মাওলা প্রিন্সের দিবারাত্রি প্রেমকাব্য | খাদিজা খাতুন সাথী

মাওলা প্রিন্সের দিবারাত্রি প্রেমকাব্য :কবি এখানে মদমত্ত মাতালের মতো উন্মাদ, কবি এখানে বিশুদ্ধ বিরহাক্রান্ত | খাদিজা খাতুন সাথী

🌱

কবিতা হচ্ছে শব্দের ইন্দ্রজাল। তার পরতে পরতে রয়েছে সূক্ষ্ম শব্দযোজনা। শব্দের এই শিল্পকে অনুভব করতে হয় হৃদয় দিয়ে। কারণ, ওর জন্মই যে কবি-হৃদয়ে। আর, কবি হচ্ছে সেই শিল্পের সুন্দরতম প্রকাশের নির্ণেতা।

শূন্যের দশকের প্রাণবন্ত কবি মাওলা প্রিন্স। জন্ম ১৪ জানুয়ারি ১৯৮৩। হিমালয়ের পাদদেশ উত্তরাঞ্চলের লালমনিরহাট জেলায় জন্মগ্রহণ করেন কবি। অপার প্রকৃতির মন্দ্রছন্দে লালিত শৈশব-কৈশোর কেটেছে কবির নিজ জেলা লালমনিরহাটে। তাঁর স্কুল-জীবনের পুরো পড়ালেখা সম্পন্ন হয় চার্চ অব গড উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। এরপর লালমনিরহাট সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দেন সিল্কসিটি খ্যাত রাজশাহীতে। স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে ২০০৩ সালে স্নাতক এবং ২০০৪ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ‘নজরুলের কবিতায় পুরাণ ও চিত্রকল্প’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের জন্য ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন ২০১৬ সালে। ০১ এপ্রিল ২০০৭ সালে মাওলা প্রিন্সের কর্মজীবনের সূত্রপাত ঘটে এশিয়ান ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদানের মধ্য দিয়ে। এরপর ০১ এপ্রিল ২০০৮ সাল থেকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনায় নিযুক্ত রয়েছেন তিনি। কবি পরিচয়ের পাশাপাশি মাওলা প্রিন্স একজন অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক, গবেষক এবং সাহিত্য-সমালোচক। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলো হলো : ‘নিশীথপ্রদীপে শঙ্খঝিনুকের চাষ’ (২০১৩), ‘দিবারাত্রি প্রেমকাব্য’ (২০১৪), ‘সব ঠিক, ঠিক কি, ঠিকটা কী’ (২০১৯) এবং ‘আবার বছর কুড়ি পর’ (২০২০)। তাঁর অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : ‘কালোত্তরের প্রতিশ্রুতি : প্রসঙ্গ সাহিত্য’ (২০০৯), ‘রশীদ করীমের উপন্যাস : বিষয়বৈভব ও শিল্পরূপ’ (২০১৪), ‘অনুধ্যানে নজরুল’ (২০১৭), ‘কথাসাহিত্য পাঠ ও রূপতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ’ (২০১৯) এবং ‘নজরুল পৌরাণিক অভিধান’ (২০২০)।

প্রত্যেক কবির পারিবারিক-সামাজিক পরিবেশ প্রভাব ফেলে তাঁর কবিতায়। ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে কবির মনস্তত্ত্ব, বিবর্তন, পরিবর্তন-প্রক্রিয়া তাঁর সৃষ্টিতে নিয়ে আসে নতুনত্ব। শব্দ-খেলার এই নতুনত্বই এক কবি থেকে অন্য কবিকে করে স্বতন্ত্র। আবার, পরিবেশ-পরিস্থিতির ক্ষেত্রবিশেষে একই উদ্দীপক ভিন্ন ভিন্ন কবি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন। আর, সেখানেই চিহ্নিত হয় কবির সৃষ্টিকর্মের বৈচিত্র্য।

মাওলা প্রিন্স আধুনিক ভাবধারাপুষ্ট কবি। কবিতাঙ্গনে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি রচনা করেছেন চারটি কাব্যগ্রন্থ। সেগুলোর প্রত্যেকটি বিষয় ও আঙ্গিকে রয়েছে ভিন্নতা। মাওলা প্রিন্সের কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ‘নিশীথপ্রদীপে শঙ্খঝিনুকের চাষ’ কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে হলেও তাঁর পূর্ণাঙ্গ কবিত্বের বিকাশ ঘটেছে ‘দিবারাত্রি প্রেমকাব্য’ কাব্যের মধ্যে । কবিয়াল থেকে কবি হয়ে ওঠার গল্পগাথা মাওলা প্রিন্সের ‘দিবারাত্রি প্রেমকাব্য’। আধুনিক ও উত্তরাধুনিক সময়ে এরূপ শাশ্বত ও মন্ত্রমুগ্ধ প্রকাশ খুব একটা নজরে আসে না। কবি এখানে মদমত্ত মাতালের মতো উন্মাদ। আবার, কখনো বিরহে কাতর হয়ে যাপন করেছেন অশ্রুসিক্ত বিভাবরী। সব ছাপিয়ে এক ধরনের বিশুদ্ধ বিরহকাতরতা পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়। যা চিরায়ত প্রেমের পরিশুদ্ধ রূপ।

