পোট্রেট | কামরান পারভেজ

পোট্রেট | কামরান পারভেজ


🌱
সেপ্টেম্বর মাসের বিকালগুলো আমর জীবনে বরাবারই ক্লান্তিকর। দীর্ঘ বিকালগুলো কাটতেই চায় না। দুপুরের ভাত ঘুম শেষ হওয়ার পরও দুই ঘন্টা বেলা থাকে। আছরের নামাজ পড়ে, তসবিহ জবে জবে বারান্দায় পায়চারি করি। আমাদের বাড়িটা পশ্চিমমুখী হওয়ায় তখনো সূর্যের আলো দুপুরের তেজ নিয়ে ছোট্ট আঙিনা আর বারান্দাজুড়ে ছড়িয়ে থাকে। বারো বছর ধরে এমন ক্লান্তির বিকাল যাপন করতে করতে এখন আমার বয়স আটান্ন। এই আটান্নার মধ্যে শেষ বারো বছর ধরে আমি কোন কাজ করি না। কাজের মধ্যে একবার গোসল করি, তিন বেলা খাই, চার বেলা নামাজ পড়ি আর ঘুমাই। ফজরের নামাজ পড়তে পারি না। রাতে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে শুতে হয় বলে ভোরে ঘুম ভাঙে না।
মফস্বল শহরের একধারে, যেখান থেকে এক চিলতে কাঁচামাটি নদীর বুক দেখা যায়, এমন একটা জায়গায় পশ্চিমমুখি বাড়ি আমাদের। বাড়ি থেকে কাঁচামাটি নদীকে আড়াল করার চেষ্টায় প্রাচীর নির্মাণ করা হলেও সেই প্রাচীর অনেক স্থানে ভেঙে যাওয়ায় শুকনো মৌসুমে ঘরের বারান্দা থেকে নদীর বুক দেখা যায়। আর ঘর বলতে শ^শুড়ের তৈরি করা তিন রুমের একটা হাফ বিল্ডিং। সেই ঘরে আমি স্বামী আর মেয়ের স্মৃতি নিয়ে একা একা থাকি। মাসের প্রথম দিকে একবার বাইরে যাই। স্বামীর চাকরির পেনশন তুলি, খুব প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটা করি। কাজের মহিলা দুই বেলা এসে আমার তিন বেলার খাবার তৈরি করে দিয়ে যায়। এমনই নিরুত্তাপ জীবন আমার।
১৪ সেপ্টেম্বর ওই রকম ক্লান্তিকর এক বিকালে শিমুকে স্বপ্ন দেখে আমার দুপুরের ঘুম ভাঙে। স্বপ্নে দেখলাম শিমু বেশ মোটা হয়েছে। পেটের নিচে নাভি দেখা যায়, এমন বিশ্রি করে শাড়ি পড়েছে। কাটা চুলগুলো বারবার কপালে আছড়ে পড়ছে আর শিমু বারবার হাত দিয়ে চুল গুছাতে গুছাতে খুব ব্যস্তভাবে কি যেন করছে। চেহারায় পরিপূর্ণ সুখ। শুধু নাভি দেখা যাওয়ার বিশ্রি ব্যাপারটা বাদ দিলে দারুন লাগছিল শিমুকে। আশপাশে আরও মানুষ-জন ছিল। মনে হচ্ছিল তারা শিমুর শশ^ুড় বাড়ির লোক। আমি বারবার বলতে চাইছিলাম শাড়ি ঠিক করে পড়। কিন্তু আমার স্বর বের হচ্ছিল না। ঠিক ওই সময় ঘুমটা ভাঙে। ঘুম ভাঙার পর সেই দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর বিকালে ঘরের বারান্দায় পায়চারি করতে থাকি। বারো বছর ধরেই আমার কাছে একই রকম রয়ে গেছে মেয়েটার চেহারা। সেই একই রকম হাসিমাখা মায়বী মুখ। মেদহীন ছিমছাম পাতলা শরীর। হোক নিজের সন্তান, তাই বলে কি একই রকম চেহারা প্রতিদিন দেখতে ভাল লাগে না।
শিমু যখন ছোট ছিল, ছোট মানে খুব ছোট, দশ কি এগারো মাসের হবে। শিমু তখন সবে মানুষকে ভয় পেতে শুরু করেছে। ওই সময়টায় ওর বাবার এক অদ্ভুদ খেয়াল হয়েছিল। মেয়েকে অযথা ধমক দিয়ে কাঁদাত। মেয়েটা কাঁদতে অপ্রস্তুত থাকত। বাবার সঙ্গে হয়তো অনেকক্ষণ ধরে খেলা করছে, দারুন হাসি হাসি মুখ। ওই সময় শিমুর বাবার কি খেয়াল হতো, হঠাৎ করেই মেয়েকে ধমকানো শুরু করত। ধমকানো মানে যেই সেই ধকম না। একেরারে দাঁত কিড়মিড় করে চোখ বড় বড় করে বাতাস কাঁপিয়ে খুব জোরে জোরে ধমক দিতে শুরু করত।
