তলানি | শেখ লুৎফর

তলানি | শেখ লুৎফর

🌱

‘মানুষটা ক্যাডা’ এই জিজ্ঞাসা রহিমার বুকে সময়-অসময়ে আছড়ে পড়ে তোলপাড় তুলে, সমস্ত চেতনার মর্মমূল খামচে রক্তাক্ত করে রাতের অখণ্ড ঘুমকে। সিমেন্ট ফ্যাক্টরির শেষ সিফটের বাঁশি যখন ছাতকের ঘোরলাগা রাতের কালোকে চৌচির করে তার খানিক বাদেই একটি ছায়া শিববাড়ির এই শীর্ণ সড়কে বেহিসাবী পাও ফেলে সুর টানে…। সেই অস্পষ্ট সুরের ঝাপটা রহিমাকে দূর…বহুদূরের কোনো এক রাজ্যের কথা কয়। সে কেমন দেশ আর কেমনতরো তার নৃত্য-কলা তার মাথামুণ্ডু জানে না রোগা শরীরের ষোল বছরি তামাটে রহিমা।

প্রথম প্রথম রহিমা ভয়ে অবশ দেহ নিয়ে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকতো, কিন্তু কানের সরুপথ বড়োই উতলা হয়ে গোগ্রাসে গিলে নিতো সেই সুরের সুধা আর তার ঝংকার সারা দেহের কোণা-কানায় ছড়িয়ে ঝাঁঝিয়ে তুলতো মন-গতর। তারপর রাত গড়িয়ে যেতো বৈতাল ভাবনায়। ভোলাগঞ্জ টু ছাতক রোপওয়ের পথ সচল হলে তার খাটাশে শব্দ ছোট্ট এই শহরবাসীর ঘুম হেঁচড়ে নিলেও রহিমা জাগতো না। বাথরুম-কাম টয়লেট আর রান্নাঘরের এই গুপ্তকোঠার ভারী বাতাস যখন লাফিয়ে উঠতো নায়েব-বিবির ধমকে তখন রহিমা আছড়ে-পাছড়ে উঠতে গিয়ে শরীরের অবাধ্য ঘুমকে ঝেঁটিয়ে দিতো নায়েব সাহেবের পেশাবের চিন…চিন…সিশ্ শব্দে।

নায়েব সাহেবের বেগবান পেশাবের সেই তীক্ষ্ণ শব্দ দেওয়াল আর চৌকাঠ টপকে রহিমাকে খুঁচিয়ে যেতো; লম্বাটে মুখের ধিঙ্গি শরীর আর একবার শিহরিত হতো সেই গুপ্ত হিসহিসানির তাড়নায়। পবিত্র এই সকালে ফের তার বুকের ভেতর জোয়ার আসতো ডাকিনীর কূল থেকে। কলতলায় দাঁড়িয়ে অই নীল-নীল খাসিয়া পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা সাদা পানির বান দেখে সে আবার ভাবতে শুরু করতো সেই রাতের মানুষটার কথা; আর তখন ঘোরভাঙা বাস্তবেও সুরের শরীর দিশেহারা করতো অভাগীর ক্ষুদ্রজীবনের সকল পয়গামকে। তাবৎ অনুকুল আবহের উজানে হাসতো একটি দূর স্বপ্নছায়া এবং প্রতিকূলের হিংস্রতায় তার আহ্লাদের বাঁশি বড়োই অবুঝ মনে টানতো সেই রহস্যঘেরা বেগানার সহবত। তার সকল ভাবনায় মরিয়া হয়ে দোল খেতো একজন দুঃখী যুবকের প্রতিচ্ছবি যে অন্তকাল ধরে ছাতকের শিববাড়ির অন্ধকার পথে হেঁটে যাচ্ছে দুঃখের বয়ন বুকের পাঁজরে লুকিয়ে। কল্পনায় সহবত প্রাপ্ত সেই দুঃখী পুরুষের পাঁজর শীতল করে দেবার বাসনায় নায়েব-বিবির বেধড়ক নির্যাতনের মুখেও তার নিমগ্ন চেতনা আঁকু-পাঁকু করে উঠতো। পাষাণ্ড সভ্যতার চার দেওয়ালে বাঁধা জীবন তাকে নিত্য বি ত করলেও মেঘ-বিজলি-বাদল আর পাহাড় ঘেরা ছোট্ট এই শহর তাকে টেনে তুলতো।

ভেজা কাপড় ছাদে মেলে দিতে গিয়ে রহিমা অন্য রকম একটা বিশাল রাজ্য দেখে আসতো। রোপওয়ে বেয়ে ছুটে আসছে পাথরভরা লোহার বালতি, নিচে ফ্যাক্টরির চিমনি তাল তাল সাদা ধূঁয়া উগড়ে আকাশের বুক ভরে দিচ্ছে, শহর ঘিরে বাঁক খাওয়া সুরমা নদী সুরমার মতোই কাজলা পানি বুকে নিয়ে ছুটছে ভাটির দিকে; উত্তরে খাসিয়া পাহাড়ের বুক জোড়ে বসেছে ঘুম ঘুম মেঘের মেলা। এই সব দেখে মনে পড়ে যেতো তার দাদার কথা; ভরা জোছনার রাতে বুড়ো উঠানে পাটি পেতে গান জুড়তো,

