আকাশ ধরে টান দিয়েছিল মাধবী আর হুড়মুড় করে খুলে পড়েছিল আকাশটা | আনিফ রুবেদ

আকাশ ধরে টান দিয়েছিল মাধবী আর হুড়মুড় করে খুলে পড়েছিল আকাশটা | আনিফ রুবেদ

🌱

[শ্রীদাম আর আরতির মেয়ে মাধবী। শ্রীদাম অসুখে পড়ে। আরতি রমজান নামের এক গ্রাম্য ডাক্তারের হাত ধরে ঘর ছাড়ে। মাধবী আর তার বাবা শ্রীদাম দারুণ কষ্টের মধ্যে পড়ে। একদিন শ্রীদাম মারা যায়। শ্রীদাম মারা যাবার পর মাধবী আরো অসহায় হয়ে পড়ে। সে আত্মহত্যা করার চিন্তা করে।
একরাতে সে ঘরের চালার সাথে ফাঁসির দড়ি বাঁধে। সে ফাঁসে ঝুলতে যাবে এমন সময় কয়েকজন যুবক তার ঘরে ঢুকে আর তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তাকে একটা পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয়। ফাঁসির দড়ি টানানোই থাকে চালার সাথে।
আরতি গ্রাম্যডাক্তারের বাড়ি থেকেও বিতাড়িত হয়ে একদিন মাধবীর কাছে পতিতালয়ে গিয়ে হাজির হয়। তখন সে গর্ভবতী। আরতি পতিতালয়ে যাবার কয়েকদিনের মধ্যেই একটা মেয়ে সন্তান জন্ম দিয়ে মারা যায়। মেয়েটির নাম রাখে, আশা।
আশাকে নিয়ে স্বপ্ন ফাঁদে মাধবী। কিন্তু পাতিতালয়ে থাকলে আশাকে মানুষ করা যাবে না। মাধবী একদিন আশাকে নিয়ে পতিতালয় থেকে পালিয়ে যায়। পতিতালয় থেকে বের হবার পরের গল্প ]

বাস চলছে ঝিম ঝিম করে। মাধবীর বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কায় দুরু দুরু করে। বেশ্যাখানার জীবন একরকম অভ্যাস্ত হয়ে গেছিল, এখন নতুন জীবনের দিকে যাচ্ছে সে। সেখানে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে কে জানে। সে আরো ভাবে, সর্দারনি খালার লোক কাঁটার মতো বিছিয়ে আছে চারদিকে। সে কি এখন খবর পেয়ে যায়নি মাধবীর পালিয়ে আসার? সে কি তার লোক লেলিয়ে দেয়নি তাকে ধরার জন্য? কোনো লোক কি তার পিছু নেয়নি তাকে ধরার জন্য? মাধবীর বুক কাঁপছে। তবে সে পিছু ফিরবে না আর। আশার জীবনকে অবশ্যই সুন্দর করতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। সে ভয়কে খুন করতে চায়। ভয় আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মাধবীর চোখ ফেটে জল বের হতে চায়, সে নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করে।

