বিষপিঁপড়া | শেখ লুৎফর

বিষপিঁপড়া | শেখ লুৎফর

🌱

এক

             আজকে সকাল সকাল অদিতির ঘুম ভাঙল। বাইরে ভোরের বাতাস ঝিরিঝিরি বইছে। পাশ ফিরতেই নাকে লাগে জংলি ফুলের সুবাস। গাছে গাছে পাখিদের কলতান! খুশিতে অদিতির মনটা উথলে ওঠে। যখন বাড়ির কারো ঘুম ভাঙে নি, কেউ কাউকে ডাকছে না, ঘটিবাটির ঠুনঠান শব্দ নাই, মাটির বাসন বানানোর ধুপ্পুত ধুপ্পুত আওয়াজ নাই, ভোরের সেই সময়টা অদিতির খুব ভালো লাগে। তাই ঘুম ভাঙলেও সে খরগোশের মতো কান খাড়া করে বিছানায় আরো অনেকক্ষণ পড়ে থাকে। আম-কাঁঠালের গাছে গাছে ঝিঁন ঝিঁন সুরে ডাকছে কাঁঠালি পোকারা। এই ডাকে সাড়া দিয়ে আম পাকবে, কাঁঠাল পাকবে, জামের রঙিন শরীর রসে হবে টসটসা।

             আজ থেকে কোনো ইস্কুল নাই। গ্রীষ্মের ছুটির সুবাদে পড়াও নাই। অবশ্যই পড়ার জন্য মায়ের হাতের কিল-থাপ্পরও থাকবে না। এক দফা আনন্দে অদিতির ফর্সা মুখটা একটু যেন লাল হয়। হালকা-পাতলা শরীরটা বুঝি আরেকবার চিলবিল করে ওঠে। মাঝে মাঝে মা তাকে তক্তা বলে খ্যাপায়। তার শরীর নাকি তক্তার মতো খটখটা শুকনা!

ঘরের পেছনের আম গাছে কোকিল ডাকছে,বউকথা কও। নদীর দিক থেকে মহাজনি নাওয়ের দাঁড় টানার কেড়ৎ, কেড়ৎ… শব্দ আসছে। এক লাফে অদিতি বিছানা থেকে নেমে পড়ে। পেছন-বাড়ির কলস থেকে গবগব করে লোটায় পানি ঢালে। ঝটপট হাত-মুখ ধোয়। তারপর এক দৌড়ে গাঙপারে চলে যায়। বিরাট বড় একটা পাটের নাও চারজনে দাঁড় টানছে। ঘাটের পাশের নিম গাছে হেলান দিয়ে যতক্ষণ দেখা যায় অদিতি চেয়ে চেয়ে নৌকাটা দেখে।

উঠানের কাঁঠাল তলায় মা মাটি ছানা করছে। বাবা হয়তো বেড়িয়ে পড়েছে আম গাছের বাকল জোগারের জন্য। আম গাছের কাঁচা বাকল থেকে কুমারেরা রং ওঠায়। সেই রঙে রঙিন হয় মাটির নতুন হাড়ি-পাতিল। কিন্তু তার বাবা যে আম গাছের কাঁচা চামড়া তুলে আনে এইটা অদিতির একটুও সয় না। তার বিচারে বাবা এক সাথে দুইটা অপরাধ করছে। ১. না বলে অন্যের গাছ থেকে চুরি করে বাকল তুলছে। অবশ্য এই জন্য তার বাবাকে কেউ বকে না। কখনো যদি কেউ দেখেও ফেলে তবু খুব একটা রাগ করে না।  ২. জ্যান্ত গাছের চামড়া যারা তুলে আনতে পারে তারা অবশ্যই কিছুটা নিষ্ঠুর। এই গ্রামে চামড়া তুলে নেওয়া অনেক আম গাছ আছে। অদিতির চোখে পড়লেই মনটা খারাপ হয়ে যায়। গাছের বাকলহীন জায়গাটা দেখতে মানুষের পিঠের ঘা’র মতো। গাছগুলা যেন আড়ে আড়ে অদিতির দিকে তাকিয়ে থাকে। তার কাছে নীরব অভিযোগ করে, দ্যাখ অদিতি তোমার বাবা আমার চামড়া তুলে নিয়েছে!

অদিতি এক দৌড়ে তুলসি তলায় চলে আসে। এখানে সে কাল বিকালে একদলা ছানামাটি এনে রেখেছিল। আজ সেটা দিয়ে সে মনের মতো একটা ঘোড়া বানাবে। পঙ্খিরাজ ঘোড়া। যে রকম ঘোড়ায় চড়ে আগেরদিনের রাজকুমাররা শিকারে বেড়িয়ে পরতো; এইরকম একটা ঘোড়া বানাবার শখ তার অনেক দিনের! ঠিক এই সময় বাড়ির পেছনে একটা শব্দ হয়। শব্দটা শুনে অদিতি চমকে ওঠে। এটা একটা পরিচিত শব্দ। সাপ, নেওল আর পাখি শিকারিরা এমন দ্রুত আর সাবধানে চলাচল করতে পাড়ে ! তার ছোট্ট বুকটা ধক্ করে ওঠে। সে এক দৌড়ে বাড়ির পিছনের জংলায় চলে আসে। যেই ভাবনা সেই কাজ। তাদের বুবিগাছের নিচে সেই ঘুঘুশিকারিটা দাঁড়িয়ে আছে। লোকটাকে সে জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দেখছে : এক-ই রকম করমচা করমচা লাল চোখ, উসকু-খোসকু চুল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, খাটোকরে পরা আধময়লা লুঙ্গি, কাঁধে একটা গামছা। ছাইবন্ন লোকটাকে দেখলেই সাপ দেখার মতো ভয়-ঘেন্নায় অদিতির শরীরটা রি রি করে।

লোকটা জাওয়াবাঁশের লম্বা লম্বা নল একটার মাথায় আরেকটা গেঁথে গেঁথে শিকারি পাখির খাঁচাটা উপরের দিকে তুলছে। অন্তত বিশহাত উঁচুতে কাঁঠালের যে ডালটা দু’দিকে চলে গেছে সেইখানে আস্তে করে সে বসিয়ে দেবে খাঁচাটা। তারপর ঘন পাতার আড়ালে বসে তার শিকারি ঘুঘুটা গলায় তুলবে কুড়–ড়…কুড়, কুড়–ড়…কুড়…। দূরের কোনো পাখির কানে ছলনার এই সুর যেতেই সে আনচান করে ওঠবে। একটু পরেই হয়তো সে উড়ে এসে, দুষ্ট পাখির মিষ্টি কথায় ভুলে, ফাঁদে পা দেবে। ব্যস খতম!
লোকটা এমন ভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন সেও একটা গাছ! অদিতিকে লোকটা এখনো দেখেনি। তাই সে যেমন নীরবে এসেছিল তেমনি নীরবেই ফিরে যায়। রাগে তার ছোট্ট বুকটা জ্বলছে। টানাটানা কালো চোখ দুইটাতে ঘুণার আগুন দপদপ করছে। পাখিদের মধ্যে ঘুঘুকেই সে সবচে বেশি ভালোবাসে। ঘুঘুর ডাক তার প্রিয়।

এবার অদিতি দৌড়াতে শুরু করে। এখন বিলু আর রাসেলকে তার খুব দরকার। ওরা তার বন্ধু। কয়দিন পরপর এসে মানুষটা ভুলিয়ে-ভালিয়ে পাখিগুলা ধরে নিয়ে যাবে আর সে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখবে ?

অদিতি এক দৌড়ে বিলুদের জামতলায় চলে আসে। বিলু বারান্দার চটে বসে একটা কলা খাচ্ছে। সামনে বই। অদিতি একবার চারপাশটা দেখে নেয় : রাখাল পাল নিমতলায় পা দিয়ে কাদামাটি পিষছে। আর নিতাই খুঁড়ো তার মাটির কাজের ছাপরার নিচে বসে বসে হুঁক্কা টানছে। খুড়োর পাশে নজা শেখ। দুজনই আলাপে মগ্ন। আশপাশে আর কেউ নাই। পথের পাশে বাসক গাছের একটা ঝোপ। ঝোপটার উপরে একটা কালো ভোমরা ভোঁ ভোঁ করে উড়ছে।

অদিতি শাঁ করে ঝোপটায় ঢোকে যায় । বসে বসে মনটা আগে ঠান্ডা করে। তারপর চোখ বুজে দূর্গা টুনটুনি পাখির মতো চিপ…চিপ…টুইপ্ বলে ডেকে ওঠে। এক-দুই-তিন। সে বাসক গাছের আড়াল থেকে দেখছে, বিলু চকিত চোখে তাকে তালাশ করছে। তারপর চোরের মতো এক-পা দুই-পা করে সরতে সরতে হঠাৎ ভোঁ-করে একটা দৌড়মারে!

আনন্দে অদিতির মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে ঝোপ থেকে বেড়িয়ে চট করে মোটা একটা গাছের আড়ালে সরে যায়। বিলু বাতাসের বেগে এদিকেই আসছে! কাছাকাছি আসতেই অদিতি রেন্ট্রিগাছের আড়াল থেকে পথের দিকে একটা হাত বের করে দেয়। বিলু তার হাতটা দেখে থেমে যায়। এবার সে বিলুর সামনা-সামনি দাঁড়ায়। কান্না-কান্না গলায় বিলুর কাছে নালিশ করে, সেই লোকটা আজ আবার এসেছে।

বিলু হাঁফধরা গলায় জানতে চায়, কোন লোকটা ?
সেই ঘুঘু শিকারিটা।
বিলুর চোখ খুশিতে ছলকে ওঠে। মানুষকে নাজেহাল করে সে সবচে বেশি সুখ পায়। আজকের এই সুযোগটা বিলু অবশ্যই কাজে লাগাবে।
চল রাসেলকে নিয়ে আসি।
এই কথা বলে বিলু অদিতির একটা হাত ধরে ছুটতে থাকে।

দুই ক্ষেত উত্তরে শেখ পাড়া। আবুল শেখের সুপারি বাগানে পরপর তিনবার একটা তক্কক ডাকে, তকক্ তকক্ তক্ক…।
রাসেল পুকুরপারে দাঁড়িয়ে বড়শিতে টোপ লাগাচ্ছে। সে কান পেতে তক্ককের ডাকটা শুনে। তারপর হাতের ছিপটা ঘাটের পাশে ফেলেই একটা দৌড় দেয়। এক দৌড়ে সুপারি বাগানে এসে দাঁড়ায়। তাকে দেখে অদিতি দৌড়ে কাছে আসে। বিলু রাসেলের একটা হাত ধরে ফিসফিস করে বলে, তাড়াতাড়ি তুর গুলতিটা নিয়ে আয়।

অনেকগুলা গুলি আনতে হবে।

এইকথা বলে অদিতি রাসেলের চোখে চোখ রাখে। ওর চোখ মেয়েদের মতো ভাসা ভাসা।
রাসেল চোখ বড় বড় করে তাকায়, কেন, কী হইছে ?
অদিতি রাসেলের একটা হাত ধরে, সেই ঘুঘু শিকারিটা আমাদের জঙ্গলে আজ আবার এসেছে।
বিলু বিশ-পঁচিশ হাত দূরের একটা সুপারিগাছকে টার্গেট করে গুলতি ছুঁড়ছিল। এবার সে রাসেলকে তাড়া দেয়, দেরি করিছ না, চল।

রাসেল উজ্জ্বল চোখে তাকিয়ে আছে। হয়ত একটা ফন্দি আঁটছে মনে মনে। তারপর এক দৌড়ে বাড়ির দিকে ছুটে যায়। একটু পরেই হাতে দুটো গুলতি নিয়ে ফিরে আসে। অদিতি দৌড়াতে শুরু করে। তার পেছনে পেছনে ছোটছে বিলু-রাসেল। ভয়ে অদিতির মনটা কুঁকড়ে যাচ্ছে; এর মধ্যেই না-জানি কয়টা পাখি ধরে ফেলেছে!

লোকটাকে পাওয়া গেলো মাধপ পালের জঙ্গলে। তারা তিনজনই বিশাল একটা রেন্ট্রিগাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। এই একটু সময়ের মধ্যেই লোকটা দুইটা ঘুঘু ধরে ফেলেছে। বেচারারা ছাড়া পাওয়ার জন্য আছাড়ি-পাছাড়ি করছে। কালো, লম্বা লিকলিকে লোকটা সাপের মতো শীতল দৃষ্টিতে গাছের ডাল-পালা পরখ করছে। মাঝে মাঝে একঠায় দাঁড়িয়ে কান পেতে ঠাওড়াতে চাইছে ঘুঘুর ডাক। নানান জাতের পাখির ডাকের মাঝে কোনদিকে বসে ঘুঘুটা ডাকছে অদিতিও ধরতে পারছে না! বিলু বলে, এই লোকটা রশিদ ডাকাতের ভাই না ?

হ্যাঁ বলে রাসেল একটা বড় ঝোপের মাঝে ঢুকেপড়ে। বিলু ডান দিকের আরেকটা ঝোপে ঢুকতে ঢুকতে ফিসফিস করে বলে, এখন মারব না। আবার ফাঁদ পাতলেই খেল দেখাব।

রাসেল অদিতিকে বলে, তুই পচ্চিমের বেতছোপার পিছন দিকে চলে যা। অদিতি রাসেলের হাত থেকে অন্য গুলতিটা তুলে নেয়। বিলুর গুলতি সব সময় পেন্টের পকেটেই থাকে। সে নিজেরটা রেডি করতে করতে বলে, আমি হাঁটুর গিলিটাতে লাগাব।
আমি কোমরের ঠিক মধ্যখানের হাড্ডিতে মারব বলে অদিতি একটু হাসে। পেছন থেকে লোকটার ঘাড়ের মাঝখানে যে উঁচু হাড়টা দেখা যাচ্ছে আমার টার্গেট সেখানে।

রাসেল তার নিজের কথা জানিয়ে এক হাঁটু ভাঁজ করে ঝোপের মাঝে পজিশন নেয়।

একটা ঘুঁইসাপ মাথা তুলে বীরের ভঙ্গিতে চলছে। একটা কাঠবিড়ালি বদ্দিরাজ গাছের কোঠুরি থেকে উঁকি দিয়ে অদিতিকে দেখছে।

লোকটা কার্তিক পালের ডেওয়া গাছে ফাঁদ পেতে একটা বিড়ি ধরায়। বিলু একবার মুচকি হাসে। শিকারি-ঘুঘুটা গা ফোলিয়ে শিকারকে ডাকছে, কুড়ুড় কুড়, কুড়ুড় কুড়…। লোকটা তাদের দিকে পিছন দিয়ে শিকার আর বিড়ির নেশায় বুঁদ। অদিতি ডেকে ওঠে, চিপ চিপ টুইপ্…।

টুইপ্ বলার সাথে সাথে তিন দিক থেকে গুলতির তিনটা গুলি শিসস্…শব্দে বাতাসে চাবুক মারে। এক পলকের সেই তীক্ষ্ণ শব্দটা বুঝে ওঠার আগেই লোকটা ‘বাবারে’ বলে লাফিয়ে ওঠে। বাবারে….অরে বাবারে… আমারে ভুতে খাইলরে…।

লোকটা মরণ চিৎকার দিতে দিতে ঝোপ-ঝাড় ভেঙে অন্ধের মতো ছুটতে থাকে। এক দৌড়ে শিকারি গিয়ে সুরেশপালের উঠানে আছড়ে পড়ে। তার মরণ চিৎকারে আশপাশের সবাই হাতের কাজ ফেলে ছুটে আসছে। এই ফাঁকে রাসেল ছুটে যায় খাঁচার দিকে। অদিতি রাসেলের একটা হাত চেপে ধরে, খাঁচা ভেঙে পাখি ছেড়ে দিলে লোকটা ভাববে মানুষের কাজ। শুনছসনা ভুত, ভুত… বলে সারাপাড়া মাথায় তুলছে।

অদিতি আবার মুচকি হাসে। তার টানাটানা কাজল চোখ দুইটার দিকে রাসেল হা-করে তাকিয়ে থাকে। মাঝে মাঝে রাসেলের মনে হয়, অদিতি বিলু আর তারচে অনেক বেশি প্রত্যুপন্নমতি!

 

দুই

গ্রীষ্মের ছুটি চলছে তাই ইস্কুল নাই। পড়া নাই। সকাল সকাল বাসি দুধ-ভাত কলা দিয়ে খেয়ে অদিতি এসেছিল গাঙপারে ছিপ নিয়ে। ঘুম থেকে ওঠেই সে একবার গাঙপার ঘুরে দেখে এসেছে : কানাই, মনা, রেখা, সুভাসহ অনেকেই ছিপ দিয়ে মাছ ধরছে। গত দুইদিন টানা বৃষ্টি হয়েছে। তাই নদীতে ঘোলাপানির ঢল। ঘাটে ঘাটে ছিটকি জাল ফেলেছে বড়রা। শুধু ছোটরাই ছিপ-বড়শি দিয়ে ধরছে টেংরা-গোলশা-সড়পুঁটি।

অদিতি জানে কোথায় গেলে বিলু-রাসেলকে পাবে। মা রান্নাঘর থেকে গলাফাঁটিয়ে বলে দিয়েছে, আমগর ঘাটে যা। অহন তুই বড় হইছস, ছেলেগর লগে মাছ ধরিছ না। মাইনশে আমারে নানান কথা হুনায়।

অদিতি মুচকি হাসতে হাসতে একটা কোদাল দিয়ে পেছনের জংলা থেকে মোটা মোটা কয়টা কেঁচো তুলে এনেছে। তাদের ঘাটে ইছবআলী কাকা ছিটকি জাল ফেলে বসে আছে। বাচ্চুদের ঘাটে হেমেন্দ্র কাকা। অদিতি ছিপ হাতে হাঁটতে হাঁটতে বেনেভিটার পাশে চলে আসে। এখানে নদীর পাড় খুব খাড়া। মাথার উপরে সারি সারি বাঁশ ঝাড়। এই ছায়াঘন জনহীন জায়গাটাতেই সে বিলু আর রাসেলকে পেয়ে যায়। ওরা টপাটপ মাছ তুলছে। রাসেলের খলুইয়ে বারো-তেরোটা টেংরা-গোলশা। বিলু ধরেছে সবচে বেশি। আসতে আসতে অদিতির অনেক দেরি হয়ে গেছে! হোক দেরি। ঘাটগুলো দেখে না আসলে মায়ের হামলার মুখে সে কী জবাব দেবে। মা যখন বলবে, তুই আবার ছেলেগর লগে মাছ ধরতে গেলি হারামজাদি ?
সে বলবে, আমাদের ঘাটে ইছবালী কাকা জাল ফেলেছিল।

মাঝে মাঝে তার মন ক্ষেপে যায়। বিলু-রাসেলের সাথে সেই ওয়ান ক্লাস থেকে পড়ছে। তখন থেকেই ওরা তার খেলার সাথী। এপাড়াতে আর যেকয়জন মেয়ে আছে ওরা সবাই হয় তারচে বয়সে বেশি বড়, না হয় অনেক ছোট। তাদের তিন-ঘর পুবে বিলুদের বাড়ি। আর দুই ক্ষেত উত্তরে রাসেলদের শেখপাড়া। তারা এক সাথে দল বেঁধে ইস্কুলে যায়। ফিরেও আসে এক সাথে। গোসলের সময় সাঁতরানো, বিকালে বিলুদের উঠানে বৌ-কুত কুত খেলা সবি চলে এক সাথে। এই করে করে এবছর তারা ক্লাস সেভেনে ওঠেছে। গত এক বছর আগেও তো তাকে কেউ বলেনি, এই ছেলেগর লগে খেলতে যাস ক্যা ?

