অসুখ | শেখ লুৎফর

অসুখ | শেখ লুৎফর

🌱

শরীরে সিফলিসের ক্ষতের মতো অসংখ্য নয়া-পুরান সাইনবোর্ড নিয়ে, পাকা সড়কের মোড়ে বিশাল শিরীষ গাছটা স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। দুই-একটা সাইনবোর্ডের বুক জঙ্গারে খেয়ে খুবলে ফেলেছে। কিন্তু পেরেকের কঠিন দাঁত, শিরীষের গতর কামড়ে ধরে এখনও তাফালিং করছে। বিচিত্র বিজ্ঞাপনগুলোর উজ্জ্বল শরীরের নিচে চাপা পড়া, শিরীষের সেইসব গোপন ক্ষত থেকে দিনমান চুঁয়ে-চুঁয়ে শুধু পোঁজ-রক্ত ঝরে। 

শিরীষের কোমড় ঘেষে দাঁড়িয়ে মুনিম একটা রিক্সার জন্য অপেক্ষা করে। কত বছর ধরে যে সে এই শিরীষের নিচে দাঁড়িয়ে আছে! স্কুলের ছুটির দিনগুলোতে, ভরদুপুরে একা-একা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এই শিরীষ গাছটাকে ঠার করে চম্পট দিত। দোকানের ঝাঁপ ফেলে বাবা তার বাজার থেকে এলো বলে নিশ্চই তার জন্য বাদাম আনবে। ধুলোভরা ধু ধু পথটার দিকে তাকিয়ে চোখ টাটাতো। কত মানুষ আসে-যায়, বাবা কেন আসে না ? বিশাল মাঠের বুক চিরে মাটির সড়ক গঞ্জের দিকে মুখ লুকিয়েছে। দূরে ছিন্ন ছিন্ন গ্রামগুলোর কালচে রেখা, মাঝ দুপুরের ঠা ঠা রোদের তেজে হঠাৎ হঠাৎ কেঁপে ওঠে।

চারপাশের গ্রামগুলো থেকে আল-বাত বেয়ে বেয়ে মুনিমের বয়েসি যারা স্কুলে যাবার জন্য আসত, তারা প্রতেক্যেই এই শিরীষতলায় এসে অপেক্ষা করত। চার-পাঁচজন হলে হৈ হৈ করে সড়কের ধুলো কিংবা কাদা ঠেলে স্কুলের দিকে ছুটত। রজব, রেহান, ওমর…। মুনিমের বুকে কত নাম, মাঝে মাঝে অনাহক বিখাউজের মতো চুলকায়। ওমর কথা বলত গমগম করে, তাই সবাই তাকে ডাকত ভোমা ওমর। আঙুলের মতো বড় বড় দাঁত আর বাঘা কব্জির মানুষটা ডাকাতি করতে গিয়ে পাবলিকের ব্যারিকেডে পড়ে, দশ বছর আগে খুন হয়ে গেছে। রজব রেলের খালাসি। ঈদ-পরবে ছুটিতে বাড়ি এলে মুনিমের আড়তে এক-আধ চক্কর আসে। পোশাক-গতরে অনটনের প্রকট উপস্থিতি, চোখে-মুখে পৌষের সন্ধ্যার মতো কষ্ট, জড়তা।

আড়তের পিচ্চিটা দু-কাপ চা আনে। মুনিম টোস্টে কামড় দিয়ে মরা চোখে পুরানা বন্ধুর দিকে তাকিয়ে থাকে। কি দিয়ে আলাপ শুরু করবে, হাতড়ে হাতড়ে লেজ-মাথা কিছুই পায় না। চায়ের গরম শরীর থেকে ওঠে আসা ধোঁয়া দুজনের মাঝে ইঁদুরের মতো লেজ নাচায়।

চা শেষ হয়ে গেলেও রজব উঠতে চায় না। মুনিমের শরীর খিতখিত করে। খাতক কেউ এলে তার জানটা বুঝি বাঁচে।

মুনিমের আড়ত ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেলে সে চেয়ে দেখে বাইরে রাত আলকাতরার মতো ঘন হয়ে গেছে। খাতকশূন্য এরকম স্তব্ধ ঘরে, নিজের অস্তিত্বের বাসি ঘ্রাণে তার নিজের বুকটাই কিলবিল করে। তখন সে নিজের বুকের কাঁচা-পাকা লোমে নখ ডুবিয়ে চুলকাতে চুলকাতে আরেকবার বাইরের দিকে চোখ পাকায়। আরও আশ্চর্য কোনো অন্ধকারের আগুনে মুখ ডুবিয়ে পরে থাকার একটা উৎকট লোভ তখন তার বুকে হু হু করে ডাঙ্গর হতে থাকে।

