ফুল সাংগ্রাইয়ের দিন | জহির রিপন

ফুল সাংগ্রাইয়ের দিন | জহির রিপন

🌱

চৈত্রের শেষ দিন। পাহাড়ের গাছে গাছে লাগে নাই কালবৈশাখের বাতাস। মানিকছড়ি খালে নাই হাঁটু পরিমাণ পানিও। কোথাও কোথাও এমন যে, চাইলে পা না ভিজিয়েই অনায়াসে চলে যাওয়া যায় এপাড় থেকে ওপাড়। শীতে ঝরা পাতাগুলোও শুকিয়ে গেছে কবেই। এইসব পাতা চৈত্রের দাবদাহে এতোটাই উষ্ণ হয়ে আছে যে এখন কেউ একবার আগুন ধরিয়ে দিলেই হলো। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে পাহাড়। যদিও জুমচাষের পাহাড়গুলো পুড়ানো হয়েছে আগেই। এখন বৃষ্টির অপেক্ষা। কিন্তু কোথাও বৃষ্টি নাই। শুকনো পাতা কিংবা জুম পুড়ানো ছাই কোথাও যে ভেসে চলে যাবে সে উপায়ও নাই। বৃষ্টি নাই, তাতে অবশ্য ফুলের ফুটতে কোনো বাধা নাই। পাহাড় ঢেকে আছে ফুলে ফুলে। এত এত ফুল যে সব ক’টা ফুলের নাম হয়ত এক জীবনে জানা হবে না আমার। তাতেই বা কী? আজ ফুল সাংগ্রাইয়ের দিন। নাম জানা থাকুক বা না থাকুক আজ ফুল ছিঁড়ার দিন। ফুলে ফুলে সাজবে পাহাড়। পাহাড়ের পাহাড়ে নামবে উৎসব।

ভোরের আলো ফুটছে কেবল। গচ্ছাবিল বাজার পেরিয়ে বাস যেখানে নামিয়ে দিল অথবা বাস থেকে যেখানে নামলাম তার এক পাশে বয়ে গেছে মানিকছড়ি খাল। বিপরীত পাশে পাহাড়। পাহাড়ের পাদদেশে আর্মি ক্যাম্প। মাঝখানে পাকা রাস্তাটা সাপের মতো চলে গেছে এঁকেবেঁকে। আর্মি ক্যাম্পের পাদদেশে মাটির বাঙ্কার থেকে বন্দুকের নলা তাক করে আছে ডিউটিরত সৈনিক। সদাসতর্ক তাঁর চোখ। ফাঁকা রাস্তা। ডিউটিরত সৈনিক ছাড়া কোন মানুষেরই দেখা মিলল না৷ দশ বছর আগের এক সকালে এখানেই নেমেছিলাম। সেদিনও এমন সুনসান ছিল জায়গাটা৷ তখন কত আর বয়স? তেরো বা চৌদ্দ? নীরবতারও যে ভাষা আছে সেদিন টের না পেলেও আজ পাচ্ছি৷ ভারী ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নীরবতার ভেতর হাঁটতে লাগলাম বাজারের দিকে৷ কয়েক কদম আগালেই লোহার ব্রিজ। এখনও লোহারই রয়ে গেছে৷ একটুও জং ধরেনি তাতে। যেমন একটুও ঝাপসা হয়নি স্মৃতিও। ব্রিজের নিচে একটা নালা সোজা গিয়ে ঢুকে পড়েছে মানিকছড়ি খালে। যদিও নালায় কোনো পানি নেই। কয়েকটা জংলী গাছ হেলে আছে নালার উপরে।

