নির্বাচিত কবিতা | মাসুদ খান

ভূমিকার আভা…

হারু‌কি মুরাকামির উপন্যাস 1Q84 এ একথা কথা আ‌ছে এমন, যা অল্প কথায় বোঝা‌নো যায় না, তার উদাহরণ দি‌য়েও বোঝা‌নো যা‌বে না। অর্থাৎ, উপল‌ব্ধি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা নির্ভর ততটা না যতটা অনুভূ‌তি নির্ভর। ক‌বি মাসুদ খা‌নের ক‌বিতা কেন আলাদা, ভা‌লো লা‌গে, তার নতুনত্ব কী, পৃথকত্ব কোথায় এগু‌লো খুব ক্লি‌শে একা‌ডে‌মিক আ‌লোচনা ম‌নে হয়। নন্দনতত্ত্ব একা‌ডেমির বারান্দায় জন্ম‌ নি‌লেও, এর সুদীর্ঘ ই‌তিহাস ও দর্শন থাক‌লেও, এমন‌কি তার প্রভাব প্র‌তিপত্তি আ‌র্টের সমা‌জে ব্যাপক হ‌লেও, আজকাল ম‌নে হয় মানু‌ষের মন, অনুভব ও অ‌ভিজ্ঞতার কা‌ছে এগু‌লো খুব পান‌সে। সুস‌জ্জিত অ‌স্ত্রের বিরু‌দ্ধে একটুক‌রো পাথর নি‌য়ে দাঁড়া‌নোর মত ব্যাপার এটা। অস্ত্র বা নন্দনত‌ত্ত্বের বোধ যতই শান‌তি হোক না কেন আর্ট বোঝার জন্য পাথরটাই য‌থেষ্ট। আর্ট হ‌লো কী হ‌লো না, ভা‌লো লাগ‌লো কী লাগ‌লে না তা একমাত্র অ‌ভিজ্ঞ মানব মন ‌নির্ধারণ কর‌তে পা‌রে সহ‌জে। এর জন্য তর্ক, উদাহরণ, কো‌টেশন, কৌশ‌লের মায়াজাল বিস্তার করা লা‌গে না। শিল্প নি‌জেই তার হ‌য়ে ওঠার উদাহরণ। আ‌মি কয়‌দিন হ‌য়ো বাংলা সা‌হি‌ত্যের নতুন নতুন বইগু‌লোর কথা ভাব‌ ছিলাম যেগু‌লোর আয়ু অন্তত আগামী ক‌য়েক শতক। তার মধ্যে থে‌কে বলা বিগত ত্রিশ বছ‌রে বাংলা ক‌বিতায় সব‌চে‌য়ে উ‌ল্লেখ‌যোগ্য লিখিত দু‌টি কাব্যগ্রন্থ ক‌বি মাসুদ খা‌নের ‘পা‌খিতীর্থ‌দি‌নে'( ১৯৯৩) ও ‘নদী কূ‌লে ক‌রি বাস’ (২০০১)। এমন অনন্য উচ্চতার কবিতা পুস্তক বিরল। প্রায় বিশ ত্রিশ বছর যাওয়ার পরও বইদু‌টোর কথা বল‌তে হ‌চ্ছে। আ‌মি বল‌তে পার‌ছি এই বইটা নি‌য়ে, এখ‌নো পড়‌তে পার‌ছি। ফ‌লে আমার হিস‌া‌বে বই দু‌টোর আয়ু ক‌য়েক শত বছর। যা ত্রিশ বছর প‌ঠিত হয় তা আ‌রো ষাট বছর পড়‌া হয়, যা ৬০ বছর তা ১২০ বছ‌রের আয়ু পায়। ১২০ বছর কিছু প‌ঠিত হ‌লে, তা অমর হ‌য়ে ও‌ঠে যে কোন ভাষায়। বাংলা সা‌হি‌ত্যের অমর ক‌বি হ‌বেন তি‌নি। এখন কেউ য‌দি ব‌লে আমার কথার ভি‌ত্তি কি? ত‌বে বল‌তে পা‌রি, ‘ অল্প কথায় বোঝা‌নো যায় না, তার উদাহরণ দি‌য়েও বোঝা‌নো যা‌বে না।’
মৃদুল মাহবুব
২৯ মে ২০২১

নির্বাচিত কবিতা | মাসুদ খান

🌱 

চেরাগজন্ম

বাতাসে ভাসিয়া যায় প্রচুর ব্যঞ্জনধ্বনি, ঘ্রাণ,
প্রলাপবিলাপবিকিরণ,
নিরুদ্ধার, যুগের যুগের।
লণ্ঠনটা তুলে ধরো হে চারণপুত্র,
আজ ভাষা ভেসে যায় গাঢ় সন্ধ্যা-,
অপর কালের।
ভাষা যায় পাঠোদ্ধারহীন, ব্যাসকূটসহ।
ধরো খপ করে চঞ্চুক্ষেপে একে একে
আলো ফেলে, লালা ফেলে, করো অর্থভেদ দেখি এইবার।

ও চারণ, তোমার চেরাগজন্ম বৃথা যায় যায়…

মন্দ গাইছে লোকে দিকে দিকে পুনর্বার
চিমনি চিরে যায় আজ এ-উন্মার্গ জলের ছিটায়
লোকের সকল মন্দ সুগন্ধ চন্দনচূর্ণ করে বলো,
এ-ই মাখিলাম এই অখণ্ডমণ্ডলে।

ও চারণ, তোমার চেরাগজন্ম বৃথা যায় যায়
চিমনি চিড় খায় আজ এ-উন্মার্গ জলের ছিটায়
চিমনি চিরে যায় আজ চক্রবাল থেকে
তেড়ে আসা অভিশাপে, ভর্ৎসনায়।

 

উচ্চতর বাস্তবতা

মায়েরা মৃত্যুর পর দেহ ছেড়ে চলে যান দূরের বিদেহপুরে।
তারপর প্রতিদিন ওই ব্যস্ত বিদেহনগর থেকে এসে
ঘুরে ঘুরে দেখে যান যার-যার ছেড়ে-যাওয়া সোনার সংসার।
অন্তত প্রথম ত্রিশ দিন।

কী করছে আহা সোনামণিরা তাদের,
কেমনই-বা কাটছে তাদের দিন, মাতৃহীন
বিষাদবাতাস, বাষ্পঘন দীর্ঘশ্বাস
ফাঁকা-ফাঁকা ঘরদোর, আশপাশ
মায়ের অভাবে উঠানের কোণে বিষণ্ন দাঁড়ানো জবাগাছ।

নবমৃত মায়েদের কি-জানি কেবলই মনে হতে থাকে
বেঁচেই আছেন তারা সংসারে, হয়তো
সংসারেরই ভিন্ন কোনো সম্প্রসারে, ঘুমঘোরে,
অন্যতর মায়ায়, আবেশে।
যেমন জন্মের অব্যবহিত পরের দিনগুলি…
নবজাতকের কাছে
বোধ হতে থাকে যেন সে রয়েছে তখনো মায়েরই গর্ভকোষে।

 

কুড়িগ্রাম

কোনোদিন আমি যাইনি কুড়িগ্রাম।

রাত গভীর হলে আমাদের এই প্রচলিত ভূপৃষ্ঠ থেকে
ঘুমন্ত কুড়িগ্রাম ধীরে ধীরে আলগা হয়ে যায়।
অগ্রাহ্য করে সকল মাধ্যকর্ষণ।
তারপর তার ছোট রাজ্যপাট নিয়ে উড়ে উড়ে
চলে যায় দূর শূন্যলোকে।

আমরা তখন দেখি বসে বসে আকাশ কত-না নীল
ছোট গ্রাম আরো ছোট হয়ে যায় আকাশের মুখে তিল।

অনেকক্ষণ একা-একা ভাসে নিখিল নভোভারতের রাজ্যে রাজ্যে।
দক্ষিণ আকাশে ওই যে একনিষ্ঠ তারাটি,
একসময় কুড়িগ্রাম তার পাশে গিয়ে চিহ্নিত করে তার অবস্থান।
তখন নতুন এই জ্যোতিষ্কের দেহ থেকে মৃদু-মৃদু লালবাষ্প-ঘ্রাণ ভেসে আসে।

সেই দেশে, কুড়িগ্রামে, ওরা মাছরাঙা আর পানকৌড়ি দুই বৈমাত্রেয় ভাই
কুড়িগ্রামের সব নদী শান্ত হয়ে এলে
দুই ভাই নদীবুকে বাসা বাঁধে
স্ত্রীপুত্রকন্যাসহ তারা কলহ করে।

নদী শান্ত হয়ে এলে
শাস্ত্রবাক্যে বাঁধা যত গৃহনারী
প্রাচীর ডিঙিয়ে এসে নদীকূলে করে ভিড়
প্রকাণ্ড স্ফটিকের মতো তারা সপ্রতিভ হয়।

হঠাৎ বয়নসূত্র ভুলে যাওয়া এক নিঃসঙ্গ বাবুই
ঝড়াহত এক প্রাচীন মাস্তুলে ব’সে
দুলতে দুলতে আসে ওই স্বচ্ছ ইস্পাত-পাতের নদীজলে।
কুড়িগ্রাম, আহা কুড়িগ্রাম!

পৃথিবীর যে জায়গাটিতে কুড়িগ্রাম থাকে
এখন সেখানে নিঃস্ব কালো গহ্বর।

কোনোদিন আমি যাইনি কুড়িগ্রাম।
আহা, এ-মরজীবন!
কোনোদিন যাওয়া হবে কি কুড়িগ্রাম?

 

পাখিতীর্থদিনে

আজ এই পাখিতীর্থদিনে, খোলা জানালাদিবসে
নিদারুণ এ অশনবসনের ক্লেশ।
দাউদাউ দুর্ভিক্ষের সামনে হা-দাঁড়ানো হতভম্ব মিকাইল।
হাতে কাঁপতে-থাকা ভিক্ষামাপনযন্ত্র–
মর্চেপড়া, অ্যানালগ; তদুপরি খসড়া, ক্যালিব্রেশনহীন।

এ-অঞ্চলে এমনিতেই কষ্ট।
পূর্বিনী, বিষণ্ণ শৃগালিনী,
ভর্ৎসনাচিহ্নিত ভাঙা লণ্ঠনটি মুখে আঁকড়ে ধ’রে
ধীরে সরে পড়ো ক্রমপূর্বদেশে দুপুরের রোদে
কোনো এক গভীর অগ্রাহ্যজঙ্গলের সরু পথ দিয়ে চলা
স্নিগ্ধ মিথ্যাবাদিনীর মতো।

প্রবল, উজ্জ্বল বনকিরণের মাঝে, ততক্ষণে,
তোমার সমস্ত দেহে চিকচিক করতে থাক
মিহি মিথ্যা-মিথ্যা বালিপরাগ।

তোমার হ্রেষাকে, অতিরঙিন গতিকে
বারবারই অতিক্রম করে যাক
এইসব বৃহন্নলা-দিনের রিমঝিম
বৃহন্নলা-মুদ্রার হ্রী ও ধী-সমুদয়।

দিক-দিগন্তর থেকে, এখন, অখিল বুদ্ধিরাশি
ক্রমেই ধাবিত হোক ওই দিব্যদূতের মস্তিষ্ক অভিমুখে।

 

মা

এই ধূলি-ওড়া অপরাহ্ণে,
দূরে, দিগন্তের একেবারে কাছাকাছি
ওই যে খোলা আকাশের নিচে একা শয্যা পেতে শুয়ে আছেন–
তিনি আমার মা।
দূর্বা আর ডেটলের মিশ্র ঢেউয়ে, ঘ্রাণে রচিত সে-শয্যা।
নাকে নল, অক্সিজেন, বাহুতে স্যালাইন, ক্যাথেটার–
এভাবে প্লাস্টিক-পলিথিনের লতায় গুল্মে আস্তে-আস্তে
জড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।

শয্যা ঘিরে অনেকদূর পর্যন্ত ধোঁয়া-ধোঁয়া
মিথ্যা-মিথ্যা আবহাওয়া।

মনে হলো, বহুকাল পরে যেন গোধূলি নামছে
এইবার কিছু পাখি ও পতঙ্গ
তাদের উচ্ছল প্রগলভতা
অর্বাচীন সুরবোধ আর
অস্পষ্ট বিলাপরীতি নিয়ে
ভয়ে ভয়ে খুঁজছে আশ্রয় ওই প্লাস্টিকের ঝোপঝাড়ে,
দিগন্তের ধার ঘেঁষে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা প্রাচীন মাতৃচ্ছায়ায়।

 

দীক্ষা

পথ চলতে আলো লাগে। আমি অন্ধ, আমার লাগে না কিছু।

আমি বাঁশপাতার লণ্ঠন হালকা দোলাতে দোলাতে চলে যাব চীনে, জেনমঠে
কিংবা চীন-চীনান্ত পেরিয়ে আরো দূরের ভূগোলে…
ফুলে-ফুলে উথলে-ওঠা স্নিগ্ধ চেরিগাছের তলায় বসে মৌমাছির গুঞ্জন শুনব
নিষ্ঠ শ্রাবকের মতো, দেশনার ফাঁকে ফাঁকে।
মন পড়ে রইবে দূরদেশে। সাধুর বেতের বাড়ি পড়বে পিঠে,
দাগ ফুটবে সোনালু ফুলের মঞ্জরির মতো শুদ্ধ সালংকার…

দীক্ষা নেব বটে মিতকথনের, কিন্তু
দিনে-দিনে হয়ে উঠব অমিতকথক,
নিরক্ষর হবার সাধনা করতে গিয়ে আমি হয়ে উঠব অক্ষরবহুল
এই হাসাহাসিভরা ভুঁড়িটি ভাসিয়ে গল্প বলে যাব
কখনো প্রেমের ফের কখনো ভাবের…
অথবা ধ্যানের, কিংবা নিবিড়-নিশীথে-ফোটা সুগভীরগন্ধা কোনো কামিনীফুলের।

ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরবে মঠের মেঘলা আঙিনায়
ওদিকে অদূরে লালে-লাল-হয়ে-থাকা মাঠে পুড়তে থাকবে ঝাঁজালো মরিচ
সেই তথ্য এসে লাগবে ত্বকে ও ঝিল্লিতে।
আমি সেই মরিচ-পোড়ার গল্প বলব যখন–
ঝাঁজের ঝাপটায় উত্তেজিত হয়ে তেড়ে গিয়ে যুদ্ধে যাবে সবে, এমনকি বৃদ্ধরাও।
যখন প্রেমের গল্প– কমলায় রং ধরতে শুরু করবে সোনাঝরা নরম আলোয়।
আবার যখন গাইব সে-গন্ধকাহিনি, সেই ভেজা-ভেজা রাতজাগা কামিনীফুলের–
ঘ্রাণের উষ্ণতা লেগে গলতে থাকবে মধুফল দেহের ভেতর।

 

নিদ্রা

এমন দক্ষিণাদিনে আজ
এই দেহ থেকে গোল-গোলাকৃতি চতুষ্কোণ
কত ধ্বনি বিকীর্ণ উপর্যুপরি–
প্রতিটি ধ্বনির সঙ্গে প্রবল মোচিত হচ্ছে প্রাণ
একটু একটু করে প্রতিবার, আর
এই রাংতারঙের রাত্রিতে যারা জীব,
তারা জানে, এই ধ্বনি কী জিনিশ! কী যে অবস্তু-অতীত!
এই ধ্বনি মৃদু-মৃদু, বাগর্থেরও অধিক উত্তরে,
আজকের রাত্রিতে যেখানে যত অন্নময় ও ইলিশময় জৈবকোষ আছে
তাদের সবার সূক্ষ্ম তুঙ্গ হর্ষধ্বনিরও অতীত এই ধ্বনি।

আর
সব ধ্বনিই আসলে চূড়ান্ত। তুঙ্গ পুলকজনিত।

এই ধ্বনি মৃদু-মৃদু, বাগর্থেরও অধিক উত্তরে,
আজকের রাত্রির সমস্ত অন্নময় ও ইলিশময়
জীবানন্দ কোষের অতীত।

আজ রজনীতে যারা জীব আছ, অবশিষ্ট হয়ে আছ,
ঘুমিয়ে পড়ছ ঝুপঝুপ করে একে একে
একটি বাতাস ছাড়া অন্যসব বাতাসেরা রাংতামুড়ি দিয়ে
বেরিয়ে পড়ছে ঝাঁকে, এই বদ্ধ জীব-সীমা পার হয়ে–
ছোট সৎবোনটিকে নির্জন বাড়িতে একা রেখে
যেমন বেড়াতে যায় বোনেরা, আহ্লাদসহ দূরে।
ছোট মেয়ে ভয়ে কাঁপে
ততোধিক কাঁপা-কাঁপা কুপির দীপন আগলে রেখে।

 

হোমাপাখি

পড়তে থাকা শুরু হলে একবার, জানি না কতটা পতনের পর সূচিত হয় উত্থান আবার–
ভাবছি তা-ই আর মনে পড়ছে সেই হোমাপাখিদের কথা যারা থাকে আকাশের অনেক উঁচুতে। আকাশেই ডিম পাড়ে। পড়তে থাকে সেই ডিম। কিন্তু এত উঁচু যে পড়তে থাকে দিনের পর দিন। পড়তে পড়তেই ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। তখন বাচ্চা পড়তে থাকে। পড়তে পড়তেই বাচ্চার চোখ ফোটে, ডানা হয়, পালক গজায়। একদিন দেখতে পায় সে পড়ে যাচ্ছে। অমনি চোঁ করে উড়ে যায় মায়ের দিকে। উঠে যায় অনেক উঁচুতে। এত উঁচুতে যে পাখিরা আকাশের গায়ে ইতস্তত ভাসমান তিলচিহ্ন হয়ে ফুটে থাকে।

ওই পক্ষিকুলে জন্ম পুনর্জন্ম আমাদের, ওই পক্ষিকুলেই পালন-পোষণ-পতন-উত্থান-উড্ডয়ন…

 

স্বপ্নভূভাগ

এবার বলো হে ফিরতিপথের নাবিক,
ওহে মাথা-মুড়িয়ে-ফেলা ভিনদেশি কাপ্তান,
সেই দ্বীপের খবর বলো
যেইখানে মানিপ্ল্যান্ট ও সোলার প্ল্যান্টের পাতারা
একযোগে চিয়ার্স-ধ্বনি তুলে পাল্লা দিয়ে
পান করে রোদের শ্যাম্পেন।
কোন প্রজন্মের উদ্দেশে তাদের সেই স্বতঃস্বাস্থ্যপান?