একদিন একটা আড়ালে দাঁড়িয়ে আমি পুরো ব্যাপারটা খেয়াল করেছিলাম। হাসি হাসি মেয়েটার চোখের দেখি তাকিয়ে হঠাৎই ধমকে উঠল শিমুর বাবা। এগারো মাসের মেয়ে তো ধমক খেয়েও প্রথমে হাসতে থাকে। মনে করছিল ধমকটাও মনে হয় বাবার খেলারই কিছু একটা অংশ। কিন্তু শিমুর বাবার ধকম ক্রমশ চড়াও হতে থাকে। হঠাৎ শিমুর ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা চোখ ভিজে উঠতে থাকে। আরও কয়েকবার বাবার ধমক খেয়ে শেষে মেয়েটা হাউ মাউ করে কাঁদতে শুরু করে। মেয়ের কান্না যখন তীব্র আকার ধারণ করে তখন আবার বাবা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আদারে আদারে ভাসিয়ে দিতে শুরু করে- আমার আম্মা কাঁদে না। আমার ভুল হয়ে গেছে। মা আমার কাঁদে না। এসব বলতে বলতে হঠাৎ দেখি শিমুর বাবার চোখেও মেয়ের মতই পানি। বাবার চোখের পানি দেখে মেয়ের কান্না আরও বাড়ে। মেয়ের কান্না থামাতে না পেরে বাবার কান্নাও বাড়ে। ওই সময় দৌঁড়ে গিয়ে মেয়েকে আমি বুকের দুধ খাইয়ে থামাই। মেয়েকে বুকের দুধ খেতে দিলে শিমুর বাবাও আহ্লাদ পাওয়া কুকুরের মত পেছন দিক থেকে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কুন্ডলি পাকানোর মত হয়ে শুয়ে পড়ে।
ঠিক একই ঘটনা একে একে চার কি পাঁচ দিন ঘটে যায়। পাঁচটা দিনই ছিল শুক্রবার অথবা অন্য কোন ছুটির দিনের দুুপুর। ওই রকম এক দুপুরে শিমুর কান্না থামাতে আমি বুকের দুধ দেই। একই কায়দায় শিমুর বাবাও মেয়ের পেছন দিকে শুয়ে পড়ে। আমি ওই দিন খুব রাগ করেছিলাম। শিমু বুকের দুধ খেতে খেতে ঘুমাচ্ছিল। আমি কোন কথা বলছিলাম না সেদিন। আনুমানিক আধ ঘন্টা হয়ে গেলেও আমি কিছু বলিনি। মনে আছে আমার এমন নীরবতায় অহস্য হয়ে শিমুর বাবা ঘুমন্ত মেয়ের পেছনে নিজের মাথা গুজে রেখেই বলেছিল- রাগ করলে কেন। আমি কি তোমার মেয়েকে রাগে বা রিবক্ত হয়ে ধমক দেই মনে করেছ। মোটেও না।
এ কথায় আমার রাগ কিছুটা কমে গেলেও আমি রাগের ভান বজায় রাখি। বলি – ছুটির দিন দুপুরে মেয়েকে একটু খানি সময় দেখভাল করলেই তোমার যে এত রাগ চড়ে যায়।
এ কথা শুনে শিমুর বাবা এবার মুখ তুলে আমার দিকে তাকিয়েছিল খুব মায়াবি আর কান্না ভেজা চোখ নিয়ে। তার চেহারা দেখে আমি এতই অবাক হয়েছিলাম যে, কথাই বেরুচিছল না আমার কণ্ঠ দিয়ে।
পরে শিমুর বাবার কাছে থেকে মেয়েকে ধমক দিয়ে কাঁদানোর কারন শুনে আমিও অনেক কেঁদিছিলাম। সেদিন চুলাতে বসানো তরকারি পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও গন্ধ পর্যন্ত টের পাইনি। ছুটির দুপুরে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে আমরা দুজন মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শুয়েছিলাম।
শিমুর বাবা মেয়েকে কাঁদানোর কারটা ছিল বেশ অদ্ভুত। কাঁদলে নাকি মেয়ের প্রতি মায়া আরও বাড়ে। বেশি আদর করতে মন চায়। কান্নার সময়টায় নাকি মেয়েটা একটা মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যায়। ওই বিপর্যয়ের সময় মেয়েকে আদর করে করে আবারও হাসাতে পারলে নাকি শিমুর বাবার খুব আনন্দ হয়।
এমন পাগালের মত কথা শুনে আমি বলেছিলাম- মেয়ে বড় হোক। দেখবে কত ঝড় ঝাপটা আসবে জীবনে। তখন না হয় বুক পেতে সামলে দিও সব।
শিমুর বাবা বলেছিল- কেন জানি মনে হয় মেয়ের বড় হওয়া পর্যন্ত আমি বেঁচে থাকব না। শিমুর বাবার মুখ থেকে এমন একটা কথা শোনার পর থেকে আমার বুকটা সারাক্ষণ ফাঁকা ফাঁকা লাগত। একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ কেন এমন একটা কথা বলল। কিছুই ভাল লাগত না। শিমুর বয়স যখন সাড়ে চার তখন একদিন সামান্য এক রোড এক্সিডেন্টে শিমুর বাবা মারা যায়।