বিলু তার বড়শিতে নতুন করে টোপ লাগাতে লাগাতে বলে, উজান পাড়ার ঘাটের পাশের বাচ্চা দুইটা আর নাই।
মাছরাঙার সেই বাচ্চা দুইটা ?
অদিতি ঘাড় বাঁকা করে বিলুর দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকে। গতকাল বিকালেও মাছরাঙাপাখির বাচ্চা দুইটা তারা গর্তে হাত ঢুকিয়ে দেখে এসেছে : তুলতুলা শরীরে নরম নরম পালক গজাতে শুরু করেছে।
রাসেল একটা ছিপ মারে। লম্বা লম্বা গোঁফওয়ালা মস্ত একটা গোলশা মাছ বাতাসে নাচতে নাচতে তার পায়ের কাছে চলে আসে। রাসেল মাছটা বড়শি থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলে, হয় ঘুঁইসাপে খাইছে নাইলে জাতিসাপে।
অদিতি বলে আদু ডাকাইতের কড়ুই গাছের খবর কী ?
আছে, ওরাসব ঠিক আছে।
আদু ডাকাতের কড়ুই গাছে একটা শালিক বাচ্চা তুলেছে। গতকাল বিকালে অদিতিরা তিনজন এক সাথে দেখে এসেছে।
বিলু ছিপমারে। বাতাসে ফাৎ করে শব্দ হয়। মাছ উঠে না।

 

তিন

এইযে অদিতি-বিলু-রাসেলের একান্ত পৃথিবী তা একটু একটু করে গত ছয়-সাত বছরে কুমারিলতার মতো ছড়িয়ে-জড়িয়ে গ্রামের সারাটা চৌহদ্দি জোড়ে গড়ে ওঠেছে। ইস্কুলের পথের দুপাশে বিরাট বিরাট জঙ্গল। বাড়ি থেকে নদীর ঘাটে যাওয়ার পথটাও আম-জাম-কাঁঠাল, কলা ছোপায় ঢাকা। আর সারাটা গাঙপাড়ের পরতে পরতে কত জাতের প্রাণী, গাছ-লতায় ভরা তার কী কোনো শেষ আছে ?

আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের বাহার। জোর বাতাসে নাচছে চিরল চিরল বাঁশ পাতা। বাঁশে বাঁশে ঘঁষা লেগে গাঙপারে শব্দ ওঠছে কটর…কটর…কট্। প্রকৃতির এইসব আয়োজন যেন ডেকে ডেকে অদিতিকে ঘরের পেছন দিকের জানালার পাশে এনে দাঁড়ায় করায়। তাদের পেছন বাড়িটা ঘন জঙ্গলে ঠাঁসা। দেউড়ির পাশ থেকে আম-জাম-কাঁঠাল গাছের ফাঁক দিয়ে একটা দু-পায়ে পথ চলে গেছে টয়লেটের দিকে। বুবিগাছের একটা ডাল উপুর হয়ে পড়েছে টিনের টয়লেটের উপর। তারপর কয়েকটা গাবগাছের পেছনে বিরাট বিরাট বাঁশঝাড়। অদিতি চোখ বন্ধকরেও দেখতে পায় পালপাড়া, শেখপাড়া, ইস্কুল আর সারাটা গাঙপাড়ের তল্লাট। গাছ-বৃক্ষ, ঝোপ-ঝাড় ঘেরা প্রকৃতির এই নিবিড় রাজ্যের শিরায় শিরায় বিলু-রাসেলের সাথে ঘুরতে ঘুরতেই তো সে এতটা বড় হয়েছে।

অদিতি ফ্রকের কোনা দিয়ে জলভরা চোখ মুছে। জাম গাছের মগ ডালে গত ফাগুন মাসে ঘুঘু পাখি একটা বাসা করেছিল। বাচ্চা তোলার আগেই বাসাটা তার চোখে পড়ে যায়। তখন সকাল। বাসাটা দেখেই সে হাতের নিশিন্দা ডালটা ফেলে দিয়ে তরতর করে উঠে পড়েছিল গাছে। মার্বেল সাইজ দুইটা ডিম। ছোঁয়ে দেখতে খুব ইচ্ছা করছিল অদিতির। তবু সে ডিমে হাত দেয় নি। মানুষের পরশে পাখির ডিম কাঞ্জি হয়ে যায়। তখন পাখি ডিমে তা-দেওয়া বন্ধ করে দেয়। তা দিলেও নষ্ট ডিম থেকে আর বাচ্চা হবে না।

অদিতি ডালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। এখান থেকে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। কালাই বিলের পুবপারে রেলরাস্তা। প্রতিদিন ভোরে ‘এইটডাইন’ নামে একটা ট্রেন ঢাকার দিকে যায়। এই ট্রেনের শব্দে রোজ রোজ তার ঘুম ভাঙে। তবু সে চোখ বন্ধ করে শব্দটা মন দিয়ে শোনে। শোনতে শোনতে অদিতির মনের ইচ্ছাগুলো বুকের মাঝে টনটনায়!

তারপর থেকে অদিতি ঘুঘুর বাসাটা চোখে চোখে রেখেছিল। সে জানে, পাশের শেওড়া গাছের খুড়লে একটা দাঁড়াশ সাপ থাকে। একটু সুযোগ পেলেই পাজিটা গিয়ে ডিম খেয়ে আসবে। তো এখনো অদিতির মনে আছে, সেবার বাচ্চা দুইটার চোখ ফুটতেই সময় লেগেছে পাঁচদিন! সে বিলু আর রাসেল সাপের কবল থেকে বাচ্চাগুলো বাঁচানোর জন্য দস্তুর মতো পালাকরে পাহারা দিয়েছে। তারপর একদিন দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখে খালি বাসাটা পড়ে আছে। তুলতুলে মিষ্টি ছানারা আশপাশের ডালে ডালে উড়াউড়ি করছে।

শেওড়া গাছের খোড়লে যে সাপটা থাকতো, তাকে তারা তাড়িয়ে দিয়েছিল শোকনা মরিচ-পোড়া ধোঁয়া দিয়ে। বেটার কী রাগ! ফোঁস ফোঁস করে গর্ত থেকে বেড়িয়ে এসে এইবড় ফণা তুলে তাদেরকে ভয় দেখিয়েছিল! রাসেলটা আস্ত একটা দস্যু। এই মোটা বাঁশের একটা লাঠি মাটিতে ঠুকতে ঠুকতে বলে, ভাগ ব্যাটা; ঘুঘুর ছানা খেতে এইদিকে আবার এলে মাথার খুলি থেঁতলে দেব!
অবোঝ-কান্নায় অদিতির দুচোখ উথলে ওঠে। আজ কতদিন রাসেলদের সাথে সে খেলতে পাড়ে না। বাড়ির দেউড়ির বাইরে পা দেওয়া তার নিষেধ। দেশে খুব গণ্ডগোল। এই গণ্ডগোলকে বড়রা বলছে সংগ্রাম। এটা নাকি স্বাধীনতার সংগ্রাম। সবাই বলে এখন নাকি দেশে যুদ্ধ শুরু হবে। দেশের মানুষ যুদ্ধকরে পাকিস্তানিদেরকে এই দেশ থেকে তাড়িয়ে দিবে। এই সুযোগে দেশের খারাপ মানুষেরা যা ইচ্ছা তাই করছে। তার মা ভয়ে জড়সড় হয়ে কতদিন তাকে বলেছে, এখন নুনেরচে খুন সস্তা। মেয়েরা শিয়ালের মুখে মুরগী। অহনঅ সময় আছে, সাবধান হ। নাইলে কিন্তু শেষ অইয়া যাইবে রে…!

ঘরের আশ্রয়ে থেকেও অদিতির মনে শান্তি নাই। ভয়ে সে সারাক্ষণ কুঁকড়ে থাকে। দিনে রাজাকার, রাতে ডাকাত! এখন রাজাকার-পাকসেনারাই শুধু না ডাকাতরাও ডাকাতি শেষে যুবতি মেয়েদেরকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। গত কয় মাসে যাদেরকে নিয়ে গেছে তারা আর কেউ ফিরে আসেনি। সে শুনেছে, ওরা নাকি কীসব অত্যাচার করে মেয়েদেরকে একেবারে শেষ করে দেয়। তাই মা তাকে ঘর থেকে বের হতে কঠোর নিষেধ দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে চারপাশে যা ঘটছে তাতে অদিতি ঘরেই বেশি বিপদ মনে করে। এখানে সে বন্ধি। একটা রাইফেল হাতে যে-কেউ এসে চিলের মতো ছোঁ-মেরে তাকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে পারবে!
আশপাশে একটু শব্দ হলেই অদিতির শরীরে ঘাম ওঠে, বুক ধড়ফড় করে। মাঝে মাঝে এখান থেকে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সে কোথাই পালাবে ? এই এক-দেড় মাসের হালচাল থেকে সে জেনে গেছে, তার তেরো বছরের এই জীবনটাই এখন সবচে বড় শত্রু। সারাক্ষণ উদ্দেগ-অস্থিরতা আর বিচিত্র ভাবনার চুটে অদিতির চিন্তা শক্তিও বুঝি অনেক বেড়ে গেছে! বিচিত্র এইসব বিপদের সমূহ সম্ভাবনার কথা ভেবে সে বিছানায় চুপচাপ বসে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা আত্মরক্ষার নানান রকম কৌশল খোঁজে। তার যদি একটা রাইফেল থাকতো! জৈষ্ঠ মাসের প্রথম দিকে যখন ঢাকা ছেড়ে ইপিআররা পালিয়ে যাচ্ছে তখন এই গ্রামের অনেকেই ওদের কাছ থেকে রাইফেল কেড়ে রেখেছিল। তার বাবা বলেছে, সেইসব রাইফেল নিয়ে ওরা আজ ডাকাতি করে। মা-বাবার বুকে রাইফেলের নল ঠেকিয়ে পাখির ছানার মতো মেয়েদেরকে ওঠিয়ে নিয়ে যায়। কেউ বাঁধা দিলে সোজা বুকে গুলি চালায়!

এবং এই জটিল অবস্থা থেকে বেঁচে থাকার জন্যই অদিতি অনেক ভেবে-চিন্তে তাদের ঘরের উত্তরের জানালার একটা শিক আধ খোলা করে রেখে দিয়েছে। ডাকাত আসলে আসবে সামনের দরজা দিয়ে। আর সে পালাবে পেছন দিকে! শুধু একটা লাফ দিয়ে পেছনের জংলাটায় পড়তে পারলেই হলো। সেখানে একটা মস্তবড় আম গাছ আছে। আছে ডাল-পাতায় পাতায় আচ্ছাদিত অসংখ্য ঘন ঝোঁপ। মায়ের পিটনি খাওয়ার ভয়ে কতদিন সে তড়তড় করে ওঠে সেই আমগাছে আশ্রয় নিয়েছে; ঝোপের অন্ধকারে লুকিয়ে থেকেছে ঘন্টার পর ঘন্টা। কতবার গাছটার নিচ দিয়ে টয়লেটে গেছে তার মা। কিন্তু কোনোদিন তাকে দেখেনি। এই গাছে বসে থাকতে থাকতেই কতদিন শেখপাড়ার মসজিদে বিকালের আযান পড়েছে। তার নাওয়া-খাওয়া কিছুই হয়নি। বাবা গাঙপাড়ে দাঁড়িয়ে ঘন ঘন ডাকছে, অদিতি…।

মা বাড়ির আনাচ-কানাচ খোঁজতে খোঁজতে বার বার অভয় দিয়ে বলছে, আমার অদিতি কই, অহনো আইলেনা, কহন চান করবে, ভাত খাইবে ?

মায়ের এই অভয় বাক্য শুনতেই সে অবিকল একটা কাঠবিড়ালির মতো সড়সড় করে মগডাল থেকে কতদিন নেমে এসেছে। একটা পিঁপড়াও টের পায়নি। এইসব নানান ঘটনার জন্য বাড়ির পেছন দিকটা অদিতির কাছে সবচে বেশি নিরাপদ লাগে। গত বুধবার রাতে ডাকাত এসেছিল সাহাপাড়ায়। ফিরে যাবার সময় জবা দিদিকে নাকি উঠিয়ে নিয়ে গেছে। এই বছর জবা দিদির মেট্রিক পরীক্ষা দিবার কথাছিল। রক্তজবার মতো লাল টকটকা সুন্দরী জবা দিদি আর ফিরে আসেনি। এই ভয়াবহ খবর শোনে সে তিন রাত এক বিন্দুও ঘুমায়নি। তাপরই সে মনস্থ করেছে, যে কোনো উপায়ে হোক ডাকাত এলে তাকে পালাতে হবেই।
একটা কাঠবিড়ালি কটক, কটক করে কাঁঠাল গাছ থেকে লাফ দিয়ে জাম গাছে চলে আসে। একটা শালিক কিচিরমিচির কথা বলতে বলতে এক লাফে অন্য শালিকটার পাশে চলে এসেছে। এইসব দেখতে দেখতে কিশোরির মনটা তেজপাতার মতো মিষ্টি গন্ধে ভরে ওঠে। তার ইচ্ছা করে জনালার ভাঙা শিকটা উঠিয়ে পালায়। সন্ধ্যাদিদিদের জঙ্গলে একটা কাঠঠুকরা পাখি ঠক ঠক করে শব্দ করছে। বিদ্রোহের আগুনে অদিতির বড় বড় চোখ দুইটা জ্বলতে থাকে। সে দরজার কপাটের ফাঁকে চোখ রাখে : মা এখন মাটি ছানা করছে। কমপক্ষে দুপুর নাগাদ সে মাটির কাজেই মগ্ন থাকবে। বাবাও বাড়ি নাই। বিলু-রাসেল অবশ্যই এখন ইস্কুলের মাঠে খেলছে। অদিতির লম্বা লম্বা পল্লব ঘেরা চোখ দুইটা একটু উদাস হয়।

 

চার

নেউলের মতো নীরবে সে দরজাটা পাড় হয়। ছোট একটা দৌড়ে পেছন বাড়ির কাঁঠাল তলায় এসে দাঁড়ায়। একটা জিংলাপোড়া সাপ তার পায়ের শব্দে ভয় পেয়ে চেল চেল করে জাম্বুরা গাছে উঠে যায়। বাঁশতলার ছাতার পাখিগুলো অনেকদিন পর অদিতিকে দেখে কেচমেচ শুরু করে! অদিতি খুব দ্রুত চিন্তা করছে : বিলুদের কাছে যাবে না দুলিদের বাড়ি যাবে। সে জানে, চারিদিকে কিলবিল করছে দস্যু আর রাজাকার।

অদিতি উত্তর দিকে ছুটতে থাকে। ঝাড়-জংলার ফাঁক-ফুক্কর দিয়ে ক্ষণে তার ফ্রকের লাল কোনা কখনো আবার দবদবে ফর্সা পায়ের গোছা দুইটা ঝলক দিয়ে ওঠে। মেঘের আড়াল থেকে সূর্য্যটাও উঁকি দেয়। সোনারঙে উজ্জ্বল হয় চারপাশ। নিপেন পালের কুমড়া-মাচার নিচ দিয়ে, অমূল্য সরকারের টয়লেটের সামনে দিয়ে ছুটতে ছুটতে সে গিয়ে গাঙপারের পথে ওঠে।

দুপাশে নিরালা বাঁশ ঝাড়। মাঝে মাঝে বড় বড় গাছের নিচে অদ্ভুত নীরবতা। সে এখন ধীর পায়ে হাঁটছে। ঘামে ভেজা চোখ-মুখে আনন্দের ঝিলিক। মাঝে মাঝে পায়ের নিচে শুকনা পাতার কড়মড়! তখন অজানা ভয়ে শরীর রি রি করে। সে গত তিন মাসে পদে পদে দেখেছে, এখন মানুষের জীবনের কোনো দাম নাই। মা বলছে, যে কোনো রাতে তাদের পাড়াতেও ডাকাতের হামলা হতে পারে, পাকসেনারা যে-কোনো মুহূর্তে এসে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাইভস্স করে দিতে পাড়ে বাড়ি-ঘর। গুলি করে শেষ করে দিতে পারে সবাইকে!

চারপাশের নির্জনতায় অদিতি অবাক হয়। কোথাও মানুষের কোনো সাড়া নাই। চলাচল নাই! এখন কেউ সহজে নিরাপদ আশ্রয় থেকে বের হয় না। পালপাড়া থেকে নদীর পার ধরে উত্তর দিকে যে দুপায়ে পথটা গেছে, অদিতি সেই পথে হাঁটতে হাঁটতে এইসব আরেকবার ভাবে। তাকে এখন বড় মানুষের মতো অনেক কিছুই ভাবতে হয়। যে ভাবনাটা বিলু কিংবা রাসেলের নাই। কারণ তারা ছেলে। পথের দু’পাশে ঘন ঝোপ-ঝাড়, লতা-পাতা। মাথার উপরে হেলেপড়া বাঁশঝাড়। মাঝে মাঝে বড় বড় গাছের ডাল-পালা চার দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার অন্ধকারের মতো ছায়া-ঘেরা পথটা দিয়ে সে খুব সতর্ক পায়ে হাঁটছে। এই অবাধ প্রকৃতির মাঝে খেলতে খেলতে, ছুটতে ছুটতে সে বিলুদের সাথে বড় হয়েছে। তাই এই জংলাগুলার কোথায় সাপের আড্ডা, কোনখানে সজারুদের গর্ত, কোন ডালে কখন কোন পাখি বাসা বাঁধে, ছানা তুলে, নদীর খাড়াপারের কোন কোন গর্তে মাছরাঙাদের বাসা সব বিলু-রাসেল আর অদিতির মুখস্ত।

বিলু আর রাসেলকে পাওয়া গেলো বেনেভিটার উত্তরে। সেখানে একটা বদ্দিরাজ গাছ নদীর দিকে হেলে পড়েছে। সেই গাছের ডালে সামনা-সামনি বসে তারা পাকা আম খাচ্ছে। অদিতি জানে এই খাওয়া পর্বটা শেষ হলে ওরা সেই ডাল থেকে নিচের ভারা নদীতে ঝাঁপিয়ে পরার খেলাটা শুরু করবে। গত দুই বছর আগেও অদিতি এই খেলাটা ওদের সাথে খেলেছে। এখন আর সাহসে কুলায় না। লাফিয়ে পড়ার সময় দম আটকে আসে। আরেকটা বড় অসুবিধা হলো তার ফ্রক-টক শরীরের ঠিক ঠিক জায়গায় ঠিকমত থাকে না।

চটকরে অদিতি নিজেকে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে ফেলে। তারপর বনবিড়ালের মতো ডেকে ওঠে, ওয়াপ, ওয়াপ…। মানে আমি এসেছি, তোমরা আমাকে খোঁজে বের কর। ডাক শোনে বিলু-রাসেলের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। হাতের আধ খাওয়া আম ফেলে তারা দুই জনই গাছ থেকে দ্রুত নেমে আসে। চারপাশে নজর বুলায়। বেনেভিটার ছোট ছোট ঝোপ-জংলা, আম-কাঁঠালের গাছ আর গরু-মানুষের চরাটবিহীন পতিত জমিগুলার হাঁটু সমান ঘাস আগের মতই বাতাসে দুলছে। তাহলে বনবিড়ালের ডাকটা কী মিথ্যা ? রাসেলের মন খারাপ হয়ে যায়। বিলু বলে, অদিতিরে কতদিন দেখি না…।
রাসেল বিলুর একটা হাত ধরে বলে, চল অদিতিদের বাড়ি যাই।

এবার পাশের ঝোপে একটা পাখি ডেকে ওঠে। দুজনেরই চোখ চকচক করে। বিলু ঝোপটার দিকে দৌড়ে যায়। রাসেল ঝপকরে মাটিতে বসে পড়ে। আধশোয়া হয়ে ঝোপের ভেতরে তাকায়। সেখানে কুঁকড়া-মুকড়া হয়ে বসে আছে অদিতি। সে দৌড়ে গিয়ে একটা পা ধরে টেনে টেনে ঝোপের বাইরে নিয়ে আসে অদিতিকে। যদিও অদিতি চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছে, ছাড়, ছেড়েদে বলছি; নাইলে লাত্থি খাবি…।

 

পাঁচ

দক্ষিণের বাঁশঝাড়গুলোতে বাতাস এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কলাগাছের পাতাগুলো বাতাসের দাপটে ফাৎ ফাৎ করে পতাকার মতো উড়ছে। এত বাতাস তবু গরমে তারা তিনজনই ঘামছে। ওরা হাঁটতে হাঁটতে বেনেভিটার পশ্চিম দিকে চলে আসে। বিশাল, পতিত এই ভিটাতে একটা পুরোনো কবরস্থান আছে। তার থেকে শ-দুয়েক হাত দক্ষিণে পালদের চিতাশাল। তাই সহজে কেউ এদিকে আসে না। আর এখনতো সংগ্রাম। মানুষতো দূরে থাক এখানে একটা গরু-ছাগলও চোখে পড়ছে না।

