শিশুটি | মূল: ডোনাল্ড বার্থেলমে | অনুবাদ: ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

শিশুটি
মূল: ডোনাল্ড বার্থেলমে
অনুবাদ: ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ
🌱
মার্কিন লেখক ডোনাল্ড বার্থেলমে (১৯৩১-১৯৮৯) বিয়ে করেছেন চারবার। তাঁর জীবনী লিখেছেন (তাঁর মৃত্যুর পর) দ্বিতীয় স্ত্রী ২০০১ সালে। প্রথম কন্যাসন্তান মিলেছে তৃতীয় স্ত্রীর কাছ থেকে। দ্বিতীয় কন্যাসন্তান চতুর্থ স্ত্রীর কাছ থেকে। চতুর্থ স্ত্রীর সাথেই ছিলেন আমৃত্যু। গলার ক্যান্সারে মারা যান বার্থেলমে। গল্প লিখেছেন শতাধিক। উপন্যাস চারটি। বাদবাকি কিছু গদ্যের বই আছে তাঁর। মেয়ের সঙ্গে যৌথভাবে লিখেছেন একটি শিশুতোষ বই। বার্থেলমেকে কেউ কেউ বলেন পোস্টমডার্ন ছোটগল্পের জনক। যাঁরা তার প্রশংসা করেন তারা বলেন− বার্থেলমে খুব সরস, সুশৃঙ্খল ও সুগভীর, পরাবাস্তবিক। যাঁরা তার নিন্দা বা উপহাস করেন তারা বলেন− বার্থেলমের লেখা অর্থহীন, প্রাতিষ্ঠানিক পোস্টমডার্ন। কেউ কেউ বলেন− আমেরিকার ইতিহাসে বার্থেলমে হচ্ছেন সবচেয়ে প্রভাবশালী, কিন্তু সবচেয়ে অপঠিত লেখক। কেউ বলেন− লেখায় তিনি ধর্ষমর্ষকামী। কেউ বলেন− তিনি বিশ শতকের উৎকণ্ঠার স্বর। আমরা বলি− বার্থেলমে প্রথাবিরোধী, বিদ্রুপাত্মক, তীর্যক ও তীক্ষ্ণ। ভাষা নিয়ে খেলতেন তিনি, ভাঙতেন শব্দ ও বাক্যকে, ভাঙতেন গল্পকেও। তাঁর গল্পগুলো কাঁচের টুকরো জুড়ে গড়া ভাস্কর্যের মতো। কখনও অর্থহীনও তিনি। কারণ, শিল্পের শক্তি সমাজ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে, আধুনিকতার এই বিশ্বাসেই হয়ত তার ভক্তি ছিল না। এসব কারণে বার্থেলমের গল্পের থৈ পাওয়া, খেই পাওয়া, ভিনভাষীদের জন্য কঠিন বটে। ‘শিশু’ গল্পটি তাঁর লেখাগুলোর মধ্যে, সাধারণ বিবেচনায়, অপেক্ষাকৃত সহজ ও সাধারণ মেজাজের।

