আমার শহিদ দাদু এবং বাঙালির দ্বিতীয় ভাষা-শহিদ দিবসের হীরক জয়ন্তী | সৌমিত্র শেখর

আমার শহিদ দাদু এবং বাঙালির দ্বিতীয় ভাষা-শহিদ দিবসের হীরক জয়ন্তী | সৌমিত্র শেখর

🌱

২০২১ সাল বাঙালির দ্বিতীয় ভাষা-শহিদ দিবসের ষাট বছরপূর্তি; হীরক জয়ন্তী। এই দিনে ভাষা-শহিদদের প্রতি জানাই অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা। ভাষার জন্য আন্দোলন শুধু পূর্ববাংলাতেই (বাংলাদেশে) হয়নি, হয়েছে ভারতের আসামেও। দুক্ষেত্রেই ব্যাপারটি ছিল ভাষার রাষ্ট্রীয় বা সরকারি স্বীকৃতি বিষয়ে। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রæয়ারি ঢাকার রাজপথে গুলি চলেছে, বাঙালি শহিদ হয়েছেন, গুলি করেছে পুলিশ। ১৯৬১ সালের উনিশে মে আসামের শিলচর রেলস্টেশনে গুলি হয়েছে, বাঙালি শহিদ হয়েছেন, গুলি করেছে বিএসএফ। শিলচরে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর সংখ্যাটি ঢাকার চেয়ে বেশি। এগারোজন। এঁদের মধ্যে আবার একজন নারী-শহিদও আছেন। ঢাকার শহিদ দিবস কালক্রমে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষাদিবস এবং সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে ভাষাচেতনা জাগরণের স্মারকদিবসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু উনিশে মে সে-অর্থে কোনো স্বীকৃতিই পায়নি। এমন কি, শিলচর রেলস্টেশনÑ যেখানে গুলি করে শহিদ করা হয়েছিল এগারোজন বাঙালিকে সেই রেলস্টেশনের নাম শিলচরবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি সত্তে¡ও দাপ্তরিকভাবে ‘ভাষা-শহিদ স্টেশন’ করার মতো মামুলি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। অথচ, রেলমন্ত্রকের কুর্সিতে একাধিকবার অধিষ্ঠিত ছিলেন বাঙালি মন্ত্রী। বাঙালি এবিএ গনি খান চৌধুরী ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমবার ১৯৯৯ ২০০০, দ্বিতীয়বার ২০০৯ ২০১১, মুকুল রায় ২০১২ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু তাঁরা কেউ শিলচরের একটি রেল স্টেশনের নাম পাল্টে দিয়ে বাংলা ভাষা-শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এগিয়ে আসেননি। পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি আঞ্চলিকতাবাদের প্রবক্তা এবং ‘বাঙালি-দরদি’ বলে পরিচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দু-দুবার রেলমন্ত্রী হলেও তিনি ছিলেন ঠিক সময়ে নীরব।এখন আসামের শিলচর রেলস্টেশনে স্থানীয় জনগণ আবেগবশত ‘ভাষা-শহিদ স্টেশন’ বলে একটি ফলক লাগিয়ে রেখেছে, দাপ্তরিকভাবে যার কোনো স্বীকৃতি নেই।
পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের দৃষ্টি কখনোই আসাম আর ত্রিপুরার বাঙালিদের দিকে পড়েনি। পড়লে সেই ১৯৬১ সালে আসামে যে একটি বাংলা ভাষার আন্দোলন হয়েছে, তার জন্য কমবেশি চর্চা গত ষাট বছরে কলকাতা বা পশ্চিমবঙ্গে দেখা যেত। এতো বাঙালির বসবাস, তবু আসাম আর ত্রিপুরার বাঙালিরা সবসময়ই পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মনোযোগের বাইরে থেকে গেছে। বাইরে রয়েছে বহিঃপশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরাও। রাজনীতিতে সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে তাদের দৃষ্টান্ত বারবার দিতে দেখা যায় পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে, এর বাইরে কিছু নয়। পশ্চিমবঙ্গে দু-একটি ছোটো প্রতিষ্ঠান পশ্চিমবঙ্গের বাইরে থাকা বাঙালিদের নিয়ে ভাবেন ঠিক, তবে তাদের শক্তি ও সামর্থ্য ইচ্ছের চাইতে অনেক কম। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি-সেন্টিমেন্ট নিয়ে যারা রাজনীতি করেন এবং সে-সূত্রেও যারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হন, তারা পশ্চিমবঙ্গের বাইরের বাঙালিদের জন্য মোটেই ভাবে না। এর বড়ো প্রমাণ হলো, একটু আগেই যেটি উল্লেখ করেছিÑ ভারতের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী হিসেবে তিনজন বাঙালি দায়িত্ব পালন করলেও তাঁদের কেউ শিলচরে একটি রেলস্টেশনের নাম ‘ভাষা-শহিদ স্টেশন’ করেননি। অথচ, ভারতে কত বড়ো বড়ো স্টেশন-জংশন এমন কি নগর-জনপদের নামও চটজলদি বদলের ইতিহাস ছিল এবং এখনও তা হচ্ছেই। আসামের শিলচরের বাঙালিদের জন্য বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে আমরা সহমর্মিতাই প্রকাশ করতে পারি শুধু। মূল কাজটি ভারতের বাঙালিচেতনাধারীদেরই করতে হবে। এই বাঙালিজনদের দুর্দশাকে ক্ষমতায় যাবার সিঁড়ি বানালে চলবে না।
একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ দিনটি নিয়ে বাঙালির গর্বের সীমা নেই। এই দিনটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাঙালিদের আন্তরিকতা, চেষ্টা আর আগ্রহের সীমা ছিল না। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রæয়ারি ঢাকার রাজপথে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যে আন্দোলন-সংগ্রাম এবং জীবনদান ঠিক একই রকম আরেকটি আত্মত্যাগের ইতিহাস বাঙালিরা সৃষ্টি করেছে ১৯৬১ সালের উনিশে মে ভারতের আসামের শিলচরে। একুশে ফেব্রæয়ারিকে যদি বাঙালির প্রথম ভাষা-শহিদ দিবস বলি, উনিশে মে তা হলে বাঙালির দ্বিতীয় ভাষা-শহিদ দিবস। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, উনিশে মে-র রক্তদানের ইতিহাস অধিকাংশ বাঙালিরই অজানা। উনিশে মে শহিদ হয়েছিলেন আমার দাদু কানাইলাল নিয়োগী।
কানাইলাল নিয়োগী আমার মায়ের বড়ো মামা। আমার অশীতিপর মা এখনও তাঁর মামার স্মৃতি স্মরণ করতে পারেন। বড়ো মামার কাঁধে উঠে ঘুরে বেড়ানো, মাথায় লুকানো একটি-দুটি সাদা চুল পয়সার বিনিময়ে এনে দেওয়ার গল্প করতে করতে চোখ তাঁর ঝাপসা হয়ে আসে। আমার মায়ের মাতামহর নাম দ্বিজেন্দ্রলাল নিয়োগী, মাতামহী মনোরমা নিয়োগী (বুড়ি)। তাঁদের বাড়ি ছিল সে সময়ের ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইলের কালিহাতির খিলদায়। মায়ের মাতামহ জামালপুরের সরিষাবাড়ি জমিদারদের নায়েব ছিলেন এবং সে-সূত্রে সরিষাবাড়িতেই থাকতেন। তিনি জ্যেষ্ঠ কন্যা নিরুপমার বিয়ে সম্পন্ন করেন ময়মনসিংহ জেলারই শেরপুরের শ্রীবর্দির লঙ্গরপাড়ার জোতদার মহিমচন্দ্র ঘোষের একমাত্র পুত্র মণীন্দ্রচন্দ্র ঘোষের সঙ্গে। নিরুপমা-মণীন্দ্র দম্পতির ঘরে আমার মায়ের জন্ম। মনোরমা-দ্বিজেন্দ্রলাল দম্পতির চার কন্যা, তিন পুত্র। আমার মা তাঁর মামা-মাসিদের সবার পুরো নাম এখন আর স্মরণ করতে পারেন না, কিন্তু ডাকনাম মনে করতে পারেন। যেমন, মনোরমা-দ্বিজেন্দ্রলালের কন্যারা হলেন : মণি (নিরুপমা), মানি, পারু, চুনি। পুত্ররা হলেন : কানু (কানাইলাল নিয়োগী), বেণু (মানবেন্দ্রনাথ নিয়োগী), টুনু (প্রশান্তনাথ নিয়োগী)। ১৯২৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন কানাইলাল; ১৯৪০ সালে মেট্রিক পাস। এরপর দেশভাগের ইঙ্গিত ও সাম্প্রদায়িকতার প্রাবল্যে কানাইলাল নিয়োগী ভারতে চলে যান। তিনি কবে ভারতে চলে যান তা জানা যায়নি। তবে তিনি স্রোতের বিপরীতেই গিয়েছিলেন আসামে। কেননা, শেরপুরের পূর্ব-উত্তর কোণে আসাম আর পশ্চিম-উত্তর কোণে কোচবিহার-শিলিগুঁড়ি। শেরপুর