রাসেল তার পকেট থেকে সিঁধুর রাঙা তিনটা আম বেড় করে অদিতিকে দেয়। বিলু জংলার বাগিচা থেকে টসটসে পাকা একটা আনারস নিয়ে আসে। বিলু পকেট থেকে আম কাটার ছোট্ট দা বের করে অদিতির দিকে এগিয়ে দেয়। সে পাকাগিন্নির মতো ছোট দা দিয়ে আনারসটা ঠিকঠাক কেটে ফেলে। রাসেল হাফপ্যান্টের পকেট থেকে কাগজে মোড়ানো লবন বের করে বলে, হেকুমুন্সির সিন্দুরাগাছের সব আম শেষ। অথচ এইবার তুই একদিনও খাইলে না।

বিলু জানায়, জানস দেশের অবস্থা খুব খারাপ।
রাসেল বলে, মানিক ভাই বাড়ি থেকে পালিয়েছে। মা সারাদিন কাঁদে। বাবা বলে বড় ভাই ই-িয়াতে চলে গেছে। মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিবে।
অদিতি কিছু বলে না। সে মাথা নুয়ে আনারসের ফালিতে লবন মাখছে। তার কাজল কাজল চোখ ভরে গেছে পানিতে। তাই লজ্জায় মাথা তুলতে পাড়ছে না। রাসেল আনারসের ফালিতে কামড় দিয়ে অদিতিকে বলে, তুই আর ঘর থেকে বাইর হইছ না। মানুষ খুব খারাপ হইয়া গেছে !
রাসেল একটু আমতা আমতা করে বলে, এইযে তুই এইখানে এলি, কাকিমা টের পাইলে নিশ্চয়ই পিটনি দিবে।
এই ফাঁকে অদিতি চোখের পানি গোপনে মুছে ফেলে হাসে, দূর গাধা। মা এখন মাটি ছানা করছে। দুপুর পর্যন্ত সে সেখানেই থাকবে। এর আগেই আমি ফিরে যাব।
বিলু-রাসেল অদিতির কথায় খুশি হয়। তাদের পেটে কত খবর। অথচ অদিতিটা বোকার মতো কিছুই জানে না। এক মাস আগেও তো অদিতি সকাল-বিকাল তাদের সাথেই খেলতে বেরুত। আর এখন যুদ্ধ চলছে !
ওদের চোখ-মুখের ভাব দেখে অদিতি বুঝে, এই কয় দিনের বিরতিতে বিলুরা আর তার সাথে আগের মতো সহজ হতে পারছে না। তাই অদিতিই প্রথম আলাপ জোড়ে, আলফাজদের বাড়িতে নাকি ডাকাতি হইছে ?
হ।
বিলু-রাসেলের মতো আলফাজও তাদের ক্লাসমেট। রাসেল চেয়ে দেখে, অদিতির চোখ টলমল করছে। বিলু বলে, সিন্ধুকের চাবি দিতে দেরি করার জন্য ডাকাতরা আলফাজের বাবাকে গুলি করেছিল। গুলিটা বুক দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়েছে।
পিঠে এইবড় একটা গর্ত হইছিল…।

বিলু দুই হাতের দশ আঙুলে একটা বড়-বৃত্তাকার আকৃতি বানায়। অদিতি জিজ্ঞেস করে, ডাকাতগুলা কোনখানের ?
আমি দুইজনকে চিনি।

বিলুর কথা শেষ হবার আগেই রাসেল ফিসফিস করে বলে, আমিও চিনি।
অদিতি চারপাশে আরেবকার চোখ বুলায়। বিশ-পঁচিশ হাত দূরে কবরস্থানের পাশ দিয়ে একটা বুড়ো বানর হেঁটে যাচ্ছে। তার বয়স্ক-ভারী দেহের চালচলনে কোনো ভয়,ব্যস্ততা নাই। কীএক উত্তেজনায় অদিতির দুই কান গরম হয়ে ওঠে। বুকটা ঢিপঢিপ করে। সে বিলু-রাসেলের দিকে ঝুকেপড়ে ফিসফিসায়, সত্যি চিনস ?
হ। বিদ্যার কসম…।
দুইজনেই মুখ গম্ভির করে কিরাকাটে।

পরশুদিন খুব সকাল সকাল আমি আর বিলু গেছিলাম কেন্দুদের খেঁজুরগাছ তলায়। পাকা খেঁজুর নিয়ে ফিরে আসার সময় দেখি কেন্দু গোয়াল ঘরে। তার হাতে বস্তায় প্যাঁচানো কীএকটা জিনিস। ভারী এবং দুই-তিন হাত লম্বা। তখন কেন্দুর ভয়ে আমরা দুই জনেই খড়ের পুঞ্জির পিছনে লুকিয়ে ছিলাম। বিলু ভয়ে কাঁপছে। ব্যাটা যা হারামি, দেখলে খেঁজুর ত রাখবেই সাথে চড়-থাপ্পরও দিবে। আমরা খড়ের পুঞ্জির পেছন থেকে উঁকি দিয়ে দেখি, কেন্দু হাতের জিনিসটা গোয়াল ঘরের কোনার দিকে খাড়াকরা অনেকগুলো কাঠ-বাঁশের মাঝে লুকিয়ে রাখছে।

এই বলে রাসেল বিলুর দিকে তাকায়। বিলু দুই-তিনবার মাথা ঝাঁকিয়ে রাসেলের কথায় জোর-সম্মতি জানায়।
অদিতি চোখে ঝলক দিয়ে বলে, গোয়াল ঘরের সেই জাগাটা আমরা একদিন খোঁজে দেখব।
আমার মন বলে জিনিসটা রাইফেল। আব্বা বলেছে, ডাকাতির সময় আলফাজের মা নাকি কেন্দু-বসর দুইজনকেই চিনতে পেরেছে।
এইকথা বলে রাসেল অদিতির দিকে তাকিয়ে থাকে। অদিতি আনারসের ফালিতে একটা কামড় দিয়ে বলে, আজকেই আমরা সেখানে যাব।

রাসেল বিলুর দিকে তাকয়। কিন্তু বিলু কিছু বলার আগেই অদিতি দক্ষিণ দিকে আঙুল তুলে বলে, অইযে দেখ, তুফান আসছে।
সারা আকাশ অন্ধকার হয়ে, গাছ-বৃক্ষে হুড়মুড় শব্দ তুলে ঝড়-বৃষ্টি ছুটে আসছে। এলোমেলো বাতাস কাঁধতক নেমে আসা অদিতির চুল নিয়ে টানাটানি শুরু করে। লাল-কালো ছিট ছিট ফ্রকেরপাড় বার বার উড়িয়ে নিতে চাইছে। অদিতি জামার পাড় হাঁটুর নিচে চেপে ধরে বলে, যে ভাবেই হোক রাইফেলটা আমরা নিয়ে আসব। বন্ধুক না থাকলে ডাকাতি করতে পারবে না।
অদিতিরা তিনজন গাঙপারের পথ ধরে পালপাড়ার দিকে হাঁটতে থাকে। বৃষ্টি নাই। শুধু শোঁ শোঁ বাতাস তাদেরকে পথ থেকে উড়িয়ে নিতে চাইছে। তবু তারা তিনজন নীরবে হাঁটে। উড়ে আসা পাখির একটা পালক কুড়ি নেয় রাসেল। তারপর চিন্তামগ্ন অদিতির কানে সেই পালকটা দিয়ে আলতুকরে সুড়সুড়ি দেয়। অদিতি এই, এই… বলে হেলে পড়তে পড়তে রাসেলের হাত থেকে পালকটা কেড়ে নেয়।

তিনজনই ভাবছে কীভাবে রাইফেলটা চুরি করে নিয়ে আসবে। যদি সত্যি সত্যি আনতে পারে। উফ! আনন্দে রাসেলের বুকটা ধকধক করে।

 

ছয়

অদিতি মরার মতো বিছানায় পড়ে আছে। ডর-ভয় আতঙ্কে চোখে ঘুম নাই। গাছের একটা পাতা পড়লেও বুক ধড়ফড় করে ওঠে। মানুষ না হয়ে যদি সে একটা বিড়াল হতো। কোনো পাখি হতো! পাতালপুরের সেই রাজপুত্রটা যদি এসে তাকে এখান থেকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতো! এত কিছু থাকতে কেন যে ভগবান তাকে মেয়ে বানিয়ে পাঠাল ? মাঝে মাঝে গাঙপারে শিয়াল ডাকে। ঝিঁঝি পোকারা তো সন্ধ্যা থেকেই একটানা ডাকছে। মাঝে মাঝে আকাশ ডাকছে গুড়ুম,গুড়…। বৃষ্টি-বাতাস কিছুই নাই শুধু গুমুট গরমে পৃথিবীটা জ্বলছে। আর বিছানায় পড়ে পড়ে ডরে-ভয়ে, ঘামে শেষ হচ্ছে অদিতি। রমেশ পালের কুকুরটা কেন ভয়ার্ত গলায় ঘেউ ঘেউ করছে ? অদিতি কান খাড়া করে বিছানায় মিশে থাকে। একেকটা পলককে মনে হয় লক্ষ লক্ষ বছর!

উঠানের পেয়ারা তলায় কয়েক জোড়া পা এসে থমকে দাঁড়ায়। শোকনা পেয়ারা পাতা মচমচ শব্দে আর্তনাদ করে। বিজলি-চমকানোর মতো টর্চের একঝলক উজ্জ্বল আলোতে তাদের চৌকাঠের ফাঁকা জায়গাটা দুই-তিনবার ঝলসায়! নিজের অজান্তে অদিতির পাতলা দেহটা এক ঝটকায় বিছানা থেকে নেমে পড়ে। জোড়া জোড়া পায়ের আওয়াজ দরজার দিকে এগিয়ে আসছে! পুব দিকে রাখাল পালের দরজা ভাঙার শব্দ হচ্ছে! অদিতি একটানে জংলার দিকের জানালাটা খোলে ফেলে। এখন তাদের দরজাতেও জোরে জোরে লাথি মারছে ডাকাতরা, দরজা খোল, নাইলে ভাইঙ্গ্যাফালাইমু…!

অদিতি এক নিমেষে জানালার ভাঙা শিকটা খুলে ফেলে। তার বাবা-মা বিছানায় বসে কবুতরের মতো কাঁপছে। দরাম দরাম লাথির চুটে দরজাটা বুঝি ভেঙেই পড়বে! কিন্তু উঁচু জানালাটায় তো অদিতি কিছুতেই উঠতে পারছে না! হায় ভগবান! মা এক লাফে বিছানা থেকে নেমে তার কাছে ছুটে আসে। সাথে সাথে বাবাও চলে আসে। দরাম করে দরজাটা ভেঙে পড়ে। কয়টা টর্চের তীব্র আলোতে ঘরটা ধাঁধিয়ে ওঠে। দু’হাতে দুইটা শিক-ধরে এক ঝটকায় সে জানালার চৌকাঠে ওঠে বসে। বিড়ালের মতো চিকন শরীরটা দুই শিকের ফাঁকে গলিয়ে দেয়। সে চোখের কোনা দিয়ে দেখতে পায়, আসুরের মতো হিং¯্র একটা ডাকাত তার বাবার পিঠে লাঠি দিয়ে আঘাত করেছে! বাবা ঢলে পড়তেই অন্য একটা ডাকাত মায়ের চুলের মুঠি ধরে জানালার সামনে থেকে হিচঁড়ে নিয়ে যায়।

অদিতির বারো আনা শরীর জানালার বাইরে ঝুলছে। এখন শুধু পিঠ-মাথা বের করে নিতে পাড়লেই বাঁচে। পেছন থেকে আরেকটা ডাকাত লাফ দিয়ে এসে তার ডান কাঁধটা খপ করে ধরে ফেলে। সে এখন শূন্যে ঝুলছে। মাথার চুলগুলো লুটিয়ে পড়েছে জংলার মাটিতে। সেটা এক তিলের জন্য। তারপরই মেয়েটা ঘরের দেওয়ালে দুই পা ঠেকিয়ে প্রাণপন শক্তিতে নিজেকে বাইরের দিকে ঠেলে দেয়। ফড়ফড় করে একটা শব্দ হয়। গায়ের জামাটা ছিঁড়ে ডাকাতের হাতেই ঝুলে থাকে। অদিতি ছিটকে পড়েই বিড়ালের মতো আরেকটা লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। দুই ঘরের গলিতে ডাকাতদের পায়ের শব্দ হয়! ওরা এদিকেই ছোটে আসছে! অদিতির ছোট্ট-হালকা শরীরটা শূন্যে লাফিয়ে ওঠে। একটু পরেই জঙ্গলের লতা-পাতা চার-পাঁচটা টর্চের আলোতে বারবার ঝলসায়। কিন্তু ততক্ষণে সে জংলা ছাড়িয়ে শেখর দাসের পাটক্ষেত ফুঁড়ে উত্তর দিকে দৌড়াচ্ছে।

 

সাত

এক দৌড়ে শেখপাড়ার প্রথম জংলাটায় এসে অদিতি দমছাড়ে। তারপর হাপড়ের মতো বুক ভরে বাতাস টানতে টানতে বিলুর কথা মনে হয়। তার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। থরথর করে কাঁপছে। সে সাক্ষাৎ যমের হাত থেকে বেঁচে গেছ। কিন্তু তার মা-বাবা ? অদিতি কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে শুয়ে পড়ে। শতশত মশা তাকে ঘিরে ধরেছে। সারা শরীর ছেঁকে ধরেছে মশায়। সে উঠে বসে। আবার বিলুর কথা মনে পড়ে। বিলু তো এখন বনে-বাদাড়ে রাত কাটায়। বিলুর মা মরে গেছে তিন বছর আগে। সেই থেকে বিলু সৎমায়ের শাসনে আছে। শাসন মানে অত্যাচার। গত দুই বছর ধরে বিলু প্রায়ই ইস্কুল কামাই করতে বাধ্য হয়েছে। স্যারেরাও তেমন কিছু বলে না। সবাই জানে বিলুর দিন বড় কষ্টে কাটছে। সপ্তাহে কমপক্ষে চারদিন তাকে বাবার সাথে বাজারে বাজারে পাতিলের বোঝা নিয়ে যেতে হয়! সেইসব দিনগুলোতে বিলু বাড়ি ফিরে রাত নয়টা-দশটায়।

যুদ্ধের প্রথম দিকেই বিলুদের পরিবার পাড়ার অন্যদের সাথে ইন্ডিয়া পালিয়ে গেছে। এর অন্তত দশ-বারোদিন আগেই বিলুও পালিয়ে ছিল। সে লোকমুখে শোনেছে, হেঁটে হেঁটে ইন্ডিয়া যেতে পনেরো-বিশদিন লাগে। পথে ঘুম-খাওয়ার মতো নিজের জীবনটারও কোনো ভরসা নাই। চোর-ডাকাত, পাকসেনা যেকোনো সময় প্রাণ কেড়ে নিতে পাড়ে। ইন্ডিয়া যাবার আগে খেতে বসে তার বাবা প্রায়ই বলতো, যুদ্ধ শেষ হলে সবাই আবার দেশে ফিরে আসবে। তাই শোনে বিলুও ঠিক করেছিল, সে কিছুতেই ইন্ডিয়া যাবে না।

সৎমায়ের অত্যাচার যতই বাড়ছিল বিলুও ততই বেশি বেশি বাড়ির বাইরে বাইরে রাত কাটাতে শুরু করে। অবস্থার ফেরে পড়ে যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই বিলুর বন্য জীবনটা শুরু হয়েছিল। যুদ্ধ এবং অভিবাবকহীন বিলু এখন চারপাশের প্রকৃতির মতো অবাধ। পড়শিদের আম-কাঁঠাল, কলা-পেঁপে, পেয়ারা খেয়ে সে ভালোই আছে। মাঝে মাঝে ভাতের কথা মনে পড়লে শেখপাড়ার দিকে চলে আসে। খাবার সময় যে-কারো চোখে পড়লে তাকে ডেকে নিয়ে ভাত দেয়। দেশের এই অরাজক পরিবেশে ছোট-বড় সবাই এত ভয়াবহ রকমের অস্থির যে কেউ-কারো খবর রাখে না। সবাই আছে ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম’ এমন একটা অবস্থায়।
অদিতির শরীরে কাপড় বলতে শুধু একটা পাজামা । তাকে ঘিরে লাখ লাখ মশা উৎসবে মেতেছে। দু-হাতে ঘঁষে, ঘন ঘন হাত-পা নেড়ে-চেড়েও সে মশার হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। এইরকম চলতে থাকলে সে একটু পরেই পাগল হয়ে যাবে। অদিতি দ্রুত চিন্তা করছে, বিলুর কত গোপন আস্তানা! এখন কোথায় গেলে তাকে পাবে ? কিছুতেই সে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। তারপর হঠাৎ রাসেলের কথা মনে হলে সে অবাক হয়, এই জঙ্গলের পরেই তো রাসেলদের বাড়ি! রাসেলের মা তাকে খুব আদর করে। ওরা তিন ভাই। ছোটটা এবার টু-ক্লাসে ওঠেছে। রাসেলের বড় ভাই কলেজে পড়ত। পাড়ার অন্যসব তরুণদের সাথে সে-ও ইন্ডিয়া গেছে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিসেনা হতে। এখন ঘরে ঘরে, গ্রামে গ্রামে শুধু শিশু-নারী, বুড়া-বুড়ি। তরুণরা দলে দলে ইন্ডিয়া পালাচ্ছে।

অদিতি পা টিপে টিপে উঠান পেরিয়ে রাসেলদের ঘরের বারান্দায় ওঠে। দরজার ফাঁকে ঢিম-করে রাখা হারিকেনের মরা আলো। সে জানে রাসেলের মা রাতে ঘুমায় না। নামাজ-কোরআন পড়ে, খোদার কাছে ইন্ডিয়ায় যাওয়া ছেলের জন্য দোয়া করে। এতক্ষণে শরীরের কাঁপুনি অনেকটা কমে এসেছে। সে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কানপাতে। ভেতরে কোনো সারা-শব্দ নাই। অচমকা তার উদাম শরীরের কথা মনে পরে। শরমে শরীরটা কুঁকড়া-মুকড়া করে দুই হাত দিয়ে সে তার রোগা রোগা বুক-পেট ঢেকে ফেলতে চেষ্টা করে!

জঙ্গলের মশারাও তার ভাগ্যের মতো তাকে ঘিরে ছোট্ট একটা চাক-বেঁধে রাসেলদের দরজা পর্যন্ত চলে এসেছে! অদিতি কপাটের শিকল ধরে ছোট্ট একটা নাড়া দেয়, কাকি, অ-কাকি…।

এই প্রথম অদিতির গলা বন্ধ হয়ে আসে। কান্নার ঢেউয়ে ‘কাকি’ শব্দটা হঠাৎ বুকফাটা আর্তনাদ হয়ে যায়। রাসেলের মা এক টানা বিশ রাকাত নফল নামাজ পড়ে ক্লান্তিতে পাটিতেই একটু কাত হয়েছিল। চোখ দুইটাও ঘুমে জড়িয়ে এসেছিল। স্বপ্নের ঘোরে দেখে; তার বড় ছেলে মানিক ইন্ডিয়া থেকে ফিরে এসেছে। পিঠে একটা রাইফেল ঝোলানো। পোড়া-কাঠের মতো শরীরের মানিক ডাকছে, মা, মা…।

হন্তদন্ত মা দরজার দিকে ছুটে। কাঁপা হাতে কপাট খোলতেই তার পায়ের কাছে গড়িয়ে পড়ে অদিতি। বিড়াল ছানার মতো হালকা-নরম শরীরটা থরথর করে কাঁপছে, কাকি গো, ডাকাত আমারে ধরতে আইছে…!

মা পলকেই সব বুঝে ফেলে। নামজের মাঝেই পালপাড়ার দিকে দরজা ভাঙার শব্দ শুনেছে। চট করে সে মেয়েটাকে ঘরের ভিতরে টেনে অনে। তারপর তাড়াতাড়ি দরজা বন্ধ করতে করতে বলে, কান্দিছ না, আর কিচ্ছু অইত না।

মা নামাজের পাটিতেই অদিতিকে বসায়। কোলের কাছে টেনে নিয়ে আঁচল দিয়ে মেয়েটার চোখ-মুখ মুছিয়ে দেয়। তারতো কোনো মেয়ে নাই। এখন সে মেয়েদের কাপড় পাবে কোথায়?

