একটি আখ্যানের আখ্যান | রাজা সরকার

একটি আখ্যানের আখ্যান |রাজা সরকার

🌱

সন কত হবে! ১৯৯১-৯২! স্থান শিলিগুড়ি। 

স্ব-আরোপিত বিচ্ছিন্নতার একটি ব্যক্তিগত সময় চলছিল তখন।  লেখালেখির আড্ডা, পত্রিকা ও লেখকবন্ধুসহ সকল উন্মাদনা এড়িয়ে চলছিলাম। ডিপ্রেশন কিনা বুঝতে পারিনি। হতেও পারে।  এর পেছনের কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছিল কি না এখন আর মনে নেই।  বাড়ি আর অফিসের মধ্যেই এই এক প্রকার সীমাবদ্ধ করে  নিয়েছিলাম নিজেকে। অবসর সময়ে লেখার খাতা বই এসবের থেকে দূরেই থাকি। মাঝে মধ্যে আড় চোখে টেবিলের দিকে তাকাই। তাও ক্ষণিকের জন্য। রাতের দিকে টেপরেকর্ডারে প্রতিমা বড়ুয়ার গোয়ালপাড়িয়া শুনি। ঘন ঘন সিগারেট খাই। 

এই সময়েই আমার হঠাৎ বাগান করার শখ হয়। আমার ছোট্ট ছাদে ধীরে ধীরে গড়ে উঠে বাগান। বেশ নেশার মত। যেখানে যা পাই তুলে আনি। সাধ্যমত পরিচর্যা করি। অনেকেই তাতে উৎসাহ দেয়। যেন কুসঙ্গ করার চেয়ে এটা মন্দের ভালো। লেখালেখির আড্ডা, পত্রিকা ও লেখকবন্ধু, এসব তখন কোনো কোনো মানবগোষ্ঠীর  কাছে  নেহাতই কুসঙ্গ। অথচ আমার মাথা গিজ গিজ করে নানা  চিন্তায়। সব চিন্তা টবের চারা গাছে ছড়িয়ে দিতে পারি না। উদাস লাগে।

আমার শিলিগুড়ির বাসস্থানটা ছিল শহরের একদম পূর্বপ্রান্তে।  আমাদের সেই প্রান্তসীমার পর কিছুটা দূর থেকেই শুরু হয়েছে শালবন। চলতি কথায় ফরেস্ট। আর তার লাগোয়া তৈরি হচ্ছে  শিলিগুড়ির ইস্টার্ন বাইপাস। সেখানে খোলা জায়গায় হাঁটতে যাই  ছুটির দিনে। তেমনই  এক বৈকালিক ভ্রমণকালে হঠাৎ চিন্তা  এলো  উপন্যাস লেখার। তারাশঙ্করের কোনো এক নিবন্ধে বোধহয়  পড়েছিলাম এমন কথা যে, উপন্যাস লিখতে গেলে লেখকের চল্লিশ বছর বয়সের সীমা অতিক্রম করা  প্রয়োজন। কেন বলেছিলেন?  আমি ধরে নিলাম যে জীবনকে দেখা এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করার জন্য হয়তো এরকম বয়সের কথা বলেছিলেন। তবে অবশ্যই এটা একটা কথার কথা। কারণ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তিরিশ থেকে চল্লিশ বছর বয়সকালেই তাঁর বিখ্যাত  উপন্যাসগুলো লিখে ফেলেছিলেন। তারমধ্যে আমার সবচাইতে প্রিয় উপন্যাস দিবা রাত্রির কাব্য লিখেছিলেন মাত্র সাতাশ বছর বয়সে।