বারো বছর পর চৌদ্দ সেপ্টেম্বর দুপুরের ভাত ঘুমে স্বপ্ন দেখার পর আমার মধ্যেও এক অদ্ভুত ইচ্ছা জাগল। শিমুর একটা পোট্রেট আঁকিয়ে দেয়ালে টানাতে হবে। যেমনটা স্বপ্নে দেখেছি। প্রায় ত্রিশ বছর বয়সী শিমু। সবে কিছুটা মহিলা মহিলা ভাব আসছে। চেহাচায় পরিপূর্ণ সুখ।
মেয়েটার যে ছবিটা দেয়ালে বারো বছর ধরে স্থির হয়ে আছে সেদিন চারটা সংবাদপত্রে এ ছবিটা ছাপা হয়েছিল। বাম দিকে ঘাড় কাত করে রাখা হাসিমুখের ছবিটা। ঠোঁটের উপর বাম দিকে কালো তিল, আর দুই গালে খুব সামান্য টোল। অ্যালবামে শিমুর এরচেয়ে ভাল ছবিও ছিল। কিন্তু কেন জানি সেদিন আমি এ ছবিটাই বড় করে বাধাই করে আনিয়ে দেয়ালে টানাই। সেই একই হাসি। একই রকম করে তাকিয়ে থাকা। বেঁচে থাকলে শিমুর উনত্রিশ পার হতো। স্বপ্নে যেমন দেখেছি তেমনি মোটাসোটা হওয়ার বয়স এটা। একটা অথবা দুটা বাচ্চা থাকত। বাচ্চারা নিশ্চই ঘরজুড়ে কিলবিল করতো।

