অরু | শেখ লুৎফর

অরু | শেখ লুৎফর

    আমার পৃথিবীটা ছোট হতে হতে গুটিকয় মানুষ, বাসা আর বাসার ছাদে এসে আটকে গেছে। সকালটা কাটে বাসার ছাদে। কোদাল, ছেনি, দা সব মজুত থাকে সিঁড়িকোঠার টিনের চালের কড়িবর্গায়। টবের গাছগুলোর সাথে আমার আত্মার মহ্বত। তাদের নিয়ে কাজ করতে করতে আমি লেখার চরিত্র নিয়ে ভাবি। দশ-বিশ মিনিট বাদে বাদে কাজ ফেলে হাওরের দিকে তাকিয়ে থাকি। বর্ষার ভরাট হাওরের বুকের দিকে তাকিয়ে আমার লেখার জগতে হাঁটি। চরিত্র খোঁজি। দুনিয়ার যত আকামের মানুষ হলো আমার চারণভূমি। একজন একজন করে তাদেরকে নিয়ে আমি খুঁটাখুঁটি করি। তাদের সুখ-দুঃখ দিয়ে গড়া জীবনটা তন্নতন্ন করে বাজিয়ে দেখি। যদি সুরটা মনমতো হয় তবে আমি তাদের সাথে আলপ জোড়ি। একদিন বউ এসে দেখে আমি কাজ ফেলে হাওরের দিকে মুখ করে বসে জারে জারে কাঁদছি আর হাত নাড়িয়ে কথা বলছি। আমার দু’গাল ভেসে যাচ্ছে চোখের পানিতে। আমি তখন ‘চন্দ্রবতীর পুত্রগণ’ উপন্যাসের মালেকের সাথে কথা বলছি। আমি জানি, আজ রাতেই মালেক বিষাক্ত সাপের ছোবলে মরবে।

    সারদিন যত কষ্টেই যাক, যত ক্লান্তিই থাকুক। রাতে ছাদে এসে মোবাইলের লাইট দিয়ে টবের বাসিন্দারেকে না দেখে আমি লেখতে কিংবা ঘুমাতে যাই না। তাদের শরীর-স্বাস্থ্য, অভাব, অসুখ দেখতে দেখতে আমার যন্ত্রনা ভরা হৃদয়টা হাওরের মতো বিশাল আর বৈচিত্রময় হয়ে ওঠে। বুকের মাঝে কী একটা যেন খুব দ্রুত বেড়ে উঠতে থাকে।

    আজও রাতের খাওয়া সেরে ছাদে গেলাম। আজ আর মোবাইলের লাইট জ্বালিয়ে টবের ফুল দেখি না। উত্তরের বড় টপটায় কী চিচিঙ্গার বীজ ফোটে চারা গজিয়েছে? এই জিজ্ঞাসা আমাকে তাড়া করে না। আজ বুকটা পাথরের মতো ভার আর স্তব্দ। গলার কাছে রোদনের মতো একটা কী যেন আটকে আছে। তাই বিশাল আকাশের নিচে গিয়ে ক্ষুদ্র একটা পিঁপড়ার মতো চুপচাপ বসে থাকি। তুচ্ছ, দীন একটা মানুষের নিশ্বাস পড়ে। তখন বুকের স্তরে স্তরে হাজারটা মুখ কথা বলতে শুরু করে। বউ যখন ভেতরে ভেতরে বেশি রেগে থাকে তখন আমাকে লেখতে দেখলে, চাপা স্বরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, লেখা তোমারে কী দিছে?

