শিকার | মোর্শেদ শেখ

শিকার | মোর্শেদ শেখ

🌱

সুনসান চারপাশ। পড়ন্ত রোদের ভ্যাপসা ত্যাজ। একটুও বাতাস বইছেনা কোনদিকে। চুলগুলো ভিজে উঠছে নূরালীর। ঘামের ছোট কিছু ধারা চুলের ভিতর থেকে কপাল বেয়ে থুতনিতে নামছে। কিছু কিছু চোখের ভুরুতেই আটকে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে এক-দু’ফোঁটা লবন পানি মুখে যাচ্ছে। জিভ নেড়ে নিঃশব্দ ভাবে চেটে যাচ্ছে। তবুও নূরালী তীক্ষভাবে চেয়ে আছে। পড়ন্ত রোদের ভ্যাপসা ত্যাজ আর বাতাসহীন অবস্থাটাই নূরালীকে আরও দৃপ্ত করে তোলে। চোখের ভেতরটা এদিক ওদিক খুব আস্তে আস্তে ঘুরতে থাকে। চোয়ালগুলো শক্ত হয়। খুব সাবধানে বৈঠা ফেলে। ছোট ডিঙ্গিটা বিলের চারপাশের ঘাস-ঢেপ-শাপলা ঠেলে এগিয়ে যায়। পানিতে কোন শব্দ ওঠেনা। নূরালী বৈঠা ফেলে। হঠাৎ বৈঠা রেখে চুপ! দৃষ্টি নিবন্ধ হয় অদূরে একগোছা ঘাসের দিকে। নৌকার গলুইয়ে বৈঠা রেখে কোঁচটা তুলে নেয় নূরালী। চোখগুলো জ্বলজ্বল করে। দৃষ্টি স্থির হয় ঘাসগুলোর দিকে। চোয়ালগুলো আরে দৃঢ় হয়। চারিদিক সুনসান। বাতাসহীন। স্থির হয়ে আছে সারা বিলের ঘাস-শাপলা-শাপলার পাতা। ঝিরঝির ঢেউ পর্যন্ত নেই। কিন্তু নূরালীর দৃষ্টি যে ঘাসগুলোর উপর; সেগুলো একটু একটু নড়ছে। কোঁচ হাতে নূরালী তৈরি নৌকার মাথায়। আচমকাই ছুড়ে মারে ঘাসগুলোর মাঝখানে। বিলের পানিতে ‘ঢুপ’ একটা শব্দ হয়। একটু দূরে হিজল বনে দু’একটা বক-পানকৌড়ি একটু গলা উচিয়ে এদিক ওদিক তাকায়। যেন শব্দের উৎস ও কারণ বোঝার চেষ্টা করে। তারপর আবার নিজেদের কাজে মনোযোগ দেয়। নূরালী ডিঙ্গিটা নিয়ে ছুঁড়ে দেয়া কোঁচটার দিকে এগিয়ে যায়। কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে কৌশলে কোঁচটা বের করে আনে ঘাসের ঝুপের ভিতর থেকে। ঘাস-ঘাসের গায়ে লেগে থাকা শ্যাওলা-পোকা শিকারে আসা মাছগুলো নূরালীর শিকারে পরিণত হয়। কোঁচের মাঝে গেঁথে থাকা মাছগুলি খুলে নৌকার মাঝে রাখে নূরালী। হঠাৎ দু’একটা একটু নড়াচড়া করে। নৌকার তলায় জমে থাকা পানিতে ছোট আলোড়ন উঠে। থামানোর চেষ্টা করে নূরালী। পানির কিছু ফোঁটা তার মুখে ছিটকে পরে। ঘাম আর পানি তার মুখে এক হয়ে যায়। বিলের পানিতে মুখ ধুয়ে নূরালী আবার সামনে এগিয়ে যায় নিঃশব্দে বৈঠা ফেলে আরো কিছু শিকারের আশায়।

