কাঠবাদামের গাছ | মুহম্মদ ইমদাদ

কাঠবাদামের গাছ | মুহম্মদ ইমদাদ

🌱

‘আম্মা, তোমার বয়স তখন কত আছিল?’
‘১৭/১৮ বছর হইব।’
‘তোমার বিয়া হইলো কবে?’
‘সংগ্রামের ২ বছর বাদে।’
‘আমি হইলাম কবে?’
‘তোর জনম সংগ্রামের ৭ বছর বাদে।’
‘তোমার বিয়া তো তাইলে দেরিতে হইসে।’
‘সংগ্রামের বছর হওয়ার কথা আছিল। কেমনে হইব এই গন্ডগোলের মাঝে। তখন তো মানুষ বিয়া-টিয়া ভুলি গেছিলো। আমার খালি মনে হইত, বিয়ার দরকার নাই, দেশটা স্বাধীন হোক।’
‘তোমার বিয়া যুদি সংগ্রামের আগে হইত তাইলে তো আমি থাকতাম। যুদ্ধ দেখতাম।’
‘যুদ্ধ দেখার জিনিস না রে বাবা। যুদ্ধ খুব ভয়ঙ্কর। কেমনে যে গেছে ৯টা মাস। রাইত ঘুম আইত না ডরে। গোলাগুলির শব্দ হুনলেই আমরা দৌড় দিয়া বাঙ্কারে ঢুকতাম। বাড়ির উপর দিয়া যখন গুলি যাইত ফনফন শব্দ হইত।’


ছেলে তার মা’র কাছে খালি মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে চায়। মা তেমন কিছু জানেন না।তিনি খালি জানেন গুলির ফনফন শব্দ আর বাঙ্কারের কথা। তবু তিনি ছেলের কৌতুহল মেটানোর জন্য মনে করতে চেষ্টা করেন আরো মুক্তিযুদ্ধের গল্প। তার গল্পের কোনো ধারাবাহিকতা নাই। ছেঁড়া ছেঁড়া। তার গল্পের কোনো শুরু নাই, শেষও নাই। তবু সে শোনে। শুনতে তার ভালো লাগে। ছেলেটার খালি মনে হয়, পৃথিবীতে বাংলাদেশ নামক যে একটা স্থান আছে, তা মুক্তিযুদ্ধের আগে ছিলো না। যুদ্ধ করে তবে স্থানটাকে এখানে এনে বসানো হয়েছে আর নাম রাখা হয়েছে বাংলাদেশ।কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা না। স্থান তো স্থানের জায়গায় ছিলো। শুধু নাম রাখা হয়েছে বাংলাদেশ। নতুন শিশুর যেমন নাম রাখা হয়। তবু সে কল্পনা করে স্থানটা এখানে ছিলো না। সে চিন্তা করে ‘সন্তানের যেমন মা থাকে তেমনি মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশের মা আর দেশটার পিতা হচ্ছেন ‘শেখ সাব’। ‘শেখ সাব’ বলেন তার মা। সে ‘শেখ সাব’ বলতে রাজি না। সে বলতে চায় ‘বাংলাদেশের পিতা শেখ মুজিবুর রহমান’। ছেলেটার ছবি আঁকতে ইচ্ছে করে। বাংলাদেশ আর শেখ মুজিবের ছবি। কতভাবে আঁকে তবু তার আঁকার শেষ নাই। মা ভেবে পান না কে শেখালো তাকে পাগলের মতো দেশকে ভালোবাসা? বিজয় দিবসের আগের কিছুদিন তার কী উত্তেজনা। বিজয় দিবসে সে নতুন জামা পরবে, বন্ধুদের খাওয়াবে যেন বিজয় দিবস না, ঈদের দিন। ঈদের দিনেও সে এত উৎফুল্ল থাকে না। জহির রায়হানের ‘সময়ের প্রয়োজনে’ গল্পটা তার প্রায় মুখস্ত। কবি শামসুর রাহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতাটি কতভাবে সে যে আবৃত্তি করে। কিন্তু শামসুর রাহমানের উপর তার অভিযোগ আছে। অভিযোগ হলো, কবিতাটিতে কেনো শেখ মুজিবের নাম নাই।
এই অভিযোগ থেকেই একদিন সে নিজেই লিখে ফেললো-

‘স্বাধীনতা তুমি, শেখ মুজিবের
মহান ভাষণ, সাহসী তর্জনী।’


ছেলেটার নাম তো জানা হলো না। তার নাম সানা। পুরো নাম সানাউল্লাহ। সানাউল্লা ইশকুলের দেয়ালিখার জন্য একটা গল্প লিখবে। মুক্তিযুদ্ধের গল্প। সে তার বাবার কাছে শোনা মুক্তিযুদ্ধের গল্পটা লিখে দিতে পারে, কিন্তু বাবার গল্পটা সে মায়ের মুখে শুনতে চায়। তারপর লিখতে চায়। সে মনে করে মায়ের মুখে মুক্তিযুদ্ধের গল্প খুব মধুর শোনায়। মা খুব আবেগ দিয়ে কথাগুলি বলেন। শুনতে কেমন যেন লাগে।

আব্বার কাছে শোনা গল্প মা বলতে আরম্ভ করেন, ‘২৫ মার্চের পর থাকি আস্তা দেশে পাঞ্জাবী আর পাঞ্জাবী। ডরাইয়া কেউ টু শব্দ করে না। তোমারা হাস্কুলেও আছিল। এলাকার মানুষ ডরাইয়া কততা তারারে নিয়া দিতো। তারা ইসকুলো বইয়া বইয়া খাইতো। কিছু শয়তান রাজাকার আছিল পাঞ্জাবীর কথা কইয়া মানুষর গরু-ছাগল আনিয়া খাইতো। ইন্দুরে এনডিয়া পার করিয়া দিবার কথা কইয়া কত সোনা গয়না নিছে। বহুত শয়তানরে মুক্তি দেশে আইয়া পরে মারছে। কতগু এখনও আছে বাঁচিয়া। পাঞ্জাবীরা বাজারে গিয়ে খবর লইত কে কে আকাশবাণী হুনে।’

মার গল্পের মাঝে সানা জানতে চায়, ‘আম্মা আকাশবাণী কিতা?’
মা বলতে থাকেন- আকাশবাণী একটা রেডিও ইস্টিশন। এনডিয়া থাকি প্রচার অইতো।’
সানা বলে, ‘আকাশবাণী হুনলে দোষ কিতা?’
মা বলেন, ‘আকাশবাণীত বাংলাদেশর খবর দিতো। মুক্তিবাহিনির খবর দিতো। বাজারো
শিলু বাবুর দোকানো রেডিও পাইছিল একটা। রেডিও নিছে কিন্তুক মারছে না। মুক্তি দেশে ঢুকছে হুনিয়া পাঞ্জাবীরা ইশকুল থাকি বারঅই গেল। যাওয়ার সময় গাঙর উপরের বিরিজটা মটার মারিয়া ভাঙিয়া ফালাইছিল। পাখির লাখার মানুষ মারা আরম্ভ করছিল। তোর বড় চাচার লাশ তো পাইছইন না। রেল ইস্টিশনর পাঞ্জাবী গেছিল না। কেম্প থাকি মানুষ মারা আরম্ভ করছিল। তোর আব্বা এনডিয়া যাইতো পারছিল না কিন্তুক মুক্তি দেশে আওয়ার পর তারার লগে যোগ দিছিলো। ইস্টিশনে মানুষ মারার খবর হুনিয়া বাজার থাকি কয়েশ মানুষ বাংলাদেশর পতাকা লইয়া ইস্টিশনে গেল। মুক্তিও লগে আছিল। পতাকা আছিল সিরাজর আতো। বদরি মার পোয়া সিরাজ। এখন রিশকা চালায়। তার বয়স আছিল ১১ বছর। হে আছিল সবার সামনে।
তারা যাওয়ার এক দুইঘন্টা পরে খবর আইলো সবরে মারিয়া ফালাইছে পাঞ্জাবী।তোর দাদি রাস্তাত গিয়া চিৎকার দিয়া বেহুশ। সারা এলাকায় খালি কান্দার রোল। খালি চিৎকার। ২টার পর একজন দুইজন করি আওয়া আরম্ভ করলো। খবর আইলো কেউরুরে মারতো পারছে না। ৪টা পাঞ্জাবী জোয়ানরে তারা মারছে।

সানা শুয়ে পড়েছে। তার চোখ বন্ধ।

‘এর পর থাকি সারা এলাকা খালি অইগেল। যে যে বায় পারছে গেছে। উঠানো ধান, গোয়ালো গরু। রাজাকার ছাড়া কেউ কেউরুর কিচ্ছুতে আত দিছে না। মানুষ কত ভালা হইতো পারে সংগ্রামর বছর দেখছি।’ বলে মা উদাস হয়ে পড়েন। ছেলে কিছু বলে না। সে হয়তো চোখ বুজে শুয়ে শুয়ে গল্প বানাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের গল্প। হঠাৎ সে বলে ওঠে, ‘আম্মা আমার গল্পের নাম দিব ‘‘আমার সোনার বাংলা’’। মা মুচকি হাসেন।
সানাউল্লা বলে, ‘আম্মা গল্পে তো কাঠবাদামের বিষয়টা আনা যায়।’
মা বলেন ‘কী অলৌকিক ঘটনা।’
এলাকায় একটা কাথা চালু আছে। নাপাক পাঞ্জাবীরা ইশকুলে আসবে জেনেই নাকি সংগ্রামের বছর ইশকুলের কাঠবাদমের গাছে ফসল আসেনি। দেশ-মাটির ওপর অশুভ কোনো শক্তির আঘাত নাকি আগেই বুঝতে পারে প্রকৃতি। গাছ, পাখি, তৃণ। মানুষ বোঝে অনেক পরে।

সানা মনে মনে বলে, ‘কাঠবাদামের গাছ দিয়েই গল্প শুরু করবো।’


সানাউল্লার আম্মার নামটা তো জানা হলো না। হাওয়ারুন নেছা।

হাওয়ারুন নেছার আজকাল একা হলেই মনে পড়ে মুখে-মুখে শোনা মুক্তিযুদ্ধের কত গল্প। কিন্তু সানাউল্লাকে এইসব গল্প তিনি কেমনে বলবেন। ছেলেকে এইসব গল্প বলতে মা’র খুব লজ্জা করে। কিন্তু এগুলো তো মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে করুণ গল্প। মা ভাবেন, একদিন কেউ না কেউ তাকে এই গল্পগুলি করবে। সানার গল্পগুলি জানা দরকার। তখন সে আরো বেশি করে দেশকে অনুভব করবে। বুঝবে তার দেশের কত দাম।

সত্যি, মা কিভাবে ছেলেকে বলবেন, সবিতাকে ধর্ষণ করে পাঞ্জাবীরা সিদ্ধ-গরম ডিম যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলো তার যৌনাঙ্গে? কিভাবে বলনে, বারীন্দ্র ঢুলির সামনে তার মেয়েকে পালাক্রমে ধর্ষণের কথা। আমির মুক্তিযুদ্ধ থেকে ফেরার পর কেন তার স্ত্রী নাজমা চলে গেল বাপের বাড়ি? কেন সে আবার বিয়ে করলো? আমির যে যুদ্ধে তার পুরুষাঙ্গ হারিয়েছে একথা ছেলেকে কীভাবে বলবেন মা?

তবু তার মনে হয়, মাটির জন্য, দেশের জন্য, দেশ থেকে দানব হঠানোর জন্য আর নতুন ছেলেমেয়েদের একটা ‘আমার সোনার বাংলা’ দান করবার জন্য এমনসব ত্যাগ দরকার ছিল। দেশের জন্য ত্যাগ করলেই দেশকে ভালোবাসা যায়। সানা যে আজকে শুধু ‘আমার সোনার বাংলা, আমার সোনার বাংলা’ করে তা তো ওই ত্যাগের কারণেই। পূর্বপুরুষগণ ত্যাগ করেছে বলেই আজ তাদের সন্তানরা এদেশের মাটিকে ভালোবাসে।


সানা তার গল্প শুরু করলো।
গল্পের প্রথম বাক্য হিসেবে সে লিখলো, ‘কাঠবাদমের গাছ ঝিম ধরে আছে।’
গল্পের শেষ লাইন লিখলো, ‘আম্মা আমি মরি নাই। মেরে আসছি ৪টা নাপাক শয়তান।’
গল্প যে শেষ হলো তার চিহ্ন হিসেবে সে লিখলো, ‘জয় বাংলা।’


মেট্রিক পাস করে সানা এবছর কলেজে উঠেছে। বন্ধুরা তার নাম দিয়েছে ‘মুক্তি’। তার হাতে সবসময় শোভা পায় একটা ডায়েরি। পাতাগুলি দেশ নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার বিভিন্ন সময়ের অনুভব-অনুভূতিতে ভরা। লেখা আছে কত টুকরো টুকরো মুক্তিযুদ্ধের গল্প। নতুন কোনো এলাকায় বেড়াতে গেলে সে লোকজনের কাছে ওই এলাকার মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনতে চায়। শোনা গল্পগুলি পরে লিখে রাখে তার ডায়েরির পাতায়, পাতায়।

সানার ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা আছে, ‘আমার আম্মা আমাকে জন্ম দিয়েছেন, আর মুক্তিযুদ্ধ জন্ম দিয়েছে এই দেশ। তাই মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশের মা। মুক্তিযুদ্ধকে জন্ম দিয়েছিলেন মহাপুরুষ শেখ মুজিব, তাই তিনি বাংলাদেশের পিতা। বাংলাদেশ মানে তো আমরাই। তাই শেখ মুজিব আমাদের পিতা।’

তার ডায়েরির পরের পাতায় লেখা আছে, ‘আমরা (মানে বাংলাদেশ) আমাদের পিতাকে হত্যা করতে পারি না। পিতাকে হত্যা করেছে তারাই, যারা ‘বাংলাদেশ’ নয়। তারা নাপাক পাকিস্থানের জারজ সন্তান।’

