মাতাল ঘূর্ণী | শেখ লুৎফর

মাতাল ঘূর্ণী | শেখ লুৎফর

🌱

আরমান আজও এল না; না বিল পাড়ে, না গাঙ পাড়ে।
পলি রুরোদ্যমান। তার টলমলে চোখের মণিতে প্রাণময় বিকালটা এক মোচড়ে অন্ধকার হয়ে ওঠে। দূরে কোথাও জলমগ্ন বিলের ডহরে একটা কুড়া-পক্ষীর গলা আর্ত-হাহাকারে, ক্ষণে ক্ষণে চৌচির হচ্ছে।

পলিদের বাড়িটার ডাইনে নদী, বাঁয়ে বিল; রোদ পড়লেই ঝিলমিল। নদীর পারে মস্ত একটা জারুল গাছ, তার নীলচে ফুলের বাহানায় পলির বুকে সময় সময় কাব্য গোঙায়। পাশেই একটা বুড়ো শেওড়া; তার ভূতুড়ে জাফরিখানা অষ্টপ্রহর ডর দেখায়।

কৈশোর উত্তীর্ণ পলির তাগা-বাঁধা পুরুষ্ট বেণীটা মাঝ পিঠে। শরীর দ্রুত দাবি করছে কাপড়ের বর্ধিত পরিসীমা। দুনিয়ার যে দিকেই চোখ যায়, অপার ভাললাগায় মৌটুসি পাখির মতো মনটা নেচে ওঠে।

আজ পলির মুঠিতে দড়কচা লেবুপাতা, নাকে-মুখে উপচে-পড়া বমনের সংকেত। এখন আর আরমানের বাঁশি নয়, এট্টুখানি তারে দরকার। ও দিকে তার মা-পলি পলি করে তিন-চারটা ডাক দিয়ে হামলে পড়ে।
আমার কী সব্বনাশ অইলরে কালা মুরগীডা বুঝি হিয়ালে নিছেগা!
পলির মায়ের চিরে-চণ্ডাল চিৎকারে বিলের বুক বরাবর ঘনিয়ে আসা সূর্যাস্তের বিমূর্ত ছবিটা খান খান হয়ে যায় ।

দিশা-বিশাহীন মেয়েটার হৃদয় ভয়-বিভ্রান্তিতে কুঁকড়ে আসে। তার জীবনের ছোট্ট পেয়ালাটায় মধু জমবার আগেই উথলে উঠেছে গরল। সে এখন তিন মাসের হামিল। তাই তার চোখে আলোকময়ী পৃথিবী আজ ভয়াবহ কুটিল।

মা বদনায় ওজুর পানি নিয়ে বসতেই পলি তার সামনে পড়ে যায়। মায়ের চোখে আবিল সন্দেহ দাঁতের নিচের কাঁকড়ের মতো কড়মড়ায়। দিনতিনেক আগেও মা তাকে একান্তে কৈ-মাছের মতো খেঁচে ধরেছিল।
গেল মাসেরটা অহনঅ বুঝি অইছে না?
খাবি খেতে খেতে কোনো-মতে সে জবাব দেয়।
-কী যে কও!
মা কিন্তুক…কিন্তুক…করেও আটকে যায়। মায়ের গলার সেই আশঙ্কা এত দিন ধরে চেপে রাখা তার লজ্জাটিকে এখন মৃত্যুহিমে উত্তীর্ণ করে।

ছোটভাই বুলু দু’টো ফড়িং ধরে ছুটতে ছুটতে আসে। তার গলায় মানিক-প্রাপ্তির উত্তেজনা।
বুবু…বুবুরে…এই যে দ্যাখ।
সন্ধ্যার রোগাটে অন্ধকারে ভাইয়ের মাঝে নিজের শৈশব একদফায় ঝিকিয়ে ওঠে। সেই গলানো আবেগে পলির হাতের কচলানু লেবুপাতাও পায়ের কাছে গড়িয়ে পড়ে।

বাড়ির ডাইনে নদী। সূর্যের অন্তিম প্রক্রিয়া প্রায় শেষ; তাই হোসেনের তাজা খুন আসমান থেকে গলে গলে নদীর জলে খাচ্ছে হাবুডুবু। নদীপারের বাঁশবনের গুমুট অন্ধকার পিছলে-পিছলে ঘিরে ধরছে চারপাশ। পলির তলপেটের অবোধ-আন্ধা মানিকটাও তার নিবিড় স্পন্দনে সেই গুটিগুটি প্রদোষ-কালকে যেন প্রগাঢ় আমন্ত্রণে জটিল করে ।