থেকে অন্যরা যেখানে কোচবিহার-শিলিগুঁড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন, সেখানে কানাইলাল আশ্রয় নিয়েছেন আসামে। এটাই স্রোতের বিপরীত। অবশ্য আসামের কাছাড় জেলার শিলচরে বাঙালিরই বাস। হতে পারে, বাঙালিজনের নিরাপদ স্থান হিসেবে তিনি বেছে ছিলেন শিলচরকে। এরপর পঞ্চাশের দশকের মধ্যেই মনোরমা-দ্বিজেন্দ্রলালের সাত পুত্র-কন্যা স্রোতেভাসা কচুরিপানার মতো ছিন্নবাস্তু হয়ে যান। কানাইলাল তাঁর স্বল্পশিক্ষায় চাকরি পান রেলওয়ের পার্সেল-ক্লার্ক পদে। রাজনীতিমনস্ক আর অধিকার সচেতন মানুষ হিসেবে তিনি কর্মচারী-রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সে-সূত্রে তিনি রেলওয়ে অ্যামপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন, আসামের সাংগঠনিক সম্পাদকও নির্বাচিত হন। ফলে জন-অধিকার সচেতন এই মানুষটি সবসময় নিরলসভাবে কাজ করেছেন নিজের কথা না ভেবেই। এরই মধ্যে তিনি শান্তিকণাকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের দুই কন্যা-সন্তান ও দুই পুত্র-সন্তান ভূমিষ্ট হয়। সন্তানদের নাম : ইলা, শিলা, শেখর, জহর। পরিবারের এই অবস্থাতে, সাঁইত্রিশ বছর বয়সে ১৯৬১ সালে শিলচর রেলস্টেশনের ভাষা-সমাবেশে গুলির ঘটনায় শহিদ হন তিনি। শিলচরের এই ভাষা-শহিদ হওয়া একটি আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ঘটেছে এবং এর একটি ইতিহাস আছে।
১৯৪৭ সালে ভারতভাগের আগে ও পরে পূর্ববাংলায় সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার ও নানা কারণে আসামে বাঙালির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। ব্রহ্মপুত্রের অববাহিকায় বরাক উপত্যকার শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দিতে গড়ে ওঠে বাঙালি জনপদ। বাঙালির সংখ্যাধিক্য ও তাদের সাংস্কৃতিক প্রাবল্য আসামের সমাজ ও রাজনীতিতে ভিন্নমাত্রা যোগ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আসামে এক সময় জন্ম নেয় উগ্র অহমিয়াদের পরিচালিত ‘বাঙাল খেদা’ আন্দোলন। ১৯৪৭ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর স্বাধীন ভারতের আসাম বিধানসভার প্রথম অধিবেশনে রাজ্যপালের ভাষণে বলা হয়েছিল, আসামে অনমহিয়ারা বসবাস করার অধিকার পাবে, তবে তাদের আনুগত্য স্বীকার করে থাকতে হবে। সেই সূত্র ধরে ১৯৬০ সালের ৩রা মার্চ আসামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিমলাপ্রসাদ চালিহা বিধানসভায় বলেন, অহমিয়াকে আসাম রাজ্যের সরকারি ভাষা ঘোষণা করা হবে। তবে এ দাবি আসতে হবে অনহমিয়াদের পক্ষ থেকে। মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পরে অহমিয়াকে সরকারি ভাষা করার দাবি জানানোর জন্য অনহমিয়াদের ওপর নানা পর্যায়ের চাপ ও নির্যাতন বেড়ে যায়। বাঙালিদের বলা হয় : তোমরা দাবি করো, অহমিয়াকে সরকারি ভাষা করা হোক!
এই চাপের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬০ সালের ১৬ই এপ্রিল শিলচরে বাঙালিরা এক নাগরিক সভায় মিলিত হয় এবং সরকারি ভাষা প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-প্রস্তুতির জন্য অধ্যাপক শরৎচন্দ্র নাথকে আহ্বায়ক করে প্রস্তুতি কমিটি গঠন করে। শিলচরে ২রা ও ৩রা জুলাই চপলাকান্ত ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে সম্পন্ন হয় বাংলা ভাষা সম্মেলন। কাজী নজরুল ইসলামের ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’ গান দিয়ে সূচনা ঘটেছিল সেই সম্মেলনের। বাংলা ভাষার ওপর আসামে সরকারি উপেক্ষানীতির বিরুদ্ধে কলকাতায় জনমত গঠনের লক্ষ্যে নানা ধরনের সভা হয় এর কয়েকটিতে সভাপতিত্ব করেন প্রখ্যাত কথাশিল্পী তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু ঐ পর্যন্তই! ব্যাপক জনমত কলকাতায় গড়ে ওঠে না। পশ্চিমবঙ্গেতো নয়ই। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ সংবাদ পর্যন্ত করে না!