রিক্সার চাকা পনপন করে ঘুরে। রাস্তার পাশের আতংকিত গাছগুলো, অন্ধকারকে ঝাপটে ধরে নিজেরাই গভীর অন্ধকার হয়ে যায়।

সড়কের দু পাশে বিস্তীর্ণ জমিন। ছোট-বড় আল-বাতর তুলে মানুষেরা অসীমকে সসীমে কব্জা করে নিয়েছে। কখনো জোর বাতাস গ্রামের বাঁশবন পেরিয়ে বিশাল মাঠে পড়ে খ্যাপার মতো দৌড়ায়। চৈতের শুখা-ভুখা মাঠের ধুলো, ছন-বন নিয়ে টানটানি করতে করতে হঠাৎ দানোর মত লাফিয়ে ওঠে জ্বলন্ত সূর্যটাকে থাপা দিয়ে ধরে কচলে-মচলে অন্ধকারের কালো কালো গুঁড়ো চারপাশে ছড়িয়ে দেয়। দিগন্তের উদলা কোণাকানা থেকে কালো মেঘের বহর কার যেন তাড়া খেড়ে ভেংচি কাটতে কাটতে তামাম দুনিযাটাকে ঝলসে দেয়।

প্রবল বিতৃষ্ণায় মুনিমের বাক রোধ হয়ে আসে। এক আজিব হিংস্র-কুটিল চোখে সে ঐ দিকে তাকিয়ে থাকে। নিজের ঘরে সে ধীরাজ; আড়ত, ইটভাটা, অটো রাইস মিলে প্রভু আর এই ছোট থানা সদরের যে কজন সেরা হাড়কিপ্টে ক্যাশওয়ালা আছে, তাদের একজন সে এবং নিজের কাছে সে যাই থাকুক কিন্তু যখন মুনিম হাত দুটো পেছনে রেখে মাথাটা টানটান করে বিষাদ-বদনে বাজারে কিংবা বাইরে হাঁটে, তখন আশপাশের মানুষ তো মানুষ, ফরাজিরা যে কেউ হোক তার সামনে পড়লে মুনিম হাত তোলার আগেই তারা সালাম দেয়।

বাতাস শো শো গর্জন তুলে ছুটছে। পথের পাশের তরুণ মেহগনির একটা ডাল ছিঁড়ে মোচড়াতে মোচড়াতে তারা মুনিমের দিকে এগিয়ে আসে। তার শরীর শক্ত হয়ে ওঠে, দাঁতে দাঁত পিষে সে ভ্রুক্ষেপহীন দাঁড়িয়ে থাকে।

গেল দিন মুনিম কাম শেষ করে লুঙ্গি গোছ-গাছ করছিল। আয়তুন পাটি থেকে উঠে সরাসরি মুনিমের পেটে হাত দিয়ে বলে, মিয়া সাবের ভুড়িডা খালি মোডা অইতাছে। অহন আর মেয়া-মাগি দ্যায়া কি অইব, তারচে হুইত্তা হুইত্তা নাক ডাহাই ভালা। 

মুনিমের চোখ দুটো দপ করে জ্বলে ওঠে তবু কঠিন কিছু বলে না। সে লুঙ্গিতে গিঁট দিয়ে, মাথার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বলে, খালি ভুড়িডাই দ্যাখলে…।

নজর মোটা মানুষকে মুনিম একদম সহ্য করতে পারে না, ছেমড়িডা একটুও বুঝে না, ট্যাহা বাড়লে-ত পেট বাড়বই। মুনিমের আক্ষেপ হয়, মানুষ যে ক্যান অত লেঙ্গুর মোটা!