বিকালে বাংলাবাজারের হাটে অর্ধেক মাছ বিক্রি করে নূরালী। আর অর্ধেক থেকে যায় তার নাওয়ে। মাছ বিক্রি শেষে হাট থেকে কিছু কেনাকাটা সেরে সন্ধ্যায় বিলের পূবে নাও ভাসায় সে। মাঝে হিজল আর কড়চের বাগ। গলা পানি – বুক পানি ভেঙে দাঁড়িয়ে। তারপর নূরালীর কাঙ্খিত গন্তব্য। আমজোড়া গ্রাম। দিন হলে কড়চ – হিজল বাগের মাঝ দিয়ে নাও বাইতো সে। সময় সন্ধ্যা শেষে রাতের দিকে এগিয়েছে তাই হিজল – কড়চ বাগকে বায়ে রেখে বেশ একটু ঘুরে যায়। আমজোড়া গ্রামের সিদ্দিক আলীর বাড়ি তার গন্তব্য।

নূরালীর দ্বিতীয় পরে পরিবার যায়েদা বানু কোনো ছেলে মেয়ের জন্ম না দিয়েই বছর দুই আগে বৈশাখের এক দুপুরে ঘরের কাজ শেষে পুকুর ঘাট থেকে কলসি নিয়ে ফিরে ঘরে ঢুকার আগেই উঠানেই বেহুঁশ হয়ে যায়। পাড়া প্রতিবেশির শত চেষ্টাতেও হুঁশ ফেরে না তার। এই দুই বছরে নূরালী তৃতীয় আর কোন পরিবারকে গ্রহন করেনি। তেমনি যোগাযোগও ছিন্ন করেনি শ্বশুর সিদ্দিক আলীর পরিবারের সাথে। আর শ্বশুর সিদ্দিক আলী মেয়ের মৃত্যুর পরও তাকে এখনও জামাই হিসেবেই আদর- যত্ন করে যেমন করে শ্বাশুড়ি জরির মা। যদিও পাড়া প্রতিবেশির গুঞ্জণ সিদ্দিকের প্রথম পরে মেয়ে যায়েদার মৃত্যুর পর দ্বিতীয় পরে মেয়ে জরিনাকে নূরালীর হাতে তুলে দিতে চায় সিদ্দিক। নূরালীর মতো জামাইতো সহজে পাওয়া সহজ না। শুধু একটু অপো আরো বছর খানেকের। জরির বয়সটা ১৫ পার হতে দেয়া। শরীরের বানটা যেন একটু ভালো হয়। ৩৮ বছরের নূরালীর সাথে যেন বেমানান না লাগে। আর নূরালীও সে আশাতেই শ্বশুর বাড়ির সাথে যোগাযোগ ছাড়েনি- তৃতীয় পক্ষ ঘরে আনে নি। গায়ের লোকজন বলে; ধৈর্য ভালো নূরালীর।

আমজোড়া গ্রামে ঢুকে শ্মশানকে পিছে রেখে বড়দিঘীর পাশ দিয়ে এগিয়ে পোদ্দার বাড়ির বেতগড়া পেরুতেই শ্বশুরবাড়ির আলো দেখতে পায় নূরালী। বেশ দ্রুততার সাথে বৈঠা ফেলে সে। বাড়ির সীমানার কাছে যেতেই কানে আসে ৬১ বছরের সিদ্দিকের খুক খুক কাশির আওয়াজ। গেলবার থেকে শুরু হয়েছে কাশিটা। আগে যখন হুক্কা খেত তখন কাশিটা ছিল না। কিন্তু বছর তিনেক আগে তামাকের অপ্রতুলতা আর বিড়ির সর্বত্র ব্যবহারে বিড়িকে বেছে নেয় সিদ্দিক। প্রথম প্রথম মতি বিড়ি টানতো। এখন বিনোদ টানে। বিড়ি খাওয়ার বছর দুয়েকের মাথায় এই কাশির শুরু। প্রথমে খুব একটা পাত্তা দেয় নি। এখন খুব ভুগায়। রাতে শোয়ার পর বাড়ে। কাশতে কাশতে চোখ মুখ লাল হয়ে যায়। সিদ্দিকের সাথে সাথে ঘুম ভাঙে বউ আর মেয়ের। প্রথম প্রথম সারা রাত জেগে থাকতো বউ মেয়ে। কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পর বিষয়টা বউয়ের কাছে আর জটিল কিছুই থাকে না। হয়ে উঠে বিরক্তির কারণ। আর এখন সিদ্দিকের বিছানা ছেড়ে বউ হালিমা বানু মেয়ে জরির বিছানা ভাগ করে। হালিমার বিছানা ছাড়ার পর থেকেই সিদ্দিক দেবল কবিরাজের সালসা খেয়ে চলছে। তা প্রায় মাস ছয়। কিন্তু কিছুতেই কোনো কাজ হচ্ছে না। উন্নতির বদলে নুইয়ে গেছে শরীর। তবুও দেবলের সালসা খেয়ে যায় সে। আর মাঝ রাতে কাশতে কাশতে ঘুম ভেঙে উঠে একটা বিনোদ বিড়ি ধরিয়ে আস্তে আস্তে উকিঁ দেয় পাশের ঘরে। দেখে বউ – মেয়ে নিরবে ঘুমাচ্ছে। এখন আর কাশিতে ঘুম ভাঙে না তাদের।

