নূরুল হক | এ জীবন খসড়া জীবন

নূরুল হক | এ জীবন খসড়া জীবন

সমস্যা

মৃত্যুতে আমার কোনো সমস্যা নেই

কারণ

         জীবনে তো মৃত্যুই ভরা আছে 

                        তাতেই তো বসবাস করি

তাই

মৃত্যুতে আমার কোনো গড়িমসি নেই 

                    যখনই লগ্ন হবে তখনই পাড়ি

 

কিন্তু

     মৃত্যু হলে

           পৃথিবীটা ঠিকঠাক চলছে কিনা

 

তা জানব কী করে?

এই যা সমস্যা ৷

 

ব্যয়মূল্যসহ

‘মৃত্যুর পর আবার আমাদের দেখা হবে’

বলে

যখন আমি মরলাম

               দেখলাম কিছুই নেই

                        শুধু ছলছল মাঠ,

 

কোনো টুকটাক হৃদয়ও

              এদিকে ওদিকে পড়ে নেই,

তাহলে আর কী করে থাকি সেখানে?

 

তাই

মৃত্যুকে ফিরিয়ে দিলাম মৃত্যুর কাছেই

ব্যয়মূল্যসহ ।

 

মৃত্যুবিবরণী

ভাণ্ডার পূর্ণ হয়ে আছে

                   মৃতের দলিলে।

মৃত্যুর তালিকা নেবে?

                    মুঠি খুলে নিয়ে যাও।

জীবনের সংকীর্ণ সীমায়

                    বড় বেমানানভাবে নাচে ফুলদল, যেখানে শায়িত হয় মুহুর্মুহু

                    দিগন্তে লরির মতো

 

দীর্ঘ সারি লাশ,

শববাহী পিঁপড়ারা নিয়ে যায়

                         পতিত ফড়িং,

                                      পোকা,

শবার্থী আকাশ, 

ঝরাপাতা আর মরা বাতাসের গভীর বিস্তীর্ণ পথে

                                 পবিত্র মৃত্যুর চিহ্ন লেখা? 

তাহলে কেমনে তুমি সমুদ্রের তল থেকে

                             মাথাটি উঁচিয়ে ধরতে চাও?

 

হত্যা, গুম আর বাঁচনেওয়ালাদের লম্ফঝম্প দেখে

মনে আস্থা হয় 

মানুষের আয়ু বুঝি মানুষের সাধ্যের অধীন।

 

মৃত্যু মানে

[কলিকালের আয়াতের কবি মতিন বালালীর মৃত্যুর পর]

মৃত্যু মানে আর কিছু নয় 

মৃত্যু মানে

         চলছিল

থেমে গেল

একদিন সবকিছু থেমে যায়।

 

আমি

জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে 

                যে বস্তু ডুবে যায় 

সে কি আমি?

 

আমার কবিতাগুলো

আমার কবিতাগুলো আমাকে অতিক্রম করে যায় পিছনে রেখে যায় আমার জীবন 

                     এবং শূন্য দুহাত।

ঢেউ যেমন অতিক্রম করে যায় নিজেকে

                            এবং ঝড়ো বাতাসকে

 

আমার ভেতর দিয়ে তেমনি ওরা চলে যায়

আমাকে রেখে যায়

                     চরায়

কিংবা বালুঘাটে

                   নুড়ি কিংবা শামুকের পাশে। 

তারপর আমি একদম খালি

                   ভাঙা পাত্রের মতোই

 

পড়ে থাকি

            কারো পায়ের কাছে 

            যেন খোলা বাতাসের মতো

ঠিকানাবিহীন।

 

যাত্রার প্রাক্কালে

চলে যদি যেতে হয়

              তাহলে কোথায় যাব?

                        সঙ্গে নেব কাকে?

 

কাকে যাব ফেলে রেখে?

কী আমার নাম?

পাখির বুকের মধ্যে আমারও কি নাম লেখা আছে? 

                    অখ্যাত নদীর ঘাটে?

                          ঢেউয়ে ঢেউয়ে বয়ে যায়?

 

সীমাহীনতায়?

কোথায় আমার শুরু?

           কোথায়ই বা সীমান্ত-বাঁধুনি?

কিভাবে তা মাপজোখ করি,

বহরে-লম্বায়?

সে কি হাজার বৎসর আগে

                    পিচ্ছিল মাটিতে যত

 

পায়ের বিহ্বল দাগ আছে

সেই থেকে

সাম্প্রতিক জগতের কল্লোলিত কররেখা বরাবর কূলপথ ধরে?

                 সবটুকু?