যাই হোক ওইসময় আমার বয়সও চল্লিশের কোঠায়। সুতরাং উপন্যাস লেখার জন্য আমি অন্তত বয়সের যোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছি। মেধা বা অভিজ্ঞতার পরীক্ষা তো আর দিতে হচ্ছে না। সেদিন বাড়ি ফেরার সময় একটা লম্বা রুল টানা এক্সারসাইজ খাতা কিনে বাড়ি ফিরলাম। লিখি কবিতা। এখন লিখব উপন্যাস। নিজেই নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছি না। লেখালেখির শুরুতে কিছু গল্প লিখেছিলাম বটে। তবে উপন্যাস! আমাদের দেশে গল্প কবিতা উপন্যাস লেখার কোনো সহায়ক গ্রন্থ আছে  কিনা জানা নেই। তবে এটা জানা আছে যে লিখতে লিখতে যতটুকু যা হওয়ার হয়। তার মধ্যে যারা প্রতিভাবান তারা বিখ্যাত হন। আমার যেহেতু বিখ্যাত হওয়ার হ্যাপা নেই তাই আমি নিশঙ্ক চিত্তে শুরু করে দিলাম ।  

দেখতে দেখতে আমার  উপন্যাস লেখা শুরু হয়ে গেল। শুরুতে কিছু কাটাকাটি থাকলেও ধীরে ধীরে উপন্যাস তার রাস্তা ধরে হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগুতে লাগলো। লেখা মসৃণ না হলেও  চলতে লাগল। টের পেলাম লেখা চলতে শুরু করলে ক্রমে লেখা নিজেই একটা গতি লাভ করে ফেলে। তবু মাস দেড়েক লাগলো লেখাটি  শেষ করতে। গোটা দুই এক্সারসাইজ খাতা লাগলো শেষ করতে। উপন্যাসে চরিত্রের সংখ্যা খুব কম নয়। নায়কের নাম সুবোধ। নায়িকার নাম জাহানারা। এছাড়াও একটি বিশেষ চরিত্র ঊর্মিলা। এই চরিত্রগুলো লেখাবন্দী হওয়ার আগে পর্যন্ত কাল্পনিক ছিল।   কিন্তু লেখাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর তারা বেশ জীবন্ত হতে শুরু করে। আশ্চর্যের ব্যাপার আমি এদের যেন বাস্তবে মাঝে মাঝে দেখি। কথা বলি না ভয়ে। যদি চিনতে না পারে। এতে  বোঝা গেল যে আমি উপন্যাসের চরিত্রগুলোর সঙ্গে বেশ একাত্ম হয়ে পড়েছি।

কল্পনা বা কাল্পনিক কথাগুলো তখনই মনে হলো অবাস্তব কিছু  নয়। আসলে আরো মনে হলো যে অবাস্তব বলে আদৌ কিছু হয় না।  বা অবাস্তব  বলে যা হয় তা আসলে বাস্তবেরই কোনো এক রূপ।  এই সব চরিত্রগুলো হয়তো আমার চেতনার কোনো স্তরে জন্ম নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। উপন্যাসের সূত্রে তারা শুধু বেরিয়ে এসেছে মাত্র। যাকগে উপন্যাসের তত্ত্ব কথায় যাব না। মোট কথা আমার উপন্যাস লেখা হয়ে গেল। নাম একটা দিলাম। পছন্দ হলো না। রেখে দিলাম থাক পরে বদলানো যাবে। এবার এটা কাউকে পড়ে শোনাতে হবে। কাকে শোনাই! আমিতো স্বেচ্ছা নির্বাসনে আছি। শোনালে তো লেখক বন্ধুদেরই প্রথম শোনাতে হয়। তারা ভালো বললে পরবর্তী ধাপে এগোনো যায়। আর তারা বাতিল করে দিলে প্রোজেক্ট পরিত্যক্তও হতে পারে। 