সেই দ্বীপদেশের কথা বলো যেখানে নারীরা
সামান্য একটি কাঠের কুটিরে
ফুটিয়ে তোলে অন্তত বাষট্টি রকমের বাৎসল্য ও প্রীতি।

প্রীতিপরবশ সেইসব কুটিরের কথা বলো, সেই
একটানা মমতালোকের কথা বলে যাও হে কাপ্তান
যে-দেশে নিশুতি রাতে রাধিকাপুরের ঝিয়ারিরা
পথ চলে শিস দিয়ে, তুড়ি বাজাতে বাজাতে।
আর আশপাশের ঝোপঝাড় থেকে
তালে-তালে পাল্টা তুড়ি বাজিয়ে সাড়া দেয়
নবীন উলটকমলের চটপটে পাতা ও পল্লব।

এবং হঠাৎই, টাশ-টাশ করে কথা বলে ওঠে
তরুণী বনবিড়ালিনীর সদ্য-বোল-ফোটা কনিষ্ঠা মেয়েটি।
তাক লাগিয়ে দেয় দ্বীপদেশের অরণ্য অধ্যায়ে।

নাবিক, অবাক সেই ভূভাগের কথা বলো
যেখানকার মাটি উষ্ণ, অপত্যবৎসল,
যেখানে মানুষ সোজা মাটিতে শুয়ে প’ড়ে
শুষে নেয় অষ্টাঙ্গে ভূতাপশক্তি সঞ্জীবন…
দেহ ও মাটিতে যোগাযোগ হয় একদম সরাসরি,
সোজা ও সহজ।

ও ফিরতিপথের নাবিক, ও মাথা-মুড়িয়ে-ফেলা প্রবীণ কাপ্তান,
তুমি সেই প্রসন্ন দ্বীপের কথা বলো, কী কী দেখলে সেখানে?
জলবায়বীয় পরিস্থিতির কথা বলো
প্রাণী ও পতঙ্গদের উল্লোল উচ্ছ্বাস
আর গাছেদের স্বতঃস্ফূর্তির খবর…

আমরাও তো চলেছি উজানে।
চলছি তো চলছিই অনিঃশেষ
উত্তর পেরিয়ে আরো দূর উত্তরোত্তর অঞ্চলে…
উগ্র লোনা বাতাসের সোহাগে, লেহনে
বিকল হয়েছে আমাদের সেক্সট্যান্ট
মর্চে ধরেছে কম্পাসে, দুরবিনে।
চলেছি তবুও।

বহু প্রত্যাশার, বহু সাধ-সাধ্য-সাধনার যোগ্য
স্বপ্নভূভাগ কি এরকমই দূর ও দুর্গম, যোগাযোগাতীত?

 

কৌতুকবিলাস

ঈশ্বর ছুড়েছে ঢিল ঈশ্বরীর দিকে, কৌতুকবিলাসে।

গ্রহটিকে মাটির ঢেলা বানিয়ে ব্রহ্মাণ্ডের এক প্রান্ত থেকে
ক্ষেপণ করেছে ভগবান, অন্য প্রান্তে থাকা ভগবতীর প্রতি।

মহাকাশ জুড়ে প্রসারিত মহাহিম শূন্যতা, লক্ষ-ডিগ্রি নিস্তব্ধতা–
তারই মধ্য দিয়ে একপিণ্ড ছোট্ট শ্যামল কোলাহল হয়ে
ধেয়ে যাচ্ছে এই ঢিল।

ঢিল নয়, মহামিসাইল–
মহাকাশের জোনাক-জ্বলা ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে
একের পর এক যমজাঙাল পেরিয়ে মিথ্যা-ইথারে অস্থির
ঢেউ তুলে ছুটছে ঢিল অহেতু আহ্লাদে
গোঁয়ার ক্ষেপণাস্ত্রের মতো একদিকে টাল হয়ে চক্কর খেতে খেতে
ঘোর-লাগা লাটিমঘূর্ণনে
আহ্নিকে বার্ষিকে ধোঁয়াজট বেগব্যঞ্জনায়–
যে বেগ উদ্ভ্রান্ত, যেই গতি একইসঙ্গে ঋজুরেখ বক্র চক্রাকার
ঘূর্ণ্যমান নাটকীয় একরোখা দুর্ধর্ষ ও ওলটপালট…

ছুটতে ছুটতে হয়রান ঢিলখানি।
ওদিকে ঈশ্বরী, ওই রাঘবরহস্যে-ঘেরা উত্তুঙ্গ রহস্যরাজ্ঞী,
সর্বনাশা এক ভাব-আলেয়ার ভাব ধ’রে অজ্ঞাত স্থানকালাঙ্কে ব’সে
থেকে-থেকে ছিনালি-হাতছানি একটু দিয়েই সরে যাচ্ছে দূরে।

মুহূর্তে মুহূর্তে ফুলে-ফেঁপে ওঠে মহাকাশ।
বেঁকে-যাওয়া, বাঁকতে-থাকা, ক্রমপ্রসারিত
এক দেশকালের ভেতর দিয়ে ঘটতে থাকে
ঢেলাটির উদ্ভ্রান্ত উন্মাদ ছুটে-চলা। আর
ছিটকে পড়ার ভয়ে ভয়ার্ত শিশুর মতো ছুটন্ত ঢেলার গা আঁকড়ে ধ’রে
চাম-উকুনের মতো চিমসা দিয়ে পড়ে থাকে প্রাণপণ
তটস্থ ও অসহায় প্রাণিকুল।

খেলা করে ভগবান ভগবতী– বিপদজনক ঢিল-ক্ষেপণের খেলা।
আর রোমাঞ্চে ও ত্রাসে শিউরে-শিউরে কেঁপে ওঠে তাদের শিশুরা।

 

জ্বরের ঋতুতে

তখন আমাদের ঋতুবদলের দিন। খোলসত্যাগের কাল। সুস্পষ্ট কোনো সর্বনাশের ভেতর ঢুকে পড়তে চেয়েছিলাম আমরা দুজন। তার আগেই তোমার জ্বর এল। ধস-নামানো জ্বর। তুমি থার্মোমিটারের পারদস্তম্ভ খিমচে ধরে ধরে উঠে যাচ্ছ সরসর করে একশো পাঁচ ছয় সাত আট…ডিগ্রির পর ডিগ্রি পেরিয়ে…সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী তাপের সহগ হয়ে উতরে উঠছ তরতরিয়ে সেইখানে, যেখানে আর কোনো ডিগ্রি নাই, তাপাঙ্ক নাই…তাপের চূড়ান্ত লাস্যমাত্রায় উঠে ঠাস করে ফারেনহাইট ফাটিয়ে বেরিয়ে আসছে থার্মোমিটারের ফুটন্তঘন ফলিত আগুন।

তীব্র, ধসনামানো জ্বরেও নারীরা ধসে না। হয়তো কিছুটা কদাকার দেখায়, এবং কিছুটা করালী দেবীর মতো। যত রূপসী তত করালিনী, জ্বরে।

একসময় মাথা-ফেটে-যাওয়া থার্মোমিটারকে ব্রুমস্টিক বানিয়ে তাতে চড়ে উধাও উড়ালে অস্পষ্ট অঘটনের দিকে হারিয়ে যাচ্ছ হে তুমি, প্রিয়তরা পিশাচী আমার।

জীবনে প্রথম মুখোমুখি এরকম সরাসরি স্পষ্ট বিপর্যাস…
মিটারের জ্বালাখোঁড়ল থেকে ঝরছে তখনো টগবগ-করে-ফোটা ফোঁটা-ফোঁটা লাভানির্যাস।

 

ডালিম

যুগের যুগের বহু বিষণ্ণ বিবর্ণ মানুষের দীর্ঘনিশ্বাসের সাথে
নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড–
তা-ই থেকে তিলতিল কার্বন কুড়িয়ে
জমাট বাঁধিয়ে, কাষ্ঠীভূত হয়ে
তবে ওই সারি-সারি দিব্যোন্মাদ ডালিমের গাছ।

বৃক্ষের সংগতি যতটুকু, তারও বাইরে গিয়ে
তবেই-না ওই টানটান বেদানাবৃক্ষ, ব্যাকুল বেদনাকুঞ্জ,
মায়াতরু…রূপাঙ্কুর…রূপসনাতন…
পাতার আড়ালে ফাঁকে-ফাঁকে ফলোদয়
থোকা-থোকা গুপ্ত রক্তকুপিত উত্তপ্ত বিস্ফোরণ
রামধনুরঙে, মগ্নছন্দে
ফলিয়ে ফাটিয়ে তোলে ডালে-ডালে লালাভ ডালিম।

বসে আছি ম্রিয়মাণ…বেদনাবৃক্ষের নিচে, পড়ন্ত বেলায়।
সামনে খুলে মেলে-রাখা একটি ডালিমফল, তাতে
প্রভূত বেদানা-দানা, নিবিড় বেদনাকোষ…আর,
বেদানার দানারা তো আর কিছু নয়, জানি–
টলটলে করুণ চোখে রক্তজমা চাবুক-চাহনি…

ভাবি,
এতসব ডালিমকোষের মধ্যে, ঠিক কোন কোষটি রচিত
আমারই সে ন্যুব্জ ব্যর্থ বিষণ্ণ পিতার বাষ্পঠাসা দীর্ঘশ্বাসের কার্বনে!
ঘনীভূত হয়ে ওই বায়ব অঙ্গার, তিলে-তিলে, অনেক বছর ধ’রে…

 

দমকল

উন্মাদ উঠেছে গাছে, তরতর করে, ছাড়া পেয়ে পাগলাগারদ।

নামে না সে কিছুতেই, যতক্ষণ-না ওই বেঁটেখাটো নার্সটি এসে
মিনতি করে না-নামায় তাকে।

নার্স আসে দ্রুত, দমকলের মতন
কী-কী যেন বলে হাত নেড়ে নেড়ে,
তাতে খুশি হয়ে নেমে আসে উঁচু ডাল থেকে বিমুগ্ধ পাগল–
ঝোলের উল্লাসসহ নেমে আসে যেইভাবে কইমাছ পাতে
কানকো টেনে টেনে
ক্রমিক সংখ্যার মতো সহজ স্বাচ্ছন্দ্যে।

ঝিলমিল করে বয়ে যায়, সেবিকার বোধে, পাগলের বিকল বিবেক।

উন্মাদ আবার ফিরে যাবে আজ উন্মাদ-আশ্রমে
ধর্মগণ্ডিকায় মাথা রেখে নির্বিকার নিয়ে নেবে
তেরোটি ইলেকট্রিক শক
তেরোবার স্বীকারোক্তি, স্বাস্থ্যযাজকের শান্ত সুধীর নির্দেশে।

 

ব্লিজার্ড

আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত দাপিয়ে ফিরে
সমগ্র নীলিমা তছনছ করে দিয়ে
কোটি-কোটি দুষ্ট দাপুটে শিশু খেলছে হুলুস্থুল বালিশ ছোড়ার খেলা।

অজস্র কার্পাস ঝরছে
লক্ষকোটি বালিশফাটানো তোলপাড়-করা অফুরন্ত তুলা।
যেন তুলারাশির জবুথবু জাতক হয়ে পড়ে আছে ধীরা ধরিত্রী, বিব্রত বেসামাল।
সাথে উল্টাপাল্টা ঝাড়ি একটানা বেপরোয়া বাবুরাম পাগলা পবনের।
আবার কোত্থেকে এক নির্দন্ত পাগলিনীর আকাশ-চিরে-ফেলা ওলটপালট অট্টহাসি
মুহুর্মুহু অট্টালিকায় প্রতিহত হয়ে ছুটছে দিশাহারা দিগবিদিক
ঘরবাড়ি মিনার-ময়দান বাহন-বিপণী আড়ত-ইমারত গাছপালা বন বন্দর বিমান
সবকিছুর ওপর এলোপাথাড়ি থার্ড ডিগ্রি চালিয়ে বের করে আনছে
তুলকালাম গোপন তথ্য, তুলাজটিল শীৎকার।

 

প্রলাপবচন

নদ এসে উপগত হবে ফের নদীর ওপর
দুই পারে জমে উঠবে কপট কাদার ঘুটঘুটে কেলেংকারি
মাঝখানে চোরাঘূর্ণি চোরাস্রোত
এলোমেলো এলোমেলো বাউরি ভাবনা এসে
পাক খেয়ে ঢুকে পড়বে বৃষ থেকে মিথুনের অধিক্ষেত্রে।

মাকাল ফলের মৃদু মনস্তাপ
করলা-লতার শ্যামলা আক্ষেপ
কোকিলস্য প্রবঞ্চনা, কাকের বাসায় উপঢৌকন
ভরা বিলের ওপর দিয়ে ভেসে আসা ভেজা-ভেজা সুর
হুদহুদ পাখির অস্থিরতা, অসমাপিকার লঘু তঞ্চকতা
একরোখা অশ্বের অস্মিতা, উগ্রবসনা আগুনের চঞ্চল রসনা…
আলগোছে সবকিছু পাশ কেটে গিয়ে
ওইদিকে বর থাকবে কনের বশে
খলনায়কের দাঁতের নিচে পড়বে কট্টরপন্থী কাঁকর
চার্জ করা হবে পশ্চিমের ব্লাস্ট ফার্নেসে
আর ঝাপটা এসে লাগবে পূর্বেরটা থেকে
খামাখা দিওয়ানা হবে রঙিলা বিড়ালিনী
ঘনঘন গণ-হাইপ উঠবে মামুলি ঘটনা ঘিরে এমনি-এমনি
হিস্টিরিয়ায় কাঁপতে থাকবে দেশকাল
সাত সাধু এক হবে, এক শয়তান সাত
দোষযুক্ত আলু নামবে হিমাগারের শ্রোণিচক্র থেকে…

এবং হয়তো আমি একদিন ঠিকই
পড়ো-পড়ো ঘরকে যোগাতে পারব
গাঁট-অলা তিন-বাঁকা শালকাঠের সমর্থন
নিশ্চিহ্নকে দেখাতে পারব কিছু লুপ্তপ্রায় চিহ্নের ইশারা
বিশেষকে কোনো ভ্রান্তিকর নির্বিশেষের আভাস
বেদিশাকে দিশার বিভ্রম…

আর দুম করে লিখে ফেলব এমন এক কবিতা একদিন,
যা পড়ে ভৌতিক সুর তুলবে একসঙ্গে সাধু ও শয়তান
সাপ-আর-অভিশাপে-গড়া মতানৈক্যে-ভরা গামারিকাঠের গিটারে
আর ‘চলে আয়’ বলে স্বয়ং ঈশ্বর টুইট পাঠাবেন দিব্য টুইটারে।

 

নির্বাসন

অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে আকাশ ঢাকা
গায়ে তার জ্বলে কোটি-কোটি প্ল্যাংক্টন
তারই মাঝে একা একটি শ্যামলা মেঘে
সহসা তোমার মুখের উদ্ভাসন।

হয়তো এখন আকাশ নামছে ঝেঁপে
মেঘ ও মেঘনার ছেদরেখা বরাবরে
ঝাপসা একটি আগুনের ছায়ারূপ
ঝিলিক দিয়েই মিলাচ্ছে অগোচরে।

দূর গ্রহে বসে ভাবছি তোমার কথা
এতটা দূরে যে, ভাবাও যায় না ভালো
ভাবনারা হিম-নিঃসীম ভ্যাকুয়ামে
শোধনে-শোষণে হয়ে যায় অগোছালো।

অথচ এখানে তোমারই শাসন চালু
তোমার নামেই বায়ু হয়ে আমি বই
তোমারই আবেশে বিদ্যুৎ জাগে মেঘে
তোমার রূপেই ময়ূর ফুটেছে ওই।

মধুকর আজ ভুলে গিয়ে মাধুকরী
রূপ জপে তব কায়মনোগুঞ্জনে।
মনন করছে তোমারই বিম্বখানি
ধ্যানে ও শীলনে, স্মরণে, বিস্মরণে।

গন্ধকের এই গন্ধধারিণী গ্রহে
তটস্থ এক বিকল জীবের মনে
ক্ষার, নুন, চুন, অ্যাসিড-বাষ্প ফুঁড়ে
চমকিয়ে যাও থেকে-থেকে, ক্ষণে-ক্ষণে।

