ঢাংমারি’র বামনি পার্বণ | ইমরান উজ-জামান

ঢাংমারি’র বামনি পার্বণ | ইমরান উজ-জামান

🌱

মংলা থেকে ট্রলারে পশুর নদী পার হয়ে মোটর সাইকেলে চেপে বসলাম, উদ্যেশ্য ঢাংমারী। যেতে, নদীর পার ঘেষে রাস্তা, আর রাস্তার পার ঘেষে সারি সারি ঘর। গোলপাতার ছাউনি, প্রায় ঘরের ভিটি নতুন করা হয়েছে। রাস্তাও জায়গায় জায়গায় নতুন মাটি দিয়ে ভরাট করা। কোন কোন ঘরের কংকাল দাড়িয়ে, এখনো ছাউনি দেয়া হয়নি। মোটরসাইকেল চালকের সঙ্গে কথা হচ্ছে, নাম সোহেল। সোহেল জানালেন, এটা গনিকা পল্লি। সিডরে সব নিয়ে গেছে, নতুন করে গড়ে উঠছে আবার পল্লির স্থাপনা। ঘরের ফোকর, বেড়ার পাশ, দোকান নানা জায়গা থেকে আটুনি দেহের মেয়ে-মহিলারা নানা অঙ্গ-ভঙ্গিও মাধ্যমে ইঙ্গিত করছেন। ক্ষনিকের নাগর পাওয়ার আশায়। সস্তা পাউডার মাখা মুখ আর লিপস্টিক মাখা ঠোট, কেমন যেনো প্রাগৌতিহাসিক যুগের মানুষের মতো লাগছে মানুষগুলোকে। কোন কোন মুখের দিকে তাকানো যায় না। কেমন যেনো জগতের সকল কষ্ট বুকে ধরে যেনো নির্বাক হয়ে আছে। ভাবছি, দু-দন্ড আলাপ করতে পারলে হতো।
সোহেল যেনো আমার মনের কথা পড়তে পারলেন। বললেন, ভাই মোটর সাইকেল থামাবো? দোকানে বসবেন একটু?
আমি বলি, হে হে রাখো, এই দোকানটার কাছেই।
দোকানের সামনে রাখা বেি তে বসে, দোকানদারকে চা বানাতে বললাম, নাম রেশমি। রেশমির সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিলাম। এই দোকানে একাধারে তার বেচা-বিক্রী এবং ব্যবসায়িক অফিস। অর্থ্যাৎ তিনি নিজে, আরো ৪জন গনিকা আছেন তার গনিকা নিবাসে। একটা ছবির এ্যালবাম ঠেলে দিলেন, ছবি দেখার জন্য। আপনি বললেন, আপনার চারজন সদস্য, এখানে তো অনেক জনের ছবি? বললেন, বাকীগুলো আমার আশপাশের ঘরের। যেটা চান দেয়া যাইবো। বলেই, রেশমা সোজা চোখের দিকে তাকালেন।
এতোক্ষণ খুব খেয়াল করে দেখিনি, চোখে চোখ পড়তেই আমি ভয় পেয়ে গেলাম। মধ্য বয়স্ক হলেও, ভয়ংকর সুন্দর চেহারা রেশমার। মনে হলো রেশমা আমার মনের অবস্থা পরে ফেললেন। একটু মুচকি হেসে বললেন, আপনেরা সাংবাদিক, বুঝতে পারছি। আপনে কামের জন্য আসেন নাই।
কি আর কমু ভাই গো। মার কাছে শুনছি, এই বানিসান্তা পল্লী বিদেশীদের আনন্দ নগরী ছিলো। দেশী কাস্টমাররা এখানে আসতে সাহস পাইতো না, খরচের কথা চিন্তা কইরা। সেই পল্লীর মেয়েরা এখন না খেয়ে থাকে। সবই উপর ওয়ালার ই”্ছা, বলে দীর্ঘস্বাস ছাড়লেন রেশমা।
তিনি বলে চলেছেন, মার কাছে হুনছি, হেই দেশ বিভাগের পর পর মংলা নদী বন্দর গড়ে উঠলে। নদীর ঐ পারে কুমারখালী খালের উত্তর পাশে ছিলো এই পল্লী। পরে আমাগো লোক সংখ্যা বেশি হইলে, এখানে চলে আসে। পশুর নদীর চ্যানেল গেছে নষ্ট হইেয়া। বিদেশী কাস্টমার আর আসে না, তবুও আমরা কোন রকমে ভালোই ছিলাম। এই আইলায় সব শেষ কইরা দিয়া গেছে। আবার নতুন কইরা সব গড়ার চেষ্টা করতাছি আমরা। একটু লিখ্খা দিয়েন।
রেশমার জন্য এই লেখা ছারা আর কি করতে পারি আমি। মনের গহীনে একটা কষ্ট চেপে বসে। আর গল্প করা যায় না। বিকাল হয়ে আসলো, ঢাংমারি পৌছতে হবে। যাবো বাউনি পার্বণে।
বানিসান্তা পার হয়ে ঢাংমারি খালের মুখে সোহেল নামিয়ে দিলো। নদী পার হয়ে যেতে হবে ঢাংমারি। নৌকা পার হয়ে অটো পাওয়া গেলো। ঢাংমারি গ্রামের প্রথমেই আছে বাজার। বাজারেই উৎপলদার দোকান। উৎপলদার মেহমান আমি।