এর পরের পাতায় সে লিখেছে সুন্দর একটি রচনা।
রচনার শিরোনাম ‘এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে সবচেয়ে সুন্দর করুণ।’ লেখাটি এমন :
‘এই যে আপনারা চারদিকে সবুজ প্রকৃতি দেখছেন, পাখির ঝাঁক আর ফুলের রঙিন গুচ্ছ দেখছেন, এই যে ছেলেমেয়ের দল আর নদীর বুকে নৌকা আর নৌকায় বসা নতুন বউ দেখছেন- এসবই বাংলাদেশ। পূর্ব আকাশে ওই লাল একটা সূর্য দেখছেন, আর ওই পূর্ণিমার চাঁদ- সবই বাংদেশের। একদিন তারা বাংলার ছিলো না। আমরা যুদ্ধ করে অর্জন করেছি। আমাদের পূর্বপুরুষেরা তাদের প্রাণ, মান-ইজ্জত, ধন-জন আর ভালোবাসার বিনিময়ে অর্জন করেছেন।…কবি সুকান্ত, কবি নজরুল বহু আগেই ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি উচ্চারণ করেছিলেন। বিশ্বকবির লেখা যে-জাতীয় সংগীত আপনি আজ বুকে হাত দিয়ে গেয়ে ওঠেন তাও তো কত আগের লেখা। আর এই অপরূপ বাংলার মায়াবী প্রকৃতিকে কবি জীবনানন্দ তার ‘রূপসী বাংলা’ নামের কবিতার বইয়ে কী সুন্দর এঁকেছন, তা তো আপনাদের জানা।

লেখাটির শেষ স্তবক, ‘এই দেশের মাটি দেখতে মাটি হলেও আসলে মাটি নয়, আমাদের পূর্বপুরুষের মাংস; তারা তাদের শরীর দিয়ে গড়ে দিয়ে গেছেন আমাদের পায়ের তলের ভূমি। এই ভূমিই তো বয়ে নেয় নদীদের। এই মাটিই তো জন্মায় সোনার ধান…।’


সানার নামটি জানা গেছে বটে কিন্তু তার রূপ-গড়ন তো আমরা এখনো জানি না। ছেলেটা দেখতে অনেকটা চে গুয়েভারার মতো। চুল অবশ্য ততো লম্বা নয়। তার গায়ের রঙ দুধ মেশানো চায়ের মতন। বড় বড় চোখ। কথা বলে কম। হাঁটে খুব দ্রুত। আসলে সে এই বাংলার যেকোনো সুদর্শন ছেলের মতোই একটা ছেলে।
এবছর সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। বিষয় সমাজবিজ্ঞান। বাংলাদেশ নিয়ে বিভোর এই ছেলেকে তার বান্ধবীরা ভালোবাসতে শুরু করলো সেই প্রথম ক্লাস থেকেই। তার গুণ হিসেবে তার শারীরিক সৌন্দর্য মোটেও পাত্তা পেলো না। সবাই তাকে ভালোবাসে তার বাংলাদেশপনা দেখে। সে বাংলাদেশ নিয়ে লিখতে ভালোবাসে, ভাবতে ভালোবাসে। রাজনীতি সে অপছন্দ করে কিন্তু ভালোবাসে দেশকে। অসম্ভব এক ভালোবাসা। রাজনীতির কথায় কেউ দেশকে খাটো করলে, মুজিবকে খাটো করলে সে সহ্য করতে পারে না। সহ্য করতে পারে না ওদেরকে, যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, শিকার করতে চায় বাংলার স্বাধীনতাকে। সে টিশার্ট পরে। তার বেশিরভাগ টিশার্টের বুকে থাকে বাংলাদেশের ছবি। নিচে লেখা থাকে, ‘বাংলাদেশ, আমি তোমাকে ভালোবাসি।’

তার এক বান্ধবী একদিন, দিনের নামটি এখন আর মনে নাই। হয়তো সেদিনের কোনো নাম ছিলও না। সেরকম একদিন এসে তাকে বলে ‘তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে।’ সানা বলে ওঠে, ‘তোমার জন্য আমি কী করতে পারি?’
‘কিছুই করতে হবে না। দেখা হলে একটু হাসলেই হবে।’
‘ঠিক আছে। হাসা যাবে। হাসলে আয়ু বাড়ে।’
‘তোমার আয়ু বাড়ানোর জন্যই এই ব্যবস্থা।’
‘ধন্যবাদ।’

তারপর দেখা হতো। দেখেলেই হেসে উঠতো সানা।
একদিন জিজ্ঞেস করলো ‘খুশি তো?’
‘খুশি হবো না? তোমার আয়ু বাড়ছে। খুশি তো অবশ্যই।’

একদিন সানা নিজেই বলে বসলো, ‘চলো একটু হেঁটে আসি।’
‘চলো। আমার কপাল খুলছে মনে হয়।’
সানা কিছু বলে না।
একটু দূর এগিয়ে সানা বলে, ‘তুমি কবিতা পড়ো না কি? মানে কবিতা ভালোবাসো কি না জানতে চাইছি।’
‘তুমি কবিতা লেখো?’
‘মাঝে মাঝে লিখি।’
‘শেষ কবে লিখেছ?’
‘তুমি যে-দিন বললে আমাকে তোমার ভালো লাগে।’
‘শোনা যাবে?’
‘আরো একটু দূরে গিয়ে, শহিদ মিনারের ছায়ায় বসে তবে কবিতা হবে।’

এখন সময় কত। কোথাও ঘড়ি নাই। দুপুর না বিকেল? মনে হচ্ছে এখন দুপুর না, বিকেলও না। তাহলে এখন ‘কখন’? এরকম সময়কে কোনো নামে ডাকা যায় না। দক্ষিণ দিক থেকে বাতাস এসে শহিদ মিনারে থেমে যাচ্ছে। দুই একটা পাখি কি ডাকছে? ডাকছে না তবে গাছের ডালে ডালে আছে। তারা শহিদ মিনারকে পাহারা দেয়।

সানা বসতে বসতে বললো ‘আমরা কোথায় বসলাম জানো?’
‘কোথায়?’
‘বাংলাদেশের ভিত্তির ওপর।’
‘শহিদ মিনার তো বাংলাদেশের ভিত্তিই। এই মিনারটি যেদিন স্থাপন করা হয়েছিল সেদিনই বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল।’
‘ঠিক তাই। ওই পাকিস্থানি নাপাকগুলো তো মিনারকে দেবতা মনে করে আর তাতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোকে মনে করে পূজা।’
‘এই পশুদের কথা রাখো। তোমার কথা বলো।’
কিছুক্ষণ নীরব থেকে হঠাৎ সানা বলে উঠলো, ‘তোমাকেও আমার ভালো লাগে।’

সানার পাশে বসে-থাকা মেয়েটার নাম নীলিমা। নীলিমা চুপ।
সানা এবার বলে উঠলো, ‘বাক্যটির মধ্যে একটু ‍ভুল আছে। ভালো লাগা হবে না। বাক্যটি হবে, আমি তোমাকে ভালোবাসি।’

নীলিমাকে দেখতে অনেকটা অভিনেত্রী বিপাশা হায়াতের মতো। এখন তার চুল খোলা। সারা পিঠে চুল ছড়িয়ে আছে। মুখে মুচকি হাসির মতো একটু হাসি। এরকম হাসিকে বলে স্বপ্নছোঁয়া হাসি। হাঁটুতে মুখ বসিয়ে পায়ের বুড়ো আঙুলে কী যেন দেখছে নীলিমা। সানা তাকিয়ে আছে সুদূরের নীলিমার দিকে। পুরো দেখা যাচ্ছে না। পাতার ফাঁকে ফাঁকে যা দেখা যায়।

নীলিমা গুনগুন করে গাইছে, ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয়…’
সানাও গাইছে, ‘ওগো মা তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে…।’

প্রেমের কোনো গান তাদের মনে কি পড়ছে না?

নীলিমা বললো, ‘তোমার কবিতা শোনাও।’
সানা বলতে আরম্ভ করলো,
‘তোমার-ও সঙ্গে বেঁধেছি আমার-ও প্রাণ সুরের-ও বাঁধনে
আমি তোমারে পেয়েছি অজানা সাধনে।’
‘এটা তো রবীন্দ্রনাথের। তোমারটা বলো।’
‘আমার কবিতা অন্যদিন হবে। তুমি বাংলাদেশ সম্পর্কে কতটুকু জানো?’
‘বেশি জানি না তবে কমও না।’
‘মুক্তিযুদ্ধ সর্ম্পকে?’
‘আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহিদ।’
‘তুমি তো শহিদ পরিবারের সন্তান।তোমার পায়ের ধূলি দিয়ে আমাকে ধন্য করো।’ বলেই সানা নীলিমার পায়ের তলায় তার হাত ঘঁষে সেই হাত এনে তার মুখে-চুলে মাখে।নীলিমা বুঝতে পারে না কিছু। বলে ‘তুমি কী করলে এটা?’
‘কিছুই করিনি। ট্রিবিউট টু ফ্রিডম ফাইটার, ট্রিবিউট টু লিবারেশন ওয়ার মারটেয়ার।’
নীলিমা বলে ‘তুমি বাংলাদেশকে খুব ভালোবাসো।’

সেদিন তাদের মধ্যে আর কী কী কথা হয়েছিল তা আমাদের জানার দরকার নাই। আমরা এটুকু জেনেই খুশি থাকবো যে দুই বাংলাদেশ-পাগল একাত্ম হয়েছে, তারা দুজন দুজনকে ভালোবাসে। এই ভালোবাসা থেকে জন্ম নেবে আরো আরো বাংলাদেশ-পাগল।


সানার সেই ডায়েরির কথা মনে আছে না? আজ সে তার ডায়েরিটা নিয়ে এসেছে। নীলিমার জ্বর ছিলো তাই কয়েকদিন দেখা হয়নি। আজ দেখা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। একটু একটু শীত পড়তে শুরু করেছে। মাঠের ঘাস এখনো পুরো মরেনি। তবে আধা মারা হয়ে গেছে। পুরো শীত জুড়ে তারা নাই হতে থাকবে। মানে লুকিয়ে যাবে মাটির পেটে। অপেক্ষা করবে বৃষ্টির। ব্যাঙের মতো ঘাসও শীতঘুমে যায়। সানা বসে বসে ভাবছে। আচ্ছা, কোথাও চালতা গাছ দেখি না কেনো? চালতাকে মানুষ একদিন মনে হয় ‍ভুলেই যাবে। শীতের ফুল কোথায়?

‘শীতের ফুল কোথায়’ বাক্যটি যখন সানা ভাবছে তখনই নীলিমার উদয়। নীলিমাকে আজ সত্যিই ফুলের মতো লাগছে। শীতের শিশির ভেজা ফুল। নীলিমা চাদর জড়িয়ে এসেছে। চুলগুলি খোলা, পড়ে আছে চাদরের বাইরে পিঠের ওপর। তাকে জ্বরক্লান্ত লাগছে না। বরং একটু বেশি প্রাণবন্ত লাগছে।
বসতে বসতে বললো ‘এটাই সেই ডায়েরি?’
‘তোমাকে পড়াতে এনেছি।’
‘আমি নিজে পড়বো না। তুমি পড়বে। আমি শোনবো।’
‘খুব দখল গেছে না?’
‘ধুর দখল। একটু রেস্ট নিলাম আরকি।’
নীলিমা ডায়েরি হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে, আর সানা দেখে ‘নীলিমার উল্টেপাল্টে দেখা’।
সানার মনে হয় আমার এই ভালোবাসার ডায়েরিটাকে এত সুন্দর কোনো হাত আগে কখনো ছুঁয়ে দেখেনি।

নীলিমা পড়বে না বলেও পড়তে আরম্ভ করে। সানা বলে ‘জোরে পড়ো।’
‘জোরে তুমি পড়বে। আমি একটু একটু দেখছি।’
‘আমাকে দাও।’
নীলিমা এবার বলে ‘এই লেখাটা আমি পড়বো্।’ বলেই পড়তে শুরু করে।

লেখার নাম ‘রাজাকার কাকে বলে’

লেখার প্রথম স্তবকটি এরকম :
‘রাজাকার হচ্ছে পাগলা কুকুর। পোষা কুকুর পাগল হয়ে গেলে তার মনিবকেও চিনে না।
রাজাকার হচ্ছে সেই ইতর প্রাণি যারা নিজের মাকেও ধর্ষণ করতে পারে।
রাজাকার হচ্ছে সেই বেঈমান পশু যে ভিনদেশি শূকরের খাদ্য হিসেবে তুলে দেয় নিজের বোনকে।

লেখার শেষ লাইনটি, রাজাকার হচ্ছে মীরজাফরের ছেলা। ঘসেটির অবৈধ সন্তান।

নীলিমা বলে ‘এই শুয়োরের বাচ্চারাই তো সুন্দরী সুন্দরী যুবতীদেরকে পাকিস্থানি শুযোরদের হাতে তুলে দিছিলো।’

সানা বলে ‘আমি একটা উপন্যাস লিখতে চাই। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস।’
নীলিমা বলে ‘তুমিই পারবে।’

একটা পাখি উড়ে গেল। তার মুখে খড়। ঘুঘু না কি? পাখিরা কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়? সন্ধ্যা হয়ে এলো। বাতাস বইছে। বাতাসে ছাতিম ‍ফুলের গন্ধ নাকি? এখন তো ছাতিম ফোটার কথা না? সানা ও নীলিমার সময়-ঋতু সব এলোমেলো গেছে।


রাত এখন কয়টা? মনে হচ্ছে দুইটা একুশ। বাইশও হতে পারে। নাও হতে পারে। সানা স্বপ্ন দেখছে। পাকিস্থানিরা তাকে নদীর পারে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করছে তার বুকে। কিন্তু তার কোনো ব্যথা লাগছে না। তার শুধু মনে পড়ছে মাকে। মায়ের জন্য তার কষ্ট হচ্ছে। তার লাশ ভাসছে নদীতে। এটা কোনো নদী? হঠাৎ দেখে সে দাঁড়িয়ে আছে শেখ মুজিরে সামনে ।তার হাতে পাইপ। সানা কোনো কথা বলছে না।
মুজিব তাকে জিজ্ঞেস করলেন ‘তুই এখানে কী করিস?
‘আপনাকে দেখতে এসেছি। আপনি কেমন আছেন?’
‘আমি ভালো আছি। বাংলাদেশ কেমন আছে। এবার ধান কেমন হলো? যমুনা কেমন আছে? পদ্মা? সুন্দরবন? সিলেট কেমন আছে? ঢাকা? ৩২ নম্বর কেমন আছে?’
পিতার প্রশ্নের কোনো শেষ নাই। হাজার প্রশ্ন জমে আছে তার মনে। সানা কিছু বলে না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু এক মহাপুরুষকে দেখে। দেখে আর দেখে।
তিনি আবার বলতে শুরু করেন, ‘রবীন্দ্রনাথের গানটা কী তোমরা গাও? আমার সোনার বাংলা? ইলিশ কি আগের মতো ধরা পড়ে? স্বাদ কি আগের মতোই আছে? তোর আম্মা কেমন আছে? আব্বা?’