 

একজন বর্ণদাসী ও একজন বিপিনবিহারী সমাচার

বনের কিনারে বাস, এক ছিল রূপবর্ণদাসী
আর ছিল, বনে বনে একা ঘোরে, সেই এক বিপিনবিহারী।
কন্যা তো সে নয় যেন বন্য মোম, নিশাদল-মাখা, বন্য আলোর বিদ্রুপ
রাতে মধ্যসমুদ্রে আগুন-লাগা জাহাজের রূপ
অঙ্গে অঙ্গে জ্বলে–
দূর থেকে তা-ই দেখে কত রঙ্গে, কতরূপ ছলে ও কৌশলে
মূর্ছা যায়-যায়-প্রায় কত যে বামন গিরিধারী
আর যত অন্য-অন্য অর্বাচীন বিপিনবিহারী।

কন্যা তো সে নয়, বুনো সুর, বুনো তান, আর উপমান, অরণ্যশোভার।
আঁচলে কূজন আঁকা তার, আমাদের সেই বহুবল্লভার।

বনের কিনারে বাস, ছিল এক রূপবর্ণদাসী
আর ছিল বনে বনে একা ঘোরে সেই এক বিপিনবিহারী।
অসবর্ণ তারা, অসমান, অসবংশের জাতক
একসঙ্গে তবু দোঁহে একই বুনো বাদলে স্নাতক।
তবু সেতু গড়ে ওঠে সন্ধ্যাকালে দূর দুই তটে
সেতু, দেহকথনের গোধূলিভাষ্যে তা ফুটে ওঠে।

 

ছক

দশটি পথ এসে যেখানটায় কাটাকাটি হয়ে চলে গেছে দশ দিগন্তের দিকে, সেইখানটায় গিয়ে বসে থাকেন আমার মা। পথের ধারে বসে মা আমার মানুষ দ্যাখেন, মানুষের আসা-যাওয়া দ্যাখেন। কোনো পথ দিয়ে আসে হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা। কোনো পথ দিয়ে আসে গ্রহণ-লাগা, ক্ষয়ে-যাওয়া, নিভু-নিভু সব বনি-আদমের দল। আবার মেঘ ও মিথুন রাশির ছায়ায় তুমুলভাবে বাঁচতে থাকা মানব-মানবীদের যাতায়াত কোনো কোনো পথে।

একদিন আসা-যাওয়ার পথের ধারে মা কুড়িয়ে পেলেন আমার ভাইকে (আমি তখনো আসিনি আমার এই মায়ের কাছে)। কিন্তু কিছুকাল পর আমার সেই ভাই হঠাৎ গেল হারিয়ে। তারপর থেকে মা আমার ওই পথমোহনায় বসে তীব্র পুত্রশোকে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদেন।

একবার, গোধূলিরঙের লম্বা-লম্বা চুলদাড়িঅলা এক বুড়ো পথিক ক্ষণিকের জন্যে থামালেন তার পথচলা। মা-র কাছে সব শুনে বললেন, ‘কোথাও তো কিছু হারায় না মা এই মহাবিশ্বে! যাও খুঁজে দ্যাখো।’ তারপর থেকে মা আমার উড়ে উড়ে বিশ্বসংসার তোলপাড় করে খুঁজে ফিরেছেন তার সন্তানকে। শেষে সপ্ত-আকাশের পরপারে আমাকে কুড়িয়ে পেয়ে, এবং তার সন্তানকেই পেয়েছেন মনে করে, উড়িয়ে নিয়ে এলেন এই মর্ত্যের ধুলায়। আমি তখন সাত আসমানের ওপারে অনন্ত নক্ষত্রকুঞ্জের ঝাড়জঙ্গলের ধারে সোনালি খড়ের গাদায় বসে অনাথ শিশুর মতো কাঁদছিলাম একা একা, মাকে হারিয়ে।
দিন যাবে, মাস যাবে, ঘুরে আসবে বছর…
একদিন হয়তো আবার হারিয়ে যাব আমি এই নতুন পাওয়া মায়ের কাছ থেকে আর আমাকে খুঁজে পাবেন অন্য এক মা। তারও হারিয়েছে সন্তান। আমাকে পেয়ে ভাববেন, খুঁজে পেয়েছেন তারই হারানো ছেলেকে।

এইসব অনন্ত বিভ্রম আর বন্ধন
এই যে নিখিল ভুলবোঝাবুঝি
লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদা আর হারানো-পাওয়া খেলা
এইসব নিরন্তর মায়া ও ম্যাজিক…
সবকিছু অমীমাংসিত রেখে দিয়ে,

কাটাকুটি ময়লা ডুপ্লিকেট নকশা একখানা জগৎসংসারের,
তা-ই মেলে ধরে অবাক উদাস হয়ে বসে আছেন জরিপকর্তা।

নকশাটাতে একপাশে লেখা– স্বাক্ষর/- অস্পষ্ট
নিচে তার চেয়েও অস্পষ্ট একটা সিল…

 

শৈবালিনী

স্রোতে শুধু ভেসে চলো তুমি ওগো শৈবালিনী, শৈবালিকা, জলজা আমার
তুমি, তুমি ধর্মে মৎস্য, জাতিতে শৈবাল, আর স্বভাবে যে সৌদামিনী তুমি…

তুমি ঊর্মি রাশির জাতিকা
ঊর্মিসঙ্গে ভেসে চলাতেই হয় তব ধর্ম, আনন্দ তোমার।

তুমি মাছ হয়ে যাবে, নাকি
হবে কোনো জলজ উদ্ভিদ–
এতকাল পর এই দ্বিধা আজ, শৈবালিনী, জাগছে তোমাতে
মুহুর্মুহু বিজলিবিলাসে।

ফোটে ফুল, আস্তে আস্তে, ফোটে তার বিবিধ ব্যঞ্জনা
আবার হারিয়ে যায় জলে সেই ফুল, সেই জলজ রচনা
জল থেকে জলান্তরে…বহু নাম জাগে পথে পথে,
সর্ব নাম ফের বদলে বদলে যায় স্রোতে।

বহুলনামিনী তুমি বহুলচারিণী বহু-আকারিণী জলজা আমার
তুমি, তুমি ধর্মে মৎস্য, জাতিতে শৈবাল,
স্বভাবে বিদ্যুৎ-লতা তুমি…

তুমি ঊর্মি রাশির জাতিকা, ঊর্মিসঙ্গে ভেসে চলাতেই হয় তব ধর্ম ও সাধনা
তোমাতে ক্ষণেই জাগে মাছের স্বভাব, ক্ষণেই তো ফের শিকড়বাসনা…

 

ইতিহাস

কী করে সম্ভব তবে পৃথিবীর সঠিক ইতিহাস? কারণ, যিনি লিখেছেন, তিনি কে এবং কোথায়? কোন্ সময়ে, কোন্ অবস্থানে দাঁড়িয়ে কী উদ্দেশ্যে লিখছেন, সে-সবের ওপর নির্ভর তার ইতিহাস। আর তা ছাড়া বিষয়টি বিষয়ীগত। সাবজেকটিভ।

তবে কি সত্যিই অসম্ভব সঠিক ইতিহাস?

—না। ভূমণ্ডল হতে এ যাবৎ যত আলো বিকীর্ণ হয়ে চলে গেছে সে-সবের মধ্যেই মুদ্রিত হয়ে আছে পৃথিবীর ইতিহাস, কালানুক্রমিক। অর্থাৎ পৃথিবী হতে বিচ্ছুরিত আলোর ইতিহাসই পৃথিবীর ইতিহাস। আর তা-ই হচ্ছে প্রকৃত ইতিহাস, কেননা তা লিখিত প্রাকৃতিকভাবে। এই নিখিল নভোভারতের রাজ্যে রাজ্যে বসে দুরবিন দিয়ে সেগুলো টুকে নিচ্ছে হয়তো কেউ কেউ— আমরা জানি না।

তবে সে-ও কি হবে সঠিক ইতিহাস? কেননা, ইতিহাসের সেইসব অধ্যায়, যেগুলো কালো এবং অন্ধকার? সব আলো শুষে নিয়ে নিয়ে যেগুলো কালো ও কলঙ্কিত হয়ে পড়ে আছে? যেগুলো থেকে কোনোকালেই আর বের হয়নি এবং হচ্ছে না কোনো আলো? সেইসব?

তা ছাড়া সেই সব মানুষদের ইতিহাস, যারা কালো এবং কালচে তামাটে?

—হয়তো-বা দুরবিনে ঝাপসা হয়ে ধরা পড়ছে তাদের ইতিবৃত্ত, ঝাপসা মুদ্রিত হচ্ছে তাদের ইতিহাস— যেহেতু তারা যথাক্রমে কৃষ্ণ এবং ঊনকৃষ্ণ, যেহেতু তারা খুবই সামান্য আলো দিতে পারে বলে পৃথিবীতে প্রচারিত, বিচ্ছুরণে তারা প্রায় অক্ষম বলে প্রচারিত।

তাহলে কি কালো ও তামাটে মানুষদের ইতিহাস নিরন্তর ঝাপসাই থেকে যায়!? পৃথিবীতে!? এবং প্রকৃতিতে!?

আলো নেই, তাই ইতিহাসও নেই?!

 

ধর্মাধর্ম

যেদিন গাছেরা ত্যাগ করবে তাদের বৃক্ষধর্ম
মিষ্ট নয়, ফল হবে কটু বা কষায়
আর সোজা না ফেলে সে ফল ফেলবে তির্যক ভঙ্গিতে
যেদিন আমের গাছে জাম হবে, এবং তামার গাছে সিসা…

দস্যুকে তো শীলাচারী হলে চলে না
তবুও যেদিন সে ডাকাতি ছেড়ে দিয়ে
হয়ে উঠবে সুশীল, পাদ্রি ও পরার্থপর
বকেরা যেদিন মশগুল হবে মাছেদের মঙ্গলচিন্তায়
সাপেরা অহিংস হবে, হরিণেরা তাড়িয়ে বেড়াবে সিংহদের…

যেদিন আয়না পরিত্যাগ করবে তার আর্শিধর্ম
দেবে না তো আর কোনো প্রতিবিম্ব
পাহাড় দেবে না প্রতিধ্বনি…

আর যত শীল ও দুঃশীল গতি অগতি কুশল অকুশল
আর যত অভিজ্ঞা ও সমাপত্তি, বারো রকমের বন্ধনযাতনা
সংসার সন্ন্যাস মোক্ষ মোহ কাম কৃত্য ঘাম মূত্র
ঔরস ও ধর্মাধর্ম পুরীষ পৌরুষ…
সব একাকার হবে যেইদিন
সেদিন কোথায় কোন দূরে নিয়ে যাবে গো আমায়
ধর্মহারা বীতকৃত্য সূত্রহীন পুরীষবিহীন?

 

বৃষ্টি-১

এখন বিদেশে বৃষ্টি হচ্ছে, অতিদূর আর নিকট-বিদেশ।
ঠান্ডা হাওয়া এসে লাগে থেকে থেকে অপর দেশের।
এ গ্রীষ্মসন্ধ্যায় আহা এমন বিষাদ আর রূপের অনুশীলন আজ
বিদেশি আকাশে!

কী যে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যায়
আর
পরধর্মে সাধ জাগে ধীরে ধীরে এমনই সন্ধ্যায়।

দূরে রূপশাসিত নদীর কিনারায়
বিদেশ অপূর্ব বৃষ্টিময়
মুহুর্মুহু বিজলিপ্রতিভায়।
আর
পররূপে কাতরতা জাগে মৃদু-মৃদু
এমনই সন্ধ্যায়।

তাজা হাওয়া বয়
খুঁজিয়া দেশের ভুঁই,
ও মোর বিদেশি জাদু
কোথায় রহিলি তুই ॥

 

বৃষ্টি-২

বৃষ্টি হচ্ছে
বিদেশে
আরো কত-কত আবছা ব্রহ্মদেশে, রঙ্গপুরে,
ব্যাপিত বগুড়াবর্ষে,
অনেক নিম্নের দেশে, ম্লেচ্ছাবর্তে,
বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে আসা
বিকেলের ব্রহ্মদেশে,
বৃষ্টি হচ্ছে।

এবং একটানা এই বিজলিশাসনের নিচে
এই বৃষ্টিনির্ধারিত তৃতীয় প্রহরে
দেশে দেশে কত রাঙা ও রঙিন জাতি
অস্পষ্ট গঠন নিয়ে ফুটে উঠছে উৎফুল্ল ভেকের মতো
অজানা উৎক্ষেপে।

বৃষ্টি আর বিদ্যুতের এই সহিংস প্ররোচনাক্রমে
চূড়ান্ত প্রশ্রয়ে
প্রলোভনে
বৃষ্টির প্রবল ঘোর আর
ঘূর্ণির ভেতর
বাতাসের অন্ধকারে
পূর্বাঞ্চলে
আকাশের নিচে
একাংশে, বিশাল ফাঁকা মাঠে
বিস্তারিত কচুখামারের আড়ালে আড়ালে
প্রায় অবিশ্বাস্যভাবে জায়মান নতুন-নতুন সব রাষ্ট্র।

ডানাভাঙা উত্থানরহিত কত ক্ষুদ্র-ক্ষুদ্র রাষ্ট্র
তাদের ময়লা মানচিত্র
এবং অস্থির কাঁপা-কাঁপা ক্ষেত্রফল
অশোধিত আইন এবং সব অসহায় খর্বকায় ন্যায়পাল
এবং অপরিষ্কার কিছু কুচকাওয়াজসমেত জেগে উঠছে শুধুই
শুধু যমনির্দিষ্ট নিয়তি নিয়ে।

এইবার রাত্রি সমাপ্তির দিকে প্রবাহিত। এখন বৃষ্টিও নিভুনিভু-প্রায়।
ওইসব কথিত উল্লাসশীল জাতি আর বিকাশচঞ্চল রাষ্ট্র আর
তাদের শরীরে
গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে স্ফুটমান আর সদ্যফোটা কত-না বর্ণাঢ্য ধর্মরাজি
সবসহ অচিরে মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে
ভোরের আলোয়। বিস্তারিত কচুপ্রান্তরের আড়ালে আড়ালে।

 

সেতু

কোন-বা জাতির জাতক তুমি
কোন-বা প্রাণের প্রাণী
আঁধারতমা আলোকরূপে
তোমায় আমি জানি।

কোন-বা জলের জলজ আহা
কোন ঝরনায় বাস,
কোন অম্লজানের হাওয়ায়
নিচ্ছ তুমি শ্বাস?

কোন ঘটনার অনুঘটক
কোন জারণের জারক,
কোন উল্কার গতি তুমি
কোন কৃত্যের কারক?

ভাব-উচাটন পুরুষ হলে
প্রকৃতিস্থ হও।
কিংবা যদি হও প্রকৃতি,
পুরুষরত রও।

কোন ধর্মের ধর্মী ওহে
কোন-বা রূপের রূপী,
রূপ থেকে রূপ-রূপান্তরে
ফিরছ চুপিচুপি।

জন্মান্তর ঘুরে আসি
তোমায় দেখার ছলে,
কোন রূপে ফের আকার পেলে?
কোন মন্ত্রবলে?

কোন মেঘেদের বিজলি তুমি
কোন-সে কুলের কেতু,
কেমন করে তুলব গড়ে
যোগাযোগের সেতু?

 

প্রত্যাখ্যান

হঠাৎ মায়ের স্তন থেকে, আজই, উৎখাত হয়েছে শিশু
ঘুরে ফিরে বারে বারে যায় তবু মায়ের নিকট
বকা খায়, কিছুটা অবাক হয়, তবু শিশু যায়…

অবুঝ কী আর বোঝে কী-বা অর্থ হয় এই উৎখাতলীলার!
কী-বা এর বিন্দু- ও বিসর্গ-ভাব
কিছুই পারে না বুঝতে মায়ের স্বভাব
শুধু ভাবে– মায়ের কৌতুক তবে এতটা নিষ্ঠুর!
মাতা কেন হয় আজ এতটা বিমাতা
এই খরাঋতুতে হঠাৎ?

ভেবে একা কষ্ট পায়, নিঃসহায়, ফের তবু যায়
শিশু ফের বকা খায়, আবার অবাক হয়, তবুও সে যায়…

কেঁদে কেঁদে অবশেষে বোবা অভিমানে
অবশ ঘুমিয়ে পড়ে মাটির শয়ানে।

শুধু তার পিপাসার ধ্বনি এসে লাগে কানে
থেকে থেকে, এই মহিমণ্ডলের এখানে ওখানে।

 

নামহারা, বাক্ ও বাক্যহারা…

মেঘের ডাকের মধ্যে গচ্ছিত আছে জগতের সমস্ত ধ্বনি, জমাট হয়ে, এক জটিল প্রকারে। ওই যে মেঘ ডাকছে আর মনোযোগ দিয়ে তুমি শুনছ, মনে হচ্ছে না কি, একসঙ্গে ধ্বনিত নিখিলের সমস্ত স্বর ও ব্যঞ্জন? ঘোষ? অঘোষ? এবং নির্ঘোষ?

