গীতসাহিত্যে : জলযান ও জলজীবিতার বিচিত্র উপাখ্যান | মোহাম্মদ সুবাস উদ্দিন

গীতসাহিত্যে : জলযান ও জলজীবিতার বিচিত্র উপাখ্যান | মোহাম্মদ সুবাস উদ্দিন

🌱
গীতসাহিত্যের চারণভূমি এ সুনামগঞ্জ। তিনশ’র অধিক লোককবির জন্মভিটা এ অ লে। বালি-পাথরের মতো গান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রত্যন্ত জুড়ে। কাঁদামাটির গন্ধ মাখানো এ জনপদের গান। গান শুকেও চেনা যায় এখানকার মাটির রকমফের বৈশিষ্ঠ্য। এ গীতসাহিত্যের শ্রষ্টা খেটো-খাওয়া মানুষ।প্রত্যেক মানুষের জীবন থেকে উৎসারিত চিন্তর প্রতিরূপ হিসেবে গীতসাহিত্যেই মোটাদাগে জায়গা দখল করে আছে। তাঁদের রচিত গানে শুধু শ্রষ্টা আর সৃষ্টির গুঢ় রহস্যএবং জীবন সংগ্রামের কঠিন বাস্তবতার নানাচিত্রও অবলীলায় উদ্ভাসিত হয়েছে। প্রতি বছর জল এখানকার প্রকৃতি-পরিবেশকে প্রতিবছরই ধুয়ে মুছে ঢেলে সাজায় নুতন আঙ্গিকে। মিঠাজলের গন্ধ শুকে মাতোয়ারা হয়ে কৃষক-জলজীবিরা জীবন সংগ্রামে যুক্ত থাকে। কাজের ফাঁকে বিনোদন,শিল্পসংস্কৃতির চর্চা এখানকার মানুষের নিত্যদিনের অভ্যাস। সুরমা-কালনী-রক্তি-যাদুকাটা নদীর বিপুলস্নেহধন্য জলজীবিদের প্রকৃতির সঙ্গে রয়েছে হাজার বছরের মিতালী পাতানোর ইতিহাস। রোজদিনই হাওর নদীকেন্দ্রিক জনপদে নানারকম জলযান উজান-ভাটির স্ত্রোত ঠেলে এক জনপদ থেকে অন্যজনপদে। জীবনের টানে কতমাঝি উত্তাল ঢেউ মাড়িয়ে ক্লান্তিনাশিতে অচেনা নদীতীরে নোঙ্গর ফেলে তীরে বসে গায় জীবনের গান। অপরদিকে এ জলযানের সঙ্গে মানুষের প্রীতি-ভালোবাসা ও আগ্রহের কমতি ছিল না কোনো কালেই। স্রোত ঠেলে ঠেলে জানা-অজানা শঙ্কাকুল পথে ধেয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এখানকার জলজীবি মানুষের লোকায়ত জীবনের অগ্রন্থিত পাঠ।
জলের উপর ভর করেই মানুষ এক সময় সভ্যতার উত্তরণ ঘটাতে চেষ্টা করেছিল – এ প্রসঙ্গে বেরতী মোহন সরকার বলেন- ‘মানুষ প্রথমে ভাসমান কাঠের উপর আপন দেহভার ন্যস্ত করে জলের উপর পাড়ি জমিয়েছিল’ এ আবিস্কার সভ্যতার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এটিও ‘আদিম বিজ্ঞান’ অথবা ওহফরমবহড়ঁং ঝপরবহপব এর অবদান বলে স্বীকৃত। এ অভিজ্ঞতা লব্ধ ধারণা থেকে মানুষ কাঠের তৈরি জলযান আবিস্কার করে।… কাঠের সাহায্যে জলে ভেসে থাকার চেষ্টাই দিনে দিনে মানুষকে জলযান তৈরি করতে অনুপ্রেরণা যোগায় এবং তা থেকেই পর্যায়ক্রমে জলযান ব্যবস্থার গোড়া পত্তন হয়।১ তা থেকে অনুমিত হয় জলযান প্রযুক্তির ক্রমবিকাশ মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি ক্রমোগ্রতির পরিচায়ক। জলযানের আবিস্কার ও তার ব্যবহার ফলে সভ্যতাসংস্কৃতির বিকাশ সাধিত হযেছে যুগে যুগে। আদিমতম মানুষের জীবন পর্যালোচনা থেকে জানা যায়-জলকে জয় করার প্রচেষ্টার কথাআর্কিমিডিস তাঁর জীবদ্দশায় অঙ্ক কষে দেখিয়েছিলেন যে, একটি লোহার বল জলে ডুবে যায় কিন্তু সেই বলটাকে পিটিয়ে কড়াইয়ার (ঊখখওচঞওঈঅখ) মতো করে তৈরি করলে সেটি জলে ভসে। কোনো বস্তু জলে পড়লে সেটি যতটা জল সরাতে পারেতার অপেক্ষা বস্তুট বেশি ভারি হলে সেটি ডুবে যায়।
