নির্বাচিত দশ কবিতা | নীহার লিখন

নির্বাচিত দশ কবিতা | নীহার লিখন

🌱

কাব্য ভাবনা 

কবিতা শব্দে লেখা নিজেরই ছিন্ন-ভিন্নতাগুলোই, এ প্রাপ্তির তুলনা নেই, সতত ঘটনাবহুল একটা জীবনে এক নির্ভয় মিনতিটাই মানি যার অভিমুখ সে নিজেই, আমি কবিতা লিখলে চারপাশটা ভিন্ন হয়ে যেতে দেখি; সে অর্থে কবিতা আমার কাছে একটা পাহাড়ের মতোই যার উপরে উঠলে বহুদূর অব্দির জীবনটা একসাথে দেখা যায়, কবিতা ছাড়া আমার সামান্য দুচোখের পক্ষে এটা সম্ভবপর হয়ে উঠতো না ।

 

নির্বাচিত দশ কবিতা 

 

জুঠা বাসনের পুতি কথোপকথন 

~

বনে আগুন লাগলে যাই,  ভস্মের পরে, পোড়া কোনো পশুর মাত্রই নিভে যাওয়া চোখ, পাখির চিবুক, আর উলঙ্গ গাছের বিমূঢ় থমক দেখে মিলাই অনেক;  অবিনশ্বর নই কেন আমি, আমাদের প্রেমকে  কোন অধীশ্বর বলেছে অমৃতের থালার প্রসাদ; কম্পন নেই তবু ভেঙে গেছে লালনার আজন্ম খয়েরী বিষাদ, মৃত্যুও এক বেবী সাইকেল, পাংচার হয়ে পড়ে থাকে, সন্ধ্যার বেলকনিটাই যার অমোঘ প্রাসাদ 

বরং ঘোড়া ভালো কমিউটার মানুষের; মরে যায়, চলে যায়, ঘুড়ির মতোই, পবনেও ছিড়ে যেতে পারে, ত্রিমাত্রিক নয় যদিও, তবু স্মৃতির আগুন নেই যার, যে কোনো স্মৃতিই রক্তকে বাষ্পীভূত করে আকাশে উড়ায়, কানাভোলায়, দাবানলের মতন, সাদা জলেও কালো ছাই ফেলে যায় 

সুফিদের দুনিয়া মূলত নৈশভোজের পরে জুঠা বাটির কথোপকথন, নৈ:শব্দে একে অন্যের দাগের দিকে চেয়ে হাসে

আমি সেই সুফি, আগুন লাগার পরে বনে যাই, চৌবাচ্চার জুঠা বাসনের দাগের ভিতর থেকে ঈশ্বরের প্রস্থিত হাতের ছাপগুলো দেখে হাসতে পারি

—————

 

আত্মা 

~

বিভুঁই জাহাজ যদি আত্মাটা ধরে নেই, তবে সমস্ত ভ্রমন তাঁর যতোটা দেশান্তরি হয়, ততোটাই বিস্তারিত হয়েছে সে ভেতরে তোমার, যা খোলস, পরিভ্রমণ ভেবেছে অনেকেই, ভেবেছে অগাধ, বিফলতাপ্রসূত কোনো নৈশ বিভ্রান্তির নিমজ্জনে যদিও স্পাইনে তাঁর জমেনি তমসার অতল বিবাগী জল, বেভুলা দাঁতের হাঙরের ঢল 

মৃত্যুকে যদি ধরি শুক্রসন্জিবনীর পেয়ালা, তাঁর অসীমের ধোঁয়া মিশে যায় ছিন্ন পাতায়, তৃণের হরিণকে যে নিরীহ ভাবেনি, প্রকৃতি তাঁর অন্তরে গচ্ছিত রাখে গোপন আওয়াজ, জীবনের গন্ধের সবটা নিয়ে পুষ্পের মতো যে ফোটে একা নিরালায়, সুফির চোখের মণিজোর যার সফল উপমা পৃথিবীর

————

 

রক্ত রজত 

~

পৃথিবীতে তোমাকে এনেছে কোনো দলিত রাখাল,যার হাতে ছিলো মিহিন লাঠি, আদতে বিষণ্ণতা, যার স্পর্শে সাদাফুল আজীবন ফুটেছে ধরায় 

সে’ও কোনো দূতটাই, যার চুলে লাগে ধুলা, ফুলের মতোই সাদা, মনে থাকে বারোমাস আশিনের নীল 

তোমাকে এনেছে চিরদিন এক ছোঁ-মারা চিল, দূরের ঈষান থেকে উড়ে; ঘাসের ডগারা ভোরে কিছুই বুঝেনি নিশ্চুপে কোথায় আকাশ থেকে এতোসব তারা কোথায় সঙ্গোপনে হাসিমুখের মতন ঝরে পড়ে 