‘বন্ধু আমার কাঞ্চা গাছের ফল,
অরে বন্ধু আমার চর যমুনার ফসল…
বন্ধু হইল এই অভাগীর–
মরণ-কালের জল…
দিব তোমায় আবের আয়না-কাঁকই
আরও দিব জলেবাস্যের সাবান…
গানের রসোদ্ধারে আপদ হয়ে দাঁড়াতো আব শব্দটি, তাই রহিমা গানের মাঝেই বুড়োকে প্রশ্ন করে বসতো;
-আব কি দাদা ?
ত্যক্ত বুড়ো রহিমার থুতনি ধরে একটা নাড়া দিয়ে বলতো;
-‘আব কি জানোনা বুবু…হেই উত্তরে আছে হেমালি পর্বত, আসমান তক্ ঠেকছে তার মাথা। হেই পর্বতের বুকে গাছের সবুজ পাতা খাইতে নামে ঐ যে দেখছ সাদা সাদা মেঘ…হেরা; আর হেই ফাঁকে আব শিকারিরা গুলি চালায়। সেই আব থিকা তৈরি হয় আয়না। আগের দিনের রাজা বাশ্শাগর বিবি-কৈন্যারা সোনার বদন আর পানের রসে লাল টুকটুক ঠোঁট দেখত সেই আয়নায়।’

রহিমার মনে ফের আরেকটা ভাবনা মোচড় দেয়, তার দাদার বুকের মধ্যে সে কোন রাজ কন্যা বসত করত…। যার জন্য বুড়া চাঁদমারি রাতে উদাস হয়ে একই গান বার বার গেয়ে যেতো। তবে কি প্রত্যেক পুরুষের বুকে একজন গুপ্তবাসিনী কাল কাটায়! যার অসীম রূপ-লাবন্যে এবং প্রেমের দ্যোতনায় পুরুষের জীবন কাটা মাছের মতো ছটফট করতে-করতে কাটে। ‘আহ…পুরুত না যেন হাইঞ্জার আউয়্যা ফড়িং।’
এই কথা ভাবতে-ভাবতেই রহিমার কল্পচোখে ভাসে রাতের সেই ক্লান্ত পথিকের কায়া আর তার দুরুদুরু বুকে জেগে উঠে এক আনখা আদর।

সন্ধ্যায় ছাদ থেকে শুকনো কাপড় তুলে আনতে গিয়ে সে দেখে আসতো অন্য একটা পৃথিবীর রঙিন খেলা। পশ্চিমে মেঘের মুলুকে ঢলে পড়া সূর্যের গোল মুখ লাল রক্তিম তীর ছুড়ছে সুরমার ডহরে, যেখানে অন্ধকার আর নীল জল এক হয়ে জট তুলছে রহস্যের চাদরে। আর ছোট-ছোট ডিঙি নৌকা সুরমার নিস্তরঙ্গ বুকে মিশে আছে রহিমার মিহি পাঁজরের মতো। তার মনটা আনচান করে ওঠে। এক আজব অনুভূতি তাকে ভয়-ভাবনার জগৎ থেকে উচ্ছেদ করে দিলে, সে নিজেকে উজাড় করে অন্য রকম একটা পৃথিবীতে ভেসে যাবার আকুলতায় ঠক-ঠক শব্দে দাঁত কাটে। বুক চিরে ভেসে আসে অজান্তি কলের সিটি ধ্বনি, কিছু দেবার ও পাবার মতোই বিনিময় মুদ্রা। ঐ রাতের মানুষটাকে…ছন্নছাড়া মানুষটাকে যক্ষের ধনগুলো খুলে-মেলে দিয়ে শীতল করা যায়না…আপন করে বশ মানানোর চেষ্টা করা কি খুবই অলেয্য…অসাধ্যের…; কতকাল সে এই শহরের শিববাড়ি রোডের চার দেওয়ালে বন্দি! রহিমার ভেতরটা এবার সত্যি-সত্যিই কেঁপে ওঠে। সে যেন পৃথিবী সৃষ্টি তক্ গলায় শিকল বাঁধা একটা কুত্তির মতো এই শহরে আটক আছে; দুমুঠো ভাতের জন্য সে কি-না শুনে, আর শরীর, সে কি কম লাথি-গুতো হজম করে ? এই কনক্রিট ঘেরা বনেদি শহরের রুদ্র-রুক্ষ আবহ তাকে নিক্ষেপ করে কল্পনা প্রবর দিগন্তে যেখানে নায়েব-বিবির হিসাবি সংসারের নিরর্থক হম্বিতম্বির প্রেবেশ নিষেধ।

রহিমার গুপ্ত কোঠার কান্জি বালিশ-কাঁথা আর মলিন মশারির উপর হাট-খোলা জানলা এখন সেই নিশিচারী বেগানা পথিকের জন্য যেন অপেক্ষার প্রহর গুনে। প্রথম-প্রথম যার সুর-অস্তিত্বের উপস্থাপনা তাকে ভয়-ভাবনায় নির্জীব করে দিতো কিন্তু আজ সময়প্রবাহে ও কামনার গলি পথ আবিষ্কারের আকাঙ্খায় সেই জলাতংক রোগীর বিকার কেটে গিয়ে এখন তপ্ত উচ্ছাস তার স্নায়ূকে তছনছ করে যায়। মশারির ঝুলকালি আর জানলার গ্রীল গলিয়ে চোখের নেশা তারার সাথে কথা কয়। মেঘের আড়ালে নক্ষত্র-চূঁয়া আলোয় ঐ মানুষটার আদল খুঁজে-খুঁজে ব্যর্থতায় লবেজান হয়। বুকের ভিতর ঢিপ-ঢিপ শব্দ আর হাড়ের ওপর জেগে থাকা ছোট কদবেলাকার স্তনের বোঁটায় তর্জনী ঘুরে আসে, তার সেই নির্লজ্জ আকাঙ্খা দেখে শরমে চাঁদের মুখ মেঘের তলে লুকাতে চায়। আকাশের ডান-বাম পেট ফুঁড়ে বিজলী কাটে প্রচন্ড ব্যস্ততায় তার সাথে দূরে কোথাও বিকট শব্দে বাজ পড়ে। তিরতিরে বাতাস হঠাৎ প্রবল হয়ে সোঁ-সোঁ শব্দে ছুটতে থাকে। নদীর তীরের গাছ-পালা ভেঙে ঝড় রূপকথার সেপাই হয়ে খবর দেয় বৃষ্টি-বাদলার। প্রকৃতির সকল সাক্ষ্য-বিবাদ উপেক্ষা করে ফ্যাক্টরির শেষ সিফটের বাঁশিও বেজে ওঠে।