    আমার লেখালেখিটা বুঝি তার সতীন। চাপা স্বভাবের গম্ভীর মানুষটা যখন তার বড় বড় চোখ মেলে তাকায় তখন তার সেই দৃষ্টিতে অনেককিছু দেখি। তার নরম আর বিবেচক হৃদয়টায় আমার অটুট সিংহাসনটা দিব্যি দেখতে পাই। কিন্তু এইসব বিষয়ে সে মুখে কিছু বলে না। ফোনে কারো সাথে আলাপের সময় যদি আমার লেখালেখির ভালো কিছু শুনতে পায় তবে কখনও কখনও আমার পাশে এসে বলবে, আমি যে তোমাকে কতটা পছন্দ করি টের পাও?

আমার মনে শত কথা লাফিয়ে ওঠে। ইচ্ছা করে তাকে সাথে নিয়ে ছাদে চলে আসি। কদমের নরম ছায়ায় বসে বন্ধুর মতো দুইজনে অনেকক্ষণ কথা বলি। সে যেহেতু সরাসরি কোনোদিন কিছু বলে না। তাই আমিও হাজার হাজার কথা দিয়ে গল্পের মতো তাকে একটা কিছু বুঝিয়ে দেই। কিন্তু তার উজ্জ্বল চোখের তলে অসম্ভব ভদ্র আর তীক্ষ্ণ আর দূরদর্শী মানুষটাকে দেখে আমি শুধু উপর-নিচে মাথা ঝাকিয়ে জানিয়ে দেই যে তার ভালোলাগা আমি খুব ভালোভাবে টের পাই।

    আজ তিনদিন ধরে একবারও কম্পিউটার ওপেন করি নি। একবারও রাতের আকাশের দিকে তাকিই নি। ছাদে শুয়ে, বুকের কাছে মুখ নিয়ে মরারমতো পড়ে থাকি। তিনবেলা বউ আর মেয়ের সাখে খাবার টেবিলে বসছি নামমাত্র। মেয়েটা পড়ার টেবিল ছেড়ে বারবার আমার কাছে এসে আলাপ জমাতে চেয়েছে। আমার সারাভুবন জোড়ে বোবা কান্না। আলাপ কীআর জমে ?

    মাঝে মাঝে দুচোখ উপচে উঠে পানিতে। আমি চোখ মুছে পাশ ফিরি। ঘুরেফিরে চোখ পড়ে দেয়ালের একটা ছবির ওপর। লেমিনেট করা ছবিটা একটা পাখির। সে নীল আকাশে দুই ডানা ছড়িয়ে উড়ছে। তার মুক্ত পাখার মাঝে এতদিন আমি অরুর হাসি হাসি মুখটা দেখতে পেতাম। কিন্তু গত তিনদিন ধরে আমি ছবিটার মাঝে কান্নারত অরুকে দেখতে পাই।

    অরুর সাথে আমার দেখা হয়েছিল একটা নির্বাচনের ডিউটিতে গিয়ে। সহকারী প্রিজাইডিং কর্তা হিসাবে তারা আমাকে সব দরকারী জিনিসের সাথে দুইজন পুলিং অফিসারকেও দিয়েছিলেন। তাদের একজন ছিল অরু। অনেক বছর ধরেই নির্বাচন তো একটা তামশা তাই কেন্দ্রে ভোটারটোটার একদম ছিল না। মাঝে মাঝে এক-দুইজন আসলে ঝটপট তাদের বিদায় করে ফের আমরা তিনজন আলাপে মজতাম। আমার দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে তার চোখে সারা দুনিয়াটাকে হেসে ওঠতে দেখছি সেই সকাল থেকেই। 

    দুপুরে পাশের বাজারে খেতে গিয়ে তার জন্যও এক পেকেট খিচুরি নিয়ে এলাম। সে একটু হেসে টাকাটা আমায় দিল। আমি অবাক হয়ে তার লালিম মাড়ি থেকে উঁকি দেওয়া হীরকের ছোট ছোট দানাগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মানুষের দাঁত এত সুন্দর হয়!