দশ বছর আগের পরিচিত বাজারটার কোনো পরিবর্তনই হয়নি। সেই তো বাঁশ আর কাঠ দিয়ে বানানো কয়েকটা দোকান। এক ঝাঁক শালিক রাস্তায় পায়চারি করছে। আলাদা করে পরিবর্তন বলতে এইটুকুই। বাজারের ঠিক মাঝখানে দু’দিক থেকে দুটি রাস্তা এসে মিলেছে মূল রাস্তায়। দশ বছর আগেও ঠিক এইভাবেই রাস্তা দুটি ছিল। তবে একটা রাস্তা এখনো মাটির রয়ে গেলেও আরেকটা রাস্তায় ইট বিছানো। ইট বিছানো রাস্তাটা চলে গেছে মানিকছড়ি খালের দিকে, বাজারের পাশের পুকুরের পাড় ঘেঁষে অন্য রাস্তাটা। রাস্তাটা যেখানে শেষ সেখানেই পাহাড়ের শুরু। পাহাড়ের ঠিক নিচেই ছিল একটা মাটির বাড়ি। আব্বার চাকরিসূত্রে সেখানেই থাকতাম আমরা। আমরা বলতে আম্মা, আব্বা আর আমি। আব্বা আর বেঁচে নেই। আম্মা বেঁচে আছে কী? রাস্তাটা যেহেতু এখনো আগের মতোই আছে, আমি আমাদের সেই ভাড়া বাড়িটার দিকে পা বাড়ালাম৷ এই ভোরবেলায় কাউকে কি পাওয়া যাবে? কে বা কারা থাকে ওখানে এখন? তাঁদের কাউকে কি চিনব আমি অথবা তাঁরা আমাকে?

ঢালু রাস্তা। যার দুই ধারে সারি সারি মাটির ঘর। দশ বছর আগে এমনই ছিল দৃশ্য। এখন আর সে সব মাটির ঘরের বেশিরভাগই দেখা গেল না৷ কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে রাস্তাটা ফুরিয়ে গেলে পাহাড়টা দেখা গেল স্পষ্ট। পাহাড়ের নিচের সেই মাটির বাড়িটা কোথায়? পাওয়া গেল না। যেখানে ছিল বাড়িটা সেইখানে এখন দু’তলা ভবন। ভবনের মূল গেইটের মাথায় লেখা ‘রব ভিলা’। রব আংকেল ছিলেন আমাদের সেই বাড়িটার মালিক। আমার আর বুঝতে দেরি হলো না, মাটির বাড়িটা ভেঙে ফেলা হয়েছে। স্মৃতিচিহ্ন হারিয়ে ফেলার মতো বেদনার আর কিছু হয় না। সামনের পাহাড়টার দিকে তাকালাম আমি। দিনে কতবার যে এই পাহাড়ে চড়েছি তার হিশেব নেই। আরো একবার চড়ব না’কি! পা বাড়িয়েও থেমে যাই। পাহাড়টার চূড়ায় যে গাছগুলো ছিল সে সব যদি আর না পাই, দশ বছর আগের সেই স্মৃতিটুকুও নষ্ট হবে। মাটির ঘরটা নেই, পাহাড়ের স্মৃতিটুকু না হয় থাক।

