পথরেখা : আমার ইদ | মোহাম্মদ বিলাল

পথরেখা : আমার ইদ | মোহাম্মদ বিলাল
🌱

সাব টাইটেল

ইদ হলেও এবং নতুন কাপড় কিনতে হলেও, কেনা মানে আজকের দিনের মতো রেডিমেইড কাপড় তখনও গ্রামে গঞ্জে পাওয়া যেত না। এজন্য খলিফা দিয়ে শার্ট বানানো হতো। কিন্তু শার্টের মাপ দেওয়ার জন্যেও আমাদের বাজারে যাওয়ার নিয়ম ছিলা না। এক্ষেত্রে পুরাতন শার্ট নেওয়া হত বাজারে- নতুনটা বানানো হতো পুরাতনটা থেকে একটু বড় করে।

পথরেখা : আমার ইদ

বাংলা বানানের আধিকারিক প্রতিষ্ঠান ‘বাংলা একাডেমি’ যেদিন বহুকাল ব্যবহৃত ‘ঈদ’ শব্দটিকে হ্রস্ব ই-তে লেখার অনুশাসন জারি করল, তারপর হতে অনেকদিন পর্যন্ত বাঙালি মুসলমানের অনেকের এই পরিবর্তন খুবই বেমানান ঠেকল। আমার অবশ্য এরকম কিছুই মনে হয় নি। বরং এই হ্রস্বতার পক্ষে একটি নিজস্ব বিবেচনা কাজ করছিল। এর সঙ্গে অবশ্যই বানানের নিয়ম বা অনিয়মের বিষয়টি যুক্ত ছিল না। আমি ভাবছিলাম, ভালোই হয়েছে-সেকালের ‘ঈদ’ একালে পরিণত হয়েছে ‘ইদে’। ফলে এ শব্দটি সমকালীন জীবনপ্রবাহ ও অনুষ্ঠানের আচরিক দিকগুলোর বিবর্তনকে ধারণ করেছে। এরকম চিন্তার বিষয়টি পরিষ্কার হবে আমাদের ছেলেবেলার ‘ঈদে’র আয়োজন ও উদযাপনের সঙ্গে মিলিয়ে নিলে। এটা একান্তই ব্যক্তিক বিষয় যে আমার শৈশব-কৈশোরে যাপিত ‘ঈদ’ দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বেশ লম্বা ছিল, একালের মতো হ্রস্ব হয়ে যায় নি। সুতরাং যাই থাকুক আর বলুক লোকে, দেশি-বিদেশি শব্দের ভুবনে আত্মীকরণ ঘটুক আর না-ঘটুক ‘ইদ’ নামক শব্দ বা অনুষ্ঠানটির, বাংলা একাডেমির অনুশাসন মেনে ‘ঈদ’কে এখন থেকে ইদ লিখা হবে। কেন লেখা হবে তার অনুভূতিটা এবারে প্রকাশ করা যাক : শৈশবে দুবার জামা কাপড় পেতাম আমরা। আমি বড় হয়েছি একান্নবর্তী পরিবারে-বছরে দুবার নতুন জামা-কাপড় পেতাম আমরা। একবার হেমন্তের ধান তোলার পরে, আরেকবার পেতাম ইদে। ইদ মানে রোজার ইদে; বকরি ইদে কোনো নতুন জামা-কাপড়ের রেওয়াজ ছিল না। এর বাইরে আমরা অপেক্ষাকৃত ভালো কাপড়টি ইদ আসার হপ্তাদিন আগে ধোয়ে নিতাম এবং শুকানোর পর ভাঁজ করে বিশেষ যত্নে বালিশচাপা দিয়ে রাখতাম। বিদ্যুত মহাশয় তখনও রাতদিন একাকার করে দেন নি আমাদের গ্রামে, ইস্ত্রি নামক বৈদুত্যিক যন্ত্র তো ছিলই না। মাইলতিনেক দূরে ধোপার একটি লন্ড্রিঘর ছিল কালীগঞ্জ বাজারে, তাতে কাঠ-কয়লা ইস্ত্রিতেই চলত কাপড় আয়রনের কাজ। কিন্তু বাজারে যাওয়া আমাদের বারণে ছিল। সুতরাং ইদের আগমন-প্রতীক্ষা ছিল একটা ভীষণ বিষয়। নতুন জামার-কাপড়ের গন্ধ আর কাপড়ের সুনিপুণ ভাঁজের জন্য আমাদের অপেক্ষা ছিল প্রায় সারা বছরের!
এর সঙ্গে আরেকটা বিষয়যুক্ত ছিল। আমরা যেহেতু ছিলাম একান্নবর্তী পরিবার, মা-বাবা, চাচ-চাচি, দাদা-দাদি, চাচাত ভাই-বোন এবং চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন-সব মিলিয়ে কমচে কম পঁচিশজনের সংসার ছিল আমাদের। এতে কিছু অলিখিত নিয়ম সবাই মেনে চলত। ইদে সবার গায়েই নতুন জামাকাপড় উঠত, শিশুরা তো ছিলই, বাড়ির মহিলা এবং সারা বছর ধরে কৃষিকাজে নিয়োজিত লোকজন- কেউই বাদ যেতেন না এ তালিকায় থেকে। আজ মনে হচ্ছে, শুধু