শ্বশুরের ভিটায় নূরালী নাও ভিড়াতেই দরজার পাশে বসে বিড়ি টানতে থাকা সিদ্দিক হাক দেয় – কেলা গো?
– জ্বি আব্বা আমি, আমি নূরালী শেখ।
নিজের নামের পাশে ‘শেখ’ কথাটি বলতে খুব ভালোবাসে নূরালী। যখনই সুযোগ পায় তখনই বলে ‘নূরালী শেখ’। তবে কবে থেকে বা কেমন করে সে শেখ হল তা ভালো জানা নাই তারও। বাপ আব্বাসালী কিংবা দাদা বাবরালী কেউ শেখ ছিল কিনা তা তার গ্রামের কেউ আজ আর মনে করতে পারে না।

বাড়ির সামনে একটা গাছে নাওটাকে বাঁধতে থাকে নূরালী। এমন সময় কুপি হাতে বের হয়ে আসে জরি। কাছে এসে জিজ্ঞেস করে – কিরম আছইন দুলাভাই?
– ভালা। তুই ভালা আছস?
– হ।
নূরালীর সাথে জরির বিয়ে বিষয়ে কিছু কানাঘুষা চলছে তা জরিও জানে। তবুও আগের মতোই জরি তাকে দুলাভাই বলেই সম্বোধন করে। যদিও আশেপাশের বিভিন্ন জনের কথায় আর সমবয়সীদের ঠাট্টা ইংগিতে ধীরে ধীরে জরির কিশোরী মনে নূরালীর ঘর সংসারের স্বপ্ন বীজ ছেড়ে এখন হৃষ্টপুষ্ট এক চারাগাছ। নাও বাঁধা শেষ করে নূরালী চোখ তুলে তাকায় জরির দিকে। মাস তিনেক আগে দেখে যাওয়া জরি যেন কিশোরী জরি নেই। গায়ে গতরে অনেক বেড়েছে। তার সাথে শাড়ী পড়ায় তাকে যুবতী বলেই মনে হচ্ছে। নূরালী যেন হঠাৎ নতুন জরিকে কুপির আলোতে আবিষ্কার করতে চায়। নূরালীর তাকিয়ে থাকা দেখে চোখ নামিয়ে জরি বলে – চলেন; ঘরে চলেন। বাংলাবাজারের হাট থেকে কেনা সদাইপত্র আর শিকার করা মাছগুলো নিয়ে নূরালী কুপির আলোয় দেখা যাওয়া পথে জরির পেছন পেছন ঘরের দিকে এগিয়ে চলে।

ঘরে ঢুকে নূরালী মাছগুলো জরির হাতে দেয় আর সদাইগুলো নিচে রেখে সিদ্দিকের পাশে বসে। জরি মাছগুলো নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগুতেই সিদ্দিক বলে – তোর মারে কইছ, জামাই আইছে।
– আইচ্ছা।
নূরালীর দিকে একটা বিড়ি এগিয়ে দেয় সিদ্দিক। বিড়িটা ধরিয়ে নূরালী একটান ধোঁয়া ছেড়ে বলে – আপনের শইলডা অখন কিরম?
– আছে বাবা, কুনুমত।
– কবিরাজের ওষুদে কুনু কাম অয় না?
– বুঝি কই!
– আমি একটা সালসা আনছি। বাংলাবাজারের হাটও লইয়া আইছিন। কুহিনূর কম্পানির। কয়দিন খাইয়া দেহইন। আরাম লাগলে আর একটা আনবামনে।
হাট থেকে আনা সদাইগুলো থেকে সালসার বোতলটা বের করে সিদ্দিকের হাতে দেয় সে। এমন সময় ঘরে ঢুকে জরির মা হালিমা। ৩২ বছরের তাগড়া শরীর। এক সময় গায়ের রঙ কত সাফ ছিল। এখন তা তামা রঙের কাছাকাছি। নূরালীর শ্বাশুরী মারা যাওয়ার পর আজ থেকে ১৬ বছর আগে হালিমাকে ঘরে আনে সিদ্দিক। তখন সিদ্দিকও ছিল ৪৫ বছরের তাগড়া মরদ। আজ ১৬ বছরের সংসার জীবনের পর বয়স ও অসুখে সিদ্দিক ভেঙে পড়লেও হালিমা যেন আরো গড়ে উঠেছে। শরীরের মজবুত বান বাহির থেকে বুঝতে দেয় না ভেতরের অভাবটা। যদি কেউ ভলো করে পরখ করে তাহলে হয়তো বোঝে যায় মেদহীন বলিষ্ট শরীরে ফোটে ওঠা অন্য এক ভাষা।