আদিকালের মানুষের লোকায়ত ধারণা থেকে তৈরিএকমাত্র জলযানই বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে নিয়ে এসেছে পরস্পরের কাছাকাছি। জলতীরবর্তী এপারের মানুষ অবাক হয়ে ওপারের দিকে তাঁকিয়েছে। এ বিভেদ ও দুরত্ব সৃষ্টিকারী নদী-হাওর-খালের দুস্তর জলপ্রবাহ দ্বারা বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমঝোতা,সম্প্রীতি গড়ে ওঠেছে জলযানের কল্যাণে। জলযান কেবলই পরিবহন-সহায়কই এটি প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে অবিরাম সংগ্রামের হাতিয়ার বটে। জলযান জীবিকাসূত্রে মানুষের সামনে ধেয়ে যাওয়ার প্রতীকী জীবনেরই সোপান। এখানখার মানুষের জীবনের বড় বৈশিষ্ট্য হলো জলজীবিতার আশ্রয় পৌরণিক কাল হতেই এ অ লে ব্যবসা-বার্ণিজ্যে জলযান পরিচালনা করেছে মাঝিরা। সত্তরের দশকে নদীপথ দিয়ে জং নৌকা. কোষা নৌকা, বাছারী নৌকা, চলেছে হরদম। উল্লেখ্য যে, জলযানের সঙ্গে জনপদের লোকদের আত্মিক সম্পর্ক অনেক আগ থেকেই। সখের বশে এ জনপদে জলযান পরিচালনা করে তবে বেশিরভাগই মানুষই মোটাভাতের সন্ধানে জলের বুকে তরি বেয়ে অতিক্রান্তকরেছে সোনালী জীবন। জলের মধ্যে থেকে জলজীবিরা মাছধরার জন্যে সুতা ও বাঁশ দিয়ে তৈরি করে শিকারের নানা শিল্পসুলভ ফাঁদ এবং তা জলে প্রয়োগ করতে সহযোগিতা নিয়েছে জলযানের। ব্যবহারের উপযোগীতা থাকার ফলে জলযান যুক্ত হযে যায় জীবনের সঙ্গে। সংসারের দায় কাধে নিয়ে রাতের অন্ধকারে চোরাজালুয়ার সঙ্গে হাতহাত করে অবৈধ্য শিকারবৃত্তিতে জলযান ব্যবহারের প্রবণতার কথা শোনা যায়। এতদ্বঅ লে মানুষের কাছে জলযান কেবল কাঠের তৈরি একটি নির্জীব জড়পদার্থ বিশেষই নয়-সে যেন প্রাণরসে সঞ্জীবিত; তার সুখ-দুঃখ আছে,মানঅভিমান আছে। যে জন্যে জলযানকে কেন্দ্রকরে রচিত হয়েছে-কতকাব্যে-কাহিনী, জনশ্রতি লোকগান। তাতেই প্রতিবিম্বিত হয়েছে জলজীবিদের দাপ-দাদার,এমন কী তাঁর পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য পরিচয় জনপদের মানুষের ভাষাসংস্কৃতি।
গীতিসাহিত্যে জলজীবিতার উপাখ্যান
আমরা জানি বাংলাসাহিত্যের ইতিহাস মূলত: গীতি-গাঁথার ইতিহাস। প্রায় একহাজার বছরের ইতিহাস থেকে যতটুকু জ্ঞাত তা হলো দশম শতক থেকো আটারো শতক পর্যন্ত সাহিত্যের ইতিহাস তাঁর পুরোটাই গানের ইতিহাস। যতকিছুই প্রতিভাত হয়েছে সবই গীতিসাহিত্যে। সমগ্রদেশ আগে যেমন গীতিপ্রধান ছিল এখনও তার ব্যতিক্রম চোখে পড়েনি। বিচিত্র গানের সুরঝংকারে অনুরণিত হচ্ছে জনপদের আশ-পাশ।
বাংলা গীতিসাহিত্যের গোড়ার দিকে ‘চর্যাপদে’ দেখা যায়- ডোম-রমণীর নৌ-বাহনের কথা। মধ্যযুগের বাংলা গীতিকাব্যেও নৌ-চালিকা শক্তিরূপে নারীর ভূমিকার কথা স্বীকৃত। মনসা মঙ্গলে দেখা যায় -দেবীমনসা আত্মশক্তিতে প্রত্যয়ী দাম্ভিক চাঁদের দ্বারা তাঁর পূজা ও মাহাত্ম্য প্রচারে অভিপ্রায়ী। কিন্তু শৈবচাঁদ মনসাকে দেবী বলে আদৌ মানতে রাজী না হওয়ায় শুরুহয় সংঘাত। ক্রুদ্ধাদেবী চাঁদের গুয়াবন ও ছয়পুত্রকে বিনষ্ট করেন। চাঁদ এসবের পরোয়া না করে বার্ণিজ্যের জন্যে সাগরে ডিঙা ভাসান। দেবীর কোপানলে সে প্রয়াসও কালীদহের জলে সলিল-সমাধি ঘটে। ‘মনসা মঙ্গলে’ দেখি চাঁদসদাগরের ‘সপ্তডিঙা মধুকর’-র ভরাডুবির কথা, যা সংগঠিত হয়েছে মনসার চক্রান্তে। ঘটনার ফলশ্রুতিতে বেহুলা লখীন্দরের মৃতদেহ ভেলায় করে ভাসায়ে দেন অজানার উদ্দ্যেশে। ‘‘সদ্যবিধবা বেহুলা তার নির্ভীক জলযাত্রায় অভাগিনী বেহুলার ভাগ্যে জলযান হিসেবে জুটেছিল কলার মাঞ্জুস (আ লিকার্থে কলাগাছের খন্ডিত অংশের মাইনজ্জা) চম্পকনগরীর বাসিন্দরা সেসময়ে বেহুলার উপর ছুঁড়ে দিয়েছিল একরাশ ঘৃণা,অবজ্ঞা ও অভিসম্পাত। তখন দুঃখ-অভিমানে অবমানিত নারীস্বত্তার মধ্যে প্রতিজ্ঞা জেগে ওঠে। তাই মৃত স্বামীর প্রাণ ফেরায়ে আনতে স্বজন-পরিজনের আকুল আহ্বান উপেক্ষা করে কালীদহের জলে ভেলা ভাসায়ে দেয়। ….আসলে সমাজ তিরস্কৃত, স্বজন ধিক্কিত বেহুলার ভাগ্যে তার জলযাত্রায় ডিঙি জোটেনি। হয়তো সে পুরুষতন্ত্রের চোখে অমঙ্গলদায়িনী বলে’’।