একদিন ওই মেঘই মেদিনীর বুকে ছিটিয়ে দিয়েছিল ধ্বনির বীজ। আজও মেঘ থেকে ঝরে রকমারি ধ্বনির পরাগ– ঝরে বিজলির সঙ্গে ব্যঞ্জন, বৃষ্টি ও বাতাসের সঙ্গে স্বর।

অতঃপর ওই বীজ অঙ্কুরিত হলো ঝড়ের নিস্বনে, ঝরনার কলস্বরে, শঙ্খের নিনাদে, ঢেউয়ের চ্ছলচ্ছলে…। ফিনকে উঠে ছড়িয়ে গেল ধ্বনির ফুলকি সবখানে– কেকায় কুহুতে, কূজনে গুঞ্জনে, হ্রেষায় বৃংহণে…

এই যে আজ পাখি ডাকছে আবার এতকাল পর, তার ওই কূজনের মধ্যেও জটপাকানো বিশ্বের সমস্ত স্বর ও ব্যঞ্জন। পাখির কূজন আর পতঙ্গগুঞ্জন– সে-এক আশ্চর্য ধ্বনিপ্রপঞ্চ যার মধ্য থেকে শনাক্ত করা অসম্ভব একক কোনো ধ্বনি। সব ধ্বনি যেন এসে মিলেমিশে টালমাটাল একাকার।

স্মরণে আনো একবার সেই দূর-দূরতর দিনের স্মৃতি (অতীত দিনের স্মৃতি, কেউ ভোলে না কেউ ভোলে), যখন কোথাও ফোটেনি কোনো ভাষা, কেননা ধ্বনিই তখন ফোটা-অফোটার দোলাচলে…। অসহ্য সুন্দর সেই ভাষাহীন নিঃশব্দ নির্বাক্ অথচ কী অপূর্ব আধো-আধো ধ্বনিগন্ধময় জগৎ! সমস্ত বস্তু বৃক্ষ প্রাণী, সমস্ত ক্রিয়া প্রবাহ ঘটনা, সবকিছুই কী বিশুদ্ধ কুমার-কুমারী! নামের কোনো দূষণ, প্রতীকের কোনো কেলেঙ্কারি তখনো ছোঁয়নি তাদের।

মনে কি পড়ছে তোমার, সেই নামপূর্ব ভাষাপূর্ব অবাক্ অমলিন অকলঙ্ক নিসর্গের ভেতর দিয়ে, খুলে রেখে আমাদের নামের খোলস, কালাকালহীন তুমি-আমি হেঁটে চলেছি সমান্তরাল– নামহারা, বাক্ ও বাক্যহারা, ভাষাহীন, বাকলবিহীন…

 

মৌসুম

গাছগাছালিরা আবার প্রকাশ করবে পত্রপত্রিকা।
কীটাক্ষরে ছাপা হবে তাতে কথা ও কথিকা, কবিতাও…
মহোৎসব লেগে যাবে বানানভুলের, কাটাকুটি,
নিরক্ষর পাতায় পাতায়।

“আমার লাইন হয়ে যায় আঁকাবাঁকা, ভালো না হাতের লেখা…”
গাইতে গাইতে এই তো এখনই ছুটে যাচ্ছে কাঠবিড়ালির শিশুকন্যা।
তার ফোকলা দাঁতের খিলখিল হাসির হিল্লোলে
আগাম চেয়ার উল্টে পড়ে যাচ্ছে ওই
দ্যাখো সাপ্তাহিক কলাকাণ্ডের ঘোড়েল সম্পাদক।
রসিক পাঁকের মধ্যে খাবি খাচ্ছে সম্পাদনা, মৌসুমি আহ্লাদে।

অপরের ভাব ভাষা চুরি করে পাইকারি চালান দিতে গিয়ে
ধরা খেয়ে জব্দ বসে আছে বর্ণচোরা দুই চতুর চড়–ই।
শরমে স্থগিত করে দিচ্ছে পত্রপ্রকাশনা আপাতত
কতশত ধোঁকা-খাওয়া মাটি-ঝোঁকা রাংচিতা-ঝোপ,
আলাভোলা আশশ্যাওড়ার ঝাড়।

আর ক-টা দিন পর
উড়াল কটাক্ষ ছুড়তে ছুড়তে গাছ থেকে গাছে
উড়ে যাবে উড়–ক্কু শেয়াল, গিরগিটি বহুরূপী…
আর প্রকাশিত পত্রপত্রিকা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে বলে
দুড়দাড় গাছে উঠে পড়বে
আরোহসক্ষম বেশ কিছু বন্য বেল্লিক ছাগল।

তারা খুদে পত্রগুলি খাবে আগে।

 

গভীর রাতে মানুষের একাকী কান্নার মতো…

যে-আঁধার সন্ধ্যাবেলা থাকে বায়বীয়,
রাত্রিতে তরল হয়ে আসে তা-ই।
আরো পরে ধীরে ধীরে জমাট কঠিন।

রাতের তৃতীয় যামে মানুষের একাকী কান্নার মতো,
রাগরেচনের মতো জ্বলে ওঠে যবক্ষার, গন্ধক-বাক্যসকল।
জ্বলে ওঠে আর জ্বালিয়েও দেয় একইসঙ্গে কত রূপাতীত
গীত ও সংগীত, রতি ও আরতি, আগুনগান্ধার…

ওইসব উজ্জ্বলন্ত বাক্য আর বাচনের অবশেষ,
রুপালি ভস্ম ও রেশ, ওড়ে ভোরের বাতাসে।

ভোর:
রাত এসে আছড়ে পড়ে লীন হয়ে মিশে যায় দিনের শরীরে
জন্ম হয় বালুফেনাময় সূক্ষ্ম তটরেখা
আমরা তাকেই ভোর বলে ডাকি
ভোর বলে ভ্রম হয় শুধু আমাদের।

এই সেই ভোরবেলা, যখন কুয়াশা দেখা যায় গুরু গন্ধবিজ্ঞপ্তির মতো
ব্যান্ডেজ-পোড়ানো বাষ্প, ছাই
ওগুলি তো আর কিছু নয়, ওগুলি মূলত তা-ই–
মানুষের জ্বলে-ওঠা বাক্য, রতি ও রক্তের অবশেষ, ক্ষারকভস্মের তেজ।

 

তীর্থ

নারদ, পণ্ডিতশ্রেষ্ঠ, মানুষকে খুবসে বোঝাচ্ছেন–
(মানুষেরা মনোযোগ দিচ্ছে কিনা তা বোঝা যাচ্ছে না)

“এ ভঙ্গুর দেহ, কেউ বলে তীর্থ, কেউ-বা মন্দির
কেউ বলে কূটনকশা, চক্রছক, অশুভ সন্ধির।

তীর্থজুড়ে এত রূপ ও অরূপ, ধূপ-ধূনি-মন্ত্র
শলাকা, অলাতচক্র, বহুতল কুঠুরি ও রন্ধ্র।

মন্দিরের তলা দিয়ে নদী বয় তরঙ্গসংকুল
শীঘ্রস্রোতা, দুকূল-ছাপানো, বাঁকা, কুমিরবহুল

ক্ষণেই সরল বটে সেই নদী ক্ষণেই বঙ্কিম
পাড় ভাঙে, ফেনা জাগে, হাঁস ডাকে হরেক কিসিম।

বুদ্বুদের থেকে বহু উৎপন্ন বুদবুদ, রকমারি–
বিম্ব থেকে আরো বিম্ব, বহুবিম্বধারী।

দেহ– এত মেদ মেধা আয়োজন, রঙ রতি অঘটন, গতি ও রহস্য!
দেহ– তা-সে বপু হোক তনু হোক, পুড়লে তো বাপু সেই দেড় কেজি ভস্ম!”

সর্ব-অঙ্গে অমৃতকথন শুনে পণ্ডিতশ্রেষ্ঠের,
ঝিমুনিস্বভাব জাগে মানবের ও-তনুতীর্থের।

 

বৈশ্যদের কাল

ধীরে ধীরে এই ভূমিপৃষ্ঠে ফিরে এল বৈশ্যদের কাল।

সার্থবাহ নিয়ে আসে ঝলমলে বাসকপাতার কোলাহল
দুঃখ সেরে যায়, অসুখ সারে না।
প্রতিদিন লাল রং ভালোবেসে অনূঢ়া অনল
খেয়ে নেচে নেচে বেঁচে যায় ছেলে।
অসুখের ওই পার থেকে ছোটমাসি পুরো নাম ধরে ডাকে–
‘আয় দ্যাখ্, বৃক্ষেরা কর্তব্য করে না
কেবলই কলহ করে মেঘেদের সাথে।’
অমনি মাথাভর্তি ঝিলিমিলি হিলিয়াম নিয়ে, নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে
ওই উঁচু-উঁচু মেঘ থেকে তিনচক্রযানে চেপে ছুটে আসে ছেলে।

বাতাসে বাতাসে ঘর্ষতড়িৎ জ্বলে ওঠে।
চকচকে নিকেলের মতো তারাবাজি পোড়ে।
তারপর একদিন ঘুমন্ত স্ত্রী আর পুত্র রেখে ঘন রাতে নিরুদ্দেশে যায়
নিরঞ্জনা নদীকূল শুধু কাঁপে অকূল তৃষ্ণায়।

প্রকৃতি অলস ঢঙে এসে উপগত হলো ওই পুরুষের
পিঠের ওপর
কালচক্রে জন্ম নিলো জন্তু
অর্ধেক জলজ আর অর্ধ ঊর্ধ্বচারী প্রাণীর মতন।
রক্তচক্ষু, শিরদাঁড়া কাঁটাঙ্কিত, অসম্ভব বর্ণাঢ্য যুগল ডানা
নিম্নাঙ্গে জলজ পিচ্ছিলতা, লেজ
মুখ দিয়ে অবিরল তেজ বের হয়ে ভাসালো ভূখণ্ড
কী যে কাণ্ড হলো! ডাকো বৈদ্য। আহা, ডাকো না বুদ্ধকে।
সে তো বোধিপ্রাপ্ত, সে এসব জানে, তাকে ডাকো।

তারপর ধূলিঝড় হলো, হিমবাহ গেল শতযুগ,
ধীরে ধীরে এই ভূমিপৃষ্ঠে ফিরে এল বৈশ্যদের কাল।

ওইখানে হইহই রইরই পঞ্চকাণ্ড মেলা বসতো
হাজার বর্ষ আগে
আজ শুধু একজোড়া নিরিবিলি জলমগ্ন বৃক্ষ বাস করে।
দূরে ওই বৃক্ষমিথুনের থেকে, থেকে-থেকে মিথেন জ্বলে উঠলেই
ছেলেরা ও মেয়েরা একালে বলে ওঠে, ওই যে ভূতের আলো দেখা যায়

নীল-নীল আলো দেয় ছেলেটির শরীর, অশরীর।

 

পারাপার

কথা ছিল, দেব যৌথসাঁতার। অথচ কথা ভেঙে
একক ডুবসাঁতারে একা চলে এলাম এ-লোকান্তরে
তোমাকে ছাড়াই, ওগো সহসাঁতারিনী।

অনেক তো হলো পরলোকে!
এইবার সাঙ্গ করি পরপারলীলা
দিই আরো একটি অন্তিম ডুব।

ভেঙে দিয়ে এপার-ওপার ভুয়া ভেদরেখা
এক ডুবে ছুটে আসব পরলোক থেকে
সোজা ইহলোকেই আবার।
তোমাকে দেখার কী যে দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা আমার!

গিয়ে দেখে আসি– ওহে মুক্তকেশী,
আজ কোন লকলকে লাউডগা সাপে
বেঁধেছ তোমার
শিথিল চুলের রাশি।

 

জলোচ্ছ্বাস

হাজার হাজার জংলি ঘোড়ার দঙ্গল উঠে আসছে অন্ধকার দরিয়ার মধ্য থেকে আর সাথে একটানা বিজলি ও বজ্রচমক। চমকের মুহুর্মুহু ইলিশরঙা ঘ্রাণের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে ঘোড়াদের হ্রেষাধ্বনি, উপর্যুপরি রাত্রিরং চিৎকার। ঢেউয়েরা তো সমুদ্রকেশর। দাউদাউ শিখা শোনা যাচ্ছে কেশরের। কেশরপোড়া আবহের আস্বাদ এসে আছড়ে পড়ছে স্তরে স্তরে– বালুতে লবণে ফসফরাসে। যেন একদল উগ্র পাগল আরেকদল বদ্ধ মাতালের সঙ্গে মারদাঙ্গা মেতেছে সংলাপে। কেউ কারো বাক্য বুঝছে না, জাহেরি-বাতেনি ধর্ম-মর্ম কিচ্ছু বুঝছে না, বাক্যের বিন্যাস-ব্যঞ্জনা বুঝছে না, খালি একনাগাড়ে ঝাপটা মারছে বাগবাহুল্যের। ফলে সংলাপে না হচ্ছে সমঝোতা, না কথাকাটাকাটি। খুব চেষ্টা হচ্ছে, কিন্তু কিছুতেই কথাকে কাটছে না কোনো কথা, বাক্যে এসে মিশছে না কোনো বাক্য, পাশ কেটে চলে যাচ্ছে কেবলই অবিরাম হুলুস্থুল ধুন্ধুমার মহাগজব একটানা…

বৈকুণ্ঠের তরে বৈষ্ণবীর গান

‘গৌর ব’লে বাহির হবো, গৃহেতে আর রবো না গো…
যেই দেশেতে গৌর পাই, সেই দেশেতে চলিয়া যাই
এই দেশ তো আর ভালো লাগে না’–
গাইতে গাইতে দেশ-দেশান্তর পার হয়ে
চলেছে সে, স্নাতকিনী, বৈষ্ণবী আমার…

সে-কোন অজ্ঞাত পূত এক স্নানসত্রের সন্ধানে
বহু দিন বহু তিথি বহু দেশ বহু পথ ভ্রমণের শেষে
স্নাতকিনী এসে আজ দাঁড়িয়েছে এমন এক তারিখরেখায়,
যেইখানে একই দিনে একইসাথে আসে রবি- আর শশীবার
একইসঙ্গে জাগে কৃষ্ণ প্রতিপদ আর দ্বিতীয়ার গোরা বাঁকা চাঁদ
গোলার্ধপ্রতিম দূরে, বৈষ্ণবী দাঁড়িয়ে আছে সেই দ্রাঘিমায়
যেইখান থেকে দূর বৈকুণ্ঠ-গোলোক,
কৈলাস ও অলিম্পাস, জান্নাত এবং জাহান্নাম…
সবকিছু ঝাপসা দেখায়।

 

পাণ্ডবদের দেশে

পাণ্ডববর্জিত, ব্রাত্যজন-অধ্যুষিত জলাজংলা প্রদেশের এক নিরীহ নামাজি
অদ্ভুত বিপাকে পড়ে গেছে আজান দিতে এসে এক অচেনা মুলুকে,
নির্ধারিত মুয়াজ্জিনের অনুপস্থিতিতে।

পায় না কেবলা খুঁজে, পেয়েও হারায় বারবার।
আর দ্যাখে, এই দেশে, এইসব বেগানা প্রদেশে
প্রচুর পাণ্ডব, পালোয়ান। এত যে পাণ্ডব, কিন্তু কেমন যে তারা
জামাত-যৌথতা জানে না, আওয়াজ-কালাম মানে না,
নিয়তের ঠিক নাই, খালি-খালি কলহ করে, বাঁধায় তাণ্ডব
তদুপরি পাদ মারে, পিক ফেলে, নষ্ট করে ওজু ও ইমান…

আরো আছে হরেক কুতুব, কুতুবের অন্ত নাই,
তারা উল্টাপাল্টা ফতোয়া দেয়, এলোপাথাড়ি মছলা-মাছায়েলা ঝাড়ে,
আর শুধু হেদায়েত দেয়, ওয়াজ-নসিয়ত করে
তাতে বাতেনি কথাই বেশি, জাহেরি কম-কম
সিরাতুল মোস্তাকিম বোঝে না, ঘোরানো পথ বোঝে…

নিরীহ মুয়াজ্জিনের এমনিতেই জলাবিলা দশা,
তার ওপর ফের পাণ্ডবেরা, কুতুবেরা হল্লা করে কেবলই টালাতে থাকে নিরীহকে।

মন-খারাপ-করা হাওয়া বয়।
মুয়াজ্জিনের মন! একটু একটু করে তুষারের মতো ঝরে।

ঘোরানো সিঁড়ির ঘুর-স্বভাব মাড়িয়ে তবু আস্তে-আস্তে সে উঠে যায় মিনারচূড়ায়।

 

নিঃসঙ্গ

লক্ষ-লক্ষ মাইল উঁচুতে, মহাকাশে,
জনমানববিহীন ভাসমান একটি স্পেস-স্টেশনে পোস্টিং পেয়ে
এসে জয়েন করেছে এক স্টেশনমাস্টার।

একদিন একটি রকেট এসে প্রচুর বোঁচকা-বুঁচকিসহ তাকে নামিয়ে দিয়ে,
ফুয়েল-টুয়েল নিয়ে কোথায় যে চলে গেল কোন আসমানের ওপারে…
সে-ও কতদিন আগে!