ফিরতি পথ ধরে আবার বাজারের মাঝখানে দাঁড়ালাম। শালিকগুলো ওড়ে গেছে কোথাও। ইটের রাস্তা ধরে মানিকছড়ি খালের দিকে আগালাম। বাজার পেরোলেই বাড়ি-ঘর। বাঙালীরাই থাকে সেখানে। বাড়ি-ঘর পেরিয়ে খালের ধারে এসে দাঁড়ালাম। দশ বছর আগে যেখানে ছিল ঘাট এখন সেখানে কংক্রিটের ব্রিজ। ঘাট নাই। পড়ে আছে পারাপারের রাস্তা। অথচ এইখানে আমার সাঁতার শেখা। কোনো কোনো দিন এখান থেকেই শুরু হতো আমার মাছ ধরা। কেবল আমি একা না। আমার সাথে থাকতো পাশের বাড়ির হুমায়ূন ভাই। মৈত্রী কলেজে পড়তো সে। দুজন মিলে খালের পাড় ধরে জাল ফেলতে ফেলতে কতদূর যে আমরা চলে যেতাম কখনো মাপিনি তা মিটারে। সেই ঘাটটা আর নাই, নাই মাছ ধরার দিনও। হুমায়ূন ভাই কোথায় আছে, কে জানে! খালের ওইপাড়ে যতদূর চোখ যায় পাহাড়। বেশিরভাগ পাহাড়ে হয় জুমের চাষ। আরো বহুদূরে আদিবাসীদের বাড়ি-ঘর। বাঁশের খুঁটির উপর আদিবাসীদের সেইসব ঘর ভালো লাগতো আমার। কংক্রিটের ব্রিজটা সেইসব স্মৃতিকে মুছে ফেলতে চাইলেও আমার স্পষ্ট মনে পড়ছে সেই সব দিনের কথা। সব কিছু কেন একিরকম থাকে না চিরকাল?— এই ভেবে মন খারাপ হয়ে আসে আমার। ব্রিজ পেরিয়ে, খাল পেরিয়ে দূরের রাস্তাটার দিকে তাকাই। যে রাস্তাটা দশ বছর আগে ছিল কেবলি পায়ে হাঁটা পথ। এখন সেখানে চার চাকার গাড়িও চলে যেতে পারে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে দেখতে পাচ্ছি পাহাড় থেকে নেমে আসছে মানুষের একটা ছোট্ট দল। দলে বেশীরভাগই নারী। তাদের হাতে হাতে ফুলের ঝুড়ি। স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে আমি ভুলেই গেছি, আজ তো ফুল সাংগ্রাইয়ের দিন। আমার তো যাওয়ার কথা রানী নিহার দেবী স্কুলে।

ভ্যানে চড়ে বসলাম। গচ্ছাবিল বাজার থেকে রানী নিহার দেবী স্কুল তিন কিলোমিটারের পথ। দশ বছর আগে অষ্টম শ্রেণীতে এই স্কুলেই পড়তাম আমি। যদিও অষ্টম শ্রেণী শেষ করার আগেই এই স্কুল ছেড়ে দিতে হয়েছিল আমাকে। দশ বছর আগে এভাবেই ভ্যানে চড়ে স্কুলে যেতাম। আর্মি ক্যাম্প, বিহাড়িয়া পাড়া পেরিয়ে ভ্যান এগিয়ে যাচ্ছে। এরপরেই ময়ূরখীল পাড়া। লিসামনিদের গ্রাম। এখান থেকেই একই ভ্যানে চড়ে আমার সাথে স্কুলে যেতো অথৈ আর লিসামনি মারমা। একই ক্লাসে পড়তাম আমরা। নতুন একটা স্কুলে এসে এই দুজনের সাথেই হয়েছিল প্রথম পরিচয়। এমনকি এই দুজনেই হয়েছিল আমার বন্ধু। ক্লাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল মেয়েটি লিসা। তার সাথেই ছিল আমার সবচেয়ে ভাব। দশ বছর আগের ফুল সাংগ্রাইয়ের আগের দিন। প্রতিদিনের মতো স্কুল থেকে একই ভ্যানে ফিরছিলাম অথৈ, লিসা আর আমি। ‘কাল সাংগ্রাইয়ের শুরু’ ফিরতে ফিরতে লিসাই জানাল আমাকে। সাংগ্রাই কী? তখনও বুঝি না আমি। ‘তোমাদের যা পহেলা বৈশাখ, সেটাই আমাদের সাংগ্রাই’, লিসা জানিয়েছিল। অথচ পহেলা বৈশাখের তখনও দুইদিন বাকি। কালকের কথা কেন বলেছিল লিসা বুঝিনি আমি। লিসাই বুঝালো, ‘তোমাদের উৎসব একদিন, আমাদের তিনদিন। কাল ফুল সাংগ্রাই। খুব সকালে চলে এসো আমাদের বাড়ি।‘ ভ্যান থেকে নামার সময় লিসা তাদের বাড়ির পথটাও দেখিয়ে দিল। ময়ূরখীল পাড়া বাজার থেকে পথটা গেছে দক্ষিণে। সামান্য দূরেই ময়ূরখীলপাড়া বিহার। বিহারের পাশেই তাদের ঘর। অথচ পরদিন আমার যাওয়া হলো না। ওই বয়সে খুব সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়া সহজ তো ছিল না।