বাস চলছে ঝিম ঝিম করে। লোক ওঠানোর জন্য বাস থামে। মাধবীর বুক ধক করে ওঠে। লোক নামানোর জন্য বাস থামে। মাধবীর বুক ধক করে ওঠে। এই বুঝি সর্দারনির কোনো লোক উঠল। এই বুঝি তাকে নিয়ে টানাটানি শুরু করল। মাধবী যতটা সম্ভব মুখ ঢেকে শ্বাসপ্রশ্বাস পরিমিত করে গুটি শুটি দিয়ে বসে থাকে। কোনো লোককে তার দিকে তাকাতে দেখলেও মনে ভয় হয়, এই বুঝি সর্দারনির লোক। মাধবীর মনে পড়ে তার বাবার কথা, তার বাবা একদিন বলেছিল Ñ ‘ক্ষমতাশালী মানুষ অন্য মানুষকে ভয়ের চাপে রাখে সবসময়। শুধু সামনাসামনি থাকলে ভয় পাবে এমন নয়, যখন সামনে থাকবে না তখনও ভয় পাবে, ভয় পাওয়া মানুষের মনে হবে চারপাশে থাকা লোকজন মনে হয় তারই লোক। এখানে ভয়দানকারী থেমে থাকে না। ভয় ঢুকিয়ে দিতে চায় ভয়কারীর একেবারে গভীরে, বস্তার ভেতর গুতিয়ে গুতিয়ে যেমন করে শস্য ঢোকানো হয় তেমন। যখন একেবারে একা থাকবে, একমাত্র একা থাকবে তখনও ভয় পাবে। তবু শস্য তো ফাঁকা বস্তাতে ঢুকানো হয় এখানে ব্যাপারটা ঘটে আরো মারাত্মক। ভয়দানকারী যদি কামাল হয় আর ভয়প্রাপক যদি জামাল হয় তবে প্রথম কাজ হলো জামালের ভেতর থেকে জামালকে বের করে ফেলা হয় আর তার ভেতরে ঠেঁসে ঠেঁসে ঢুকানো হয় কামালের ভয়, যেমনভাবে কোনো বস্তা থেকে ধান বের করে গম ঢুকানো হয় তেমনই।’ মাধবীর শরীর একটা বস্তা, এ মাধবীবস্তা থেকে মাধবীশস্য বের হয়ে গেছে ঢুকে গেছে সর্দারনির ভয়শস্য। মাধবীর শরীর হাঁটে, শরীরের ভেতরে সর্দারনির ভয়দানা। মাধবীর শরীর হাঁটে, মাধবী বাইরে থেকে দেখে। মাধবী ভয়দানা বের করে মাধবীকে ঢুকাতে চায়। মাধবী, মাধবীর ভেতর মাধবীকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
বাস চলছে ঝিম ঝিম করে। আশা ঘুমাচ্ছে। ঘুমের ঘোরে সে দাঁত কিড়মিড় করছে। পেটে হয়তো তার কৃমি হয়েছে। মানুষকে দেহ সেবা দিতে দিতে ব্যাপারটা খেয়ালই করতে পারেনি মাধবী। জলে কুমির ডাঙায় বাঘ গাছে সাপ এর চেয়ে ভয়ঙ্কর হলো মানুষের ভেতরে কৃমি কিলবিল করে থেকে খাচ্ছে আর বাইরে বাঘ কুমির খাবার জন্য ছুটে আসছে। মানুষ যাবে কোথায় কৃমি মারার জন্য ওষুধ খাবার জন্য একটু বসলে ততক্ষণে কুমির ছুটে আসে, কুমির থেকে পালাতে গেলে কৃমি ভেতর চুষতে শুরু করে। বিপদ থেকে পালার জন্য অতিষ্ঠ হয়ে আছে মানুষ। এতটুকু স্থির হতে পায় না। যদি কখনো একটু দাঁড়াতে বা বসতেও পায় তবু সারাক্ষণ ভয় চেপে থাকে কখন বিপদ এসে পড়বে। আশার মুখের দিকে তাকিয়ে মায়া লাগে মাধবীর। এ কার সন্তান কে জানে। তার মা আরতি গর্ভে ধরেছিল। যে পুরুষের বীজজল এর গায়ে বয়ে যাচ্ছে সে পুরুষ কোনোদিন বুঝতেও পারবে না তার বীজজল কোথায় কিভাবে আছে। হায় রে মানুষ। পৃথিবীতে পিতা মাতা সন্তান সব ভুয়া কথা। আশা আবার দাঁত কিড়মিড় করে। আশাকে কৃমির ওষুধ খাওয়াতে হবে।

পথে কিছুই ঘটেনি। বাস থেকে নেমে মাধবী কিছুটা স্বস্তি পায়। বাস থেকে যখন সে নামল তখন দুপুর পেরিয়ে গেছে কিন্তু বিকেল তখনো হয়নি। সকালে বাসের উপরেই কিছুটা পাউরুটি আর কলা খেয়ে নিয়েছে। আশাকে খাওয়েছে। সন্ধ্যার আগে বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে না। পাড়ার সব লোকজন এসে ভিড় করবে। আজকে রাতে কোনো ভিড়ের ভেতর পড়তে চায় সে। লোকজনের সাথে দেখা করবে কাল সকালে। এখন শহরেই ঘুরেফিরে সময় কাটাতে হবে। কিছু খাবারটাবার কিনে নিয়ে যায়। সে কয়েক দোকান ঘুরে ঘুরে কিছু খাবার কিনল। ম্যাচ মোমবাতি কিনল। কিছু কাপড় চোপড়, গামছা, চাদর কিনল।