রহিমা তড়াক করে উঠে দাঁড়ায়, এই ঝড়-জলের রাতে লোকটার যে ফেরার সময় হলো। একটা প্রচন্ড কষ্ট তার বুকের আগাড়-নিগাড়ে ছুটা-ছুটি শুরু করে দিলে সে গ্রীলে মাথা ঠেকিয়ে দূরের পথে চেয়ে থাকে। টিলার উপর ফাঁকা শিব মন্দিরের বারান্দার বাল্ব বাতাসের ঝাপটায় জোনাক পোকা হয়ে নাচছে। ঠিক তখনি দ্বিতীয় বাজটা বিজলী কেটে হড়-হড় শব্দে ফেটে পড়ে। রফিমা বেগানা এক মরদের জন্য চোখের জলধারাকে প্রলম্বিত হতে দিয়ে তৃপ্তির জারকে ঘেমে ওঠে।

উদ্ধেল রহিমা অবাক হয়, বেগানা মরদ যার অবোধ্য গানের সুর-লহরি ছাড়া সে যে লোকটার বিন্দুবিসর্গও জানেনা, তার জন্য বুকে কেন এত দরদ? তবে কি তার কাঙালিনী জীবন রসহীন সময়ের সাথে ঠোকাঠুকি করে একেবারেই নিঃস্ব হয়ে গেলো? বিজলির ক্ষণিক আলোয় পতিত দিগন্ত আর উলোল সুরমার বিস্তৃত ডহর স্পষ্ট নজরে আসে। যত দূর দৃষ্টি যায় শুধু বিক্ষুব্ধ ঢেউ, পানির উপর কুয়াশার মতো ঘোলাটে আবরণ অশান্ত সেই জলরাশিকে আরও বেশি দূর্দান্ত করে তুলেছে। রহিমা আবার চমকে ওঠে; এই দুর্যোগের রাতেও কি সে ফিরবে রোজকার মতো?

কে একজন ছুটতে-ছুটতে রহিমার নজরের ত্রিসীমানা অতিক্রম করে গেলো। সে কিছুটা অবাক হয়ে সেই পথিকে লক্ষ্য করে। সুরহীন পথচারীর মধ্যে কাঙ্খিত ব্যক্তির কায়া-কানুন উদ্ধারের ব্যর্থ চেষ্টা তাকে নাজেহাল করে। তারপর দীর্ঘ সময় ঝড়-ঝাপটার পাঞ্জা লড়া দেখে মনের ক্লান্তি ধাবিয়ে রাখার জন্য সে সিদ্ধান্তে আসে, ঐ মানুষটা প্রাণের তোয়াক্কা করে না; সুরের পূজারি দ্বিধাহীন নির্ভিক আরও অনেক গুনের কীর্তন তার সমস্ত শরীর জুরে নতুন করে কোলাহল তোলে। রহিমার বুকের ভেতর কাম ও উদ্ধেগ শির শির করে চোখে হানা দিলে আনখা ভালোবাসার উদ্বায়ী বাষ্পগুলো দরদকে সাথে টানে, তাতে একটি সাহসী প্রতীজ্ঞা তার ঠোঁটে বাঁকা চাঁদের মতো অতুল মহিমা জাগায়।

রাতের গভীর অন্ধকারে বাতাসের ধস্তাধস্তি থেমে গিয়ে আকাশ মেঘ মুক্ত হলে রেজগি বৃষ্টির ভেতর দূর হতে গানের সুর ভেসে আসে। রহিমার তাবৎ ইন্দ্রীয় ঝাঁকি দিয়ে বিগড়ে যাওয়া ইঞ্জিনের মতো ঠক ঠক করে কাঁপতে শুরু করে। আগের সকল প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিরেট স্বপ্নকথা হয়ে জ্যান্ত রহিমা মরার মত গ্রীল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখের সমুখ দিয়ে কাঙ্খিত লোকটি অন্যদিনের মতো ঢিলে পায়ে টলতে-টলতে কাকভেজা শরীরে চলে যায়।

নিজেকে অপদার্থ বেকুব ভাবতে-ভাবতে সে বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ রাখার তালিম দেয়, কিন্তু চলমান ভাবনার ফুলকিগুলো তাকে থিতু হতে দেয় না। ঐ যে মানুষটা গেলো, তার অন্তরে কী এমন দুঃখের দরিয়া যে, তাকে এই আপদের রাতেও একই সবকের শোলোক সন্ধানে ফিরতে হয়!