সে কিছু বলে না। তিনি পাইপে টান দেন। তার ঘুম ভেঙে যায়।

১০
সকালে সে মাকে একটা চিঠি লেখে।
চিঠিটা এরকম : ‘আম্মা, তুমি কেমন আছো?
রাতে এক ঘটনা ঘটেছে।
স্বপ্নে দেখি আমাকে হত্যা করেছে পাকিস্থানিরা।
হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে আমার লাশ।
যেতে যেতে হঠাৎ দেখি আমি শেখ মুজিবের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
তাঁর কত প্রশ্ন। খালি প্রশ্ন আর প্রশ্ন।
তোমার কাথাও জিজ্ঞেস করেছেন।
বলেছেন ‘তোর আম্মা কেমন আছে।’
আমি কিছু বলিনি।
তাঁকে জড়িয়ে ধরার খুব ইচ্ছা হইছিল।
সাহস পাইনি।
আগের মতোই আছেন।
কী প্রাণবন্ত।
কাউকে পেলেই খালি
এ কেমন আছে? ও কেমন আছে?
সিলেট কেমন আছে? যমুনা কেমন?
সবার জন্য তাঁর কী টান।
সবকিছু মনে আছে। একটুও ভোলেননি।
পিতারা তো এমনই হয়।
কী বলো আম্মা?’

আব্বা কেমন আছেন?
আব্বার কথাও জিজ্ঞেস করেছেন।
আব্বাকে বলিও শেখ মুজিব তার কথা জিজ্ঞেস করেছেন।

ইতি
তোমার সানা।

১১
সানা আজ কোথাও যাবে না। মাথায় কবিতা ঘুরছে। আজ হয়তো একটা কবিতা লিখবে সে। কবিতার দুইটা লাইনই মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।

‘একটা পাখির সুর এসে লেগে যাবে আরেকটা পাখির সুরে,

সুরে সুরে বিবাদ লেগে রাত্রি ভরে যাবে গানে…’

এর পরের লাইন কী হতে পারে? পাখির গানে রাত্রি ভরে যাওয়ার বিষয়টা হঠাৎ তার মনে এলো কেন? সে কী কোনো কারণে আনন্দিত?

জানলা দিয়ে নিকেশ পত্রিকা দিয়ে গেলো। আজ সাহিত্য সাময়িকীতে একটাও কবিতা ছাপে নাই। কবিতার পাঠক কী তাহলে কমেই গেলো? সাহিত্য পাতায় পড়ার মতো কোনো লেখা সে পেলো না। পাতা উল্টাতে উল্টাতে একটা খবরে এসে তার চোখ আটকে গেলো।

‘এক রাজাকারের করুণ মৃত্যু’।
তার বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। গত রাতে বাথরুমে গিয়ে সে আর বিছানায় ফিরে নাই। সকালে তাকে বিছানায় না দেখে তার তৃতীয় স্ত্রী তাকে বাথরুমে আবিষ্কার করে। সে মরে পড়ে আছে বাথরুমেই, গুয়ের মাঝে।

সানার মনে পড়ে তার মায়ের কথা। মা বলতেন, যে রাজাকাররা ধরা পড়ছে না, শাস্তি হইছে না, তারাও শাস্তি পাইবো। আল্লা ইতারে গজব দিয়া মারবো। দুনিয়াতই বেহেস্ত-দোজখ। পাওনা তারা পাইবো।

সানা খবরটা আবার পড়ে আর মনে মনে বলে, হারমির বাচ্চা পাওনা পাইছে। গু-তে পড়িয়া মরছে।

১২
নীলিমাকে একটা চিঠি লিখতে হবে। চিঠিটা রাতে লিখলেই হবে। সানা বেরিয়ে পড়ে। সন্ধ্যা হয় হয় করছে। শহরে তেমন মানুষ নাই। রাস্তাঘাট একটু ফাঁকা ফাঁকা। সে চিন্তা করলো, রিকশা নেবো না।আজকের সন্ধ্যাটা হেঁটে বেড়াবো। নীলিমা হলে ভালো হতো। নীলিমা গেছে তার গ্রামে। কাজিনের বিয়ে। সানাকে বলেছিলো অবশ্য। কিন্তু সে কেন যাবে। তাকে তো কেউ চিনে না ওখানে। লোকজন কে কী মনে করবে। নীলিমাও তেমন জোর করেনি।

সানা হাঁটছে। কোনো বন্ধুর সাথে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কী একেবারে নাই? বিষয় কী? এমদাদ কী এখন মেসে আছে? রুমু তো লিলিকে নিয়েই ব্যস্ত। মানিক গেছে তাবলিগে। কবির আর মাসুম তো পাক্কা ছাত্রনেতা। সবাই ব্যস্ত। স্ট্যাটের মানুনকে হয়তো পাওয়া যাবে। জহির আর শাকিল তো ভার্সিটির মাস্টার হওয়ার নেশায় উন্মাদ। পলাশ দা আর সুমি আপার সাথে দেখা হলেও হতে পারে। তারা সন্ধ্যায় এই পথে রিকশা করে ফেরে প্রতিদিন। শামীম ভাইটাও ইদানীং লাপাত্তা।

বুলবুল আর হাসানকে পাওয়া গেলো। দুইটা চা খাচ্ছিল। সানাকে তারা দেখেনি। হঠাৎ সে তাদের সামনে গিয়ে হাজির।

চা শেষ করে তিনজন হাঁটা দিলো যে দিকে চোখ যায়। টিলাগড় মোড়ে যেতেই এক পাগল এসে তাদের রাস্তা আগলে দাঁড়ালো।
‘কী চাই?’ বুলবুলের এমন প্রশ্ন শুনে পাগল বলে, ‘তোর কাছে আছে কী?’
সানা বলে, ‘কিছুই নাই।’
হাসান বলে ‘টাকা লাগবে?’
‘আমার টাকা লাগে না। পয়সা লাগে না। আমার কুকুর লাগে। আমি কুকুরের মা-বাপ। আমি তাদের খাওয়াই, পরাই।’ পাগল বলেই যচ্ছে, ‘এই শহরের সব কুকুর আমার।’
সানা বলে, ‘আপনার বাড়ি কোথায়?’
আমার বাড়ি কোথায় ছিলো আমি কী করে জানবো। এই দেশের কোথাও ছিলো। নাও থাকতে পারে। সারা দেশই আমার বাড়ি। সারা দেশই আমার বিদেশ। আমি তো যোদ্ধা ছিলাম। মুক্তিযোদ্ধা। এই দেশরে তো আমিই যুদ্ধ করে স্বাধীন করছি।’
সানা বলে, ‘আপনি মুক্তিযোদ্ধা? আমি তো আপনাকেই খুঁজছি। চলেন চা খাই।’
‘আমি চা খাই না।’
‘আপনি কী খান?’
‘আমি কিছু খাই না। আমি বাতাস খাই।’
‘আপনি কোন্ সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন।’
‘মনে নাই। কিছুই মনে নাই। খালি মনে আছে আমার মা’র লাশ, বাবার লাশ, ভাইয়ের লাশ, বোনের লাশ…লাশ আর লাশ… লাশ আর লাশ…লাশ দেখতে দেখতে আমি পাগল হইলাম…।’
‘আপনি তো পাগল না’
‘আমার ঘর নাই, বউ নাই, ছেলেমেয়ে নাই, চাকরি নাই। আমি পাগল ছাড়া কী?’
‘এখানে আপনি কোথায় থাকেন?’
‘আমি এখানে কোথাও থাকি না। আমি থাকি স্বাধীন বাংলাদেশে। স্বধীন মানুষের মুখ দেখি। মায়া লাগে। খুব মায়া লাগে।’
পাগল উদাস হয়ে আকাশে তাকায়। একা একা কথা বলে আর হাঁটে। সানা পিছন পিছন হাঁটে। সানার পিছনে হাঁটে বুলবুল, হাসান। পাগল দাঁড়িয়ে পড়ে। একটা গাছের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘গাছ তুমি স্বাধীন গাছ। আমিও স্বাধীন। স্বাধীন মানুষের, স্বাধীন গাছের ঘর লাগে না। টাকা লাগে না। খালি দমের বাতাস থাকলেই হয়। আমি হাজার হাজার বছর বাঁচতে চাই। এই দেশে আমার বাঁচার শখ শেষ হবে না। আমার কিছু লাগবে না। খালি বাতাস হলেই হবে। দম নিলেই হবে। বাঁচতে পারলেই হবে।’

দুইতিনটা কুকুর এসে পাগলকে ঘিরে দাঁড়ায়। এবার পাগল কথা বলতে শুরু করে কুকুরগুলোর সাথে। বলে, ‘তোমরা একটু বসো। আমি কাজটা শেষ করে আসি। পাগল প্রসাব করতে কচুবনের দিকে যায়। কুকুরগুলো সানাদের আশ্চর্য করে দিয়ে বসে পড়ে।

এই মুক্তিযোদ্ধার পায়ের ধূলি নিতে পারলো না সানা।
সে তার বন্ধুদের বলে, ‘মুক্তিযুদ্ধ কত মানুষকে পাগলও করেছে। লাশ দেখে ভারসাম্য হারিয়েছে কত মানুষ। এই লোকটা সম্ভবত কোমলপ্রাণ মানুষ ছিলো, সহ্য করতে পারেনি পাকিস্থানিদের নির্মমতাকে।

হাঁটতে হাঁটতে তার মনে আসে, ‘মুক্তির-ও মন্দির-ও সোপান-ও তলে কত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে…’ সে গুনগুন করে। হাসান আর বুলবুল গলা ছেড়ে গাইতে থাকে, ‘মুক্তির-র মন্দির-ও…।’

১৩
রাত ১১টা ১৯মিনিট। সানার মনে হলো এখনই নীলিমাকে চিঠি লেখা যায়।

নীলিমা, কেমন আছো তুমি?
শামসুর রাহমানের একটা কবিতার বইয়ের নাম যে ‘বিধ্বস্ত নীলিমা’, তুমি জনো?
কিন্তু তুমি বিধ্বস্ত নও। বিধ্বস্ত নীলিমা তো ভালোবাসতে পারে না।
তুমি ভালোবাসতে জানো। আমাকে যে তোমার ভালো লাগে, তার কারণ কী জনো?
তার কারণ, আমি তোমাকে ভালোবাসি, তাই।
তোমাকে দেখার আগ থেকেই আমি তোমাকে ভালোবাসি।
দেখার আগ থেকে নয়, তোমাকে তো দেখছি আমি জন্মের পর থেকেই, আম্মার মুক্তিযুদ্ধের গল্প থেকেই। তুমি আসলে বাংলাদেশ। আমার মাতৃভূমি। মাতৃভূমিকে আমি ভালোবাসি, যেমন ভালোবাসি আমার আম্মাকে। তোমার মাঝে পুরো বাংলাদেশ আছে, যে বাংলাদেশ আমার প্রেম। তুমি তাই আমাকেই ভালোবাসবে এটা স্বাভাবিক।

কাল রাতে কী স্বপ্ন দেখলাম জনো? জানো না।
দেখলাম আমাকে কোন এক নদীর পারে দাঁড় করিয়ে বুকে গুলি করেছে নাপাক পাকিস্থানি সেনারা, কিন্তু আমার কষ্ট হচ্ছে না। খালি আম্মার কথা মনে পড়ছে। আমার লাশ ভেসে যাচ্ছে নদীতে। নদী যেন আমাকে তার কোলে করে নিয়ে যাচ্ছে আল্লার কাছে। আচ্ছা এই নদীর নাম মনে পড়ছে না কেনো? না কি বাংলাদেশের সব নদীর জল মিলে সম্পূর্ণ নতুন এক নদী? তার নাম কী হতে পারে? ধরো, এর নাম অশ্রুনদী। রবীন্দ্রনাথের গানে আছে না ‘অশ্রুনদীর সুদূর পারে…।’ অশ্রুনদী কোথায় গেছে জানো? স্বর্গে।

স্বর্গে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম কার সামনে জানো? বাংলাদেশের পিতা শেখ মুজিবের সামনে।
আমাকে দেখেই তার ভেতর উতলে উঠলো বাংলাদেশের ছবি। খালি প্রশ্ন করেন, ‘যমুনা কেমন আছে, সিলেট, সুন্দরবন, বঙ্গোপসাগর, কর্ণফুলি…?’ তোমার কথাও হয়তো জিজ্ঞেস করতেন, বলতেন, ‘নীলিমা কেমন আছে রে, বাংলার ত্রস্ত নীলিম?’ আর আমি বলতাম, ‘না নীলিমা বড়ো শান্ত মেয়ে, অশ্রুনদীর মতো শান্ত।’ কিন্তু আমার ঘুম ভেঙে গেলো।

নীলিমা জানো, আবার কখনো যদি দেখা হয় তাঁর সাথে আমি তাঁকে কী বলবো? বলবো, ‘তোমার সন্তানেরা বাংলাদেশকে খুব ভালোবাসে, খুব…তুমি চিন্তা করো না জনক, এই আমাকে দেখছো না, আমি চাই বাংলার জল ভরে থাকুক মাছে আর মাছে, মাঠ ভরে থাকুক ধানে আর ধানে, বনগুলি ভরে থাকুক ফুলে আর পাখিতে, পাখির গানে আর ফুলের গন্ধে বাংলার আকাশ-বাতাস আনন্দে লাফাক। মায়ের কোলে কোলে ফুটে থাকুক গোলাপের মতো শিশু…তারা কবি হোক আর তোমার জন্য লিখুক কবিতা, তোমার মহাপুরুষের মুখ তাদের আকাশ স্পর্শ করার সহাস জোগাক…। আমার প্রেমিকার নাম নীলিমা, তার বুক ভরে আছে বাংলাদেশের সুবাস, কেননা তার দাদার রক্তে বাংলাদেশের মাটি ভিজেছে বলেই গোলাপ এত লাল…।’

বলতাম, ‘পিতা তোমাকে ওরা বন্দী করেছিলো বলে তুমি বুকের রক্ত দিতে পারোনি মুক্তিযুদ্ধে, কিন্তু তোমার সন্তানেরা তো ঢেলে দিয়েছে তাদের শোণিত, অকাতরে। তোমার সন্তানের রক্ত তো তোমারও রক্ত। তোমার রক্তে বাংলার মাটি সিক্ত হোক আমরা চাইনি, জনক, তবু আগস্ট পনেরো এলো বাংলার বুকে…! এই শোক ছাড়া বাংলার আর কোনো শোক নাই, আর কোনো শোক…। এই শোক, তোমাকে হারানোর শোক আমাদের সূর্যকে কালো করে দেয়, চন্দ্রকে কালো করে দেয়…।’

নীলিমা, পনেরো আগস্টে তুমি কালো শাড়ি পরো?
নীলিমা, বাংলার আকাশে কতো অবুঝ পাখি, তাদের ডানার শব্দে আমার প্রাণও পাখি হতে চায়, কিন্তু তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, ‘হায় তাইরেসিয়াস তুমি জানতে আমরা ইডিপাস?’
না, আমরা ইডিপাস নই। তাইরেসিয়াস জানেন। আমরা ইডিপাস না, নই পিতৃহন্তা। বাংলার নিয়তি…।’