    সে তার হাতব্যাগ খুলে আমাকে একটা এলাচির গোটা দিল। দানার সুগন্ধের মাঝে আমি তার সুন্দর মনের একটা গড়ন পেয়ে যাই। চেয়ে দেখি কুঁকড়া কুঁকড়া ঘন চুলের সিঁথিতে সিঁধুরের মোটা রেখা। ভোটাররা ভিট দিতে এসে তার দিকে হা-করে তাকিয়ে থাকে। তার শরীরের মিষ্টি গন্ধে কেমন বেভুলার মতো ত্যাব্দা মেরে থাকে। 

    আড্ডার সময় বাউল মকদ্দস আলম উদাসী ভাই মাঝে মাঝে বলেন, মেয়েরা হচ্ছে মা ফাতেমার জাত। তারা আমাদের মা। 

কথা বলার সময় মাঝে মাঝে আমি এইভাবে তার দিকে তাকাই। তার ঠোঁটে নীরবে জ্বলে এক চিলতে হাসি। যা শুধু আমিই দেখতে পাই।

    ভোটের সব আনুষ্ঠানিকতা মিটিয়ে টাকা হাতে পেতে পেতে সন্ধ্যাটা উতরে যায়। পথে নেমে দেখি চাঁদও উঠেছে আকাশে একখানা! আজ বুঝি সে বিদ্যুতের বাতিকেও হারমানাবে! 

    পথে কোনো যানবাহনের পাত্তা নাই। তাই অনেকেই হাঁটছিল। আমিও তাদের সাথে পা বাড়াই। আনমনে একাই হাঁটছিলাম। একটু পরেই দেখি আমার পেছনে সে, একটু আস্তে হাঁটেন, মা কুলিয়ে উঠতে পারবে না। 

বুঝলাম, দেহরক্ষি হিসাবে সাথে মাকে এনেছে। আমি ঘুরে প্রবীনাকে আদাব দেই। তিনি বলেন, এতটা পথ কীকরে হাঁটব?

আমি হাঁটতে হাঁটতেই বলি, পথেই পাবো। ইলেকশান ভাঙছে তো এখন ড্রাইবাররা গাড়ি নিয়ে নামবে। 

আর আলাপ জমে না। আমিও ভয়ে ভয়ে আছি, সত্যি যদি গাড়ি না পাই।

    একটু পরেই চেয়ে দেখি সে আমার পাশে। মা একটু পেছনে। আমাদের সামনে-পেছনে বিস্তর লোক। ঠিকমতো খাওয়া নাই, বিশ্রাম নাই তবু আমি বুঝি উড়ছিলাম! এইরকম রাতে আমি লেখা ফেলে বাসার ছাদে আলো-আঁধারিতে রহস্যঘেরা হাওর সামনে নিয়ে বসে থাকি। 

    কেমন জানি আনমানা হয়ে গেছিলাম। ভুলেই গেছিলাম যে পাশে একজন আছে। সে একটু পরে আস্তে আস্তে বলল, রাতটা খুব দারুণ।

মিষ্টি গন্ধে মৌতাত একটা টেবিল ঘিরে একটু একটু করে তার অনেকখানিই জানা হয়ে গেছিল। তাই তার গলার স্বরে আমি চমক খাই।  কিন্তু কিচ্ছু বলি না। সে একই রকম গলায় বলে, ইচ্ছা করছে গলা ছেড়ে গাই, আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে…।

আপনি গাইতে পারেন?

একটু একটু।

আমি তার স্বামীর কথা জিগাই, দাদা আসল না কেন?