মা আলনাটা দেখে। মানিকের কালো টি-শর্টটা চোখে পড়ে। এই গেঞ্জিটাতে এখনো তার ছেলের শরীরের গন্ধ লেগে আছে। এশার নামাজের পরে এই গেঞ্জিটাকে বুকে নিয়ে মা নামাজের পাটিতে কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল। মানিক ছিল দবদবে ফর্সা আর শুকনা, লিকলিকে লম্বা। গেঞ্জিটা একটু লম্বা হলেও অদিতিকে বেশ মানিয়েছে! খুশিতে মায়ের চোখ চকচক করে। মাথায় বুঝি একটা দারুণ বুদ্ধিও উঁকি মারে ? সে হারিকেনের সলতে উসকে দিয়ে অদিতিকে ভালো করে আরেকবার দেখে। মায়ের মনে ভয় : একবার যখন চোখ পড়েছে, বাঘ একদিন না একদিন ঘাড় মটকাবে!

মেয়েটা বয়সেরচে একটু বেশি লম্বা। এখনো দুধের শিশুর মতো শরীরটরির বলতে কিচ্ছু নাই। মা টেবিল থেকে কাপড় কাটার কাঁচিটা হাতে নেয়, অদিতির দিকে তাকিয়ে বলে, চুল চাছস না জীবন চাছস ?
অদিতি মাকে জড়িয়ে ধরে, কাকি গো…,আমারে তুমি বাঁচাও। আমি আর বাড়িতে যাবো না।
মা চোখ বন্ধ করে মানিকের লম্বা লম্বা চুলের কথা ভাবে। যুদ্ধে যাবার আগেই লম্বা চুল-দাড়িতে ছেলে নিজেকে আমূল পাল্টে ফেলেছিল! সে বোকা বলেই কিছু বুঝতে পারেনি!

মায়ের কাঁচিতে কচ কচ শব্দ ওঠছে। কয়েক মিনিটের মাঝেই অদিতির কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা চুলগুলা উধাও। একটু পরেই কান-ঢাকা বাবরিচুলে অদিতি হয়ে ওঠে ঝলমলে এক কিশোর! হাসিভরা মায়ের মুখ, তরে অহন ঠিক অভির মতো লাগছে। অভি হইল আমার বড় ভাইয়ের ছেলে। ঢাকা থাকতো। জানিনা এখন বেঁচে আছে কিনা!

মা আলনা থেকে মানিকের পেন্ট এনে অদিতির কোমরের কাছে ধরে মাপ নেয়। তারপর কাচি দিয়ে পেন্টের বাড়তি অংশটা কেটে সেলাই করে পড়তে দেয়। পেন্টপড়া শেষ হলে মা অদিতির দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। এখন অদিতি সত্যি সত্যিই তার বড় ভাইয়ের ছোট ছেলে অভি! মা একটা কাগজে অভির মা-বাবার নাম-ঠিকানা লিখে অদিতির হাতে দেয়, এইটা মুখস্ত করে ফেল। কাল সকালে কেউ তরে জিগাইলে বলবে, আমার নাম অভি। বাপের নাম আফজাল হেসেন। ঢাকার সেগুন বাগিচায় আমাদের বাসা। রাসেল আমার ফুফাত্তো ভাই। পারবে না ?

এইমাত্র হয়ে ওঠা আফজাল হোসেনের ছেলে অভির ভাসা ভাসা চোখ আবার পনিতে ঝাপসা হয়ে আসে। চোখে-মুখে উপচে ওঠা কান্না লুকাবার জন্য সে জোরে জোরে মাথা নাচিয়ে মায়ের কথায় সম্মতি জানায়।

 

আট

ফজরের নামাজের পর মা উত্তরের খাটে ঘুমিয়েছে। পেন্ট-শার্টপরা অদিতি ঘুম ভাঙতেই দেখে : হলুদ ফিতার মতো এক চিলতা আলো এসে তার বিছানায় পড়ে আছে। তাতেই ঘরটা অন্য রকম একটা আভাতে ভরে ওঠেছে! ঘরের বারান্দার খুঁটিতে ঝোলানো খাঁচায় বন্ধি রাসেলের শালিক পাখিটা কেচমেচ করে পাখা ঝাপটাচ্ছে। অদিতি দরজা খুলে বাইরে আসে। পাখিটার দিকে তাকিয়ে সে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে। কঠিন কোনো ভাবনায় পড়লে ঠোঁট কামড়ানো তার অভ্যাস। সে বাইরের দুনিয়াটা আরেকবার দেখে : আজ তিনদিন আকাশে এক ফোটা মেঘ নাই। পৃথিবীটা ডালের বড়ার মতো মচমচা শুকনা। বাতাসে কদম ফুলের ঘেরাণ!

গত এক মাসের চলন-বলনে অদিতি এখন অভি নামের দুরন্ত এক কিশোর। সে এক ছুটে গিয়ে বন্ধি পাখিটা খাঁচা থেকে ধরে আনে। মুক্তি পেতে জীবটা প্রাণপন শক্তি খাটায়। এই অনুভবে অদিতির শরীরটা কেঁপে ওঠে। সেই ডাকাতটা যখন তার একটা কাঁধ খাবলে ধরেছিল সে-ও কী ঠিক পাখিটার মতো করেনি ?
ছাড়া পেয়ে পাখিটা খুব বেশিদূর গেলোনা। উঠানে উড়ে গিয়ে পেয়ারা গাছের ডালে বসে। রাসেলও ঘুম থেকে ওঠে এসে তার পাশে দাঁড়ায়, ছেড়ে দিলে ?
হ।
রাসেল একটা তুড়ি দিয়ে পাখিটাকে ডাকে, রছি…।

পাখিটা গলা টানটান করে রাসেলকে দেখে। রাসেল পুটুস পুটুস তুড়ি দিয়ে রছি, রছি… ডাকছে। পাখিটা এক উড়ালে তার কাছে চলে আসে। অদিতি অবাক হয়। আবার রাগও হয়। পরবশা মানুষের মতো পাখিটাও নিজের সাধ-আল্লাদ ভুলে গেছে ?
রাসেল বলে, মানিক ভাই বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরে বাবা শালিকটাকে ছেড়ে দিয়েছিল কিন্তু সে যায়নি। উঠানে, বারান্দায়, পাকঘরে মায়ের পিছে পিছে ঘুরত। উত্তর বাড়ির হুলু বিড়ালটা একদিন প্রায় খেয়েই ফেলেছিল। তাই মা পাখিটাকে তাড়াতাড়ি ধরে এনে আবার খাঁচায় ভরে রাখে।

এই কথা বলে রাসেল ঘরের ভিতরে চলে যায়। একটু পরেই ফিরে আসে। হাতে একটা খুরপি। চল, গুলতির গুলি বানাতে হবে।
তারা পুকুরের দিকে হাঁটতে থাকে। অদিতি তখনও পাখিটার কথা ভাবছে। রাসেল বলে, এইরকম রোদ পাইলে গুলতির গুলি বন্দুকের গুলির মতো শক্ত হবে।

নাস্তার সময় মা পাতে ভাত দিতে দিতে বলে, অভিকে লইয়া খুব বেশি দূরে যাইছস না।

দুধ-ভাতের মধ্যে গুড়ের দলা ভাঙতে ভাঙতে রাসেল নিজের হাসি লুকায়। মা ভেবেছে, অভির মাঝে লুকিয়ে থাকা অদিতিকে রাসেল সত্যি সত্যি চিনতে পারেনি। সেদিন সকালে রাসেল ঘুম থেকে ওঠলে, মা বাবার সামনে অভিকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। কারণ রাসেলের সাথে অভির শেষ দেখা হয়েছে সাত-আট বছর আগে। তাই মা নিশ্চিত যে অভির কোনো সঠিক কায়া রাসেলের মনে নাই।

ইস্কুলের মাঠের দিকে ছুটতে ছুটতে রাসেল বলে, মা ভাবছে আমি তুকে চিনতে পারিনি।
সেটাই ভালো।
কেন রে…?
তাহলে আমরা ইচ্ছামত চলতে পারব।
অদিতি রাসেলের হাতটা ধরে, আগে চল বিলুকে খোঁজে বের করি।
বিলু খুব মজায় আছে।
রাসেলের কথায় অদিতির চোখ চকচক করে।

অনেক খোঁজা-খুঁজির পর বিলুকে পাওয়া গেল, রমেশ সাহার উজার বাড়িতে। জনশূন্য বাড়িটার দরজা-জানালা বাদে সব লুট হয়ে গেছে। গোয়াল ঘরের কোণায় দুইটা শিয়াল ঘুমিয়ে ছিল। তাদের পায়ের শব্দে জংলার দিকে দৌড়ে পালায়। অবাধ স্বাধীনতায় ঘাস, লতা-পাতা বাড়িটাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে! বড়-ঘরের দরজা দিয়ে দেখা যায় : মেঝেতে অনেক বই ছাড়ানো। বইগুলো ফেলে অন্যসব জিনিসিপত্রের সাথে কাঠের বুক সেলফটাও নিয়ে গেছে!

কত বই! অদিতি উল্টে-পাল্টে দেখে। স্তুপ-স্তুপ বইয়ের ফাঁকে হঠাৎ কালো মতো একটা কী বেড়িয়ে আসে। অদিতি হাতে নিয়ে দেখে সেই বাইনোকুলারটা! এই বাড়ির মালিক রমেশ সাহা তাদের ইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন। অবিবাহিত মানুষটার নেশা ছিল বই আর পাখি। অদিতিরা কতদিন তাকে জঙ্গলে কিংবা বিলের ধারে পেয়েছে। চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে মানুষটা দূরে কোথাও পাখি দেখছে!

 

নয়

ঘরে কাঠের মাচায় বসে বিলু এতক্ষণ সবই দেখছিল। এবার সে সেখান থেকেই তক্ককের স্বরে ডেকে ওঠে, তকক্ তকক্ তক্ক…।
রাসেল অদিতির দিকে তাকিয়ে হাসে। অদিতি বাইনোকুলারটা গলায় ঝুলিয়ে সাড়া দেয়, চিপ, চিপ টুইপ্…।
উপর থেকে বাঁশের একটা সিঁড়ি নেমে আসে। অদিতি রাসেলের দিকে তাকায়। রাসেল উপরের দিকে তাকিয়ে হাসছে। অদিতিও সেদিকে চেয়ে দেখে, পাটাতনে বিলু দাঁড়িয়ে আছে।

কাঠের মাচায় খড়ে-বানানো একটা বালিশ আর ছেঁড়া একটা খেতার বিছানা। কয়েকটা বই। সিথানের দিকে ‘হাকলবেরি ফিনের অবিশ্বাস্য কাহিনি’ বইটা খোলা। পাশে ‘কৃষণ চন্দর’ এর ‘পিকনিক’। অদিতির চোখ দুইটা খুশিতে চকচক করে। এই বইটাই সে একটু আগে নিচে খোঁজছিল। রমেশ স্যার গতবছর তাদের তিনজনকেই ‘হাকলবেরি ফিনের অবিশ্বাস্য ভ্রমণ কাহিনি’ বইটা পড়তে দিয়েছিল।

মাচায় ওরা তিনজন গোল হয়ে বসেছে। সিথানের দিকের ছোট্ট জানালাটার শিকগুলা নাই। সামনের কড়ি কাঠে এই মোটা একটা দড়ি-কাছি ভাঁজ করা। বোঝা গেলো আপদ কালে এখান থেকে খুব সহজেই পালানোর পথও রেডি করে রেখেছে বিলু। অদিতি বিলুর দিকে তাকিয়ে ভাবছে : এই কয়েক মাসের আদিম জীবনে ছেলেটা আপাদমস্তক পাল্টে গেছে। বিছানার পাশেই একটা নোট খাতা। তার ভাঁজে বিলুর সেই প্রিয় ফাইন্টেনপেন কলমটা!

যখন অঝরধারায় বৃষ্টি নামে। শাঁ শাঁ বাতাস ওঠে। তখন মন কেমন কেমন করে। সেই সময়ে রমেশ স্যারের এই খাতায় আমি কিছু লিখতে চেষ্টা করি।
বিলু এইসব বলতে বলতে মাচার কোণার দিকে চলে যায়। স্তুপকরা পাটের বস্তার নিচ থেকে এই মোটা মোটা এক কাঁদি সবরি কলা হাতে নিয়ে সে ফিরে আসে, জানস, আমার কাছে অনেক খবর আছে।
অদিতি জানালার সামনে উপুর হয়ে শুয়ে আছে। চোখে বাইনোকুলার। দূরের আকাশে একটা চিল। অথচ তার মনে হচ্ছে হাত বাড়ালেই সে পাখিটাকে অনায়াসে ধরে ফেলতে পারবে!
তাহলে খবরগুলা বল শুনি।
রাসেল বিলুকে তাড়া দেয়। বিলু তৃতীয় কলাটা গিলতে গিলতে বলে, মুক্তিবাহিনী ক্যাম্প করছে।
অদিতি কেঁপে ওঠে। সে চোখ থেকে বাইনোকুলার নামিয়ে রেখে বলে, কি বললে ?
বিলু আবার বলে, মুক্তিবাহিনী ক্যাম্প করছে।
কোথায় ?
প্রসাদপুরে।
কোনপাড়াতে ?
বাজারের উত্তরে।
চল দেখে আসি বলে, অদিতি উঠে দাঁড়ায়। তার একটুও তড় সয়না।
নদীপাড়ের মূল সড়ক ছেড়ে তিনজন জংলার মাঝ দিয়ে চলছে। খরগোশের মতো নিশব্দ পায়ে সবার আগে বিলু। পেছনে রাসেল। অদিতি হতবাক। গ্রামে মুক্তিবাহিনী এসেছে!
ওরা দেখতে কেমন ?
কিন্তু সে মুখে কিছুই বলছে না। এখন বোকার মতো কিছু বলে ফেললে পরে সুযোগ পেলেই বিলু আর রাসেল এই নিয়ে তাকে খ্যাপাবে। ক্ষেত বানাবে!
গাছের পাতায় পাতায় ঝিরিঝিরি বাতাস। আবছা আলো-ছায়ার রোমা কর এই জঙ্গলময় পৃথিবী তাদের আজন্ম পরিচিত। প্রসাদপুর বাজার ছাড়িয়ে তারা ওমর আলীর বিরাট জংলাটাতে ঢুকে যায়। জংলার সবচে বড় গাছের গোড়ায় এসে বিলু থামে। চারপাশে এক নজর চোখ বুলিয়ে সে গাছটায় কাঠবিড়ালির মতো চেল চেল করে ওঠে পড়ে। পেছনে পেছনে অদিতি আর রাসেলও গাছ বেয়ে উঠছে। ঘন-পাতার আড়ালে মোটা একটা ডালে তিনজন নিবিড় হয়ে বসে।
বাড়িটা জংলা ঘেরা। বাংলা-ঘরের সামনের চাতালটা বেশ বড়। সেখানে চার-পাঁচজন তাগড়া মানুষ নেংটি কষে ট্রেনিং নিচ্ছে। অইযে সবুজ পেন্ট-শার্টপড়া যে, সেই এই দলের কমান্ডার।
বিলুর কথায় অদিতি আর রাসেলের মুখে কোনো শব্দ নাই। তারা বুঝি ভিন গ্রহের কাউকে দেখছে!
বাঁশের লাঠি দিয়ে ট্রেনিং করছে কেন ?
অদিতি ফিসফিস করে জানতে চায়।
রাইফেল মাত্র সাতটা।
মানুষ কয়জন ?
বিলু একবার দুই হাতের দশ আঙুল দেখায়। আরেকবার এক আঙুল। অদিতি অবাক গলায় বলে, মাত্র এগারোজন ?
অদিতির মনটা খারাপ হয়ে যায়। এগারোজন যুদ্ধার জন্য মাত্র সাতটা অস্ত্র! সে চোখে বাইনোকুলারটা লাগিয়ে সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। তারপর কি মনে হতেই বলে, চল। জলদি চল। কাম আছে।

রাসেলের যেতে ইচ্ছা করছিল না। নিশ্চয়ই তার মানিক ভাই এই বাংলাদেশেরই কোথাও এমন একটা গোপন জাগায় অস্ত্র নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে যুদ্ধ করার জন্য। যুদ্ধ করার জন্য যেমন অস্ত্র দরকার তেমনি শক্তি ও বুদ্ধি দরকার। সে বিলুর কানের কাছে ফিসফিস করে ওঠে, মুক্তিরা খাবার পায় কোথা থেকে ?
আমি খাবার পাই কোনখান থেকে ?
এই কথা বলে বিলু বীরের মতো বুক ফুলিয়ে মুচকি হাসে।

 

দশ

বৃষ্টি-বাতাস আর ঠাঁসা-অন্ধকারে বিকালটা হঠাৎ ঘোরতর রাত হয়ে গেলে অতিদিরা দৌড়াতে শুরু করে।

দৌড়ের মাঝেই অদিতি রাসেলের পিঠে হাত দিয়ে বলে, কান্দুদের রাইফেলটা আজ চুরি করব! এই ঝড়-বৃষ্টিতে ডাকাতরা নিশ্চয়ই ঘর ছেড়ে বাইরে বেরুবে না।

বিলু বলে, আমার কাছে আরও দুইটার খোঁজ আছে।

তাইনাকি ?

রাসেল-অদিতি অবাক চোখে বিলুর দিকে তাকিয়ে থাকে। অদিতি বলে, আমরা ডাকাতদের সবকটা রাইফেল চুরি করে নিয়ে আসব।

চুরি করা রাইফেলগুলো মুক্তিবাহিনীকে দিয়ে দেব।

রাসেল এই কথা বলে, মুখে জমে ওঠা বৃষ্টির পানিতে পিচকারি কাটে।

বিলু-অদিতি খুব অবাক হয়। এইটাইতো তাদের প্রাণের কথা তবে কেন এতক্ষণ মনে আসছিল না!

ওরা বৃষ্টিতে ভিজে, অন্ধকার আর পিছল পথ দিয়ে পুব দিকে ছুটছে। সত্যি সত্যি রাইফেলটা সেই গোয়াল ঘরের কোনায় পাওয়া গেলো। অনেকগুলো বাঁশের খুঁটির সাথে বস্তায় মোড়া জিনিসটা খুব সহজেই তাদের হাতে চলে আসে। এত সহজে! ঘটনাটা অদিতি বিশ্বাস করতে পারছে না। রাইফেলটা বিলুই প্রথম আড়া-আড়ি কাঁধে তুলে নেয়। জিনিসটার ভারে বিলুর পিঠ কুঁজো হয়ে আসলে সে ফিসফিসায়, দারুণ ভারী!

উত্তেজনায় রাসেলের কান ঝাঁঝাঁ করছে। নিজেকে কতকিছু ভাবতে ইচ্ছা করছে। কখনো মনে হচ্ছে সে তার বড় ভাই মানিকের মতো অনেক সাহসি। তবে কী সে-ও মুক্তিযুদ্ধা হয়ে যাবে ?
বিলুর কষ্ট হচ্ছে দেখে রাসেল হাত বাড়ায়, আমাকে দে।
না!
না বলে বিলু ঝটপট হাঁটতে শুরু করে। রাসেল মন খারাপ করে বিলুর পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। তার ইচ্ছা করছে জিনিসটা একবার ছুঁয়ে দেখে। গোপাটের সড়কে ওঠার পর বিলু হাঁফাতে থাকে। রাসেল আবার হাত বাড়ায়, এখন আমাকে একটু দে…।
রাসেলের গলায় মিনতি। বিলু রাইফেলসহ কাঁধটা বন্ধুর দিকে এগিয়ে দেয়। রাসেল রাইফেলটা দুহাতে বুকের সাথে আঁকড়ে ধরে।
অদিতি নীরবে হাঁটছে। তার মাথায় কত চিন্তা; কত দিকে হানা দিচ্ছে! তবে সবচে বড় ভাবনাটা হলো, জিনিসটা এখন কোথায় রাখতে পারে ?