মাধবীর মনে হলো এখন বাড়ি যাওয়া যায়। গভীর সন্ধ্যা লেগে গেছে। ঘুমিয়ে পড়ছে সূর্যের আলো। অন্ধকার আড়মোড়া ভেঙে জাগতে শুরু করেছে। মাধবীর এখন অনেক ভালো লাগছে। মনটা হালকা হয়ে গেছে। চেনা আর জন্মবাতাসের ভেতর বুক ভরে শ্বাস নেয়। জিহ্বা বের করে চোখ বন্ধ করে শ্বাস নেয়। জন্ম এলাকার জন্মবাতাস গপ গপ করে গিলে। চমৎকার বাতাসের স্বাদ। বাতাসকে চকলেটের মতো চুষতে চায় সে। মাধবী হাঁটছে। আশাকে বুকের সাথে চেপে নিয়ে হাঁটছে। হাঁটতে হবে ঘণ্টাখানেক।

***
বাড়ির ভেতর ঢুকেই দেখল, ঝোঁপঝাড়, লতাপাতায় ভর্তি। মাধবী স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। যে ছবি সবশেষ দেখেছিল সেই ছবিই মনের ভেতর নিয়ে সে ঢুকছিল বাড়িতে। পুরো বাড়ির প্রতি ইি লতাপাতায় মোড়া। আদিমযুগের ভয়ঙ্কর কোনো গুহা যেন। লতাপাতাগুলো যেন মাধবীর আসাতে গোস্বা হয়েছে। ঠা-া চোখে লতাপাতারা তার দিকে তাকায়। বুক হীম হয়ে আসে মাধবীর। এখানে রাত কাটানো যাবে?

মাধবীবস্তা থেকে ভয়শস্য বের করে মাধবী প্রবেশ করে মাধবীর ভেতর। মাধবীর ভেতর মাধবী প্রবেশ করে, মাধবীর ভেতর মাধবী প্রতিষ্ঠিত হয়। সাহসশস্য উৎপন্ন করে মাধবী, শক্তিশস্য উৎপন্ন করে মাধবী। আশা তার ঘাড়ের উপর ঘুমিয়ে ছিল। মাধবী তাকে জাগায়, বারান্দায় দাঁড় করিয়ে রাখে, ‘এখানে দাঁড়া আশা।’

ম্যাচ মেরে মোমবাতি জ্বালায় মাধবী। জীবনের এই প্রথম সে ম্যাচে একবার মাত্র মেরে কাঠি জ্বালাতে পারল। আগে চুলা বা চেরাগ জ্বালাতে কত কাঠি সে নষ্ট করত। তার মা বকা দিত, ‘ম্যাচটাও ঠিক মতো জ্বালাতে পারিস না মাধবী, কী যে হবে রে তোর, শ্বশুর বাড়ি গিয়ে কী করবি?’ এক কাঠিতে মোম জ্বালতে পেরে তার মনে হয়, সবকিছুই নিশ্চয় ঠিকঠাক হবে। নিশ্চয় এটা একটা শুভ ইঙ্গিত। সে এখন উদ্যমের খনি, প্রচুর উদ্যম উৎপন্ন হচ্ছে।

মোমের আলোয় দেখল, ঘরের দরজা খোলায় আছে। সাত বছর ধরে একটা ঘরের দরজা খোলা আছে। মানুষের যেমন হৃৎপি- ঘরের তেমন মানুষ, মানুষ না থাকলে ঘরের প্রাণ থাকে না। মাধবী দেখল, সেভাবেই বিছানা পাতা আছে ঘরে। বিছানার উপরে ঘাস বেরিয়ে গেছে। বিছানাটাকে ছোটখানো ঘাসময় একটা মাঠের মতো মনে হচ্ছে। হাত দিয়ে বিছানার ঘাস, লতাপাতা ছিঁড়ে সে। রাতের মতো ঘরটাকে কিছুটা লতাপাতা মুক্ত করতে হবে। বিছানাটা পাততে হবে। আশা জেগে থাকতে পারবে না। আগে তার ঘুমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আশা হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সে কিছুই বুঝতে পারে না। সে প্রশ্ন করে, ‘মা আমরা কোথায় এসেছি?’ মাধবী বলে, ‘আশা আমরা আমাদের বাড়িতে এসেছি। আমরা এখানেই থাকব।’ আশা বলে, ‘এতো জঙ্গলের ভেতর থাকতে পারব আমরা?’ মাধবী বলে, ‘থাকতে পারব আশা, সব জঙ্গলজঞ্জাল সাফ করব।’ আশা আর কিছু বলে না। সে মাধবীর কাজ করা দেখে।