গ্রামের প্রবেশ পথে ডেকোরেটরের গেট সাজানো। ছেলে-মেয়ে-বুড়ো সকলের পড়নেই নতুন পোষাক। চারদিকে সাজ সাজ রব। একটা বিষয় দেখে আশ্চর্য হলাম, প্রতিটা বাড়ির সামনে-পিছনে অথবা পাশে কোন কোন জায়গায় লাঠি পুতে তার মধ্যে রঙিন কাগজে সাজানো হয়েছে। জানলাম এগুলো কবর। মকরসংক্রান্তিতে মৃতের মঙ্গল কামনায় সাজানো হয়েছে কবরগুলো।
স্থানীয়রা বাউনি পুজাকে ‘বামনি’ ও ‘বাস্তু পুজা’ বলে থাকে। প্রতিটি বাড়ি গরুর গোবর দিয়ে লেপা হয়েছে। কাজেই বাড়িগুলোকে পরিচ্ছন্ন-ছিমছাম লাগছে খুব। প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙ্গিনায় মারাইয়ের জন্য রাখা ধানের স্তুপের পাশে, সাজানো হয়েছে। একটা ঘটে পানিতে ফুল, মাটির পিদিম, আমের প পল্লব, বিভিন্ন রকমের ধান এক মুঠো করে রেখে, চালের গুড়ার রং দিয়ে নকশা বেড়া দেওয়া হয়েছে। সেই সাথে বাড়ির এক পাশে অথবা আঙ্গিণায় থাকা স্থায়ী শষ্যের গোলার সামনে চালের গুড়ার রং দিয়ে আলপনা এবং বিভিন্ন ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। কেউ কেউ মুষ্টিবদ্ধ হাতের তালু দিয়ে পায়ের আকৃতি একে, বাড়ির ঘাট থেকে ঘরের দরজা পর্যন্ত একে লক্ষীর আগমন নিশ্চিত করেছেন। কেউবা আবার উঠানের মধ্যখানে গোলাকৃতি পদচিহ্ন একে লক্ষীর নৃত্যরত পায়ের ছাপ ফুটিয়ে তুলেছেন। বাড়ির পিড়া ও গোলপাতার চালেও চালের গুড়ার রং দিয়ে সাজানো হয়েছে। অসাধারন এবং নিজস্ব শিল্পরীতির সেই সব নকশা। প্রতিটি বাড়িতেই এই আলপনা তৈরির কাজ সম্পন্ন।
নারীরা সাবধান করলেন, এই পুজা খুবই গরম। কোন রকমের বেয়াদবি করা যাবে না। তাহলে মহামায়া রুষ্ট হবেন, আর মা রুষ্ট হলে রক্ষা নেই। তারা পুজার তিনদিন উপোস দেন। ফল-মূল খেয়ে থাকেন। কারন, মায়ের রুষ্ট হওয়ার ভয়ে এই সময়ে মাটিতে আগুন জ্বালানো যায় না।
বাড়িতে বাড়িতে চলছে পিঠা তৈরির কাজ, শেষ হয়েছে আগেই। বাড়িতে প্রবেশ করলেই পিঠা খেতে হয়। জানলাম উপোস থাকার আগে তিনদিন ধরে চলেছে পিঠা তৈরির উৎসব।
সংক্রান্তির দিনে সকালে পিঠা-পুলি, পায়েস, দই-চিড়া, তিলু-কদমা আর নকুল-বাতাসার পাশাপাশি বিভিন্ন ফলমূলের আয়োজন ছিলো সকল বাড়িতে। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধরাও আত্মীয়সহ প্রতিবেশীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে পিঠা-পুলি খেয়েছে।
উত্তর পাড়ার গ্রামের মাথায় অশ্বথ গাছের তলে বসেছে অস্থায়ী পুজামন্ডপ। নারীরা ক্ষনে ক্ষনে উলুধ্বনি দিচ্ছেন। পুরোহীতের মন্ত্র আর ধুপের ধোঁয়ায় এক পরাজাগতিক অবস্থা বিরাজ করছে। মন্ডপের পাশেই সাজানো হয়েছে অস্থায়ী কীর্ত্তন ম , মে বাগেরহাটের রাজলক্ষী সম্প্রদায়ের পল্লবি রাজলক্ষী কীর্তন করছেন। খোলা মাঠে বসেছে মেলা। সন্ধ্যায় শেষ হবে এই আয়োজন।
প্রবীন প্রাইমারী মাস্টার নিহারঞ্জন পালের কাছে জানা গেলো এই পৌষ সংক্রান্তি নিয়ে।
আজ থেকে প্রায় সোয়া’শ বছর আগে কথা। ঢাংমারিতে প্রতিবছর মহামারি কলেরার প্রকৌপ দেখা দিত। কোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা না থাকায় মহামারিতে প্রচুর মানুষ মারা যেতো। এই রোগের কোন ঔষধ ছিলো না, কাজেই একবার রোগ দেখা দিলে, মানুষের মৃত্যুর মিছিল বসে যেতো। এমনই এক সময়ে, এই গ্রামের পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন এক মুনিঋষি। অনেকে মনে করেন তিনি ছিলেন বীর গাজী।