১৯৬০ সালের ১০ই অক্টোবর আসাম রাজ্যের সর্বত্র অহমিয়া ভাষার পূর্ণ প্রয়োগ ঘটানোর জন্য বিধানসভায় ভাষা-বিল উত্থাপিত হয় এবং যথারীতি পাসও হয়ে যায়। এই আইনের প্রতিবাদে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় আসামের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও পণ্ডিত রাজমোহন নাথের সভাপতিত্বে ১৮ থেকে ২০শে নভেম্বর, শিলচরে। সম্মেলনের সিদ্ধান্ত : ‘যদি ঐ আইন সংশোধন করে বাংলা ভাষাকে অহমিয়া ভাষার সমমর্যাদা দেওয়া না হয় তবে বাঙালিসমাজের মৌলিক অধিকার ও মাতৃভাষা রক্ষার্থে আসামের বাংলা ভাষা অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর বৃহত্তর আসাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অপরিহার্য হয়ে পড়বে।’ পরে শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দির প্রশাসককে চরমপত্র দেওয়া হয় এই ভাষায় : ১৩৬৭ বঙ্গাব্দের ৩০শে চৈত্রের মধ্যে ভাষা আইন যথাযথ সংশোধন করে বাংলাকে পূর্ণ মর্যাদা যদি না দেওয়া হয় তবে কাছাড়ের জনসাধারণ ১৩৬৮ বঙ্গাব্দের পহেলা বৈশাখ থেকে অহিংস গণ আন্দোলনের সূচনা ঘটাবে। উল্লেখ্য, এই চরমপত্র প্রদানকারীরা তারিখ ব্যবহারের ক্ষেত্রে খ্রিষ্টাব্দের পরিবর্তে স্বেচ্ছায় বঙ্গাব্দ ব্যবহার করেন।
পূর্ব সিদ্ধান্ত মতো, ১৯৬১ সালের ১৮ই মে রাত বারোটার পর থেকে প্রায় দশ হাজার তরুণ-তরুণীসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ শিলচর রেলস্টেশনে অহিংস অবস্থান ধর্মঘট করার জন্য সমবেত হতে থাকে। পরদিন অর্থাৎ উনিশে মে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। পুলিশ এদের অনেককেই গাড়িতে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। বিভিন্ন দফায় লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যসের শেল নিক্ষেপ চলতে থাকে সেখানে। অহিংস ধর্মঘটকারীদের সঙ্গে যোগ দেয় এবং তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে অনেক রেলকর্মচারীও। কানাইলাল নিয়োগী তাঁদের একজন। তিনি সমাবেশে অংশ নেওয়া হাজার হাজার তৃষার্ত বাঙালিকে জলদানের ব্যবস্থা করছিলেন। ১৯শে মে রাতেই সপরিবারে তাঁর পাণ্ডুয়াতে ভ্রমণে যাওয়ার কথা ছিল। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও ছুটির কাগজ তাঁর গুলিবিদ্ধ শার্টের পকেটে পাওয়া গেছে। রাতে যাবেন, তাতে কী? দিনে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন তিনি। এ অবস্থায় বেলা আড়াইটার দিকে রেলস্টেশনে কর্মরত বিএসএফের সদস্যরা হঠাৎ গেরিলার ভঙ্গিতে গুলি আরম্ভ করলে গুলিবিদ্ধ হয়ে তৎক্ষণাৎ শহিদ হন এগারোজন বাঙালি। তাঁরা হলেন : কমলা ভট্টাচার্য, কানাইলাল নিয়োগী, কুমুদ দাস, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, তরণী দেবনাথ, বীরেন্দ্র সূত্রধর, শচীন্দ্র পাল, সতেন্দ্র দেব, সুকোমল পুরকায়স্থ, সুনীল দে সরকার, হীতেশ বিশ্বাস। আহত হন কয়েকশ! প্রশাসন এরপর কার্ফ্যু জারি করে, গ্রেফতার করা হয় প্রায় সাড়ে ছহাজার মানুষকে। কিন্তু এতেও ক্ষান্ত হননি আন্দোলনকারীরা। তাঁদের রক্ত আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে অবশেষে বরাক