মাধবী খুব সতর্ক হয়ে কাজ করে। সাপখোপ থাকতে পারে। খাটটা নড়বড় করছে। খাটের কাঠের সাথে মিশে যাওয়া বিছানা খুঁটে খুঁটে তোলে মাধবী। নতুন কেনা চাদর তার উপর বিছায়। সে কাজ করছে মগ্ন হয়ে। আশা বারান্দাতে দেয়ালে হেলান দিয়ে আবার ঘুমিয়ে গেছে। মাধবী আশাকে কোলে করে বিছানায় তুলে দেয়। আশা ঘুমায়।

ঘরের ভেতর এখনো প্রচুর লতাপাতা আছে। সেগুলো পরিস্কার করতে থাকে। মেঝেতে অজ¯্র ইঁদুরের গর্ত। ইঁদুরের খালে সাপ ঢুকে থাকে। সাপ খাল খুঁড়তে পারে না, ইঁদুর যখন খাল খুঁড়ে তখন সাপ দূর থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে আর হাসে, ‘নে রে ইঁদুর খাল খুঁড়ে নে, খাল খুঁড়ে তার ভেতর বসে থাক আমার জন্য খাদ্য হয়ে।’ ইঁদুরের খাল খুঁড়া শেষ হলে সাপ খালে ঢুকে ইঁদুরটাকে গিলে খায় আর ওখানেই বাস করতে থাকে। মাধবী খুঁজে খুঁজে ইঁদুরের সব গর্ত বন্ধ করে। তবে সাপের চেয়ে ইঁদুর কম নয় মানুষের ক্ষতি করাতে। মানুষের সকল মৌলিক চাহিদার উপর তার দাঁত বসায়। গর্ত খুঁড়ে সাপের ঘরে ঢুকার পথ করে দেয়। সাপের কাটায় মানুষ মরলে সাপটাকে ঘরে নিয়ে আসার জন্য ইঁদুরও দায়ি। ইঁদুর মানুষের শস্য খেয়ে ফেলে, বই কেটে ফেলে মানুষকে মুর্খও রাখতে চায়। পোশাককে কেটে ফেলে মানুষকে নগ্ন রাখতে চায়। শুধু পোশাক কেটে তার সাধ মেটে না চামড়াও কেটে ফেলে। এইতো কদিন আগে খবরের কাগজে খবর হলো, দুমাসের এক শিশুর তিনটে আঙুল কেটে ফেলেছে ইঁদুর, শিশুটির মা শিশুটিকে ঘুম দিয়ে বাড়ির পিছনে চুলা ধরানোর লাকড়ি কুড়াতে গেছিল। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা সবের উপর হাত চালায় ইঁদুর।

একটা করে খাল বন্ধ করছিল আর ইঁদুরের নামতা পাঠ করছিল মাধবী। তার হঠাৎ মনে পড়ে রমজান ডাক্তারের ছেলের কথা। ইঁদুর বিষয়ক নামতায় তার ছেদ পড়ে। রমজান ডাক্তারের ছেলে যদি জানতে পারে যে, মাধবী ফিরে এসেছে তবে আবার ধরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করবে। জানতে পারে কী, জানতে পারবেই। ইুঁদরের নামতা বাদ দিয়ে, খাল বন্ধ করা বাদ দিয়ে, জঙ্গল পরিস্কার করা বাদ দিয়ে মোমবাতিটা নিয়ে সে তাদের হেঁসেল ঘরের দিকে যায়। তরকারি কাটা হাঁসুয়াটা নিয়ে এসে রাখতে হবে ঘরে। খুঁজে খুঁজে সে হাঁসুয়া খুঁজে পায়, এ হাঁসুয়া দিয়ে সে বনমুরগি কেটেছিল। কিন্তু হাঁসুয়াতে মরিচা লেগে একেবারে ভোঁতা হয়ে গেছে, অনেকটা ক্ষয়ে গেছে। সেটাকেই সে নিয়ে আসে। এটা দিয়েই সে শত্রুর মোকাবিলা করবে। তার এখন অনেক সাহস। সে এখন সাহসের মেঘ, মুষলধারে সাহস বর্ষিত হচ্ছে। কোনোভাবেই হেরে যাওয়া চলবে না। সে হাঁসুয়ার দিকে তাকিয়ে ভাবে, এতে আর তরকারি কাটা যাবে না কিন্তু শত্রুকে কাটা যাবে। সে তার ওড়না কোমরের সাথে পেঁচিয়ে বাঁধে। কোমরের সাথে ওড়না পেঁচিয়ে বাঁধলে শক্তি অনেক বেড়ে যায়। শক্তি আরেকটা বিশস্ত জীব, এ জীব তাকে সঙ্গ দিচ্ছে। এ জীবের কামড়ে ডাক্তারের ছেলে পালাবে। এই শক্তিজীব তাকে আর আশাকে বাঁচাবে।