বুলু বই-খাতা নিয়ে টেবিলে বসে। হারিকেনের ম্যাড়ম্যাড়া আলোয় চৌকি, চেয়ার, টেবিলের তলায় কোণঠাসা অন্ধকার ধাউড়ের মতো ঘাপটি মেরে থাকে। গুহাতুল্য মাটির ঘরটার স্যাঁতস্যাঁতে জংলি গন্ধটা এতদিন স্থাবর সম্পত্তির মতো ছিল, আজ তার আলে-ডালে যেন কিি ত বদল ঘটে গেছে ! তাই বুলুর শরীর থেকে ভলকে ভলকে পাকা তালের মতো একটা ঘ্রাণ বেরুচ্ছে। পেছন থেকে ভাইটার ঘাড়-পিঠ তার মায়ের মতো লাগে। বাড়ন্ত শরীরের রোগা গড়নে, গৌরবর্ণের কি ত আভাসে প্রাণবন্ত বুলু। বাইরে বাংলার গ্রাম, ক্রুর অন্ধকারের ক্ষুধার্ত মিছিলে ভেসে বেড়ায় ঝিঁঝিঁ পোকার আলাপ, হিয়ালের কুটিল হুক্কাহুয়া।

পলির নাকের এ্যান্টেনা এখন দুনিয়াসুদ্ধ তামাম আমিষের খবর রাখে। পাকঘরে মায়ের বটির ঘায়ে যে ইলিশের ধড়-কানকু আলগা হয়ে গেছে; সেই সংবাদে তার পরিপাকনালীসহ প -ইন্দ্রিয় বিদ্রোহী হয়ে উঠলে, নাভির নাড় ছিঁড়ে-ভিড়ে গলগল করে উদগার আসে।

মা উঠান থেকে ঘোর কিয়ামতের চিৎকার জোড়ে।
ক্যাডা…ক্যাডারে…।
বুলুটা দৌড়ে আসে।
বুবু…বুবুরে…।
মাঝের বাড়ির আঙ্কুরাদাদি লাঠি ভর দিয়ে নুয়ে-নুয়ে এসে মায়ের কুপির সামনে বিকট ছায়া ফেলে দাঁড়ায়।
হুনলাম ক্যাডা জানি উটকায়?
একটা নিদারুণ আতঙ্কে মা মুখ তুলে মানুষ নামের এই চলমান রয়টারকে দেখে তার পঞ্চাত্মা কেঁপে ওঠে; আবার দ্রুত সামলেও নেয়।
মা-ছাবের যে কতা, বুলু-না ভরা লোডাডা উল্ডায়া ঘপঘপ কইরা পানি ঢালল।
আঙ্কুরাদাদি অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে, অভিযোগের ভাষায় লাঠিতে থুতনি ঠেকিয়ে মায়ের হাত জোড়া ঠাহর করে।
ইলশা কাডঅ বুঝিন, কি দিন কাল আছিন; এক বাড়িত ইলশার গলাত ফেঁস দিলে দশ বাড়ি জুইড়া ঘেরান ছুটত!

রয়টার দাঁড়িয়ে থাকে। জংধরা প্রাচীন মস্তকখানা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তার বিশ্বাসের নজির খোঁজে। মা হার্মাদি চালে এক মনে মাছ কুটে। ভুলেও আঙ্কুরাদাদির দিকে তাকায় না। বুলু কিংবা পলিকে আর দিনের মতো পিঁড়ি দিতে ডাকে না। লম্বা পাড়ি দেওয়া অভিজ্ঞ শরীর-মন নিয়ে বুড়ি অনুসন্ধান চালায়। তার তামাম ইন্দ্রিয় কুনকুনিয়ে ছাফিল-কথার হদিস খোঁজে। কিন্তু পিঁড়ি নাইবা দিলে, বসতে না-বললে তো আঙ্কুরাদাদি হাতের লাঠিখানা চিমসে পাছায় ঠেকিয়ে বসতে পারে না।