সে জগন্নাথপুর বাজারে একটা কাপড়ের দোকান চালায়।

    শেষমেষ একটা খালি ইজিবাইক পাওয়া গেল। সবাই হুরুমর করে উঠতে চাইছে। আমি এক লাফে পেছনের সীটে উঠে বসি। সাথে সাথেই সে আমার পাশের সীটটা দখল করে ফেলে। তার হালকা শরীরের ক্ষীপ্রতা আমাকে মুগ্ধ করে। আমি আরও চেপে তার মায়ের জন্যও সিট রাখি। কিন্তু তিনি তার মেয়ের পাশেই বসেন। অরু আমার পাশে। সিটের মানুষের চাপে আমাদের দুইজনের শরীরের পাশটা পরস্পরের শরীরে চেপে আছে। ভাঙা রাস্তায় গাড়ি চলছে হেলেদোলে। তার শরীরের হালকা-মিষ্টি গন্ধে আমার ঘুম চলে আসে। তবু আমি যতটা পাড়া যায় তার থেকে শরীর বাঁচিয়ে, মাথার উপরের রড ধরে, চোখ বোজে ঝিমাই।

    তিনদিন পর একটা অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসে, আদাপ স্যার। চিনছেন?

হ্যালো শব্দেই আমি তার গলার স্বর চিনে ফেলেছিলাম। বুঝলাম নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নিয়োগপত্র থেকে ফোননাম্বার পেয়েছে। প্রাইমারীর টিচার তো ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ক্লান্তিঝাড়বে। 

    এইভাবে সে চার-পাঁচদিন পরপর ঠিক দেড়টায় ফোন দিত। বছরখানেকের মাঝেই অরু তুমিতে নেমে আসে। আমার আরো কয়েক মাস লাগে। হয়ত কোনোদিনই তাকে তুমি বলা হতো না, যদি না সে এই বিষয়ে আমাকে ক্ষ্যাপাতে শুরু না করত।  

    বউয়ের চোখের তলার সেই অসম্ভব ভদ্র আর হৃদয়বান মহিলাটার দিকে তাকিয়ে আমি তার সাথে রফা করে নেই, ¯্রফে আমরা বন্ধু। তুমি আমাকে পুরুষ ভাববা না। যেমন আমি তোমাকে কখনই নারী ভাবি না। 

ওপাশ থেকে সে চ্যাঁচায়, জানি জানি, সেই প্রথম দিন থেকেই জানি। বেশি বাহাদুরী দেখাবা তো তোমার মুছ কেটে ফেলব।

হাসতে হাসতে আমার দম আটকে আসে। সে বলে, তুমি জানো না, মুছুয়ারা প্রেমিক পুরুষ হয়। 

সেই থেকে সে আমাকে মুছুয়া ডাকে। 

    ওপাশ থেকে সে চেঁচিয়ে জানতে চায়, বলত মুছুয়া, অরু শব্দের অর্থ কী?

আমি গম্ভীর গড়লায় উত্তর দেই, রক্তবর্ণ সুন্দর বদন।

সে অবাক হয়। আমোদ ভরা গলায় ফিসফিসিয়ে বলে, বিয়ের আগে মৌমাছির মতো ছোটে আসা প্রেমিকদের কাছে জানতে চাইতাম, অরু শব্দের অর্থ কী? তারা হা-করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে আমি বলতাম, তুমি মুর্খ, তোমার সাথে আমার পোষাবে না।

    মাসখানেক ধরে অরুর কোনো পাত্তা নাই। তরশু মনে পরতেই ফোন দিলাম। ওপাশে ভারী গলা, এতদিন পর!

বিশ্বাস কর দোস্ত খুব ব্যাস্ত ছিলাম।

জানি।

জানি বলে সে চুপ করে থাকে। আমার ভেতর কেমন খটকা লাগে, অরুত এমন না! ফোন দিলেই ভোরের পাখির মতো হাজার গলায় কলরব করে ওঠে, এতদিনে মনে পড়ল! দায় শুধু আমার? সামনেরবার দেখা হলে মুছুয়া তোমার মুছ যদি আমি না কাটছি…।

সেই অরু এত নীরব! এপাশ থেকে আমি ধড়ফড় করে ওঠি, অরু তোমার কী হইছে? সত্যি করে কও…।

ওপাশ থেকে চাপা কান্নার ফোঁপানি ভেসে আসে। আমার বুকটা নীরবে খানখান হয়। আমার গলায় মিনতি ঝড়েপড়ে, প্লিজ! অরু অবোঝ হইয় না, তোমার কী হইছে?