সামনের দেয়ালের লতাপাতার আড়াল থেকে দেখা যায় একটা ছবি ঝুলছে। তার বাবা মায়ের ছবি। লতা সরাতেই ছবিটি পড়ে যায় মেঝেতে। মাধবী পড়ে থাকা ছবির দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তার বাবা হাসে, তার মা হাসে। তাদের হাসি দেখে মাধবী কাঁদে। ছবিটা তুলে সে একদিকের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখে। জল ভরা চোখ নিয়ে ছবির দিকে তাকিয়েই থাকে, তার মনে পড়ে তার বাবা শ্রীদাম একবার বলেছিল Ñ ‘ছবি আর ছবি তুলতে চাওয়ার মানে আছে, ছবি তুলতে চাওয়ার মানে হলো, মরতে না চাওয়া। মানুষ মরতে চায় না কিন্তু সে জানে সে মরে যাবে তাই তো ছবি তুলে রাখে। মরে গেলেও যাতে ছবি হয়ে থাকতে পারে, ছবি হয়ে পৃথিবী দেখতে পারে।’ মাধবী দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, ‘বাবা তুমি জগৎ দেখতে পাচ্ছ, আমাকে দেখতে পাচ্ছ। ঐ যে দেখ তোমার খাটে আশা শুয়ে আছে অথচ সে তোমার কেউই নয়। তোমার বউ চলে গেছিল, সে তোমার লজ্জা আর এ হলো তোমার লজ্জার সন্তান।

খাটের পাশে টেবিলটা আছে, দাঁড়িয়ে লতা সরালে সেখানে দেখতে পায়, তার বাবার ওষুধের পাতা, ওষুধের শিশি। ওষুধের ওপর শেওলা জমে গেছে। সাত বছর আগের ওষুধ। লতা টেনে ফেলতে সেগুলোও পড়ে যায়।

বামের দেয়ালে সাত বছর আগের তার বাবার নতুন ফতোয়া। এ ফতোয়া মাত্র কয়েকবার গায়ে দিয়েছিল বাবা। সেখানের লতা সরাতে গেলে লতার সাথে সাথে খ- খ- হয়ে পচে যাওয়া নতুন ফতোয়ার চেলা ছুটে চলে আসছে।

ঐ যে কাঠের বাক্স দাঁড়িয়ে আছে। এটা ছিল খয়েরি রঙের। এর ভেতর থাকত শীতের লেপ-কাঁথা, পুরোনো কাপড় চোপড়, আরতির বিয়েতে পাওয়া কাঁসা পিতলের থালা বাসন। বাক্সের পাশে পড়ে আছে টিনের ট্রাংক। ট্রাংকের উপর খুচরো কিছু পয়সা থামের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মাথাভাঙা শুকনো তালগাছের মতো দাঁড়িয়ে আছে। পুরুষ মানুষের উত্থিত শিশ্নের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মন্দিরের চূড়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে। পয়সাথামের দিকে, মাথাভাঙা তালগাছের দিকে, উত্থিত পয়সাশিশ্নের দিকে, মন্দিরের চূড়ার দিকে তাকিয়ে থাকে মাধবী।

এই যে মাধবীর পড়ার টেবিল, পরে এটা থালাবাটি রাখার টেবিল হয়ে গেছিল। টেবিলের উপর গ্লাস আর প্লেট। খাবার শেষবার খাওয়ার পর সে ধুয়ে রেখেছিল। ওভাবেই সাত বছর ধরে গ্লাস প্লেট রয়ে গেছে। ধোয়া অবস্থায় রয়ে গেছে। লতা পাতা তাদের মাথা নিয়ে এগিয়ে গেছে থালার দিকে। লতাপাতা কি থালাতে ভাত আছে ভেবে থালার দিকে গেছে?