রাইফেল কাঁধে রাসেল খুব সাবধানে হাঁটছে। পিছল পথে সে যদি আছাড় খায়। তখন যদি এটা থেকে গুলি বেরিয়ে পড়ে ?
ভেজা বস্তা থেকে টপটপ পানি ঝরছে। সেই পানিতে ছাগলের মুতের গন্ধ! তার বমি আসছে। অবশ্য এইসব বমিটমিকে এখন রাসেল পাত্তা দিতে রাজি না। তার কাঁধে এখন একটা তাজা রাইফেল ! সাথে গুলিভরা তিনটা মেগজিন! সে অদিতি আর বিলুর মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ে। আকাশে বাজ ডাকার কড়াৎ কাড়াৎ শব্দ হয়। বিজলি ঝলকায় চটাস চটাস। ঝলসে ওঠা পৃথিবীর আদিম আলোয় তারা তিনজন পরপস্পরকে আরেকবার দেখে। তাদের টুপটুপা-ভেজা শরীর-কাপড় আর চুল থেকে ঝরঝর করে পানি ঝরছে। রাসেল শার্টের হাতা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলে, জিনিসটা এখন কোথায় রাখব ?
তুদের লাকড়ি-ঘরে।
এই প্রস্তাব অদিতির।

আগামিকাল আমরা রাইফেলটা মুক্তিদের কাছে দিয়ে আসব। এই কথা বলে, বিলু অদিতির দিকে তাকিয়ে থাকে সম্মতির অপেক্ষায়। জমাট অন্ধকারে তারা কেউ কাউকে এখন দেখছে না। শুধু অন্তর আর নিশ্বাসের শব্দ দিয়ে তারা তিনজন পরস্পরকে অনুভব করে।

রাইফেলটা লাকড়ির ঘরে রেখে তারা যেমন নিশব্দে এসেছিল তেমনি নীরবেই আবার বেরিয়ে যায়। এবার দক্ষিণ-পুব কোণার দিকে। অদিতি রাসেলের একটা হাত আঁকরে ধরে হাঁটছে। কাদায় মাখামাখি পিছল পথে রাসেলের পা বারবার ফসকে যাচ্ছে। বিলু কিংবা অদিতি পালপাড়ার মানুষ। মাটি তাদের আজন্ম ভরসা। তার ভাষা ও ভাব পালদেরচে আর-কে বেশি বুঝে ?
বিলু ফিসফিস করে বলে, নেওকা গ্রামের অসকর ডাকাদের আরেকটা রাইফেল আছে। পরশুদিন শেষরাতে পেটের খিদায় আমার ঘুম ভেঙে যায়। দেখি ঘরে কোনো খাবার নাই। আমি বাইরে এসে ভাবছিলাম কোথায় গেলে পাকা ফলটল পাওয়া যাবে ? ঠিক তখনি শুনি, বাড়ির সামনের পথে মানুষের পায়ের শব্দ! শেষরাতে মরা চাঁদের আলোয় আমি গাছের আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দেখি সাত-আটজনের দলটা পুব দিকে যাচ্ছে। নেংটিকাছা মানুষগুলার হাঁটু পর্যন্ত কাদায় মাখামাখি। কাঁধে একটা রাইফেল। তিনজনের হাতে লম্বা লম্বা রাম দা। আমার আর বুঝতে বাকি থাকে না। আমি ঝোপঝাড়, গাছের আড়ালে আড়ালে ওদের পিছু নেই। ধলপহরের সময় ওরা একটা খড়ের গাদায় রাইফেলটা ঢুকিয়ে দিয়ে যার যার বাড়িতে চলে যায়। তখনি আমার ইচ্ছা করছিল, রাইফেলটা চুরি করে নিয়ে আসি। কিন্তু সকাল হতে খুব বেশি দেরি নাই।

রাসেল দাঁড়িয়ে পড়ে, তার যে কী দারুণ লাগছে! সে বলে, একটু পরেই আমাদের রাইফেল সংখ্যা হবে দুই। এখন ইচ্ছা করলে আমরাও মুক্তিবাহিনী হতে-পাড়ি!

অদিতি বলে, আমাদের দলটার নাম হবে ‘বিষপিঁপড়া’। আমরা যতসব পাজিদেরকে সুযোগ পেলেই কুটুস কুটুস করে কামড়াবো।
এইকথা বলে অদিতি মুচকি হাসে।

ওরা এগারোজন না ?।

রাসেল উত্তরের আশায় বিলুর দিকে তাকিয়ে থাকে। বিলু বলে, আমাদের দুইটা পেলে ওদের নয়টা হবে।
আরো যে দুইটা কম পড়ে।

রাসেলের হতাশায় বিলু জানায়, আমি তালাশে আছি। একদিন না একদিন বাকি দুইটাও জোগার হবে।
আবছা অন্ধকারে বিলুর হাসি-হাসি মুখটা দেখে অদিতির মায়া হয়। বনে-জঙ্গলে একা একা ঘুরতে ঘুরতে এতদিনে বিলু সত্যিই একটা ‘বিষপিঁপড়া’ হয়ে ওঠেছে।

 

এগারো

‘ দুইটা রাইফেল আর গুলিভরা পাঁচটা ম্যাগজিন আপনাদের জন্য রেখে গেলাম। এগুলো ডাকাতদের জিনিস। চুরি করে এনেছি।’
ইতি,
বিষপিঁপড়া।

লেখাটা শেষ করে অদিতি হারিকেনটা নিভিয়ে ফেলে। আজ সে সারারাত ঘুমায়নি। মাথায় শুধু এক চিন্তা, কোন উপায়ে অস্ত্র দুইটা মুক্তিদের হাতে পৌঁছে দেওয়া যায় ? বিকাল থেকেই মাথায় গিজগিজ করছিল নানান কৌশল। শেষেমেষ এই চিঠি-পদ্ধতিটা মনমতো হলে সে কাগজ-কলম নিয়ে বসেছিল।

অদিতি জানালার একটা ডালা খুলে সময়ের অনুমান করতে চেষ্টা করে। পুব দিকটা প্রায় ফর্সা হয়ে উঠছে! একটু পরেই নামবে ভোর। তার বুকটা ঢিপঢিপ করছে। শরীরে আজব শিহরণ! পাশের ঘরে রাসেল বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। তার খুব রাগ লাগে। সে পা টিপে টিপে ওঘরে চলে যায়। জোরে একটা ঠেলা দিতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে রাসেল। চোখ বড় বড় করে জানতে চায়, কী হইছে ?
বাইরে চল, কাজ আছে।
রাসেল কথা বলে না। অদিতিকে এক ঝলক দেখেই বুঝে ফেলে। খাট থেকে ঝটপট নেমে আসে, সকাল হইছে ?
এইটু পরেই হবে। চল বিলুকে নিয়ে আসি।
অদিতি প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ছোট্ট চিঠিটা একবার ছুঁয়ে দেখে। অন্যটায় গুলতি-গুলি রাখে। তারপর দুইজন ভোরের নির্ভার বাতাসে গা-ভাসিয়ে রমেশ সাহার বাড়ির দিকে খরগোশের মতো লম্বা লম্বা কদমে এগিয়ে যায়।
বিলু আর রাসেল রাইফেল দুইটা জংলা-ঘেষা ক্যাম্পের দরজার সামনে রেখে চলে আসে। অদিতি পকেট থেকে গুলতি-গুলি বেড় করে। তারপর রাসেলকে কানে কানে বলে, তুরা চলে যা। বাজারের ঘাটের কাছের ঝোপটায় আমার জন্য অপেক্ষা করবে।
অদিতি মরা পাতার ওপর শোয়ে পড়তেই বিলু আর রাসেল কিছু শুকনা লতা-পাতা দিয়ে তার শরীরটা ঢেকে দেয়। সে শোয়ে শোয়ে সেই কাগজটা একটা গুলিতে প্যাচিয়ে, দরজার কপাট বরাবর গুলতি টার্গেট করে। একটু পরেই কপাটে ঠাস-করে শব্দ হয়। পরপর তিনবার। তারপর সে পাতার আড়ালে মাটির সাথে মিশে থাকে। খোলা চোখ দুইটা ক্যাম্পের বন্ধ দরজায়। চার-পাঁচ সেকে-ের মধ্যেই দরজাটা প্রথমে একটু ফাঁক হয়। তারপর এক ঝটকায় খুলে যায়। সবুজ প্যান্ট-শার্টপড়া সেই ছেলেটা। মাথা ভর্তি এলোমেলো লম্বা লম্বা চুল। দাড়ি-গোঁফে ঢাকা মুখ। ডান হাতটা পেছনে লুকানো। তবু ঝকঝকে ছুঁরিটার বাঁট অদিতির চোখে লেগে আছে!
চারপাশে তাকিয়ে কমান্ডার কাউকে খুঁজে। তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়। দুই দুইটা রাইফেল! পাশে একটা দলামচা কাগজ। সে রাইফেল ধরতে গিয়ে কাগজটাই আগে ওঠায়। টেনে ঠিকঠাক করে পড়ে। বারবার পড়ে। আবার চারপাশে কাউকে যেন খুঁজে। জংলার পাতায় পাতায় ঝিরিঝিরি বাতাস। পাখিদের কলতান! ছেলেটা কাগজটা ভাঁজ করে বুক পকেটে রেখে দেয়। তারপর উপুর হয়ে দুই হাতে রাইফেল দুইটা তুলে নেয়।

বারো

মাঝে মাঝে অদিতির মন খুব খারাপ হয়ে যায়। মা-বাবার জন্য গলার কাছে কান্নাটা উথলে ওঠে। ইচ্ছা করে এক দৌড়ে মায়ের কাছে ছুটে যেতে। তখন মনে পড়ে সেই ডাকাতটার কথা। এই বড় গোল গোল চোখ! রাক্ষসের মতো একটা লোমশ হাত তার কাঁধটা চেপে ধরেছিল। জোরবরাত সেদিন পশুটা তার চুলের নাগাল পায়নি! মাঝে মাঝে বিলু কিংবা রাসেল তার মা-বাবার খবর এনে দেয়। পালিয়ে আসার পরেরদিন সকালে নাকি রাসেলের বাবা তার বাবার কানে কানে বলে এসেছিল, অদিতি মানিকের মায়ের কাছে আছে। তার সাথেই থাকতে চায় সে। তোমরা তার জন্য কাঁদবানা। সে ভালো আছে।
বাড়ির কথা মনে হলে সে রাসেলদের পুকুর ঘাটে ছিপ ফেলে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে। টোপের পর টোপ খেয়ে মাছেরা তাকে বারবার ধোঁকা দিয়ে যায়!
আজও সে রাসেলকে নিয়ে মাছ ধরছিল। দুইজনেরই চোখ ছিপের ফাতনার দিকে। হঠাৎ বরশির ফাতনার সামনে ডুব্বুস-করে একটা ঢিল পড়ে। পানি ছিটকে পড়ে চারদিকে। বড় একটা ঢেউ ওঠে। কাঁপতে কাঁপতে ফাতনা তলিয়ে যায়। রাসেল ফিসফিস করে বলে, পাত্তা দিসনা , দেখি বিলু কী করে।
আরেকটা ঢিল পড়ে। রাসেল চুপচাপ। কোনখানে ব্যাটা লুকিয়ে আছে ?
অদিতি বলে, কাঁঠাল গাছে।
পুকুরের পুব কোনায় একটা তক্কক ডাকে, তকক্ তকক্ তক্ক…।
এবার দুজনই উঠে দাঁড়ায়। অভিবাবক কিংবা চারপাশের মানুষকে ফাঁকি দিয়ে তক্ককের ডাকের মাধ্যমে তারা নিজেদের মাঝে অসাধারণ কিছু ইঙ্গিত চালাচালি করে। তাই অদিতি প্যান্টের পেছনে ভিজা হাতটা মুছতে মুছতে বলে, চল।
বিলুকে সত্যিই কাঁঠাল গাছে পাওয়া গেল। দুই ডালের ফাঁকে বসে ব্যাটা এই ভরা ভাদ্রমাসে আরামছে গাছপাকা কাঁঠাল খাচ্ছে। তারা গাছের নিচে যাওয়ার আগেই কাঁঠালের একটা বিচি উড়ে এসে অদিতির মাথায় ঠন্নাৎ করে লাগে। তার মাথাটা চন্নাৎ করে ঘুরে যায়! একটা তামড়ানি খেয়ে অদিতি আবার সোজা হয়। কাঁঠাল গাছের দুই ডালের ফাঁকে বিলুর একটা পা ঝুলছে! অদিতি মনে মনে বলে, রাখ দেখাচ্ছি মজা।
সে দ্রুত একটা মরা ডাল তুলে বিলুর ঝুলন্ত পায়ের দিকে ছুঁড়ে মারে। ডালটা ফাৎ ফাৎ করে বিলুর পায়ের দিকে ছুটে যায়। ঠেঙাটা পায়ে লাগতেই ‘বাবারে…’ বলে বিলু চেঁচিয়ে ওঠে। তারপর সে আস্ত কাঁঠালটাই অদিতির মাথার ওপর ছেড়ে দেয়। অদিতি অবশ্য এইরকম একটা কিছুর জন্য আগে থেকেই মনে মনে রেডি ছিল। তাই সে লাফ দিয়ে সড়ে যেতেই কাঁঠালটা গিয়ে পড়ে রাসেরের পায়ের কাছে। রাসেল ভয় পেয়ে লাফিয়ে ওঠলে অদিতি আর বিলু এক সাথে হেসে ওঠে।
কাঁঠালের রসে ভেজা হাতটা গাছের ডালে ঘষতে ঘষতে বিলু বলে, তর বাইনোকোলারটা নিয়ে আয়। রাজাকাররা রেলব্রীজের বাঙ্কারে থাকে। আতা ঢালির কড়–ই গাছে ওঠে সেখানে একটা খানাতল্লাশি চালাব।
বিলুর প্রস্তাব শোনে একজন তুখোর গোয়েন্দার ভঙ্গিতে রাসেল অদিতির দিকে তাকায়। অদিতি এক নজরেই রাসেলের মনে কথা ধরতে পাড়ে। তারপর ফুড়–ৎ করে বাড়ির দিকে একটা দৌড় দেয়। বয়সেরচে একটু বেশি শক্ত-পুক্ত বিলুর শরীরটা প্রথমে গাছের ডালে ঝুলতে দেখা যায়। তারপর বাঁদরের মতো ছোট্ট একটা দোল দিয়ে সে মাটিতে লাফিয়ে পড়ে।
কড়–ই গাছের সবচে উঁচু ডালে ওরা তিনজন পাশাপাশি বসেছে। সামনে বর্ষার ভরা কালাই বিল। তারপর রেলসড়ক। বিলুর হাতে বাইনোকোলার। সে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে। রাসেলদের রেডিওয়েতে সে শুনেছে, এখন নাকি সারাদেশে মুক্তিবাহিনী গিজগিজ করছে! মাঝে মাঝে চোরা-গুপ্তা হামলা-টামলারও খবর কানে আসে। রেলপথ, সড়কপথের ব্রীজে ব্রীজে রাজাকারদের পাহারা আছে। বাংঙ্কার আছে। সে এখন জানে, বাঙ্কার মানে বড় বড় পাথর আর কাঠের সিলপাট দিয়ে মস্ত একটা গর্তকে নিরাপদ আশ্রয় হিসাবে গড়ে তোলা। সেই বাঙ্কারটাই সে খুঁটিয়ে খুটিয়ে এতক্ষণ দেখছিল। অধির অদিতি যন্ত্রটা পাওয়ার জন্য পাশ থেকে বিলুর পেটে খুঁচা মারে। বিরক্ত বিলু অদিতির হাতে একটু পরেই বাইনোকোলারটা ফিরিয়ে দেয়। অদিতি একটা ডালে বুক ঠেকিয়ে যন্ত্রটা চোখে লাগায়। এক লাফে মাইলখানেক দূরের রেলব্রীজটা হাতের নাগালে চলে এসেছে! ব্রীজের বড় বড় থাম্বা, বাংঙ্কার, বাংঙ্কারের সামনে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। হাতে রাইফেল। কব্জিভর্তি খাড়া খাড়া রগের লোমশ হাতটা দেখেই অদিতির বুকে কাঁপন ধরে! সে তাড়াতাড়ি বাইনোকোলারের লেন্সটা রাজাকারটার মুখের ওপর ধরে। কপালের পাশে লম্বা একটা কাটাদাগ। গোল গোল চোখ!
অদিতির মাথাটা ঝিমঝিম করে। ভয়ে শরীরটা ডাল থেকে ফসকে নিচে পড়ে যেতে চায়! সে হাতের জিনিসটা রাসেলকে দিয়ে গাছের ডালটা জোরে আঁকড়ে ধরে। এই সেই ডাকাত! যে তার কাঁধটা চেপে ধরেছিল। অদিতি বিলুর কাছে জানতে চায়, রাজাকারটাকে তুই চিনস ?
হ। ঝুম্মন। আগে ডাকাতি করত। এখন রাজাকার হইছে।
এই কথা বলতে বলতে বিলু অদিতির দিকে তাকায়, বেশি কথা বলিছনা। একটু বাতাস পাইলে ব্রীজ থেকেই গুলি করবে!
অদিতি জানে, গ্রামে গ্রামে রাজাকারদেরও লোক আছে। ওরা টিকটিকির মতো সবখানে টু টু-করে ঘুরে বেড়ায়। অদিতি গাছ থেকে নামতে শুরু করে। তখনো রাসেলের চোখে বাইনোকোলার। সে দেখছে। দেখোক। অদিতির যা দেখার তা সে দেখে ফেলেছে।
পরদিন সকাল দশটা-এগারোটা হবে। অদিতি পুকুরপাড়ে কাঁঠাল গাছের গোড়ায় গালে হাত দিয়ে বসে আছে। রাসেল আর বিলু মার্বেল খেলছে। তখন অদিতি দেখে, মড়লপাড়ার দিক থেকে কিছু মানুষ দৌড়ে এদিকেই পালিয়ে আসছে। তারা জানে এখন অবশ্যই সেখানে রাজাকারের হামলা হয়েছে। রোজ রোজ দশটা-এগারোটার দিকে আশপাশের গ্রামে গ্রামে রাজাকাররা হানা দেয়। প্রথম প্রথম বাড়ি-ঘর লুট-করে যাবার সময় গোয়ালের গরু-ছাগলও নিয়ে যেতো। এখন আর গরু-ছাগল নাই। এই কয়মাসে ওরা সব খেয়ে সাবার করেছে! তাই এখন রাজাকাররা বাড়ি বাড়ি এসে, দৌড়ায়া দৌড়ায়া হাঁস-মুরগি ধরে। তাদের আসার আওয়াট পেয়ে বাড়ির মানুষ-জন পালালেও হাঁস-মুরগি তো আর পালাতে পারে না। এইসব ভাবতে ভাবতে অদিতির যে কীহয়! সে বসা থেকে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে, চল।
কোথায় ?
বিলুর প্রশ্নের জবাবে অদিতি আঙুল তুলে মড়লপারাটা দেখায়।
চল, কাছ থেকে রাজাকারগুলা দেখে আসি।
এইকথা বলতে বলতে অদিতির চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রাসেল মুঠির মার্বেল একটা ঝোপের মাঝে লুকিয়ে রাখে।
উঁচু বাতরের নিচ দিয়ে কখনো বিলের ঢালা দিয়ে ছুটতে ছুটতে তারা চলে আসে মড়লপাড়ার একটা জংলায়। যে-ঝোপের নিচে পাশাপাশি তারা তিনজন পজিশন নিয়ে শোয়ে আছে তার তিনচার হাত সামনেই মড়লপাড়ার পথটা। তিনটা রাজাকার সেই পথ ধরেই ফিরছে। সবার পিঠে রাইফেল, দুই হাতে ধরা হাঁস-মুরগি। ওরা বুক টানটান করে রাজাধীরাজের মতো হেঁটে আসছে। সবার আগে ঝুম্মন! নিজের অজান্তে অদিতির হাতে গুলতি ওঠে আসে। গুলি রেডি করে সে গুলতির ফিতা টেনে দস্যুটার কপাল টার্গেট করে! তার দুইপাশের দুইজনও নিজ নিজ গুলতি টেনে ধরেছে। একটা অদ্ভুত আনন্দে বিলুর শরীরটা শিহরিত হয়। শিহরণ জাগে রাসেলের শরীরেও। তারা দেশপ্রেম কিংবা যুদ্ধ বোঝে না। শুধু জানে রাজাকার মানে কোনো মানুষ না। দেশের ছোট-বড় সকলেই এদেরকে যেমন ভয়পায় তেমনি ঘৃনা করে।
দুরন্ত কৈশোরের দুঃসাহস থেকে অদিতিরা যেমন করে মরিচপোড়া-ধোঁয়া দিয়ে পাখির বাচ্চা-খেকেু বিষাক্ত সাপকে নিয়ে খেলে, তেমনি তারা রাজাকার নামধারি তিনটা হিং¯্র জীব নিয়ে আজ খেলায় মেতেছে। রাজাকাররা একটা সুবিধাজনক দূরত্বে আসতেই অদিতি ডেকে ওঠে, চিপ চিপ টুইপ্…। অর্থাৎ এক, দুই, তিন। কড়া-রোদ খাওয়া এঁটেল মাটির গুলি তিনটা ঝুম্মনের কপালে লাগতেই তার পৃথিবীটা দশ রিখটার স্কেলে লাফিয়ে ওঠে! পিঠে রাইফেল নিয়ে দানব সাইজের ঝুম্মন পলকে চেতনা হারিয়ে মাটিতে লুটায়। ছাড়া পেয়ে হাতের মুরগিগুলা কক্ কক্ করে ছুটে পালিয়ে যায়। পেছনের দুইজন থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত! কোনো গুলির শব্দ নাই, শত্রুর কোনো কায়া নাই তবু কেন ঝুম্মন মাটিতে লুটিয়ে পড়লো ?
কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরেকবার সেই পাখিটা ডাকে চিপ চিপ টুইপ্…।
দ্বিতীয় জনেরও একই পরিণতি দেখে শেষজন মুরগিটুরগি ফেলে দৌড় দেয়। যেহেতু গ্রামটা রাজাকারদের ধাওয়া খেয়ে উজার এবং অবশিষ্ট জনও এখন প্রায় রেল সড়ক ধরে ধরে। তাই কদম পাতার মুখোশ আঁটা ছোট ছোট তিনটা কায়া ছুটে এসে অজ্ঞান রাজাকারদের পিঠ থেকে রাইফেল দুইটা খুলে নিয়ে আবার জঙ্গলে মিলিয়ে যায়।