চৌদ্দ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার পর থেকে পুরানো ডায়রিতে লিখে রাখা ফোন নম্বরগুলো থেকে সফির হাসানের নম্বরটা খুঁজে পেতে পেতে খুব ঘেমে উঠি। সফির হাসান চারুকলায় পড়া আস্টির্ট। শুকনো হাড় জিড়জিড়ে শরীর। মাথা ভর্তি চুল। সবশেষ দেখা হয়েছিল চার বছর আগে রোজা ঈদের সন্ধ্যায়। আমাকে দেখতে এসেছিল। ঈদের দিন ছিল বলে সারা দিনই নিকট আর দূরের আতœীয়া আসে স্বামী আর মেয়েহারা আমাকে দেখতে আসে। সন্ধ্যার পর যখন একটু একাকী সময় কাটাতে চেয়েছিলাম ঠিক ওই সময়ই আসে সফির হাসান। তখনো সে চাকরি করে না। চাকরি করতে নাকি তার ভাল লাগে না। স্বাধীন ভাবে ছবি আঁকে আর বাচ্চাদের ছবি আঁকার স্কুল করেছে। খুব জোর করে একটু খানি সেমাই আর পিঠা দিতে চাইলে আমাকে নিবৃত্ত করার জন্য দুহাতে ধরে অনুরোধ করতে থাকে।
আমাদের মফস্বলের কমবাইন্ড স্কুলটায় শিমুর সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ত সফির। যেদিন শিমু মারা যায় সেদিন দাফনের পরে একে একে শিমুর সব বন্ধু সহপাঠী চলে যাওয়ার পর লম্বা চুলের একটা ছেলে বাড়ির পাশে কাঁচামটি নদীর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। পর দিন আবার সকাল সকাল ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছেলেটাকে কাঁদতে দেখেছিলাম। পাঁচ কি ছয় বছর পর জেনেছিলাম চারু কলায় পড়ে ছেলেটা আর্টিস্ট হয়েছে। নাম সফির হাসান। সেবার রোজার ঈদের সন্ধ্যায় আমার জন্য উপহার হিসাবে একটা ছবি এনেছিল। বাঁধাই করা ছবিটা পুরানো একটা লুঙ্গিতে করে খুব ঢেকে ঢুকে বগল চাপা করে নিয়ে বসেছিল। যাওয়ার সময় ছবিটা আমাতে দিয়ে যায়। গ্রামের দৃশ্য। আমন ধান কাটা হয়ে যাওয়া বড় একটা ফসলের মাঠে শীতের সন্ধ্যা নামছে। কুয়াশা অথবা ধোঁয়ার খুব পাতলা একটা আস্তরণ পড়েছে দিগন্তে। অনেক দূরে থেকে দেখা যাচ্ছে ধান কাটা হয়ে যাওয়া ফসলের মাঠ দিয়ে দুজন মানুষ হেঁটে আসছে।
ছবিটা মানে কি জানতে চাইলে সফির বলেছিল, শিমু যখন ফাইভে পড়ত তখন নাকি শীতের এক বিকালে আমি শিমুকে নিয়ে কাচামাটি নদী পার হয়ে হাঁটতে গিয়েছিলাম। সফির দূর থেকে আমাদের ফলো করেছিল। সেদিন শীতের সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সময় আমি শিমুকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে থাকলে এমন একটা দৃশ্য সফিরের চোখে পড়েছিল। বড় হয়ে সেটাই সে ছবিতে একেঁছে। আমি অনেক ভেবেও সেরকম কোন বিকাল বা সন্ধ্যার কথা মনে করতে পারিনি। ছবিটা আমি দেয়ালে টানাইনি। সেভাবে পুরোনো লুুঙ্গির কাপড়ে ভাজ করে ঘরের আলমানির সবার নিচের তাকে রেখে দিয়েছিলাম।