এমতাবস্থায় আমার স্বেচ্ছা নির্বাসন একদিন উঠে গেল। উঠে  যাওয়ারই কথা। টানা দু আড়াই মাস নির্বাসন আমার মত সামান্য মানুষের পক্ষে বেশ বেশিই হয়ে যায়। আমাদের পত্রিকাটি আবার প্রকাশ হবে। এই উপলক্ষে বন্ধুরা একদিন বাড়ি এসে আমাকে  বলতে গেলে টেনে বের করে নিয়ে গেল আড্ডায়। আড্ডায় গিয়ে ডোবার মাছ নদীতে পড়ার মত অবস্থা আমার। তুমুল কথাবার্তা হৈ চৈ যা আমাদের স্বভাব  ,তা আবার চলতে লাগল। তারমধ্যে এক ফাঁকে আমার উপন্যাসের কথা বলে ফেললাম। আশানুরূপ  সাড়া পাওয়া গেল না। আসলে আমরা তখন মূলত প্রথাবিরোধী কবিতা ও গদ্য (গল্প নয়) এসবেরই চর্চা করি । সেখানে একটা উপন্যাস—আচ্ছা ঠিক আছে—একদিন শোনা যাবে—এই পর্যন্তই।

 

তো একদিন চেষ্টা করে সেই উপন্যাস পাঠের বন্দোবস্ত করা গেল। আমি কাঁধের ব্যাগে সেই উপন্যাস ঢুকিয়ে নিয়ে অকুস্থলে  পৌঁছে  গেলাম। একসময় পড়াও শুরু করলাম। কিন্তু চার পাঁচ পাতা পড়ার পর কথাবার্তা এমন মোড় নিলো যে উপন্যাস পাঠের চেয়ে আমাদের আলোচনা অধিক জরুরি হয়ে পড়লো। পড়া আর হলো না।  উপন্যাস আবার আমার কাঁধের ব্যাগে করে বাড়ি ফিরে এলো। এরপর বছর দুয়েক কেটে যায়। প্রোগ্রাম হলো আমরা লেখক কবিরা পিকনিকে যাবো পাহাড়ের  পাদদেশে দুধিয়া নামক স্থানে। ঠিক হয় ওখানে সেই উপন্যাস পাঠ হবে। কাঁধের ব্যাগে করে উপন্যাস দুধিয়া গেল। পিকনিক  স্বভাবতই উত্তাল স্বভাবের হয়ে থাকে । সেখানে মোটে সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না উপন্যাস পড়ার। উপন্যাস পড়ার জন্য তো এক জায়গায় বসতে হবে। পিকনিকে এসে বিবিধ দ্রব্যগুণে যুবকেরা  সকলেই খুব চঞ্চল বালকে পরিণত হয়ে যায়। একসময় সবাইকে কোনোমতে টেনেটুনে এক জায়গায় করে আমি একটা চেষ্টা চালালাম উপন্যাস পাঠের। পাহাড়ি তন্বী নদীর পাশে বড় বড় পাথরের উপর বসে সেই পাঠকর্ম সম্পন্ন হবে। কিন্তু এবারও  কয়েকপাতার বেশি এগোনো যায়নি। কোনো একজন  শ্রোতাবন্ধু আপন খেয়ালে সেই নদীজলে হঠাৎ প্রপাতিত হওয়াতে  আসর ভঙ্গ হয়ে  গেল। আশু কর্তব্য হিসেবে  পতিত উদ্ধারে সকলে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। উপন্যাস পাঠ শোনার দায় থেকে সকলে মুক্তি পেল। আবার উপন্যাস আমার ব্যাগে ঢুকে গেল। এবার যেন উপন্যাসের নায়ক সুবোধ বলে উঠলো— বারবার এগুলো কী করছআমাদের কষ্ট হয় না ? 

বুঝলাম সুবোধ কষ্ট পাচ্ছে। আমিও আর এরপর এমত চেষ্টা  করিনি। অপঠিত উপন্যাস আমার বইপত্রের ভাঁজে গিয়ে মুখ লুকলো। আমি নিশ্চিন্ত হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলাম। উপন্যাসের স্মৃতি আমার কাছে ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে এলো।

 