আজ নূরালী আসায় সিদ্দিকের জায়গা হয় রান্নাঘরের বারান্দায়। যদিও নূরালী বলেছিল – আব্বার যাওনের দরকার নাই, এক ঘরয়ই থাহন যাইবো।
শোনে হালিমা বলেছিল – থাহন যাইবো ঠিকই, কিন্তুক ঘুমান যাইবো না। রাইত ভর খালি খুক খুক…
সিদ্দিকও সায় দিয়ে বলে – হ বাবা; তুমি অত দূর থাইক্কা আইছ, রাইতে একটু ভালা কইরা ঘুমাও। আমি পিছে আইতনাতেই ঘুমাইতা পারবাম।
তবুও রাত বাড়ার সাথে সাথে সিদ্দিকের কাশির খুক খুক শব্দের পাতলা আবরন ঘরের মানুষদের ছুঁয়ে যায়। এক সময় শোনা যায় নূরালীর নাক ডাকার শব্দ। নূরালীর নাক ডাকার শব্দ শোনে পাশের ঘরে বিছানায় এপাশ ওপাশ করা জরি মুখ চেপে হেসে ওঠে। হাসির শব্দে তন্দ্রচ্ছন্ন হালিমার তন্দ্রা ছুটে যায়। মেয়েকে ধমক দেয় – শইল তেলং তেলং করে না! ঘুমা। অত আসি আয় কেরে?
মায়ের ধমকে হাসি বন্ধ করে পাশ ফিরে শোয় জরি। তার চোখে রঙিন স্বপ্ন খেলা করে। ঘর – সংসার – নূরালী – সন্তান আরো অনেক কিছু। স্বপ্নের ছুটাছুটিতে মগ্ন জরি এক সময় গভীর ঘুমে মগ্ন হয়ে পরে।

রাতের গভীরতার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলে সিদ্দিকের খুক খুক কাশির শব্দ। জরি পাশ ফিরে শোয়; ঘুমের ঘোরে মাকে জড়িয়ে ধরতে চায় কিন্তু হালিমাকে পায় না। হালিমা তার পাশে নেই। চোখ মেলে তাকায় জরি। ভাবে হয়তো ‘বাইরে’ গেছে। আবার চোখ বন্ধ করে – বাড়ির সামনে ঘাটে নূরালীর নাও একটা ছোট লাঠিম গাছের সাথে বাঁধা। বাতাসে পানিতে মৃদু ঢেউ, নাও-ও দোলে। বাতাসে নাও একবার ঘাটের গায়ে লাগে; আবার একটু দূরে সরে। ঢেউ; নাও আর ঘাটে শুরু হয় গল্পকথা – ছলাৎ ছল; ছলাৎ ছল, কখনো চুকচুক – চুকচুক।