শিশুটি
বাচ্চাটি তার বই থেকে কিছু পাতা ছিঁড়ে ফেলল। এটাই তার প্রথম অন্যায়। তার এই অন্যায়ের কারণে আমরা একটা নিয়ম করলাম। প্রতিবার পাতা ছেঁড়ার জন্য এই শিশুকন্যাকে রুমে একা একা চার ঘণ্টা আটকা থাকতে হবে। শুরুতে সে প্রতিদিন বই থেকে একটি করে পাতা ছিঁড়ছিল। নিয়মও কার্যকর হচ্ছিল সে অনুযায়ী।
বন্ধ দরজার ওপাশে তার কান্না আর চিৎকার যদিও সহ্য করার মতো ছিল না। আমরা নিজেকে যুক্তি দিয়ে বোঝালাম যে এই মাশুল কিংবা আংশিক মাশুল তোমাকে দিতেই হবে। আঁকড়ে ধরার ক্ষমতা বাড়ার সাথে সাথে বাচ্চাটি দিনে দুইটি করে পাতা ছিঁড়তে লাগল। তার মানে, দিনে আট ঘণ্টা তার রুমে তাকে একা বন্দি থাকতে হলো। এতে প্রত্যেকের বিরক্তিও দ্বিগুণ হলো। কিন্তু কন্যাটি তো পাতা ছেঁড়া বন্ধ করবে না। তারপর এমন দিন এল যে সে দিনে তিন-চারটি পাতা ছিঁড়তে লাগল। এই কারণে রুমে প্রতিদিন ১৬ ঘন্টা পর্যন্ত আটকে রাখা হলো তাকে। আমার স্ত্রী তাকে বদ্ধ ঘরে খাবার দিয়ে আসছিলেন। উদ্বেগ বাড়ছিল তার। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, কোনো একটা নিয়ম চালু করলে আপনাকে তা মেনে চলার ব্যাপারে লেগে থাকতে হবে, দৃঢ় থাকতে হবে, তা না হলে সবাই একটা ভুল ধারণা পাবে।
কন্যাটির বয়স যখন ১৪ কিংবা ১৫ মাস তখন সে প্রায়ই ঘুমানোর আগে প্রতিদিন ঘন্টাখানেক কান্নাকাটি করত। এটা ছিল তার জন্য ক্ষমা। তার রুমটি ছিল বেশ চমৎকার। রুমে কাঠের সুন্দর একটি দোলনা ঘোড়া ছিল। পুতুল ছিল শ’খানেক। খেলনা জীবজন্তুও ছিল। বিচক্ষণতার সাথে সময়কে ব্যবহার করলে খেলনা, পাজল ও অন্যকিছু− ওই রুমের মধ্যেই করার মতো কতকিছু আছে তার। কখনো-সখনো দরজা খুললে দুর্ভাগ্যক্রমে আমরা দেখতাম যে ভেতরে থাকা অনেক বইয়ের অনেক পাতাই সে ছিঁড়ে ফেলেছে। এবং খুব ন্যায্যভাবেই সেই ছেঁড়া পাতার সংখ্যাও হিসাবে যোগ হতো।
শিশুটির নাম ছিল ‘জন্ম নাচুনি’। আমরা তাকে আমাদের কিছু ওয়াইন− লাল, সাদা ও নীল− দিলাম এবং খুব আন্তরিকভাবে তার সাথে কথা বললাম। কিন্তু তাতে কোনো ফল হলো না।
মানতেই হবে যে সত্যিকারের চালাক হয়ে উঠেছিল সে। সেই বিরল সময়টুকুতে, যখন সে রুমের বাইরে মুক্ত অবস্থায় মেঝেতে বসে খেলত, তখন তার পাশে খোলা থাকত একটি বই এবং আপনি সেদিকে সারাক্ষণ চোখ রাখলেও দেখতেন যে সবকিছু একেবারে ঠিকঠাকই আছে। এবং তারপর আরও নিবিড়ভাবে দেখতে হতো, তখন আপনার চোখে পড়ত ব্যাপারটা। বইটির একটি পাতার কিনারটা একটু ছেঁড়া। বইটি ব্যবহারের কারণে ক্ষয়ে গিয়ে পাতাটি এইটুকু ছিঁড়ে গিয়ে থাকতে পারে, এড়িয়ে যাওয়ার মতো এই রকম সাধারণ ব্যাপারই মনে হবে ওই ছেঁড়াটাকে, কিন্তু আমি জানি এই কাজটা তারই করা। এই কিনারটুকু সেই ছিঁড়ে ফেলত এবং কাগজের টুকরোটা গিল ফেলত। যে কারণে এটুকুও আমাদের হিসাব করতে হতো এবং করতামও। আপনাকে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য সে এই কম বা বেশি যেটুকুই হোক ছিঁড়তে পারে।