বাবার গায়ে ইদের দিনে নতুন কাপড় চাপাতে দেখিনি সেদিনগুলোতে। তবে তাঁর জামা-কাপড় ছিল বিস্তর, অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে তিনি নতুন কাপড় কিনতেন না। বছরের যে-কোনো সময় পছন্দ হলেই অনেকগুলো কাপড়- বিশেষ করে পাঞ্জাবি করিয়ে নিতেন। নতুন কাপড়ে প্রসঙ্গে আরেকটু বলে নেই। ইদ হলেও এবং নতুন কাপড় কিনতে হলেও, কেনা মানে আজকের দিনের মতো রেডিমেইড কাপড় তখনও গ্রামে গঞ্জে পাওয়া যেত না। এজন্য খলিফা দিয়ে শার্ট বানানো হতো। কিন্তু শার্টের মাপ দেওয়ার জন্যেও আমাদের বাজারে যাওয়ার নিয়ম ছিলা না। এক্ষেত্রে পুরাতন শার্ট নেওয়া হত বাজারে- নতুনটা বানানো হতো পুরাতনটা থেকে একটু বড় করে। বাড়ির শিশু-কিশোরদের বাজারে যাওয়ার কোনও অনুমতি না থাকার একটা কারণ তো ছিল দূরত্ব, কিন্তু এছাড়াও আরেকটি কারণ ছিল এবং সেটিই মুখ্য হয়ে দেখা দিত। বাজারে যাওয়ার বায়না ধরলে শোনানো হতো একটি ‘ডাকর-খতা’। এটি হয় তো বা একটি ‘ডাকের বচন’ বা অনুশাসন। বলা হতো- ফোয়াইন নষ্ট হাটে আর ফুড়িন নষ্ট ঘাটে। ‘ফোয়াইন’ মানে ছেলেরা/কিশোরেরা আর ‘ফুড়িন’ মানে হচ্ছে মেয়ে বা যবতীরা; ‘ঘাট’ হচ্ছে পুকুর ঘাট বা নদীর ঘাট। এরকম স্থানে হর-হামেশা গমনকে কোনও সময়েই উৎসাহ দেওয়া হতো না। আজকের দিনে এসব নিশ্চয় আলগা হয়েছে। সুতরাং নিজে যাচাই-বাছাই করে কেনাকাটা করার সুযোগ ছিল না। তবে জামাটি কোন রংয়ের হবে তা বলে দিতাম আমরা। বাবা এক টুকর সূতো অথবা মুর্তা বেত দিয়ে গায়ের মাপ নিয়ে নিতেন অনেক সময়। বাবা যার জন্য যা আনতেন তাই নিতে হতো। তো কাপাড় আনলে পরে প্রথমে দেওয়া হত সবার ছোটকে। মায়েদের ব্যাপারটি ছিল আরো সিরিয়াস- মা-চাচি ছিলেন তিনজন। সুতরাং সর্বকনিষ্ঠের সুযোগ ছিল তার পছন্দ মতোই শাড়িটি নেওয়ার কিংবা এর পরের জনও হয় তো পছন্দ মতোই নিতে পারতেন। কিন্তু সবার যিনি বড় তিনি অন্যরা নেওয়ার পরে যা থাকত তিনি সেটিই নিতেন। এইখানে সমস্যা হতো অবশ্য, কিন্তু চিল্লাটাল্লা হতে দেখিনি। সেকালে টাঙ্গাইল শাড়িরই চল ছিল, প্রিন্টের শাড়ি বা ছাপার শাড়ির বাজার অতোটা চওড়া হয় নি। মা বলতেন, কোনো কোনো শাড়ির বাহারি নামও ছিল। শাড়ি আনার পর মূলত দেখা হতো তার রং পাকা কিনা আর মুড়ির সুটো কতোটা ভালো। কোনও কোনও ক্ষেত্রে শাড়িটা পুরো বারো হাত পড়েছে কিনা সেটিও দেখতে হতো। তবে বাবার রুচিবোধ এবং গুণবিচারি ছিল প্রখর। তবু মাঝে মাঝে শাড়িগুলো পড়ে থাকতে দেখেছি। কারণ একজন শাড়ি নিয়ে অভিমান করলে অন্যরা শাড়ি পরা স্থগিত রাখতেন মনে হয়। তবে সেটি বেশি দিন পড়ে থাকত না আর বাজার থেকে কোনোকিছু পুনর্বার পরিবর্তন করে কখনই আনতেন না বাবা। সুরাং সমঝোতাটা মায়েদের মধ্যেই হত এবং নামাজফেরত মায়েদের গায়ে নতুন কাপড় দেখতে পেতাম।