তবে বেহুলার কলাগাছেল মাঞ্জুশের তৈরী ভেলা বা জলযান মানবসভ্যতার একবারে আদিকালের জলযান। প্রাগৈতিহাসিককালে মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতায় টুকরো টুকরো কলাগাছকে কোনো কিছু দিয়ে এঁটে জলে ভাসতে দেখেছিল। পরবতীকালে মানুষ এ পদ্ধতিতে অনুসরণ করে ভেলাকে কাজে লাগায়ে ছিল জলকে জয় করার জন্য। আজও এ জনপদে অকাল বন্যায় পাড়াগাঁেয় কলাগাছের বুড়ার(ভেলা)ব্যবহার নিতান্তই অবসিত হয়ে যায়নি। যাই হোক কেমন করে লখিন্দরের ভেলা নির্মিত হয়েছিল এ বিযয়ে জগজ্জীবন ঘোষাল লিখেছেন-
‘মর্ত্তমান মধুভাস কাটিয়া কুল পাই।
বাগানে কাটিল কলা লেখাজোখা নাই॥
হাতদশ প্রসার দীঘল দশহাত।
মঞ্জুষ পত্তন করিল তাহাত ॥
বান্ধিল মুঞ্জুষখান মধ্যে দিঞা বাঁশ।
ডিড়িঞা বান্ধিল ভেলা করিয়া চৌরস ॥
গোড়া আগল করিঞা কলার গাথে হালি।
হানিয়া বাশেঁর গোজ কোরা আড়া খানি ॥
চৌদিকে কাটিয়া ভেলা করে বিচক্ষণ।
জলের উপরভাসে রাজসিংহাসন ॥


মধ্যযুগের সাহিত্যে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে কৃষ্ণের নৌকালীলা বা নৌকাবিলাস অত্যন্ত উপভোগ্য কাহিনীরূপে স্থান পেয়েছে। গীতিসাহিত্যেও এ জলযান তার আপন বৈশিষ্ট্য নিয়ে সমুপস্থিত। আধুনিক কালের সাহিত্যে নৌকা বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। আমরা যাঁরা শহরকেন্দ্রিক জীবনযাপনে, জ্ঞান-গর্বে বলিয়ান, কমবেশি দলিল-দস্তাবেদ পঠন-পাঠনে অভ্যস্ত বা নিছক অবকাশ যাপনে বইয়ের পাতা ওল্টানো-পাল্টানোর অভ্যাস আছে, তাঁরা নিশ্চয়ই বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গলের নাম শুনেছেন বা পড়েছেন। তাঁর কাব্যে চন্দ্রধর সদাগর চৌদ্দডিঙা সাজায়ে বাণিজ্যে উদ্দ্যেশে জলবিহারে বেড়িয়েছিলেন এ জনপদে। তার বাহন ছিল জলযান। রাজা-বাদশাহগণ আগেকার দিনে যোগাযোগের ক্ষেত্রে যেসব যান ব্যবহার করতেন বিজয়গুপ্ত চাঁদসদাগরের চৌদ্দ ডিঙার নাম বর্ণনা দিয়েছে এ ভাবে-
তার পাছে চলে ডিঙা নামে চন্দ্রপাট
তার উপর মিলিয়াছে শ্রীকলার হাট ॥
তার পাছে চলে ডিঙা গঙ্গাঁর চরণ
নানা পুস্প রূপিয়াছে করিয়া যতন ॥
তার পাছে চলে ডিঙা সিন্দুর কটুয়া
সেই নায়ে নৃত্য করে তালিম নাটুয়া ॥
তার পাছে ডিঙা নামে হাসমড়া
সেই ডিঙায় ভরিয়াছে সাত শত ঘোড়া ॥
তার পাছে চলে ডিঙা গুরড় মহারথী
বিনা বাইশে চলে লোকে নহে দেখি ॥
সেই নায়ে করিয়াছে বিচিত্র দুই ঘর
রতেœর কলস শোভে দেখিতে সুন্দর ॥
তার পাছে চলে ডিঙা নামে চন্দ্ররেখা
সেই নায়ে যত দ্রব্য নাহি লেখা জোখা ॥


প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যে জলযানের ব্যবহারের দিক নিয়ে যৎকিি ত আলোকপাত পর এবার চোখ ফেরাবো সুনামগঞ্জের জলসাম্রাজ্যের ভেতর বেড়ে ওঠা গ্রামীন এলিটদের রচিত সৃজনশীল গীতিসাহিত্যে। যে গীতিসাহিত্যে জল ও জলযান জলজীবিতার রীতিনীতি, বাস্তবিকতা রূপবৈচিত্র্যতা প্রসঙ্গটি অত্যন্তসচেতনতার সাথে অংকন করে সুরমাপাড়ের বাঙালির জলযাত্রার গৌরবময় অতীত এবং জলজীবিতার ঐতিহ্যকে ইতিহাসের অর্ন্তভূক্ত বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গীতিসাহিত্যের পরতে পরতে জলজীবিতার ইতিহাসকে কীভাবে যুক্ত করলেন এবার সে প্রসঙ্গের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক।