আমার স্ত্রী বলতেন, আমরা বোধহয় বেশিই কঠোর হচ্ছি। বাচ্চাটির ওজন কমে যাচ্ছিল। স্ত্রীকে আমি নিশ্চিত করে বললাম, বাচ্চাটিকে দীর্ঘকাল বাঁচতে হবে এবং এই পৃথিবীতে অন্যদের সাথে বসবাস করতে হবে, থাকতে হবে এমন এক বিশ্বে যেখানে আছে অনেক অনেক নিয়ম-কানুন-বিধি-নিষেধ। নিয়ম-কানুন মানতে না শিখলে তুমি তো চরিত্রহীন অবস্থায় অন্যদের উপেক্ষার শিকার হবে, সবাই এড়িয়ে চলবে এবং একঘরে করে দেবে। আমরা শিশুটিকে সবচেয়ে দীর্ঘ সময়, একটানা আটাশি ঘণ্টা, রুমে আটকে রেখেছিলাম। কারণ, পঁচিশটি পাতা ছিঁড়েছিল সে। আমার স্ত্রী শাবল দিয়ে দরজার কব্জা ভেঙে ফেলায় বারো ঘণ্টা বাকি থাকতেই তার শাস্তি শেষ হয়ে যায়। দরজাটিকে আমি আবার কব্জা এবং বড় একটি তালা লাগালাম। স্লটে ম্যাগনেটিক কার্ড দিলেই কেবল এই তালা খুলবে। ম্যাগনেটিক কার্ডটি রেখে দিলাম আমার কাছেই।
কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। নরকের বাদুড়ের মতো শিশুটি তার ঘর থেকে বেরিয়ে আসত। সামনে যে বই-ই পেত, তা ‘গুডনাইট মুন’ই হোক বা যা-ই হোক, ছুটে গিয়ে দ্রুত পাতা ছিঁড়ে ফেলত।
তার মানে মাত্র দশ সেকেন্ডে ‘গুডনাইট মুনের’ চৌত্রিশটি পৃষ্ঠা সে মেঝেতে ছিঁড়ে ফেলে দিল। সেই সঙ্গে বইটির কভারও ছিঁড়ল। আমিও কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে শুরু করলাম। ছেঁড়া পাতা আর ঘণ্টার হিসাব করলে তো তাকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তার রুমেই আটকে থাকতে হবে, তাহলে। তাকে বেশ সুন্দর, কিন্তু রোগাটে ও ফ্যাকাশে, লাগছিল। কয়েক সপ্তাহ সে পার্কেও যায়নি। আমরাও কমবেশি নৈতিক সংকটে ছিলাম। এই সমস্যা সমাধানে আমি ঘোষণা দিলাম যে বইয়ের পাতা ছেঁড়া খারাপ কিছু নয়। অধিকন্তু, অতীতেও বইয়ের পাতা ছেঁড়া থাকাটা ঠিকই ছিল।
নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারা বাবা-মা হিসেবে একটি সুখের বিষয়। অবস্থান পরিবর্তনের এই বিষয়গুলোর এক একটি সোনাদানার মতো। তারপর থেকে কন্যা শিশুটি আর আমি বেশ আনন্দের সঙ্গে মেঝেতে পাশাপাশি বসে বইয়ের পাতা ছিঁড়তাম। এবং মাঝে মাঝে, নিতান্তই মজা করে, বেরিয়ে যেতাম রাস্তায় এবং সেখানে গিয়ে ভেঙে দিতাম গাড়ির উইন্ডশিল্ড।

ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ
ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ লেখালেখি ও অনুবাদের চেষ্টা করেন। সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ ‘কোরিয়ার গল্প’ (সম্পাদনা)। পেশায় সাংবাদিক। জড়িত আছেন উজান প্রকাশনের সাথে।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

নির্বাচিত কবিতা | মাসুদ খান

Sat May 29 , 2021
ভূমিকার আভা… হারু‌কি মুরাকামির উপন্যাস 1Q84 এ একথা কথা আ‌ছে এমন, যা অল্প কথায় বোঝা‌নো যায় না, তার উদাহরণ দি‌য়েও বোঝা‌নো যা‌বে না। অর্থাৎ, উপল‌ব্ধি ব্যাপারটা ব্যাখ্যা নির্ভর ততটা না যতটা অনুভূ‌তি নির্ভর। ক‌বি মাসুদ খা‌নের ক‌বিতা কেন আলাদা, ভা‌লো লা‌গে, তার নতুনত্ব কী, পৃথকত্ব কোথায় এগু‌লো খুব ক্লি‌শে একা‌ডে‌মিক […]
Shares