মৃত্যুরও অধিক হিম আর নির্জনতা…
মানুষটি একা-একা থাকে, খায়, ঘুমায়– ওজনহীন, নিঃসাড়, নির্ভার…
মাঝে মাঝে নভোপোশাক পরে বাইরে সাঁতার কেটে আসে শূন্যে,
তখন সে বাঁধা থাকে ধাতুরাংতারচিত এক লম্বা লাঙুলে, স্টেশনের মাস্তুলের সঙ্গে।

কাছে-দূরে কোত্থাও কেউ নাই,
কোনো প্রেত-প্রেতিনী, অথবা কোনো যম-যমী, জিন-পরি, ভগবান-ভগবতী,
ফেরেশতা-ইবলিশ কাঁহা কিচ্ছু নাই, কেউই ঘেঁষে না কাছে, যে,
তার সঙ্গে একটু কথা বলবে, কফি খাবে…
এমনকি মানুষটা যে একটু ভয় পাবে, তারও উপায় নাই…
নিজের সঙ্গেই তাই নিজেরই মিথুন ও মৈথুন, খুনসুটি, হাসাহাসি, সাপলুডো খেলা…

কেবল রজনীস্পর্শা, ভীষণবর্ণা এক গন্ধরাজ্ঞী ফুটে থাকে অবাধ, অনন্তরায়…
বহুকাল দূরে…

 

প্রহ্লাদপুরের জঙ্গল
(রামকৃষ্ণ পরমহংস…)

রামশরণ ব্যাধ গিয়েছিল শিকার করতে, প্রহ্লাদপুরের জঙ্গলে। শিকার মিলেছে প্রচুর। শিয়াল, শজারু, শকুন, গোধিকা, গন্ধগোকুল, ফেজান্ট, কাছিম…। মেলেনি কেবল কাক আর বক; ওদেরকে তো আগেই ভস্ম করে দিয়েছে তপস্বী। দুপুরের দিকে পশুপাখিগুলিকে কেটেকুটে মাংসের ভাগা দিয়ে বসেছে ব্যাধ, পাকুড় গাছের নিচে। সাতমিশালি মাংস, বিক্রি হচ্ছে খুব। শব হয়ে শুয়ে আছে শিব। কালী লীলা করছে তার বুকের ওপর, যেভাবে প্রকৃতি লীলা করে পুরুষের ওপর; জীব, পরমের। বালিতে মেশানো চিনি, নিত্য-র সাথে অনিত্য যেমন। এসো পিঁপড়া দলে-দলে, সিরিজে-সিরিজে, বালি রেখে চিনি বেছে খাও…

ফেরার পথে একটি ঘাসখেকো বাঘের শাবকও সাথে করে এনেছে রামশরণ। জন্মের পরপরই মেষেদের সঙ্গে চলে গিয়েছিল আলাভোলা ব্যাঘ্রশিশু। সে এখন ঘাস খায় বটে, কিন্তু রাগ আছে ঠিকই, ক্ষাত্রতেজ অব্যাহত…ঠাস-ঠাস করে থাপড়ায়, দাবড়ায় বড়-বড় নিরীহ ভেড়াদের।

 

সাবানগাছ

নদী দিয়ে কত কী যে ভেসে আসে! আমাদের নদী দিয়ে।
নানান দেশের ওপর দিয়ে বয়ে আসা আমাদের নদী।

একবার উজান দেশের এক ভূমিকম্পে ভেসে এসেছিল শয়ে শয়ে শালগাছ…
সেগুলি ধরে ধরে আমাদের পূর্বপুরুষেরা দমাদম বানিয়ে নিয়েছে
বাস্তুঘরের খুঁটি। এখনো টিকে আছে।
একবার ভেসে যাওয়া এক শালপ্রাংশু মরদেহ ধরে এনে
পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। কিছুই গজায়নি।

আরও আসে ভেসে জলজ্যান্ত মানুষ-মানুষী–
সাপে-কাটা, অজ্ঞান, মাকড়ে-কাটা, গুম-হওয়া, ঘুম-পাওয়া, আর
মাঝে মাঝে ঘুমন্ত মানুষ।
ওই যে আমাদের ছোটকাকি, হলদে পাখি হয়ে উড়ছেন এঘর ওঘর,
একদিন তিনিও এসেছিলেন ভেসে, ভেলায় ঘুমন্ত শিশু, আমাদের নদী দিয়ে।
ওই যে রাজপুরুষের মতো উপচানো ঢেউ-জাগানো মেজফুফা,
তিনিও তো নদী-ভাসা, তাকেও তো পাই এই নদীটি থেকেই…
নদীতে মানুষ পাই আর ধরে এনে জুড়ে দিয়ে সংসারে লাগাই।

আর ভেসে আসে বিচিত্র সব ফল ও বীজ।
একবার এক অচেনা বীজ এনে পুঁতে দিলেন আমার বাবা।
ভেবেছিলেন, হবে হয়তো কোনো সুমিষ্ট ফল, বিরল জাতের।

বীজ ফুটে গজায় গাছ। গাছ বাড়ে দিনে দিনে।
ফল হয়। পাকে। পাকা ফল থেকে,
এ কী! সাবানের ফেনার মতো শুধু ফেনা!
কোথায় সুমিষ্ট ফল, কোথায় কী!
বৃক্ষ, তোমার নাম?
–ফল-এ পরিচয়।
ফলে, গাছটির নাম হলো সাবানগাছ।

কাক যখন দ্যাখে যে, কী! তারই বাসার ডিম থেকে ফোটা বাচ্চারা
দিনে দিনে হয়ে উঠছে কেমন ভিন্ন আদলের, কণ্ঠে ফলছে ভিন্নরকম স্বর,
তখন যে বিরক্তি, বিস্ময়, ও অসহায়ত্ব নিয়ে সে তাকিয়ে থাকে বাচ্চাদের দিকে–
বাবাও সেরকম তাকিয়ে থাকতেন ওই সাবানতরু আর সাবানফলের দিকে
বহুদিন, বহুবছর। আবার গুনগুন করে গাইতেনও–
‘বাঞ্ছা করি সুমিষ্ট ফল পুঁতলাম সাধের গাছ
ফাঁকি দিয়া সে গাছ আমায় ঝরায় দীর্ঘশ্বাস
মনে দুঃখ বারোমাস…’

তারপর একদিন তো তিনি নিজেই গত হলেন;
নদী থেকে পাওয়া সেই অদ্ভুত ফলের গাছ
একদিন নদীই ভাসিয়ে নিয়ে গেল।

তবে ওই সাবানফলেরা বহুবছর ধরে আমার বাবার ময়লা সন্তানদের
ততোধিক ময়লা পোশাকগুলিকে ঋতুতে ঋতুতে কিছুটা হলেও
ফর্সা ও উজ্জ্বল করে দিয়ে আসছিল…

 

সেতু ও সম্পর্ক

প্রাণ আর নিষ্প্রাণের মাঝখানে যেইটুকু গোধূলি-অঞ্চল
জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে যেটুকু ধূসর ব্যবধান
সেইটুকু এক নদী, আমাদের মাঝখানে–
ছোট্ট, কিন্তু কুয়াশাধূসর, পারাপারাতীত, হেঁয়ালিবিধুর।

শাস্ত্রে বলে–
দুই পারে, পরস্পরে, সম্পর্ক হলেই তবে গড়ে ওঠে সেতু।
আরো বলে– বস্তুত কোনো সেতুই সম্ভব নয় সম্পর্কবিহীন।
অথচ কতটা ধ্রুব, সুস্থির সম্পর্ক আমাদের!
তবু জেগে উঠছে না কোনো সেতু
কোনোদিন জাগবে না যেন আর।
সাড়াহীন, পারাপারহীন পড়ে আছি যার যার পারে।

ব্যর্থ হয়ে যায়
কেবলই তোমার আর আমার বেলায়
সম্পর্কশাস্ত্রের যত মৌল নীতিমালা
কোনো এক ভৌতিক খেলায়।

 

মায়া

সাগরকিনারে দেখা প্রথম মিনার তাতে মেঘ তাতে পর্বতের মাথায় রাগ
রাগিনী ও বজ্রচেরাগ পাহাড়ের বগলতলায় বাষ্প, কুহু ও কামিনী রোদ
কুসুমকর্ণিকা সুরবল্লী রিঠাফল দলকলসের ঝোপে একাকী মৌমাছি
ঝাপসা হয়ে আসা পথহারা মেষ ও মালিক অস্তরাঙা চিল উঁচু চিমনিচূড়ায়
ইতস্তত ঢোলকলমি অশোক বাসক– প্রকৃতির প্রতিটি সঞ্চয় থেকে
তিল-তিল অর্থ আহরণ করে আনি সে তো তোমাদেরই জন্যে
যদিও জেনেছি বেশ– জ্যামুক্ত তির তো আর কখনো আসবে না ফিরে
কখন কোথায় কবে কাকে যে ঘায়েল করে চলে গেছে দূরে
টলে ওঠে ধানুকীর একাগ্রতা যদি তির ফিরে আসে বুমেরাঙের গতিপথে
কোনোদিন– সেই আশা-নিরাশায় বসে থাকা…
আমি নিশিপাগলার বেশে কী এক অদ্ভুত চোরাটানে অনন্তকাল ধরে চলেছি
অরণ্য পাহাড় নদী সম- ও মালভূমির অন্তহীন অলিগলি চোরাপথ থেকে
কারা যেন খালি মায়া ছুড়ে মারে এমনকি আমি যখন বকফুল আর
ভেরেণ্ডা গাছের নিচ দিয়ে যাই তখনো কে যেন কেবলই মায়া মাখিয়ে দেয়

 

তুমি, তোমার সরাইখানা এবং হারানো মানুষ

একটি দিকের দুয়ার থাকুক খোলা
যেইদিক থেকে হারানো মানুষ আসে।
রান্নাবাড়ার ঘ্রাণ পেয়ে পথভোলা
থামুক তোমার সরাইখানার পাশে।

আজও দেশে দেশে কত লোক অভিমানে
ঘর ছেড়ে একা কোথায় যে চলে যায়!
কী যাতনা বিষে…, কিংবা কীসের টানে
লোকগুলি আহা ঘরছাড়া হয়ে যায়!

এ-মধুদিবসে আকাশে বাতাসে জাগে
ঘর ছাড়বার একটানা প্ররোচনা।
হারিয়ে পড়তে নদী মাঠ বায়ু ডাকে
ঘরে ঘরে তাই গোপন উন্মাদনা।

জগতের যত সংসারছাড়া লোক
ঘুরে ফিরে শেষে সরাইখানায় স্থিত।
এ-স্নেহবর্ষে তুমি কি চাও যে, হোক
ঘরছাড়া ফের ঘরেই প্রতিষ্ঠিত?

হারানো মানুষ সেই কত কাল ধ’রে
স্বজনের ভয়ে দেশ থেকে দেশে ঘোরে।
স্বজনেরা তবু নানান বাহানা ক’রে
বৃথাই খুঁজছে কালে ও কালান্তরে!

স্বজন যখন খোঁজে উত্তরাপথে
হারানো তখন দাক্ষিণাত্যে যায়।
স্বজন যখন নিরাশাদ্বীপের পথে
হারানো খুঁজছে নতুন এক অধ্যায়।

 

নলজাতক

যদি তুমি অর্জন করে থাকো দশপারমিতা, তবে এই নলবনে যত নল আছে সমস্তই গাঁটহীন, একচ্ছিদ্র হোক, যাতে নলের ভেতরে জাতকদের জন্ম, বর্ধন ও বিচরণ হয় অতি অনায়াস। তারপর, একদিন দুপুরে, নুইয়ে ফেলে মোটা-মোটা নলখাগড়া অগণন, নলের ভেতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসুক সারা গায়ে নালঝোলমাখা কালো-ধলো সরল- ও কোকড়া-চুলো গমরঙা তামাটে কপিশ অগণিত রৌদ্রদিগম্বর ন্যাংটো নলজাতক। ভরে যাক নিস্তরঙ্গ এ-অরণ্য অক্ষৌহিণী দাপুটে দামাল শিশুবাহিনীর উত্তাল তরঙ্গরঙ্গে…

 

আবর্ত

অবেলায় এসে আবর্তে পড়ে গেছ হে দিগভোলা।
এ আবর্ত মনুষ্যজন্মের।

এ বড় কঠিন চক্র–
একবার পড়েছে যে, নিস্তার নেই আর তার।
এই যে দুর্দান্ত জাদুজটিল ফাঁদ,
এই যে মহামেঘলা গোলকধাঁধা–
কী করে বেরুবে হে
মণিরত্ন-ভরা এই গুহার ভেতরে আটকে-পড়া আতঙ্কিত আলিবাবা?
অভিজ্ঞান ভুল মেরে বসে থাকা উপর্যুপরি ভাগ্যহত?
প্রকোষ্ঠ থেকে প্রকোষ্ঠে ছুটে মরবে শুধুই
জন্ম থেকে জন্ম পার হয়ে যাবে কেবলই লাফিয়ে লাফিয়ে…
বেরুতে পারবে না।

বাইরে দীর্ঘ দাবানল, পুড়ে যাচ্ছে কত মধু ও মশলার বন।
দাহিত মধু-মশলার মিশ্র ঝাঁজালো গন্ধ,
সেইসাথে বহু বহু যুগের ওপার থেকে ধেয়ে-আসা
যত সমাধানহীন সমীকরণের ঝাঁজ
ঝাঁৎ করে এসে লাগছে একযোগে চোখে-মুখে।
দুষ্পাঠ্য মুখের রেখা হয়ে উঠছে আরো জটিল,
জন্মচক্র আরো প্রহেলিকাময়।

এইবার, এই মহাচক্রাবর্ত
ঘোরাতে ঘোরাতে কোন দিকে, কোন জাহান্নামে তবে নিয়ে যাবে যাক…

 

সাব-জিরো সাইলেন্স

চোখা-বাঁধা জিম্মি-হওয়া মানুষ জানে না ঠিক কোন মুহূর্তে
কী কারণে গুলি এসে লাগবে ঠিক কোথায় কোথায়।
অচেনা রোমাঞ্চে, রোমহর্ষে, ত্রাসে, সর্বোচ্চ সংরাগে
শরীরের প্রতি ইঞ্চি তাই প্রতিস্পর্ধী, টানটান।
যেমন ‘দেহের সবচেয়ে সংরক্ত জায়গা
পোশাকের ফেলে-রাখা ফাঁকা স্থান।’

একদিকে তোমাতে সঞ্চার করা হবে
অনন্ত বাকতৃষ্ণা, চিৎকারের উদগ্র তাড়না, উদ্গার
অন্যদিকে নিষেধ বাকস্ফূরণ। নিষেধ চিৎকার।
কোন দিকে যাবে?

কোন দিক থেকে তেড়ে আসবে কোন ধারালো ছোবল,
কোন কোপ, কোন কার্তুজ, লেলিহ ফিসফাস–
এই গা-ছমছম ভূতবান্ধব জ্যোৎস্নায়
বুঝতেও পারবে না আর, ওরে নিরুপায়।
এই এখনই শুনবে বহু ঘোলাটে ভয়ের ঘোলতরঙ্গবাদন
এখনই আবার উচ্চনাদী নীরবতা।

কতশত সশব্দ উচ্চার, ঘুরে-দাঁড়ানো চিৎকার,
অন্তরাত্মা-কাঁপিয়ে-তোলা কান্না, আর্তি, আহাজারি,
বহুমাত্র বিচিত্র আওয়াজ–
স্রেফ দ্বিমাত্রিক কালো টোটেম-অক্ষর হয়ে
একদম খামোশ মেরে থাকে নিঃসহায়…
কখনো তা ভাবদোষে কখনো-বা রাজরোষে
স্তরে-স্তরে-রাখা রাষ্ট্রপুথির ঘোর-গুমসুম নিঝুম পাতায়।

অতিরিক্ত অবদমনের অবশেষ
দোষযুক্ত স্বপ্নে ভরে যায় সারা দেশ।
স্বপ্নের ভেতর থেকে ঘটে যায় তার
লাভাভর্তি পিচকারির ঘন পিচিৎকার।

 

একটি ভোরবেলা: সদ্য খসড়া-করা

ভোরের বাতাস আজ উন্নত দেশের
কাগজি টাকার মতো সপ্রতিভ–
একটানা সতেজ কখনো, কখনো-বা থেমে থেমে।

আর এই প্রভাতবেলায়
লালায়
রেশমসূত্রের গ্রন্থনায়
গাছে গাছে এখন গ্রন্থিত হয়ে আছে
প্রবন্ধের পাতার আকারে বহু উড়ন্ত জটিল পাতা
স্থগিত হয়ে থাকা কাণ্ডে, কাণ্ডজ্ঞানে,
অবাক বিন্যাসে যথা নদীর ওপারে।

কিছুক্ষণ আগেই, এই তো
বেশ কিছু স্ফূর্তিশীল পাখি ও পতঙ্গ
তোলপাড় করছিল পৃথিবীর গাছে গাছে।
আকাশ তাদের জব্দ করে নিয়ে চলে গেছে অনেক উঁচুতে
মাখন-রাঙানো মেঘরাজ্যে
ওই ঝুরঝুর ঝরে-পড়া চিকচিকে সোনালি চিনির দেশে–
মেঘে মেঘে প্রচারিত আজ তাই অনেক অচেনা কোলাহল।

অগ্রহায়ণের এই ভোরবেলা
দৃশ্য আর ঘটনার এই যে অসহ্য অতর্কিত রূপ
এসবের অন্তরালে, নিসর্গের কোন অভিপ্রায়,
সে-কোন প্রবাহে, ছকে, সে-কেমন ভাষ্যে, ব্যঞ্জনায়
কীভাবে যে মীমাংসিত হয়ে আছে!
ভোগী মানুষের অন্নগত প্রাণ আর
ব্যসনব্যঞ্জন উপলব্ধি দিয়ে যতদূর বোঝা যায়, বুঝি,
বুঝতে প্রয়াস পাই,
যতভাবে অনুভব করা যায়, করি।