আজ সবার আগে ঘুম ভাঙে জরির। জরি বেড়িয়ে আসে বাড়ির সামনে ঘাটে। ভোরের ঝিরঝির বাতাস চারিদিকে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে। আলতো পরশে ছোঁয়ে যায় জরিকে। উঠে বসে নূরালীর নাওয়ে। একবার হাতে তোলে নেয় বৈঠা। পানিতে না ছুইয়েই নিজ মনে টানে নূরালীর বৈঠা। আবার তোলে নেয় নাওয়ে রাখা কোঁচটা। নাওয়ের উপর দাঁড়িয়ে শিকারীর ভঙিতে ছুড়ে মারতে চায় পানিতে। একবার; দুইবার – তিনবারের সময় সত্যি সত্যিই পানিতে ছুড়ে মারে। টলে উঠে নূরালীর নাও। সামলাতে পারে না জরি। পানিতে পড়ে যায়। কোঁচটাকে নাওয়ে তুলে রেখে ভাসান পানিতে ডুব সাঁতারে মাতে জরি। আপন মতে চলে তার ডুব – সাঁতার খেলা। এদিকে ভোর তখন সকালের পথে। ডুব – সাঁতার শেষ করে ঘাটে উঠে দেখে নূরালী দাঁড়িয়ে তার নাওয়ের কাছে। দেখছিল জরির জলকেলি। ভিজে শরীরে উঠে আসা জরিকে দেখে নূরালী। দৌড়ের কাছাকাছি দ্রুততায় জরি ছুটে যায় ভিতরে। ঘরে ঢুকে হালিমার সামনে পড়ে জরি। ভিজে শরীরে জরিকে দেখে চমকে যায় হালিমা। বলে – এই তুই অত বিয়ানে ভিজছস কেমনে?
– ভিজছি কই; গোসল করছি।
– অই অত বিয়ানে তোর গোসল কিয়ের রে?
– রাইতে গরম লাগছে হের লাইগ্গা…
– রাইতে গরম লাগছে না? শইললে তেল বেশি অইছে? অত তেলং তেলং ভালা না হারামজাদী। সময় অইলে তেল মজব-
জরি কিছু বলে না। সকালে তার গোসলে হালিমার ক্ষেপে যাওয়ার কারনও খোঁজে পায় না। চোখ গড়িয়ে পানি পড়ে। কিন্তু শরীর – মুখে লেগে থাকা ভাসান পানির কারনে জরির চোখের পানির অস্তিত্ব হালিমার চোখে দৃশ্যমান হয় না। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে জরি। ভিজে কাপড় থেকে গড়িয়ে পড়া পানি ভাসিয়ে দিতে চায় মাটির ঘরের মেঝে। খেঁকিয়ে ওঠে হালিমা – ওই ঘর ভিজে দেহছ না? যা কাপড় বদলা।
দুই পাশে দড়ি দিয়ে ঝোলানো বাঁশ থেকে মায়ের একটা শাড়ি টেনে রান্না ঘরের দিকে পা বাড়ায় জরি।

সকালের খাওয়া দাওয়া শেষে নূরালী চলে যেতে চাইলে হালিমা বলে – আইজ দিনটা থাইক্কা গেলে অয় না?
– না যাইগা। বাড়িত একটু কামও আছে।
– ‘ও জরির বাপ; তুমি কও।’ সিদ্দিকের উদ্দেশ্যে বলে হালিমা। ‘বাড়িত তো আর কেউ নাই। হেই একলা। আমরার সাথে একটা দিন থাউক।’
– ‘হ, আইজ থাউক জামাই।’ সিদ্দিক বলে। ‘আইজ আর কাম নাই। কাইল বেনে রওনা দিবানে। আর জরির মা তুমি দেখ কয়ডা পিডা বানানি যায় কীনা? জামাইতো খালি লইয়াই আয়। ভালা কিছু তো তারে আর খাওয়াইতে পারি না।’
অতঃপর সিদ্দিকের কথা আর এড়াতে পারে না নূরালী।
নূরালী আর সিদ্দিক বিড়ি টানছে রান্না ঘরের বারান্দায় বসে। ভিতরে চালের গুড়ি তৈরি করছে হালিমা। পাশে বসে জরি। বিড়ির ধোঁয়ার সাথে খুক খুক কাশিও বের হচ্ছে সিদ্দিকিরে মুখ থেকে। নূরালী বিড়ি টানতে টানতে দেখছে ভিতরে পিঠা তৈরিতে ব্যস্ত হালিমা আর জরিকে। হালিমার বলিষ্ঠ হাত – বাহু। চালগুলো পিষে চলছে পাটায়। সামনে পিছনে দুলছে হালিমা। পাশে জ্বলন্ত চুলায় কি যেন বসানো। চুলার ভিতর থেকে আগুন বেড়িয়ে আসতে চায়। কিন্তু পারে না। উপরে চাপানো পাতিলটায় আটকে যায়। শুধু পাশের ফাঁক দিয়ে একটু উঁকি-ঝুঁকি দেয় আর উত্তপ্ত হতে থাকে পাতিলটা। নূরালী একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আর বিড়ি টানতে থাকে। হালিমা ভেতর থেকে আড়চোখে দেখে নূরালীর দৃষ্টি; সাথে পাটায় চালগুলোর উপর ঘর্ষণের পরিমান আরো বাড়িয়ে তোলে।

দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষে নূরালী বলে – থাকছিই যহন; যাই দেহি আপনেরার রৌয়াইল বিলে কিছু মাছ পাই কিনা?
– ‘শ্বশুর বাড়িত আইয়া মাছ মারতে যাইবা?’ সিদ্দিকের এই কথায় হালিমাও সমর্থন যোগিয়ে বলে -‘হ; মাইনষে নানান কথা কইবো। কাম নাই।’
-মাইনষের কথায় কি অইবো। বাড়িত বইয়া থাহনের চেয়ে দেহি কিছু পাওয়া যায় কিনা?’ বলে উঠে দাঁড়ায় নূরালী।
-‘আমি যাই বাজান দুলাভাইয়ের লগে?’ জরি বলে।
শুনেই খেঁকিয়ে উঠে হালিমা। – মাইয়া মাইনষের আবার মাছ ধরা কিয়ের? যা ঘরে অন্য কাম আছে হেইডি কর।
– বাজান তুমি মায়েরে কও।
-‘আইচ্ছা টিক আছে। যাউক।’ মেয়ের আবদার ফেলতে পারে না সিদ্দিক। ‘জামাইতো আছেই। তবে জামাই সকাল ফিইরো।’
বাপের অনুমতি পেয়েই জরি নূরালীর আগেই নাওয়ের দিকে ছুটে চলে। পাছে মা আবার অন্য কিছু বলে আটকে দেয়। নাওয়ের কাছে এসে কোঁচটা যাচাই করে নাও ভাসিয়ে দেয় নূরালী।

রৌয়াইল বিলে নিঃশব্দে এগিয়ে চলে নূরালীর নাও। নূরালী কোন কথা বলে না। মাঝে মাঝে হ্যাঁ অথবা না দিয়ে উত্তর দেয় জরির নানা জিজ্ঞাসার। দৃষ্টি তার শিকারের খোঁজে। সময় গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে নূরালী তার দ শিকারী হাতে কোঁচে গেঁথে নেয় মাছ। জরি অবাক চোখে দেখে নূরালীর নিপুনতা। কিভাবে বোঝে যায় মাছের খাওয়ার জায়গা! কিভাবে এত নিখুঁত ছোঁড়ে কোঁচ – গেঁথে নেয় মাছ! জরি ভাবে আর নূরালীকে দেখে। শিকার করার আগে নূরালী যেন ধ্যান মগ্ন হয়ে যায়। মাছরাঙার মতো। তারপর ঝুপ শব্দ ওঠে বিলের বুকে। কোঁচে গেঁথে যায় নানা রকম মাছ।

নিঝুম বিকালে রৌয়াইল বিলে আর কেউ নেই। নূরালী আর জরি। বিলের একপাশে একটু উচুঁ যায়গা দেখে নাও ভিড়ায় নূরালী। নাও থেকে নেমে ঘাসের উপরে বসে একটা বিড়ি ধরায় সে। জরি আস্তে কোঁচটা তুলে নেয় হাতে। নূরালীর ভঙ্গিতে পানিতে ছুঁড়ে দিতে চায়। নাও একটু টলে উঠে। দেখে নূরালী একটু ধমকের সুরে বলে – পানিত পরবি; কোঁচ থ।
– আমারে শিখাইবেন দুলাভাই?
– তুই কি করবি শিইখ্খা?
– কিছু না; তবু একটু শিখি।
জরির আবদার ফেলে না নূরালী। দেখিয়ে দেয় কোঁচ ধরা আর ছুঁড়ে মারার কৌশল। নূরালীর দেখিয়ে দেয়া পন্থায় চেষ্টা চালায় জরি – হয় না। নূরালী জরির পিছনে এসে দাঁড়ায়। জরির হাতে কোঁচ ধরিয়ে দিয়ে বলে – এইবার মার।
মারতে গিয়ে টলে উঠে জরি। নূরালী পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে জরিকে। কোঁচটা এলোমেলো পানিতে চলে গেলেও জরি থেকে যায় নূরালীর কোঁচ মারা হাতে।

