবুল হাসান কবিতা পড়তে মঞ্চে ওঠেন। কিন্তু নিজের কবিতা না পড়ে তিনি পড়েন বন্ধু কাশীনাথ রায়ের কবিতা। এবং সে কবিতা ‘চারুবাবু ও কতিপয় বিভ্রান্ত স্থপতি।’ এশিয়া-কাঁপানো নকশালবাড়ি আন্দোলনের নিদারুণ ব্যর্থতার পর  গোটা একটা প্রজন্মের বিমূঢ়তা ও মানসিক উন্মূলতা, সংশয় ও দিশাহীনতা বাণীরূপ পেয়েছিল এই কবিতায়:

‘হে অদৃষ্টময় অন্ধকার,
তুমি কেন আমাদের হৃৎপিণ্ড করো আত্মসাৎ?
আমরা তো শিশুতীর্থান্বেষী নই! বিশ্বাসের পরীক্ষায় তবে
কেন অবতীর্ণ হতে হবে আমাদের?
আমরা দক্ষিণে বামে শস্যক্ষেত্র দগ্ধ হতে দেখেছি। নির্বাক
শিশুর কঙ্কাল নিয়ে কড়ি খেলছে দ্বিতীয় ভুবন।
একা উপবাসী গাঙচিল
শীর্ণ ঠোঁটে জলরেখা টেনে তুলতে গিয়ে
পদ্মায় তলিয়ে গেছে। সর্বনাশা নিশি
ডেকে নিয়ে গেছে সব বাড়ন্ত কুমার।…
কী করে ঘুমাব আমরা বলো!
এইসব মৃত্যু-অপমৃত্যুর খবর
কারা পুষে রাখবে? কারা অদৃষ্টের পর
মেটাবে অসীম ধৈর্যে তপ্ত অন্ধকারের লালসা?

সব মিলিয়ে মাত্র তিনটি বই অন্তরালবর্তী কবি কাশীনাথ রায়ের। কাব্যনাটক ‘ডিভাইন কমেডি’ এবং কাব্যগ্রন্থ ‘জীবনানন্দ, দেখুন’ ও ‘আমি যাহা দিতে পারি।’ পরিমাণের বিচারে সামান্যই এই সম্ভার — তাও আবার অযত্নে-অলক্ষ্যে প্রকাশিত। কিন্তু তাহলেও তো তিনি কবি, মর্মে মর্মে কবি, স্বপ্নে ও জীবনানুশীলনে কবি। নিজের নিভৃত চর্চায় আমাদের সাহিত্যে যতটুকু রূপ ও মূল্য তিনি সংযোজন করেছেন তা অনুপেক্ষণীয়। এত দ্রুত তাঁর জীবনাবসান হবে ভাবেননি পরিচিতজনেরা। কিন্তু কবির অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি হয়ত কিছু বুঝতে পেরেছিলেন। তাই নিজের এপিটাফ লিখে গিয়েছেন এই কবিতায়:

‘তবুও দিনান্তে আমি বৃক্ষে ধরে রেখেছি ললাট।
জন্মাবধি অবনত এ আমার একমাত্র বিলাস।
জীবন্ত পাতাকে আমি অসম্মান করিনি কখনো।
আমার শিয়রে তাই জেগে থাকে এই অভিলাষ:
বৃক্ষ ভালোবেসে যদি করে থাকি ক্ষুদ্র পুণ্য কোনো
নিষ্ফল আমার নামে নিদ্রিত ছায়ায়
যে-কোনো বৃক্ষের থেকে যে-কোনো একটি পাতা
যেন ঝরে যায়।’

কবিতায় ব্যক্ত ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁর নিদ্রিত ছায়ায় নিশ্চয় এখন একটি গাছের একটি পাতা হলেও ঝরবে।

এই দুষ্কালে চলে গেলেন আরো কত গুণিজন যাঁরা আমাদের চিত্তের প্রসাদ দিয়েছেন, সৌরভ দিয়েছেন, ছায়া দিয়েছেন। গোটা একটি প্রজন্মই যেন উড়ে গেছে এবারের মৃত্যুঝড়ে। কিন্তু এই প্রজন্ম সামান্য নয়। অনেক প্রযত্ন আর সাধনার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিলেন এইসব মানুষ। জানি অনেকে মনে করিয়ে দেবেন এই আপ্তবাক্য — প্রকৃতি শূন্যতা পছন্দ করে না। হয়ত এই শূন্যতা কেটে যাবে একসময়। কিন্তু কেউ কি জানে কবে আসবে সেই সুসময়?

 

লেখক পরিচিতি :

কবি, গদ্যশিল্পী গোলাম ফারুক খান ১৯৫৮ সালের ১ অক্টোবর নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার                                                  সিংহেরগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা শেষে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন)-এর সদস্য হিসেবে                              কর্মজীবনের একাংশ কাটিয়েছেন। এ্রখন বিকল্প উন্নয়নধারার সাথে যুক্ত আছেন।                                                                                 কাব্যচর্চা ছাড়াও প্রবন্ধ রচনা ও অনুবাদকর্মে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: ‘গলুইয়ে কাঠের চোখ ভিজে ওঠে’ ( ধ্রুবপদ, ২০১০)।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

নির্বাচিত দশ কবিতা | নীহার লিখন

Fri May 14 , 2021
নির্বাচিত দশ কবিতা | নীহার লিখন 🌱 কাব্য ভাবনা  কবিতা শব্দে লেখা নিজেরই ছিন্ন-ভিন্নতাগুলোই, এ প্রাপ্তির তুলনা নেই, সতত ঘটনাবহুল একটা জীবনে এক নির্ভয় মিনতিটাই মানি যার অভিমুখ সে নিজেই, আমি কবিতা লিখলে চারপাশটা ভিন্ন হয়ে যেতে দেখি; সে অর্থে কবিতা আমার কাছে একটা পাহাড়ের মতোই যার উপরে উঠলে বহুদূর […]
Shares