দলিতের আরেক নাম অস্পৃশ্য, যার রক্ত রজতখানি কেউ জানে না; না মেষ, বা পশুর পাল, না চড়ানোর মাঠ, না সেই গোলক যাতে আজম্ম চক্কর কাটছে সবাই

————

 

পিছনে মানুষ থাকে না 

~

একটা মানুষ আরেকটা মানুষকে জোরে বলছে তার নিজস্ব ধর্ম, গুণগান ও শ্রেষ্ঠতা 

অথচ তারা কেউই কখনোই পাখির মতন সর্বজয়ীটি না, পৃথিবীর সমস্ত অন্দরে তারা কেউই নিরঙ্কুশ নয়, কোনো পরাভূত কোকিলের মতোও 

তারপরও কলহাস্যের শেষ নেই, যেন তুষের আগুন, আংড়াটা জ্বলে দেশ বিদেশে 

আমি আমার মতন সেরা হই, তোমাকে হারালে; তুমি তোমার মতন দু’পা বাড়ালে

কী তার আহ্নিক-বার্ষিক গতির জটিল হিসাব তা জানি না,  জানি,  দু’জনেই এক রকম যাচ্ছেতাই হেরেছি আসলে 

যেহেতু গতি-সুন্দর প্রভু  পিঠে বসে আছে আমাদের সবার ঘোড়ায়, আমাদের সুখ সেখানেই, সামনে দৌড়ে চলার স্পর্ধায়, সামনে সুন্দর বন, সামনেই নদীর ঠান্ডা জল, সামনে এলোভেরার মতন যৌবন 

পিছনে পৃথিবী নেই, পিছনে কোকিল ডাকে না, পিছনে মানুষ থাকে না

 

রাস্তা

~

অজগরের বন্ধু হয়ে রাস্তাটা নেমে যাচ্ছে পাশের পাতার বিরানে

খচমচ শোনা যায় এমন সন্ধ্যায় মেঘ ভেঙে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছি, কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে, সাদা সুর আসছে, গন্ধে ভাসছে কী এক হিম

পতন আছে জেনেও বকুল ফুটেছে চিরদিন, যার আশপাশ আত্মার মতন, কুন্ডুলিত আছে, কান্ডে, গাছে  

সেথা যাই, যেথা এই সকল রাস্তারা যাওয়ার চিন্তায় মগ্ন হয়েছিলো জ্যান্ত বেহালায়, পজ নেই, সদা চলিষ্ণু তাঁর সকল প্রস্থান, শেষতক সে গতির অভিমুখ বৃষ্টির সাক্ষাত পাবে কীনা জানা নেই, মেঘ ভেঙে সাইকেল চালাই

—————-

 

রাও 

~

শো শো বাতাস, মাঠের পরে মাঠ, পাচ্ছি আমায় মোগল বাড়ির থেমে থাকা চৌকাঠ 

 

ঘাস কে লাগায়, এত বিস্তার যার; পেখম-খসা আমার সময়, ইট-ভাঙা রাস্তার 

 

হে ভগবান তুমিও পুরান হচ্ছো না কোন সুখে 

আমার মতন তোমারও কি সুখগুলো বি-সুখে 

 

চৈত্র পালি আমি, চৈতালি সব জলেই ঢালি, দামী

নৈবদ্যে আতপ চালই চাও

দয়াল তুমি কেমনে হলে সখা আমার, ক্লেদের সাগর সাঁতরে ডাকি, পাই না যাহার রাও 

ভেবেছি তাই শুন্যমাঠই আমার পরম, তোমার তুলট বুক, দেখি বাতাস উড়ে, শব্দে তোলে সুখ

—————-

 

মৌ-গন্ধে

~  

কেউতো আছেই, আগুন নিয়ে লুকিয়ে 

বের হয়, ভর-রাত বিষে ভরে গেলে, এই যে এতো ফুল ফোটে, সে তারই সাহসে, ভোর হয়’তো আজও, এ কোনো নিয়মটাই,  ঘাসের দোসর হয়ে ছুয়েছে মাটি- সত্যে

কেউতো আছেই, তোমার মতন এক নেপথ্য রানী, গ্লানি-জঙ্গল ঘেটে লোকালয়ে গেলে অচেনায়, মনে হয় তারার পুলক হয়ে ঝুলে আছো বাদরলড়ি, মৌ গন্ধে

————

নিস্তার 

~

প্রেমের কবিতা লিখলে তুলার মতন হাল্কা লাগে, তবু নিদান পাথর নড়ে না 

খুব ক্লীশেই যদিও, জগতে তোমার যতো উপমা সকল, অজগর থেকে চাঁদ অথবা নদীর কথায়, বারবার ফিরে আসি একই কাতরতায়; সন্যাসী ছায়াটায়, সন্নিকটেই, কিছু নেই দেখবার, খুজবার, তবু মন ভরে না 