১৪
‘চিঠিটা কী নীলিমা পেয়েছে?’ সানা একা একা হাঁটে আর ভাবে।
গত কদিন ধরে তার বুকের বাঁ-পাশে একটু ব্যথা হচ্ছে, চিনচিনে ব্যথা। সে অবশ্য পাত্তা দিচ্ছে না তেমন। সে হাঁটছে। যাচ্ছে শহরের শেষ মাথায়, সুরেশ বাবুর কাছে। এই শহরে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যে মুক্তিযুদ্ধের সময় শহর ছেড়ে কোথাও যাননি। নাপাক পাক সেনারা তাকে ধরে নিয়েছিলো, এক দিন এক রাত তাকে চ্যাঙদোলা করে ঝুলিয়ে রেখেছিলো মোড়ের বড় কৃষ্ণচূড়ার ডালে। তার নাক-চোখ দিয়ে রক্ত ঝরছিলো। সবাই ভেবেছিলো মারা গেছেন সুরেশ বাবু। কিন্তু তিনি মরেননি। এক দিন এক রাত পর তার পায়ে বাঁধা দড়িতে ফায়ার করেছিলো ওরা, সবাই ভেবেছিলো মেরে ফেলেছে। মারেনি। সুরেশ বাবুর অর্ধমৃত শরীরটা টুপ করে ঝরে পড়েছিলো খালি। পাক সেনারা চলে গেলে কয়েকজন মুক্তি এসে তাকে নিয়ে গিয়েছিলো।
সুরেশ বাবুর অপরাধ ছিলো তার সুন্দরী মেয়ে স্বপ্না, আর স্ত্রী আরতি দেবী।
রাজাকাররা নাপাকদের খবর দিয়েছিলো সুরেশ বাবুর মেয়ে আর স্ত্রী খুব সুন্দরী…। কিন্তু তারা বাড়ি তল্লাশি করে তাদের পায়নি। বাড়িতে সুরেশ বাবু একাই ছিলেন। সুরেশ বাবুকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় তার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলো নাপাকরা। সবকিছু পুড়ে ছাই হলেও দেবতা না কি পোড়েনি। বাড়িতে অবিকল শুধু পাওয়া গেছিলো ওই দেবতাকেই। দেবতা-ঘরের সামনে যে কামিনীগাছটা ছিলো তাও পুড়ে আঙরা হয়ে গেছিলো। কিন্তু কী আশ্চর্যের বিষয়! গাছটির পোড়া শরীরকে সুরেশ বাবু কাটতে দেননি। তিনি নাকি বলেছিলেন, ‘এই গাছ আবার জীবিত হবে।’ বৃষ্টি শুরু হতেই নাকি গাছের গুঁড়ি থেকে নতুন ডাল গজিয়েছিলো। সেই গাছ এখন শহরের সবচেয়ে বড় আর পুরোনো কামিনীগাছ।

সুরেশ বাবুর স্ত্রী আরতি দেবী গেল বছর মারা গেছেন। বাড়িতে এখন আছেন শুধু বৃদ্ধ-অন্ধ সুরেশ বাবু আর তার মেয়ে স্বপ্না, স্বপ্নার বর সোমনাথ আর তাদের দুই ছেলে-মেয়ে অম্লান আর মুক্তা।

সানা যাচ্ছে সুরেশ বাবুর সঙ্গে কথা বলতে।
তিনি খুব মিতভাষী। তাছাড়া এখন কানে কম শুনেন এবং পুরোপুরি অন্ধ।
তবু সানা যাচ্ছে যদি কিছু কথা বলা যায়।
সুরেশ বাবু সম্পর্কে শহরে অনেক কিংবদন্তি আছে। তিনি নাকি গর্ব করে বলেন, ‘‘আমার বাবা দেশভাগের সময় আমাদের নিয়ে এদেশ ছেড়ে যাননি। সবাই গেলেও তিনি ওই শ্মশানের দিকে তাকিয়ে নাকি বলেছিলেন, ‘এখানে আমার পিতৃদেব, মাতৃদেবী, আমার সন্তান, আমি তাদের একা ফেলে কোথাও যাবো না। আমি এই শ্মশানেই মিশে যেতে চাই, আমার মায়ের মাটি হয়ে-যাওয়া দেহে, আমার বাবা আর সন্তানের মাটি হয়ে-যাওয়া দেহে আমি মিশে থাকতে চাই। আমি কোথাও যাবো না। দেশ ছেড়ে যে যায় তার মতো বেঈমান আর কে হতে পারে?’’

সুরেশ বাবু নাকি বলেন, ‘আমি আমার সহায়-সম্বল সব হারিয়েছি, নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে এসেছি তবু এদেশ ছেড়ে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতে পারি না। এই দেশ আমার মা। আমি মাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না।’

সুরেশ বাবুকে বাড়িতে পাওয়া গেলো না। তিনি হসপিটালে। বার্ধক্যজনিত অনেক রোগে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন। বাড়িতে পাওয়া গেল সুরেশ বাবুর মেয়ে আরতি আর আরতির মেয়ে মুক্তাকে। আরতি জানালেন, ‘বাবা খুব অসুস্থ। কাল রাতে হঠাৎ কেমন যেন করতে লাগলেন, রাতেই হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। একটু আগে আমরা বাসায় এসেছি। একটু পর আবার হাসপাতালে চলে যাবো। এখন ওখানে আছেন মুক্তার বাবা।’
সানা জানতে চাইলো, ‘আমি আপনাদের সঙ্গে কি একটু হসপিটালে যেতে পারি?’
আরতি বললেন, ‘কথা তো বলতে পারবেন না। তবু যেতে চাইলে চলুন।’
‘কথা বলার দরকার নাই। তাকে এক নজর দেখলেই হবে।’
‘একটু বসুন। আমরা তৈরি হয়ে নিই।’

সানা অন্ধ-অসুস্থ সুরেশ বাবুকে দেখছে, আর মনে পড়ছে তাকে নিয়ে মানুষের মুখে-মুখে ফেরা কথাগুলি। সুরেশ বাবুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে ইচ্ছে করলো তার।


তিন দিন পর এই দেশমাতৃকার মায়া ছেড়ে সুরেশ বাবু যাত্রা করলেন অন্য এক পৃথিবীর পথে। পত্রিকায় রিপোর্ট বের হলো। ‘ইতিহাসের মৃত্যু’।
সানা মনে মনে বলে উঠলো, ‘ইতিহাসের মৃত্যু হয়। ‍পুনর্জন্ম হয়।’
সে ঠিক করলো, সুরেশ বাবুর শবযাত্রায় সে যাবে না।
সে তার ডায়েরিতে লিখলো,

‘মাটিতে মিশে গেছে আরো কিছু সোনার মাটি।
বুড়ো গাছ, তুমি শিরায় পাবে আজ নতুন কামনা।
ফুল ফুটবে, ফুল ফুটবে। সৌরভে ভরে যাবে শহর
মাটিতে মিশে গেছে আরো কিছু সোনার মাটি।
বুড়ো গাছ, তুমি রক্তে পাবে আজ নতুন কামনা।।

কবিতাটির নিচে লিখলো, ‘সুরেশ বাবু, আপনার শ্রীচরণে।’

কবিতাটির নাম দিলো, ‘এপিটাফ’।

১৫
আজ বৃহস্পতিবার। সকাল কয়টা বাজে এখন। দরোজায় কেউ কড়া নাড়ছে? সানা একটু বিরক্ত হলো যেন। কেউ তো আসার কথা না? কে এলো এই সাত সকালে?
দরোজা খুলে তো সে একেবারে হা। নীলিমা। স্বয়ং নীলিমা।
‘এই প্রথম তুমি আমার মেসে এলে।’
‘আমার এ-আসা অহেতুক নয়। হেতু আছে।’
‘কী হেতু?’
‘তোমাকে অভিনন্দন জ্ঞাপন।’
‘অমূলক অভিনন্দন কেনো? কী অপরাধ আমার?’
‘অমূলক নয়, মূলক। মূলটা হচ্ছে তোমার চিঠি।
আর অপরাধ হচ্ছে চিঠিটা এত সুন্দর করে লিখেছো কেনো?’
‘শেষপর্যন্ত তুমি আমার গৃহ দর্শনেও এলে?
হাতের ব্যাগ বিছানার একপাশে রেখে বসতে বসতে বললো নীলিমা,‘আসার অভ্যাস করছি।’
‘অভ্যাস হয়ে গেলে ইচ্ছা না-করলেও আসতে হবে।’

চুল ঠিক করতে করতে সানা বললো, ‘কেনো?’

‘কারণ তখন তুমি তোমার অভ্যাসের দাসে পরিণত হবে, তার কথা মতোই তোমাকে চলতে হবে। তখন তোমার ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো দাম নাই।’
‘তোমার কাছে আসার অভ্যাসের দাস হতে আমার কোনো বাধা নাই। এমন দাসই তো হতে চাই।’

‘আরাম করে বসো।খবরটা পড়েছো?’
‘জানু পেড়ে বসতে বসতে নীলিমা বললো, ‘সুরেশ বাবুর মৃত্যু?’
‘হ্যাঁ।’
‘পড়বো না মানে? সুরেশ বাবুকে একবার আমাদের ইশকুলে আনা হয়েছিলো। তখনো তিনি পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাননি। তার মতো এমন প্যাট্রিয়ট আমি জীবনে দেখিনি। তোমার মতো।’
‘আমাকে লজ্জা দিও না মেয়ে। কোথায় বিন্দু আর কোথায় সিন্ধু।’
‘না, তুমিও তো তোমার দেশকে ভালোবাসো। দেশের জন্য যুদ্ধ-করা মানুষ, আর দেশের জন্য শহিদ-হওয়া মানুষগুলিই তো তোমার সবচেয়ে প্রিয়।’
‘প্রিয় ঠিক আছে। কিন্তু দেশের জন্য আমি কিছু কি করতে পেরেছি?’
‘দেশকে ভালোবাসো তো? তাতেই দেশের জন্য অনেককিছু করা হয়। তোমার আশেপাশে কত তরুণ আছে না, ওরা কি তোমার মতো দেশকে ফিল করে? দেশকে হৃদয়ে ফিল করাই দেশের জন্য অনেককিছু করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেশকে ভালোবাসতেন বলেই লিখতে পেরেছিলেন ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি…।’ সবাই দেশের জন্য প্রাণ দিতে পারে না, যুদ্ধ করতে পারে না। সেই সুযোগ সবাই পায়ও না।এই যেমন আমাদের জন্ম হলো দেশ স্বাধীনের পর।’

সানা কিছু বলছে না। নীলিমাকে শুনছে। ভালোই লাগছে শুনতে। বেশ সুন্দর করে কথা বলে নীলিমা।

সানা আধশোয়া হয়ে পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছে। পত্রিকা পড়ার ভান করলেও আসলে সে নীলিমার কথা খুব মন দিয়ে শুনছে।

নীলিমা বলছে, ‘কিন্তু দেশকে ভালোবাসার সুযোগ সবার আছে। সে সুযোগ কজন কাজে লাগায়। কজন অনুভব করতে পারে ‘‘এই মাটি রক্তেভেজা?’’ তোমার ডায়েরিতে সেদিন একটা প্যারা পড়ে খুব আনন্দ পেয়েছি।’

‘কোন প্যারাটা?’

‘‘ওই যে ‘বাংলার মাটিতে খালি পায়ে হাঁটতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি মাটির কণা শহিদ মিনার, প্রতিটি মাটির কণা স্মৃতিসৌধ। বাংলাদেশের জলে-স্থলে লেগে আছে পূর্বপুরুষের রক্ত। জুতা পায়ে হাঁটা যাবে না এখানে। অথচ কত লোক স্বয়ং শহিদ মিনারেও জুতা পায়ে হাঁটে। ছিছি।’’

‘তোমার দেখি একেবারে মখস্ত হয়ে গেছে।’
‘মখস্ত হওয়ার মতোই তো।’
‘তুমি বসে বসে পত্রিকাটা দেখো। আমি রেডি হয়ে নিই। একসঙ্গে বেরুবো। কিছু খাওয়া দরকার।’
‘পত্রিকা না, একটা কবিতার বই দাও।’
সানা সেলফ থেকে একটা কবিতার বই নীলিমাকে দিতে দিতে বললো, ‘শঙ্খ ঘোষের কবিতা পড়ো। আমার প্রিয় কবি।বইটার নাম : ‘বাবরের প্রার্থনা’।


সানা ও নীলিমা। ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে দুইজন। তাদের মাথার উপর একটা কামরাঙাগাছ। পাতার চেয়ে কামরাঙা বেশি। সানা রিকশা খুঁজছে। নীলিমা দেখছে কামারাঙাগাছ।
‘আজ রিকশা গেলো কোথায়?’ সানা নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে।
নীলিমা বলে, ‘মাথার উপর একবার দেখো।’
সানা বলে ‘শহরে কামরাঙা।’
‘কার বাড়ি এটা? নীলিমা জানতে চায়।
‘জানি না।’ বলেই একটা খালি রিকশা দেখে সানা বলে ওঠে, ‘মামা ভার্সিটি।’

রিকশা যাচ্ছে। সানা বলে, ‘তুমি সুরেশ বাবুর কামিনীগাছের কাহিনিটা জানো?’
‘না তো।’
‘সুরেশ বাবুর বাড়ির কামিনী গাছটাই এই শহরের সবচেয়ে বড় আর পুরোনো কামিনী গাছ।
‘তাই নাকি?’ নীলিমা অবাক হয়।
‘হ্যাঁ। পাকিস্থানি সেনারা তার স্ত্রী ও মেয়েকে ধরে আনতে গিয়ে, না-পেয়ে সুরেশ বাবুকে ধরে এনেছিলো, আর আসার সময় আগুন ধরিয়ে এসছিলো তার বাড়িতে।’
‘এটা আমি জানি।’ নীলিমা বলে।
‘বাড়ির সবকিছুর সঙ্গে কামিনী গাছটাও পুড়ে আঙরা হয়ে গিয়েছিলো।
‘তাই?’
‘হ্যাঁ, কিন্তু সুরেশ বাবু বলেছিলেন, এই গাছ কাটা যাবে না। এটা আবার জীবিত হবে।
আজকে যে-গাছটা শহরের সবচেয়ে বড় আর পুরোনো কামিনী, তা ওই পুড়ে-যাওয়া গাছের দ্বিতীয় জীবন।’
‘একদিন গাছটা দেখতে যাবো।’
‘অবশ্যই যাবো।’
‘পেপারে একটা ফিচার লেখা যায় না গাছটা নিয়ে?’
‘লিখতে পারো।’