ভ্যান পেরিয়ে যাচ্ছে ময়ূরখীল পাড়া। লিসাদের বাড়িটা নিশ্চয় এখনো এখানেই আছে! থাকারই তো কথা। ভ্যান থেকে নেমে যাব কি’না একবার ভাবলাম। কিন্তু লিসামনিকে কি পাব? আর পেলেই বা কী? লিসা কি চিনতে পারবে আমাকে? কৈশোরের এক সহপাঠীকে দশ বছর সে কেনই’বা মনে রাখবে! মনে রাখলেও তার কি মনে পড়বে দশ বছর আগের নিমন্ত্রণের কথা? সেদিন সকালে যেতে না পারা নিয়ে তার যে অভিমান ছিল তা কি এখনো আছে? লিসাকে খুঁজে পেলে সব প্রশ্নের উত্তর হয়ত জানা যেতো। অথবা জানা না গেলেও ক্ষতি নেই। অন্তত বলা তো যেতো, ‘দশ বছর আগে পারিনি, দশ বছর পরে তো এলাম’।

ভ্যান এসে থামলো রাণী নিহার দেবী স্কুলের গেইটে। কৈশোরের সেই স্কুলের কিছুই বদলায়নি। দুটি ভবন আর লম্বা একটা খেলার মাঠ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সগৌরবে। সামান্য ক’টা দিন পড়লেও এটা আমারও স্কুল। মাথা নিচু করে একবার স্কুলটাকে কুর্ণিশ জানালাম। তারপর সোজা এসে দাঁড়ালাম মূল ভবনের বারান্দায়। স্কুলের মাঠটি লোকে লোকারণ্য। প্রায় সকলেই আদিবাসী। মেয়েদের গায়ে বাহারি রঙের থামি। ছেলেরা পরে আছে লুঙ্গি। তাদের সকলের হাতেই ফুলের ঝুড়ি। আশপাশের আদিবাসী পাড়াগুলো থেকে তো বটেই দূরের পাহাড় থেকেও এসে জড়ো হয়েছে তারা। মাইকে বিভিন্ন পাড়ার নাম ঘোষণা করা হচ্ছে। যখন যে পাড়ার নাম ঘোষণা করা হচ্ছে, সারি বেঁধে একে একে সেই পাড়ার ছেলেমেয়েরা রওনা হচ্ছে রাজবিহারের দিকে। তাদের কণ্ঠ থেকে ঝরে পড়ছে ‘সাংগ্রাই লেতে’। পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণের অপরূপ দৃশ্য। দশ বছর আগের ফুল সাংগ্রাইয়ের দিনের যে বর্ণনা লিসা দিয়েছিল তার সাথে মিলে যাচ্ছে অবিকল। আমার চোখ সজাগ। এতো এতো মানুষের ভিড়ে আমার চোখ লিসাকে খুঁজতে ব্যস্ত। মাইকে ঘোষণা এলো ময়ূরখীল পাড়ার নাম। আমি ছুটলাম ময়ূরখীল পাড়ার দলটির পাশে পাশে। প্রতিটা মুখের দিকেই তাকালাম আমি। কিন্তু কারো মুখের সাথেই লিসামনি মারমার মুখের মিল খুঁজে পেলাম না।