রাত ভোর হয়। রহিমার ধিঙ্গি শরীরের ফুঁসে-ওঠা হাড়গোড়-রক্তের তপ্ত স্রোতের মধ্য থেকে রাজপুত্র ক্ষণিক বিরতির পর্দা টেনে অন্তরালে ডুবে যায়। তার বড়-বড় লম্বা দাঁতের হলদে পাটি ফাঁক হয়ে মশারির ভেতরের ঘোলাটে আলোয় বোঁটকা বাতাসের সাথে সখ্যতা বাড়ায়। এই তপ্ত গুহার ঠাসা অন্ধকারে একটু উ তার আবদার নিয়ে ঘরের বেড়াল-দম্পতিও তার গা ঘেষা হয়।

রোপওয়ে সরবে সচল হলে ঘুমের প্রথম ও গভীর আস্তর উঠে যায়। দ্বিতীয় বার নায়েব-বিবির বিকট হুঙ্কার ঘুমকে আরও রোগা করে দেয়। তাতে বিবির পেশাবের সম সম শব্দ ঘুমের পাতলা খোসা গলিয়ে কানের গর্তে কাটুস-কুটুস করে কামড় বসায় আর তখনি রহিমা চোখ খুলে তেলেসমাতি আন্দাজে আনতে গেলে, নায়েবের পেশাবের তীক্ষè চিন-চিন-শিস শব্দে তার রক্তে দপকরে আগুন জ্বলে ওঠে এবং তাতে বুকের ভেতর স্তব্ধতার পরিবর্তে আগুনের চচ্চড়, চোখের মণিতে দলা দলা ঘুমের বদলে মাদকতামিশ্রিত তীব্র ঔজ্জ্বল্য ঢুকে যায়। সে শরীরের সবখানে বিছার কামড়ের জ্বালা বোধ করে এবং সেই সাথে এক প্রকার রাক্ষুসে উন্মাদনা তাকে খাক করতে থাকে, যা উসুল করার দস্তুর দাওয়াই তার নাগালে না-থাকায় সে নায়েব বিবির বিশেষ অঙ্গকে খাল বলে তিরষ্কারে জ্বলে ওঠে এবং সেই সাথে সাহেবের চিনচিনা-তীক্ষ্ণ শব্দকে মনের গলিতে ছেড়ে দিয়ে চোখ খুলে মশারির উর্ধ্ব পটে রাতের মানুষটার মুখ কল্পনা করার আগেই, উল্টো দিক হতে মাঝারি সাইজের একটা লাথি তার পাছায় পড়লে সে বুঝতে পারে কিসকি স্বপ্ন রেখে তাকে এখন ডেক-ডেকচি এবং সাহেব-বিবির বাসি কাপড় ধুতে হবে।

ফের বিকালে ছাদে উঠে রহিমা অবাক হয় শান্ত সুরমার বুক আর দূরে সবুজ পাহাড়ের পরিচ্ছন্ন সুষমা দেখে। ফুরফুরে বাতাস নদীর মগ্ন-অতল জলে পলকা ঢেউ তুলে খুশির দেমাগি হাসিটাকে দু’ পারে ছড়িয়ে দিচ্ছে। মাঝে-মধ্যে নদীর পারে পাথরের স্তুপ, চারপাশে থৈ থৈ পানি, যেন ছোট ছোট দ্বীপমালা আর পানির স্রোত, সে-তো তাদের পা হাঁটু তক ধুয়ে যাচ্ছে একান্ত আদরে। দূর গ্রামান্তে সারি সারি সবুজ টিলার সাথে এক হয়ে আরও দূরে বিরাট পাহাড়ের পাদদেশ হতে ধীরে ধীরে উঠে গেছে মেঘের তালুকে। সমস্ত আকাশ-জমিন নীল-সবুজে একাকার। এখানে যে এত মানুষ, বিচিত্র সুখ-দুঃখে হাসে-কাঁদে, কুটিলতায় ফোঁসে ওঠে আবার কপট হীনতায় ছোবল মারে; সাধ্য কই যে রহিমা এই স্বপ্নছায়ার দেশে তার তালাশ পায়! দারুখাওয়া ঘোরচোখে সে সিঁড়ি টপকে ফিরে আসে; নায়েব-বিবির রুক্ষ ভাষা, চোখের কটকটে দৃষ্টিশেল তাকে খুব কমই নাগাল পায়।

রহিমা যন্ত্রের মতো গেরস্থালি দায় সারে আর বুকের রোদন আগলে রাখে মাঝ রাতের সুরের জন্য। ঐ মত্ত মানুষ এখন তার হাড়গিলে গতরটার মতো কতই না চেনা, যার জন্য সে এমন করে দিনভর বেঁচে থাকে। বাদলাহীন আষাঢ়ের চাঁদনী রাত গ্রীল থেকে লাফিয়ে রহিমার মশারির পেট ফুঁরে বালিশ-খ্যাতায় আহ্লাদের জোয়ার আনে। একটা ধেঁরে ইঁদুর কিচকিচ করে মশারির চারদিকে ঘুরে যায়, কয়টা আরশোলা ভয়ে ফর ফর শব্দে উড়তে থাকলে সে লম্বা করে হাই তোলে। বিছানার ভারী বাতাস তার খর নিঃশ্বাসে এই গুপ্ত কোঠার কোণায়-কাণায় আতরের সুবাস হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। রহিমার শরীর আদিম ক্রোধের বিষাক্ত ছোবলে মোচড়ে উঠলে শিরদাঁড়া মটমট শব্দে ক্ষেপে ওঠে আর সে গোপন ভাষা তার দেহকান্ডকে ধনুকের ছিলার মতো মুহূর্তে বাঁকিয়ে ফের বিছানায় উল্টে-পাল্টে আড়াই পাক দিয়ে স্থির করে দেয়। পিট পিট করে চোখের পাতা বার কয় নেচে থেমে গেলে সে ঠোঁট জোড়া সূাঁচালো করে শব্দ তোলে; বাঁ হাতে আঁচল টেনে একবার নাকের পাটা ঘঁষে নেয়ে। ক্ষার-ধোয়া শাড়ির কষা গন্ধে মনে বিষাদের ছায়া পড়ে আর তখনি একটু টেলকম পাউডারের জন্য তার মনে আক্ষেপ শুরু হয়। মনে উঁকি দেয়, চোখের কাজল আর নাক ফুলের কথা। ও সব হলে আঁখির রোশনি, নাকের শোভা কতটা বেশি হতো তা নিয়ে সে ভাবতে বসে।