মুনিম নিজেই-তো নিজেকে বোঝে না। তা না-হলে ঝকঝকে আলোভরা সকালে পথে এসে রিক্সার জন্য দাঁড়িয়ে প্রায়ই কেন চমকে ওঠে। দেমাগে প্রশ্নটা ঝাঁকি মারে, কিসের তাড়নায় সে এতটা হন্ত-দন্ত? এক চুমুক ঔদাস্যের মাঝে যখন তার প্রিয় গদি ঘরখানা স্মৃতিতে উঁকি মারে, তখনি তার ঝাঁপসা চোখে-মুখে অজস্র আলোর তীর মুখিয়ে ওঠে। ডান দিকের শিরীষ গাছটা আজ কী পেল্লাই শরীর নিয়েছে, তা-আর মুনিমের চোখ মেলে দেখা হয় না। আজকের এই দাপোটে বৃক্ষটা যখন কিশোর ছিল, যখন মুনিমরা সবাই স্কুলে যাবার পথে এখানে বাঁক নিত, তখন লাল হয়ে আসা এক পড়ন্ত বিকালে সে গোপনে তার ভূগোল বইয়ের পেট থেকে এক ফালি ব্লেড বের করে শিরীষের বাকল কেটে-কেটে-বেশ মোটা করে তার আর রানুর নাম লিখে মাঝে একটা প্লাস চিহ্ন বসিয়ে দিয়েছিল।

ফরাজি বাড়ির ছোট মেয়ে রানু। টুকটুকে ফর্সা। ছিংলার মতো লকলকে শরীর। বুকে বই চেপে যখন সে স্কুলের পথে হাঁটে, তখন চারপাশের সবকিছুই যেন তার সাথে মন্ত্র-মুগ্ধের মতো হাঁটতে চায়!

পরের দিন মুনিমের বাবা একটু আগধাবারে দোকানের ঝাঁপ ফেলে বাড়ি ফিরে। মুনিম তখন এশিয়ার মানচিত্র আঁকতে গিয়ে পৃষ্ঠা জোড়ে খালি রানুর মুখ দেখছে। ইন্দ্রিয়ঘন সেই নিবিড় মুহূর্তটিতেই তার বাবা এসে মুনিমের পড়ার টেবিলের সামনে দাঁড়ায়। অপমানে মানুষটার মুখটা কালো আংরা হয়ে গেছে। মাথার চুল পটপট করে উঠলে মুনিম দেখে রানু নাই, তার বাবা তাকে চুল ধরে শূন্যে তোলে মাটিতে আছাড় মেরে ফেলে দিয়েছে, কুত্তার বাচ্চা, কত বড় হিম্মত তর ফরাজিগর একটা লুম্বার সমান হইছস?

পরের জ্যৈষ্ঠে রানুকে দেখা গেলো তাদের বাড়ির পেছনের পাট ক্ষেতে, মুনিমের গলা জড়িয়ে ধরে ঘামছে। ফরাজিদের ছোট মেয়ের টুকটুকে ফর্সা হাত, পাটক্ষেতের মশার কামড়ে লাল লাল চাকায় ভরে যায় তবু মুনিমের গলা ছাড়ে না।

তার পরের জ্যৈষ্ঠ মাসে, মুনিম ইন্টারের ফরম-ফিলাপের টাকা কলেজের কেরানিকে না-দিয়ে, ছাগলের পাইকারকে চড়া সুদে দিয়ে দেয়। আর কলেজ নয়। লোকজন দেখে, বিকাল হলে মুনিম স্টেশনের পাশের টং দোকানে বসে বসে পা দোলাচ্ছে।  সদর ফেরত ট্রেনের ঘন্টা বাজলে ছেলেটার চোখ-মুখ এক আশ্চর্য উত্তেজনায় লাল হয়ে ওঠে। সেদিন থেকে পাইকারের প্রতিটা চালানের পর মুনিম শিরীষের বাকলে নয়, তার নিজের হৃৎপি-ে একটা করে প্লাস লেখে।

আজ ব্যাংকের সাহেবরা মুনিমের নামের পাশে কত যে প্লাস লেখে, কিংবা তার আড়তের রোগা কেরানিটি সারাদিন অজস্র সংখ্যার পাশে শুধু প্লাস চিহ্ন বসায়। মাঝে মাঝে সেইসব লম্বা লম্বা সংখ্যাগুলোর শরীর ভরা প্লাস দেখে মুনিম একটুও খুশি হয় না।