১৯৯৮ সন। আমি শিলিগুড়ি থেকে পাততাড়ি গোটালাম। চললাম কলকাতা। ছেড়ে গেলাম আমার তখন পর্যন্ত একমাত্র উপন্যাসের  জন্মভূমি। যেদিন আমার গৃহস্থালি জিনিসপত্রের সঙ্গে আমার বইপত্র ট্রাকে বোঝাই হচ্ছে সেদিন আমার অজান্তেই আমার উপন্যাসও ট্রাকে  উঠে পড়েছিল। অথচ সেদিন ঘর জুড়ে পুরনো চিঠিপত্র আর কাগজপত্রের স্তূপ জমে পড়েছিল। স্থান সংকুলানের ভয়ে অনেক  জিনিস ফেলে আসতে হলো। আশংকা ছিল জরুরি কিছু ফেলে  যাচ্ছিনা তো! বেশি ভাবার সময় নেই। আমার মাথায় তখন  গৃহস্থালির সব কিছু ঠিকঠাক তুলে নিয়ে গিয়ে কলকাতার ভাড়া  বাড়িতে নিরাপদে পৌঁছানো। 

কিন্তু কেন হঠাৎ এই কলকাতা যাওয়া? চারপাশে বিরাট প্রশ্ন। নিজের ছোট্ট বাড়ি, ছোট সংসার। কাছাকাছি অফিস। এসব ফেলে মানুষটা কই যায়? কী কারণে যায়? সব প্রশ্নের উত্তর দেয়া যায় না। কিন্তু অনেকসময় দিতে হয়। যেমন মেয়ে কলকাতার কলেজে পড়বে বলে যাওয়া। এই উত্তরে কমবেশি সকলেই অসন্তুষ্ট। এটা কি একটা কথা—কেন–মেয়ে কি এখানে শিলিগুড়ি কলেজে পড়তে  পারে না? পারবে না কেন, পারবে। আমার ইচ্ছা, মেয়ের ইচ্ছা, মেয়ের মায়ের ইচ্ছা মেয়ে কলকাতায় গিয়ে পড়বে। মেয়ে কলকাতা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে—কী নিয়ে পড়বে—না বাংলা। এটা শুনে বাঙালি স্বজনেরা প্রায় স্তব্ধ। বাংলা ! বাংলা ! বাংলা নিয়ে পড়ার জন্য পড়ার জন্য কেউ ঘরবাড়ি ছেড়ে যায়! বাঙালি জীবনে তুচ্ছ  কারণে ঘরবাড়ি ফেলে চলে যাওয়াটা নাকি অশুভ বলে বিধান দেওয়া আছে। এই সুযোগে আমাকে মাথাখারাপ বলেও কেউ কেউ সাব্যস্ত করলো। থাক—আমার জনসমর্থন কোনো কালেই তেমন ছিল  না,এখনও নেই । এই ধরে নিয়ে আমি কলকাতার গাড়িতে উঠে পড়লাম।  

 

কলকাতার বাড়িতে এসে ঘর গুছিয়ে বসার পর অনেক ফেলে আসা জিনিসের কথাই মনে পড়লো। বইপত্র গোছানোর সময়  মনে পড়লো উপন্যাসের কথা। হায় সুবোধ তোকে ফেলে আসিনি তো! শুরু হলো বইপত্র তোলপাড় করে খোঁজা। একসময় পেয়ে গেলাম। মুখের ঘাম মুছে চেয়ে দেখলাম সুবোধ মিটি মিটি হাসছে। যাক আমরা কেউ কাউকে ছাড়িনি। যত্ন করে রেখে দিলাম উপন্যাস।