আরো কত কী দেখে মাধবী। যাই দেখে তাই দেখে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়ায়। চোখ ছল ছল করে। চোখ মুছে লতাপাতা সরাতে থাকে।

ঘরের উপর দিকে চালের কাছাকাছির লতাপাতা পরিস্কার করতে গিয়ে দেখে সেই যে ফাঁসির দড়ি এখনো ঝুলছে। ফাঁসির মুখ হা করেই রয়েছে সাত বছর ধরে। নাইলনের দড়ি, বেশ শক্ত পোক্ত হয়ে আছে এখনো। সে ফাঁসির দড়ির দিকে তাকায়। সে হাসে। সে আশার দিকে তাকায়। আশা শান্ত হয়ে ঘুমুচ্ছে। না, সে আর ফাঁসি নিবে না। সে এখন আশাবাদী। বেঁচে বেঁচে নাচবে, নেচে নেচে বাঁচবে। আশাকে নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন। তাকে স্কুলে পড়াবে, মানুষের মতো মানুষ করবে। দুঃখি মানুষের জন্য কাজ করবে আশা। এখন তার কাছে কয়েক লক্ষ টাকা আছে। টাকা দিয়ে অনেক কিছুই করতে পারবে। টাকা হলো রেখা, এ রেখা দিয়ে অনেকরকম ছবি আঁকা যায়। টাকা হলো ছাঁকনি, এ ছাঁকনি দিয়ে জীবন থেকে কষ্ট ছেঁকে ফেলা যায়। টাকা হলো চাকা, এ চাকাতে চড়ে আরামে চলা যায়। টাকা হলো বাঁকা, এ বাঁকা দিয়ে ঘি তোলা যায় কারণ সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না। টাকা হলো পাখা, এ পাখা দিয়ে ওড়া যায়। টাকা সরল, টাকা গরল, টাকা তরল, টাকা মড়ল। টাকাই সব।

মাধবী খাটের উপর বসে। খাটটা কচ কচ করে উঠল। মনে হচ্ছে ভেঙে যেতে পারে। কিন্তু ভাঙল না। খাট জানে, সে ভেঙে পড়লে কালই তাকে ফেলা হবে, চুলাতে জ্বালা পোহাতে হবে, নতুন খাট কেনা হবে, মাধবীর মেলা টাকা আছে। মাধবী ভাবল, নতুন খাট কিনতে হবে।

খাটের উপর বসে আছে মাধবী। নিজেকে তার রাণী রাণী মনে হচ্ছে। বাহির থেকে একটা ইঁদুর এসে তার গর্তে ঢুকার মুখ খোঁজে, পায় না। ইঁদুরের হয়ত সন্দেহ হয় সে ঠিক জায়গায় এসেছে কিনা। মোম জ্বলছে। সাত বছর পর এ ঘরে আলো জ্বলছে। এই ইঁদুর কি কখনো এ ঘরে আলো দেখেছে? এই ইঁদুর কি তার এ ঘর থেকে তার মায়ের চলে যাওয়া, শ্রীদামের মরা, মাধবীর ফাঁসিতে ঝুলতে যাওয়া, দুবৃত্তদের হাতে পড়া দেখেছে? ইঁদুরটি বিভ্রান্তির ভেতর পড়ে একবার বাইরের দিকে যায় আবার ফিরে আসে ঘরের ভেতর। গর্তের মুখ খুঁজে। মুখ খুঁজে পায় না। গর্তের সব মুখ সেলাই করা দেখে ইঁদুরটি বেকুব বনে গেছে। ইঁদুরের কারবার দেখে মাধবীর হাসি পায়। সে মিট মিট করে হাসে। বহুদিন পর সে হাসতে পারল। ইঁদুরটি অবাক অবাক চোখ নিয়ে আলোর দিকে তাকায়। ইঁদুর কি আলোর মানে খুঁজছে? মাধবীর মজা লাগছে, সে প্রশ্নের নামতা আওড়াইতেই আছে, সে ইঁদুরের দিকে তাকিয়ে আছে এমনভাবে যেন ইঁদুরের সার্কাস খেলা দেখছে। একসময় ইঁদুরটি হঠাৎ করেই দৌড়ে বেরিয়ে গেল। মাধবী হেসে ওঠে।