প্রেমকে উপজীব্য করে প্রেমিকার প্রতি আকুল আর্তি উচ্চকিত হয়েছে ‘দিবারাত্রি প্রেমকাব্যে’। কবিতাটি আরম্ভ হয়েছে এক ধরনের বিরহ নিয়ে। একটা দীর্ঘশ্বাস কম্পন তুলে পাঠক-হৃদয়ে। মিলনে নয়, বরং বিচ্ছেদেই প্রিয়াকে আরও কাছে পান কবি। এ যেনো শরৎচন্দ্রের ‘বড় প্রেম’। যা ক্ষণে কাছে টানে, ক্ষণে দূরে ঠেলে দেয়; কিন্তু, বিচ্ছেদের চিতানলে পুড়ে কবি খাঁটি সোনা হন। তাই কবি একমনে বলে ওঠেন :

তবুও বলবো না তোমায়, ‘এসো মিলি সুখ-অভীপ্সায়—’
তবুও বলবো না তোমায়, ‘এসো মিলি নব-পূর্ণতায়—’
তবুও বলবো না তোমায়, চুম্বনে হোক জয়—’
বিরহে-বিরহে বেদনায়-বেদনায় কবির চেতনায় তুমি-আমি চির অক্ষয়।

প্রেম কখনো মন ছাপিয়ে একেবারে শরীর সর্বস্ব হয়ে যাবে না। মন ছুঁয়ে তবেই শরীর ছুঁতে হয়। কবির সেই ইংগিত লক্ষণীয়। কবি নির্মলেন্দু গুণের (জ. ১৯৪৫) কবিতার প্রেমিকার আক্ষেপ— ‘শরীর ছুঁয়ে দেখলে তুমি/ মন ছুঁতে আর পারলে কই’; আর, মাওলা প্রিন্সের কবতায় কামহীন প্রেমের সংশয়— ‘তবে কি কামহীন প্রেম নেই— বাঁচে না প্রেম কাম ছাড়া!’ কোথায় যেনো যোগসূত্র স্থাপিত হয়। কবি কামনা ও প্রেমের প্রভেদ করতে গিয়ে একমনে বলে উঠেন :

কারে শুধুই— কোন জনে যাই— তুমি বিহনে সব— সব কিছু বৃথাই।
কাকে শুধাই— কী করে বোঝাই— হৃদয় পেলো ক’জন—
হৃৎপিণ্ড পেলো সবাই।

যৌনতার প্রসঙ্গ তাঁর কবিতায় একেবারে আসেনি, এমন নয়। তবে, হাংরি বা বিট জেনারেশনের মতো শুধু দেহসর্বস্ব কামান্ধতার প্রকাশ ঘটাননি। বরং প্রেমে দেহ আর মনের সুন্দর সংমিশ্রণ ঘটেছে তাঁর কবিতায়। রক্ত-মাংসের মানব-মানবীর প্রেমগীত রচনা করেছেন কবি। কোনো স্বর্গের দেব-দেবতা বা কল্পকাহিনি নয়। কোনো কিছুতে হার না মানা কবি কেবল তাঁর মেঘবালিকার প্রেমেই নতি স্বীকার করেন। কবি যুগ যুগ ধরে কেবল তার প্রেমেই পরাজিত হতে চান। সেই কবিই আবার অনেকটা কণ্টকময় পথ পেরিয়েও প্রেয়সীকে স্বীকৃতি দিতে অপারগ। সবলের মতো তাঁকে আঁকড়ে ধরতে পারছেন না। কুলকাঠের অনল বুকে চাপা দিয়ে কবি উচ্চারণ করেন : ‘এসো না এসো না তুমি প্রেম— নূতন করে— অশ্রু ঝরে— এতটা কাল পরে—।’ নিষ্ঠুর বাস্তবতার কাছে নতি স্বীকার করে কবির নির্মম উচ্চারণ— ‘না’।