কলকাতা খুব অচেনা না হলেও বসবাস চাকরি অফিস এসব নিয়ে প্রথম প্রথম চেনা অচেনার একটা গোলক ধাঁধাঁ পার হতে হয়েছে। সড়গড় হতে সময় লাগে নি। লেখালেখির বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে এতদিন চিঠিপত্রের যোগাযোগ ছিল। এবার মুখোমুখি যোগাযোগও স্থাপিত হলো। ধীরে ধীরে কলকাতা আমার কাছে আর খুব অনধিগম্য মনে হলো না। ধীরে ধীরে থিতু হতে হতে একসময় দেখলাম উপন্যাস আবার ফিরে এলো চিন্তায়। নিরাবয়ব সুবোধ দেখি সঙ্গ দেয়। ২০০১-০২ নাগাদ একদিন এক বন্ধুকে উপন্যাসটির কথা বললাম। বলল—নিয়ে আয় একদিন। নিয়ে গেলাম। বন্ধু খাতা দুটো বাড়ি নিয়ে গেল। সপ্তাহখানেক পর বলল অমুক পত্রিকায় ছাপতে দিচ্ছি। আমি তো অবাক। আহ্লাদে আটখানা। যাক,  সুবোধের তাহলে একটা গতি হলো! তখন লেটার প্রেসের  যুগ। খবর পাই কম্পোজ হচ্ছে। দেখতে দেখতে একদিন কম্পোজ শেষ হলো। বন্ধু  বলল—ফার্স্ট প্রুফ দেখা হচ্ছে। কদিন পরে বলল—সম্পাদক বলছে তোর বানান  বা ভাষায় বেশ গোলমাল আছে। একদিন সে সেই প্রুফ কপি আমাকে দেখালো।  আঞ্চলিক বাংলায় লেখা ডায়লগগুলো সব কেটে মান্য বাংলা করে দিয়েছে। আমি তো  স্তম্ভিত। আমার অসন্তোষ টের পেয়ে বন্ধু বলল—চিন্তা নেই, আমি প্রুফ দেখে দিচ্ছি। অনেক পরিশ্রম করে বন্ধু প্রুফ দেখলো। কিন্তু এবার সম্পাদকের আবদার এই উপন্যাস ছাপাতে হলে টাকা দিতে হবে। কথাটা শুনে আমি শুধু অবাক হইনি ক্রুদ্ধও হয়েছি বেশ। বন্ধুকে বললাম—লেখার কপি আর প্রুফটা আমাকে ফেরত দে । আমি ছাপাবো না। ওই পত্রিকা আর সম্পাদকের নাম উহ্য রাখলাম। উপন্যাস আবার আমার ঘরে ফিরে এলো। কিছুদিন বাইরে বাইরে ঘুরে সুবোধ খুব ক্লান্ত ছিল। ঘরে ফিরে বইয়ের রেকে সে আবার আগের মতো ঘুমিয়ে পড়লো।  

আমি আবার ভুলে গেলাম। লেখা আড্ডা দৈনন্দিন কাজে কর্মে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। কলকাতা আসার প্রায় পাঁচ বছরের মাথায়  আমার আবার বাড়ি বদল ঘটছে কলকাতাতেই। আবার নতুন বাড়িতে ঘর গৃহস্থালির সঙ্গে এলো আমার বইপত্রের স্তূপ ও সঙ্গে এলো সময়ের আঁচড়ে জীর্ণ হয়ে আসা আমার উপন্যাসের খাতাও।  নতুন ঠিকানায় এসে সে আবারও ঘুমিয়ে পড়লো। দীর্ঘ ঘুম। কেটে গেল দশ বার বছর। এরমধ্যে আমার কবিতার বই সহ গোটা দুয়েক গদ্য গ্রন্থ  বেরিয়ে গেল। বইয়ের রেকে আমার জীর্ণ উপন্যাস তখনও শুয়ে আছে। সেই কবে ১৯৯১-৯২ এ তার জন্ম। আজও সে মুক্তি পেল না। 