ইদের পিঠাপুলির জন্য মায়েদের প্রস্তুতি শুরু হতো মাসখানেক আগে থেকে। ঘাইল-ছিয়ায় কুটে চালের গুড়ো করা হতো, দলবেঁধে প্রতিবেশী কিশোরীরা আথবা আত্মীয়-কুটুম্বরা আসত সাহায্য করতে। ইদের দিনে ভোরবেলার গোসল ছিল একটি অত্যাশ্যকীয় বিষয়। সমবয়সী সবাই প্রায় সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই ইদের দিনের গোসল সেরে নিতাম। শীতের দিন হলে খড়ের আগুন পোহান ছিল পরমানন্দের। আরেকটি বাড়তি আনন্দের বিষয় ছিল নামাজের পর বাড়ি-বাড়ি বেড়ানো। ইদের দিন ঘরের মেঝেতে পাটি বিছিয়ে সকাল সকাল পিঠপুলি সেমাই দেওয়া হতো সকলকে। বাড়ির ছেলেবুড়ো এবং কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে বসতেন বাবা।
কিন্তু এসব ছাড়িয়ে অন্য একটি উপলক্ষ্য আমাদের ছোটবেলার ইদে প্রায় অপরিহার্য ছিল। আমাদের পাশের ঘরগুলো ছিল কয়েকজন হিন্দু নর-নারীর। বলা চলে আমরা বহু বছর পরস্পর প্রতিবেশী ছিলাম। আমার বয়স যখন সাত কি আট, তখন পাশের গ্রামের ললিতকাকার বাড়ি কিনে বসবাস শুরু করি আমরা। ললিতকাকা তো ইন্ডিয়াতে চলে যান কিন্তু বাড়ির অপর অংশে থেকে যান তিনটি পরিবার। এই পরিবারগুলোর কর্তাদের ছিল ভড়রাম নমশুদ্র, যামিনীরাম নমশুদ্র আর দেবন্দ্ররাম নমশুদ্র, তাদেরকে প্রত্যেকের নামের শেষে ‘দা’ যুক্ত করে আমরা ডাকতাম ‘যামিনীদ্দা, দেবেন্দ্রদ্দা’ বলে। সত্যি বলতে কি আমরা এ ধরনের নাম-ধাম-ধর্মের সঙ্গে ইতোপূর্বে পরিচিত ছিলাম না। কিন্তু ক্রমেই সামাজিক যোগাযোগ এতোটা নিবিড় হয়ে উঠে আমাদের যে প্রায় ত্রিশ বছর পর্যন্ত তারা এ বাড়িতেই বসবাস করেন এবং আমরা প্রায় একউঠোন ভাগাভাগি করে বড় হয়েছি এ সময়ে। তো ইদের দিনে তাদের বিশেষ নেমতন্ত থাকত, সবার জন্য থাকত পিঠাপুলি সেমাই আর বাজার হতে আনানো হতো জিলাপি। কিন্তু ইন্দিরাদি আসতেন প্রায় ছ’মাইল দূরে অবস্থিত স্বামীর বাড়ি হতে। তিনি তার স্বামী সন্তানকে নিয়ে আসতেন আগের দিন, এসে প্রথমে পুকুরের পূর্বপারে বসে অনেকক্ষণ তার স্বর্গীয় মা-বাবার জন্য কান্না করতেন। তারপর বাড়ি এসে আমার মা-বাবাকে প্রণাম করতেন। পা-ছুঁয়ে সালাম করার মুসলমানীয় কায়দা তিনি রপ্ত করে নিয়েছিলেন। মা-বাবাকে সালামের পর ‘ওরে আমার ভাইরে’ বলে আমাকে প্রায় কোলে তুলে নিতেন। তিনি দেখতে একাঙ্গী আর শ্যামলা ছিলেন, তার দাঁত ছিল মুক্তোর মতো ঝকঝকে; বয়স ছিল প্রায় আমার মায়ের মতো। তিনি কাঁচাপাকা নানা সাইজের নারিকেল নিয়ে আসতেন আর এমন সব পিঠাপুলি নিয়ে আসতেন যা আমাদের ঘরে তৈরি হতো না। ইন্দিরাদির জন্য আমরা সকলে অপেক্ষা করতাম। তিনি দিনকয়েক স্বামী-পুত্রকে নিয়ে তার জ্যাঠামশায়ের ঘরে থাকতেন। এসময়ে তাদের আপ্যায়ন করাতেন বাবা, চাল-ডাল ইত্যাদির খরচ দিয়ে দিতেন একসঙ্গে। ফিরে যাওয়ার সময় যথারীতি ইন্দিরাদিকে ‘নাইওরি বিদায়’ দিতেন বাবা-মা। পাশের গ্রাম থেকে অনেক হিন্দু অতিথিও আসতেন ইদের দিনে। বড় হতে হতে আমার অনেক সহপাঠী ইদেপর্বে বা এমনিতে আমাদের বাড়িতে আসে। বিশেষ করে মাকে ইদের প্রণাম করতে আসত আমার বন্ধুরা। এদের সকলের আমার যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায় নি, শুধু ইন্দিরাদিই লোকজীবন সাঙ্গ করেছেন। ইদ কিংবা পূজো এলে তাকে খুব মনে পড়ে। বড় হতে হতে দেখতে পাচ্ছি ইদ ক্রমশ হ্রস্বতর হচ্ছে, মাসিপিসির হাতের বদলে পিঠাপুলিতেও লেগেছে বেনিয়াদের থাবা। এখন অনলাইন জীবনপ্রণালীই যেনো সকল দায়-দেনা মেটায়- মমতাকেও সে তার মতো ব্যাখ্যা করে।