এক টুকরো ঘন কালো মেঘ চাঁদের মুখে চেপে বসলে তার আন্ধি-ছায়া বাঁশঝাড় এবং রেনট্রির ডাল-পাতার নাক-মুখ বেয়ে রহিমার জানলায় বিষন্নতার দূতালি করে। সে খুব কাতর চোখে একবার আকাশ দেখে হাতের আঙুল মটকে বিছানার দু’ দিকে হাত দ’ুটো ফেলে দেয়। ঘারের নিচে একটা পিঁপড়ে বালিশ আর শরীরের দূরত্বটার সুবিধা ভোগ করার মৌকা পেয়ে কুটকুট করে কামড় বসায়; কিন্তু রহিমার সে দিকে খেয়াল নেই, ঐ রাতচারী মানুষটার কথা ভাবতে-ভাবতেইতো সে থৈ পাচ্ছে না।

রহিমা মশারির পার তুলে গ্রীল ধরে দাঁড়ায়। জানলার চৌকাঠে যৌবন ঠেকিয়ে অপেক্ষা করে আর তার মনের ভেতর আশনা-বাসনার ছবিগুলো স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে।

ফ্যাক্টরির শেষ বাঁশি বড় বেশি তীক্ষèতায় বেজে উঠলে তার প ইন্দ্রিয় আরেকবার ঝাঁকি খেয়ে থরথরি জিকির তুলে। চাঁদের মিহি আলো পরিচিত ভালো-মন্দের প্রতিবেশকে নতুন করে সাজিয়ে দিয়েছে এখন শুধু স্বপ্নের এই অচিন পুরীতে অপেক্ষর প্রহর গোনা, কে একজন কথা দিয়েছে আসবে বলে।

সুরমার ঝকঝকে মসৃণ বুক থেকে একটা ক্ষীণ বাতাস পানির আঁশটে গন্ধ আর মিহি সুরের স্বপ্নছটা নিয়ে রহিমার কণ্ঠাহাড় আর নিচের উদলা অংশে আদর দিয়ে যায়। কয়টা রুক্ষ চুল গালের চাগিয়ে-ওঠা হাড়ে উজবুকের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এই অধৈর্য-অপেক্ষার মুহূর্তে সে বেশ আন্দাজ করতে পাড়ে নিঃশ্বাসের উত্তাপ পারদের মতো লাফিয়ে বাড়ছে আর বুকের ঢিব ঢিব শব্দ ও শরীরের কম্প-কোলাহল সব কিছুকে ছাপিয়ে বাড়ছে।

যাদুর মতো অবোধ্য সুরের রেশ যেন চারপাশের তাবৎ প্রকৃতিকে নিথর করে দিয়ে সেই জমাট বাঁধা স্তব্ধতার ভেতর বিলি কেটে কেটে ছড়িয়ে পড়ছে! রহিমা নিঃশ্বাস চেপে বুঝতে চেষ্টা করে গানের ভাষা ও পয়ার কিন্তু তার সকল তদবিরকে বিফল করে দিয়ে কিছু বুঝার আগেই বাতাসে মিলিয়ে যায় কথাকলি, জন্মান্তরের পরিচিত সুরের লহর অথচ নিত্যনতুন আবহ উন্মাদনা ধরতে-ধরতেই হারিয়ে যায় ব্যাকুল চরাচরে। নিজের অজান্তে চোখের জলে রহিমার দু’ গাল ভিজে ওঠে; কী কষ্ট…আহা কী কষ্ট…কী কষ্টে মানুষ এমন করে বুকের হুতাশনকে ছড়িয়ে দেয় সুরে সুরে! কী এমন বেদনা যার বোঝা একাই বইতে হয় চৌপরি দিন আর রাতের পৈঠায় যাদুর সুর হয়ে উড়াল দেয়। হাজার জিজ্ঞাসা কোঁচের ফলা হয়ে তাকে ছিন্নভিন্ন করে যায়। অভাগীর ধিঙ্গি শরীর পড়ে থাকে গ্রীল ধরে কিন্তু চিরকাল বি ত উপাসী মন ছুটে যায় রাস্তায়, যেন চুমোয় চুমোয় ভাসিয়ে দেয় মানুষটার ক্লান্ত মুখ।

এলেবেলে ভাবনা আর আবেগের উচ্ছাস তাকে আনমনা করে দিয়েছে, যার জন্য সে হঠাৎ দেখে সুরের মিহি মন্থর গতি একঠায় হতে ভেসে আসছে। সমস্ত চেতনা দিয়ে সে লক্ষ করে অবাক হয়, লোকটা তার জানলার কাছে এসে তারই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সুর টানছে। রহিমার হাত-পা খুব জোরে-জোরে কাঁপতে থাকে এবং চোখের আলো নিবু-নিবু হয়ে সব কিছু ঝাপসা ঠেকে। এমন ধারায় কতক্ষণ কাটে সে উদ্দিশ রহিমার থাকে না। হুঁশ ফেরে বৃষ্টির টাপুর-টুপুর শব্দে; চাঁদের রোশনি পালিয়ে গিয়ে কখন ঝাঁক-ঝাঁক কালো মেঘ সমস্ত আকাশ দখল করে নিয়েছে তাও তার মালুমে আসে না। রহিমার ভাঙা হৃদয় টলে ওঠে; এখন স্বপ্নের রাজ্য ভরা ঘুটঘুটে কালো পলেস্তরা, থৈ থৈ রহস্য। সুরের যাদুকর কখন কোন পথে পালিয়ে গেছে তার আলভোলা মন সে সন্ধানও রাখেনি। স্বপ্নঠাসা চোখে অসীম অন্ধকার নিয়ে মশারির ভেতর সে হাঁসফাঁস করে।