শত শত লোককবির জন্মভূমি এ জনপদ। তাঁদের রচিত হাজার হাজার গীতবাণী লোকগানের বিশাল আরতকে করেছে ঐশ্বির্যমন্ডিত। এ সৃজনশীলতার জগতের মহীরুহ হলেন লোকায়ত রস- বোদ্ধা আউল-বাউলগণ। অধিকাংশ গানের বিষয়দর্শন অধ্যাত্ববাদ, জাগতিক প্রেম, শ্রষ্টা ও সৃষ্টি তত্ত নির্ভর। সমাজমনস্ক চিন্তা-দর্শন যে, লোকগানের ভেতর নেই, তা বলা ঠিক নয়। কারণ এ গীতসাহিত্যে রচয়িতাগণ কোনো না কোনো সমাজে বড় হয়েছেন। একথা সর্বজনবিদিত গীতসাহিত্যের রচয়িতাদের বেড়ে ওঠা জনপদের চারপাশের চিত্রই হয়ে ওঠেছে তাঁদের রচনার প্রধান উপজীব্যবিষয়। তাঁদের রচিত গীতসাহিত্যে শিল্পমূল্য সম্পর্কে কতিপয় বিদ্যাজীবিদের মন্তব্যেরসারৎসার এটি যে, তাতে শিল্পমূল্য নেই আছে শুধু মাটির গন্ধ। আবার কেউ এ মাটির গন্ধ শুকে অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে সেসব গীতিসাহিত্যের ভেতর থেকে প্রতিনিয়ত খুঁজে বেড়ান সমাজবাস্তবতা,সমাজতত্ত্ব বা লোকদর্শন। এ দৃষ্টিভঙ্গির নিয়ে বিষয় শিরোনামের প্রক্ষিতে জলজীবিতার উপাখ্যান সম্পর্কে দু’য়েক কথা বলা। লোকায়ত ধারার কবিদের রচিত গীতিসাহিত্যের জগতে প্রবেশ করে মনে হয়েছে ‘গীতিসাহিত্যে’ সকল মানুষের লোকধর্ম, লোকচিন্তা,লোকবৃত্তি, জীবনসংগ্রামের প্রতিচিত্র। যেসব কবিদের রচনা সংগ্রহ করা হযেছে ওরা মুলতঃ খেটো খাওয়া মানুষ। তাঁরা আজন্ম জলজীবিতার সঙ্গে প্রত্যক্ষভবে জড়িত। জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করছেন জলের সঙ্গে যুদ্ধ করে।

জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত লোকেরাই কর্মসূত্রে একস্থান থেকে অন্যস্থানে যেতে নিদ্বির্ধায় পথ চলতে বিচলিত হওয়ার অবকাশ নেই বললে চলে। কাজের ফাঁকে সৃষ্টির প্রেরণার উজ্জীবিত হয়ে লোকায়ত সাধনার জগতে জীবন অতিবাহিত করেছেন অমন আজন্মব্রতী লোকদেরও সংখ্যা সহশ্রাধিক। এসব লোকজন জীবনের ধ্যান-জ্ঞান অভিজ্ঞতা দলিলায়ন করার ক্ষেত্রে বেঁচে নিযেছে গুরুমুখী শিক্ষা। আজও এ শিক্ষার গুরত্ব এ জনপদ থেকে বিলিন হয়ে যায়নি। জীবনের অভিজ্ঞতাকে ধরে রাখতে যে কেউ গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে থাকে। একটা সময় পার হলেই অনায়াসে লিখতে পারে গান। ছন্দপতন,বানান ভুলের সমারোহ তাঁদের রচনার যতই থাকুক না কেন তাঁদের চেষ্টাকে কেউই খাটো করে দেখে না। তাঁদের গানের শরীরের রূপরস গন্ধই স্বশিক্ষিত রসবোদ্ধাদের কাছে পরম সম্পদ। নাগরিক সাহিত্যের বলয় মুক্ত কবিরা চিরকালই বিভিন্ন গাঁথা-গীতি রচনা করেছে। ঐসব মানুষের মনোজগতে কোনোবৈরীতা নেই।

নাগরিক সমাজের প্রতীকী মার্কা সাহেববাবুরা কালেভদ্রে দেখতে যান কেবলি ভোটের আরতদারের সঙ্গে কথা বলার জন্যে। মার্কামারা শহরকেন্দ্রিক রাজনীতিবিদদের অপ-কৌশলের কারণে সুনামজনপদে জলজীবি মানুষের অনেক ক্ষতিই সাধিত হয়েছে। ‘জাল দেবে জলা দিবে’ এমন প্রতিশ্রুতির কথা হর-হামেশায় ভোটব্যবসায়ীদের মুখে শোনা যেতো। এখন শোনা যায় না ‘জাল যার জলা তার’ এ ধরণের ্েশ্লাগান। শহরের ইলিট বা অভিজাত শ্রেণি এখন রাস্তায় স্বার্থ চরিতার্থের কামনায় মানব বন্ধন করেন। জলজীবীদের এমন শ্লোগানের সাথে কারো সম্পৃকতা থাকলেও হাতের মুটোলোন পেলেই কেউ কেউ সটকে পড়েন। ব্যঙ্গকরে জলজীবিরা বলতে দেখা গেছে ‘ ভোট যার জলা তার’ সেই সাথে জলজীবিতার ধরণ-ধারণও বদলে গেছে। নাগরিক সমাজে কেউ কেউ জলজীবি পরিচয় দিতে স্বাছন্দবোধ করেন। নিম্নবর্গের জালুয়ারা নিজেদের পরিচয়পত্র বিক্রি করে দিয়েছে ওয়াটার লর্ডদের কাছে। যাঁদের একচুটিয়া অধিকার ছিল জলের উপর তারা এখন অচ্যুত নিগৃহীত। যে জলের উপর জলজীবী মাঝিরা তার জীবনতরী ভাসাত,তারা প্রতিযোগিতায় হেরে গেছে। যান্ত্রিক সভ্যতার অগ্রগতির কারণে নৌকার পেছনে যুক্ত হয়েছে ইজ্ঞিন। শোনা যায় না ভাটিয়ালী গান ও সুর, যে গান গেয়ে মাঝি তার ক্লান্তি গোচাতো ।
মাঝি বাইয়া যাওরে
অকুল দরিয়ার মাঝে আমার ভাঙ্গা নাওরে
মাঝি বাইয়া যাওরে।
জীবন গাঙের মাঝি আর কতই বাইবে নৌকা। এ উদ্ধৃাংশে মাঝির স্বগোক্তি প্রকাশ পেয়েছে। নড়বড়ে জীবনকে ভাঙ্গা নায়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন গানের রচয়িতা। এমন অসংখ্য গানের ভেতর জলজীবিতার চিত্র লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে হাওর-বাওর নদী-নালা এখন ইজারাদারদের দখলে, নৌকার ইঞ্জিনের শব্দে মাছ নাকি অন্যত্র চলে যায় অমন অভিযোগ ওঠেছে। একজন কবি তার একটি গানে জলজীবি মানুষের ঐতিহ্যনাশের কথা তুলে ধরেন। গানটির গঠনশেলী এরূপ-
পালের নৌকা দেখা যায় না নদীর বুকে
ইজ্ঞিন নৌকায় মানুষ চলে ঝাঁকে ঝাঁকে।
বৈঠা লগি দাঁড় টানতে হয় না মাঝির
ইঞ্জিনের শব্দে যাত্রীরা হয়ে ওঠে জাতে বধির।
খেয়া পারে বুটবুটি সময় লাগে কম
পরাণ মাঝি ঘাটে বইয়া কান্দে হরদম।
জালুয়া বেঠা জাল ফাতাইযা মাছ ধরত হাওরে।
এখন জালুয়ার ফাতাইল জাল বুটবুটি চিড়ে।
ইঞ্জিনের ত্রাশে নাশ হইল বৈঠা লগি দাঁড়
শত শত মাঝি কান্দে এখন বইয়া নদীর পাড় ।