এ তেমন কোনো ধন্দও না তুমি, অথবা শিলা, স্তরীভূত হয়েছো ক্রমেই, তারপরও হাতছানি কী এক জগতসম ডাকে, পাতার ফাঁকে, কোনো বিষন্ন চোখের পাখি, উড়ন্ত মেঘেরা যেমন অন্ধকারের মতো জমেই 

নিস্তারে বহুবার চেয়েছি যেতে, অলক্ষ্যে ফেলে রেখে সব, পারিনি কোথাও, পথ ঘুরে দাঁড়িয়েছে পথেই আবার, মৃত কথা ছাই হয়ে শব্দে ঢেলেছে কলোরব

————

অরিগ্যামির নৌকারা

~

পবিত্র ভোর, কোন নিরীহ মানুষ তোমাকে পাঁজরে নিয়ে শুয়ে থাকে; আমিও খুঁজি না, তুমিও বুঝো না 

তারপরেও আমাদের সাক্ষাতকার নিতে আসে চিলতে  বাতাস, জানলার কাচের স্পর্শকে হড়কে সড়কে নেমে যায়, যেভাবে অজানা হয়েছে অরিগ্যামির নৌকারা; শিশুকালের বৃষ্টির ড্রেইনে

আমি কিম্বা তুমি কেউই  ভাবিনি আমাদের কথা, প্রত্তুত্তর আর প্রত্যাবর্তনহীন এক জীবনে কখনোই থাকে না মোলায়েম সে অন্ধকার, আমিও বুঝি না, তুমিও বুঝো না; এইসব দৃশ্য ও আলোর সন্মুখে আপ্ত বিচ্ছুরণ কিভাবে তলিয়ে দিয়েছে আমাদের সত্যের সাধ, কান্না করার সব ঝুম-অধিকার 

ঘুম ভেঙে গেলে আমরা যে যার মতো, যার যার পথ ধরে নেমে গেছি দূরে সরবার

 

———

রাক্ষসেরা

~

অর্থে নেই, অর্ঘ্যে নেই, ব্রঞ্জে নেই, গঞ্জে নেই, নেই পাথরে, বা নেই দাগে, বাগে, পিছে, আগে

একটা মস্ত বড় শুন্য শুয়ে ছিলাম তোমার ভাগে, পাগলের নির্লিপ্তি

স্মৃতি ঘেটে এ থেকে বিশুদ্ধ বিপ্লব খুঁজে বের করার মতো কোনো সুফি তুমি নও, ন্যুনতম জলও ছিলো না তোমার কোনোদিন, যাতে বেলা পড়ে আসা কালে হরিণটা জিভ দিতে পারে

এমনই পৃথিবী তুমি; চেনা হয়ে গ্যাছে, বিগত সময়ে এখান থেকে যারা চলে গেছে, তাদের আত্মার স্মারক কিছু ফুল ফোটে নিরীহ, বা এমন কিছু যক্ষের ধন প্রকৃতিতে গচ্ছিত রেখে কোনো সুফি চলে গেছে বলেই তুমি তা ভাঙিয়ে খাচ্ছো 

আমার সেই নির্লিপ্তিকে যদি একটা মুষ্টি-পাথরও মনে হয়, একবার হাতে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মেরে শুদ্ধ হয়ো তুমি;ওটাকে সামান্য ভেবে পথে ফেলে দিলে, তুমি ভাঙতে পাড়বে না কিছুই, একটা মামুলি চুলও ছিড়তে পারবে না কোনো রাক্ষসের, এবং একদিন ওই রাক্ষসেরা তোমাকেও খেয়ে গ্রহান্তরে চলে যাবে ।

 

লেখক পরিচিতি :

ব্রহ্মপুত্রের লৌহিত রেখায় মৃত্তিক মানুষ।  সাধক, ভাবুক, কবি এবং আখ্যানশিল্পী।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

শিশুটি | মূল: ডোনাল্ড বার্থেলমে | অনুবাদ: ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

Fri May 14 , 2021
শিশুটি মূল: ডোনাল্ড বার্থেলমে অনুবাদ: ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ 🌱 মার্কিন লেখক ডোনাল্ড বার্থেলমে (১৯৩১-১৯৮৯) বিয়ে করেছেন চারবার। তাঁর জীবনী লিখেছেন (তাঁর মৃত্যুর পর) দ্বিতীয় স্ত্রী ২০০১ সালে। প্রথম কন্যাসন্তান মিলেছে তৃতীয় স্ত্রীর কাছ থেকে। দ্বিতীয় কন্যাসন্তান চতুর্থ স্ত্রীর কাছ থেকে। চতুর্থ স্ত্রীর সাথেই ছিলেন আমৃত্যু। গলার ক্যান্সারে মারা যান বার্থেলমে। গল্প […]
Shares