তেরো

রাত হলে রাজাকাররা ব্রীজের বাঙ্কার থেকে ঘনঘন গুলি করে। সেই শব্দে অদিতির ঘুম আসে না। আজও চোখটা লাগতেই পট্ঠুস… করে পরপর কয়টা গুলি হয়। অদিতি জানে এটা চায়না রাইফেল। রাতের টহলে পাকসেনারা এলে কোনো কোনোদিন এল এম জি দিয়ে থের থের করে টানা ব্রাশ ফায়ার দেয়। অদিতি কপাটের ফাঁকে চোখ রাখে, বাইরে ফকফক করছে দুধ-সাদা জোছনা! কয়দিন ধরে কোনো বৃষ্টি নাই। ঘামে-গরমে অদিতির পিঠ ঘামাচিতে ভরে গেছে। সে পিঠ চুলকাতে চুলকাতে রাসেলের রুমে চলে আসে। রাসেল হা-করে ঘুমাচ্ছে। অদিতি প্রথমে ওর থুতনিতে চাপ দিয়ে মুখের হা-টা বন্ধ করে দেয়। তারপর সে একটা মুচকি হাসি দিয়ে ওর নাকটা চেপে ধরে। রাসেল ধড়ফড়িয়ে ওঠে বসে। চোখ বড় বড় করে বুঝতে চায়, কী ঘটেছে ? চোর-ডাকাত, রাজাকার-পাকসেনা; চারপাশে কত হুজ্জত, কত দুরাবস্থা! অদিতি ঠোঁট কামড়ে হাসি দমন করতে চেষ্টা করে। একটু ভাবে তারপর আঙুল দিয়ে জানালার দিকে ইশারা করে বলে, দেখ কী জোছনা! ল বাইরে যাই।
ফনফন বাতাস বইছে! অক্লান্ত ঝিঁঝিরা ডাকছে। চারপাশে জনমানবের কোনো সাড়া নাই। রাসেল বলে, ল রণপা দিয়ে হাঁটি।
অদিতি বলে, তার আগে শরীরে সাদা কাপর প্যাঁচিয়ে জিন-ভূত সাজতে হবে। তাহলে আনেক মজা হবে।
আমরা যেদিক ইচ্ছা সেদিক যেতে পারব। কেউ আমাদেরকে দেখে ফেললেও জিনÑভুত ভেবে ভয়ে পালাবে।
এইকথা বলে রাসেল অদিতির একটা হাত ধরে।
শুধু ভয় পাবেনা; পরের দিন থেকে জনে জনে বলে বেড়াবে, কালকুয়া রাইতে আমি তিনটা ভুত দেখছি। আসমান সমান উঁচা, বাতাসের লগে উইড়্যা বেড়ায়!
এই বলে অদিতি মুচকি মুচকি হাসে।
বাঁশের ‘রণপা’ দিয়ে বড় বড় কদম ফেলে কয়েক মিনিটেই তারা রমেশ মাস্টারের বাড়িতে চলে আসে। উজার বাড়িটা চাঁদের আলোতে খা খা করছে! বাড়ির সামনে একটা আমগাছের ঘন ছায়ায় দাঁড়িয়ে অদিতি জোরে জোরে ডাকে, তকক্ তকক্ তক্ক…।
পরপর তিন-চারটা ডাক দিয়ে তারা একটুক্ষণ অপেক্ষা করে। বিলুর কপালে আজ ভাত জোটেছিল। মুরগির মাংস আর চিকন চালের ভাত পাতে দিয়ে শেখপাড়ার ফজল চাচার বুড়ি বউ বলেছিল, খা, পেট ভইর‌্যা খা। চরণের ঠাঁই আছে, অহন মরণের ঠাঁই নাই! কহন পাকিস্তানিরা আইয়া ফুট্টুস কইরা গুলি মারে! হাঁস-মুরগি দ্যায়া আর কি অইব। সব-ত রাজাকার-পাকিস্তানিরাই ধইর‌্যা ধইর‌্যা খাইতাছে।
কড়া ঝালের লাল সালুন দিয়ে বিলু গলা পর্যন্ত ঠেঁসে খায়। খাওয়া শেষে আর নড়াচড়া করার শক্তিছিল না তার। সে কোনোমতে গড়িয়ে গড়িয়ে এসে পাটাতনে উঠেছিল। তারপর ঘুম। অদিতির ডাকে হুঁশ ফিরে। এখন দিন না রাত, সে কোথায় আছে ? এইসব জিজ্ঞাসার কোনো দিশা না পেয়ে সে কানপেতে ডাকটা শুনে। তবু কিছুই মনে করতে পারে না। শেষে যখন রাসেলে-অদিতির কথা মনে পড়ে, তখন সে লম্বা করে ডাকা তক্ক…শব্দটার অর্থ ধরতে পারে। বিলু সাথে সাথে ওউঠে বসে। অদিতি ডাকছেই, তকক্ তকক্ তক্ক…। বিলু সিথানের দড়িটা ধরে ছড় ছড় করে নিচে নেমে আসে। দরজাতো খোলাই থাকে। তাই চোখ মেলতেই দৃষ্টি চলে যায় উঠানের আমতলায়! এই উঁচা, মস্ত মস্ত দুটো সাদা ভুত পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে! বিলুর শরীরটা ভয়ে কেঁপে উঠে। এই কয়েক মাসে কত চেনা-জানা মানুষ গুলি খেয়ে মরেছে! অপঘাতে যাদের মৃত্যু হয় তারা নাকি ভুত হয়ে ফিরে আসে। হঠাৎ বিলুর মনে সন্দেহ জাগে, ভুতেরা এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার কথা না। সে শুনেছে বিচিত্র ভঙ্গি-টঙ্গি করে ভুতেরা মানুষকে ভয় দেখায়, ঘাড় মটকে দেবার জন্য নানান ছল-ছুতায় কাছে ভিড়ে। এরা নিশ্চয়ই অদিতি আর রাসেলে! মনে পড়ে, গত পরশু দিন তারা বাঁশের রণপাতে সাদাকাপড় প্যাঁচিয়ে নিয়েছে। তখন অদিতি বলেছিল, বেরোবার সময় সাদা চাদর দিয়ে শরীর-মাথাও ভালোভাবে জড়িয়ে নিতে হবে। তাহলে কেউ আমাদেরকে দেখে ফেললেও ভুত ছাড়া অন্যকিছু ভাবতেও পারবে না।
গাঙপারের সড়ক ধরে তারা তিনজন পাশাপাশি রণপা দিয়ে দক্ষিণ দিকে দ্রুত হাঁটছে। দেবদূতের মতো দুধ-সাদা কায়া তিনটা জোছনার তীব্র জেল্লায় মনে হয় আসমান ছুঁয়ে ফেলবে! রুছমতের বাড়ির পাশে এসে অদিতি থেমে যায়। ছনে-ছাওয়া মাটির দেওয়ালের ঘরটা থেকে রুছমতের নাক ডাকার শব্দ আসছে। পাশেই তালপাতায় ছাওয়া ছোট্ট একটা পাকঘর। দুই-তিন মাস আগে দোচালাটা তুফানে ফেলে দিয়েছিল। কাত হয়ে পড়ে থাকা চালার আড়ালে বসেই রুছমতের বউ রান্নাটান্না করে। যেখানে জীবনের একতিল ভরসা নাই সেখানে কীহবে আর ঘরটর দিয়ে। তাই রুছমত ভাঙা পাকঘরটা মেরামত করেনি। অদিতি চাদরের আড়াল থেকে বাঁশের ছোট চোঙটা এনে করে মুখে লাগায়, রুছমত বাড়িৎ আছৎ ?
অদিতির গলা বাঁশের চোঙায় বারি খেয়ে পশ্চিমপাড়ার বদরুলের গলার মতো ঘাউ ঘাউ করে ওঠে! বদরুল ছিল অদিতির বাবার বন্ধু। যুদ্ধের আগে তার বাবার সাথে হুঁক্কায় তামাক খেতে খেতে একদিন বলেছিল, রুছমতের কাছে একমুন ধানের দাম বাকি। ট্যাহাটা চাইলেই খালি টালবাহানা করে।
পাকসেনাদের গুলি খেয়ে মরবার আগের দিনও অদিতির বাবার কাছে বদরুল কাকা নালিশ করেছিল, রুছমতটা আমার ধানের দাম দিল না। দশটাকা ছ আনা মাইরা দ্যায়া ব্যাডা আর কত বড়লোক অইব ?
রুছমত শোয়া থেকে লাফ দিয়ে ওঠে বসে, কাঁপা কাঁপা গলায় মিনমিন করে জানতে চায়,ক্যাডাগো… ?
বিলু অদিতিকে খোঁচা মারে। অদিতি এবার চোঙা দিয়ে বলে, আমি পচ্চিমপাড়ার বদরুল; ধানের দামটা নিতে আইছি। আজকোয়া ট্যাহা না দিলে তর ঘাড় চাবায়া খাইয়াম।
ভয়ে রুছমতের কালো শরীরটা লাল হয়ে ওঠে। বদরুলের নাম শুনে রুছমতের বড় মেয়ে আর বউও ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে তার শরীর ঘেষে বসে। গুলি খেয়ে মরে যাওয়া বদরুল তিন মাস পরে কউত্থে আসে ? দমফাঁটা নীরবতায় অদিতি ধমক দেয়, ট্যাহা দে, নাইলে বাতাস অইয়া ঘরে ঢুহাম।
এই কথায় রুছমতে মেয়ে-বউ হাউমাউ করে কান্না জোড়ে দিলে দুধ-সাদা কায়া তিনটা দক্ষিণের দিকে তাড়াতাড়ি সড়ে যায়। তিনজনেই খুক খুক করে হাসছে।
রণপায়ের এক একটা কদম পাঁচ-সাত হাত লম্বা। তাদের হাঁটার সাথে তাল রেখে চলতে হলে সাধারণ যে-কাউকে প্রাণপণ দৌড়াতে হবে। দেখতে দেখতে তারা পাইথল-মৌলভি বাড়ির কাছে চলে আসে। এই বাড়ির ছেলে হবিবুল্লা আলবদর হয়েছে। সে আলবদর বাহিনীর থানা কমান্ডার। রাস্তা থেকে বাড়িটা দুই ক্ষেত পশ্চিমে। বাড়ি থেকে একটা মোটা বাতর সড়কে এসে ওঠেছে। কোনো কিছু না ভেবেই অদিতি রাসেল আর বিলুকে ইশারা দেয়। তারা দুইজন দু-দিকে সড়ে গিয়ে কাঁঠাল গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকে। এই এলাকার যত ডাকাত-বদমাশ সবাই হবিবুল্লার বাড়িতে যাওয়া-আসা করে। সেই জন্যই কী অদিতি এখানে খাপ-পেতেছে ?
বিলু-আর রাসেল এইসব মনে মনে ভাবছে। ঠিক এইসময় বাড়ির দিক থেকে একটা লোক মোটা বাতর ধরে এই দিকে আসতে থাকে। অদিতি রণপা দিয়ে একটা শুকনা পাতায় ভর দেয়। মচ-করে ছোট একটা আওয়াজ হয়। এই ইশারায় বিলু আর রাসেল গাছের আড়ালে লুকায়। অদিতিও একটা কাঁঠাল গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে লোকটার জন্য অপেক্ষা করে। সে মনে মনে হাসছে। আনন্দ আর উত্তেজনায় তার দুই কান শাঁ শাঁ ডাকছে। নিজের গরম নিশ্বাসে নাকে-মুখে ছ্যাঁকা লাগছে! আজকের এই আনন্দ-অভিযানের কথা সে জীবনে কোনোদিন ভুলবে না।
লোকটা এসে বাতর ছেড়ে সড়কে ওঠে। কালো কাবুলি সেটের সাথে মানুষটার মাথায় জিন্না টুপি! বিলু-রাসেল আর অদিতি তিনদিক থেকে এসে লোকটাকে ঘিরে বৃত্তাকারে দাঁড়ায়। বাঁশের চোঙাটা মুখে লাগিয়ে অদিতি রেডি। লোকটা সড়কে উঠেই দেখে, তিনদিকে আসমান উঁচা তিনটা জিন তার পথ রোধকরে দাঁড়িয়ে আছে। সে ‘অরে বাবারে…’ বলে যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে ছুটে যেতে চায়। এক পলকে তারা তিনজন লোকটাকে চিনে ফেলে। এ হচ্ছে হবিবুল্লার প্রধান চেলা। এই লোকটাই এলাকার খবরটবর আলবদর কমান্ডারের কানে পাঠায়। অদিতি এক কদম এগিয়ে গিয়ে পথটা রোধ করে। মুখে চোঙা লাগিয়ে বিলু বলে, হবিবুল্লা বাড়ি আছে ?
এইকথায় লোকটা মাটিতে আছড়ে পড়ে, জিন বাবা আমারে তুমি জীবন ভিক্ষা দেও, আমি সব কইতাছি।
হানাদারগর বর্তমান খবর কী ?
বড় খবর আছে, নেওকা গেরামে যে দুইটা রাইফেল বে-হাত হইছে তার জন্য আগামিকাইল হেই গেরামে মিলিটারির একশন অইব।
কোনখান থেকে মিলিটারি আসবে ? এই কথা বলে, বিলু নিজের হাসি চাপে।
সকাল দশটার টেরেইনে শ্রীপুর থাইকা অনেক মিলিটারি আইব। আস্তা গেরাম হেরা জ্বালাইয়া দিব। মানুষ ত মানুষ, কুত্তা-বিলাইতুরি গুলি কৈরা মারব।
এইসব বলতে বলতে ভয়ে লোকটা পেশাব করে দেয়। কাঁপনের চুটে সে কি বলছে তার কোনো হিতাহিত নাই। চোঙা দিয়ে রাসেল বলে, তুই আমারে চিনছস ?
হ, চিনি। আফনে জিন বাবা।
না। আমি কালাম।
বিলু বলে, আমি আজাদ।
অদিতি বলে, আমি রহিম। আমরা মুক্তিযোদ্ধা হইতে চাইছিলাম। এই খবর তুই আলবদর হবিবুল্লারে দিছিলে। আলবদরটা কৌশলে আমগরে মিলিটারির হাতে তুইল্যা দিছিন। হেরা কাওরাইদ ব্রীজ থাইক্যা গুলি কৈর‌্যা আমগরে গাঙ্গে ভাসায়া দিছিন। মনে আছে ?
উপুর হয়ে বসে থাকা অনুভব শূন্য লোকটা গলাকাটা মুরগির মতো ক ক করে জ্ঞান হারায়। অদিতি রণপা দিয়ে লোকটার নাকটা চেপে ধরে। একটু পরেই লোকটা বাতাসের জন্য হুড়মুড় করে উঠে বসে।
রাসেল লোকটাকে বলে, তর এই অপরাধের শাস্তি কী তুই নিজে বলে দে।
লোকটা হাউমাউ করে বলে, তুমগর পাওধরি, ভাই তুমরা আমারে মাফ কৈর‌্যা দ্যাও।