জলফাঁদ শিকারের অন্যতম হাতিয়ার। নদীর পাড়ে বা হাওর অনেক গ্রাম আছে যেখানে মাছ ধরার বিচিত্র ফাঁদ তৈরী করা হয়। তন্মধ্যে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধরের পাড় ‘গুই’ বা কুইন তৈরি করা হয়। পেশাদার জলজীবি মানুষ বছরের ছ’মাস এখাতে শ্রম দিয়ে থাকে। ‘গুই’ বাঁশের সরুকাটি এবং প্লাষ্টিকের চিলকা দিয়ে বেঁধে তৈরি করা হয়। দিনবদলের পালায় সবই বদলে গেছে অনেককিছু। গাঁয়ের পাশের ডোবা-খালে অথবা বাড়ির পাশে জল এলেই জলফাঁদ দিয়ে মাছ শিকারের প্রবণতা এখানকার মানুষের মজ্জগত অভ্যাস। যে কারণে সখের বশে অনেকই এই ফাঁদ কিনে থাকে। ধরের পাড়ের বৃদ্ধ বলেন- তাঁর শ্রমের বিনিময়ে যে অর্থ আসে, তা দিয়ে সংসার চলে কোনো ক্রমে। গ্রাম্য কবির রচনায় ওঠে এসেছে ধরের পাড়ের মানুষের চিত্র।
গানের সুরে বলে ওঠে-
হায়রে সাধের গুই
জলে তোমায় গছে না
লোকে তোমায় কিনে না
এ দুঃখ কারে কই।
রাস্তার ধারে বসলে লইয়া
জমাদার টাকা চায়
বিক্রি কিনির ধার ধারে না
জোড় কইরা লইয়া যায়।
বাঁশের আকাল দেশ জুড়ে
বেশি দামে কিনতে হয়
কাটলে বাঁশ ওঠেনা আঁশ
এ যাতনা কি প্রাণে সয়।
বেটাবেটি মিলে সবে
বানাই মোরা জলের ফাঁদ
আজীবনই অভাবী মোরা মিটল না সাধ।

আলোকচিত্রে : জলফাঁদ ও মৎস্যশিকারী ছবি সংগৃহীত

নারী ও জলজীবিতা
আষাঢ় শ্রাবন মাস অথৈই জলে পরিপূর্ণ থাকে এ জনপদ। বাইরের পর্যটক এ জনপদে আসলেই ধারণা করেন জলের মধ্যখানে একটি দ্বীপ এ বুঝি সুনামগঞ্জ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এ জনপদ বাংলার বদ্বীপের অংশ। বর্ষা এলেই নদীতে একসময় দেখা যেতো পালতোলা নৌকার বহর। বদলে গেছে নৌকার গড়ন। পালতোলা নৌকার মাঝি ঘরছাড়া বাউলের মতো,উজান থেকে ভাটিতে বা ভাটি থেকে উজানে যেতো। এখন আর সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না। মাঝি বাড়িতে রেখে আসা বধুঁর আকুতি ও উৎকন্ঠার শেষ নেই। কবে বধুঁর পরাণমাঝি বাড়ি ফিরবে এ প্রত্যাশায় বিরহী নারীর আর্ত¥নাদ জলসাম্রাজ্যের একজন কবির গানের মধ্যে পাই।
পূবালী বাতাশে বাদাম দেইখা চাইয়া থাকি
আমার নি কেউ আসেরে
আষাট মাসে ভাসান পানিরে ॥
হায়গো আমায় নিল না নাওর
পানি থাকেতে তাজা
দিনের পথ আদলে যাইতাম
রাস্তা হইত সোজারে ॥
ভাগ্য যাহার ভালা গো নাইওর
যায় আষাঢ মাসে
উকিলের নাইর বুঝি
কার্তিকের মাসের শেষে রে ॥

পরকীয়া দর্শন
গ্রামবাংলার এক নারী প্রিয়তম বন্ধুর দেখা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বি ত। এ জনপদে ঘরে ফেরা এবং দেশান্তরী হওয়ার একমাত্র রাস্তা হল জলপথ। গ্রামীন নারীরা যেভাবে থাকুক তাঁর আকুতি-মিনতি জানানোর একমাত্র সোর্স নৌকারমাাঝি। চিরায়ত বাংলার লোককবিরা সেই চিত্র এঁেকছেন তার গানে-গীতিকায়।
সুজন বন্ধুরে ও বন্ধু কোন বা দেশে থাক
আমারে কান্দাইয়া কোন নারীর মন রাখরে সুজন বন্ধুরে ॥
উজান বাঁেক থাক বন্ধুরে ও বন্ধু ভাটিযাল গাঙে থানা
চোখের দেখা মুখের হাসি কে কইরাছে মানা রে সুজন বন্ধুয়ারে ॥
জ্যেষ্ট না আষাঢ মাসেরে ও বন্ধু গাঙে নয়া পানি
আমার নি আর মনে লয় না খেলতাম নাও দৌড়ানি ওর সুজন বন্ধুয়ারে ॥৮