সফির আমাদের মফস্বলেই থাকে। তাকে নিয়ে মানুষে নানা কথা বলাবলি করে। এতদূর পড়াশোনা করে সে কোন চাকরি বাকরি করে না। চারুকলায় পড়ে ছোট্ট মফস্বলে বাচ্চাদের স্কুল চালায়। মানুষের সঙ্গে মেশে না। কথা খুব কম বলে। শিমুর স্কুলের কয়েকজন ছেলে মেয়ে আমাদের বাড়িতে আসত। কিন্তু এরমধ্যে সফিরকে আমি কোন দেখেনি। শিমু মারা যাওয়ার আগে ছয় দিন হাসাপাতালের আইসিউেিত ছিল। তখনো ছেলে মেয়েরা হাসপাতাল আর বাসায় আনাগোনা করেছে। তখনো সফিরকে দেখিনি। শিমু যখন আইসিউতে তখন আমাকেও হাসপাতালে যেতে দেওয়া হয়নি। সবাই বলাবলি করছিল শিমুর মুখ এমন ভাবে থেঁতলানো সেটা দেখলে আমি সহ্য করতে পারব না। ছয় দিন আমার মেয়েটা ছবির মত স্থির হয়ে পড়েছিল।
শিমু মারা যাওয়ার পর বাড়িতে কত শত মানুষের আসা যাওয়া হয়েছিল, সেসব আমার মনে পড়ে না। তবে দিনে কয়েকবার পুলিশের বড় বড় অফিসারা আসতো। ইনিয়ে বিনিয়ে নানা কথা জানতে চাইত। আমি সংবাদপত্রের খবর পড়ে যতটুকু জেনেছিলাম ততটুকুই জানা ছিল আমার। পাড়ার বখাটে একটা ছেলে নাকি শিমুর পেছনে লেগেছিল। স্কুলে আসা আর যাওয়ার সময় পথ আগলে দাঁড়িয়ে আজে বাজে কথাও নাকি বলত। কিন্তু শিমু কোনদিন আমাকে এসব বলেনি। একদিন বিকালে পদার্থ বিজ্ঞান স্যারের বাসায় ব্যাচে পড়ে বাড়ি ফেরার পথে কাঁচামাটি নদীর পাড়ে শিমুর পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল ছেলেটা। ওই জায়গাটা ছিল খুব নির্জন। কিসব নিয়ে জানি শিমু ছেলেটাকে থাপ্পর মেরেছিল। এরপর ছেলেটা আস্ত ইট দিয়ে শিমুর মুখে আর মাথায় আঘাত করে থেঁতলে দেয়।
শিমু মারা যাওয়ার পর পুলিশ ছেলেটাকে অ্যারেস্ট করার অনেক চেষ্টা করেছে। কয়েকটা পত্রিকায় এ নিয়ে খুব লেখালেখি হয়েছে। একজন মন্ত্রী পুলিশকে খুব কড়াভাবে ছেলেটা অ্যারেস্ট করার কথা বললে সেটাও পত্রিকায় আসে। কিন্তু ছেলেটা আর ধরতে পারেনি পুলিশ। শিমু মারা যাওয়ার এক মাস পর এলাকায় খবর ছড়ায় শিমু যখন হাসপাতালে ভর্তি তখনই ছেলেটা পালিয়ে যায় বর্ডার ক্রস করে।