চৌদ্দ

ঝোপ-ঝাড় ঘেরা বড় একটা গাছের গোড়ায় বসে তিনজন ভাবছে। কারো মুখে কথা নাই। আবছা অন্ধকারের অস্বস্থিকর নীরবতা বিলুই প্রথম ভেঙে দেয়, আগামীকাল পাকসেনারা আস্তা নেওকা গ্রাম জ্বালিয়ে দিবে।
রাসেল বলে, গুলি কৈর‌্যা সবকটারে মারবে রে…।
বিলুর গলা শুকিয়ে আসে। একটা খেলা করতে গিয়ে তারা কত বড় সর্বনাশ ডেকে এনেছে! এই এক অনুতাপে রাসেল আর বিলুর হাত-পা লোলা হয়ে আসে। তারা দুইজনই দেখে, অদিতি গাছে হেলান দিয়ে চোখ-বুঁজে বসে আছে। তাই দেখে বিলু বলে, রাইফেল দইটা যদি না আনতাম ?
বেশ করেছি।
এইকথা বলে, অদিতি বসা থেকে ঝটকরে ওঠে দাঁড়ায়, চল একবার গয়েশপুরটা ঘুরে আসি।
মাউড়াপট্টির আড়ালে আড়ালে তারা রেলপথটাও পেরিয়ে যায়। অদিতি খুব মন দিয়ে সব দেখছে আর ভাবছে। রাণপায়ের লম্বা লম্বা কয়েক কদমে তারা গয়েশপুরের ‘ইরি সেচপ্রকল্প’র তেলের ডিপুর দিকে এগিয়ে যায়। গাছ-গাছালি আর কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা মস্ত অফিস বাড়িটা নিঝুমপুরি! বড় গেটটা হা-হা খোলা। ডিপোইনচার্জের অফিসের সামনে এসে তারা রণপা থেকে নেমেপড়ে। অফিসের কপাট ভাঙা। ভেতরের জিনিসপত্র তছনছ। তিনজনেই নীরবে বেরিয়ে আসে।
মাঠের পশ্চিম দিকে তেলের ডিপো। এলোমেনিয়ামের হাড়ি-পাতিলের মতো বৃত্তাকার বিশাল ডিপোটা দবদবে জোছনায় ঝলমল করছে! রাসেল অফিসের বারান্দায় বসে থাকে। অদিতি মন খারাপ করে ডিপোর সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছে। এই রেলপথ দিয়ে আজ ভোরের ট্রেনে শ্রীপুর থেকে পাকসেনারা আসবে!
বিলু ডিপোর চারপাশটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। মার্চের শেষ দিকেও সে এই বাজারে তার বাবার সাথে পাতিল বেচতে এসেছিল। শেষবার সে দেখে গেছে, সেচ প্রকল্পের জন্য ডিজেলভরা অনেকগুলা ট্যাংঙ্কার নিয়ে একটা তেলের গাড়ি এই তিন নম্বর লাইনে এসে খালাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। তার দুইদিন পরেরই তো ট্রেনভর্তি হয়ে পাকসেনার এসেছিল। বিলু ডিপোর পশ্চিম দিকে সড়ে যায়। ট্যাংঙ্কার থেকে তেলভরার সেই হোসপাইটা এখানো ডিপোর গোড়ায় লাগানো আছে। লম্বা পাইটার শেষ মাথা রেলপথে দাঁড়ানো তেলের গাড়ির পাশেই পড়ে আছে! তার ছোট্ট বুকটা অজানা আনন্দে খলবল করে ওঠে। সে উপুর হয়ে পাইপের গোড়ায় হাত রাখে। এখনো ফোটা ফোটা তেল ঝড়ছে! হানাদারদের ভয়ে ব্যাটারা নিশ্চয়ই তড়িগড়ি পালাতে গিয়ে ভালো করে পাইপের গোড়ার চাবিটাও এঁটে যায়নি!
ভয় আর অনুতাপে একরোখা অদিতি একটা নারকেল গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাবছে। উদভ্রান্তের মতো ভাবছে: কীকরে এই গজবের হাত থেকে নেওকা গ্রামের মানুষগুলাকে বঁচাবে সে ? এইসবের জন্যযে তারা তিনজনই দায়ি!
বিলু এসে অদিতির হাত ধরে, আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে। চল, দেখবে।
অদিতি পাইপের গোড়ার মোটা চাবিটা মোচর দিতেই নেতিয়ে থাকা হোস পাইটা তীব্রচাপে তড়বড় করে শক্ত হয়ে ওঠে। সে আবার চাবির চাকাটা ঘুরিয়ে বন্ধ করে দেয়। বিলু তার দিকে তাকিয়ে বলে, ঠিক আছে না ?
হ। মনে হয় আস্তা ট্যাংকটা ডিজেলে ভরা। চল, পাইপের মাথাটা কোথায় আছে একবার দেখে আসি।
পাইপের মাথাটা দুইজনে টেনে নিয়ে রেলের মাঝে ঠিকঠাক রেখে দিয়ে দাঁড়াতেই দেখে রাসেল। টিপটিপ পায়ে সে-ও এসে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে বেশ লম্বা আর মোটা একটা তার। অফিস ঘরের বারান্দায় সে এটা পেয়েছে। অদিতি রাসেলের হাত থেকে তারটা নিয়ে পাইপটাকে রেলের সাথে কষে বাঁধে। এবার চাবি ঘুরিয়ে দিলে তেলের বেগে পাইপ ঠিক জায়গা থেকে সড়ে যেতে পারবে না।
এখন কোথাই আগুন পাই ?
এইকথা বলে অদিতি বিলুর দিকে তাকায়।
আমার কাছে একটা ম্যাচ আছে। বিলু বলে।
তুই বিড়ি খাস ?
অদিতি বিলুর দিকে চোখ বড় বড় করে তাকায়।
না। আগুন কিংবা ম্যাচ সাথে থাকলে জিন-ভুত কাছে আসে না।
অদিতি বিলুকে ফিসফিস করে বলে, তুই চাবিটা খুলে দিয়ে আয়।
চাবিটা ঘুরিয়ে দিতেই অসাড় পাইপটা থরথর করে জেগে ওঠে। বিলু দৌড়ে এসে দেখে পাইপের মুখ দিয়ে ঝপঝপ-করে ছিটকে পড়ছে ডিজেল। তাতে রেলপথ ভেসে যাচ্ছে। অদিতি বিলুর হাত থেকে ম্যাচটা তুলে নেয়, তুরা সড়ে যা।
ফস-করে জ্বলে ওঠে বারুদের নীল শিখা। আগুনটা তেলের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে অদিতি লাফ দেয়। মুহূর্তে গয়েশপুরের আকাশ লাল হয়ে ওঠে। রাজাকাররা সূতিয়া নদীর ব্রীজ থেক ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি ছুঁড়ছে। কিন্তু ওপাশটা নীরব দেখে অচিরেই বাঙ্কারের চায়না রাইফেলগুলা থেমে যায়। অসংখ্য গুলির শব্দ আর আগুনের লাল আভায় জেগে ওঠে আশপাশের গ্রামগুলা। দুধ-সাদা তিনটা কায়া এখন শূন্যে ভাসতে ভাসতে উত্তরের দিকে ফিরে যাচ্ছে।
প্রসাদপুর ক্যাম্পের মুক্তিরাও জেগে ওঠেছে। পুব দিকের সারা আকাশ জোড়ে মুখ তুলছে ভোরের ধলপহর। কমান্ডার দাঁড়িয়ে আছে ক্যাম্পের সামনে। তার পায়ের কাছে কাগজে জড়ানো একটা জিনিস এসে ছিটকে পড়ে। সে চমকে পিছিয়ে যায়। চারপাশে চেয়ে দেখে কেউ নাই! শুধু বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে হিম হিম হালকা কুয়াশা, শেষ-রাতের বাতাসে হেমন্তের আভাস! কমান্ডার উপুর হয়ে জিনিসটা উঠায়। দলামচা কাগজটা ঠিকঠাক করে চোখের সামনে মেলে ধরে : আজ থেকে তিনদিন আগে নেওকা গ্রামে, রাজাকারদের ওপর আমরা একটা গুপ্তহামলা চালিয়েছিলাম। দুইজন রাজাকার আহত ও অজ্ঞান হয়েছিল। সেই সুযোগে রাইফেল দুইটাও নিয়ে এসেছিলাম। সেই জন্যই আজ নেওকা গ্রামে পাকসেনাদের এ্যাকশন নেওয়ার কথাছিল। পাইথল মৌলবি-বাড়ির আলবদর হবিবুল্লার সূত্র থেকে আমরা কৌশলে সেই খবর সংগ্রহ করি। যেহেতু হানাদাররা শ্রীপুর থানাক্যাম্প থেকে ট্রেনে আসবে। তাই গয়েশপুরের ডিজেল ডিপোর তেল দিয়ে রেলপথটা গতরাতে আমরাই জ্বালিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তাতেই কী হানাদাররা থেমে যাবে ?
এই তল্লাটের সব খবর নিশ্চয়ই আলবদর হবিবুল্লার মারফৎ হানাদাররা পেয়ে থাকে। তাই আসছে দিনগুলাতে আপনাদের আরও সতর্ক থাকা উচিৎ। রাজাকারদের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা রাইফেল দুইটার একটা আমাদের কাছেই থাকবে। আর অন্যটা আপনাদের জন্য বাজারের পিছনের বেতছোপার মাঝে লুকানো আছে।
ইতি,
বিষপিঁপড়া।
চিঠিটা পড়তে পড়তে হতবাক কমান্ডারের শক্ত শরীরটা পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে যায়, কারা এই বিষপিঁপড়া ?

 

পনেরো

তিন-তিনটা জিনের উৎপাতের খবর এখন গ্রামে গ্রামে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ তো মানুষ চোর-ডাকাতরাও এখন আর সন্ধ্যার পরে বড় সড়কে চলাচল করে না। শেষ বিকালের দিকে হিমে-কুয়াশায় পৃথিবীটা হয়ে ওঠে আড়ষ্ট। মাঝে মাঝে দুপুরের দিকে শাঁ করে উড়ে আসে ভারতীয় জঙ্গিবিমান। রেলপথ, সড়ক পথের বড় বড় ব্রীজগুলা বোমার আঘাতে মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন করে ওরা আবার ই-িয়াতে পালিয়ে যায়! পাকসেনারা এখন আর ক্যাম্প ছেড়ে কোথাও বের হয় না। রাজাকারদের উৎপাতও অনেক কমে গেছে। কিন্তু ওরা যখন বের হয় তখন শয়ে শয়ে দাবানলের মতো ধেঁয়ে আসে। এল এম জি কামান-মর্টার, গ্রেনেটের রক্তখেকু উল্লাসে মুহূর্তে ছারখার হয়ে যায় গ্রামকে গ্রাম। পোড়া ছাইভস্মের পাশে পড়ে থাকে অগনিত লাশ!
সন্ধ্যার পর নিঝুমগ্রামগুলা থেকে পিলপিল পায়ে বেড়িয়ে আসে মুক্তিযুদ্ধারা। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে নিমেষে হাওয়া হয়ে যায়! মাঝে মাঝে দেখা যায় কারো উঠানে কিংবা ঘরের ফাঁকে দাঁড়িয়ে ভাত কিংবা চিড়া-মুড়ি খাচ্ছে। লেংটিকাছা ছেলেগুলার কাঁধে রাইফেল। জল-কাদায় মাখামাখি মানুষগুলা কোনোমতে হাত ধোয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ভাত গিলছে গপগপ। নিজের পাতের ভাত ওদের মুখে তুলে দিতেপেড়ে বাড়ির ছোট-বড় সকলেই মহাখুশি! তাই ভাগ্যগুনে বেঁচে থাকা গ্রামবাসিরা মুক্তিদের নিয়ে আশাভরা গলায় কানাকানি করে। তাদের মলিন চোখ-মুখ এক অসম্ভব আলোতে চকচক করে।
গ্রামের ছোট ছোট ছেলেরা বাঁশ দিয়ে বন্ধুক বানিয়ে ফেলেছে। পাকা কামঙাকে তারা গ্রেনেট হিসাবে ব্যবহার করে। আর বাঁশের চোঙার মধ্যে লাটিমের মতো মেরাগুটা ফেলে টিগার টানলেই ভেতরের জিনিসটা গুলির মতো ছুটে যায়। এই দিয়ে তারা বাড়ির আনাচে-কানাচে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে। সেই যুদ্ধে একদল হয় মুক্তিবাহিনী। অন্যটা হানাদারবাহিনী। গুলাগুলির এক পর্যায়ে হানাদাররা বাঁশের রাইফেলসহ দু-হাত উপরে তুলে আত্মসর্মপণ করে! তাই দেখে বড়রাও গোপন আমুদে হাততালি দেয়।
শীতের শুরুতে রোদেলা দুপুর। অদিতিরা তিনজন গাঙপারের জংলায় চলে এসেছে। রাসেলের হাতে চটের একটা ব্যাগ। ব্যাগটায় আছে শুকনা মরিচ। অদিতির হাতে খুন্তি-কোদাল। বিলুর পকেটে ম্যাচ। হাতে বাঁশের লম্বা একটা চোঙা। তারা তিনজন এসে জংলার বিশেষ একটা উঁচু কান্দার কাছে দাঁড়ায়। বিলু মন দিয়ে ইঁদুরের পুরোনো গর্তগুলা পরীক্ষা করে। অদিতি গর্তের মাটি নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ লয়। এইভাবে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিশেষ বিশেষ গর্তের মুখে শুকনা লতা-পাতা দিয়ে তারা আগুন ধরায়। রাসেল কোদাল দিয়ে গর্তের অন্য মুখটা পরিষ্কার করে। একটু পরেই জ্বলে ওঠা আগুনের মুখে মুঠি মুঠি শুকনা মরিচ ফেলে রাসেল। বিলু সেই চোঙাটা মুখে লাগিয়ে জোরে জোরে ফুঁ দেয়। অদিতি আর রাসেল পাটের বড় বড় বস্তা অন্য গর্তগুলার মুখে ফাঁদের মতো পেতে রাখে। শীতের ধকল সইতে না-পেড়ে গর্তে গর্তে আশ্রয় নিয়েছে বিষাক্ত সাপেরা। মরিচ পোড়া ধূঁয়ার ঝাঁঝালো গন্ধে তারা বাপ বাপ করে বেড়িয়ে আসে। এসে অদিতিদের পেতে রাখা বস্তার ভেতর কু-লিপাকিয়ে আত্মগোপন করে। এইভাবে অদিতিরা বিকাল নাগাদ সাত-আট জাতি-সাপ ধরে ফেলে!
বিলু আর রাসেল সবগুলা সাপ একটা বস্তায় ভরে টাইট করে মুখটা বেঁধে ফেল! অদিতি একটা বাঁশ কেটে বাঁউক তৈরি করে। দন্ডটার ঠিক মাঝখানে দড়ি দিয়ে সাপেভরা বস্তাটা টাইট করে বেঁধে ফেলে রাসেল। অদিতি হাসে। বিলু বস্তায় একটা খুঁচা মেরে সাপগুলার তেজ পরখ করে। বিষাক্ত সাপগুলার ফোঁসফোঁসানিতে অদিতির গলা শুকিয়ে আসে। বিলু আর রাসেল অদিতির ভয়ার্ত চোখ-মুখ দেখে ফিকফিক করে হাসে।
অমাবশ্যার অন্ধকার গুরুতর হলে তারা তিনজন আলগোছে পুবের মাঠে নেমে আসে। বাঁশের বাঁউকটার এক মাথা রাসেলের কাঁধে অন্য মাথায় বিলু। সাপেভরা বস্তাটা মাঝে দোলতে দোলতে এগিয়ে চলেছে। শুকনা কালাই বিলের পাড়ে এসে বিলু থেমে যায়। বাঁশ ও বস্তাটা পড়ে থাকে। তারা তিনজন বিশাল পাথারের তিন দিকে শুকনা নাড়া দিয়ে আগুন ধরায়। শুকনা নাড়ার ছোট ছোট ঢিপি একটুক্ষণ জ্বলতেই তারা পা দিয়ে নিভিয়ে ফেলে। সোজা আধমাইল পুবে রেলব্রীজ। এইরকম আগুনের খেলা চলে তিন-চারবার। তারপর আরেকটু ব্রীজের দিকে এগিয়ে বিলু-রাসেল দুইজনে মিলে সেই বাঁশটার এক মাথা মাটিতে পুঁথে ফেলে। তারপর নাড়ার কয়েকটা আঁটি বাঁশটার গায়ে বেঁধে দেয়। তিন-চারশ গজ দূরে রেল সেতু, রাজাকারদের বাঙ্কার! রাসেল বাঁশটার এক মাথায় লম্বা একটা দড়ি বাঁধে। বিলু লম্বা দড়ির অন্য মাথাটা নিয়ে দূরে সড়ে যায়। সেখান থেকে দড়িটা ধরে টানতেই নাড়ার আঁটি বাঁধা বাঁশটা পেছনে চলে আসে। আবার ছেড়ে দিতেই সামনের দিকে ছুটে যায়। রাসেল কাঁচের বোতল থেকে বাঁশে বাঁধা নাড়ায় কেরসিন ছিটিয়ে দেয়। অদিতি সাপেভরা বস্তাটা পিঠে তুলে নেয়। সাপগুলা গর্জাচ্ছে। ভয়-ঘেন্নায় অদিতির শরীরটা শিরশিরিয়ে ভেঙে আসতে চাইছে। তবু সে ছুটছে বাঙ্কারের দক্ষিণের গাছটার দিকে। পেছনে রাসেল।
অনুমান তারা গাছের গোড়ায় এসে থিতু হলে বিলু ম্যাচের এক খুঁচায় নাড়ার আঁটিতে আগুন দিয়ে পশ্চিমের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দপকরে জ্বলে ওঠা আগুনটা আড়ে-দিগে ঠিক মানুষের মতো! বিলু সেই দড়িটার মাথা একবার পেছনে টানে, একবার সামনের দিকে ছেড়ে দেয়। ব্রীজের কাছে, বাঙ্কারের মুখে রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা রাজাকারটা দেখে, কাইলাই বিলের পেতনিটা তার দিকে দৌড়ে আসছে! সে পড়িমড়ি করে বাঙ্কারে সেঁধিয়ে গেলে অদিতি তকক্ তকক্ তক্ক…ডেকে ওঠে। বিলু দড়িটা ছেড়ে শিকারি নেওলের পায়ে তাদের কাছে দৌড়ে আসে।
বিলু সাপের বস্তাটা নিয়ে একাই বাঙ্কারের দিকে সড়ে যায়। রাসেল অদিতির একটা হাত আঁকড়ে ধরে, বিলুরে যদি গুলি করে মেরে ফেলে ?
তুই বিলুরে চিনস না! তার লেজের নাগালটাও রাজাকাররা পাবে না।
এই বলে অদিতি অন্ধকারে হাসে। বাঙ্কারের সবাই ঘুমে। এইমাত্র ঢোকেপড়া রাজাকারটাও ওদের সাথে খেতামুড়ি দিয়ে ঘুমের ভান করে পড়ে আছে! সে খুব ভয় পেয়েছে। কালাই বিলের সেই পেতিœটা! গত বছর সে ছআনি গ্রামের গেসুকে সন্ধ্যার পরে বিলে একলা পেয়ে প্রায় ঘাড় কটকে দিয়েছিল!
বিলু পিঁপড়ার মতো বেয়ে বেয়ে বাঙ্কারের মুখটার একপাশে এসে বসে। উঁকি দিয়ে দেখে জমাট অন্ধকারে গভীর অন্ধকার হয়ে ঘুমন্ত রাজাকারদের মাঝে টহলে থাকা রাজাকারটাও খেতামুড়ি দিয়ে পড়ে আছে। লোকটা নিশ্চয়ই পেতিœকে তার দিকেই ছুটে আসতে দেখার স্মৃতিটা এখন মন থেকে মুছে ফেলতে চাইছে। কিন্তু সত্যিই কী সে ভুলতে পারবে ?
টাইট করে বাঁধা বস্তার মুখের দড়িটা বিলু খুলে ফেলে। বস্তার তলায় পড়ে থাকা সাপগুলা এখনো রাগে ফোঁসছে! নিচের দিকের কোণায় ধরে, সে আস্ত বস্তাটা বাঙ্কারের গভীরে ঝেড়ে দেয়। তারপর বসে বসেই নিচের জমিনে নেমে আসে।
এখন বিলু দক্ষিণমুখো ছুটছে। সে মাঝপথে আসতেই বাংঙ্কারে অনেকগুলা ভয়ার্ত গলার চিৎকার শুনা যায়, অরেবাবারে…, সাপে খাইয়ালছে রে…।
বিলু আমুদে প্রাণভরে শিয়ালের গলায় ডাকে, কেঁউহা, কেঁউহা…। তার জবাবে অদিতি আর রাসেল যুগল গলায় আওয়াজ তুলে, হুক্কাহুয়া, হুক্কাহুয়া…।

 

ষোল

অদিতিরা তিনজন আতাঢালীর সেই কড়–ই গাছে উঠে বসেছে। তাদের সামনে কালাইবিল। তারপরে আরেকটা বিল। শীতে, শুকনা দুই বিলের মাঝখানে রেল সড়ক। অসম্ভব লম্বা একটা ট্রেন অজগরের মতো বুকে হেঁটে দক্ষিণে যাচ্ছে! অদিতি জানে এইটা ট্রেন আসার সময় না। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দিনে মাত্র দুইটা ট্রেন চলে। একটা সকালে। একটা বিকালে। তখন ইঞ্জিনের পিছনে থাকে দুই-তিনটা যাত্রিবাহি ওয়াগন। সামনে থাকে বালুর বস্তাভরা ছাদখোলা দুইটা ওয়াগন। কিন্তু আজকের ট্রেনটা যেমন লম্বা তেমনি ইঞ্জিনের সামনে তিনটা ছাদখোলা ওয়াগন। গ্রামের ছোট-বড় সবাই এই ছাদখোলা ওয়াগনগুলাকে ডাকে, কুত্তার জিব্বা! ইঞ্জিনের সামনে কুত্তার জিব্বা থাকলে হানাদাররা আশিভাগ নিরাপদ। মুক্তিবাহিনী যদি রেলে বোমাপেতে রাখে তখন বিস্ফোরণে উড়ে যাবে ‘কুত্তার জিব্বা’ দুইটা। ইঞ্জিন ও রসদবাহি কামরাগুলা থাকবে অক্ষত।
অদিতি অবাক! আজ এত বেশি সর্ককতা কেন ? বিলু বাইনোকোলারটা রাসেলের হাতে তুলে দেয়, দেখ অজগরের মতো ট্রেনটা আজ কত লম্বা! রাসেল যন্ত্রটা চোখের সামনে ধরে বোবা হয়ে যায় : কামরার পর কামরা ভর্তি হানাদাররা। সিটে-মেঝে শোয়ে-বসে, হেলান দিয়ে ক্লান্ত বিধ্বস্ত রাক্ষসগুলা ঝিমোচ্ছে!
একতিল পরেই রাসেল যন্ত্রটা অদিতির হাতে তুলে দেয়। অদিতি চোখে বাইনোকোলারটা লাগিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায় : ওয়াগনে ওয়াগনে শত শত হানাদর। ওরা কী বড় কোনো অপারেশনে যাচ্ছে, নাকি পালাচ্ছে? গত কয়দিন ধরে মানুষের মুখে মুখে রটে গেছে, দেশ স্বাধীন আইয়া যাইবোগ্যা! পাকিস্তানীগর গুলি-বারুদ শেষ।
আজকাল প্রতিদিন স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে জোরগলায় বলছে, মিত্রবাহিনীর কেচক্যামাইরে হানাদাররা এখন আলুরদম। আত্মসর্মপণ না করলে বাঙ্গালিরা হেগরে লবন দ্যায়া ক্যাচলায়া খাইব!
তাই কী সব ঢাকার দিকে ছুটছে ?