উপত্যকার সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রশাসনিক স্বীকৃতি দিতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়। বিপুল পরিমাণ রক্তত্যাগের বিনিময়ে এ অর্জনটুকু সামান্যই। আসামের সরকারি ভাষা হিসেবে অসমিয়া ভাষা। আর সীমিত অঞ্চলের জন্য সরকার অনুমোদিত দুটো ভাষার একটি বাংলা অন্যটি বোরো। আসামে অসমিয়াভাষী আছে ৪৯%। অন্যদিকে বাংলাভাষী প্রায় ৩০% আর বোরোভাষী ৫%। অবস্থা যখন এমন, তখন শুধু বরাক অঞ্চলের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায় বাংলাÑ সমস্ত আসামের সরকারি ভাষা নয়, এটাই অবাক হওয়া ব্যাপার। আসামে উপরিউক্ত তিনটি ভাষার মানুষ ছাড়াও সাদ্রি, নেপালি, হিন্দি, মিশিং, নেপালি, কার্বি, সাঁওতালি, উড়িয়া, ডিমাসা, গারো, রাভা, মণিপুরীÑ এ রকম অনেকগুলো ভাষার মানুষ আছে এবং তাদের শতকরা হার এক বা প্রায়-এক। তাহলে স্পষ্ট, আসামে অসমিয়া আর বাংলাই প্রধান দুই ভাষা (এবং দুই জনগোষ্ঠীও)। কিন্তু আসামে বাংলা ভাষার সরকারি মর্যাদা সামান্যই। এ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের আগ্রহ ও চর্চা প্রায় নেই বললেই চলে। তারা আছেন নিজেদের নিয়ে এবং এ-সব বাঙালিদের দুর্দশা নিয়ে রাজনীতির সিঁড়ি বানাতে মত্ত। অবাক হওয়া তথ্য, পশ্চিমবঙ্গের পত্রপত্রিকায় ১৯৬১ সালের উনিশে মে-র এগারোজন শহিদ হওয়ার সংবাদ খুবই ছোটো করে ছাপা হয়। বহুল প্রচারিত বলে খ্যাত ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ উনিশে মে-র শহিদ হওয়ার সংবাদ ছেপেছিল ২২শে মে; তাও মাত্র নয়টি বাক্যে। আজও উনিশে মে নিয়ে তেমন আগ্রহ দেখা যায় না পশ্চিমবঙ্গের কথিত বাঙালি-দরদি সরকার বা সমাজে! এই হলো আসাম বা ত্রিপুরার বাঙালির প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির ‘আত্মিক’ টানের দৃষ্টান্ত।
ভারতের বৃহৎ বাঙালিদের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের সরাসরি সমর্থন ও অংশগ্রহণ পায়নি বলে আজও শিলচরের বাঙালিরা তাঁদের ভাষা-শহিদদের জন্য বড়ো কিছু করতে পারেনি। আজও নির্দিষ্ট নকশায় কোনো স্মৃতি-স্তম্ভ নেই তাদের। শহিদ স্মৃতি-স্তম্ভ যা আছে তা বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নকশায় নির্মিত। একক নকশায় সর্বত্র স্মৃতি-স্তম্ভ গড়ে উঠলে যা হতো, বিচিত্রভাবে স্মৃতি-স্তম্ভ করায় চেতনার সেই প্রকাশটিও হয় না। কিছু দিন আগে পশ্চিমবঙ্গের একটি কলেজে ভাষা-শহিদ স্মরণে সেমিনারে যোগ দিলাম। সেখানে তারা সরু কাঠ দিয়ে বাংলাদেশের একটি শহিদ মিনার বানিয়ে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করলেন। কেমন হয়েছিল সে শহিদ মিনার সেটি বড়ো কথা নয়, সবাই বুঝল সেটি বাংলাদেশের শহিদ মিনার। বুঝবার কারণটি হলো, বাংলাদেশের ভাষা-শহিদ মিনারের নির্দিষ্ট নকশায় সেটি গড়া হয়েছিল। বাংলাদেশের স্মৃতিসৌধও তেমনি। ভূমি থেকে সরু হয়ে আকাশমুখো হলেই সেটি মুক্তিযুদ্ধের শহিদ-স্মারক, বুঝতে অসুবিধা হয় না। উনিশের চেতনার জাগরণে এ ধরনের একক নকশাবিশিষ্ট শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
একুশে ফেব্রæয়ারি রক্তদানের পথ বেয়ে যেমন বাংলা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা পেয়েছিল, উনিশে মে-র রক্তদানের পথ বেয়ে তেমনি বরাক অঞ্চলে বাংলা সরকারি ভাষার মর্যাদা অর্জন করে। এই অর্জন ধরে রেখেই অধিকতর অর্জনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে বাঙালিকে দ্বিতীয় ভাষা-শহিদ দিবসের হীরক জয়ন্তীতে এই হোক প্রত্যয়।