রাণী নিহার দেবী স্কুল থেকে মহামুনি টিলা এক কিলোমিটারের পথ। মহামুনি টিলার ঠিক উপরে রাজবিহার তাঁর প্রাচীন ভবন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভিতরে বুদ্ধের মূর্তি, বাহিরে পাহারারত দুটি সিংহ। মহামুনি টিলার পুরোটা জুড়েই বয়সী বটবৃক্ষ। দশ বছর আগে একবার গুনেছিলাম। তখন সতেরোটা বটবৃক্ষ ছিল এখানে। এখন কি কমলো? আরো একবার গুণে দেখার কথা ভাবলাম। কিন্তু যে লিসা এখানে নিয়ে এসেছিল প্রথম আমাকে, পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল এইসব বৃক্ষের সাথে তাকে ছাড়া কীভাবেই বা গুণি। এইসব বৃক্ষগুলোকে তো পাওয়া গেল, কিন্তু লিসামনিকে আদৌ কি পাওয়া যাবে?

বিহারের দরজায় মোমবাতি জ্বালিয়ে আদিবাসী ছেলেমেয়েরা বটবৃক্ষের নিচে জড়ো হয়েছে। টিলার পুরোটা জুড়েই চলছে অস্থায়ী নানাবিধ দোকান বানানোর কাজ। কাল মূল সাংগ্রাইয়ের দিন। এখানেই মেলা বসবে। দূরদূরান্ত থেকে আসা কারবারিরা ব্যতিব্যস্ত সেইসব নিয়ে। টিলা যেখানে শেষ ঠিক সেখানেই লম্বা মাঠ। মূল সাংগ্রাইয়ের পরদিন এখানেই হবে পানিউৎসব। সেই আয়োজনও থেমে নাই। মাঠের ঠিক পাশেই মানিকছড়ি খাল। খালে বাঁশের সাঁকো। সাঁকো ধরে ওইপারে গেলেই মারমা রাজার বাড়ি। রাজবাড়ির গেইট পেরোলেই মানিকছড়ি বাজার। বাজারে উপচে পড়া ভিড়। সাংগ্রাই উপলক্ষে বড় বাজার বসে এখানেই। সেই বাজারের দিকে না গিয়ে মহামুনি টিলা থেকে নেমে লম্বা মাঠে এসে দাঁড়ালাম। এখানে জড়ো হয়েছে আদিবাসী ছেলেমেয়েরাও। বিহারের প্রার্থনা শেষে তারা ফুল ভাসাবে খালের পানিতে। ফুল ভাসাবার দৃশ্য থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমার নাম ধরে কারো ডাক শুনতে পেলাম। কে ডাকছে ডাকনাম ধরে আমার? ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালাম। সবুজ থামি আর লাল টপস পরিহিত এক নারী এগিয়ে আসছে। মাথায়, গলায়, হাতে ফুলের মালা। এক হাতে ধরে আছে ফুলের ঝুড়ি। অন্য হাতে সামলাচ্ছে দেবদূতের মতো দুই কি তিন বছর বয়সী এক শিশু। শিশুটিরও মাথায়, গলায়, হাতে ফুলের মালা। প্রথম দেখায় এদের দুজনকে মা ফুল গাছের কোলে শিশু ফুল গাছ ঝুলে আছে মনে করলে ভুল হবে না। দৌড়ে এসে আমার মুখোমুখি দাঁড়াল নারীটি। জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল, ‘তুমি, তুমি সুমন না’!

যেখানে কেউ চিনে না সেখানে এই নারী কী করে চিনলো আমায়! ঘটনায় আকস্মিকতায় আমার মুখ থেকে কথা বেরোলো না। মুখের অঙ্গভঙ্গিতে কিছু একটা বোঝালাম। যার অর্থ আমি কি সুমন না সুমন নই তার কিছুই বুঝা গেল না। তবুও নারীটি কথা বলে উঠলো।

‘তোমাকে যে সেই চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হলো, অ্যাম্বুলেন্সে, হাসপাতালে তারপর তো আর তুমি ফিরলে না! তোমাকে কত খুঁজেছি আমরা। তোমরা যেখানে থাকতে, গচ্ছাবিলে, সেখানেও গিয়েছি…’— নারীটি একটুও না থেমে বলতে লাগল।