নীলিমা হলে যাচ্ছে। নীলিমার যাওয়া দেখছে সানা। নীলিমার যাওয়া দেখতে-দেখতে সানার মনে হলো সে আসলে নীলিমার যাওয়া দেখছে না, দেখছে রোমান হলিডে সিনেমার শেষ দৃশ্যে হেপবার্নের যাওয়া। বুকের চিনচিনে ব্যথাটা আবার উদয় হয়েছে। আজ আকাশ একটু বেশিই নীল। কোথাও কোনো মেঘ নাই। আকাশে মেঘ না থাকলে মানায় না। মেঘ হচ্ছে আকাশের শোভা। সন্তান। খালি নীল আকাশ খালি খালি লাগে। চিল খুব ভালো পাখি। অনেকক্ষণ এক জায়গায় থাকে। তাদের ওড়াউড়ি তাকিয়ে দেখা যায়। অন্য পাখিরা এই আছে এই নাই। তারা আকাশকে পথ হিসেবেই ব্যবহার করে। চিল কিন্তু আকাশে অনেকক্ষণ থাকে। এখন আকাশে কোনো পাখি নাই।

১৬
ডাক্তারের কাছে একটু যাওয়া দরকার। সানার হাতে এত সময় যে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময় সে বের করতে পারছে না। যাদের কোনো সময় নাই তারাই সময়মতো সব কাজ করতে পারে। সানা ভাবে, ‘এত সময় দিয়ে আমি কী করবো?’ ট্রেনটা এখন কোথায় থেমেছে? তার জানার ইচ্ছে করে না। তার খালি মনে হচ্ছে, ‘মায়ের কাছে যাচ্ছি।’

সানা প্রায় তিন মাস পর বাড়ি যাচ্ছে। এখন রাত ২টা ৭। সকাল ৭টার দিকে তার বাড়ি পৌঁছার কথা। একবার ঘুম এসেছিলো। কিন্তু সে ঘুমাবে না। নীলিমা না করেছে। গাড়িতে ঘুমানো ঠিক না। ট্রেনের জানলা দিয়ে সে রাতের বাংলাদেশ দেখে দেখে যাচ্ছে। এই দেখাকে অবশ্য দেখা বলে না। অনুভব করা বলে। আকাশে চাঁদ নাই। চারদিকেই অন্ধকার। তবুও সে দেখছে। চেনা গ্রাম। চেনা আকাশ। অন্ধকার হলেই কি অচেনা হয়ে যায়। অন্ধকার হলেই যদি সব অচেনা হয়ে যেত তাহলে রাতে মানুষজন পথ হারিয়ে ফেলতো। বাড়ি খুঁজে পেতো না। পৃথিবীতে বাস করতে করতে পৃথিবীটা মানুষের কাছে এত চেনা হয়ে গেছে যে এখন তারা অন্ধ হলে গন্ধ শুঁকে শুঁকে বাড়ি যেতে পারে। নিশিজাগা মানুষ আর পাখির গান শুনে শুনে চিনে নিতে পারে দেশ।

সানা ভাবে, ‘‘আফ্রিকার বা আরবের রাস্তায় অবশ্যই কেউ হঠাৎ গেয়ে উঠবে না, ‘কী ঘর বানাইমু আমি শূন্যের-ও মাজার, লোকে বলে, বলে রে ঘর বাড়ি ভালা না আমার।’’
ইউরোপের রাস্তায় কেউ হঠাৎ গেয়ে উঠবে না, ‘মানবজমিন রইলো পতিত আবাদ করলে ফলতো সোনা, মন রে কৃষিকাজ জানো না’ অথবা ‘এমন মানবজনম আর কি হবে মন যা করো তরাই করো এই ভবে’।
আমেরিকার গাছে অবশ্যই ডাকবে না কোকিল, আর রাতে পথ হাঁটতে হাঁটতে কেউ গাইবে না, ‘বাংলা আমার জীবনান্দ বাংলা প্রাণের সুর, আমি এই বাংলার মায়াভরা পথে হেঁটেছি এতটা দূর।’ অথবা, কেউ গাইবে না, ‘পাখির কন্ঠে আপনি জাগাও আনন্দ, তুমি ফুলের বক্ষে ভরিয়া দাও সুগন্ধ’।

যতই অন্ধকার হোক পাখির কন্ঠ, ভেজা খড়ের গন্ধ, জলের শব্দ ঠিকই মানুষকে তার পথ দেখিয়ে দেয়।

ভোর হতে শুরু করেছে। সানার মনে পড়ছে ছোটবেলায় পড় ‘‘পাখিসব করে রব রাতি পোহাইলো, কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিলো।’’ পৃথিবীর আর কোথায় রাত পোহানো মানে পাখির কলরব? এই বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথায় ভোর হওয়া মানে কাননে কুসুম ফুটে-যাওয়া?

নীলিমার সঙ্গে কাথা বলতে ইচ্ছে করছে সানার। মাথায় কী কবিতা এলো?

তার লিখতে ইচ্ছে করছে, ‘রাত্রিকে হটিয়ে দিয়ে জেগেছে বাংলাদেশ।’
লাইনটা তার তেমন মনপূত হলো না।

সে লিখবে,

‘যেখানে যত আঁধার ছিলো দিয়েছি কবর
বাংলার পরতে পরতে কমলারঙ হাওয়া।
দুলিতেছে পাতা আর উড়িতেছে পাখি
জলের রেখাগুলি খুঁজিতেছে নদী।
এখানে তোমার সাথে আমার প্রণয়
বাংলার বুকের ভেতর আছিলো হৃদয়।’

কবিতাটি সে লিখলো না। তবে মুখে মুখে বলছে। বাড়িতে গিয়েই লিখে ফেলতে হবে।
আচ্ছ বাংলাদেশের একমাত্র উদ্ভিদ-মুক্তিযোদ্ধা কাঠবাদামের গাছটা কি আছে, না কেটে ফেলেছে? আজ বাড়িতে গিয়েই ইশকুলের কাঠবাদামের গাছটা দেখতে যাবে।

অগ্রাহায়ণ মাস। আমন ধানের গন্ধে মৌ মৌ করছে গ্রাম।
ঘরে ঢুকেই সানা বললো, ‘আম্মা ইশকুলের কাঠবাদামের গাছটা আছে না নাই?’
‘জানি না রে বাবা। আছে মনো হয়।’
সানার আম্মা শিশুর মতো আনন্দিত এখন। শিশুরা চকোলেট পেলে যেমন খুশি হয়, সানার মা ছেলেকে পেয়ে ঠিক তেমনই খুশি। কত গল্প হলো মা-ছেলের। ভাত খেলো ইলিশ মাছের ডিম আর দুধের সর দিয়ে। বাবা বাজারে। দুপুরে আসবেন। ছোট ভাইবোন সব ইশকুলে। এখন একটু ঘুমিয়ে নেয়া যায়।

কাঠবাদামের গাছটা নাই।
সানা নিজেকে বলে, ‘গাছপালা যেদিন থাকবে না সেদিন মানুষ বুঝবে। মানুষ নিজেরে ছাড়া কাউকে বুঝে না। না গরু, না গাছ, না নদী, না মাটি। অথচ এরাই মানুষরে বাঁচিয়ে রাখে।’

সে অনেকদিন পর নদীর উপরে লোহার ব্রিজে দাঁড়ালো সানা। মনে মনে ভাবলো, ‘কাল যাওয়ার আগে নদীতে গোসল করে যাবো। আসলে শহরে বাংলাদেশকে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ মানে তো তার গ্রামগুলিই। শহরে হাঠৎ একটু-আধটু বাংলাদেশ দেখা যায় ওই কামরাঙা গাছের মতো। তাও নিরীহ। গাড়ির শব্দে-ধোঁয়ায় ভীতসন্ত্রস্ত। শহরে মাটি কোথায়? মাটি তো গ্রামে। শহরে নির্জনতা কোথায়? কোথাও শান্তি নাই। নীলিমার মতো এক টুকরা শান্তি আসলে গ্রামেই।

জীবনানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’র কোথাও শহর নাই। শহর নাই আমাদের জাতীয় সংগীতেও। অথচ আমরা এখন শহরবাসী। গ্রাম হচ্ছে আমাদের পরবাস। অথবা, বড়জোর একটু বেড়ানোর স্থান। নদীর উপর দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতে তার মনে পড়লো জীবনানন্দ দাশের কবিতা :
‘আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায়/
দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল/কুয়াশার…’

সানা নদীর উপর কুয়াশা দেখেনি কতকাল।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে একবার সে তাকায় মসজিদের পাশের গোরস্তানের দিকে। সে চিন্তা করে ‘আকন্দফুল কী ফুটেছে? আবছা অন্ধকারে দাদার কবর দেখা যাচ্ছে না। দাদির কবরের সিথানে আমার লাগানো আকন্দ গাছটা কী আছে?’
নির্জন গোরস্তানের পাশে সে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারে না। গা চমচম করে। অথচ এখানেই শুয়ে আছেন কত প্রিয় মানুষ; মিশে আছেন মাটিতে। তার বড় চাচার কবর দেখার জন্য তার মন আকুল হয়। কোথায় আছে তার কবর। না কি তার কবর হয়নি কোথাও?
এই বাংলার পৃথিবীর সব মাটিতে তার দেহ মিশে আছে? যে দেশের জন্য তার জান কোরবান হলো সেই দেশে তার কবর নাই?

যুদ্ধ কত মানুষের কপাল থেকে কবরও কেড়ে নিছে।

গ্রামের চারপাশে তাকায় সে। শান্ত শান্ত বাড়ি। বোকা বোকা গাছ। একটা শিশুর ধারাপাত পড়ার শব্দ শুনে সে একটু থামে। তার মনে পড়ে…। কী মনে পড়ে?

১৭
‘নীলিমা জানো, এবার গ্রামে গিয়ে আমার হৃদয়-মাথা কবিতায় ভরে গেছে। অথচ কী আশ্চর্য এক লাইন কবিতাও লিখতে পারিনি।’ বলে সে তার ব্যাগে হাত দেয়।
‘তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি।’
‘কী এনেছো?’
‘একগুচ্ছ ফুল।’
‘কী ফুল? নাম কী ফুলের?’
‘দেখো তো চিনতে পারো কি না।’ বলে সে একগুচ্ছ আকন্দফুল এগিয়ে দেয় নীলিমার দিকে। নীলিমা চিনতে পারে না।
নীলিমা বলে, ‘জীবনে প্রথম দেখলাম।’
সানা বলে, ‘তুমি কীভাবে দেখবে, তোমার তো এই ফুল দেখার কথা না। তুমি কী তোমার কোনো স্বজনের কবরে গিয়েছো কখনো? যাওনি। মেয়েরা গোরস্তানে নিষিদ্ধ। তুমি তো গোরস্তান দেখেছো দূর থেকে। তুমি তোমার বাবর শব কবরে নামানোর আধকারী নও। কারণ তুমি মেয়ে। তুমি তোমার মা’র কবরে একমুঠো মাটি দেবার অধিকারী নও। অধিকারী তোমার ভাই, কারণ সে ছেলে। তুমি আকন্দ চিনবে কেমনে। এটা আকন্দফুল। সমাধিপুষ্প। এই ফুলের গাছ শুধু গোরস্তানেই হয়। তুমি তো জানো না যে মৃতকে মাটি দেওয়া শেষ হলে তার কবরের চার কোণায় চারটা আকন্দের ডাল পুঁতে দিতে হয়। এই আকন্দগাছ তাকে ছায়া দেয়। মায়া দেয়।…’
বলতে বলতে তার কণ্ঠ ধরে আসে। চোখ ভিজে যায়। নীলিমা তাকিয়ে থাকে দূর নীলিমার দিকে। ওখানে কি তার শহিদ দাদার ছায়া দেখা যাচ্ছে? তিনি কি দিগন্ত পার হয়ে চলে যাচ্ছেন আরো দিগন্তের দিকে?

নীলিমা ফুলগুলি তার ব্যাগে রাখতে রাখতে বলে, ‘তোমাকে এই প্রথম কাঁদতে দেখলাম। কান্না আমার খুব অপছন্দের বস্তু। আমি সহ্য করতে পারি না। চলো তোমাকে নিয়ে হেঁটে আসি।’
‘কোথায় যাবে?’
‘আমরা কোথাও যাবো না। আমরা এখানেই থাকবো। আমি থাকবো তোমার কাছে। তুমি থাকবে আমার কাছে। আমরা দুজন দুইজনের মধ্যে আসা যাওয়া করবো।’
সানা বলে, ‘সুন্দর বলেছো। কবিতার মতো।’

তারা দুইজন হাঁটে। এই হাঁটাকে হাঁটা বলে না। তবু তারা হাঁটে। এই হাঁটা কাউকে কোথায় নিয়ে যায় না। তবু তারা যায়? কোথায় যায়? সানা আর নীলিমাই শুধু জানে। আমরা জানি না।


সানা নীলিমাকে কাঠবাদামের গাছের কথা বলে না। কাঠবাদামের গাছটা যে বাংলাদেশের একমাত্র উদ্ভিদ-মুক্তিযোদ্ধা এই খবর সে কাউকে দেবে না। মানুষ তাকে পাগল বলবে। নীলিমাও বলতে পারে। সুরেশ বাবুর কামিনীগাছের মাঝেই সে বাংলাদেশকে খুঁজে পায়। জ্বলে-পুড়ে কামিনীগাছটা যেভাবে উঠে দাঁড়িয়েছে, তাকে বাংলাদেশের রূপক না বলে কী বলা যেতে পারে? পুরো বাংলাদেশই তো ওই কামিনীর মতো পুড়ে আঙরা হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু আজ তো বাংলাদেশ ওই কামিনীগাছের মতোই সবুজ, ফুল আর পাখিতে ভরা।কিন্তু একথাও সে কাউকে বলবে না। সে চিন্তা করছে, পাক সেনাদের গুলিতে-আগুনে কী পরিমাণ পাখি মারা গেছে, জোনাকি মারা গেছে, নদীতে লাশ দেখে ভয়ে কী পরিমাণ মাছ মারা গেছে, আগুনে পুড়ে গেছে কতগুলি গাছ, গুলিতে ঝাঁঝরা হয়েছে কতগুলি কুকুরের বুক…। যে পশু-পাখি-গাছ-তৃণ বেঁচেছিলো, তারা কীভাবে বেঁচেছিলো, কী ভাবছিলো তারা এই আগুন, গুলি আর রক্তপাত দেখে? যুদ্ধ-দেখা কোনো বাঘ কী এখনো বেঁচে আছে?