এরমধ্যে বেশ কিছুদিন আগেই কম্পিউটারে বাংলা লেখার চল হয়েছে। আমিও লিখি । একদিন কি মনে করে সেই জীর্ণ উপন্যাস টেনে নিয়ে বসলাম কম্পিউটারে । শুরু করলাম টাইপ করা।  সংশোধন ও পরিমার্জন করা শুরু করলাম। ছাপা হোক বা না হোক   আমি অন্তত তাকে একটা নতুন রূপ দেই। লেখাটি আবার এত বছর পরে আমার মাথায় জায়গা করে নিলো। নাম দিলাম নতুন করে। বর্গমাইলের পদাতিক। এই সময় অফিসের এক বন্ধুকে অফিসে বসেই কথায় কথায় উপন্যাসের গল্পটা সংক্ষেপে  বললাম। বন্ধুটি গল্প শুনে প্রায় লাফিয়ে উঠলো। বলল—বই হিসেবে এটা আর  ছাপবেন না দাদা। পাইরেট হয়ে যাবে। আমি অবাক। বলে কি! আবার বললো, আমি এটা নিয়ে সিনেমা করবো। আমি তো আকাশ  থেকে পড়লাম। পাগল বলে কি !  টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়ায় তার অনেক চেনাশোনা ও যাতায়াত আছে। বারবার সে বলতে লাগলো ছাপাবেন না কিন্তু। ওর ধারণা  উপন্যাস ছাপতে দিলেই ছাপা হয়ে যায়। ওর ধারণা নেই বই বা বইয়ের বাজার প্রসঙ্গে। বোঝাই যাচ্ছিলো অনভিজ্ঞতা আর আবেগের মিশেলে সে এসব কথা বলছে। যাই হোক ওর সঙ্গে দেখা হলেই ঘু্রে ফিরে আসে উপন্যাসের কথা। কোন চরিত্রে কে  কে অভিনয় করবে সে-সব পর্যন্ত সে মনে মনে ঠিক করে ফেলেছে। আমি এক আচ্ছা ফ্যাসাদে  পড়েছি তখন। হায়রে সুবোধ তোকে নিয়ে আমারও বিড়ম্বনার শেষ নেই। এরমধ্যে সে একদিন আহ্বান জানালো যে সিনেমার এক সহ নির্দেশক নাকি স্ক্রিপ্ট শুনতে চেয়েছেন। অবাক হলাম। সত্যি বলছে তো! তার বাড়ির বসার ঘরেই সেই মত ব্যবস্থা হলো। একটা  গোটা উপন্যাস পড়ার মত মনের জোর বা গলার জোর কোনোটাই আমার নেই। তাছাড়া বিষয়টা তখনও আমি বিশ্বাস করতে পারছি  না। তো সেই আয়োজনে আমি এক বন্ধুকে নিয়ে গেলাম যার গলা ভালো এবং ভালো পড়তে পারে। কিন্তু আমার উপন্যাসের ভাগ্য খারাপ। এবারেও পড়ার মধ্যে বাধা পড়তে লাগলো বারে বারে । আয়োজক ও উপস্থিত ভদ্রজনেরা সিকোয়েন্স  নিয়ে নানা আলাপ জুড়ে দিচ্ছেন পাঠ চলাকালীন। একজনের কথার উপর আরেক জনের কথা চলতে লাগলো। একসময় দেখা গেল পাঠ আর এগুচ্ছে না। তার বদলে চিত্রনাট্য কাকে দিয়ে লেখানো হবে সে সব নিয়ে তর্ক হচ্ছে। মনে মনে গোটা ব্যাপারটাই খুব আজগুবি মনে হতে লাগলো।

 

 যাক, আবার একদিন হবে, এমন কথা বলে সেদিনের উপন্যাস  পাঠ অসমাপ্ত অবস্থাতেই শেষ হলো। এদিকে কিছুদিন পর অফিস থেকে আমার অবসর হয়ে গেল। সিনেমা পাগল বন্ধুটি বদলী হয়ে গেল দূরের অফিসে। তখন আমাদের যোগাযোগ রইলো শুধু ফোনে। ফোনে এরপরও কিছুদিন শোনা যেতে লাগলো যে দাদা চিন্তা করবেন না—সিনেমা হচ্ছেই। আমি তখন আর মোটেই চিন্তা করছি না। 