বৃষ্টির শব্দ টাপুস-টুপুস হতে রিমঝিম ধারায় চলে এসেছে এবং সাঁই-সাঁই বাতাস জানলা দিয়ে ঢুকে মশারিকে ঠেলে খলবলিয়ে উঠছে। কড়…কড়…কড়াৎ শব্দে বাজ পড়ে আর বিজলির চমক এফোড়-ওফোড় করে ছুটে গেলে রহিমার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে, গালের নোনতা ধারা শুকিয়ে চুড় চুড় করে চুলকালে সে হাতের তালুতে ডিম ঘষার মতো একবার গাল দু’টো ঘঁষে নেয়।

এখন শান্ত সুরমার মতো তার উষ্ণ বুকটা এক ছন্দে শব্দ করছে। রহিমা কোমল হাতে গলার মোটা রগ দু’টো পরখ করে কন্ঠাহাড়ের বেমানান উচ্চতা ছোঁয়ে দেখে এক-দুই-তিন বলে তিনটা বক্ষপাঁজর গুনে বাম স্তনের উপর হাত রাখে। আকার খুব ছোট নয় ফের বড়ও নয়-এই কথা ভাবতে-ভাবতে শিহরিত দেহ-মনের মধ্যে নায়েব সাহেবের পেশাবের তীক্ষ্ণ শব্দের কথা বার কয় ঝিলিক দিয়ে ওঠে, তাতে দেহের সবখানে একটা উৎকট অনুভূতি দৌড়া-দৌড়ি শুরু করলে সে হাল ছেড়ে দেবার মতো করে বালিশে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে।

বৃষ্টি এখন ঝমঝম শব্দে পৃথিবীকে ভাসিয়ে দেবার উগ্র ইচ্ছা প্রকাশ করছে, বড় বড় ফোঁটা জানলার কপাটে আছড়ে পড়ে ভেঙেচুরে অন্যদের পিঠে চড়ে চৈ চৈ বাহানায় ছিটকে যাচ্ছে। আকাশ-মাটি তার মধ্যখানে গভীর কালো অন্ধকারের সমুদ্রে ডুবে যেতে-যেতে রহিমা ‘এত আইন্ধ্যার…এত আইন্ধ্যার…’ এই কথা উচ্চারণ করলে তার রেশ মগজের কোঠায়-কোঠায় সিমেন্ট ফ্যাক্টরির বেসুরা ঘড়ঘড়ানীর মতো ঘুরতে থাকে।

কটিতে মশায় কামড় দিলে রহিমা বাঁ হাতে আস্তে করে থাবর দিয়ে ঘষতে থাকে, তাতে চুচ্চুড়ে জ্বালাটা কমলেও জায়গাটা আলগোছে ফোলে ওঠে, তার আঙুলের ডগা ফোলা জায়গাটায় নরম আদরে ঘুরেফিরে তলপেট হয়ে ফের উপরে উঠতে থাকে, প্রবালের মত কঠিন-কোমল-উষ্ণ কদবেলের পাদদেশ ছুঁয়ে নায়েব-বিবির সকল সৌন্দর্য-সম্পদ ও ঝুলে পড়া স্তনের পাশে তার খাড়া দেমাগি বুক-জোড়ার তূল্য চিত্র কল্পনা করে সমুদয় ব্যর্থতার মধ্যেও, এই পরগাছা জীবনে এক অদ্ভুদ তৃপ্তিতে শান্তনা আসে আর ঠিক তখনি একটা বিশাল আয়নায় নিজেকে পরিপূর্ণরূপে দেখার ইচ্ছাটাও ছাগল ছানার মত বুকের ভেতর লম্ফ-ঝম্ফ শুরু করে।

রহিমা বন্ধ চোখে টের পায় বৃষ্টি এখন জানলার কপাটে ঝমর ঝমর নাচ তুলছে, সেই সাথে বাতাসের একটানা সাঁ সাঁ রব ঐ মানুষটার গানের মতোই সুরেলা। সে বেশ আরাম করে আড়মোড়া ভেঙে ঘুমের উজ্জোগ করে, এ ঠিক ঘুমের জন্য চিত্ত-কলা নয়, তারচে’ বেশ গানের আদলে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা।

দীর্ঘ সময় একই সুর একটানা চলার পর বাতাস ও বৃষ্টি তাল পাল্টে আরো কড়া ছন্দে উচ্চ মার্গে লাফিয়ে ওঠে। রহিমা তন্দ্রার ভেতর যেন দেখতে পায় সেই লোকটা এখন জানলার গ্রীল ধরে তাকেই খুশি করার জন্য নানান তালের গান ধরছে। সকল প্রকার সুর সেধেও মানুষটা যখন তার বন্ধ চোখের পাতা খুলতে অপারগ হয় তখন ক্রুদ্ধ হয়ে লোকটা তার শীর্ণ অথচ শক্ত, পাতলা তথাপি বলশালী হাত দুটো দিয়ে রহিমার একমাত্র সম্পদ এবং তার সকল অনন্দ ও গর্বের উৎস খাড়া খাড়া স্তন দুটো উপড়ে নিতে উদ্ধত হলে সে একটা কঠিন চোট খেয়ে লাফিয়ে ওঠে।