সানা একটা বই লেখার পরিকল্পনা করছে। বইটির প্রধান বিষয় হবে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বাংলাদেশের প্রকৃতি। বইয়ের নাম কী হবে তা এখনো ঠিক করেনি।

নীলিমাকে হলে দিয়ে সে হেঁটে হেঁটে মেসে ফিরছে।
আজ অগ্রায়ণের কত তারিখ? ঠান্ডা যেমন পড়ার কাথা ছিলো তেমন এখনো পড়েনি, সানা হাঁটতে হাঁটতে ভাবে, পৃথিবী দিনদিন উষ্ণ হচ্ছেই। এই উষ্ণতা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আচ্ছা, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য শুধু কী কার্বনই দায়ী? যুদ্ধ দায়ী না? গ্লোবাল ওয়ার্মিং, ইকোসিস্টেম ভেঙে-পড়া- এই সবকিছুর জন্য যুদ্ধও দায়ী। যুদ্ধ বিষধর সাপ। এর চোবলে শুধু মানুষ মরে না। বাতাস, পানি, মাটি দূষিত হয়। মারা পড়ে গাছবৃক্ষ, পশুপাখি, জন্তু-জানোয়ার। আচ্ছা অস্ত্র কে উদ্ভাবন করেছিলো প্রথম? আদিম মানুষ? তারা তো অস্ত্র বানিয়েছিলো আত্মরক্ষার জন্য, জীবিকার জন্য! মানুষ মারার জন্য অস্ত্র কে উদ্ভাবন করেছিলো? আসলে জ্ঞান মানুষের প্রধান শত্রু। এই জ্ঞান না থাকলে সে হতো পাখির মতো। পৃথিবীতে যুদ্ধ শব্দটিই থাকতো না। ২৫ মার্চের জেনোসাইড পাকিস্থানিরা কীভাবে চালাতে পারলো? কীভাবে তাদের মাথায় এলো যে মানুষ হত্যা করে মানুষকে পায়ের তলে রাখতে হবে? পৃথিবী জুড়ে দেশে দেশে যে যুদ্ধ চলছে তা তো মানুষেই করছে? অস্ত্রগুলি তো মানুষেই বানাচ্ছে?

এইসব ভাবতে তার ভালো লাগে না।

ঠান্ডা হাওয়া বইছে। শহরে কাক ছাড়া কোনো পাখি নাই। একদিন কোনো পাখি থাকবে না। মানুষ তখন মাটির পাখি বানাবে। জাদুঘরে রাখবে। একদিন নদী থাকবে না। মানুষ নদীর ছবি এঁকে জাদুঘরে রাখবে। এখদিন মানুষও থাকবে না। তখন মাটির মানুষ বানিয়ে কে রাখবে জাদুঘরে?

১৮
নীলিমাকে সোফিয়া লরেনের ‘সানফ্লাওয়ার’ ও ‘টু উইমেন’ সিনেমা দুইটি দেখাতে হবে। আগে সে দেখে থাকতে পারে। আজ সারাদিনে সিনেমা দুইটা দেখেছে সানা। আগেও দেখেছে বেশ কয়বার। দেখতে দেখতে মনে হলো, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও তো এরকম ভালো সিনেমা তৈরি হতে পারে। ‘সানফ্লাওয়ার’এ সোফিয়া লরেন্স একটা নিঃসঙ্গ পাথর। আর ‘টু উইমেন’এ তিনি গির্জায় ধর্ষিতা।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কত নারী সোফিয়া লরেন্সের মতো নিঃসঙ্গ পাথর হয়েছেন, কত নারী ধর্ষিত হয়েছেন…।

সানা ভাবে, ‘আমিও একটা সিনেমা বানাবো। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা। আচ্ছা, সোফিয়া লরেন্সের বয়স এখন কত? তিনি তো সারা পৃথিবীর সেইসব নারীদের প্রতিনিধি যারা যুদ্ধের কারণে বিধবা হয়েছে, ধর্ষিত হয়েছে। বাংলাদেশে এরকম অভিনেত্রী কে, যিনি বাংলার যুদ্ধ-লাঞ্চিত নারীদের সিম্বল?

সানার ভাবতে ভালো লাগে, ‘নীলিমা হবে আমার সিনেমার অভিনেত্রী। আমার সিনেমার সোফিয়া লরেন্স।’

ডায়েরিতে সে লিখে রাখে, ‘নীলিমা, ‍তুমি হবে আমার মুক্তিযুদ্ধের সিনেমার অভিনেত্রী।’

১৯
‘মা বলতেন ১৬ই ডিসেম্বর নাকি আমার ঈদ।’
‘তাই তো মনে হচ্ছে।’

আজ ১৪ই ডিসেম্বর।সানা-নীলিমা দুজন রিকশা করে ইউনিভার্সিটির দিকে যাচ্ছে। তারা গিয়েছিলো বিজয় দিবসের শপিং করতেত। নীলিমা কিনেছে বিজয় দিবসের শাড়ি। সানা কিনেছে বিজয় দিবসের পাঞ্জাবি। দুইটা পতাকাও তারা কিনেছে। দুইজনকে বেশ খুশি খুশি লাগছে। ঈদের আগে নতুন জামা কিনে বাচ্চারা যেমন খুশি হয়।

সানা বলে, ‘১৫ই আগস্টে তুমি পরবে কালো শাড়ি। আমি পরবো কালো পাঞ্জাবি।’
‘১৫ আগস্টে আমি তো কোথাও বের হই। লজ্জা লাগে। নিজেকে মনে হয় পিতার হ্ত্যাকারী।’ নীলিমা বলে।

সানা হঠাৎ আনমনা হয়ে যায়। বুকে চিনচিনে ব্যথাটা আবার শুরু হয়েছে।
মুহূর্তের জন্য সে ভুলে গেলো নীলিমা যে তার পাশে। সে একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দ্রুত চোখ ফেরালো নীলিমার দিকে। এমনভাবে তাকালো যেন এই মেয়েটাকে সে আগে কখনো দেখেনি।
‘দেখি তোমার হাতটা।’ হাঠৎ বলে উঠলো সানা।
নীলিমা বলে, ‘আমার হাত তুমি দেখো নাই?’
‘হাতে নিয়ে দেখি নাই।’
নীলিমা তার হাতখানি সানার হাতে তুলে দেয়। সানা এমনভাবে হাতটা তার হাতে রাখে যেন এটা হাত নয়, একটা পাখির ছানা।
কিছুক্ষণের জন্য তারা দুইজন এমন নীরব হয় যে মনে হয় কিছুক্ষণের জন্য তারা মৃত্যুবরণ করেছে। হাঠৎ সানা মৌন ভাঙে। বলে, ‘জারুল গাছগুলিরে কেমন মরা মরা লাগছে।’
নীলিমা বলে, ‘আকাশটা দেখো। এত তারা আগে কখনো দেখি নাই।’
‘আকাশভরা সূর্যতারা বিশ্বভরা প্রাণ, তহারই মাঝখানে পেয়েছি মোর প্রাণ বিস্ময়ে…’ সানা গেয়ে উঠে।
নীলিমা বলে, ‘তোমার কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত আমার অসাধারণ লাগে।’
‘তুমি তো আমাকে ভালোবাসো, তাই অসাধারণ লাগে। সত্যি আমি কিন্তু রবীন্দ্রসংগীত ভালো গাই না।’
‘আমার খুব ভালো লাগে।’
‘সুমন চট্টপাধ্যায়ের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত তোমার কেমন লাগে।’
‘‘একেক জনের কণ্ঠে একেকটা ভালো লাগে। সুমনের কণ্ঠে, ‘নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে ফুলবনে…’ আমার অসাধারণ লাগে।’’ নীলিমা বলে।

ক্যাম্পাস বেশ সরগরম আজ। বিজয় দিবস উদযাপনের নানা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
রাতটাও খুব সুন্দর। আজকের রাতকে রাত মনে হচ্ছে না। সূর্য় না-ফোটা ভোরের মতো লাগছে।
সানা বলে, ‘তুমি যাও, ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি চলে এসো। আমি গোলচত্বরেই থাকবো।’
‘আমি একঘন্টার মধ্যে আসছি। তুমি গোলচত্বরেরই থেকো।’ বলে নীলিমা হলের দিকে হাঁটা দেয়। নীলিমার হাঁটা দেখে সানা বলে, ‘আস্তে যাও। তুমি দেখছি দৌড় শুরু করেছো।’
তবুও নীলিমা প্রায় দৌড়ে যায়।

সানা হাঁটছে গোলচত্বরের দিকে। এমনভাবে হাঁটছে যেন নীলিমা তারা পাশে পাশে হাঁটছে। একা হাঁটছে মনে হচ্ছে না। একা কেউ এভাবে হাঁটে না। একটা কুকুর খুব দ্রুত তার পাশ দিয়ে চলে গেলো। মনে হচ্ছে মা-কুকুর। বাচ্চাদের কাছে যাচ্ছে। শহিদ মিনারের দিক থেকে একটা সুর ভেসে আসছে। মনে হচ্ছে পরিচিত কোনো গানের সুর; কিন্তু গানের কথা মনে পড়ছে না। তার গান গাইতে ইচ্ছে করছে। হাঠাৎ তার মনে হলো ‘চোখ ফিল্ম সোসাইটির রাশেদের সঙ্গে একটু দেখা করা দরকার। ‘সানফ্লাওয়ার’ ছবিটাও ‘মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা উৎসব’-এ অন্তর্ভূক্ত করা যায় কি না।’

বিজয় দিবস উদযাপনের প্রায় সবকটি আয়োজনে সানার আইডিয়া নেয়া হয়েছে।
‘মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা উৎসব’
‘মুক্তিযুদ্ধর কবিতাপাঠ’
‘মুক্তিযোদ্ধার মুখে মুক্তিযুদ্ধের গল্প’
‘বাংলাদেশ নিয়ে তারুণ্যের স্বপ্ন’
‘বিজয়ের গান’… আরো কত আয়োজন।

সানার অবশ্য ছোটবেলার ‘বিজয় দিবস’ বেশি পছন্দের। ধান-কেটে-নেওয়া মাঠে শতশত রঙিন জামা-পরা ছেলেমেয়ে, মাইকে ‘সবকটা জানালা খুলে দাও না’ অথবা ‘এই গ্রাম আমার মা…’ অথবা ‘এই রেললাইনের ধারে মেঠো পদ্মার পারে…’ তার ভালো লাগে। ভালো লাগে কাবাটি, গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্দা, লং জাম্প, ব্যাডমিন্টন। ভালো লাগে হাতে পুরস্কারের দোয়ত-কলম, সানফ্লাওয়ার লেখা খাতা, লাইফবয় সাবান, আয়না নিয়ে বাড়ি যেতে আর মায়ের কাছে গল্প করতে কাকে কোন ইভেন্টে হারিয়ে এসেছে সে।

রাশেদ, ফয়েজ, সুমন, পাপ্পু, ঋতো, এমদাদ, মামুন, জহির, মুক্তা, লিপি, লিলি, রুমু, তন্বী, কায়েস, শাকিল- প্রায় সবার সঙ্গে দেখা হলো। ফয়েজ জানতে চাইলো মুক্তিযুদ্ধের কোনো কবিতাটা সানার সবচেয়ে প্রিয়। নীলিমা এলো প্রায় ১ঘন্টা ১০মিনিট পর। এমদাদ প্রস্তাব করলো শহিদ মিনারে যাওয়া যায় কি না। তারা ৭/৮জন রওয়ানা হলো শহিদ মিনারের দিকে। শহিদ মিনারে পৌঁছামাত্র নীলিমা আর মুক্তা পাতা কুড়াতে শুরু করলো। শহিদ মিনার বিউটিফিকেশন অভিযান। শহিদ মিনারে কত লোক। সবাই তাদের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকাচ্ছে। পাতা কুড়ানো দেখে তাদের সঙ্গে যুক্ত হলো আরো কয়েকজন। সানার মনে হলো, এরা পরিষ্কার করছে বাংলাদেশ। একদিন এরাই বাংলাদেশকে ঝকঝকে ভোরবেলার মতো তুলে ধরবে বিশ্বের কাছে।


রাত ৩টা। নীলিমাকে হলে পৌঁছে দিয়ে সানা মেসের দিকে হাঁটছে। একটু আগেও তার সঙ্গে এমদাদ আর মামুন ছিলো। এখন সে একা। মেসের প্রায় কাছে চলে এসেছে। হাঠাৎ একটা বুনোফুলের গন্ধ তার নাকে এসে লাগলো। এখানে বুনোফুলের গন্ধ আসবে কোথা থেকে? আসতেও পারে। বাতাস তো বন থেকেই আসছে। কিন্তু না, একটু পরেই তার মনে হলো এটা নীলিমার শরীরের ঘ্রাণ। নীলিমা আশেপাশে থাকলে সে একটা ফুলের গন্ধ পায়। এখন কি ওই গন্ধটাই পাচ্ছে? ঠিক বুঝতে পারে না।

ঘুমাতে ঘুমাতে প্রায় সকাল হয়ে গেলো। ঘুমানোর আগে সে একটা কবিতা লিখলো। কবিতাটির নাম ‘হাত’। প্রথমে দিয়েছিলো ‘নীলিমার হাত’।

‘কতভাবে হাতকে ব্যবহার করে মানুষ
তোমার জন্য আমি এই দুটি হাত রেখেছি হৃদয়ের কাছে
স্পর্শ করিনি কোনো কাজ।
আমার হাত থেকে ঝরতে দাও এককোটি এক জোনাকি
আর তুমি মেঘের দুর্গের বেশে দাঁড়িয়ে থাকো দূরে, দূরে
না, খুব কাছে, ক্লান্ত কবির নিবাস।’

কবিতাটি শেষ করার পর তার মনে হয়েছে আরো একটা কবিতা লেখা দরকার। কবিতার না ‘নীলিমার হাত’। প্রথম পঙক্তিটা হবে,

‘এই হাত নীলিমার, যে-হাত ঝকঝকে করে রাখে স্মৃতি আর শহিদ মিনার।’

২০
ঘুম থেকে উঠেই তার মনে হলো, কাল বিজয় দিবস। বিজয়ের আনন্দে বাংলাদেশের আকাশ-নদী আর বনভূমি কেমন আনন্দিত, তা এই শহরে বসে দেখা যাবে না। সে চলে যাবে দূর গ্রামের দিকে। যেখানে নদী থাকে, নদীর উপর ফর্শা আকাশ থাকে আর নদীর দুইপারে থাকে লোকালয়, বনভূমি। যেখানে বনভূমি জুড়ে পাখি আর পাখি, হাওয়ার কোমল চলাফেরা আর ফুলের গন্ধ…।

কাউকে না বলে সানা চলে এসেছে গ্রামে। গ্রামে পৌঁছে তার মনে হলো, প্রতিটা গাছে নতুন পাতা, পাখিরা সুখী, মিষ্টি কিশোরীর মতো চঞ্চল বাতাস, নদীতে নতুন জল, মাছের মনে গান, মানুষের মনে মানুষের জন্য মায়া, রোদ খুব মায়াবী, মায়ের হাতের মতো কোমল ও স্নেহভরা…। কেনো মনে হচ্ছে এমন? কারণ কাল বিজয় দিবস। শিশুদের জন্য সে পকেট ভরে নিয়ে গেছে চকোলেট। তারা আজ এতটাই খুশি যে চকোলেটের চেয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তেই বেশি আনন্দ তাদের। সানা এইসব দেখে আর ভাবে। কী ভাবে সানা?