অবসরের পর অনেক সময়। ধীরে ধীরে কম্পিউটারে বসে সেই উপন্যাসের ডিজিটাল কপি তৈরি করে ফেললাম। নতুন সাজে সেজে সুবোধ যেন একদিন হেসে উঠলো। বলল—এবার একটা বই করো। কিন্তু  ছাপা হওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একে তাকে পড়তে দিই। সাড়া পাই না।  একদিন ঢাকার এক সুহৃদ অনুজ লেখককে বললাম যে একটা ছোট উপন্যাস রেডি আছে—কোথাও ছাপার ব্যবস্থা করা যায় কি না দেখ—। সে তৎক্ষণাৎ স্ক্রিপ্ট চেয়ে পাঠালো এবং একটি নিউজ পোর্টালে ধারাবাহিক ছাপার ব্যবস্থা করে দিল। যাক, বই না হোক, উপন্যাস  ছাপার অক্ষর তো পাচ্ছে।  সুবোধ এতকাল পরে সাধারণ পাঠকের কাছে মুখ দেখাতে পারলো। চলতে চলতে সেই ধারাবাহিকও একদিন শেষ হয়ে গেল। নিউজ পোর্টালের পাতা থেকে ফিরে সুবোধ হাসি মুখে আবার আমার বইয়ের রেকে অবস্থান নিলো।  আমার হাত ছোট। নিম্নকোটির মানুষ আমি। বই ছাপিয়ে পাঠক সমাজে পেশ করার বিলাসিতার কথা থাক। ভাবলাম সুবোধ আমার ঘরেই আমার সঙ্গে বাকি জীবন কাটাক।

এরপর খুব সাম্প্রতিক কালের ঘটনা। শুধু আমাদের দেশ নয়, সারা  পৃথিবী আক্রান্ত হয়ে পড়লো কোভিড ১৯ এ। লকডাউন। গৃহবন্দিত্ব। অঢেল সময়।  এক সতীর্থ বন্ধুর পরামর্শে পড়লাম এক উপন্যাস  নিয়ে। দেশভাগ, দেশভাগের উপন্যাস। ভাবনাটা ছিল অনেকদিনের।  এই অবসরে চললো তার বাস্তবায়ন। সময় লাগলো প্রায় মাস চারেক। কম বেশি লাখ খানিক শব্দের এক উপন্যাস লেখা শেষ হলো। নাম দিলাম নৃমুণ্ডের মীমাংসা। যা জীবনে কোনোদিন হয় নি, এই লেখার পর ঘটনাক্রমে যোগাযোগ হয়ে গেল প্রকাশকের সঙ্গে। একজন নয়, দুই জনের সঙ্গে। একজনের কাছে দেয়া হলো নৃমুণ্ডের মীমাংসা।  অন্যজন নৃমুণ্ডের মীমাংসা না পেয়ে চাইলেন অন্য কোনো লেখা। এই সময় হঠাৎ মনে পড়ল সুবোধের কথা।বর্গমাইলের পদাতিকর কথা। প্রায় তিন দশকের   সুদীর্ঘ সময় পথ পাড়ি দিয়ে সুবোধের আখ্যানটি গিয়ে পড়লো একজন প্রকাশকের কাছে। প্রকাশক মণিকর্ণিকা। আশা করা যাচ্ছে অনতি সময়ের মধ্যেই বর্গমাইলের পদাতিক সুবোধ বই আকারে পাঠকের হাতে পৌঁছে যাবে।

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

পোট্রেট | কামরান পারভেজ

Thu May 13 , 2021
পোট্রেট | কামরান পারভেজ 🌱 সেপ্টেম্বর মাসের বিকালগুলো আমর জীবনে বরাবারই ক্লান্তিকর। দীর্ঘ বিকালগুলো কাটতেই চায় না। দুপুরের ভাত ঘুম শেষ হওয়ার পরও দুই ঘন্টা বেলা থাকে। আছরের নামাজ পড়ে, তসবিহ জবে জবে বারান্দায় পায়চারি করি। আমাদের বাড়িটা পশ্চিমমুখী হওয়ায় তখনো সূর্যের আলো দুপুরের তেজ নিয়ে ছোট্ট আঙিনা আর বারান্দাজুড়ে […]
Shares