লোকবার্তা
পিতা তার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে প্রায়ই নিরুদ্দেশ। মা-বাপকে দেখার জন্যে তাঁর অধীর আগ্রহের টানের শেষ নেই। মনের দুঃখ ভাগ করার লোক না পেয়ে মাঝিকে উদ্দ্যেশ তাঁর স্বজনেদের কাছে বার্তা পৌছে দেবার জন্যে বলছে। মাঝিরাই একসময় বার্তা বাহকের দায়িত্ব পালন করতো নিম্নবর্ণিত গানের পুংক্তিতে সেই লোকবার্তা বিষযটি দ্যোতিত হয়েছে।
‘আরে ও ভাটিয়াল গাঙের নাইয়া
ঠাকু ভাইরে কইও আমার
নাওর নিত আইয়া রে
ভাটিয়াল গাঙের নাইয়া ॥
ঐনা ঘাটে বইয়ারে কান্দি
দেশের পানে চাইয়া
চক্ষের পানি নদীর জলে যাইতেছে মিশিয়ারে ॥
কোন পরাণে আছো রে বন্ধু
আমায় পাশরিয়া
জঙ্গলারই বাঘের মুখে
গেল নিবাস দিয়ারে ॥
এই বাইশাতে না নিলে নাইর
গলায় কলশি বান্দিয়া
ঐনা গাঙের গহীন তলায়
মরিব ডুবিয়ারে ॥
জালালে কয় আর কতদিন
থাকব রইয়া রইয়া
জল শুকালে নিবে নাইওর
বাঁশের পালং দিয়ারে ॥


পরবাস চিত্র
আবহমান বাংলার জলসাম্রাজ্যের অকুতোভয় প্রহরী নৌকারমাঝি। নৌ-সেনাদের মতো অস্ত্রশস্ত্র নেই বটে,কিন্তু জলের বুকে নিরন্তর স্বপ্ন বুনন আর বেঁচে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় জলের সঙ্গে যুদ্ধ করে নৌকা পরিচালনা করে আসছে। মাঝিরা তাঁর ভাগ্য বদলের পরশ পাথরটির খুঁজে উজান থেকে ভাটিতে যায় অবিনাশী দাঁড় বৈঠা টেনে প্রতিনিয়ত। দাঁড়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ মাঝির মনোজগৎকে শানিত করলেও শরীর থেকে ঝরে পড়া নূনা জল মনের অজান্তে মিটাজলের সাথে মিশে যায় প্রতিদিন। জলসাম্রাজ্যের জীবন যুদ্ধের অবস্থা সম্পর্কে গ্রাম্য কবির গানে ওঠে এসেছে।
আমি সুরমা নদীর নাইয়া
উজাঁন বাঁেক ছাড়লাম তরী নীল বাদাম উড়াইয়ারে ।
সোনার নাও পবনের বৈঠারে ॥
জীবন নৌকার মাঝি আমি ঐ না খেয়াঘাটে
দিনরজনী বৈঠা টানি এই ছিল ললাটে রে ॥
জন্ম থেকে জ্বলছি আমি সুরমা নদীর বুকে
নৌকা বাইয়া দিন কাটাই কতই সুখে-দুঃখে রে ॥

১০

মাঝিসংবাদ

বাপের ভিটা ত্যাগ করে যখন স্বামীর ভিটায় নারী যায় তখন আর কষ্টের শেষ থাকে না। তাঁর যন্ত্রণার অংশীদার কে হবে ? নিজের স্বজন ছাড়া কেহই দুখের ভাগ নিবে না। নদীর পাড়ে এসে অচেনা মাঝির কাছে মিনতি করে বলছে তার বার্তা বহে নেয়ার জন্যে মাঝি। যদি খবর নিতে অস্বীকৃতি জানান তখনকার অবস্থা সম্পর্কে বাউল গানে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ওরে সুজন নাইয়া
নীল যমুনায় কোথাও যাওরে বাইয়া
এ দুঃখিনীর খবর নিও
ঘাটে নাও ভিরাইয়া রে নাইয়া
আশার আশে কয়দিন থাকব চাইয়া ॥
ও নাইয়ারে
ধীরে ধীরে ছাড়ছো তরী বাদাম উড়াইয়া রে
আমার খবর যদি না নেও মাঝি
নাও দিব ডুবাইয়া রে ॥
নাইয়ারে
বিদেশে বিপাকে ঠেকলাম
কঠিন স্বামী পাইয়া রে
সেপারে মোর বাপেরবাড়ি
খরব দিও যাইয়ারে ॥
নাইয়ারে
মাইরে কইও নদীর পাড়ে
আমাায় গেলা থইয়া রে
তোমার বেটি কাল কম্ভীরে আজ
গিয়াছে খাইয়ারে ॥

১১

জালোয়ার সংবাদ

জলফাঁদ দিয়ে মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত সম্পদ্রায়কে লোকসমাজে ‘জালুয়া বলে। শিকারজীবীতার কারণে ওরা চষে বেড়ায় বহুস্থানে। ইচ্ছে করলেই যেতে পারে না স্বজনদের কাছে,তাঁদের যাওয়ার জন্যে মন আকুলি বিকুলি করে। উপায়ন্ত না দেখে নদীরজল বা বাতাস উদ্দ্যেশ করে কন্ঠে তুলে নেয় গান। আরেকজন কবির এ গানে জালোয়াদের লোকবার্তা ।
সুরমার পাড়ের জালুয়ারে আমি থাকি ভিন দেশে
বহুদিন হয় খবর দেইনা স্বজনদের তালাসে
বিধিরে এই অভাগার পাঠাইলাম পূবালী বাতাসে ॥
শীত নাই গরম নাই জলে বুকে বাস
অভাবের ফাঁদে পইড়্যা জীবন হইল নাশ ॥
বাড়ীর পাশ নদী নালা ভরাটের কারণে
মাছ শিকারের সুযোগ নাই কার দূঃখ কে শুনে ॥
দুধের ছাওয়াল রাইখ্যা আইছি ঘরে নাই মোর ভাত
ভাসান পানিত মাছ শিকারে একলা কাটাই রাত ॥
জলের কাছে বলিরে আমি জাল জলার কথা
জলেই পরে মাছের লাগি মরছিল মোর পিতা ॥
আমি যদি মরি জল গায়বি রোগে সুখে
ভাসায়ে লইয়া যাই জল সুরমা নদীর বুকে ॥