যখন রহিমা বুঝতে পারে ফালতু স্বপ্ন; ঠাহর পায় বৃষ্টির জলে ঘর ভেসে যাচ্ছে আর জানলার কপাট দু’টো বাতাসের তান্ডবে দ্রিম দ্রিম শব্দে ফেটে পড়ছে। সমস্ত আকাশ জুড়ে বিজলির চমক আর ঠাঠার হুঙ্কারে পৃথিবী ঘোর কিয়ামতের লীলায় মত্ত। আশপাশের ছোট-ছোট টিনশেড-ঘুপচিঘর ছিঁড়ে বাঁশ ও টিন উড়ছে। নদীর দিক থেকে ভেসে আসছে হৈ-চৈ আর আর্ত চিৎকার, উল্টো দিকে নায়েব-বিবির খেড়খেড়ে গলায় ‘রহিমা…রহিমা’ বলে, একটানা ডাক তাকে খুব জব্দ করে দিলে সে ঠাস করে জানলার কপাট বন্ধ করে দেয়।

পরদিন দুপুর নাগাদ ফুঁসে-ওঠা সুরমার ঘোলা বুক আর বৃষ্টি-বাতাসের আউড়ি-বাউড়ি শা›ত হয়ে আসে। শহরের ঘরহারা মানুষের আতঙ্ক বেদনায় গলে স্তব্ধতা নেমে আসে। নদী ঘেঁষা ছোট-ছোট টং দোকাগুলোর অর্ধেকেই ডুবে গেছে, সেই সাথে বেশ কটা পাকা দোকান ধেবে গিয়ে মানুষের কষ্ট আর প্রকৃতির মাতলামি একাট্টায় ফুটে উঠেছে।

বিকেলের নরম রোদে সুরমা আবার সুন্দরী যুরতীর মতো ডগমগ হয়ে ওঠে। সারা আকাশ জুড়ে অসম্ভব নীলের খেলা। পাহাড় এবং নদীর মাঝের ছায়া-ঘেরা গ্রামগুলো সন্নাসীর মতো উদার হয়ে বসে আছে। রহিমার অনেক রাতের অল্প ঘুমের কষ্ট আর জিবের কাষটে লাগা এবং চোখের নিচের চিনচিনে জ্বলুনিটাও মিলিয়ে যায় এই পবিত্র নীল-সবুজের ছোঁয়া পেয়ে।

শহরের সবাই খুব ভালো করে খেয়ে-দেয়ে সস্থিরে টানা ঘুম দিয়েছে এমন শান্ত ধারায় রাত গভীর হয়। প্রতিজ্ঞায় অটল রহিমা জানলার গ্রীলে মাথা ঠেকিয়ে অপেক্ষা করে; চাঁদের দুধেলা আলোয় ফুরফুরে বাতাস গাছের পাতায়-পাতায় তলবলে ঢেউ খেলায়। রহিমার শরীরে আগুনের স্রোত গতরাতের সুরমার মতো উত্তাল হলে রক্তে বেলাজ তৃষ্ণা উমালির সহবত খোঁজে। বুকের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে দীর্ঘপদে ক্ষণে-ক্ষণে লহরময় আগুন নিয়ে ছুটে আসে। জ্বলন্ত আংড়ার মতো সে উত্তাপ ভাগীদারের সন্ধানে জানলা দিয়ে লাফিয়ে সুরমার ডহরের দিকে ছুটতে চাইলে রহিমার ছেনালী ইচ্ছা ভালোবাসার দেড়পাট্টায় পোক্তভাবে চেপে বসে।

ফ্যাক্টরির শেষ বাঁশি বেজে উঠলে রহিমা পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে চেষ্টা করে, কিন্তু তার হাত-পা মৃগী রোগীর মতো কাঁপতে-কাঁপতে মাথা গড়িয়ে বালিশের কাছে পড়ে যেতে চাইলে সে জানলার চৌকাঠে বুক ঠেসে অপেক্ষা করে।