সে হাসির দড়িতে বাঁধা থাকবে এখন, ফাঁসির দড়িতে নিজেকে বাঁধবে না আর। সে আশাকে নিয়ে বাঁচবে। সে আশার দিকে তাকায়। তাকাতেই তার শরীর দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যায়। আশা ঘুমুচ্ছে আর তার একটু দূরেই বিশাল এক গোখরো ফনা তুলে হিসহিস করছে। সে হয়তো এ ঘরে থাকে। এতক্ষণ বাইরে শিকারে গেছিল। এখন ফিরে তার গর্ত খুঁজে পাচ্ছে না। মাধবী কী করবে বুঝতে পারছে না। মাধবী তার শক্তিকে, সাহসকে ফিরিয়ে আনে। সে সাপের দিকে তাকাতে তাকাতে পলকের মধ্যে আশাকে দ্রুত টেনে নিয়ে বুকে চেপে ধরে। আশা ভয় পেয়ে জেগে উঠে। চোখ বড় বড় করে মাধবীর দিকে তাকায়। মাধবী বলে ভয় পাসনে আশা, আমি আছি। সে নিজেকে নিজে শুনিয়ে বা আশাকে শুনিয়ে বা সাপটাকে শুনিয়ে বলে – ‘আমি মাধবী। শ্রীদাম আর আরতির কন্যা মাধবী নই। নিজেকে নিজে আবার জন্ম দেয়া মাধবী। সমগ্র পৃথিবীর বীর এসে হাজির হলেও আমি পিছিয়ে যাব না।’ আশাকে মাটিতে নামিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে একটা লাঠি হাতে তুলে নেয়। সাপের দিকে এগিয়ে যায়। সাপ ফোঁস ফোঁস করতে থাকে। মাধবীর লাঠির বাড়ি সাপের লেজে লাগে। লেজ থেৎলে যায়। থেৎলানো লেজ নিয়ে সাপ পালিয়ে যায়।

আশাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বসে থাকে মাধবী। ঘুমানো চলবে না। জেগে থাকতে হবে। ঐ সাপ আবার ফিরে আসতে পারে বা অন্য কোনো সাপ। রাত কতদূরে গেল বোঝা যাচ্ছে না। মাঝরাত পার হয়ে গেছে হয়তো। মাঝে মাঝে শেয়াল ডাকছে। শেয়ালের ডাকে আশা ঘুমের মধ্যেই মাঝে মাঝে চমকে উঠছে। সাপযুদ্ধ সংক্রান্ত বুকের ধকধুকানি চলে গেছে মাধবীর। শ্বাস প্রশ্বাস এখন স্বাভাবিক। মোমবাতিটা ক্ষয় হয়ে গেছে, আরেকটা মোমবাতি জ্বালতে হবে। মাধবী উঠে, নতুন মোম জ্বালায়। নতুন মোম বীরবিক্রমে জ্বলছে। মাধবী পায়চারি করে। তার ফাঁসির দড়ির দিকে চোখ গেল।