গ্রাম দেখতে এসেছে জেনে কত লোক তাকে দুপুরে খাওয়াতে চাইলো। সে কোথাও গেলো না। বসে রইলো নদীর কূলে। তার খুব ইচ্ছা একজন মুক্তিযোদ্ধাকে দেখা। এই গ্রামে কোনো মুক্তিযোদ্ধা নাই। অবশ্যই আছেন। তিনি কী জানেন কাল বিজয় দিবস? একজনকে জিজ্ঞেস করলো সানা, ‘এই গ্রামে কোনো মুক্তিযোদ্ধা নাই?’
‘একজন ছিলেন। গত সোমবার দিবাগত রাতে তিনি ইন্তেকাল করেছেন।’
‘চলেন তার বাড়িতে যাবো।’

সানা যাচ্ছে একজন মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি। যে বাড়িতে এখন তিনি নাই। যে বাড়িতে তিনি গত সোমবার দিনেও ছিলেন। সোমবার রাত থেকে তিনি নাই। তার সাথে যাচ্ছে কমপক্ষে ৩৪টা শিশু আর ২৯ জন বৃদ্ধ-তরুণ। একজন বলে ‘কবর জিয়ারত করবেন?’
‘কবর জিয়ারত করবো পরে। আগে বাড়িতে চলেন। কে কে আছে বাড়িতে?’
একটা শিশু বলে উঠে, ‘আমার নানা।’
‘তোমার নানা? তোমার নাম কী?’
‘আরমান।’
একজন বলে, ‘তার বাবাও নাই। সে তার মার লগে নানাবাড়ি থাকে।’
সানা জিজ্ঞেস করে, বাড়িতে শুধু আরমানের আম্মা?’
আরমান বলে, ‘খালি আম্মা।’

মুক্তিযোদ্ধা ইয়াসিন আলীর বাড়ির উঠানে বসে আছে সানা। বাড়িতে কোনো চেয়ার নাই। উঠানে মাদুর পেতে দেওয়া হয়েছে। মাদুরটাও ছোট। চারজন বাসা গেছে। বাকি সবাই দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকটা শিশু মাটিতেই বসেছে। আরমানের আম্মা খুব লজ্জিত। মেহমানকে খেতে দেওয়ার মতো কিছু নাই বাড়িতে। আরমান একজগ পানি আর একটা প্লাস্টিকের মগ এনে সানার সামনে রাখলো। এই ঘর থেকে ইয়াসিন আলীর লাশ কীভাবে বের করা হলো। ঘরের একটাই দুয়ার। ঘরের ভেতরটা দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকার। এই ঘরে ঢুকতে হয় নিচু হয়ে।

জানা গেলো, ইয়াসিন আলীর কোনো ছেলে ছিলো না। একটাই মেয়ে। তার স্ত্রী মেহেরজান বিবি মারা যান আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগে। তখন আরমানের আম্মার বয়স কত হবে বড়জোর ৩ কি ৪। মেহেরজান আশেপাশের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করতেন। স্বামী মরার পর থেকে বাবার বাড়ি এসে গত সাত বছর যাবৎ মানুষের ঘরে ঝিয়ের কাজই করছেন। ইয়াসিন আলী একপ্রকার ভিক্ষাবৃত্তি করেই চলতেন। তার একটা হাত ছিলো না। মুক্তিযুদ্ধে হারানো হাতের জন্য তার কোনো খেদ ছিলো না। বরং তিনি গর্ব করতেন। তিনি বলতেন, ‘এই হাত একদিন কবরের মাটিতে মিশে যেত। আমার সৌভাগ্য যে আমি আমার একটা হাত দেশের জন্য উৎসর্গ করতে পেরেছি। গিয়েছিলাম তো জান দেওয়ার জন্য। জানটা যদি দিতে পারতাম, মানবজীবন ধন্য হতো।’

সানা বলে, ‘চলুন ইয়াসিন আলী সাহেবের কবর জিয়ারত করে আসি।’
একজন বৃদ্ধলোক বলেন, ‘চলেন।’
সবাই যেতে উদ্যত হলে সানা ডাক দেয় ‘আরমান কোথায়, আরমান এসো।’
আরমান এসে সানার গায়ে লেগে দাঁড়ায়। যেন সে দাঁড়িয়ে আছে তার পিতার কাছে।
সানা বলে, ‘তোমার আম্মা কোথায়? একটু আসতে বলো।’
একজন মুরব্বি বলে উঠেন, ‘রাবিয়া আয়।’
রাবেয়া আসেন। ইয়াসিন আলীর একমাত্র আত্মজা। তিনি ঝিয়ের কাজ করেন। তার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার বুক গর্বে ভরা।
সানা বলে, ‘কাল বিজয় দিবস। আমি এসেছিলাম বিজয় দিবসের আগের দিনের গ্রাম দেখতে। এসে ঈদের আনন্দের মতো আনন্দ দেখেছি সবখানে। আকাশে-বাতাসে, শিশুদের মনে। কিন্তু আপনার আব্বার মৃত্যুর খবর শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। এখন মনে হচ্ছে আমি আসলে এখানে এসেছি মুক্তিযোদ্ধা ইয়াসিন আলীর কবর জিয়ারত করতে। আমি আরো একদিন আসবো আপনাকে দেখতে। আমারা অনেকে মিলে আসবো। এসে তার কবরটা পাথর দিয়ে বাঁধাই করে দিয়ে যাবে, আর কবরের ঠিক মাঝখানে, যেখানে তার বুক, সেখানে একটা লালগোলাপের গাছও রুয়ে দিয়ে যাবো।

ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন রাবেয়া। তার মুখে কোনো কথা নাই।

ইয়াসিন আলীর কবরের এক কোণায় একটু পানি জমে আছে। সানার মনে হলো এই পানি আশপাশের বাড়িতে ঝির কাজ-করা রাবেয়ার অশ্রু।

২১
নীলিমার মুখের দিকে তাকিয়ে সানার মনে পড়লো একটা ফুলের না। শিউলিফুল। কিন্তু বিজয় দিবসের শাড়ি পরে যখন আসছিলো, দূর থেকে তাকে মনে হয়েছিলো একটুকরো বাংলাদেশ। বিজয় দিবসের আগের উৎফুল্ল গ্রাম দেখতে যাওয়ার গল্প বলতে বলতে তারা যাচ্ছে ‘বাংলাদেশ নিয়ে তারুণ্যের স্বপ্ন’ অনুষ্ঠানে। নীলিমা গল্পের মাঝখানে সানাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘আর শুনবো না। আমাকে নাওনি কেনো?’
সানা তারপরও বলে, ‘গ্রামটার নাম জানো কি? কনকশ্রী।’
‘খুব সুন্দর নাম তো!’ নীলিমা অবাক হয়।
‘পৃথিবীর কোনো দেশেরই গ্রামের নাম বাংলাদেশের গ্রামের নামের মতো সুন্দর না। কিন্তু মজার বিষয় কী জানো, এই গ্রামটির নাম আমি জানি না। কাউকে জিজ্ঞেসও করিনি।’
‘তাহলে কনকশ্রী পেলে কোথায়?’
‘এই নামটি আমিই দিয়েছি। গ্রামটা দেখে মনে হলো এর নাম হবে ‘কনকশ্রী’।
‘আমাকে নাওনি কেনো?’
‘ওই গ্রামে একটা কাজ রেখে এসেছি। একদিন তোমাকে নিয়ে গিয়ে কাজটা শেষ করে আসতে হবে।’
‘কী কাজ?’
‘আছে একটা কাজ। আজ না, অন্যদিন বলবো। কাজটা করতে পারলে তুমি খুব খুশি হবে।’

ইয়াসিন আলির মৃত্যু, কবর জিয়ারত, মেহেরজান বিবি, রাবেয়া, আরমান, রাবেয়ার বৈধব্য, ঝিয়ের কাজ কিছিই সে নীলিমাকে বললো না। সে জানে নীলিমার মন খারাপ হবে। মাটি হবে তার বিজয় দিবসের আনন্দ। সারাদিন তার মনের ভেতর এক টুকরা মেঘ জমে থাকলো, কাউকে সেটা বুঝতে দিলো না সানা।

এখন ১৬ই ডিসেম্বর রাত ১০টা।
নীলিমা বললো, ‘তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। বাসায় চলে যাও।’
‘চলে যাওয়াই উচিত।’
সারাদিন মাথায় বেঁধে রাখা পতাকাটা খুলে নীলিমা সানার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘এটা তোমার জন্য।’
পতাকাটা ভাঁজ করতে করতে সানা বলে, ‘আগামী ৩/৪দিন আমাদের দেখা হবে না।’
‘কেনো?’
‘একটু বাড়িতে যাবো।’
‘হঠাৎ বাড়িতে কেনো?’
‘অনেকদিন ধরে আমার বুকের বাঁপাশে একটা চিনচিনে ব্যথা। একটু ডাক্তার দেখানো উচিত।’
‘একদিনও তো বলো নাই।’
‘পাত্তা দিই নাই। অসুখবিসুখকে বেশি পাত্তা দিতে নাই। এখন দেখছি…’
সানার কাথার মাঝেই নীলিমা বলে উঠে, ‘তোমার এই কথাটা আমার পছন্দ হলো না। অনেক আগেই ডাক্তার দেখানো উচিত ছিলো। এখন কী ব্যথা আছে?’
‘না, এখন নাই। মাঝে মাঝে হয়।’
‘কালই ডাক্তারের কাছে যাবে।’
‘অবশ্যই যাবো।’
‘আমি তোমাকে নিয়ে যাবো। বাড়িতে যাওয়ার দরকার নাই। সকালে আমি তোমার বাসায় আসবো।’
‘বাড়িতে অন্য একটা কাজও আছে।’
‘কাজটার নাম কী? কাজটার নাম জানা কী আমার জন্য নিষিদ্ধ?’
‘এসে বললো। প্লিজ মাইন্ড করো না।’
‘মাইন্ড করবো’ বলে নীলিমা হলে দিকে হাঁটে। একটু দূরে গিয়ে পিছনে তাকায়, সানাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলে, ‘যাচ্ছ না কেনো?’
সানা একটু জোরে বলে, ‘ভালো থেকো।’
‘ভালো থাকবো না।’ বলে নীলিমা হলে ঢুকে যায়।

সানা যাচ্ছে। তার মাথার উপর মেহগনি-ছায়া। এত ঘন ছায়া যে আকাশ দেখা যায় না। তেমন শীত লাগছে না তবে কুয়াশা আছে। হালকা কুয়াশা। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে রাস্তা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ সে খেয়াল করলো লাঠির মতো কী একটা পড়ে আছে। সে ভাবলো শুকনা ডাল। কিন্তু না, কাছে যেতেই খুব দ্রুত সরে গেলো সাপটা। বেশ লম্বা আর কালো। বিষধর সাপ হবে। একটু সামনে গিয়ে আবার পিছনে তাকালো। কয়েকটা ছেলেমেয়ে গান গাইতে গাইতে আসছে। তারা গাইছে, ‘মুক্তির-ও মন্দির-ও সোপান-ও তলে, কত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে…।’ গানটা শুনতে শুনতে তার মনে হলো, বিজয় দিবসে এই সাপ রাস্তায় কেনো? পাকিস্থানি সাপের বংশধর নাকি এই বিষধর সাপ?

২২
সানা বাড়ি যেতে পারলো না। সে এখন আছে কিশোরগঞ্জ শহর থেকে একটু পশ্চিমে। গ্রামের নাম দর্শাপাড়া। তার বাড়িওয়ালার একমাত্র মেয়ে গত পরশু সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গেছেন। বাড়িওয়ালার এক ছেলে। অস্ট্রেলিয়া থাকেন। মেয়ের নাম হ্যাপি। সানা ডাকতো সুখী আপা। সুখী আপার স্বামী থাকেন লন্ডনে। বাড়িওয়ালা হান্নান চাচা আর খালাম্মার সাথে সুখী আপার লাশ নিয়ে সে দর্শাপাড়া এসেছে। আগামীকাল ফিরবে। সুখী আপার প্রিয় গান ছিলো ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে, রাতের নির্জনে…।’ এই গানের শিল্পী সামিনা চৌধুরী। সামিনা চৌধুরীর বাবা মাহমুদুন্নবী। মাহমুদুন্নবীরও একটা গান আছে ‘তুমি যে আমার কবিতা..। বাপ-মেয়ের দুটি গানই বেশ বিখ্যাত। লক্ষ্য কারার বিষয়, দুটি গানেই ‘কবিতা’ শব্দটি আছে। সানা যেহেতু কবিতা লেখে তাই সুখী আপার জন্য তার একটু দরদ থাকা স্বাভাবিক। কারণ সুখী আপার প্রিয় গানটি ‘কবিতা পড়ার প্রহর…।’

আজ বাদ আছর তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এখন রাত ১টার কম না। সুখী আপাদের গ্রামের বাড়িটা কবরের মতো নির্জন। নির্জন শব্দের অর্থ জনহীন। কিন্তু আমরা শব্দাকে ব্যবহার করি নীরবতার সমার্থক হিসেবে। বাড়িটা নির্জন নয়, বরং সজন। কিন্তু সুখী আপার শোকে মনে হচ্ছে নির্জন। এরকম রাতের নির্জন কী কবিতা পড়ার প্রহর? অবশ্যই না। অন্ততপক্ষে লোকজন তা-ই বিশ্বাস করে। শোকের খুব কাছে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়ার চল এখনো বাংলাদেশে চালু হয়নি। হয়তো ভবিষ্যতে হবে। শোকে আমরা কবিতা পড়ি, তবে তা শোক থেকে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে। তবু নিজের অজান্তেই তার মুখে চলে আসে, ‘জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার…।’


একটা কুকুরের কান্নায় তার ঘুম ভাঙলো। কুকুরটার কান্না শুনে মনে হচ্ছে কেউ তার মাথায় কোদাল দিয়ে ছেদ মেরেছে। সে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। কুকুর কেঁদেই চলেছে। সানা খেয়াল করলো কুকুরের পিঠ রক্তে লাল। তার পিঠে কেউ দা দিয়ে ছেদ মেরেছে। সে কাঁদছে আর জিভ দিয়ে যতটুকু পারা যায় রক্ত চাটছে।

হান্নান চাচা ফজরের নামাজ পড়ে সুখী আপার কবর জিয়ারত করতে গেছিলেন। এখন আসছেন। সানাকে দেখেই বললেন, ‘উঠে গেছো বাবা?’
‘জ্বি চাচা। আমার তো বেরিয়ে পড়া উচিত।’
‘নাস্তা করে যাবে। হাতমুখ ধুয়ে লও।’
সানা বাথরুমে ঢুকলো। হাঠাৎ তার গত রাতে দেখা স্বপ্নের কথা মনে পড়লো। সুখী আপার একটা মেয়ে হয়েছে। মেয়েটা দেখতে অবিকল নীলিমার মতো। সুখী আপা বলছেন, ‘তুমি আমার মেয়ের একটা সুন্দর নাম রেখে দাও। সানা বলছে, ‘আপা, আপনার মেয়ের নাম ‘সুরেলা’।’ নামটা তার পছন্দ হয়েছে কি হয়নি সানা বুঝতে পারে না। মেয়েটাকে কোলে নিয়ে বসে আছে নীলিমা। নীলিমা বলছে, ‘দেখো তো মেয়েটা কার মতো হয়েছে?’