 

যদি জানতাম আমি

              সেই সীমারেখা

যদি জানতাম ৷

 

অবশিষ্ট হয়ে

সময় যে পার হয়ে গেছি

                 তা-ও ভুলে যাই

আগের অভ্যাসে

সকলের সাথে মিশে হেসে ফেলি

                         আঙুলে আঙুল ধরি

 

পথ চলতে গিয়ে

             চলে যাই অন্যদিকে

কোনো মাঠ নেই পথ নেই যে রেখায়

                             সেই রেখা ধরে

একলা এগোই,

             অবশিষ্ট হয়ে।

 

প্রমাদযোগ

নিজেরই নিয়ম ভেঙে তছনছ করে দেয়,

                  মুক্ত হতে চায় এই বিলাসী প্রকৃতি।

যাকিছু স্থাপনা ওই

              গড়ে তোলে স্তরে স্তরে

শুরুতে চলতে দেয় দ্বিধাহীন,

ক্রমে

একঘেয়েমির স্রোতে ক্লান্ত হলে পর,

                         স্বাদহীন হয়ে গেলে পর,

নিজেকেই

         সইতে বইতে না পেরে

যতসব নিয়মের স্তূপ

          এলোমেলো করে দেয়,

ভেঙে দেয় সংগত কাঠামো, 

এভাবেই প্রমাদ আহ্বান করে অভ্যন্তর,

জীবন

         মৃত্যুর কাছে যায়,

সৃষ্টি

      ধ্বংসের কাছে যায়,

মহাব্রহ্মাণ্ডও এই স্বাদহীনতার দায়ে

                  একদিন বিলুপ্তিতে যাবে।

 

এ কোনোই ধর্মকথা নয়, 

এমনকি শাস্ত্রকথাও নয়। 

নিজেদের জীবনেও একঘেয়েমির দণ্ড প্রত্যক্ষ করেছি।

 

ঠিকঠাক নয়

এতটা বয়স পার হয়ে 

                 মনে হয়,

                      এ জীবন ঠিকঠাক নয়।

 

এ জীবন খসড়া জীবন।

কোনো সীমানাই তার

                   অধিকৃত নেই৷

 

নিজেকেই নিরিবিলি বলি, 

‘বিনা সংশোধনে তাকে পাঠ করো কেন?

এখনো সময় আছে

             এখনো তারার দল আকাশে রয়েছে

দিগন্তে পাহাড়চূড়া আছে

এ ব্রহ্মাণ্ডে সঙ্গীহীন নও

এখনো যে ডাল ফেটে বেরিয়ে আসছে ফুল পথরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে নদী

তাই

     বোঝো না যা

            নিভৃতে শনাক্ত কোরো, জাগাও হৃদয়ে টেবিলেই নিয়ে চলো পাণ্ডুলিপি

                          টাটকা অক্ষরে

পুনর্লেখ করে ফের মেলে নাও ঊর্বর আভায় ৷

এত আলোভরা সুনীলতা বসবাস করে,

                                         শিরোদেশে

পাঠদান করে, 

সূর্যসখা হয়,

সুমিষ্ট আকাশে যত মাতৃভূমি আছে

                     সবখানে ঘর বাঁধে তার 

                           মাটি জলে মিশিয়ে পিষিয়ে

তুমি কেন পিছু হটে যাও?’

◾◾◾

কবি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল হক

সূর্যালোকে স্বাগতম

জন্ম ২৫ নভেম্বর ১৯৪৪, পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চলের নেত্রকোণা জেলার বালালী গ্রামে। বাড়ির সামনেই তলার হাওর ও বিস্তৃত আকাশপট। শৈশব কেটেছে এ পরিবেশেই। মলুয়া, মহুয়া, দেওয়ানা মদীনা, চন্দ্রাবতী ও অসংখ্য পালা ঘিরে রেখেছে এ জনপদের জলহাওয়াকে। বাউলগান, কবিগান, গাইনের গীত থেকে শুরু করে মাইট্যা তাম্‌শা, সিলুক, ভাটিয়ালি হরেকরকম মূর্ছনায় স্পন্দিত হয়ে আছে সেখানকার লোক-জীবন।

পৃথিবীর মায়া ত্যাগ

মৃত্যু ২২ জুলাই, ২০২১ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা

পৃথিবীর পাঠশালায়

১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। অনেক বছর কলেজে অধ্যাপনা।

কাজকর্ম

মাতৃভূমির ডাকে সাড়া দেওয়া, ১৯৭১, যুদ্ধসেক্টর এগারো। 

প্রকাশিত কবিতার বই

*সব আঘাত ছড়িয়ে পড়েছে রক্তদানায় (নিরন্তন প্রকাশন, ২০০৭)। 

*একটি গাছের পদপ্রান্তে (বিভাস, ২০১০)। 

“মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত গল্প ও অন্যান্য কবিতা (নান্দনিক, ২০১২)। 

*শাহবাগ থেকে মালোপাড়া (খেয়া, ২০১৪)। 

*এ জীবন খসড়া জীবন (খেয়া, ২০১৫)। 

*কবিতা সমগ্র (চৈতন্য ২০২০)

পুরস্কার

নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজ প্রবর্তিত খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার ১৪১৯ বঙ্গাব্দ।

➖➖➖

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

অসুখ | শেখ লুৎফর

Fri Jul 30 , 2021
অসুখ | শেখ লুৎফর 🌱 শরীরে সিফলিসের ক্ষতের মতো অসংখ্য নয়া-পুরান সাইনবোর্ড নিয়ে, পাকা সড়কের মোড়ে বিশাল শিরীষ গাছটা স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। দুই-একটা সাইনবোর্ডের বুক জঙ্গারে খেয়ে খুবলে ফেলেছে। কিন্তু পেরেকের কঠিন দাঁত, শিরীষের গতর কামড়ে ধরে এখনও তাফালিং করছে। বিচিত্র বিজ্ঞাপনগুলোর উজ্জ্বল শরীরের নিচে চাপা পড়া, শিরীষের সেইসব […]
Shares