হাঁসপতি | জাহেদ আহমদ

হাঁসপতি | জাহেদ আহমদ

🌱

একশ’ দশটা হাঁসের একটা বাহিনী নিয়া রাজন্যের ন্যায় হেঁটে এল লোকটা সামনের ঢালু বেয়ে উঠে গ্রামসড়কের উপর। একটু দূরে যেয়ে ফের রাস্তা পারায়ে উল্টাপাশের ঢালু দিয়ে নেমে যাবে ক্যারাভ্যান নিয়ে। হাঁসের ক্যারাভ্যান্। ব্যান্ডমাস্টারদের হাতে ব্যাটন্ থাকে যেমন, পোপেদের হাতে যেমন ক্রুশরেপ্লিকা, লোকটার হাতে তেমনি একটা গাছের শুকনো পলকা ডাল। রাষ্ট্রপতিদের শাসনদণ্ড বর্তমানযুগে দেখা না-গেলেও হংসপতিদের হাতে একটা গাছশাখা না-থাকলে হাঁসরাজ্যে বেসামাল পরিস্থিতি দেখা দেয়। কিন্তু অত বড়সড় বহরের হাঁসপাল পরিচালনা তাকিয়ে দেখবার মতো ম্যাজিকই বটে। একশ’ দশটা হাঁসের একেবারে পেছনে থেকেও লোকটা কী করে এদের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করছিল! অর্কেস্ট্রা কন্ডাক্টোরের ব্যাটন ঠিক যেভাবে বাতাসে ফুটিয়ে তোলে স্টাফ-নোটেশনের কোডগুলো, হংসপতির হাতে-ধরা কঞ্চিমতন শুকনা গাছডাল ঠিক ওই কাজটাই করছিল। অতদূর থেকে, একেবারে পেছনসারির শেষে হংসপ্রভু সংগীতপরিচালকের ভূমিকায়, একেবারে পয়লা সারিতে ইন্সট্রাকশন্ ট্র্যান্সমিটেড হচ্ছিল কেমন করে? এ এক রহস্য। যদিও রহস্যের কিছুটা ভেদ করা যায় একটু ভেবেচিন্তে। ব্যাটনের ওয়েইভ এবং সঙ্গে হাঁসচালকের মুখনিঃসৃত কিছু বুলি শেষের সারির হাঁসেদের কানে যেতেই তারা একে অন্যের গায়ে ঠেলে প্রেরিত কোড ট্র্যান্সফার করছিল সমুখপানে। এইভাবে, এই প্রক্রিয়ায়, অভিপ্রেত অভিমুখে হাঁসেদের চালিত করা যায়। ছাগলদেরও, গরুদেরও, মহিষদেরও। যুগে যুগে এইটাই নিয়ম। হংসপতি বীরদর্পে শাসনদণ্ড হাতে নেতৃত্ব দিতে গেলে একটা হাঁসও পতিপরায়ণ রইবে না। আথারেপাথারে যেয়ে একটা ম্যাসাকার কাণ্ড ঘটাবে। যেমন গরুও তা-ই, ছাগলও তদ্রুপ, মহিষ এবং মেষ সকলের ক্ষেত্রেই নিয়ম অপরিবর্তিত। শুধু মানুষের বেলায় নিয়মের ব্যত্যয় দেখা যায়। মানুষচালনার নেতৃত্ব দিতে দেখা যায় মানুষকেই। স্বগোত্রীয় সদস্য যখন সবার থেকে আলাদা হয়ে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তখন নেতৃত্বই হয় শুধু, সংগীত উৎপন্ন হয় না। ফালাফালি হয় নেতা নিয়ে, নীতি নিয়ে, ন্যালাক্ষ্যাপামি নিয়ে। নেতৃত্বগরবে, নেতৃত্বপ্রদর্শকামে, নেতার হুঁশবুদ্ধি বিলুপ্ত হয়ে যায়। হাঁসনেতার অর্জিত গুণের এককণাও যদি জননেতার থাকত, তবে কেমন হতো বা কিই-বা আমড়াফ্রুট ফলত, মনুষ্য প্রজাতির দুইহাজার বছরের সচল সভ্যতায় হেন অভিজ্ঞতা নাই। কিন্তু পেছন থেকে নেতৃত্ব