 

লেখক পরিচিতি :

কবি, গবেষক, প্রাবন্ধিক মোহাম্মদ বিলাল বৃহত্তর সিলেট জেলার সন্তান।                                                                                              সিলেটের সমাজ, সংস্কৃতি ও সাময়িকীর ইতিহাস নিয়ে নিত্য লিখে যাচ্ছেন তিনি।                                                                                প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষকতার দায়িত্ব                                                                    পালনের পাশাপাশি কলেজ থেকে একাডেমিক গবেষণা পত্রিকা প্রকাশের সাথেও যুক্ত আছেন।

 

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

ঢাংমারি’র বামনি পার্বণ | ইমরান উজ-জামান

Thu May 13 , 2021
ঢাংমারি’র বামনি পার্বণ | ইমরান উজ-জামান 🌱 মংলা থেকে ট্রলারে পশুর নদী পার হয়ে মোটর সাইকেলে চেপে বসলাম, উদ্যেশ্য ঢাংমারী। যেতে, নদীর পার ঘেষে রাস্তা, আর রাস্তার পার ঘেষে সারি সারি ঘর। গোলপাতার ছাউনি, প্রায় ঘরের ভিটি নতুন করা হয়েছে। রাস্তাও জায়গায় জায়গায় নতুন মাটি দিয়ে ভরাট করা। কোন কোন […]
Shares