বিচ্ছেদের চিতানলে পুড়ে কবির সৃষ্টিসম্ভার আরও পূর্ণ হয়। তাবৎ পৃথিবী জুড়ে প্রকৃতির সৃষ্টিভাণ্ডার দেখে মুগ্ধ হন কবি। তাঁর বিস্ময় আর আশ্চর্যের যেনো শেষ নেই। আমাদের চোখে যা সাধারণ কবির চোখে তাই অসাধারণ হয়ে ধরা দেয়। কবি অমাবস্যার নিচে লুকায়িত আগামীর চন্দ্রালোক দেখেন। আমরা দেখি শুধু ঘোর অমানিশা। কবি আর সাধারণের মূল পার্থক্য এই সূক্ষ্ম চেতনায়, বোধে। আর, সেজন্যই কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, ‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি’। সেই একই চিন্তার বিস্ফোরণ মাওলা প্রিন্সের কবিতায় :

সাধারণে যা সরল—
চলে যায় অবিরল—
সাদা চোখে পড়ে না ধরা;
কবির চোখে তাই অতি—
তাই দুখ তাই প্রীতি—
ওর দুচোখ জুড়ে অশ্রু ভরা।

তাই, কবিকে প্রশ্ন করা যায় না তিনি কেনো কাঁদেন, কেনো হাসেন। কবি ‘ফুলের বেসাত’ করেন। তাঁর ‘বখশিশ্ কেবল ফুলকুমারী’। তাই, কবিকে জানতে হয় ‘শুধু ভাব করে— আর ভালোবেসে’। বিরহে কবির ‘হৃদয় আজ মরা গাঙ’। কবির নয়নাকাশে যে ভালোবাসা উদিত হয়েছিলো অজস্র বছর পরও সে ভালোবাসা তার হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে। হার না মানা মানসিকতা কবি চিত্তে। লড়াকু কবি জানেন একমাত্র সত্য প্রেমই জীবনকে জাগাতে পারে। জীবনকে সঞ্জীব করে তোলে। তাই কবির অন্তরভাষ্য :

হার! হার বলে কিছু নেই
সত্যিকার প্রেম— সে তো হারতে জানে না;

যে প্রেম জীবনকে জাগাতে পারে সে প্রেম শুদ্ধ, পূত-পবিত্র। তাই, অজস্র বছর পরও সেই প্রেম কবির হৃদয়-মন্দিরে অম্লান হয়ে আছে। কিন্তু, যে প্রেম জীবনকে জাগাতে পারে না সে প্রেম মিথ্যা-প্রবঞ্চনা ছাড়া কিছুই নয় :

যে প্রেম বিকাশে বাধা— সে তো প্রেম নয়— নেই ওর প্রয়োজন—
যে প্রেম জীবনকে জাগাতে পারে না— জড় করে— ও মিথ্যে— প্রবঞ্চন—।

কোনোরূপ প্রতিদান ছাড়াই একপাক্ষিক ভালোবেসে যেতে চান কবি। প্রেয়সী ভালোবাসবে কিনা, তা তার বিষয়। কিন্তু, কবি ভালোবাসায় বুঁদ হয়ে আছেন এবং শেষপর্যন্ত ভালোবেসে যেতে চান। কবি আশাবাদী তাঁর এই ভালোবাসা উপেক্ষা করার শক্তি প্রেয়সীর নেই। হৃদয় নিগড়ানো ভালোবাসার কাছে নত হয়ে সে ফিরবেই কবির কাছে :

সখি, আমি ভালোবাসি যারে— সে-কি কভু আমা হতে দূরে যেতে পারে।
সে ফিরবে— সে ফিরবে— ফিরে আসবেই— অভিবাদন হবে ফুলহারে।।

আশার ওপিঠেই দুঃখ-হতাশা। আশাবাদী কবি পরক্ষণেই নৈরাশ্যে পর্যবসিত হন। হতাশা কবির ভালোবাসা নয়, বরং মিলনে ভালোবাসা ক্ষীণ হয়ে যাওয়ার ভয় কবিকে তাড়া করে বেড়ায়। কবি ভাবেন তাদের বাধাটা আসলে কোথায়? আটপৌরে হয়ে যাওয়ার ভয় কবিকে ঘিরে রেখেছে। কবি প্রেয়সীর কাছে স্পষ্ট উত্তর চান, হ্যাঁ অথবা না। হয় গ্রহণ, নয় বিসর্জন। কবি নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। প্রত্যাখ্যাত হলেও মেনে নিবেন। কিন্তু, হ্যাঁ ও না-এর মধ্যস্থলে ঋষি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন না। একটা স্পষ্ট বোঝাপড়া খুব প্রয়োজন। কবি হ্যাঁ-না সহ্য করার সাহস নিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কার?’; আর, প্রতি-উত্তরে যখন মেঘবালিকা বলে, ‘তবে শোনো, আমার কেউ নেই— আমি কারো নই— যদি কেউ থাকে—/ সে তুমি—’; তখন কবি এই ‘যদি’ শব্দটি মেনে নিতে পারেননি। কবি চেয়েছেন প্রেয়সী বলুক, আমি তোমার, আমি শুধু তোমার। সেখানে ‘যদি’ শব্দটা কবির ভিতরটাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। সমস্ত সংশয় বিসর্জন দিয়ে উন্মুক্ত কণ্ঠে ‘ভালোবাসি’ বলতে না পারায় কবি প্রেয়সীকে মুক্তি দিলেন। সেই সাথে মুক্তি নিলেন নিজেও। পরম যত্নে যে ভালোবাসার ঘর কবি বেঁধেছিলেন, আজ নিজ হাতে সেই ঘর ভাঙলেন। কবি-কণ্ঠে বিষাদের সুর-লহরি :