বুড়ির নড়বড়ে হাড়ের জোড়ায়-জোড়ায় কালের ক্রোধ প্রবল হলে, মর্চে পড়া অস্থি-সন্ধি ফুটিয়ে সে আপন ডেরা-মুখো হয়। তার কাঁপা-কুঁকড়ানো ছায়াটা একটু দূরে উঠানের গভীর অন্ধকারে মিলিয়ে যেতেই মা ঘরের দিকে ছুটে। বুলুর খোঁড়া টেবিলটা ডান বাজুর এক ঘষায় উল্টে দিতে দিতে পলির চুলের গোছা খাবলা দিয়ে ধরে হিসহিসিয়ে ওঠে।
এইত্ত কই, উঠতে-বইতে খালি আরমান ভাই…আরমান ভাই…, রাইতটা পাউকরে মাগীর ঘরের মাগী, হিল দ্যায়া ছেঁইচ্চ্যা যুদিন পুংটা পেট না ফালছি…তে আমি তর বাপের না।

মা পাকঘরের সামনে, অন্ধকারে মিশে ক্ষণিকের জন্য দাঁড়ায়। আকছাই হুহু করে কেঁদে ফেলে। লিকলিকে হাত-পায়ের মেয়েটা আজও যেন তার বুকের ওমে মুখ লুকিয়ে মাই চুষছে। আর আজ এই অবুঝের এত বড় সর্বনাশ! এই দিনটার জন্যই কি সে এই সংসারটাকে জোড়াতালি দিয়ে খাড়া রেখেছে? নিজের সাধ-আল্লাদের দিকে কী সে একবার ফিরে চেয়েছে। এই শরীর…। এখনও যদি একটু সাফ-শুতো হয়ে নদীর ঘাটে কলস নিয়ে যায়, তবে গাঁয়ে পুরুষ মানুষ বলে যে দু-চার জন আছে, তাদের চোখে আগুন ঝলসে ওঠে; তবু-তো সে থুতনিতে এক গোছা ছাগলি দাড়িওয়ালা আব্দুল মাঝির মতো লোকটাকে নিয়ে অটুট ঈমানে জীবনটা কাটালো।

রাত গভীর। আশিন মাসের আকাশ মারাত্মক বিজলি কেটে কেটে বর্ষণ শুরু করে দিয়েছে। অঘুমা পলি বিছানা থেকে নেমে সাবধানে দরজার দিকে যায়। গলায় দড়ি বেঁধে গাছের ডালে ঝুলেপড়ার ইচ্ছাটা এখন চূড়ান্ত । কিন্তু কপাটের খিলে হাত দিতেই একটা পাথুরে হাতের মস্ত থাবায় তার মাথার চুলগুলো আটকে যায়। সে কৈতরের মতো কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে আছড়ে পড়ে। মা কালসাপের তীব্র গরলে গর্জে ওঠে।
কই যাছরে খামারির সন্তান?
অমানুষের মতো ভয়ানক হিংস্রতায় মা তাকে টেনে-হিঁচড়ে তার নিজের বিছানার কাছে ফেলে রেখে, ঘরের নিকষ অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে ছাগলের দড়ি নিয়ে আসে। পলির হাত-পা কষে বেঁধে, লাথি মেরে মাটিতে ফেলে রাখে। তাপর নিজের বিছানায় গিয়ে ঘেন্নাভরা গলায় থুতু ফেলে।

সকালে বাজ পড়ার ভীষণ শব্দে পলির গাঢ় ঘুম চড়াৎ করে ভেঙে গেলে সে দেখে, ঝরঝরা হাত-পায়ে নিজের বিছানায় চিত হয়ে পড়ে আছে। পাশেই ছাগলের দড়িটা পড়ে আছে মরা সাপের মতো। বিগত দূর্যোগী রাতটা দিনের একচেটিয়া হল্লায় আরও বেশি দুর্মর, জটিল। টিনের চালের জল মোটা-মোটা ধারায় ছাঁইচের মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে। এখন এই বিরাট পৃথিবীর সান্দ্র-তুমুল প্রলাপের মাঝে তাদের একতিল ঘর বিষণ্ণ আলো-আঁধারীর বাষ্প-বাতাসে মুমূর্ষু প্রায়।

বুলু বৃষ্টির মোটা-মোটা ফোঁটার ছাট ফুঁড়ে জবজবা ভেজা-শরীরে বারান্দায় লাফিয়ে ওঠে। তার দুই হাত ও প্যান্টের পকেট ভর্তি কৈ-পুঁটি। বাবা বৃষ্টির জলে-ভাসা পুকুরপারে কোদাল নিয়ে লড়ছে। বুলুর দাঁড়াবার ফুরসত কৈ ? বারান্দার খুঁটিতে লটকে থাকা খলুই আর ঠেলাজাল নিয়ে সে উঠানের জলকাদা ছিটিয়ে ফের ছুটে।