১২

বার্কি শ্রমিকদের জীবনচিত্র
বার্কিশ্রমিকদের জল ও জলযান হলো তাঁদের বাঁচার একমাত্র বাহন। তাঁদের কষ্টের শেষ নেই। ওরা মুলত: পাথর-বালি উত্তোলন করে নিয়ে আসাই তাঁদের প্রধান কাজ। জীবিকার টানে নদীর উজানে নিত্যদিন বাইতে হয় তরী। আসার কালে স্রোতের অনুকূলে নৌকার গুলইয়ে বসে নৌকা ভাসায়ে দেয়। ভাটির টানে তরী চলে আসে পাথরের আরতমহালে। সারদিন কাজ শেষে সন্ধাবেলায় টাকার জন্যে ঘুরতে আরতদারের পেছনে পেছনে। চাল-ডাল আর মোটা চাউল দিয়ে কোনোক্রমে চলে সংসার। রাত কাটতে না কাটতেই স্ত্রী-পুত্রের সঙ্গ ছেড়ে পাথর সংগ্রহের সার-সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়ে চলে আসতে হয় সুরমার তীরে। একজন বৃন্ধ পাথর শ্রমিক রসিকতা করে জারি গানটি গেয়ে শোনালেন-
মরি হায়রে হায়
নাও পানি সঙ্গের সঙ্গী ছাড়লে বাঁচন দায়
মরি হায়রে হায় ॥
বাপ-দাদার জমি ছিল গোলায় ওঠত ধান
মনের সুখে কত জায়গায় শুনতে গেছি গান
এখন আমি পাথর কুড়াই দুঃখে পরাণ যায় ॥
মরি হায়রে হায় …………
নিজের জমি নদী ভাঙ্গছে চতুরসীমা নাই
মানুষে নিলে দশগেরামে বিচার করত তাই
জলের রাজা বড়ই নিঠুর চোখে তার লজ্জা নাই ॥
মরি হায়রে হায়…………..
নৌকা লইয়া যখন যাই পাথর বালির মহালে
টাকা ছাড়া ইজারাদার নামতে দেয় না জলে
এরই মধ্যে চাদাবাজি ফন্দি ফিকির কৌশলে ॥
মরি হায়রে হায়

১৩

আলোকচিত্রে : যাদুকাটা নদীতে বার্কিশ্রমিক ছবি : শাহিনূর রহমান

জলজীবিতার সংকট
মাঝির ঘাটে জল, শরীলে থাকে বল’ সহজ কথাটি অনুধাবন করলেই বোঝা যায় জীবনের সঙ্গে জলের সম্পৃকতার কথা। মাঝির ঘাটে জল নেই, শুকিয়ে গেছে নদীনালা ও খাল। সে দুঃখের কথাই ওঠে এসেছে একটি গানের ভেতর। সেই চিত্রের বর্ণনা এরূপ-
বাড়ির পাশে জল নেই
হাড়িতে নাই ভাত
বড়লোকে চাইয়া কয়
মরছে পাটনীর জাত।
খালি বৈঠা হাতে নিয়া
শুকনায় বায় নাও
শুকনা পথে মানুষ চলে
বদলে গেছে বাও।
জল থাকলে খালে-বিলে
কোনো রকম চলি
না থাকলে জল হাতে লই
ভিক্ষাবৃত্তির ঝুলি ।

১৪
কখনও তরী জীবনের প্রতীক, কখনও বা মহামিলনের অনুসঙ্গ । জলের সঙ্গে মিশেল জীবনের দুখের শেষ নেই। জোয়ার-ভাটার মত জীবনের দুঃখকষ্টও আবর্তিত হয়। নদীর স্রোতের গতির সঙ্গে তাঁদের জীবন গতির সম্পর্ক। নদী যখন শুকিয়ে যায় তখন জলজীবিদের স্বপ্নসাধও শুকিয়ে যায়। জলজীবিতার এ বৈচিত্রময়তা বাংলাসাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখাই সৃষ্টির প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। উপন্যাস, চলচ্চিত্র ও নাটকে এবং প্রাচীনসাহিত্যে চর্যাপদেও জল, জলযান, জলজীবিতার চিত্র অত্যন্ত সরব ভাবে ফুস্ফুঠিত হযেছে। জলমাতৃক জনপদে বেশিরভাগ মানুষই জলের বুকে ভ্রাম্যমান সংসার পেতে টেউয়ের দোলার মতো এ জনপদে থেকে অন্যজনপদে ঘুরে বেড়ায়। এ দৃশ্য এখনও সুরমা তীরবর্তী অ ল জুড়ে প্রত্যক্ষ করা যায়। জল ও জলযানের সঙ্গে জীবন জীবিকার একটা সেতুবন্ধন রযেছে অনাদিকাল থেকে যা চিরকালীন।
জীবিকা নিবার্হের পাশাপাশি এ জনপদের জলজীবিরা নৌ-পথে লুটতরাজ বন্ধেও অসামান্য অবদান রয়েছে। আমরা জানি জলজীবি সম্প্রদায় জলসাম্রাজ্যে আগলে রাখত। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় লুটতরাজ রোধে মাঝিরা কখনো-সখনো তারা হামলার স্বীকার হতেন। বিদেশীরা জলযান দ্বারা লুট করতো এমন বর্ণনাও ভাটিবাংলার গীতিকায় ওঠে স্থান পেয়েছে। গীতিকায় উল্লেখ আছে যে,ভিনদেশে থেকে প্রত্যাগত সদাগররা ডিঙা নোঙ্গর করে লুন্টন করতো,স্বদেশী মাঝিদের জলে ডুবায়ে হত্যা করতো এবং মাঝি মালাদের বেঁধে নিয়ে নিতো। নুরুন্নিছা ও মালেকের পালায় তার বর্ণনার প্রক্ষিপ্ত পংক্তি এইরূপ-
‘লুড তরাজ করিয়া রে ডিঙ্গা ডুপাইত।
মাঝিমালা বাঁধি তারার সঙ্গে করি নিত ॥১৫
কিন্তু এটা ইতিহাসের শেষকথা নয়। অত্যাচারে পদানত জলজীবিরা একদিন প্রতিরোধ গড়ে তুলে গভীরসাগরে জলরাশির তরঙ্গে দোদুল্যমান নৌকাগুলো বিদেশী জলদস্যুদের বিরুদ্ধে। অতঃপর প্রতিশোধের জালবিছায় এবং শক্তি সংগ্রহ করে। লুট করার সময় একজন জালুয়া হার্মাদ্যার চোখের উপর একমুটো মরিচগুড়ো ছিঠিয়ে দেয়। তারপর যা ঘটলো গীতিকায় দেখা যাকÑ
‘ভোম খাইয়া পড়ে হার্মাদ্যা সব বালুর উপর
জাইল্যার দল কি কাম করিল তারপর ॥
একে একে বাইনল ডাকু পালর রশি দিয়া
কেহ মারে কিল চোয়াড় কে মারে ডিয়া ॥
হার্মাদ্যা ডাকাত বাধি যত জাইল্যাগণ
তরবিজ করিতে তারা ভাবে মনে মন ॥