এই মাত্র বাসটা মেঘনা নদী পার হলো। সানা কিশোরগঞ্জ থেকে ফিরছে। রাত কয়টা বাজে? প্রচন্ড গতিতে গাড়ি চলছে। ঠান্ডা লাগছে খুব। তার ঘুম পাচ্ছে।

কখন ঘুমিয়ে পড়েছে সেটা তার জানার কথা নয়।কেউ তাকে ধাক্কা দিয়ে বললো, ‘ভাই গাড়ি তো এসে পড়েছে। নামবেন না?’ সানা বাস থেকে নামলো ভোর ৪টা ২০মিনিটে।
নেমেই দেখে অনেক মানুষের জটলা। অনিচ্ছা সত্বেও ওদিকে গেলো। একটা শিশু কাঁদছে। শিশুটাকে পাওয়া গেছে ইস্টিশনের পাশের কচুবনে। নিজের বাচ্চা কেউ ফেলে যায়? শিশুটার কান্না থামছে না। তাকে কেউ কোলেও নিচ্ছে না। সে শুয়ে আছে একটা বস্তার ওপর, মাটিতে। কয়দিন হবে এর বয়স? বড়জোর ৫দিন। হঠাৎ কোথা থেকে এক পাগলী এসে ভিড় ঠেলে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে বসে পড়লো মাটিতেই। পাগলীর বয়স হবে কমপক্ষে ৬০ বছর। বাচ্চার কন্না একটু কমেছে। পাগলী বললো, ‘তোমরা যে যার পথে যাও। আমি ওরে দুধ খাওয়ামু।’ বলেই সে তার বৃদ্ধ স্তন বের করলো। দুধহীন স্তন খাচ্ছে শিশু। কান্না বন্ধ।

আলো ফুটতে শুরু করেছে। পাগলী বাচ্চাকে নিয়ে শুয়ে আছে। বুকের এত গভীরে নিয়ে রেখেছে যে শিশুটাকে দেখা যাচ্ছে না। কেউ আগে খেয়াল করেনি। বাচ্চাটার একটা বেরিয়ে আছে। বেরিয়ে থাকা পায়ে দুটি আঙুল নাই। রক্ত শুকিয়ে লেগে আছে অন্য তিনটা আঙুলে, পায়ের তলায়। কুকুর কামড়েছে নাকি? কে একজন ঘুমন্ত শিশুর পা হাতে নিয়ে দেখছে। সে ভেবেছিলো ঠান্ডায় বরফ হয়ে গেছে, কিন্তু না যথেষ্ঠ গরম আছে।
সানা বললো, ‘এরে হাসপাতালে নেওয়া দরকার।’
একজন পাগলীকে ধাক্কা দিয়ে বললো, ‘ওর পা’র আঙুল কুকুরে খাইছে। হাসপাতালে নিতে হইব।’
পাগলী বলে, ‘আমি নিয়া যামু। তোরা যা।’

সানার বুকের ব্যথা আবার শুরু হয়েছে। বাসায় চলে যেতে হবে। বাচ্চাটাকে রেখে যেতে তার মন চাইছে না। সে মনে মনে বললো, ‘পাগলারা বড়দের জন্য পাগল। বাচ্চাদের কাছে তারা পাগল না। কোনো পাগল মা তার সন্তানকে কোল থেকে ফেলে দেয় না। মানুষ পাগল হতে পারে, মাতৃত্ব কখনো পাগল হয় না। এই পাগলী শিশুটার জন্য যা করতে পারবে তা এই শহরের সকল পুরুষ মিলেও করতে পারবে না।’

কীন ব্রিজের উপর এসে সানা কুয়াশাঘেরা সুরমার দিকে তাকালো। নদী থেকে ধোঁয়া উঠছে। মনে হচ্ছে বাষ্প হয়ে উড়ে যাচ্ছে সুরমা।

২৩
নীলিমা স্বপ্ন দেখছে। সানার আব্বা হাসপাতালের বারান্দায় নামাজে দাঁড়িয়েছেন। তার চোখ থেকে ঝরনার মতো ঝরে পড়ছে পানি। নীলিমার হাতে সানার ডায়েরি। দেয়ালে হেলান দিয়ে সেও বসে আছে বারান্দার ফ্লোরে। তার চোখ ডায়েরির পাতায়। হাসপাতালে গিজগিজ করছে লোকে। প্রায় সকলেই এসেছে সানাকে এক নজর দেখতে। রোড এক্সিডেন্টে গুরুতর আহত হয়ে সানা এখন ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে আছে। ডাক্তাররা বলেছে বাঁচার সম্ভাবনা খুব কম। মাথায় আঘাত পেয়েছে। পাঁজরের কয়েকটা হাড় ভেঙে গেছে। একটা পা কেটে ফেলতে হবে। সানার আম্মাকে কোলে নিয়ে বসে আছে মুক্তা আর এমদাদ। তিনি জ্ঞান ফিরলেই ‘আমার সানা বলে আবার জ্ঞান হারাচ্ছেন।’ তাকে ঘুমের ইনজেকশন দেয়া হয়েছে কিন্তু তিনি ঘুমাচ্ছেন না।

নীলিমার চোখ এখন সানার ডায়েরির সেই পাতায় যেখানে লেখা আছে : ‘নীলিমা, তুমি হবে আমার মুক্তিযুদ্ধের সিনেমার অভিনেত্রী।’

স্বপ্নের মধ্যেই নীলিমার মনে হলো, ‘এটা বাস্তব না। স্বপ্ন।’

সে ডায়েরিটা দেখছে।
এই পাতায় লেখা : ‘মুক্তিযোদ্ধা ইয়াসিন আলীর কবর বাঁধানোর জন্য নীলিমার কাছ থেকে নেওয়া হবে ৫০টা।’

হঠাৎ করে সে ডায়েরির শেষ পাতায় চলে যায়। আড়াআড়ি একলাইন কবিতা লেখা :

‘আবার আসিব ফিরে এই বাংলায় হয়তো মানুষ নয় শঙ্খচিল শালিকের বেশে…’

হঠাৎ হাসপাতালে কান্নার রোল। সে চিৎকার করে ওঠে।
তার ঘুম ভেঙে যায়। চিৎকার শুনে নীলিমার বান্ধবী শাওলি লাফ দিয়ে ওঠে। ‘কী হইছে নীলিমা।দুঃস্বপ্ন দেখেছিস?’
নীলিমা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে, ‘না, কিছু না।’

বারান্দায় এসে দাঁড়ায় নীলিমা। সানার অসুখের কী খবর। ডাক্তারের কাছে গেছে? ঘুমন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকায়। তার পিছনে এসে দাঁড়ায় শাওলি। বলে, ‘চল, ঘুমাই। সকাল হতে অনেক দেরি। শীতের রাত সহজে ভোর হতে চায় না।’

নীলিমা ঘুমাতে ভয় পাচ্ছে। আবার যদি কোনো দুঃস্বপ্ন…

২৪
সোনালি রোদে সকাল ভরে আছে। ঘাসে মুক্তার মতো শিশির। একটা শালিক এসে এক ফোঁটা শিশিরকে ঠুকরে দিলো ।

নীলিমা খালি পায়ে হাঁটছে। শিশিরের জলে তার পা দুটি ভেজা। মেহগনি গাছ থেকে ফোঁটা ফোঁটা শিশির ঝরছে তার মাথায়। ঘাসের দিকে তাকিয়ে সে আস্তে আম্তে হাঁটছে।

কী খুঁজে মেয়েটি? সে কিছু হারিয়েছে?

২৫
‘আম্মা, আমি একটা সিনেমা বানাবো।মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা।’

ঘরে অনেক আত্মীয়-স্বজন। কারও মুখে কোনো কথা নাই। সবাই হাওয়ারুন নেছাকে শেষ বারের মতো একনজর দেখতে এসেছে। মা ঘুমে, না জেগে আছেন, সানা বুঝতে পারে না। মা’র দুই চোখ বন্ধ।তবু সে বলে। বলেই যাচ্ছে-

‘সিনেমার নাম ‘‘আকন্দফুল’’। আমার সিনেমায় মুক্তিযুদ্ধে বিধবা-লাঞ্চিত-ধর্ষিত নারীর চরিত্রে অভিনয় করবে নীলিমা। নীলিমা আমার বন্ধু। আমাকে ভালোবাসে। তার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। তার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহিদ। সে শহিদ পরিবারের সন্তান। তার পায়ের ধূলি আমার মাথায় মেখে আমি একদিন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধে শহিদানদের প্রতি সম্মান জানিয়েছিলাম।’

ঘরের কারও মুখে কোনো কথা নাই। সবাই একবার সানার মুখে একবার তাকাচ্ছে হাওয়ারুন নেছার মুখে। সানার বাবা সাইফুল্লাকে কোথায় দেখা যাচ্ছে। তিনি হয়তো নামজ পড়ছেন।সানা তার কথা বন্ধ করছে না। একটানা বলেই যাচ্ছে-

‘আম্মা, নীলিমার মুখের সাথে তোমার মুখের খুব মিল। নীলিমাকে নিয়ে আমি একদিন কনকশ্রী যাবো। আমরা মুক্তিযোদ্ধা ইয়াসিন আলীর কবর শ্বেতপাথর দিয়ে বাঁধাই করে দেবো। আমরা সুরেশ বাবুর কামিনীগাছের গায়ে একটা সাইনবোর্ড ঝুলাবো। তাতে লেখা থাকবে একটামাত্র শব্দ। বাংলাদেশ। আর যদি কখনো শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার দেখা হয়, তাহলে আমি তাঁকে বলবো, বাংলাদেশের একমাত্র উদ্ভিদ-মুক্তিযোদ্ধা, নয়া বাজার কৃষ্ণচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের কাঠবাদামের গাছটা কারা কেটে ফেলেছে।’

আব্বার কান্নাজড়ানো আবৃত্তি ‘অনন্ত অসীম প্রেমময়-ও তুমি, বিচার দিনের-ও স্বামী, যত গুণগান হে চির মহান তোমারি অন্তর্যামী…’ শুনে সানার ঘুম ভেঙে যায়।

বুকের ব্যথায় তার চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে।
কোথায় শুয়ে আছে সানা? সে মনে করতে পারছে না। মেসে? নানাবাড়িতে? বাড়িতে আম্মার পাশে?

২৬
আজ তেমন কুয়াশা নাই। ঠান্ডা আছে। মনু নদীতে তবু হাজার হাজার লোক। এক একটা জাল লাছো মাছে একেবারে সাদা। চরে কারা আখের শুকনা পাতা দিয়ে আগুন ধরিয়েছে। জাল রেখে আগুন ঘিরে আছে কয়েকজন। তারা ঠান্ডায় কাঁপছে। একটু গা গরম করে আবার নামবে। এত লাছো মাছ আগে কোনোদিন আসেনি। চরে গিজগিজ করছে লোক। তাদের মুখে মুচকি হাসি। শিশুরা জাল থেকে মাছ খুলে খুব আনন্দ পাচ্ছে। কার জালের মাছ কে খুলছে তার কোনো ঠিক নাই।

আকাশে একটু পর পরই ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। তারা কোথায় যাচ্ছে?

 

লেখক পরিচিতি:

মুহম্মদ ইমদাদ  সিলেটের মৌলভীবাজার জেলায় ৬ জানুয়ারি ১৯৭৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সুফিবাদের একটা দৃষ্টি ও চিন্তা মাতৃভূমির লোকবোধ থেকে গ্রহণ করেছেন। জাগতিক জীবনের নিত্যতাই চিরায়ত রহস্যের মাধুযে উঠে আসে মুহম্মদ ইমদাদের সাহিত্যে। ভাষা ও প্রকাশের সরলতাতেই উজ্জ্বল মুহম্মদ ইমদাদের শক্তি।

মুহম্মদ ইমদাদ কবি, অনুবাদক, কথাশিল্পী এবং পেশায় শিক্ষক। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি ও লোক প্রশাসনে স্নাতকোত্তর।  প্রকাশিত বই : কবিতা— অন্ধ পৃথিবীর জানলাগুলি ● নদীমাতৃক পৃথিবী মেঘমাতৃক আকাশ ● প্রেগন্যান্ট পাগলি ও অন্যান্য কবিতা। অনুবাদ—দূরাগত স্বর ● চূর্ণচিন্তন ● আর্থার শোপেনহাওয়ারের কথাগুলি। প্রবন্ধ— আধুনিক কবিতা বিষাদবৃক্ষের ফুল ও অন্যান্য প্রবন্ধ। সম্পাদিত ছোটকাগজ— ‘হরমা’ । ই-মেইল : [email protected]

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

ঝড়ু-পিন্টু-ভানু আখ্যান | জুয়েল মোস্তাফিজ

Thu May 13 , 2021
ঝড়ু-পিন্টু-ভানু আখ্যান | জুয়েল মোস্তাফিজ 🌱 ঝড়ু পাল কত হলে একশ হয়? এক’শ কি কোনো সাপ? বাইম মাছ দেখতে কেমন, কত হলে বাইম মাছ হয়? আমি হাড় গণনার হাটে যাবো, দমের যাতাকলে পা কাটব। কত হলে পা হয়? একশ কি কোনো পা? কালো ধানের মাঠি দেখতে কেমন? পানি নাকি হাসতে […]