শোঁ শোঁ বাতাস আর আছড়ে-পড়া গুরুতর বৃষ্টির তির্যকধারার ভেতর থেকে মা ভেজা-বিপর্যস্ত শরীরে উদয় হয়। মায়ের হাতে কচি কচি সবুজ পাতা, বিজলীর কড়া ঝলকানিতে চকচক করে। তার হাত-কব্জির ইতি-উতি চ-ালপাতার ঘষায় ফোলে লাল তুরুজ হয়ে গেছে। একটা পিঁড়ি আর শিলনোড়া নিয়ে সে একমনে পাতা পিষে। তার চোখের গরমজল বৃষ্টি-ভেজা-শরীরের জলে মিশে যায়।

বুলু ফের তীর বেগে ফিরে আসে। এবার তার দুই হাতে মাঝারি সাইজের একটা উজ্জ্বল মৃগেল ছটফট করছে। উপচে-পড়া পাড় গড়িয়ে পুকুরের সব মাছ পালাচ্ছে। বুলু এসব বলতে বলতে চিলবিল করে ওঠে। জলে-শুঁষা তার কচি হাত-পা, চোখে-মুখে হতাশা-মিশ্রিত নিঃস্বতা পুরানা দাউদের মতো চুড়চুড়ায়। আকাশ থেকে গড়গড় করে ঠাটা ছুটে আসার আগেই–চোখ ধাঁধানো বিজলি দেখে, মা বুলুকে ঝাঁপটে ধরে বারান্দায় টেনে তোলে। সে হাতের মাছটা ছুঁড়ে ফেলে, ফের ঝড়-জলের বিকট ঘূর্ণীতে নিমেষে মিশে যায়। বুক ভরা রোদনের অভিশাপ নিয়ে মা সবুজ পাতার দু’টো গুটি আর একগ্লাস পানি নিয়ে পলির দিকে আগায়। বারান্দা এবং দরজার চৌকাঠের ফাঁকে আটকা পড়া তরুণ মৃগেল যন্ত্রনায় মাটিতে চড়াৎ-চড়াৎ লেজ পেটাতে থাকে।

মাঝের ঘরের আঙ্কুরাদাদি তার ঘরের দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে, হাতের লাঠিখানা থুৎনিতে ঠেকিয়ে, পলিদের ঘরমুখো নেউলের মতো চেয়ে থাকে। মাঝে-মধ্যে পাগলাঝড়ের এক আধটা ছিঁড়ে-ছোকরা ঝাপট পথহারা দানোর মতো বুড়ির উপড় আছড়ে পড়ে, শুঁটকো-শরীরের কাপড় নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করলে মানুষটা করাল চোখে সাবেকী আকাশ খোঁজে। সেখানে আম-জাম-বাঁশের ছেঁড়াপাতা, ভাঙাডালের দানবীয় নৃত্য-পরিক্রমা দেখে, দ্রুত দৃষ্টিটা পলিদের দরজা বরাবর সেঁটে ধরে। কী জানি একটু অসতর্ক হলে পাছে জিনিসটা ফসকে যায়!

মৃগেল এখন মৃত্যু বিভীষিকায় ভয়ানক অস্থির। মায়ের থমথমে চেহারায় সাপ নিয়ে খেলার মতো একটা গোপন উদ্বেগ ক্ষণে ক্ষণে কাঁটা দেয়। সে ঘরের টুকিটাকির মাঝে আঙ্কুরাদাদির ফোকলা মুখটা আন্দাজে যতই টের পায়, ততই খোদার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মাথাটা নুয়ে ফেলে।
Ñআল্লা…আল্লাগো, তুমি কী না পারো। এই আশিনি বানাশখান (আর্শ্বিন মাসের অবিরাম বৃষ্টিপাত) আরঅ দিন দুই লাম্বা করা যায় না? খালি রক্তের চাক্কাডা পেট থাইক্যা মাডিতে পড়লেই, জোড়মোরুগ দ্যায়া জুম্মা ঘরে সিন্নি দ্যায়াম।