১৬
একুশ শতকের এ জনপদে শত শত হার্মাদ্যা ডাকাতের সঙ্গে ঘরসংসার করে জীবন নিবার্হ করছে জলজীবি সম্প্রদায়। আজ থেকে প্রায় চারশত বছর আগে যাঁরা জল পথের নির্ভীক সৈনিক হিসেবে কাজ করতো। তাঁদের উত্তরসূরীরা আজ হার্মাদ্যা ডাকাতের উত্তরসূরীদের হাতে বন্দী। অপকৌশলী রাজনীতিবিদের ছত্র ছায়ায় এ জললোভী হার্মাদ্যা ডাকাত এর (ইজারাদার) প্রতিনিয়ত বিস্তৃতি ঘটছে। সুতারাং জলজীবিতার ঐতিহ্য রক্ষাকরার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে জলযান ও জালজীবীদেরনা হয় জলজীবিতার সংকট আগামীতে আরো বৃদ্ধি পাবে।

তথ্যসূত্র
সনৎ কুমার মিত্র সম্পাদিত ‘ লৌকিক জলযান’ বিশেষ সংখ্যা, লোকসংস্কৃতি গবেষেনা, লোকসংস্কৃতি গবেষনা পরিষদ, পশ্চিমবঙ্গঁ, পৃ. ৪২৫
সনৎ কুমার মিত্র প্রাগুক্ত পৃ. ৪১৭
সনৎ কুমার মিত্র প্রাগুক্ত পৃ. ৪২৫
সনৎ কুমার মিত্র প্রাগুক্ত পৃ. ৪১৫
মোঃ নজির উদ্দিন পিতা-রোস্তম আলী সাং-সুলতানপুর, পোঃ ও থানা-সুনামগঞ্জ। বয়স-৮৫ পেশা-অবঃ সরকারী কর্মচারী।
সুবল কুমার বিশ্বাস, পিতা -অনিল চন্দ্র বিশ্বাস গ্রাম -ধরের পাড় পেশা- কৃষি/ জলজীবি, বয়স-৩৭
ফোকলোর রিলেসান্স, মোহাম্ম্দ সুবাসউদ্দিনর সংগ্রহশালা-থেকে উকিল মুন্সীর একটি জনপ্রিয় গান। লোকগান সিরেয়াল-৩৭২
মোঃ শফিকুন্নুর একজন জনপ্রিয় লোকসঙ্গীত শিল্পী। ১৯৭৫ সাালে রেকর্ডকৃত গান
যতীন সরকার সম্পাদিত (২০০৫) জালালগীতিকা সমগ্র, বাংলা একাডেমী, ঢাকা পৃ ১২৫
মনিরুজ্জামান ও অন্যান্য সম্পাদিত ‘দূর্বীন শাহ গীতিমালা’ দূর্বীন শাহ পরিষদ, ছাতক, সুনামগঞ্জ পৃ. ১৫৯
মনিরুজ্জামান প্রাগুক্ত পৃ. ৪৪
নজির উদ্দিন গ্রাগুক্ত
আশ্রাফ উদ্দিন,পিতা-মোঃ নজির উদ্দিন,গ্রাম-সুলতানপুর, পোঃ ও থানা-সুনামগঞ্জ। বয়স-৪৫ পেশা-সরকারী চাকুরী।
নজির উদ্দিন প্রাগুক্ত
সনৎ কুমার মিত্র প্রাগুক্ত পৃ: ৪৩৭
সনৎ কুমার মিত্র প্রাগুক্ত পৃ: ৪৩৭

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

নির্বাচিত দশ কবিতা | ফারুক আহমেদ

Thu May 13 , 2021
নির্বাচিত দশ কবিতা | ফারুক আহমেদ 🌱 দিনগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে একটা সংগীত দগদগে আগুনে গলিয়ে ফেলা হচ্ছে একটা সুর ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে কলকব্জার ভাঁজে প্যাকেট হলেই চলে যাবে ভোক্তার দোরগোড়ায়। একটা যৌথপরিবারকে গলিয়ে ভাগ করে দেয়া হলো মৌচাক-তেজগাঁও, লন্ডন এবং ফ্রোজেন ফুডকে। আমাদের কোনো নিহিতার্থ নেই, প্রেম নেই, স্নেহ […]
Shares