রাতটা জরির কাছে আজ অনেক অচেনা মনে হয়। কেমন অস্থিরতা তাকে পেয়ে বসে। মাছ শিকার, কোঁচ চালনা সাথে নূরালীর ঘর গেরস্থালির স্বপ্ন মনে বাসা বাঁধে। এই স্বপ্ন আর ভাবনা গুলোই জরির ঘুমকে গাঢ় হতে দেয় না। রাতের দ্বিতীয় প্রহরের মাঝামাঝি ঘুম ভাঙে জরির। বিছানায় উঠে বসে। পাশে হালিমা আছে কি না সে চিন্তা আজ তাকে ভাবায় না। সিদ্দিকের কাশির খুক খুক শব্দও কানে আসে না। বিছানা থেকে নেমে ঘাটের দিকে যায় সে। নূরালীর নাওয়ে উঠে বসে। মৃদু বাতাসে নাও দোলে – জরি দোলে। নাওয়ের দোলা আর জরির মনের দোলা এক হয়ে যায়। ঢেউয়ের ছলাৎ ছল; ছলাৎ ছল; ছল ছল শব্দ জরির কাছে নূরালীর গান বলে মনে হয়। এরই মাঝে জরি অদূরে ঘাটের পাশে দু’টো ছায়াকে নড়তে দেখে। রাতের মাঝ খানে ঘাটে একা জরির রঙিন স্বপ্ন ঘোর ভেঙে যায়। একটু ভয় পেলেও নিজেকে সামলে রাখে। নাও থেকে কোঁচটা হাতে তোলে নেয়। নূরালীর দেখিয়ে দেয়া ভাবে পাকা শিকারির ভঙ্গিমায় ধরে কোঁচ। চোখ স্থির থাকে ছায়া মুর্তিগুলোর দিকে। ছায়াগুলোর এক দেহ হয়ে যাওয়াটা দেখে জরি। ধীর পায়ে কোঁচ হাতে এগিয়ে যায় ছায়াগুলোর দিকে। যতটা পারে নিঃশব্দে। তবুও ছায়াগুলো টের পেয়ে যায় তার আগমন। ঝটকা দিয়ে দেহ দু’টি আলাদা হয়ে যায়। মাটিতে পরে থাকা শাড়িটা টেনে শরীর আর মুখ ঢেকে ঘরের দিকে দ্রুততার সাথে ছুটে গেলেও জরির চোখ এড়াতে পারে না হালিমা। শিকারির মতো স্থির চোখে সে অনেক আগেই চিনে গেছে তার অতি পরিচিত মানুষ দু’টিকে। হালিমার ঘরের দিকে ছুটার সাথে সাথেই জরি হাতের কোঁচটা ছুঁড়ে দেয় অব্যর্থ নিশানায়। টলে না জরি। স্থির। শুধু নূরালীর আর্তচিৎকারে হালিমা পিছন ফিরে স্তব্ধ চেয়ে থাকে। কোঁচে গাঁথা নূরালী মাছের মতোই ছটফট করছে।

সিদ্দিক তখনো পিছনে রান্না ঘরের বারান্দায় ঘুমোচ্ছে। আর তার খুক খুক কাশির শব্দকে ঢেকে দিচ্ছে নূরালীর আর্তচিৎকার।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

শঙ্খ-সান্নিধ্যে | পিয়াস মজিদ

Thu May 13 , 2021
শঙ্খ-সান্নিধ্যে | পিয়াস মজিদ 🌱 দেখা হওয়ার বহু আগে তাঁকে নিয়ে লিখেছিলাম কবিতামতোন এমন কিছু একটা: ‘হৃৎকমল খুঁজছিলেন শঙ্খ ঘোষ, পেলেন ধাতব কলকাতা’। অদেখা কলকাতাও আমার কাছে শঙ্খ ঘোষ-বিহীন ছিলনা। আর যখন একদুপুরে শোনা গেল তিনি আসছেন ঢাকার আজিজ সুপার মার্কেটে, তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরপাল্লার বাসে চড়ে চলে এসেছি […]
Shares