বুলু আর বাবা দা-কুদাল আর খলুই ভর্তি কৈ-মাগুর নিয়ে ফিরে আসে। তাদের শরীরে বিদ্রোহী মীনগণের আঁশ-বাকল, ছোপছোপে তাজা ঘ্রাণ। বুলুটা শীতে হিহি করছে। মা কারও দিকে না-তাকিয়ে থমথমে মুখে, মৃগেলের ধড়টা বটিতে চেপে ধরে : মৃত্যুর এক অনির্বচনীয় স্বাদে মাছটার শরীর শূন্যে লাফিয়ে ওঠে, ইথারের সমুদ্রে ডুবেও এক চুমুক বাতাসের বা া নিয়ে মৃগেল বিস্ফারিত চোখে মায়ের চোখ দেখে। মা একপলক ঘরের দিকে তাকায়; নিশ্চিত–এতক্ষণে চ-াল পাতার করাল বিষ জরায়ুর নিবিড়ে জমে-উঠা পুংটা-পি-টার পলকা আস্তর ফুটো করতে শাবল ঠুকছে। মা মাছ ফেলে বটি হাতে, দুই লাফে ঘরে এসে দয়া-মায়াহীন পিচাশীর মতো বিকৃত মুখে দাঁত কিড়মিড়ায়।
যুদিন টু শব্দটা করছস,ত্যা বটি দ্যায়া খালি একখান কুপ দ্যায়াম।
বিছানায় পলি আর বারান্দায় আধকাটা মৃগেলটা অন্তিম কাতরানিতে ধুসধাস ছৈট পাড়ে।

বানাশের প্রবল তুড়ে আকাশটা যেন ভেঙে নুয়ে আসে। বুড়ি শেষবারের মতো ফাজিল দুনিয়াটার হাবভাব ঠাহর করছিল। কার একটা জংধরা টিনের চালা, ধোঁয়া-ধূসর জলস্রোতের মধ্যে পাখভাঙা বাজপাখির মতো ঘুরতে ঘুরতে পলি আর আঙ্কুরাদাদির উঠানের মাঝে ছিটকে পড়ছে দেখে, বুড়ি হাতের লাঠিখানা ছুঁড়ে ফেলে হামা দিয়ে কোনোমতে নিজের ঘরে ঢুকে।

তাই দেখে মা মুক্তির বিপুল আনন্দে পলি পলি করে আঁচল পেতে কাঁদতে বসে।

টানা দিনচারেকের অষ্টপ্রহর বুড়ি কাটা মুরগির মতো তার চৌকাঠে পড়ে হা-পিত্তেশ করেছে। চ-াল পাতার বিষ বুঝি পলির নাড়-রক্তে না বরং তার নিজের মন-গতরের শান্তি টুটাফাঁটা করে গেছে। ঘরের বাইরের মাটি এখন দুধ-চিনি চুষা ভুড়ভুড়া চিতই পিঠা। রোদের জেল্লায় দুনিয়াটা হাসছে। ভ্যাঁপসা গরমে কাদা-মাটি, ঝাড়-জংলা থেকে ভকভক করে পাদের মতো ফালতু গন্ধ উঠছে। বেজার মনে বুড়ি বিড়বিড় করে। ফোকলা মুখে তেতু জিবখানা নাড়ায়-চাড়ায়। প্রহরে প্রহরে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে, হাতের লাঠিখানা উঠানের মাটিতে ফেলে অবস্থা যাচাই করে; একটু তুচ্ছ চাপ দেবার আগেই লাঠিটা ভস করে সেঁধিয়ে যায়। ক্ষুব্ধ-ঘৃণায় বুড়ির মর্চে-পড়া চোখ দুটো কোটরের ভেতর ঝলকে ওঠে।

মা এখন শান্ত নদীর মতো জলদায়ী, অন্নদায়ী। মাঝে মাঝে সে ঘরে ঢুকে আতপ চালের জাউ দিয়ে কৈ-মাগুরের ঝোল খাইয়ে, পেষা দূর্বার বিষ-খাকি বড়ি মেয়ের মুখে তুলে দেয়।

যেদিন বুড়ি ঠুকঠুক করে পলিদের খড়ে ছাওয়া বারান্দায় এসে পিঁড়িটা নিজেই টেনে নেয়, ততদিনে মায়ের হাতের পথ্য খেয়ে মেয়েটার ফ্যাকাসে গাল দু’টো প্রায় সাবেক বরণ উসল করে ফেলেছে।