 

সতের

অঘ্রাণের শেষ বিকালে হালকা কুয়াশাঢাকা গ্রামগুলাকে বড় রহস্যময় লাগে! আনন্দে পাখির মতো উড়াল দিতে ইচ্ছা করে অদিতির। সে তড়তড় করে গাছটা থেকে নেমে আসে। বিলু-রাসেলও নেমে এলে তারা গাঙপাড়ের সড়কের দিকে হাঁটে। প্রায় জনশূন্য গ্রামগুলা সন্ধ্যার আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। সত্যিই কী ঘুমিয়ে পড়েছে ? অদিতির বিশ্বাস হয় না। তাই সে গাঙের ঢালুপাড় বেয়ে দক্ষিণের দিকে হাঁটে। সীমাহীন উত্তেজনা আর অদ্ভুত ক্যারিশমাভরা এই খেলাটা গত কয় মাস ধরে বিরামহীন খেলতে খেলতে নিজেদের অজান্তেই তারা এখন বুঝি এর আষ্টে-পিষ্টে জড়িয়ে গেছে।
পাইথলে এসে একটা কলার ভেলা দিয়ে তারা নদীটা পার হয়। নদীর ঢালুপার বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতেই ঝপাৎকরে সন্ধ্যাটা নেমে আসে। অদিতির দুইপাশে রাসেল আর বিলু। এর আগে এইপথে বিলু ছাড়া বাকি দুইজন কোনোদিন আসেনি। গত দুইবছর ধরে বিলু তার বাবার সাথে পাতিল নিয়ে হাটে-বাজারে চলাচল করেছে। তাই সে অদিতি কিংবা রাসেলেরচে অনেক বেশি চিনে-জানে। চারপাশের বাড়ি-ঘরগুলা জনশূন্য। যদি কেউ থেকেও থাকে তবে আত্মগোপন করে আছে।
বিলু অনেক কিছু ভাবছে। ভাবছে অদিতিও। গত নয় মাসে তার চেনাজানা যারা কালের অতলে হারিয়ে গেছে, রাসেল ভাবছে সেই হতভাগাদের কথা। গত কয়দিনে একটু একটু করে রাসেল একটা তালিকা করেছে। নেওকা, কান্দি, প্রসাদপুর এই তিন গ্রামে যারা যারা গুলি খেয়ে প্রাণ দিয়েছে, সব মিলে এইরকম উনসত্তরটা নামের একটা লিস্টি করেছে সে! দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও যদি তার মানিক ভাই না আসে তবে রাসেলের লিস্টিতে আরেকটা নাম বাড়বে!
কাওরাইদ বাজারে না ঢুকে তারা পাশের জংলা বেয়ে বেয়ে রেলস্টেশানের কাছাকাছি চলে আসে। অদিতি অন্য দুইজনকে ইশারা দিয়ে একটা ভাঙা চালার নিচে শোয়েপড়ে। আশপাশের অবস্থা যাচাই করার জন্য আপাতত এই নিরাপদ আশ্রয়ে তারা একটু অপেক্ষা করবে। মানুষপচা চিমসে গন্ধে তাদের বমি আসছে। অদিতি নাক চেপে ধরে। ডানদিকের কচুর ঝোপটার কাছে কয়টা শিয়াল কী একটা নিয়ে টানাটানি করছে। পচা গন্ধটা আসছে সেদিক থেকেই। চারপাশ নিরাপদ দেখে অদিতি বাইরে আসে। উত্তরদিক আলোকিত করে একটা ট্রেন আসছে!
ওরা তিনজন কনুইয়ে ভর দিয়ে কইমাছের মতো বুকে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে চলে। মহিলা বিশ্রামাগারের পেছন দিয়ে উত্তর কোনার ঝোপটার আড়ালে তারা শুয়ে পড়ে। এখান থেকে আস্ত স্টেশনটা দেখা যায়। ট্রেনের হেড লাইটের আলোতে প্লাটফর্মটা ঝকঝক করছে। পিঠে ভারি ব্যাগ, হাতে এল এম জি, মেশিনগান আর চায়না রাইফেল নিয়ে বারোজন হানাদার দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে সতেরজন আলবদর-রাজাকার। হাবভাবে অনুমান হয়, যদি মুক্তিদের হামলা হয় তবে রাজাকাররা জীবন দিয়ে তাদের পাকিস্তানি বাপদেরকে রক্ষা করবে।
উনিশটা ওয়াগন নিয়ে ট্রেনটা এসে প্লাটফর্মে দাঁড়ায়। প্রত্যেকটা কামরা বন্দুক-কামন আর পাকসেনায় ঠাঁসা! স্টেশানের হানাদাররাও টপাটপ ট্রেনে ওঠে যায়। সবার পরে ওঠে মেজর। পাইথল মৌলবিবাড়ির ছেলে হবিবুল্লা-আলবদর ট্রেনের দরজার কাছে ছুটে আসে; দুহাতে মেজরের পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে , জনাব, আপ মুজে সাথ লিয়ে যায়গা!
হবিবুল্লা মেজরের বুট জুতায় মুখ ঘষে ঘষে চিৎকার করছে, হুজুর আপ মুজে সাথ লিয়ে যায়গা!
ঘেন্নায় মেজরের কপাল কুঁচকে ওঠে! তারপর হবিবুল্লার বুকে জোরে একটা লাথিমারে গর্জে ওঠে, শালা চুতিয়া বাঙ্গালকা বাচ্চা।
হবিবুল্লার চোখের সামনে দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে ট্রেনটা চলে যায়।
গত দুইদিন ট্রেনের পর ট্রেনে করে উত্তরের সব পাকসেনারা ঢাকার দিকে চলে গেছে। এটাইছিল শেষ ট্রেন। হবিবুল্লা বড় আশা করেছিল, ওদের সাথে সে-ও পালাবে। অন্তত ঢাকা পর্যন্ত। কিন্তু মেজর সাহেব তাকে গত নয় মাসের গোলামির এই পুরস্কার দিলেন ?
হবিবুল্লা কোমর থেকে পিস্তলটা টেনে বেড়করে। মেজরের লাথির আঘাতে তার নিচের ঠোঁটটা থেঁতলে গেছে। টপটপ করে রক্ত ঝরছে ! রাগে-ঘেন্নায় নিজের মাথায় গুলি করতে গিয়ে সে সামনে দাঁড়ানো রাজাকার কছিমদ্দির বুকেই গুলিটা বসিয়ে দেয়। দানব সাইজ কছিমদ্দি ‘হাউৎ’ করে একটা চিৎকার দিয়ে ছিটকে পড়ে। তারপর গুলিখাওয়া বাঘের মতো ঘেঙরায়, ছটফটায়। মরতে থাকা কছিমদ্দিকে আলবদরটা অদননয়নে দেখছিল। বদমেজাজি হবিবুল্লাকে রাজাকাররা হাড়ে হাড়ে চিনে। তাই এই সুযোগে বাকিরা হাওয়া হয়ে যায়। গুলিখাওয়া দস্যুটা শেষ টানা দিয়ে মরে গেলে হবিবুল্লা মাথা তুলে দেখে, আশপাশ খালি! ঠিক তখনি মহিলা বিশ্রামাগারের পাশের ঝোপে একটা দূর্গা টুনটুনি পাখি ডাকে, চিপ চিপ টুইপ্…।
তিনটা গুলতির গুলি শাঁ-করে এসে আলবদরটার কপালে লাগে। ঢ্যাঙা হবিবুল্লার শরীরটা শূন্যে একটা ডিগবাজি খায়। তারপর আলুর বস্তার মতো প্লাটফর্মের পাকা বিছানায় নড়চড়হীন পড়ে থাকে। অদিতিরা তিনজন দৌড়ে আসে। বিলু আর রাসেল অচেতন আলবদরের হাত-পা ঝটপট বেঁধে ফেলে। অদিতি সবার আগে ওর মুঠি থেকে গুলিভরা অস্ত্রটা ছিনিয়ে নেয়। পিস্তলটা নিজের পেন্টের পকেটে রাখতে রাখতে অদিতি বলে, চল।
অন্ধকারে মিশে গিয়ে বিলু ফিসফিস করে বলে, হবিবুল্লার কপাল থেকে চুঁয়ে চুঁয়ে রক্ত রঝছে। সেই রক্তের গন্ধে একটু পরেই শিয়ালগুলা এদিকে চলে আসবে। ওরাই হাত-পা বাঁধা জীবন্ত হবিবুল্লাকে সারারাত ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে।

 

আঠারো

অদিতির ঘুম ভেঙে যায়। আজ শীত অনেক কম! গরমে তার শরীর ঘেমে গেছে। সে গায়ের উপর থেকে লেপটা ফেলে দেয়। পাশের বিছানায় রাসেলের মা ঘুমিয়ে আছে। সে জানে, তার কাকিমা ফজরের নামাজ শেষে ঘুমিয়েছেন। তিনি সারারাত জেগে জেগে কোরআন পড়েন। প্রতি শুক্রবারে জুম্মার নামাজ শেষে একজন হুজুর এসে দুই-তিন খতম কোরআন মানিক ভাইয়ের নামে সৃষ্টিকর্তার কাছে নিবেদন করেন! অদিতি দেখেছে, কোরআন নামের বইটা এই মস্ত অথচ কাকি এই বিরাট বইটা সাতদিনে দুই-তিনবার পড়ে শেষ করেন! আগে আগে হুজুর মন্ত্রের মাঝে মাঝে মানিক ভাইয়ের নাম বলত। কিন্তু গত একমাস ধরে বৃদ্ধ হুজুর নিজ-থেকেই মানিক ভাইয়ের নামের সাথে দেশ ও দশের জন্য কান্নাকাটি করেন। মাঝে মাঝে মন্ত্র বলতে বলতে বুড়া মানুষটা ডুকরে ওঠেন, আল্লাগো…তুমি এই দেশের অসহায়দের নিগাবান। তুমি মানুষ নামের পাকিস্তানি এই জন্তু-জানুয়ারদের হাত থেকে আমাদেরকে উদ্ধার কর, রক্ষাকর মা-বোনদেরকে!
এইসব ভাবতে ভাবতে অদিতি রাসেলের ঘরে চলে আসে। রাসেলের বিছানাটা খালি পড়ে আছে। পুবের দরজাটা একটু ফাঁক হয়ে আছে! অদিতির বুকটা ধড়াস করে ওঠে। সে নিজের অজান্তে মনে মনে বলে, রাসেল কৈ ?
সে এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। তার কান শাঁ শাঁ ডাকছে, ঢিপঢিপ করছে বুক! যদি রাসেলের কিছু হয় ?
ভোরের আবছা অন্ধকারে পুকুর পাড়ের দিকে চেয়ে দেখে, রাসেল কাঁঠাল গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা থমথমে। এই দেখে কেন জানি অদিতির মুখটা হাসিতে ভরে ওঠে। তারা সবাই জানে, খুব তাড়াতাড়ি দেশটা স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ শেষ হলে তাদের ‘বিষপিঁপড়া’ জীবনটারও ইতি ঘটবে। অভি নয়, তাকে অদিতি হয়ে আবার ফিরে যেতে হবে পালপাড়ায়!
এইটুকু ভাবতেই অদিতির বুকটা অহেতুক ভার হয়ে আসে। গত সাত-আট মাসকে এই মুহূর্তে অদিতির মনে হয় এক যুগ। মানুষের জীবনের সম্ভব-অসম্ভব সবরকম দুঃখ, পাপ, লাঞ্ছনা দেখতে দেখতে তারা তিনজনই যেন আজ অভিজ্ঞতায় শতবর্ষি বুড়ো! অদিতির একটা দীর্ঘশ্বাস আসে। তবু চিনচিনে দুঃখভরা মিষ্টি হাসিটা এখনও তার ঠোঁটে রয়ে গেছে! অদিতির পেছন পেছন বিলুও এসে রাসেলের পাশে কাঁঠাল তলায় দাঁড়ায়। আজ শেষরাত থেকে রমেশ স্যারের কাঠের মাচায় ভোরের অপেক্ষায় বসেছিল সে। একটু আলো ফোটতেই বেরিয়ে পড়েছে।
প্রসাদপুর ক্যাম্পের দিকে অনেকগুলা রাইফেল একসাথে গর্জে ওঠে। তারপর ভেসে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের হুঙ্কার, জয় বাংলা…।
অদিতির শরীর থরথর করে কেঁপে ওঠে। জয় বাংলা…বলে রাসেলও চিৎকার দিয়ে ওঠে।
বিলু আর অদিতি গাঙপারের জংলার দিকে দৌড়াতে শুরু করে। সবার পেছনে রাসেল। আজ খালি তার মানিক ভাইয়ের কথা মনে পড়ছে। সে গতরাতে ভাইকে স্বপ্নে দেখেছে। চুল-দাড়ি-গোঁফ, কাঠ কাঠ পোড়া শরীর। পিঠে একটা রাইফেল ফেলে ধাপটে হেঁটে সোজা আম্মার কাছে চলে এসেছে মানিক ভাই! হাসতে হাসতে বলছে, মা আমরা দেশ স্বাধীন করে ফেলেছি!
রাসেল ঘুম থেকে ধড়ফড়িয়ে জেগে ওঠেছিল। দরজা খোলে দেখে ভোর। তারপর গুটি গুটি পায়ে পুকুরপাড়ের কাঁঠাল তলায় এসে দক্ষিণের পথটার দিকে তাকিয়েছিল; যদি সত্যি সত্যি তার ভাই ফিরে আসে!
তারা তিনজন খুব তাড়াতাড়ি গাঙপারের জংলা থেকে ফিরে আসে। সব দিক থেকেই ফুটুস ফুটুস করে গুলির শব্দ আসছে। সাথে আসছে, জয় বাংলা। কেউ কেউ পাগলের মতো চেঁচাচ্ছে, স্বাধীন! স্বাধীন! দেশ স্বাধীন অইয়া গ্যাছে গো…।
ওরা তিনজন পুকুরপারের সেই কাঁঠালতলায় আবার এসে দাঁড়ায়। রাসেল পকেট থেকে সেই কাগজটা বের করে। খেঁজুর কাঁটা দিয়ে শহীদদের লম্বা তালিকাটা কাঁঠালগাছের বুকে আটকে দেয়। বিলু দেখে, সবপ্রথম তার উমেশ কাকার নাম। অদিতি দেখে সাত নাম্বারে জবা দিদির নাম। বত্তিশ নাম্বারে আছে রাসেলের ছোট চাচা নূরু শেখের নাম। তিনজনেরই চোখে পানি টলমল করছে! অদিতির হাতে ওঠে এসেছে হবিবুল্লা আলবদরের সেই পিস্তলটা। বিলুর কাঁধে আসকর ডাকাতের থ্রি নট থ্রি রাইফেল! সেটা ছোট্ট বিলুর পায়ের কাছে নেমে এসেছে!
উত্তর দিকে আবার গুলি হয়। আবার সেই বিজয় চিৎকার। বিলু দৌড়ে গিয়ে রাসেলদের ঘরের সামনের গাছ থেকে এক মুঠি জবা ফুল নিয়ে আসে। সে জলভরা চোখে তার উমেশ কাকার তরুণ মুখটা পস্ট দেখতে পায়। তারপর উপুর হয়ে শহীদের নামের তালিকা লাগানো গাছের গোড়ায় ফুলগুলা রেখে দেয়। বিলু এই অশ্রুভেজা নিবেদন একাই শেষ করে। তার দুইপাশে দুইজন নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের শিশুহৃদয় নয় মাসের অভিজ্ঞতার ভারে আজ বুঝি প্রবীনতর!
বিলু দক্ষহাতে রাইফেলটা কাঁধ থেকে এনে বুকে ঠেকায়। একবার অদিতি একবার রাসেলের দিকে তাকিয়ে সে আকাশটা নিশানা করে টিগার টানে। গুলির শব্দের সাথে সাথে রাইফেলের বিপরীত মুখি ধাক্কায় বিলুর ছোট্ট দেহটা মাটিতে আছড়ে পড়ে। রাসেল রাইফেলটা তুলে নেয়। অদিতি হাত বাড়িয়ে বিলুকে টেনে তুলে, দুক্কু পাইছস ?
বিলু গৌরবের সাথে মাথা নাড়ে। কষ্টে তার মুখ লাল হয়ে গেলেও সে হাসতে হাসতেই বলে, হেভ্ভি মজা লাগছে! আরেকটা গুলি করব।
রাসেল কাঁঠাল গাছে পিঠ ঠেকিয়ে, চোখ বোজে উপরের দিকে একটা গুলি ছুঁড়ে।
গুলির শব্দে বাড়ির লোকজন এইদিকে ছুটে আসছে। অদিতি পিস্তটা দুই হাতের মুঠিতে ধরে, উপরের দিকে তাককরে। তার আনাড়ি আঙুল টিগার খুঁজছে। রাসেল অদিতির হাতটা টেনে নামায়, না; গুলি করিছ না। মানুষে দেখলে বলবে, তুই মুক্তিবাহিনীতে গেছিলে।
তাতে কি?
তুই মুক্তিযোদ্ধা হয়েছিলে এই কথা জানলে তুকে কেউ বিয়ে করবে না।
আজব একটা হাসিতে অদিতির ঠোঁট ঝলমল করে। তার সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ে ভোরের সেই অদ্ভুত হাসিটা। সে রাসেলের চোখে তার টানাটানা ঘোরকালো চোখ দুইটা রেখে বলে, আমাকে কেউ বিয়ে না করলেই ভালো হবে। কারণ আমি মনে মনে ঠিক করেছি, বড় হয়ে তুকেই আমি বিয়ে করব!
অদিতির হাতের পিস্তটা পর পর তিনবার গর্জে ওঠলে রাসেল আর বিলু গলা ফাটিয়ে চিৎকার দেয়, জয় বাংলা…।

 

লেখক পরিচিতি:

কথাশিল্পী শেখ লুৎফুরের জন্ম ব্রহ্মপুত্রের পলল মাটির ময়মনসিংহে।                                                                                                  শিক্ষকতার কর্মসূত্রে বসবাস করছেন সিলেটের জগন্নাথপুর।                                                                                                                লেখালেখির নির্জন জগতের নির্জন মানুষ তিনি। জনপদের আখ্যানকে                                                                                                নিজস্ব দৃষ্টি ও ভাষায় প্রকাশ করছেন। তাঁর প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ- ‘উল্টোরথে’, ‘ভাতবউ’;                                                                          উপন্যাসগ্রন্থ- ‘আত্মজীবনীর দিবারাত্র’ ‘কালো মাটির নিশ্বাস’ ‘সুতিয়া নদীর বাঁকে’

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

আমার শহিদ দাদু এবং বাঙালির দ্বিতীয় ভাষা-শহিদ দিবসের হীরক জয়ন্তী | সৌমিত্র শেখর

Thu May 13 , 2021
আমার শহিদ দাদু এবং বাঙালির দ্বিতীয় ভাষা-শহিদ দিবসের হীরক জয়ন্তী | সৌমিত্র শেখর 🌱 ২০২১ সাল বাঙালির দ্বিতীয় ভাষা-শহিদ দিবসের ষাট বছরপূর্তি; হীরক জয়ন্তী। এই দিনে ভাষা-শহিদদের প্রতি জানাই অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা। ভাষার জন্য আন্দোলন শুধু পূর্ববাংলাতেই (বাংলাদেশে) হয়নি, হয়েছে ভারতের আসামেও। দুক্ষেত্রেই ব্যাপারটি ছিল ভাষার রাষ্ট্রীয় বা সরকারি স্বীকৃতি বিষয়ে। […]
Shares