আজ অগ্রহায়ণের এই তাক-লাগানো প্রভাতবেলা–
একা আমি বসে বসে ওইসব পাখিহারা স্তব্ধ গাছে গাছে
একটু একটু করে পাখি আর মৌমাছি মেশাই,
একটির পর একটি মৌচাক বসিয়ে যাই ডাল থেকে ডালে–
কিছুটা বিশেষ্য করে তুলি।

 

একটি হারিয়ে যাওয়া নভোযান

একখানি নভোযান–
খুব ভুলোমন আর উদাসীন গঠন-প্রকৃতি।

চেনা ও অচেনা যত পথ আকাশের, সব হারিয়ে হারিয়ে,
জরুরি দায়িত্ব দেওয়া ছিল কত, সব বেমালুম ভুলে গিয়ে
কোথায় সে-কোন্ দূর ভুবনে ভুবনে
একা একা বেড়ে ওঠে
ভেসে ভেসে ভারহীন
বহুদিন।
নিরুদ্দিষ্ট দিগভ্রান্ত বালিকা…

এতদিন পর
আজ আর
ফিরবার
কোনো তাড়া নেই।

হয়তো ফিরবেও কোনো একদিন, বহুকাল পরে,
তথ্যহারা, আলাভোলা–
দাদখানি চাল মসুরের ডাল
চিনিপাতা কৈ… করতে করতে
বহু কিছু হারিয়ে হারিয়ে
ভ্রান্ত আর অতিরিক্ত হয়ে।

তার, সে-নির্জন নভোযানটির,
হঠাৎ প্রত্যাবর্তনে
ভূবক্ষের বিজ্ঞানীরা অপ্রস্তুত হবেন কিছুটা–

হারানো কন্যাকে বহুদিন পর ফিরে পেলে অকস্মাৎ,
কিছুটা বড় ও বন্যরূপে, অভিভাবকেরা কিঞ্চিৎ বিব্রত বোধ করে।

 

প্রাণী

মাছের যা আঁশ, তা-ই পাখির পালক,
প্রাণীর সেটাই কেশ ও কেশর, ঝিলিমিলি রোম ও পশম–
দেহান্তরে শুধু ভিন্ন-ভিন্ন নাম।

ওগুলি দিয়েই প্রাণী
কোনোমতে ঢেকে রাখে তার জরাদেহখানি।

শরীরে গ্রহণ লাগে, ধীরে ধীরে, সর্বনাশা জরার গ্রহণ–
খোলসে কুঞ্চন লাগে, কতশত রেখা জাগে, রেখায় রেখায় লেগে যায় গিঁট।
ক্ষরণ চলতেই থাকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে, সকল ঋতুতে।
প্রাণী, চির-অসহায়, কুতকুতে চোখ তুলে চায়
প্রাণী, হু-হু করে কেঁদে ওঠে একবার,
দেহকে প্রবোধ দেয়, বলে,
কী আর করবি বল্ জাদুসোনাচান,
অজর অক্ষর দেহখানি চেয়ে নিয়ে প্রভু
দিয়েছে এ জরাদেহখান।

 

শূন্য

নিখিলের হঠাৎ-বিগড়ে-যাওয়া সে-কোন গোপন সংখ্যামেশিনের থেকে
অচেনা অসুখের মতো, অজ্ঞাত গজবের মতো গলগল করে
বেরিয়ে আসছে সব শূন্য।

সাধের মেশিন থেকে আশা ছিল বেরিয়ে আসবে কত-না বিচিত্র অঙ্ক আর সংখ্যা
আর ভরে যাবে এই দুখিনী দুনিয়া! তা নয়, কেবলই শূন্য।
তা-ও শূন্যগুলি সব দশমিকের ডানে বসা একটানা শূন্যের সিরিজ–
অর্থহীন উদ্বৃত্ত বন্ধ্যা ও হাহুতাশময়।

এক মহামেশিনের বিপুল ববিন থেকে, গোপন ও প্রকাশ্য সব স্লট থেকে
চিরতরে ছাড়া পাওয়া যেইমতো মাইল-মাইলব্যাপী সুতার বহর
সেইমতো এইসব খরস্রোতা শূন্যের নহর…

অন্য কোনো অঙ্ক নাই সংখ্যা নাই শুধু শূন্য উপচে উপচে আসা
লাফাংগার মতো লাফাতে লাফাতে আর গড়াতে গড়াতে আসা
বহরে বহরে পাতা আর পাতার বাহার করতে করতে আসা
ইঁদুর ও ভোঁদড়ের ভঙ্গি ধ’রে লীলা আর লাস্য করতে করতে আসা
চিকা আর চামচিকার মতো হাস্য ও রহস্য করতে করতেই
দিলমে চাক্কুমারা পাগলা ও ভোলাভালা হাক্কু ও হাহাকার করতে করতে আসা
দশমিকের ডানে-বসা কানে-ঠসা কালা-নুলা নেলাফেলা খাটাশ-খবিশ নষ্ট-ভ্রষ্ট
ডাশা-ডাশা যত শূন্যের দল ভয়াবহ শূন্যের কাফেলা……………………….
আর ওই যে বিকট বেঢপ অতিকায় এক শূন্য,
ওটাই পালের গোদা, আন্ধা-কালা কাফেলাসালার…

এসব কি স্রেফ বিগড়ে-যাওয়া সেই গূঢ় মেশিনের ঋতুবিভ্রাট?

‘দশমিক-পরবর্তী শূন্যের প্রবাহ হয়ে মহাশূন্য ভরে ফেলছে ক্রমে’

এমনিতেই জড়ের দুর্বহ দায়ভার
তদুপরি শূন্যের শাসন, অত্যাচার
কোথায় পালাবে তবে প্রাণ!
প্রাণী সব করে রব, ভয়ে–
বদ্ধ ও তটস্থ প্রাণিকুল
ফাজা আলাহুম কা’স ফিমমাকুল।
ইতিমধ্যেই যে শূন্যস্থানগুলি তৈরি হয়ে আছে
সেগুলো তো পূরণ হচ্ছেই না, বরং তৈরি হচ্ছে নতুন-নতুন শূন্যস্থান
মহাশূন্য আরো মহা শূন্য হচ্ছে।

অবশেষে একসময় শূন্যস্থান দিয়েই, যাহ্, পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে
খসখসে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা, দিনদুনিয়ার।

 

অলুক, অনশ্বর

তোমরা কারা? কতদূর থেকে এলে?
মনোহরপুর? মধুপ্রস্থ? লীলাস্থলী? অবাকনগর?
কোন যুগেরই-বা তোমরা?
উপলীয়? তাম্র? প্রত্ন? নাকি নুহের আমল?
যে যেখান থেকে, যে যুগ থেকেই আসো-না-কেন
একই জাহাজের যাত্রী আমরা এ অকূল মহাকাশে।

সহযাত্রী, এবং সমবয়সী।
তোমাদের বয়স প্রায় চৌদ্দ শ কোটি বছর, আমাদেরও তা-ই।
যে-যে কণিকায় গড়া দেহ তোমাদের, আমাদেরও তা-ই।

অমরতা চাও? চাও অন্তহীন পরমায়ু?
বিলাপ থামাও, শোনো, আমরা যে যখনই আসি
অমরতা নিয়েই আসি হে অমৃতের সন্তান—
অলুক, অব্যয়, অনশ্বর, চির-আয়ুষ্মান।
জরা ব্যাধি মন্বন্তর মহামারী অনাহার অত্যাচার গুম খুন দুর্বিপাক দুর্ঘটনা
কোনো কিছুতেই হবে না কিছুই, ধস নেই, মৃত্যু নেই,
ক্ষয়ে যাওয়া ঝরে যাওয়া নেই
শুধু বয়ে চলা আছে, রূপ থেকে রূপান্তরে,
রূপক থেকে ক্রমশ রূপকথায়…
জলে স্থলে মহাশূন্যে অগ্নিকুণ্ডে…কোত্থাও মরণ নাই তোর কোনোকালে…

সাড়ে চার শ কোটি বছরের পুরনো এক সজল সবুজ
কমলা আকারের মহাকাশযানে চড়ে
চলেছি সবাই এক অনন্ত সফরে।

 

প্রস্থানের আগে

প্রীতি পেলে থেকে যাব আরো কিছুদিন, না পেলে এক মুহূর্ত নয়।

আবার যোগ দেব প্রকৃতির প্রতিটি আয়োজনে—
মেষশাবকের তৃণপ্রাশনের দিনে, জোনাকিদের বিচিত্রানুষ্ঠানে,
বৃষদের বপ্রকেলি আর সাতভাইচম্পা পাখিদের বেলাশেষের কলহকাণ্ডে,
হরিণ-হরিণীদের বিবাহপ্রস্তাবে,
নবীন পাহাড়ি ঝরনার অভিষেকে, উদ্বোধনে…।

জানি অবহেলা পাব, তবু
কখনো বেহাগ রাগে, কখনো তোটক ছন্দে ঘুরব
রঙচিত্র প্রজাপতিদের পিছু পিছু
বাজি ধরব শিকারসফল উদবিড়ালের অন্তরা থেকে সঞ্চারী অবধি
জলপলায়নরেখা বরাবর।

বহুকাল আগে ভুলে-যাওয়া সহপাঠীদের ঝিলিক-মাখানো
মর্নিং স্কুলের রোদ এসে পড়বে গায়ে
সেই রোদ দিয়ে সেরে নেব শান্ত প্রভাতি গোসল।

প্রীতি পেলে থেকে যাব, না হলে এক মুহূর্ত নয়।

 

অপ্রাকৃত

ছোট্ট একটি ট্রেন— কিশোরী-বয়সী। অসুস্থ, অর্ধবিকল।
পরিত্যক্ত লোকোশেড ছেড়ে
নিশীথে বেরিয়ে পড়ে একা, নিশ্চালক।
সারারাত কোথায়-কোথায় কোন পথে ও বিপথে ঘুরে বেড়ায়…
কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, গ্রাম-গঞ্জ-শহর পেরিয়ে…

রেললাইন ছেড়ে নেমে যায় মাঠে। চলতে থাকে মাঠের ভেতর
পৌষের শূন্য শীতার্ত মাঠ…
সুখী মানুষেরা ঘুমে। অসুখীরা নির্ঘুম, ঊনপ্রাকৃতিক—
দীর্ঘনিশ্বাসের আতসবাতাসে একাকার তাদের ঐহিক-পারত্রিক।

ঘুমে-ঢুলুঢুলু স্টেশনের বিধ্বস্ত কোণে
কয়েকজন নির্দন্ত নুলা ভিখারি সোল্লাসে মেতেছে সম্মিলিত স্বমেহনে।
পথ থেকে এক পথকিশোরকে গাড়িতে উঠিয়ে নিচ্ছে দুই সমকামী
সদ্যমৃত শিশুর লাশ তুলে নিয়ে পালাচ্ছে এক শবাহারী।
কাঁপতে কাঁপতে এগোচ্ছে চোখবাঁধা এক হতভাগা,
ক্রমে ক্রসফায়ারের দিকে।
তা দেখতে পিছু নিয়েছে দুই রোঁয়া-ওঠা ঘেয়ো ক্ষুধার্ত কুকুর
আর রাজ-রহমতে সদ্য-ছাড়া-পাওয়া এক মৃত্যুসাজাপ্রাপ্ত খুনি।
বাসায় বাসায় বন্দি, নির্যাতিতা শিশু পরিচারিকাদের স্ফুট-অস্ফুট কান্না…

এসব কোন অ্যাবসার্ড নাটকের নিষ্ঠুর নাট্যায়ন, ঘূর্ণমান নাটমঞ্চে!
শেষ অঙ্ক থেকে পিচকারির বেগে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে সমাপ্তিসংগীত—
পরাজিত মানুষের শোচনা ও খুনির নৈশ নিভৃত অনুশোচনা
এ-দুয়ের মিশ্ররাগে জেগে-ওঠা এক নিষ্করুণ গান।

প্রাকৃত-অপ্রাকৃতের ভেদ ভুলিয়ে-দেওয়া সব দৃশ্যনাট্য
ঠেলে উজিয়ে চলেছে সেই পালিয়ে-বেড়ানো ট্রেনটি।

কেউ কি দেখেছে ট্রেনটিকে?
—কেউ না।
শুধু পরান মল্লিকের চির-রোগা রাতজাগা ছেলেটি বারবার বলে যাচ্ছে—
“অনেক রাতে জানালা খুলে দেখি-কি,
আগাগোড়া ফিনফিনে কুয়াশা-কালারের হিজাবে মোড়া
নূপুর-পরা এক ঘরপালানো গৃহবধূ
ত্রস্তপায়ে ঝুমঝুম শব্দ তুলে চলে যাচ্ছে দূরে
আরো অধিক কুয়াশার ভেতর।”

কিন্তু কেউ বিশ্বাস করছে না তার কথা।

 

নাম

তারপর চুপচাপ চলে যাব কোনো একদিন,
দূরসম্পর্কের সেই মাথানিচু লাজুক আত্মীয়টির মতো,
নিজের নামটিকেই ভুলে ফেলে রেখে, তোমাদের কাছে।

গিয়ে বার্তা পাঠাব— এসেছি তাড়াহুড়া করে,
ভুলে গেছি তাই।
পাঠিয়ে দিয়ো তো নামটিকে।

উত্তর পাব না কোনো।

কিছুদিন অনাথের মতো ঘুরে ফিরে
আমার সে-নামও নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে একদিন তোমাদের ছেড়ে।

আমিও বিলীন, আর নামও লুপ্ত, থাকবে শুধু তিলেক শূন্যতা।
আর তা পূরণ করতে এসে যাবে অন্য এক ভাবী বিলুপ্ততা।

 

ভাবাধিনায়ক

তোমার উৎফুল্ল হরতনের রাগরক্তিম ব্যঞ্জনা এসে লাগে
আমার সাজানো তাসে। কী ভাব জাগালে ওহে ভাবাধিনায়ক,
আকাশে বাতাসে আর আমাদের প্রথাসিদ্ধ তাসের সংসারে!
ফুটে ওঠে লজ্জারং, জেগে ওঠে রংধনুরূপ, ব্যাকুল তাসের সেটে।

হে ভাবের কম্যান্ডার, বোঝা ভার এ হরতনি লীলাটি তোমার।

লজ্জা-আভা-ফুটে-ওঠা স্পন্দমান তাসকেই করেছ হে তুরুপের তাস— অব্যর্থ, মোক্ষম।
পুনরায় টেক্কা মেরে দিয়েছ ঘায়েল করে সব উপশম, একদম।

 

প্রশান্তি

যখনই বাসায় আসে মায়ের পুরনো সেই প্রেমিক, শিশুটি বোঝে—
এ নিঃসীম নরকসংসারে
ওই স্নিগ্ধ সম্পর্কটুকুই যেন একপশলা মায়াবী শুশ্রূষা,
তার চিরবিষণ্ন মায়ের।
একখণ্ড নিরিবিলি রঙিন সুগন্ধদ্বীপ
মায়ের এ রং-জ্বলা নিষ্করুণ নিজস্ব ভুবনে।

স্রেফ, স্রেফ কিছুটা সময় হাসিখুশি দেখবে মাকে, শিশু তাই দ্রুত গিয়ে
সিডিতে চালিয়ে দেয় সেই গান,
যে-গান গেয়ে ওঠে চিরন্তন প্রেমিক-প্রেমিকা
চাঁদনি রাতে, প্রশান্ত নদীতে, দু-পা মেলে দিয়ে, ছইয়ের ওপর।

এইসব ছোট-ছোট মধুর মুহূর্ত,
প্রসন্ন নিমেষ
ধীরে ধীরে গিয়ে গেঁথে যায় এক বিষণ্নবিপুল মহাকালে।
সার্থক হয় মায়ের প্রণয়, মর্মী সন্তানের সহযোগ পেলে।

 

প্রদক্ষিণ

শূন্য আর এক, এক আর শূন্য—
অবিরাম এই একেশ্বর আর নিরীশ্বরে যেন পালাক্রমিক বিশ্বাস,
মাত্র দুই অঙ্কের এই মাধব-মাধবী জলকেলি, বোঝাপড়া, নর্মলীলা…
স্রেফ এই দ্বিবীজ বিশ্বাসে, এই দ্বিরাঙ্কিক বিন্যাসেই
দ্রুত গড়ে উঠেছে সংকেতবদ্ধ এক
পরাক্রমী ডিজিটাল সিস্টেম, প্রবুদ্ধ অঙ্কতন্ত্র।

তামাম দুনিয়া জুড়ে বিছানো এ মহাকায় আন্তর্জাল, এ উপাত্তমণ্ডলের মেঘ
সবকিছু ছিঁড়ে-ফুঁড়ে ঠিকরে পড়ছে আজ
স্পষ্ট, আর কারো নয়, কেবল তোমারই স্মিত মুখের কিরণ।

তোমার পশ্চিমে প্রসন্নতা, উত্তরে প্রতিভাপ্রসাদ, দক্ষিণে লাবণ্যশ্রী,
নৈর্ঋতে স্নেহসংকেত, ঈশানে বাৎসল্যবলয়, পূর্বে মেধাসরোবর…
তোমার হিরণ্যসম কিরণের কসম, তোমাকে কেন্দ্র করে অচিরেই
ঊর্ধ্বশ্বাসে প্রদক্ষিণ করতে থাকব আমি, আমরা
আর আন্তর্জালের উদ্বেল পুঞ্জমেঘ।