চৌদ্দ সেপ্টেম্বর রাতে সফির হাসানকে ফোনে পাইনি। পরে লোক মারফত খবর পাঠিয়েছিলাম যেন, আমার সঙ্গে দেখা করে। সাত দিন পর সন্ধ্যায় যখন লো ভোল্টেজে ঘরে টিম টিম করে আলো জ¦লছিল তখন সফির এসে হাজির হয়। আমার শরীর ভাল ছিল না। সেদিন দুপুরে শিমুকে স্বপ্ন দেখার পর থেকেই জ¦র আসতে শুরু। একটু পরপর আবার ঘাম দিয়ে জ¦র ছেড়ে যায়। শরীর ভীষণ দুর্বল। সফির আসলে তাকে আমি শোয়ার ঘরে বসাই। শিমুর হাসিমাখা মুখের সে ছবিটা আমার শোয়ার ঘরেই টানানো। সফির ঘরে ঢুকেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকে, খুব উচ্ছাসিত হয়ে বলে- খালা এ ছবিটা তো আমার কাছে নেই। আমি ছবিটা এঁকে আমার ছবির ঘরে টানিয়ে রাখব। কথাটা বলেই কয়েক সেকেন্ড পর সফির লজ্জা পায়, যেন শিমুর ছবি নিজের ঘরে টানিয়ে রাখার কথা বলাটা খুব অন্যায় হয়েছে।
শিমুর ছবি দেখে সফিরের উচ্ছাসিত হওয়াটা আমার চোখে লাগে। কিছুটা বিষ্মিত হলেও তাকে সেটা বুঝতে না নিয়ে একটু আনমনা ভাবে জিজ্ঞাস করি- তোমার ছবির আলাদা ঘর আছে নাকি?
সফির তখন খুব অপরাধীর মত ভাব করে মাথা নিচু করে উত্তর দেয়, আছে।
সেপ্টেম্বরের ভ্যাপসা গরমের সন্ধ্যায় ঘরে লো-ভোল্টেজের টিম টিমে আলো আর আমার শরীর খারাপ মিলে কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে ছিলাম। ঘরে তখন ঝিঝি পোকার নীরবতা। আমি সেদিন দুপুরের স্বপ্নের কথাটা বলি সফিরকে। স্বপ্নে শিমুকে যেমন দেখেছি ঠিক তেমন একটা ছবি তুমি এঁকে দিবে। একেবারে জীবন্ত ছবি যেন হয়। যেন মনে হয় মেয়েটা অনেক বছর পর স্বামীর বাড়ি থেকে আমার ঘরে বেড়াতে এসেছে। কয়েক বছর পর ছোট দুটি সন্তান নিয়ে মাকে দেখতে আসলে মেয়েদের চেহারায় আনন্দ থাকে ঠিক যেন তেমন হয় ছবিটা।
কথাগুলো বলতে বলতে আমার ঘোর যেন আরও বাড়ে। মনে হয় আমার জ¦রও বাড়ছে। সফির আমাকে বলেন, খালা এ ছবিটাও তো আমার ঘরে আছে। ছয় মাসে আগে এঁকেছি। আমি কিছু বুঝতে পারছিল না। সফিরের ঘরে শিমুর ছবি কেন থাকবে। আবার মনে হচ্ছিল সফিরের ঘরে শিমুর ছবি থাকতেই পারে। শিমুকি তাহলে সফিরের সঙ্গে থাকে। নাকি সফির শিমুর সঙ্গে থাকে। আমি বলি তোমার ঘরে শিমুর ছবিটা কিভাবে এলো। সফির বলে, শিমু তো আমার ঘরেই থাকে। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই আমি শিমুর ছবি আঁকি। আমার ঘর ভর্তি শিমুর ছবি। কলেজে পড়ার সময় শিমু আমাকে কথা দিয়েছিল, সারা জীবন আমরা এক সঙ্গে থাকব। সেদিন বিকালে পদার্থ বিজ্ঞান স্যারের বাসায় পড়তে না গিয়ে শিমু আমার সঙ্গে কাঁচামাটি নদীর ধারে বেড়াতে গিয়েছিল। সেখানে বসেই শিমু আমাকে কথা দিয়েছিল এক সঙ্গে থাকার। শেষ বিকালে শিমু বাড়িতে ফেরার সময়ই তো ছেলেটা ইট দিয়ে শিমুর মাথা মুখ থেঁতলে দেয়।
সফির বলে- শিমুকে একা হয়ে যাবে বলেই তো আমি এ শহর ছেড়ে যাই না। মাঝে মাঝে আমি ছয় সাত দিনের জন্য শহরের বাইরে যাই শিমুর হত্যাকারীকে খুঁজতে।
জ¦রে আমার শরীর যেন পুড়ে যাচ্চিল তখন। সফির আমাকে বলে, খালা চলে আমার সঙ্গে। মেয়েকে একবার দেখে আসবেন। আমি বলি চল যাই।
তারপর সফির পাড়ার মোড় থেকে একটা রিক্সা ডেকে আনে। পুরো মফস্বল শহরটায় তখন যেন ঝিঝি পোকার ডাক। কাঁচামাটি নদীর উপর একটা ভাঙা সেতু, সড়কের পাশে বসা কাঁচা বাজার, কিছুটা ঝকঝকে আলোর কয়েকটা প্রসাধনীর দোকান আর একটা মসজিদ পার হয়ে আমাদের রিকশা আরও অন্ধকার এবং আরও নীরবতার দিকে যায়। এরপর আর কিছু চোখে পড়ছিল না।

 

🌿কামরান পারভেজ

পেশা- সাংবাদিকতা

দৈনিক প্রথম আলোর ময়মনসিংহ অফিস
লেখালেখি-মূলত গল্পকার
প্রকাশিত গ্রন্থ- দিকচিহ্নহীন ও অবেলার গল্প

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

বিষপিঁপড়া | শেখ লুৎফর

Thu May 13 , 2021
বিষপিঁপড়া | শেখ লুৎফর 🌱 এক              আজকে সকাল সকাল অদিতির ঘুম ভাঙল। বাইরে ভোরের বাতাস ঝিরিঝিরি বইছে। পাশ ফিরতেই নাকে লাগে জংলি ফুলের সুবাস। গাছে গাছে পাখিদের কলতান! খুশিতে অদিতির মনটা উথলে ওঠে। যখন বাড়ির কারো ঘুম ভাঙে নি, কেউ কাউকে ডাকছে না, ঘটিবাটির […]
Shares