দেয়া, মানবসভ্যতায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিগ্যাটিভ ইম্প্যাক্ট বয়ে নিয়ে এসেছে। সেইটা আলাদা আলাপ। আবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়াটাও অকার্যকর কিছু নয়। বিশেষ করে মানুষের সমবায়ে অপেরা চালাতে গেলে, ব্র্যান্ডেনবার্গ কনচার্টো উৎপন্ন করতে গেলে, ব্যান্ডকন্ডাক্টরকে সামনে থেকে ব্যাটন ঘুরিয়ে ইন্সট্রাক্ট করে যেতে হয়। মানুষ মুখ্যত দৃষ্টান্তনির্ভর বুদ্ধিজীব। চোখের সামনে দেখাতে হয় তাকে, আলো অথবা নাচকলা, পেছন থেকে হাজার চিল্লাইলেও গণমানুষের ইন্দ্রিয় সেই চিল্লানির ফ্রিকোয়েন্সি ধরতে পারে না। হাঁসেরা মানুষের মতো অত অসহায় দৃষ্টিনির্ভর জীব নয়। হাঁসেদের, এবং গরুদের মোষেদের মেষেদের, রয়েছে অন্যান্য সজাগ ইন্দ্রিয়। ফলে তারা অনেক পেছনের বাতাসে-ওঠা খানিক ঢেউটুকুও টের পায়, ঠিকঠাক ঠাহর করতে পারে গতিপথের গাইডেন্স। হাঁসচালক দেখে অবশ্য মনে মনে এমন একটা আন্দাজি চিন্তা জাগতেই পারে যে, কেমন হতো যদি মানুষের গতিপথ নির্দেশ করত একটা হাঁস অথবা গাছশামুক? মন্দ হতো না বোধহয়। নেত্রকোনার নিধুয়া হাওরে যেয়ে হেন অভিজ্ঞান লভিলাম। কোয়েশ্চন ইজ, কৌন বনেগা কোরোড়পতি অ্যান্ড কৌন বনেগা হাঁস। ডোনাল্ড ডাকের কাণ্ডকারখানা দেখি, ডিজনির কার্টুনে, ওয়াল্ট ডিজনি অ্যানিমেশন স্টুডিয়োয় এমন অনেক ক্যারেক্টার ডেভেলপ করা হয়েছে যেইগুলা আমাদেরে ভাবায়, জিন্দেগিভর কোম্প্যানি দিয়া যায়। হাঁস হয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরে যাবার আগ পর্যন্ত কোটিপতি না হাঁসপতি দ্বিধাদোল পিছা ছাড়ে না আমাদের। তবে যেমনে-যেভাবে হোক দ্বিধাটারে একবার সিধা করে ফেলতে পারলেই লিবার্টি। স্যাঁতসেঁতে স্নেহনুয়ানো নেত্রকোনার নাম-ভুলে-গেছি এমন একটা মায়াহাওরের সেই হাঁসপতি জিন্দা থাকলে একদিন ইন্টার্ভিয়্যু করতে যাওয়া যায় কি না ভাবতে ভাবতে দেখি দিন ভাটি নিচ্ছে একযোগে এগারো মসজিদমাইকের আজানের হরিব্বল হল্লার ভিতর দিয়া রাত্রির দিকে।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

নির্বাচিত দশ কবিতা : হাসান মাহমুদ

Thu May 13 , 2021
নির্বাচিত দশ কবিতা : হাসান মাহমুদ 🌱 আমাদের বনলতা সেন আয়ুর হিসেব ক’ষে ঘুমকেন্দ্রে থিতু হয়ে আছে যম মায়ার উঠোনে কার যমজ খড়ম খট্ খট্ শব্দ ধ্যানে কবিতাকে ভাঙে মূঢ়নারী নিশ্চুপ কবিতাকুমারী মাঙে টানা খোয়াবের রাত; মরীচিকা বোধ, কুয়াশা পাহাড় জোনাক ডাঙার পাড়ে সন্ধ্যামেয়ে খাবি খেতে খেতে ডাকে, ওলো আয় […]
Shares