 

হর্ষতরঙ্গ

সরো সরো, ঈশান থেকে তিরের বেগে ওই নেমে পড়ছে হংসবাহিনী– উঠানে, অঙ্গনে, ধানখেতে, নয়ানজুলিতে। আর নৈর্ঋত থেকে ছুটে আসছে দস্যি বাচ্চারা। এসেই দুই ডানা পাকড়ে ধরে উঠে পড়ছে রাজহাঁসের পিঠে। তা-ই দেখে ঘাস থেকে মুখ তুলে মুচকি হাসছে খরগোশ, প্রশাখাজালের আড়াল থেকে কাঠবিড়ালি।

এক হোঁদলকুতকুতে, দুষ্টের চূড়ামণি, এমনিতেই লেট লতিফ, তদুপরি পিছিয়ে পড়ছে বারবার, কুকুরছানার কান মলে দিয়ে, পোষা শজারুর শলাকা ধরে টান মেরে, খুচরা নওটাংকি সেরে, দুই কাঁধে দুই অস্থির গুঞ্জরণরত বাচ্চা বসন্তবাউরিকে বসিয়ে নিয়ে এগিয়ে আসছে শেষ হংসবাহনের দিকে। হাঁসটি তখনো নয়ানজুলির জলীয় রানওয়েতে। উড়ালে উন্মুখ। বাচ্চাটি জলকাদা মাড়িয়ে এসে আছাড়ি-পিছাড়ি খেয়ে কোনোমতে হাঁকুচ-পাঁকুচ করে উঠে পড়ছে সর্বশেষ হংস-ফ্লাইটে। পেছন পেছন আলপথে হেলেদুলে আসছে কান-মলা-খাওয়া নাদুসনুদুস কুকুরছানাটিও।

তুলাপ্রসূ সব শিমুলের গাছ, ফলপ্রসূ সব আম ও আমড়া বাগান। তাদের ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে হংসবাহিনী। এক-একটি হাঁসের পিঠে এক-একটি শিশু। উড়ে যেতে যেতে উৎফুল্ল বাচ্চারা ভূমণ্ডলের দিকে উড়ন্ত চুমু ছুড়ে দেবার মুদ্রায় ফুঁ দিচ্ছে হাতের তালুতে। একবার ডান হাত, আরেকবার বাম। দুই দিকে জেগে উঠছে ছোট-ছোট হাওয়াহিল্লোল। আর সেই হিল্লোলের হালকা ধাক্কাতেই সঙ্গে-সঙ্গে নিচে আগুন ধরে যাচ্ছে হুলুস্থুল কৃষ্ণ- ও রাধাচূড়ায়, আর আমের পাতারা খিলখিল আহ্লাদে ঢলে পড়ছে প্রতিবেশী আমড়ার পাতাপল্লবের ওপর।

আজ আগুনে-বাতাসে গুলতানি, পলাশে-শিমুলে শয়তানি,
আমে-আমড়ায় দুষ্টামি একটানা
আর সাগর দুলছে পাহাড় ঢুলছে আকাশ ঝুলছে মাথার ওপর উড়াল শহর
ভোলাভালারা ভুলছে, লহরি তুলছে, ধীরে ঊর্ণা খুলছে মেঘের বহর…

 

সাবস্টেশনে একা একজন লোক

গ্রিড সাবস্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে একজন লোক–
একা ও উদ্বাহু।

সাবস্টেশনের আলো
তরুণ প্রফেটের মতো জ্বলে।
যথাক্রমে কাঁকর ও হেলেঞ্চাশাক সুর্মা হয়ে যায়।

ওই আলোর অদ্ভুত এক কারিশমা–
লোকটি সম্ভবত দীর্ঘদিন দাঁড়িয়ে থাকবে
ওরকমই উদ্বাহু, একা।

নতুন সাবস্টেশনের আলো
তরুণ প্রফেটের মতো জ্বলে।

 

কবরের উপকথা

একটি কবর পড়ে আছে একা ঘোর দুপুরের রোদে
ফলকে খোদাই উনিশে আষাঢ় তেরো শ বিরাশি সাল
মাটির গভীরে কে এক শ্রমণ গড়ছে প্রতিষ্ঠান
রশ্মিমথিত শোণিত এবং শাণিত মনীষা দিয়ে।

মূর্খ মানুষ প্রত্নের লোভে কবরের দেশে যায়
বাঁকা বসবাস, অনুসন্ধান, বক্র সমান্তর;
ক্যালেন্ডারের ভস্ম ফলক ছুঁয়ে ছুঁয়ে উড়ে যায়
মূর্খ মানুষ, ওই নির্মাণ ভ্রান্ত প্রকৌশলে।

শাদা ও কপিশ, শাদা আর শুধু শাদাদের বিন্যাস
একটি মানুষ বহুবিভাজিত বিষম সমানুপাতে
ক্যালেন্ডারের ভস্ম ফলক ছুঁয়ে ছুঁয়ে উড়ে যায়
একটি মানুষ রূপান্তরিত পাথরিত যৌগিকে।

 

ফাতনা

সরল ছিপের এক প্রান্তে মাছশিকারি, চুপচাপ,
অন্য প্রান্তে মাছ।

মাঝখানে নিরীহ ফাতনা— ভাসে নিরুপায়, মধ্যপক্ষরূপে।
তাকায় চঞ্চল শিকারের দিকে একবার, পরক্ষণে ধূর্ত শিকারির প্রতি।

জগতের প্রত্যেকটি ঘটনার তীব্র, তুঙ্গ মুহূর্তে হাজির থাকে
তৃতীয় একটি পক্ষ। থাকে এক সুদর্শন মাছরাঙা—
বড়শির বিবেকের মতো বাঁকা, রঙিন, আকর্ষণীয়।

আর এই সমস্তকিছুর মৌনী মধ্যস্থতা আকারে ভাসতে থাকে
একা এক শোলার ফাতনা।

 

মিসিং লিংক

কালোবাজারের মর্মস্থলে বসে এতকাল
চালান করেছ দারুচিনি, ভাবাবেগ…সীমান্তের এপার-ওপার।
আজ দেখি আনাগোনা
না-কালো-না-শাদা এই হৃদগন্ধা ধূসরবাজারে!

এই তো এখন চারপাশ থেকে
কানে ভেসে আসছে বকুলের গন্ধধ্বনি
নাকের ঝিল্লিতে ঝাপসা ধাক্কা খাচ্ছে
ব্রতবদ্ধ ব্যস্ত মৌমাছির বিবিধ গুঞ্জনগন্ধ।
আর কিছুক্ষণ পরে ঝোপের আড়াল থেকে
ঢুলুঢুলু চোখে তাকাবে বহুচক্ষু আনারস
তার চূড়ায় চড়ে-বসা এক মাথাগরম গিরগিটি
চেরা জিভ বাড়িয়ে দিয়ে মাপতে থাকবে
টিপটিপ রোদের সুর, ছন্নমতি খেয়ালি হাওয়ার গতি।
রূপসী আকন্দফুল, অভিনয়পটু, সখিদল নিয়ে ছিনালি-আনন্দে
মান ভাঙাবে তিরিক্ষিমেজাজ কিছু বিছুটিপাতার।

এইবার মেলাও তো দেখি হে গুনিন
ওপরের দুই স্তবকের মধ্যকার মিসিং লিংক?

 

সোনার খনির খুব কাছে

সোনার খনির খুব কাছে গিয়ে বসে থাকে রোজ
স্বর্ণজ্বরে-ভোগা রোগামতো একটি মানুষ।
পাশেই জলধি এক, অথই অপার।
শামুকে শ্যাওলায় মাখামাখি
আশ্চর্য সোনালি এক শৈবালিনী জেগে ওঠে যদি,
আকার ও অলংকারসহ,
কোনো এক মৎস্যগন্ধা সন্ধ্যাবেলায়–

সেই লোভে লোকটা এসে বসে থাকে মোহ-লাগা সারাটা দিবস।

 

বিমোক্ষণ

আজ
এই পূর্বাহ্নেই
সমস্ত ঘটনাতরঙ্গের
চূড়াবিন্দু-বিন্দুতে পুঞ্জিত ছিল হলাহলফেনা
দিগবিদিক বেপরোয়া বিষের উত্থান–

তোমার শরীর থেকে বিচ্ছুরিত স্বর্ণধূলি গিয়ে
মিশছে রশ্মির রবিশস্যীয় প্রতিভায়
এতে যে সর্বপ্লাবী বিষরসায়নের বন্যা
তাতে বুঁদ হয়ে ডুবে ছিল আজ সমগ্র নিখিল।

এবং এখন, এই সন্ধ্যাক্ষণে,
আলো-অন্ধকারের এ মৃদু-মৃদু ঘর্ষণমুহূর্তে
বিষের সকল দিগবিদিক সম্ভাবনা
দপ করে স্তব্ধ হয়ে আসে
সাপও অহিংস হয়ে যায় এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায়।

 

আন্তর্জাগতিক

ভিন গ্যালাক্সির মেয়ে তুমি, ভিন্ন গ্রহের মেয়ে
তোমায় আমি ফুটিয়ে তুলি ইচ্ছাশক্তি দিয়ে।
দেখতে কেমন, ভাষা কী তার, কেমন অবয়ব—
জড়বুদ্ধি জাহিল আমি, জানি না ওসব।

তার মন তৈরি রূপ তৈরি কেমন উপাদানে
কল্পভীরু এই কবি আর কীই-বা তার জানে!
জানি না তার অনুভূতি, আবেগ, স্বভাবগতি
স্রেফ অনুমানেই ফুটিয়ে তুলি, এমন প্রাণবতী!

ছায়াপথ ছাড়িয়ে, দূরের ওই সুরগঙ্গা, তারও ওইপারে, বহির্গোলকে,
শঙ্কু-আকৃতির এক মিটিমিটি আলো-জ্বলা ঘরে ব’সে
ভিন্ন ভুবনের মেয়ে তুমি
নির্নিমেষ চেয়ে আছ হে আমারই জানালার দিকে।

হৃদয়ের নেশা, এক আন্তর্জাগতিক নেশা…
একদিন ঘনিয়ে আসব ঠিকই দুইজনে, পরস্পরে।

তোমার আমার ঘনীভূত অভিকর্ষ দিয়ে
আস্তে-আস্তে বাঁকিয়ে ফেলব দেশকাল
দূর দুই জগতের মাঝখানে যে ব্যাকুল মহাশূন্য,
বেঁকে যাবে তা টানটান অশ্বক্ষুরাকার চুম্বকের মতো।
আলোকবর্ষের ওই মহাদূর দূরত্বই হয়ে যাবে
তুড়ি-মেরে-উড়িয়ে-দেওয়া ঘণ্টা কয়েকের পথ।
আর আমি ঠিকই সাঁতরে পাড়ি দেবো ওইটুকু মহাকাশ।

জ্যামিতির ছুড়ে-দেওয়া এক জেদি অথচ লাজুক স্পর্শকের মতো
তোমাকেই ছুঁয়ে ছুঁয়ে বয়ে যাব আমি
পৃথিবী নামের গ্রহ থেকে ছোটা হেমন্তদিনের হাওয়া।

 

তৃষ্ণা

তেতে-ওঠা বালুর ওপর দিয়ে হাহাকার করে ধেয়ে আসে
এক মরুসরীসৃপ, মুসাফিরের দিকে।
‘বিষ ঢালব না, ছিঁড়ে খাব না মাংস, শুধু একটু গলা ভেজাব রক্তরসে,
এমন ছাতিফাটা কহর তৃষ্ণায় প্রাণ যায়-যায়, এটুকু রহম করো হে বেদুইন’
ব’লে সেই গনগনে সরীসৃপ ঝাঁপ দিয়ে পড়ে বিদ্যুৎ গতিতে,
গোড়ালি কামড়ে ধরে রক্ত শুষে ভিজিয়ে নেয় জিহ্বা ও গলা,
তারপর নিমেষে উধাও, এক ক্ষমাহীন বিষুবীয় ক্রুদ্ধ মরীচিকার ভেতর।

 

ক্ষুধা

যখন শুকিয়ে যায় সবকিছু প্রচণ্ড খরায়,
শামুক-গুগলিরাও আর পারে না বাঁচতে,
তখন স্বেচ্ছায় হতে চায় তারা হাঁসের আহার।
কখন আসবে উড়ে ত্রাতারূপে ঝাঁক-ঝাঁক হাঁস,
মরিয়া হয়ে প্রতীক্ষা করে তার।

আর
হাঁসেরা যখন থাকে অনাহারে, পায় না কোথাও কোনো খাদ্য,
শৃগালকে তখন কামনা করে কায়মনে বটে
শৃগালই অমোঘ রহমকর্তা, উদ্ধারত্রাতা, এ ঘোর সংকটে।

 

উপমান

তোমার মুখের ওপর ঝেঁপে নেমে আসছে বেসামাল কেশদাম, খেয়ালি হাওয়ায়।
তারই ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে এক লালচে নির্জন দুষ্টব্রণ, গণ্ডদেশে তোমার–
যেন পুঞ্জাক্ষ আনারসের ঝোপে ছোট্ট এক রূপদক্ষ গিরগিটি…
অতিদূর অতীত থেকে ভেসে আসে দূরগামী তূর্ণ ট্রেনের সিটি।

 

যোগাযোগ

তোমাকে মনন করি বিভিন্ন ঋতুতে
বসন্তে শরতে কিংবা মার্গশীর্ষ মাসে
আর তারই আবেশে সৃজিত হও বিন্দুবৎ
একটু একটু করে
জন্মজন্মান্তরে…

এই যে এতটা দূরে থেকে তোমাকে মনন করি বিভিন্ন ঋতুতে
খুশিতে সুগন্ধে কী যে অব্যাহত হয়ে থাকি সারা ঋতু!
সর্ব-অবয়ব দিয়ে তোমাকে মনন করি, আর
তারই কি প্রভাবে তুমি প্রকাশিত হও
জ্বলজ্বলে দূর পুষ্পবিন্দু হয়ে? মাঝে মাঝে? বিরল ঋতুতে?

সর্ব-অঙ্গ দিয়ে তোমাকে মনন করি, আর
তুমি দূরে, গোলক-বাহিরে, অন্য ভুবনে, নিজস্ব
পরম্পরা থেকে সেই অনেক বাইরে,
নতুন উজ্জ্বল এক আইকন হয়ে ফুটে ওঠো।

এরপর ওই পুষ্পের, রূপের, বহু পাঠ হলো, পাঠান্তর হলো ঋতুতে ঋতুতে,
বহু বোঝাপড়ার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে ঝাপসা হয়ে আসে
ওই আইকন, স্নিগ্ধ রূপবিন্দু আমাদের।

এই কি সেই বিন্দু, ধ্রুববিন্দু,
যথা হতে যাত্রা যাবতীয় জ্যামিতির?
বিন্দুই করেছে নাকি সূত্রপাত সকল আকার,
আকারে-বিকারে ভরা যাহা এই অনিত্য সংসার!

এদিকে বিভিন্ন ধূলি আর ধারণার মধ্য দিয়ে ডুবে যেতে যেতে
যুগে-যুগান্তরে নানা রকম জ্বরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতে হতে
ক্রমশ প্রাচীন হয়ে আসে এই দেহ
ধর্মের চেয়েও প্রাচীন এই দেহ, এই তোবড়ানো ভাণ্ড, ছেয়ে যাচ্ছে
বল্মিকে বল্মিকে
মননের উৎসগুলি নিভে আসে ধীরে; যোগাযোগের সকল পথ রুদ্ধপ্রায়
আর আমরা ক্রমেই জড়িয়ে পড়ি, পড়তে হয়, এক অজানা বাল্মীকিচক্রে।
এবং এখন
যুদ্ধ ভিন্ন অন্য যোগাযোগের উপায় আর খোলা রইল না
তোমার সহিত।

দ্বৈরথ ব্যতীত আর কোনো যোগাযোগ নেই এ-পর্যায়ে।

 

ভবঘুরে মনমরা একলা মেঘলা পাখির মতো

সেই কবে যে এসেছিলাম পথ ভুলে
সে-কোন বহির্ভুবন থেকে!
এসে কত কী যে দেখা হলো!