মুনিঋষি এই বালাই এর কারন জানালেন। এবং পুজা দিতে বললেন। মুনিঋষির কথামতো গ্রামের মানুষ পুজা দেওয়া শুরু করলো। সেই শুরু এখনো চলছে মহা ধুমধামে বামনি পুজা। মানুষ মনে করে তার পর থেকে এই এলাকায় আর কলেরার প্রকোপ দেখা দেয়নি।
তবে দেশের অন্য অ লে এবং এশিয়ায় বাউনি, বামনি নানা নামে এই পৌষের শেষে পালিত হয় শষ্যেৎসব। এই উৎসবকে কোথাও ‘আউনি বাউনি’ আবার কোথাও ‘আগলওয়া’ বলা হয়। ক্ষেতের পাকা ধান প্রথম ঘরে তোলা উপলক্ষে কৃষক পরিবারে বাউনি পালন করে। অন্য এলাকায় ধানের শিষ, মুলার ফুল, সরষে-ফুল, আমপাতা ইত্যাদি গেঁথে ‘আউনি বাউনি’ তৈরি করা হয়। এই আউনি বাউনি ধানের গোলা, ঢেঁকি, বাক্স- পেটরা-তোরঙ্গ ইত্যাদির উপর এবং খড়ের চালে গুঁজে দেওয়া হয়। এতে করে তাদের খাদ্য কেন্দ্রিক এই উপসঙ্গগুলোতে লক্ষী বর করবে বলে তারা মনে করেন।
সংক্রান্তি বিষয়ে একটু বলতে হয়-
দুই অয়নে এক বছর হয়। পনের দিন-রাতে এক পক্ষ, দুই পক্ষে এক মাস, ছয় মাসে এক অয়ন আর দুই অয়নে এক বছর হয়। মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় এই ছয় মাস উত্তরায়ন কাল এবং শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ ও পৌষ এই ছয় মাস দক্ষিণায়ন কাল। সেজন্য আষাঢ়ের সংক্রান্তিতে দক্ষিণায়ণ এবং পৌষ সংক্রান্তিতে উত্তরায়ণ শুরু হয়। যে সময় অয়ন ভেদে সূর্যেরও দিক পরিবর্তন হয়। উত্তরায়ণে সূর্য দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে স ারিত হয়।
সংক্রান্তি অর্থ স ার বা গমন করা। সূর্যাদির এক রাশি হতে অন্য রাশিতে স ার বা গমন করাকে সংক্রান্তি বলা হয়। বাংলা পঞ্জিকা মতে প্রতি মাসের শেষ দিন সংক্রান্তি। পৌষ মাসের শেষ দিন পৌষসংক্রান্তি। পৌষসংক্রান্তি মূলত নতুন ফসলের উৎসব এই দিনটি ‘পৌষ পার্বণ’ নামে উদযাপিত হয়। পৌষসংক্রান্তি বা মকরসংক্রান্তি নতুন ফসলের উৎসব ছাড়াও এই অ লের সংস্কৃতিতে ‘উত্তরায়ণের সূচনা’ হিসেবে পরিচিত। একে অশুভ সময়ের শেষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পুরানে বলে,
সেকালে ধানই ছিল ধন।
ধানের দেবী আর ধনের দেবী ছিল অভিন্ন;
ধান্যলক্ষ্মীই ছিল ধনলক্ষ্মী।
সংক্রান্তি বা মকরসংক্রান্তি একটা ফসলী উৎসব, যা শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় পালিত হয়। অ লবেদে নানান বৈশিষ্ট্য এবং মেয়াদও আলাদা। কোথাও চারদিন পর্যন্ত উৎসব চলে। বাংলায় পৌষ সংক্রান্তি, তামিলনাড়ুতে পোঙ্গল, গুজরাতে উত্তরায়ণ, আসামে ভোগালি বিহু, কর্নাটকে মকর সংক্রমণ, কাশ্মীরে শায়েন-ক্রাত—। এমন নানা নামে এই একই উৎসব পালন করা হয়।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

একটি আখ্যানের আখ্যান | রাজা সরকার

Thu May 13 , 2021
একটি আখ্যানের আখ্যান |রাজা সরকার 🌱 সন কত হবে! ১৯৯১-৯২! স্থান শিলিগুড়ি।  স্ব-আরোপিত বিচ্ছিন্নতার একটি ব্যক্তিগত সময় চলছিল তখন।  লেখালেখির আড্ডা, পত্রিকা ও লেখকবন্ধুসহ সকল উন্মাদনা এড়িয়ে চলছিলাম। ডিপ্রেশন কিনা বুঝতে পারিনি। হতেও পারে।  এর পেছনের কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছিল কি না এখন আর মনে নেই।  বাড়ি আর অফিসের মধ্যেই […]
Shares