মুনিম মুখে আশ্চর্য এক গাম্ভীর্যের মুখোশ এঁটে দিনমান ছুটে। অনেক দিন ধরে ছুটছে। প্রথম প্রথম মুখোশটা চুলকাতো। খসে যেতে চাইতো; আকছা খসে গেলেও কেউ দেখে ফেলার আগেই সে জটপট পড়ে নিত। এখন মুনিমের মুখের সাথে ওটা বেশ মানিয়ে গেছে। হয়ত আজ মুখোশটাই তার প্রকৃত মুখ হয়ে গেছে। এবং ঘুমের মাঝেও হুঁতোম প্যাঁচার মতো থমথমে তার মুখখানায় এক বিস্ময়কর বিষাদ এঁটে থাকে। যখন সে ঘরে ফিরে গোসলখানায় ঢোকে, রানু হাত ভর্তি সোনার চুড়িতে রোদন তুলে লুঙ্গি-গামছা এগিয়ে দেয়। মাঝে-মধ্যে মুনিম অবাক চোখে সেই গোলগাল ফর্সা হাতের দিকে চেয়ে থাকে। মনে করতে পারে না সে, এই দুখি হাত দুটো কোথায় দেখেছে! এরা কেন এত আশ্চর্য করুণ আর নিরর্থক।

মাঝে-মধ্যে সকালে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে শুনে, তার মেয়ে পাশের বাড়ির আতাবুরের ছেলেকে ডাকছে, বড় ভাই আমার লাইগ্যা একটা রিকসা আটকাইয়ো, বড় দেরি হইয়া গেছে, আজ স্যাারে বকবো। 

মুনিম চিন্তিত হয়। আতাবুরের ছেলের মুখ মনে করতে চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। বুকটা কেমন ভার ভার লাগে। নিজের ছেলে নাই। রানু যে কী করল!

…এই বড় ভাইডা ক্যাডা, আল্লাই জানে এই কুত্তার বাচ্চা যে কী করব? 

মুনিম একটু নড়েচড়ে বসে। মেয়ের ব্যাপারে আরেকটু সর্তক হওয়া উচিত; এরকম একটা চিন্তা মগজে মুখ তুলতে চায় কিন্তু ভাবনাটা গাঁথুনি নেবার আগেই মধ্য বাজারের জায়গাটায় মার্কেট করার লোভ এসে হুড়মুড় করে তার কাছ থেকে মেয়ের মুখ আড়ালে ফেলে দেয়।

মুনিমের বুকের মাঝে একটা ক্ষোভ কালো তাগার মতো টানটান হয়ে আছে। নিজের মেয়েটাকে সে একটুও বুঝে না। ও-কে খুশি করার জন্য কিছু একটা বললে উলটো সে রাগ করে। মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যে হাবিজাবি স্বপ্নে পড়ে, বিশবছর আগের রানুকে পাট ক্ষেতে খোঁজে। না-পেয়ে হয়রান হয়ে নিজের শূন্য বুক হাতড়াতে হাতড়াতে জেগে দেখে সে রানুর মাঝ ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। নীল মশারির ভেতর দুই রানু এক সাথে। কোন রানুকে সে কানে কানে কথাটা বলবে? সেটা এক মস্ত ফাঁপর! আসল রানুকে ঠাওরাতে ঠাওরাতে সে মোদ্দা কথাটা বিলকুল ভুলে যায়।

পরশু? তরশু হবে। মুনিম ঘুম থেকে উঠে রানুকে খুঁজতে গিয়ে দেখে, অবাক এক নারী। ছবির মতো টানটান দীঘল শরীর। তার পিঠ ভর্তি ভেজা চুল থেকে আনারের ফুলের মতো টপটপ জল পড়ছে। স্তম্ভিতের মতো মুনিম চেয়ে থাকে। কাকে যেন কোথায় একদিন এমন করে দেখেছিল…।

মুনিমের জং ধরা ভেতরটা কলকল করে জেগে ওঠে। অনেক দিন পর তার শরীর-মন নির্ভার লাগে। নারী ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে ডান দিকের কড়িডোরে বাঁক লয়। সে তখন তীব্র চোখের এক ঝলক দৃষ্টিতে নিজের মেয়ের মুখটা চিনে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

মুহূর্ত কয়ের এইসব টুকিটাকির মাঝে, আড়ত আর ইটভাটার জটিল দায় এসে চট করে জামবাক মলমের মতো লেপ্টে বসলে, মুনিম বিস্বাদ বদনে রিকশায় চড়ে বসে।