ওর দুইটা কিডনিই ডেমেজ হয়ে গেছে।

    সেই থেকে আমি আছি কী নাই। বউটাকে আমি গোপনে খুব সমীহ করি। ছাদের দিকে তাকিয়ে আমি মরার মতো পড়েছিলাম। সে নিঃশব্দে এসে আমার সিথান দিকে বসে, শরীর খারাপ?

আমি ডানে-বামে মাথা নাড়ি।

মন খারাপ?

আমি বাধ্য শিশুর মতো মাথা নেড়ে মরা গলায় বলি, হ।

কাল শান্তিগঞ্জে শাজাহান ভাইয়ের কাছ থেকে ঘুরে আসবা। না হলে ছাতকে আজাদের কাছে চলে যাও। ওদের সাথে আড্ডা দিলে দ্যাখবা সব ঠিক হইয়া গ্যাছে।

আমি পাথর চোখে ছাদের দিকে তাকিয়ে আছি দেখে সে আরো ঘন হয়ে মাথায় হাত রাখে। আমি অবোঝ, অনাথের মতো গড়ান দিয়ে তার কোলে মুখগুঁজি। 

    একটু পরেই আমি ভবের বাজারের দিকে ছোটি। সেখানে আমার এক ছাত্রের কম্পিউটারের দোকান থেকে কিডনি রোগীর পথ্য, নিয়মনীতি বিষয়ে তিনজন পুষ্টিবিদের উদেশনামা ডাউনলোড করে প্রিন্ট দেই। তারপর ফোন লাগাই, অরু তুমি কৈ?

উপজেলা শিক্ষা অফিসে আছি। 

প্লিজ, আমি বিশ মিনিটের মধ্যে আসছি। 

অরু শিক্ষা অফিসে এসে আমাকে ফোন দিলে উপজেলা অফিসের সামনের রেন্ট্রিতলায় আমরা দেখা করতাম। তারপর পাশাপাশি আলাপ করতে করতে মর্ডাণ কিংবা ফিজা’র কেবিনে গিয়ে বসতাম। অরু আমাকে নিয়ে ফাজলামী করত। হাসাত। সবশেষ ফিসফিস করে বলত, তোমার গোঁফটা একটু ছোঁয়ে দেখি ?

আমি নীরবে হাসতাম। সে একদিন সত্যি সত্যি তার হাতব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা কাঁচি বেড় করল, আর হাসবা, তো বোকা তোমার গোঁফ কেটে নেব। 

    প্যাকেটটা হাতে দিয়ে বললাম, এর সবকটা প্রথমে তুমি তিনবার মন দিয়ে পড়বে। তারপর সেই ভাবেই দাদাবাবু যেন চলে।

সে ডানে মাথা কাত করে।

কীভাবে চিকিৎসা শুরু করছ?

আপাতত সপ্তাহে একদিন ডায়ালাইসিস। তারপর কিডনি ট্রান্সফার।

টাকা?

ওর দোকানটা নিয়ে কথা হচ্ছে। বেচেদিব।

আমি ওকে আড়ে আড়ে দেখছিলাম : রক্তবর্ণ সুন্দর বদনটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। কপালে চিন্তার ভাঁজ। মাথার কুঁকড়া চুলগুলো পাখির বাসার মতো। এর মাঝেই যেন তার বয়স দশ বছর বেড়ে গেছে। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল! কথা বললেই কেঁদে ফেলব ভয়ে আর কোনো কথা হলো না। পৌরপয়েন্টে গিয়ে আমি তাকে একটা সিএনজি চালিত অটোতে তুলে দিলাম। হায়! অরু তোমার জীবনটা কী পদ্মার চরের মতো ধূ ধূ  বালু হয়ে যাবে? তুমি কী আর কোনোদিন আমাকে মুছুয়া ডাকবে না ?