শিশুকে প্রহার করছে একটি মেয়ে।
শিশুটি কাঁদছে। বলছে, “ফেরত দিয়া দাও আমারে আল্লা’র কাছে।”
অজানা শঙ্কায় শিউরে উঠে সঙ্গে-সঙ্গে ফের
শিশুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলছে মেয়েটি–
অ্যাবসার্ড-প্রায় দৃশ্য, দেখা হলো তা-ও।

দেখলাম– সহ্যাতীত দুঃখশোক সয়ে যায় গ্রহের প্রাণীরা।
অনাহারে কদাহারে কাহিলও অনেকে।
তবুও কেমন যেন রঙ্গরসে টইটম্বুর! এক চোখে অশ্রু,
অন্য চোখ অহৈতুকী আনন্দে ভরপুর।

সময়ই সারিয়ে তোলে তাদের বিবিধ ক্ষত আর ক্ষয়ক্ষতি।

এও দেখলাম–
মাধবরোমাঞ্চে ভরা এ জগতে
প্রেম এক উপচে-পড়া উৎসবের মতো,
যে উৎসব তুঙ্গ জমে ওঠে
দিনের প্রথম আর পড়ন্ত বেলায়।

অনেক তো হলো এ সংসারে–
বহু হাসাহাসি হলো। ভালবাসাবাসি, তা-ও হলো।
মধুমাধবের দিনে জমে উঠল কত অম্লমধুর উৎসব।
অনেক ঘটনা হলো, আর
অনেক কথাই ঘটতে ঘটতে পুরাঘটিত অতীত…

এইবার, বেলা পড়ে এলে
কূটাভাসে ভরা এ-ভুবন ছেড়ে
ভবঘুরে মনমরা একলা মেঘলা পাখির মতন
এক ডানা একটু কাত করে ভেসে যাব ধীরে ধীরে
নিরুদ্দেশে, বহুদূরে, আকাশগঙ্গার ওই পারে।

বেলাবেলি পাড়ি দিতে হবে মহাকাশ…
অচিরেই আকাশের অবতলে ফুটে উঠবে একটি-দুটি তারা।

 

জলবিদ্যুৎ

দূরে ওই নতোন্নত ভূচিত্র। পাহাড়ি পরিসর।
ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ছোট-ছোট জলতড়িৎ প্রকল্প।

জলবিভাজিকা, জলবন্ধন, জলকপাট…
আদিম আনন্দে ঘুরতে-থাকা জলতুরবিন…
বিজলিজননযন্ত্র, সঞ্চালন লাইন…

তারও আগে
আরও দূর থেকে আরশি-আলেয়ার মতন উদ্ভাস দিতে দিতে
ঢেউয়ে ভেসে এসেছিল ফ্যারাডের বিজলিচৌম্বক বিধি।

পাহাড়ি নদীর ধৃষ্ট ধারালো স্রোতের সঙ্গে ঘর্ষণ ঘটে
ফ্যারাডের পরাক্রান্ত আইনের।

জ্বলে ওঠে জলবিদ্যুৎ।

 

চারুশিল্প

তোমার সহিংসতাটুকু আমিই তোমার হয়ে
সেরে আসি বাইরে গিয়ে। তবেই-না তুমি
সম্পূর্ণ অহিংসরূপে স্বর্গসুখে দিবানিদ্রা যাও।

সন্ধ্যাবেলা জেগে উঠে বলো-বাহ্! করেছ কী কাণ্ড!
বাইরে কী অপরূপ রক্তবিকিরণ!
স্প্রাং রিদমের তালে-তালে জম্বি ছন্দে চলছে যজ্ঞ মনুমেধ–
ওই যে থ্যাঁতলানো দেহ– প্রতীকপ্রতিম, ছিটকে-পড়া ঘিলু– রূপকসমান
পোড়ানো হাত-পা মুখ-মাথা-উপমেয়হারা উপমান,
কাটা মুণ্ড, ফাটা জিভ, বিমূর্ত চিত্রের মতো নাড়িভুঁড়ি, অনুপ্রাস,
থকথকে কূটাভাস, চকচকে চিৎকার, সত্রশিখা, উগ্র আগ্নেয় তুফান…
থেকে-থেকে যজ্ঞপটে জেগে ওঠে ভৌতিক জবান।
যোজনগন্ধার গন্ধকাহিনির মতো চমৎকার
রক্তের সুবাস ভেসে আসছে জানালায়।

সেইসঙ্গে এও বলো–
জীবাণুনাশক দিয়ে মুছে ফেলো সব আর্ট, তাড়াতাড়ি।
বিমূর্ত চিত্রের রূপ-মূর্ত তো থাকে না বেশিক্ষণ।
পচে। গলতে থাকে। চণ্ড গন্ধ হয়। জীবাণু ছড়ায়…

 

সাক্ষাৎ

আবার তোমার সঙ্গে দেখা হবে বহুদিন পর।
মন যেন আজ হাবল-পূর্ববর্তী উপদ্রবহীন
তারাঘন মায়াময় রাতের আকাশ–
নিরিবিলি নীরব নিঝুম।

বহুকাল পর আজ দেখা হবে তোমার সহিত।
জোনাকি-ফুটিয়ে-তোলা রাতের আকাশ ঝেঁপে নেমে আসবে
বিলের পানিতে। ফুটে উঠবে অগণন তারামাছ।
ধ্রুবকের মতো জ্বলবে তাদের প্রতিটি কৌণবিন্দু।

কতদিন হলো তুমি নেই এই দেশে।
উঠানে বরইয়ের গাছে চুপচাপ
ঘনিয়ে-জড়িয়ে-থাকা স্বর্ণলতাগুলি
এতদিনে বদলে গেছে জং-ধরা তামার তন্তুতে।
মৌমাছিরা সেই কবে উড়ে গেছে দূরের পাহাড়ে
ফাঁকা-ফাঁকা স্মৃতিকোষ হয়ে ঝুলে আছে
এখনো মৌচাক, কৃষ্ণচূড়া গাছে।
গুঞ্জনের রেশ, মধু ও মোমের অবশেষ, কিচ্ছু নেই কোনোখানে।

অভিমান করে নদী সরে গেছে দূরে
নাইয়র-নিতে-আসা নৌকাসহ।
তবুও এখনো
সংসারে-হাঁপিয়ে-ওঠা, ক্রমশ-ফুরাতে-থাকা
নাম-না-জানা কোনো গৃহবধূ
বিরহবিলাপ সুরে খুনখুনিয়ে গেয়ে যাচ্ছে অস্ফুট কাকুতিগান–
“ঘাটে লাগাইয়া ডিঙা পান খাইয়া যাও বাঁশি আল্লা’র দোহাই
এ-পরানের বিনিময়ে তোমার পরান দিয়ো হাসি আল্লা’র দোহাই”

 

কন্যাসংহিতা

১. নদীকূলে করি বাস.

কন্যা বারবার ঘুমিয়ে পড়ছে নদীতীরে
আজ সকাল থেকেই।
বারবার কেন ঘুমিয়ে পড়ছে?
যদিও নদীকূলেই বাস চিরদিন আমাদের,
একেবারে নদীতীরে নয়, একটু দূরে।
তবে কি বিশ্বের সব বিস্ময়ের শুরু এই ঘুমবিন্দু থেকে?

২. প্রাচ্যবচন.

সকল উদ্বৃত্ত নিদ্রা আর আচ্ছন্নতা
পরিত্যাগ করে কন্যা একসময় গাত্রোত্থান করবে,
সকন্যা আমাদের উজ্জ্বল গৃহযাত্রা হবে–
সেই দুর্মর অভিলাষ ঘিরে এই সাধ্যসাধনা নিরন্তর।

ওই যাহ্! কন্যা আবার ঘুমিয়ে গেল!
আর আমিও এই বসে পড়লাম লালধূলি নদীতীরে
কন্যাজাগরণ সাধনায়।

৩. প্রথম অধিকরণ– ঊর্মিকুমার ঘাট, ১লা বৈশাখ, ১৩৯৯ সাল.

কন্যা ঘুমিয়ে পড়ে নদীকূলে আজ ঊর্মিকুমার ঘাটে
আজ শুধু একটি বৃক্ষ নদীতীরে– একা আর হরীতকী।

৪. সাধ্যসাধনা.

আগুনে আকাশ আজ সারাদিন দোহন করেছে মৃত্তিকাকে।
বেলা পড়ে আসে
কত নিদ্রা যাও রে কন্যা…
গাত্রোত্থান করো
বাসকপাতা ধরে ধীরে উঠে এসো।
রৌদ্রস্রোতে আহা রূপ ধুয়ে যায় নিরন্তর
এইবেলা চলো গৃহে যাই ফিরে।

৫. সাধ্যসাধনা.

তোমাকে বিধৃত করে থাকে
অশেষ-ছড়ানো দুপুরের ঘন ক্ষীরমাখানো হরীতকী ফলের প্রচ্ছায়া
বহু নিচে অকথ্য অসহ আন্দোলন,
নিচে ধীর বহমান জীবাশ্ম জ্বালানি, ম্যাঙ্গানিজ।
তবু
কত নিদ্রা যাও রে কন্যা…
জাগো, জাগো একটুখানি।

৬. পৌনঃপুনিক.

পুনশ্চ ঘুমিয়ে পড়ে কন্যা নদীকূলে, ঊর্মিকুমার ঘাটে।

৭. সাধ্যসাধনা.

এইমাত্র শেষ দোহনপর্যায়।
ফেনা-উৎসবে, এখনই, উপচানো সার-সার গোলাকার মাটির বালতি।
পৃথিবীর সব পাখি আজ ভিজে যাবে বালতিতে বালতিতে,
দণ্ডিত সারসসমেত (একেন পাদেন তিষ্ঠন্তম)–
চঞ্চু চঞ্চু থেকে ফেনা, সঙ্গে ত্রাহিধ্বনির তুঙ্গ মড্যুলেশন, ছিটাতে ছিটাতে।
দূর চক্রবালে ওই গোল দেয়ালে দেয়ালে
অযথাই জাগছে বৃষের পুরীষপিঠা
কোটি-কোটি গুটিবসন্তের আকারে
আচমকা, ঝলকে ঝলকে।

পালাই,
ছড়ানো সকল তৃষ্ণারেখা গুটিয়ে নিয়ে
চলো কন্যা পলিয়ে যাই এইবেলা নদীতীর থেকে।

৮. যখন ঘুমের ছায়া পড়ে নদীর ওপারে, ঘাসে.

তোমার ঘুমের কাঁপা-কাঁপা ছায়া শুষে
স্ফীত হয় ওই বৃষের ককুদ, নদীর ওপারে, ঘাসে।

 

বহুদিন পর আবার প্রেমের কবিতা

মেঘ থেকে মেঘে লাফ দেবার সময়
তুরীয় আহ্লাদে দ্রুত কেঁপে-বেঁকে
একটানে একাকার যখন বিজলিসূত্র, ওই ঊর্ধ্বতন
মেঘের আসনে এক ঝলক দেখা গেল তাকে
আলোকিত ঘনকের আকারে।

তাকে ডাক দেব-দেব, আহা কী বলে যে ডাক দেই!
জন্ম এক রুদ্ধভাষ জাতিতে আমার–
মুহূর্তে মিলিয়ে গেল অপর আকারে।

দূর মহাকাশে

ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফুটে আছে কত ফুয়েল-স্টেশন–
সেইসব এলোমেলো নৈশ নকশার মধ্যে তাকে, প্রিয় তোমাকেই,
ঘোর মধ্যরাতে
এইভাবে দেখে ফেলি আমিও প্রথম।
সর্ববায়ু আমার সুস্থির হয়ে যায়।

যেই দেখি আর ডাক দিতে যাই প্রিয়, অমনি
তোমার সমস্ত আলো, সকল উদ্ভাস
হঠাৎ নিভিয়ে নিয়ে চুপচাপ অন্ধকার হয়ে যাও।
আবার উদ্ভাস দাও ক্ষণকাল পরে–

এইরূপে খেলা করো, লুকোচুরি, আমার সহিত।
আমি থাকি সুদূর রূপতরঙ্গ গাঁয়, আর তোমার সহিত
তোমারই সাহিত্যে আহা এভাবে আমার বেলা বয়ে যায়।

এরপর থেকে একে একে এক উচ্চতর জীবের বিবেক
প্রথমে প্রয়োগ করে দেখি,
মিলিয়ে যাচ্ছেন তিনি আকারে ও নিরাকারে।
এক অতিকায় জট-পাকানো যন্ত্রের
আগ্রহ সাধন করে দেখি,
তা-ও তিনি ছড়িয়ে পড়েন সেই আকারে নিরাকার;
আকাশে আকাশে মেলে রাখা তার কী ব্যাপক কর্মাচার,
একটির পর একটি গ্রহ আর জ্বালানি-জংশন সব
অতর্কিতে নিভিয়ে নিভিয়ে প্রবাহিত হন তিনি।

একদা মণ্ডলাকার ছিলে জানি
আজ দেখি দৈবাৎ ধর্মান্তরিত, ঘনকের রূপে!
ঘনক তো গোলকেরই এক দুরারোগ্য সম্প্রসার।
তবুও তো ধর্ম রক্ষা পায়। রক্ষিত, সাধিত হয় তবু।

গোলকত্ব পরম আকার
গোলকতা যথা এক অপূর্ব বিহেভিয়ার,
প্রায়-নিরাকারসম এক নিখুঁত আকার।

শৈশবের কালে, এক আশ্চর্য মশলা-সুরভিত
গুহার গবাক্ষপথে আচম্বিতে ভেসে উঠেছিল মেঘ,
যার বাষ্পে বাষ্পে কূটাভাস।
কিছুতেই পড়তে পারি নাই সেই মেঘ
আমরা তখন।

বিব্রত বাতাস তাকে, মেঘে মেঘে সংগঠিত ক্ষণ-ক্ষণ-আকৃতিকে,
ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে যাচ্ছে কত বিভিন্ন প্রদেশে।
নিরাকৃত হতে হতে প্রায়, ওই তো ব্যক্ত হচ্ছেন ফের আকারে আকারে।
ধর্মচ্যুত হতে হতে প্রায়, ফের প্রচারিত হন ধর্মে ধর্মে।
আহা, ধর্ম হারালে কী আর থাকে তবে এ ভুবনে!
ঘনক যে গোলকেরই এক নিদারুণ তাপিত প্রসার।

বৃহৎ, অকল্পনীয় এক জড়সংকলন। বড় বালিপুস্তকের মতো–
তারই মধ্যে অকস্মাৎ একটু প্রাণের আভা। মাত্র তার একটি পৃষ্ঠায়।
এই সংকলনের ভূমিকাপত্রটিও নেই। ছিন্ন। সেই প্রধান সংঘর্ষে।

নিষ্ক্রান্তিদিবসে, অতঃপর, ওই গুহামুখে পড়ে থাকে
এ বিপুল জড়সংকলনের ছেঁড়া ভূমিকাপৃষ্ঠাটি,
অর্থাৎ সেই যে প্রথম ক্যাজুয়াল্টি, নিখিলের–
ওই গুহাপথে, নিষ্ক্রমণকালে।

একবার মাত্র দেখা হয়েছিল কায়ারূপে
ঝাপসা, ছায়া-ছায়া!
তা-ও বিজলির দিনে, তা-ও মেঘের ওপরে
উল্লম্ফকালীন।
এরপর থেকে শুধু ভাবমূর্তি…
যেদিকে তাকানো যায়
কেবলই, উপর্যুপরি ভাবমূর্তি ঝলকায়।

মাঠে মাঠে স্প্রিং স্ক্রু আর নাটবোল্ট ফলেছে এবার সব জং-ধরা।
সে-সব ভূমিতে হাঁটু গেড়ে গলবস্ত্র হয়ে পরিপূর্ণ দুই হাত তুলে
যাচ্ঞামগ্ন সারি সারি সম্প্রদায়– তারা অসবর্ণ, তারা
লঘিষ্ঠ– কলহরত বিড়ালের আধো-আলো-আঁধারি বাচন ও কণ্ঠস্বর
কেড়ে নিয়ে দ্রুত নিজ কণ্ঠে কণ্ঠে গুঁজে দিয়ে সারিতে দাঁড়িয়ে যায় তারা।

তেজের অধিক তেজ
বাক্-এর অধিক বাকস্ফূর্তি তুমি,
গোলকে স্ফুরিত হয়ে এসো পুনর্বার
পূর্বধর্ম ধারণ করে সরাসরি উত্তম পুরুষে।

আর
কত অর্থ যে নিহিত করে রাখো বীজাকারে
সেইসব ভাসমান বাক্যের অন্তরে,
দৃশ্যত যা অর্থহীন অতি-অর্বাচীনদের কাছে।

সংকটে সংকটে, সর্ব-আকারবিনাশী
দহন দলন আর দমনের দিনে
আদিগন্ত কুয়াশা-মোড়ানো সেই তৎকালীন রৌদ্রের মধ্যেই
চতুর্দিক থেকে একসঙ্গে আর
বৃক্ষে বৃক্ষে আর দ্রব্যে দ্রব্যে আর ভূতে ভূতে সর্বভূতে
মুহুর্মুহু উদ্ভাস তোমার, এক অবধানপূর্ব রহিমের রূপে।
ঘনক তো গোলকেরই এক অপূর্ব অপিনিহিতি।

এইরূপে লীলা করো, লুকোচুরি, আমার সহিত।
আমি থাকি দূরের রূপতরঙ্গ গাঁয়, আর তোমার সহিত
তোমার সাহিত্যে দ্যাখো এভাবে আমার বেলা বয়ে যায়।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

উকিল মুন্সি: বাংলার বিরহভাবের সম্রাট | আহমেদ স্বপন মাহমুদ

Fri Jun 11 , 2021
উকিলের মারপ্যাঁচ বোঝা অত সহজ না! অন্তত স্টুপিড শিক্ষা আর কুলষিত মন নিয়া ভবের চালে-তালে মইজা ভাব ধরা যায় না। ভাবের বোঝাপড়া ভাব দিয়াই করতে হয়। আজ উকিল মুন্সির জন্মদিন। মহাজনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। জয়গুরু। উকিল মুন্সি: বাংলার বিরহভাবের সম্রাট | আহমেদ স্বপন মাহমুদ 🌱 পানির বেদনা কী হাওরের উতলা […]
Shares