নাগরীক জীবনের বহু গরম গরম খবর নিয়ে, আরও অনেক সাইনবোর্ড লেগেছে শিরীষ গাছটায়। দর্জির দোকান থেকে মোবাইল ফোন, অর্শ-গেজ থেকে কিন্ডারগার্টেন। পাকা সড়কের কালো পিচ, রোদের তেজে খা খা করে। আশপাশের খানা-খন্দ-ভরা বুনো মাঠটায় আজ ইরি চাষের জন্য গুমগুম করে ট্রাকটর ছুটছে, মাটির গভীর থেকে স্যালোকল আগ্রসী চুমুকে জল টেনে ক্ষেতে এনে উসটে ফেলছে। বস্তা বস্তা ইউরিয়া, টিএসপি সার ঠেলা থেকে ক্ষেতের বাতরে নামছে। সবকিছু কেমন অচেনা আর পরপর লাগে! তবু মুনিম চেয়ে থাকে। এসব চাইতে চাইতে সে রিকশায় বসে ঢুলে, অথবা ঢুলতে ঢুলতে সে রিকশায় ওঠে। আসলে সে এসব কিচ্ছুটি দেখে না। সে দেখে আড়ত, ব্যাংক, ইটভাটা, ছাগলের পাইকারের শুঁটকো মুখ।

এত অবসাদ! ঘাড়ের রগে এত হিম, জিভ-টাকরায় এত মর্চে…। মুনিম…মুনিম…করে  কে যেন কয়টা ডাক দেয়। কিন্তু চর্বির আস্তরে ঠাসা মোটা ঘাড়খানা চাইলেও সে সহজে ফেরাতে পারে না।

বড় রাস্তায় রিকশা দাঁড় করিয়ে গুটি গুটি পায়ে, কয়টা চষা ক্ষেত-বাতর ডিঙিয়ে, আয়তুনের এই ঝুপরির ভেতর সামলে-সুমলে মুনিম ঢুকে কি উপাসির মতো ঘন্টার পর ঘন্টা গুতানোর জন্য? তবে সে কেন আসে তাও খোলাসা করে বোঝে না। অবশ্য মুনিম আজকাল তেমন কিছু বুঝতে মাথা খাটায় না। একটু ভাবলেই গা বমি বমি করে। 

বিরামহীন একরুখা ছুটার যে ব্যামো তাকে কাবু করে বসেছে, তা থেকে ক্ষণিক মুক্তির আপাত সহজ উপায় হিসাবে হয়ত সে আয়তুনকেই বেছে নিয়েছে। মুনিমের ফিরতি পথের পাশেই এই টুকটুকি পাখিটি ছন-বন দিয়ে তার বাসাখানা সদ্য তুলেছে। সারাদিন খালি ট্যাহা আর মানু, মানু আর ট্যাহা। 

মুনিম বিড়বিড় করে। সমস্ত দিনের জটিল লেন-দেনের মতো তার সেই একান্ত সংলাপটাও জটিলতায় গুমরে ওঠে।

ধান-চাউলের আড়ত থেকে তাকে ছুটতে হয় অটো রাইস মিলে। সেখান থেকে ইটের ভাটায়। মাঝ বাজারে একটা জায়গা কেনার জন্য মলামলি চলছে। দামটা একটু চড়া হলেও, মার্কেট করার খোয়াবটা কিন্তু দিনে দিনে মুনিমের বুকে পোক্তই হচ্ছে। কারণ, স্থাপনাভিত্তিক বানিজ্য না থাকলে ওপরতলায় কলকে মিলে না। তাই ফাঁকমতো সেদিকেও এট্টু চক্কর দিতে হয় দম নেবার জন্য।

সন্ধ্যা নামলে মুনিম চা-নাস্তার পরে গরু-খাসি আর মুরগির পাইকারদের কাছ থেকে লগ্নির মাল সুদে-আসলে আদায় করে। টাকা ছাড়া আর কিছুতেই তার রুচি নাই। ইলিশ ভাজা কিংবা মুরগির রানের চে’ পাইকাদের শুকনা মুখ দেখে মুনিমের বেশি অনন্দ। চোখে-মুখে ঘনায়মান রাতের অন্ধকার লেপ্টে মোকাম ফেরত পাইকাররা যখন তার অপেক্ষায় আড়তে বসে বসে ঝিমায়, তখন সে আমুদে হাই তোলে। এদের মাঝে কেউ কেউ কুড়ি বছর ধরে মুনিমের বিশাল বপুটির রসদ যোগাচ্ছে। সে এমন চালে এদের সাথে লেন-দেনটা করে যাতে কেউ-ই আর নিজের তহবিলটা খাড়া করতে না পারে। নরখাদক বাঘের মতো সন্ধ্যা হলেই সে পাইকারদের জন্য খাপ পেতে বসে থাকে। তার কাছে এর নেশা বাংলা মালের চে’ উত্তেজক। সেইজন্যই এই পুরানা কারবারটা সে ছাড়ে-ছাড়ে করেও ছাড়তে পারছে না।