    তারার দিকে পাথর চোখে চেয়ে চেয়ে আমি ঠিক দশটায় অরুকে ফোন দিলাম। হ্যালো?

হুঁম।

দাদাবাবু এখন কী করছেন?

ডায়ালাইসিস থেকে এলে প্রথমদিন তো জ্বর থাকে। এখন বেহুঁশের মতো পড়ে আছে।

তুমি খাইছ?

হ।

কিডনি ট্রান্সফার কী ঢাকায় করবা?

হ।

ডোনার পাইছ?

না। তবে চেষ্টা চলছে।

আমি নীরবে ভেবে চলি : আমার জানা মতো একজন একটা কিডনি নিয়ে বেঁচে আছে। একটু সাবধান থাকলে একটা নিয়েই অনেকদিন বাঁচা যায়। ফোনের ওপাশে অরু অপেক্ষা করছে। কত আর বয়স? না হয় ছাব্বিশ। না হয় ত্রিশ। তার সারাটা জীবন সামনে পড়ে আছে। সবি পড়ে থাকবে। শুধু হারিয়ে যাবে তার মুক্তাঝরা হাসি। আমি আবার তাকে ডাকি, অরু?

বল।

আমি যদি ডোনার হই।

ওপাশটা  নীরবে ফোঁপিয়ে ওঠে। অনেকক্ষণ ফোঁপায়। আমার চোখের সামনের তারাগুলোও ঝাপসা হয়ে আসে। চিত হয়ে শুয়ে থাকার জন্য দুই চোখের কোনা দিয়ে গরম পানির ফোঁটাগুলো দৌড়ে দৌড়ে আমার দুই কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে। অকেক্ষণ পর কান্নার বেগ কমে এলে সে বলে, না, এইটা হয় না।

আমি শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠি। চিৎকার করে জানতে চাই ,কেন! কেন হয় না?

ওপাশে আবার ফোঁপানি। বুকভাঙা রোদন, সবাই আমাকে খারাপ ভাববে। যার জন্য দিবা সে-ও আমাকে নষ্ট ভাববে। আমি তুমি যে ভাই-বোনোর মতো ছিলাম, বন্ধু ছিলাম এই কথা ভগমান বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না।

    আমি আস্তে আস্তে আবার ছাদে শুয়ে পড়ি। এই জগতের অলিখত একটা বিধি আছে। এর বাইরে কেউ যেতে পারে না। অরু যদি রাজিও হয় আমার বউ মানবে? একটুও না। সে সশব্দে আমার প্রাণদ- ঘোষণা করবে। মেয়ে তার বাপের চরিত্রের ওপর আস্থা হারিয়ে আর কোনোদিন এসে আব্বু বলে পাশে বসবে না। কারণ দুনিয়ার কিছু কিছু মানুষের জগৎ এইরকম একটা মর্মদ-ের মধ্যে দিয়ে চলতে ভালোবাসে।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

মাওলা প্রিন্সের দিবারাত্রি প্রেমকাব্য | খাদিজা খাতুন সাথী

Wed Oct 6 , 2021
মাওলা প্রিন্সের দিবারাত্রি প্রেমকাব্য :কবি এখানে মদমত্ত মাতালের মতো উন্মাদ, কবি এখানে বিশুদ্ধ বিরহাক্রান্ত | খাদিজা খাতুন সাথী 🌱 কবিতা হচ্ছে শব্দের ইন্দ্রজাল। তার পরতে পরতে রয়েছে সূক্ষ্ম শব্দযোজনা। শব্দের এই শিল্পকে অনুভব করতে হয় হৃদয় দিয়ে। কারণ, ওর জন্মই যে কবি-হৃদয়ে। আর, কবি হচ্ছে সেই শিল্পের সুন্দরতম প্রকাশের নির্ণেতা। […]