ফাঁসির দড়ির নিচে দাঁড়িয়ে সে ফাঁসির দড়ির দিকে তাকাল। ও ফাঁসির দড়ি তোমাকে ছিঁড়ে যেতে হবে। মাধবীর ঘরে তোমার আর থাকা হবে না। ফাঁসির দড়ি ফোঁস ফোঁস করছে সাপের মতো। ফোঁস ফোঁস করে আর কোনো ফায়দা নেই রে ফাঁসির দড়ি, এখন আর মাধবী মরতে চায় না, আসল সাপের ফোঁসফোঁসানিকে ভয় পেলাম না আর তুই তো নকল সাপ। মাধবী উঠে দাঁড়ায়। যে চেয়ারের উপর উঠে সে ফাঁসের দড়িতে ঝুলতে গেছিল সাত বছর আগে সেই চেয়ার ধরে। চেয়ারটা নড়বড় করছিল। তাল সামলে খুব সাবধানে চড়ে চেয়ারে। সে দড়ি ধরে টান দেয়। দড়ির কিছুই হয় না। সে আরো একটু জোরে টান দেয়। দড়ি ছিঁড়ে না। সে আরো জোরে টান দেয়। চেয়ারটার এক ঠ্যাঙ ভেঙে মড়াৎ করে বসে যায়। তার পুরো ভর পড়ে দড়ির উপর। সে ঝুলে গেছে। থত্থর করে কাঁপছে জগৎ। জগৎ কাঁপছে কেন? ভূমিকম্প হচ্ছে? কাঁপুক জগৎ, তাকে দড়ি ছিঁড়ে ফেলতে হবে, মৃত্যু ছিঁড়ে ফেলতে হবে। মৃত্যু ছিঁড়ে ফেলার যন্ত্রণায় জগৎ কেঁপে উঠছে, যেমনভাবে হাতুড়ে ডাক্তার দাঁত উপড়ানোর সময় রোগির প্রাণ উপড়ে আসার যোগাড় হয়, রোগি থত্থর করে কেঁপে ওঠে। মাধবী দড়ি ছিঁড়ে ফেলার, মৃত্যু ছিঁড়ে ফেলার প্রাণপন চেষ্টা করছে। জগৎ কাঁপছে, যেন জগতের প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছে। তবে কি মৃত্যুই জগতের প্রাণ? ঝুলতে ঝুলতেই মাধবী হ্যাঁচকা টান দেয়, দড়ি ছিঁড়ে না, মৃত্যু ছিঁড়ে না। আরো জোওে টান দেয়, হঠাৎ করেই বহু বছরের পুরোনো বাঁশের চালা পুরো হুড় মুড় করে ভেঙে পড়ে, মাটির দেয়াল ভেঙে পড়ে।

রাতে হাল্কা ভুমিকম্প হয়েছে। সকাল বেলা লোকজন দেখে, মাধবীদের বাড়িটা গতকাল রাতের সামান্য ভূমিকম্পে পড়ে গেছে। ঘরের চালা, মাটির দেয়াল, বাঁশকাঠ পড়ে আছে একটা স্তূপের মতো। মানুষ দূর থেকে দেখছে আর চলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দুএকজন দাঁড়িয়ে দুএকটা কথা বলছে –
: শ্রীদামটা মরে গেছিল অল্প বয়সেই।
: আরতিটা রমজান ডাক্তারের সাথে কী কেলেঙ্কারিটাই না করল। শেষে সেখানেও সে ঠাঁই পেল না। পরে, পাগলি হয়ে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল এখন তাও দেখা যায় না।
: মাধবীটা কোথায় নিজেই চলে গেল, না কেউ তাকে ধরে নিয়ে গেল, না শেয়াল কুকুরে খেল তার কোনো হদিসই পাওয়া গেল না।

তিনদিন পর্যন্ত মানুষ এভাবে দূর থেকে দেখে, কথা বলে চলে যাবে, একেবারে স্তূপের কাছে আসবে না। কারণ, তিন চারদিনের আগে তো স্তূপের ভেতর থেকে গন্ধ বের হবে না। চোখ নয় নাকই মানুষকে ভাঙা স্তুূপের একেবারে কাছে নিয়ে আসবে।

 

লেখক পরিচিতি :

কবি ও কথাশিল্পী আনিফ রুবেদের জন্ম ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৮০ সালে, চামাগ্রাম, বারঘরিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: জীবগণিত (২০২০), মন ও শরীরের গন্ধ (২০১৪), দৃশ্যবিদ্ধ নরনারীগান (২০১৭), এসো মহাকালের মাদুরে শুয়ে পড়ি (২০১৫)।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

বদর বদর | অমর মিত্র

Thu May 13 , 2021
বদর বদর | অমর মিত্র 🌱 তিনি বিমল চন্দ্র। তিনি একা থাকেন। তাঁর যে বাড়ি ছিল বোড়ালে, যে অংশ তাঁর ছিল, তা ধ্বংস্তুপ। প্রমোটার নিয়েছে। নিয়েছে বছর তিন। কিন্তু কিছুই করছে না। পড়ে আছে। তিনি হাল ছেড়ে দিয়েছেন। মা বাবা মরে গেছে। তাঁর দুই ভাই ছিল, একজন বড় কমল, অন্যজন […]
Shares