‘সুস্থ হবার পর আব্বা আর এখানে ফিরিয়ে আনেননি। আব্বা নিজেও ট্রান্সফার হয়ে চট্টগ্রাম চলে গিয়েছিলেন’— নারীটিকে না চিনেই এই প্রথম কথা বললাম আমি।

‘কিন্তু তুমি যে বেঁচে আছো সেটাই তো আমাদের জানা ছিল না। এত বছর পর কোথা থেকে তুমি এলে?’— নারীটি বলল। আমি এখনও নারীটিকে চিনতে পারিনি। সে কি লিসা? লিসামনি মারমা? কিন্তু লিসার যে আদল গত দশ বছর আমি এঁকেছি তার সাথে এই নারীর কোনো মিল নেই। তবে কে সে? অথৈ? অথৈ মারমা?

‘তুমি অথৈ মারমা…’— আমি না চিনেই জিজ্ঞেস করলাম।

‘আমাকে চিনতে পারোনি তুমি?’

আমি উত্তর না দিয়ে পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম, ‘কিন্তু আমাকে কী করে চিনলে?’

‘তুমি কেবল লম্বাই হয়েছো, এছাড়া একটুও বদলাওনি।‘— নারীটি বললো।

আমি নিশ্চিত হলাম সে অথৈ মারমা। আমার চোখ নেচে উঠলো। প্রায় শুকিয়ে যাওয়া গলায় পানির সঞ্চার হলো। এইভাবে এখানে অথৈকে পাওয়া যাবে আমি কি ভেবেছি কখনো! তাঁর কোলের শিশুর দিকে ইঙ্গিত করলাম, ‘তোমার মেয়ে?’

‘হ্যাঁ, তাথৈ মারমা।’

আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। অথৈ বাড়িয়ে দিল কন্যাকে। একবার চোখাচোখি হলো আমাদের। আমরা পরস্পরের চোখে যেন আমাদের দশ বছর আগের শৈশব দেখতে পেলাম। কন্যা তাথৈকে কোলে তুলে নিয়ে অথৈকে বললাম, ‘তুমি ফুল ভাসাবে না?’

ততক্ষণে ফুলে ফুলে ভরে গেছে মানিকছড়ি খাল। আমরা খালের পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। ফুলের ঝুড়িটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল তাথৈ। কয়েকটা ফুল তুলে নিল ঝুড়ি থেকে সে। খুব সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে গেল খালের জলের দিকে। বিড়বিড় করে কী যেন বলে অথৈ মারমা ফুল ভাসিয়ে দিল খালের জলে। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম তার ফুল ভাসানোর দৃশ্যে। কিন্তু এখনো আমি লিসামনির খোঁজ পেলাম না। জিজ্ঞেস করবো নাকি তাথৈকে একবার, নিজেকেই নিজে বললাম।

অথৈ পাড়ে এসে দাঁড়াল। আমার কোল থেকে তাথৈকে টেনে নিতে নিতে বললো, ‘তুমি ফুল ভাসাবে না?’

আমি চোখের ইশারায় সম্মতি দিলাম। ঝুড়ি থেকে কয়েকটা ফুল তুলে নিলাম। ফুল ভাসানো শেষে পুনরায় অথৈয়ের পাশে দাঁড়ালাম। আমাদের দুজনের দৃষ্টিই জলের দিকে। সেই দিকে তাকিয়েই অথৈ কথা বলে উঠলো, ‘লিসামনির খবর তো তুমি পাওনি, তাই না?’