এবং, তখন থেকেই সন্ধ্যার আকাশের মতো মুনিমের মেজাজের ওপর অন্ধকার নেমে আসতে শুরু করে। ফুটো টিনের ভেতর দিয়ে বাইরের পৃথিবী যেমন অন্ধকার ঘরের দিকে চোরা চোখে চেয়ে থাকে তেমনি মুনিমের বুকের জটিল গহ্বরে একটি তৃষিত চেতনা আনখা দৃষ্টিতে মাঝে মাঝে চোখ মেলে মুচড়ে ওঠে। কিন্তু সেই অনুভব বিস্তর কঠিন কঠিন উপাত্তঠাসা বিষয়ী গহ্বরে তিলেকেই চাপা পড়ে।

রাত দশটার পর অফিসের ডিপ লকারে হার্ড মাল ঢুকিয়ে, মুনিম বুক পকেটে মাত্র একশ টাকার দুটো নোট রেখে রিকশায় ওঠে। এবার পঙ্খিরাজ দোলে-দোলে হাওয়ায় উড়ে। রাস্তার পাশের গাছ-পালার ভূতুরে ছায়ার চিপা-চাপা দিয়ে নক্ষত্রের ক্ষীণ আলো দ্বিধায় নড়েচড়ে। মুনিমের মুখে হুতুম প্যাঁচার গাম্ভীর্য। এই নিকষ অন্ধকারের মাঝেও আশ্চর্য এক মুখোশ এঁটে মুনিম ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে জেগে থাকে। সামনে ডাকু মার্কা সারথী পনপন করে রিকশায় প্যাডেল মারছে। হু হু করে মাঠের বাতাস তার নাক-মুখ ছুঁয়ে মাথার চুলে বিলি কেটে পিছিয়ে যায়। দরকার মতো এই ছেলেটা প্রাণ দিতে প্রস্তুত। অনুগত ষ-া-সারথীর জন্য তাই এক নোট, কচি আয়তুন বাকিটা। মুনিমের তৃপ্তি অজস্র সমস্যা ও সম্ভাবনাকে পাশ কাটিয়ে ঢেকুরের মতো বেরিয়ে আসতে চায়; আসলে মাইনশ্যের দাম কয় ট্যাহা?

আয়তুনের ঘরের তরল অন্ধকারে বুনো ফুলের একটা হালকা ঘ্রাণে মুনিম নয়-ছয় ভাবনা ফেলে বর্তমান মনস্ক হয়। চাঁছাছিলা ঘ্রাণটা তার গতরের রগে রগে ঘুরতে ঘুরতে মাথার খুলিতে গিয়ে জেঁকে বসে তাকে যেন উন্মার্গ বানায়। দপ করে মুনিমের চোখ দুটো উধাও। সেই শূন্য গর্তে এসে ঠাঁই নেয় কোনো নিশাচরের ধাঁধানো তীব্র চোখ। চড়চড় করে মাড়ির হাড় ফেটে যেন বেরিয়ে আসে কোনো মাংসাশী হায়ানের দীর্ঘ-ধারালো কর্তন-দন্ত। এখন সে ইচ্ছা করলেই এই দুবলা মেয়েমানুষটার আস্ত মস্তকটাই মুখে ফেলে পিষে-চুষে নিতে পারে। কিন্তু সে তার বদলে চোখ দুটো বন্ধ করে ঝিম মেরে অপেক্ষা করে। আঁটো চোখের মণিতেই চিন্তার দ্যুতিটা ঝিলিক দেয়, আসলে পুরুষ মানুষ বিত্তের পাশাপাশি তর্জনি উঠাতেই বেশি পছন্দ করে।

মুনিম একটু একটু করে শুধু ধনার্জনই করেনি; শিখেছে কেমন করে বছরের পর বছর শীত-গ্রীষ্মকে তুচ্ছ করে অপেক্ষা করতে হয়। কেমন করে বিষ হজম করে মুখে মধু উগড়াতে হয়। আর কীভাবে একটু একটু করে মানুষকে মুঠির ভেতর ভরে জিন্দা রেখে রস শুষে নিতে হয়।

সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁত ব্রাশ করতে গিয়ে মুনিম প্রায়াই চমকে ওঠে। পান-জর্দার রস মুখের ভেতর সারাটা রাত পচে পচে বুঝি পাইকারদের রক্ত হয়ে গেছে! থুথুর সাথে চাকা চাকা রক্তে সাদা বেসিনের শরীর ভরে ওঠে। সে দিশেহারার মতো কাশতে থাকে। তার হাত-পায়ে খিল ধরে, বিষ-ঘামের সাথে মাথাটাও ঝিমঝিমিয়ে ওঠে।

একটা উৎকট জ্বালা উজাই খালের কৈ মাছের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে মুনিমের সারাটা শরীর দখলে নেয়। ফুটবলের মতো গোল শরীরের মানুষটা তার হাতের আঙুলগুলোর দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে থাকে। জোঁক যেমন রক্ত চুষে-চুষে কালো জামের মত গোল আর অসার, টাকা গুনে গুনে তেমনি তার আঙুলগুলোও। সেই গোদা গোদা আঙুলের ডগাগুলো হঠাৎ শিরশির করে ওঠে আর তক্ষুণি সে টের পায় তার নখগুলো পশুর নখের মতো দীর্ঘ আর তীক্ষè হয়ে যাচ্ছে। পলে পলে তার হাতের ত্বক ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসছে কুচকুচে কালো লম্বা লম্বা রোঁয়া। তিলেক দ-ে যেন তার হাত দুটো শিম্পাঞ্জির হাত হয়ে যায়!

চরম বিস্ময়ের মাঝে ঘোর কাটে; কই সবি-তো টিকঠাক আছে, তাহলে কি মতিভ্রম? দৃষ্টি বিভ্রাট! না মনের বৈকল্য?

মল দেখার মত মুনিম থুতু ফেলে সব কিছু ভুলে যেতে চায়। তার সব ইন্দ্রিয়ের উপর একতরফা আধিপত্য সে হারাতে বসেছে। আজকাল সে প্রায়ই আয়তুনের জংলী ফুলের মতো দেহটার উপর উঠে যেন ঘুমিয়ে পড়ে। হঠাৎ চমক ভাঙলে আন্দাজ হয়, পরম শূন্য এক নিষ্ঠুর লালাট লিপি যেন তাকে পেয়ে বসেছে।

তামাদি সবকিছু উদ্ধারের মতো মুনিম মরিয়া হয়ে হাত বাড়িয়ে আয়তুনের দীর্ঘ আর নরম ঘাড়টা ছুঁয়ে দেখে। নারীর অসমাপ্ত কামনা তার ঘাড়ের ধমনীতে তীব্র মাথা মারছে। সে বুঝে, আয়তুনকে আরও লন্ডভন্ড করা উচিত ছিল। মাড়াই কল দিয়ে চাষা যেমন আখ পিষে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়, দরকার কি খামাখা সময় আর শরীর ক্ষয় করে। আয়তুনের তৃপ্তিতে তার ফয়দা কী ?

মুনিম দাঁড়িয়ে- দাঁড়িয়েই আয়তুনের একটা বুক খামচে ধরে। অল্প দিন হলো এ লাইনে আসা মেয়েটার শরীরে এখনও একটা খাঁজও পড়েনি। আয়তুন বুকের যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে; তাতে তার স্নায়ুগুলো অন্যরকম একটা তৃপ্তির জারকে খেঁকিয়ে ওঠে। মেয়েটার কচি বুকটা তার মুঠির লম্বিত চাপে ডিম্বাকৃতি থেকে বেলুনের মতো দীঘল-চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে !

আয়তুনের বুকের উত্তাপ আর আকৃতির রুপান্তর দেখার সময় তার কই? সে ঠার করে তার হাতটাকে। আশ্চর্য এক জিনিস হচ্ছে এই হাত। মানুষ তার কব্জিকে ইচ্ছা মতো বদলাতে পারে। মুমূর্ষের মুখে জল তুলে দিতে পারে, পারে দুর্বলের টুটি টিপে স্তব্ধ করে ফেলতে। সে শরীরময় বিচিত্র অনুভব টের পায়। ভরা নর্দমার মতো তার ভেতরটাও এক আদিম সুখে গলগল করে উপচে ওঠে।

মিশকালো অন্ধকারের মাঝে নাঙা আয়তুনকে দেখার সাধ হলে মুনিম তার বন্ধ চোখ দুটিতে লাইট জ্বালিয়ে নেয়;…আহ…তার লোভতুর ক্ষীণ কটি, চওড়া-চেটালো পাছা, নাছোর ভগমানের মতো রহস্য ভরা দেমাগি স্তন আর কামনার জ্বালাÑধরা চোখ দুটো নিয়ে সে কাৎ হয়ে পড়ে আছে একটা মাঝবয়েসি ভল্লুকের হাতে!