বাতাস আসে নদীর জলের আঁশটে গন্ধ নিয়ে, কিন্তু সুর আসে না। রহিমা অবাক হয়ে হতাশায় ভেঙে পড়ে। মানুষটার জন্য দরদের পরিবর্তে রাগ উদ্যত ফণা তুলে ফুঁসতে থাকে। অস্থিরতা তাড়াবার জন্য সড়ক থেকে চোখ সরিয়ে বারান্দার ছায়ায় তাকাতেই তার বুকটা ছাৎ করে ওঠে। মানুষটা তার কাছেই বারান্দার থাম ঘেঁষে চোরের মত দাঁড়িয়ে আছে। সুরের পুজারীর এহেন চাতুরী রহিমার মনকে আঘাত করে। একটা বাউড়ি বাতাস কিছু ঝাঁঝালো গন্ধের ঝাপটা দিয়ে যায়। সে লোকটাকে কাছে ডাকতে চাইলে গলার স্বর ফোটে না, কে যেন শক্ত দড়ি দিয়ে ফাঁস টেনেছে; নিজের অজান্তে একটা হাত তুলে ইশারা দিতেই ছায়ামুর্তি এলোমেলো পায়ে গ্রীলের কাছে চলে আসে। রহিমা যন্ত্রের মতো ডান হাত দিয়ে মানুষটার একটা শীর্ণ হাত খপ করে ধরে অন্য হাতে মাথার রুক্ষ চুলগুলো হাতড়ে-হাতড়ে বুকের সকল দরদের উত্তাপ ঢেলে দেয় চুল-মাথা-মগজের আনাচে-কানাচে। অসম্ভব আবেগে বন্ধ হয়ে আসা গলা চিরে একরাশ হাহাকারের সাথে প্রশ্ন ছোঁড়ে;‘আফনার খুব দুক্…বুক ভরা দুঃক্কু ভুলার জইন্যে আফনে…যাদুর সুরে গান করইন…পাগল সুরের আগুনে আমি যে কত দিন জ্বলতাছি…একবার যুদিন কইতেন কিগো আফনেরে…’
লোকটার শরীরের পচা গন্ধে আর হাতের অস্থিরতায় রহিমা কথার খেই হারিয়ে ফেলে কিন্তু মদের গন্ধ তাকে আরো বেশি উৎসাহী করে তোলে‘দিলের দাগা ভুলবার জইন্যে আফনে মদ খান…আমি সব দিমু…আফনে কওকা কিগো আফনেরে দাগা দিছে’
রহিমা বুকের নরম মাংশপিতে লোকটার কঠিন হাতের বিচ্ছিরি পাঁচটা আঙুলের নিষ্ঠুর খেলা তুচ্ছ করে অপেক্ষায় থাকে জবাব শোনার জন্য। তার সমস্ত চেতনা উপুড় হয়ে পড়ে লোকটার ঠোঁটের দিকে, আস্তে-আস্তে ফাঁক হয়ে যাওয়া দুই ঠোঁটের মাঝে আছড়ে পড়া চাঁদের আলোয় সে দিব্যি দেখে, সামনের তিনটা দাঁত নাই; ফাঁকা জায়গায় তার গুপ্ত কোঠার গভীর অন্ধকার ওৎ পেতে আছে আর মুখের ভাঁজ খাওয়া চামড়ায় সাদা-কালো খোঁচ-খোঁচা দাড়ি চোরা চোখে তার দিকে চেয়ে যেন শান দিচ্ছে। নতুন আবিষ্কারের তীব্র ছোবলের ঝাঁঝ মগজের কোষে ডান্ডা মেরে তার বারো রবির জ্বালাকে শীতল করে দেবার আগেই লোকটা বলতে থাকে-‘দিনমান ফ্যাক্টোরির চাক্কা ঠেলি, রাইতকো মনডা চায় একটু সরস অইতে। মানুষের হ¹ল দিন কি সমান যায়, দ্যাহনা আল্লার সংসারে কত রাইত-কাইত-হাইঞ্জা-মাদান, একেক সময়ের একেক মরতুবা। আর কিগোর পুরি আমারে দুঃক্কু দিত, আমার কি বালডা আছে, নিজেইত্ত বনহা মাগীডারে খেদায়া দিছি।’

রহিমার চোখের তারার সকল স্বপ্ন, বুকের অতৃপ্ত খায়েশ তিলেকে ভাজা কড়াইয়ের ছ্যাকছ্যাক শব্দের মতো জ্বলে ওঠে, আকাশের তাবৎ রং-ফ্যাশান-জোছনার ঘোর, হাবিয়ার আগুনের মতো দপদপ করে। সে বোবার মতো গোঙাতে-গোঙাতে লোকটার হাত তার বুক থেকে সরিয়ে জোরে ঠেলে দিতেই মানুষটা দূরে ছিটকে পড়ে। রহিমা কোনো দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে ঠাস শব্দে খিড়কির কপাটে ছিটকানি তুলে দিয়ে বিছানায় আছড়ে পড়ে।

স্বপ্নহীন এক নিষ্ঠুর গুহা ঘরের অন্ধকারে তলিয়ে যেতে-যেতে প্রাণদায়ী এক ফোঁটা বাতাসের জন্য তার বুক যখন হাপড়ের মতো টানছে তখন জানলার কপাট ফুঁড়ে ফের আসতে থাকে সেই পরিচিত অবোধ্য সুর লহড়ি, কিন্তু রহিমা সেই গানের মধ্যে কোনো স্বপ্নের জমিন না পেয়ে পাগলের মতো না…না…শব্দে বালিশের উপর মাথা ডান-বামে ছুঁড়তে থাকে।

 

লেখক পরিচিতি:

কথাশিল্পী শেখ লুৎফুরের জন্ম ব্রহ্মপুত্রের পলল মাটির ময়মনসিংহে।                                                                                                  শিক্ষকতার কর্মসূত্রে বসবাস করছেন সিলেটের জগন্নাথপুর।                                                                                                                লেখালেখির নির্জন জগতের নির্জন মানুষ তিনি। জনপদের আখ্যানকে                                                                                                নিজস্ব দৃষ্টি ও ভাষায় প্রকাশ করছেন। তাঁর প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ- ‘উল্টোরথে’, ‘ভাতবউ’;                                                                          উপন্যাসগ্রন্থ- ‘আত্মজীবনীর দিবারাত্র’ ‘কালো মাটির নিশ্বাস’ ‘সুতিয়া নদীর বাঁকে’

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

মাতাল ঘূর্ণী | শেখ লুৎফর

Fri Jul 9 , 2021
মাতাল ঘূর্ণী | শেখ লুৎফর 🌱 আরমান আজও এল না; না বিল পাড়ে, না গাঙ পাড়ে। পলি রুরোদ্যমান। তার টলমলে চোখের মণিতে প্রাণময় বিকালটা এক মোচড়ে অন্ধকার হয়ে ওঠে। দূরে কোথাও জলমগ্ন বিলের ডহরে একটা কুড়া-পক্ষীর গলা আর্ত-হাহাকারে, ক্ষণে ক্ষণে চৌচির হচ্ছে। পলিদের বাড়িটার ডাইনে নদী, বাঁয়ে বিল; রোদ পড়লেই […]