মায়ের পাশেই পলি, চুলায় জ্বাল দিচ্ছে। বুড়ি হা করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে; এই ছেনাল দুনিয়াটার মতি বোঝা দুষ্কর, এর প্রতি কোনো কালেই তার আস্থা ছিল না এবং আজও নাই। মা খুব ঠান্ডা-সবুর গলায় আলাপ জোড়ে।
মা-ছাবরে কি কইয়াম, আল্লায়অ গজব দিছিন আর আমার ছেড়িডারঅ রক্ত আমাশা অইছিন।
বুলু মায়ের মুখের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে দেখে, মা গমগমা গলায় চেঁচায়।
এইরে পাডা (পাঁঠা) খাড়ায়া দ্যাহস কি, তর দাদিরে পানের বাডাডা আইন্যা দে।

পরাজিত মানুষের মতো আঙ্কুরাদাদির মগজটা আক্ষেপ-রোষে দপদপ করছে। চাপা রাগে অপরিণামদর্শীর মতো আছেঁচা পান-সুপারি ফোকলা মুখে ফেলে কামড়াতে শুরু করে। যখন সুপারির দুই-একটা চিকন- চোখা দানা বুড়ির মাড়িতে শক্ত খোঁচা মারে, তখন মানুষটার মনের অসন্তুষ বেপরোয়া ভাবে উসকে ওঠে। কিন্তু শুধুই অনুমান নির্ভর জিনিসটা তেমন বল করে উঠতে পারছে না দেখে, সে পলির দিকে বিষাক্ত-চোখে চেয়ে চেয়ে ফোঁসতে থাকে।

আশিনি বানাশ থামলেও মেয়েটার হৃদয়ের উথাল-পাথাল একটুও কমে নাই। কদিন ধরেই তার মনের জটিল গ্রন্থিগুলো জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা-শাসিত জিজ্ঞাসায় তোলপাড় করছে। রক্তাক্ত করছে। সে নিঃশব্দে ঘরের গুপ্ত স্থান থেকে আরমানের বানোয়াট চিঠিগুলো গুটিয়ে এনে কৈমাছের ছালুনের ডেকচির নিচে ঠেসে ধরে, তাতে চুলার স্বাভাবিক আগুন হঠাৎ ফাঁৎ করে জ্বলে উঠলে, বুড়ি ও মা তার দিকে চকিত-নজর ফেলে। এখন মেয়েটার পা-ুর মুখাবয়বের রং আর চুলার আগুন একাকার হয়ে গেছে। জলভরা চোখে গর্জমান সেই আগুনের দিকে তাকিয়ে পলি ভাবে, এই ল-ভ- শরীর ও থেতলা মন নিয়ে সে জগতে কার কাছে দাঁড়াবে? তার নিজের কাছে নিজের এই প্রশ্নের কোনো দিশা নাই, নিষ্পত্তি নাই। শুধু একটা গরম বাতাস বদ্ধ উঠানের বিস্তারে, মাতালের মতো পাক খেয়ে খেয়ে ধুলা, আবর্জনা নিয়ে শূন্যে লাফিয়ে ওঠতে চায়।

 

লেখক পরিচিতি:

কথাশিল্পী শেখ লুৎফুরের জন্ম ব্রহ্মপুত্রের পলল মাটির ময়মনসিংহে।                                                                                                  শিক্ষকতার কর্মসূত্রে বসবাস করছেন সিলেটের জগন্নাথপুর।                                                                                                                লেখালেখির নির্জন জগতের নির্জন মানুষ তিনি। জনপদের আখ্যানকে                                                                                                নিজস্ব দৃষ্টি ও ভাষায় প্রকাশ করছেন। তাঁর প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ- ‘উল্টোরথে’, ‘ভাতবউ’;                                                                          উপন্যাসগ্রন্থ- ‘আত্মজীবনীর দিবারাত্র’ ‘কালো মাটির নিশ্বাস’ ‘সুতিয়া নদীর বাঁকে’।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

বিলাপ | শেখ লুৎফর

Fri Jul 16 , 2021
বিলাপ | শেখ লুৎফর 🌱 গেরাম ঘুরতে-ঘুরতে বেলা পড়ে যায়। বেসাত মন্দ হয় না। তবু বহরে ফেরার জন্য নিশির কোনো তাগদা নাই। উলটো তার চোখে ফুটে উঠে এক বন্য হাসি। আদিম রাত্রির রহস্যে নেচে উঠে জোড়াভুরুর আয়ত চোখ। এক পাল ছেলেমেয়ে ঘিরে থাকে ঝাঁপির চারপাশ। শেষবেলায় বেসাতের চাইতে বেহুদা দরদাম […]
Shares