মুনিমের ব্রহ্মতালু জ্বলতে শুরু করে। সে বুঝি পালাতে চায়। কিন্তু কোথায়?

উচ্ছিষ্ট আয়তুনের ভেতর অনাদি কালের এক নারী মুখ লুকিয়ে অপেক্ষা করে। একটু বুঝি কেঁদেও লয়। ঘরের অন্ধকারে আরও অন্ধকার হয়ে মুনিম তার বুক দুটো ডলতেই থাকে। বাইরে বাঁশ ঝাড়ের ছিংলা-কি র মাঝে দরকচা চাঁদটা অনাহকের মতো উঁকি মারে। হয়তো সে বাঁশ ঝাড়ের আড়াল দিয়েই জন্মের মতো চলে যাবে।

আয়তুন চাঁদটা দেখার জন্য ঘরের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছটফট করে।

একটা একশ টাকার নোট ছোটখাট কালচে ছায়াটার দিকে মুনিম কফের দলার মতো ছুঁড়ে মারে। আহত, অসুখী, দুবলা প্রাণীটা সহজে ছাড়া পেয়ে আনন্দে কিচিরমিচির করে ওঠে। আর সে ভাবে, কত কম পেয়েও মাগিটা খুশিতে ভরা নদীর মতো কলকল করছে।

ওরা ঝুপরিটার বাইরে আসে। বাঁশঝাড়ের ফাঁকে খড়ের আগুনের মতো লাল-কুক্কা চাঁদের দিকে শরীর পেতে আয়তুন এমন ভাবে দাঁড়ায়, যেন জ্যোছনার তরল ধারা দিয়ে সে মন-গতর ধুয়ে সাফ করে ফেলবে!

মুনিম চুপচাপ দাঁড়িয়ে মেয়েটার মনের দিশা খোঁজে। আর ভাবে, কী পেলে সেও একটু খুশি হতে পারে!

বড় রাস্তার দিকে ফিরতে ফিরতে বিষন্ন মুনিম, মানুষ নামের ছোট্ট শব্দটার সুদ-আসল গুনতে শুরু করে। একটা অসার শূন্যতার মাঝে নিজের চোখ দুটোও বুঝি বেভুলার মতো একবার মুছে লয়। নিরালম্ব এতিমের মতো কী এক বেদনা সর্বদা কুরেকুরে তার বুকটা খায়। আর ঠিক তখণি মনে খটকা লাগে; বাঁশতলার হুড়াহুড়িতে অবশিষ্ট নোটটা আছে-ত ?  

সে বুক-পকেটে টোকা দিয়ে দেখে। স্থিত নতুন নোটখানার দেমাগি শরীর থেকে একটা ধাড়ালো-চপল-সাংকেতিক শব্দ ভেসে আসে। ঝুপড়ির মানুষটার কাছ থেকে সংক্রামক রোগের মতো যে কৌতুহল তার মগজে জেগে ওঠেছিল, নতুন টাকার মায়াবী শব্দে তা মুহূর্তে মুছে যায়। তখন সে বিরাট আনন্দে তার চারপাশের অন্ধকারকেই নিজের বুক পকেটে মজুদ করতে শুরু করে…

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

ফসল | শেখ লুৎফর

Sat Aug 14 , 2021
ফসল | শেখ লুৎফর দুর্গা মাইকি, জয়… দুর্গা মাইকি, জয়…     সমস্বরের চিৎকার আর ঢাকের দ্রিম দ্রিম শব্দ, কালীবাড়ির আখড়া থেকে নিথর বিলের উপর দিয়ে উড়ে এসে, সজলের পিঠে হুড়মুড় করে পড়ে আর তার ধাক্কায় সজলের অধৈর্য হাতের আঙুল ফুঁড়ে বৈঠার কোমরে, গতরের তাবৎ ঝাল ঢেলে দিলে, শান্ত পানির বুকে রাগী […]
Shares