আমার বুক ধড়ফড় করে উঠলো। আমি অথৈয়ের দিকে তাকালাম। কিছুক্ষণ আগেও যার মুখ উজ্জ্বল ফুলের মতো ঝলমলে ছিল তার মুখেই এখন মেঘের ছায়া। আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারি না।

‘হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরি তিনদিন পর। লিসার খবর তখনও আমি জানতাম না।‘— অথৈয়ের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। তার গাল ভিজে গেছে জলে। আমি তার মুখ থেকে চোখ সরিয়ে মানিকছড়ি খালের দিকে তাকালাম। খানিক আগে ভাসানো ফুলগুলো ঢেউয়ে ঢেউয়ে সরে গেছে অনেকটা দূরে। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি দশ বছর আগের ফুল সাংগ্রাইয়ের দিন। আকাশী-নীল স্কুল ড্রেস পরা একটা কিশোরী লিসামনি মারমা। ফুলে ফুলে এতোটাই সেজেছিল যেন সে নিজেই এক ফুলের বাগিচা। স্কুল মাঠের এক কোণায় আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। আমাকে শাসাচ্ছে, ‘কেন তুমি সকালে আসো নাই? তুমি আমার সাথে আর কোনোদিন কথা বলবা না।‘ আমি দেখতে পাচ্ছি ঢেউয়ে ঢেউয়ে ফুলগুলো আরো দূরে সরে যাচ্ছে। কোনোদিন আর কথা বলতে না চাওয়া লিসামনি স্কুল ছুটির পরে ভ্যানে চড়ে বসেছে। তার পাশে অথৈ। আমি পিছনে। আমাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই। আমি দেখতে পাচ্ছি, ভ্যান পেরিয়ে যাচ্ছে ধর্মগড় বাজার। সামান্য দূরেই ময়ূরখীল পাড়া। একটু পরেই নেমেই যাবে লিসা আর অথৈ। আমার একবার তাকে সরি বলা উচিত। আর তখনি বিপরীত দিক থেকে আসা বাসের সজোরে ধাক্কা। আমরা ছিটকে পড়েছি ভ্যান থেকে। কিছু বুঝে উঠার আগেই অন্ধকার নেমে এলো আমার চোখে। খানিক আগে মানিকছড়ি খালে ভাসানো ফুলগুলো ভেসে ভেসে তখন চলে গেছে দৃষ্টির বাইরে।

গল্পসংক্ষেপঃ

তিন বন্ধুর গল্প। কৈশোরে যারা ছিল সহপাঠী। দশ বছর আগের এক সড়ক দুর্ঘটনায় যাদের বিচ্ছেদ ঘটে। সেদিন ছিল ফুল সাংগ্রাইয়ের দিন। দশ বছর পরের আরেক ফুল সাংগ্রাইয়ের দিনে এক বন্ধু খুঁজতে বের হয় অন্য দুই বন্ধুকে। স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে যে হাজির হয় পাহাড়ি সেই জনপদে, যেখানে অনেক স্মৃতিই কেবল নষ্ট হয়নি তার, চিরতরে হারিয়ে ফেলেছে অন্য দুই বন্ধুর একজনকেও।

 

পরিচিতি:

জহির রিপন
জন্ম ৩০ জুন, বাংলা পঞ্জিকায় ১৫ আষাঢ়, ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে। পেশাগত জীবনে যন্ত্রপ্রকৌশলী জহির রিপন পেশা বদলে যেকোনোদিন ট্যুরিস্ট গাইড বনে যেতে পারেন।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

কাঠবাদামের গাছ | মুহম্মদ ইমদাদ

Thu May 13 , 2021
কাঠবাদামের গাছ | মুহম্মদ ইমদাদ 🌱 ১ ‘আম্মা, তোমার বয়স তখন কত আছিল?’ ‘১৭/১৮ বছর হইব।’ ‘তোমার বিয়া হইলো কবে?’ ‘সংগ্রামের ২ বছর বাদে।’ ‘আমি হইলাম কবে?’ ‘তোর জনম সংগ্রামের ৭ বছর বাদে।’ ‘তোমার বিয়া তো তাইলে দেরিতে হইসে।’ ‘সংগ্রামের বছর হওয়ার কথা আছিল। কেমনে হইব এই গন্ডগোলের মাঝে। তখন […]