 

লেখক পরিচিতি:

গবেষক, প্রাবন্ধিক ড. সৌমিত্র শেখর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক।

লেখালেখি এবং গবেষণার মাধ্যমে বাংলার সারস্বত সমাজে নিত্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছেন।

ঢাকা ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত তাঁর রচিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলি হচ্ছে ‘গদ্যশিল্পী মীর মশাররফ’; নজরুল কবিতার পাঠভেদ ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’; ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা’; ‘সিভিল সোসাইটি ও অন্যান্য প্রবন্ধ’; ‘ব্যাকরণ সন্ধান’; ‘কথাশিল্প অন্বেষণ’; ‘সত্যেন সেনের উপন্যাসে জীবন ও শিল্পের মিথস্ক্রিয়া’; ‘ষাটের কবিতাঃ ভালোবাসার শরবিদ্ধ কবিকূল’; ‘ভাষার প্রাণ ভাষার বিতর্ক’ ; ‘সরকারি কর্মকমিশন ও শিক্ষাভাবনা’; ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ঃ চেতনার বাতিঘর’; ‘নজরুলঃ আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি এবং শিল্পের বোধ’; ‘মোসলেম ভারতঃ বিষয় বিশ্লেষণ’; ‘শিক্ষার ধারা পরীক্ষার কারা’।

বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত রণেশ দাশগুপ্তের রচনাবলি; অন্যান্য প্রকাশনার নির্বাচিত ‘মোসলেম ভারত’, ‘সুধীন্দ্রনাথঃ শতবর্ষে আলোছায়া’, বিভূতিভূষণঃ কথা ও সাহিত্য’, ‘লোক – উৎসব নবান্ন’, ‘হাসান হাফিজুর রহমানঃ ভবিষ্যতের সাঁকো’সহ তাঁর বেশ কিছু সম্পাদিত – গ্রন্থও আছে। ড. শেখর বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ ভাষা-সাহিত্যের জীবনসদস্য। গবেষণার জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিনস এওয়ার্ড, (২০০১), ময়েনউদ্দীন ফাউন্ডেশন পদক (২০০৮) ও নজরুল পদক (২০১৪) লাভ করেন।

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

আকাশ ধরে টান দিয়েছিল মাধবী আর হুড়মুড় করে খুলে পড়েছিল আকাশটা | আনিফ রুবেদ

Thu May 13 , 2021
আকাশ ধরে টান দিয়েছিল মাধবী আর হুড়মুড় করে খুলে পড়েছিল আকাশটা | আনিফ রুবেদ 🌱 [শ্রীদাম আর আরতির মেয়ে মাধবী। শ্রীদাম অসুখে পড়ে। আরতি রমজান নামের এক গ্রাম্য ডাক্তারের হাত ধরে ঘর ছাড়ে। মাধবী আর তার বাবা শ্রীদাম দারুণ কষ্টের মধ্যে পড়ে। একদিন শ্রীদাম মারা যায়। শ্রীদাম মারা যাবার পর […]
Shares