সখি, আর হবে না তোমার সনে—
ভাঙলাম ঘর আপনজনে—

সখি, আর হবে না তোমার সনে—
ভাঙলাম ঘর আপনজনে—

সখি, আর হবে না তোমার সনে
ভাঙলাম ঘর আপনজনে—।
যতন করি গড়লাম যে ঘর
ভাঙলাম আজি অকারণে—।।

‘দিনপঞ্জি অনুসারে আজ দশমী’ কবির প্রেমের অন্তর্জলী যাত্রা। কবির ভারাক্রান্ত অন্তরভাষ্য বুঝে নিই আমরা। মিলনে নয়, বিরহেই কবির পরম প্রাপ্তি। প্রচণ্ড ঝড়ের পর প্রকৃতি যেমন শান্ত হয়ে যায়, তেমনি আজ কবি শান্ত। ভাঙা-গড়া, বোঝাপড়া সব মাত্রা অতিক্রম করে ‘কতোকালের নির্ঘুম’ কবি আজ প্রশান্তিতে ঘুমাচ্ছেন। লক্ষণীয়, এই প্রশান্তির ঘুম ইংগিত করছে কবি যেনো আত্মাহুতি দিয়েছেন। কিন্তু, পরক্ষণেই পাঠক একটু মনোযোগী হলে স্মরণে আসবে এই কবিতারই এক অংশে কবি নিজেকে ‘জীবনবিলাসী’ আখ্যায়িত করেছেন। জীবনকে অন্যভাবে উপলব্ধি করেছেন। আত্মহত্যা কাপুরুষতা, কেবল ‘জীবনের ক্ষয়— জীবনের অপচয়—’। জীবনবাদী কবি বিশ্বাস করেন জীবনের গতি-রঙ অফুরান। কবি ‘মৃত্যু-আঁধার’ ডিঙিয়ে জীবনের জয়গান গেয়েছেন : ‘মনে রেখো, জীবন থেকে পালিয়ে মরা যায়— অমরত্বে যায় না বাঁচা।’ আমার জীবন কেবল আমার নয়, তার সাথে জড়িয়ে আছে অনেক জীবন। সেই কবি আত্মাহুতি দিবেন এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আবার, মানুষ যতোই যুক্তি দিয়ে চলুক মন চলে অযৌক্তিক নিয়মে। সেদিক থেকে কিছুটা রোমাঞ্চকর চাঞ্চল্যের জন্য পাঠকের কাছে এক ধরনের আড়াল রেখেছেন কবি। ওইটুকু আড়াল কবিতাকে আরো সমৃদ্ধ করে। সৃজনী প্রতিভার আভাস দেয়। আমরা পাঠকরা একটা ঘোরের মধ্যে থাকি। কবির সাথে পাঠকের সম্পৃক্ততা বাড়ায়।

কবি চেতনার রঙে রাঙিয়ে তুলেন সাধের কবিতার ভুবন। সেখানে বিষয়ের ভিন্নতার পাশাপাশি কবিকে যত্নশীল হতে হয় আঙ্গিক নির্মাণে। ইংরেজি সাহিত্যের গুণী প্রাবন্ধিক ফ্রান্সিস বেকন বলেন, ‘সত্যের সঙ্গে মিথ্যার খাদ মিশিয়ে নিলে তা আরও আনন্দদায়ক হয়।’ কবি ঠিক সেই কাজটি করেন। কিছু সত্য উপলব্ধির সাথে কিছু কল্পনার রঙ মিশিয়ে কবিতাকে করে তোলেন বর্ণসুন্দর, শ্রুতিমধুর। ‘দিবারাত্রি প্রেমকাব্য’ বর্ণনাত্মক ভঙ্গিতে রচিত কাব্য। কখনো কথোপকথনের ভঙ্গিতে রয়েছে নাটকীয় সংলাপ। নিসর্গচেতনা এসেছে প্রেমের বহিঃপ্রকাশে। আলাদা করে নিসর্গচেতনা নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত শব্দখেলা কবি করেননি। যা কবির আঙ্গিক কৌশলকে করেছে স্বাতন্ত্র্য। প্রেমে বুঁদ হয়ে থাকা কবির কর্মে-মর্মে শুধু প্রেয়সীর নাম উচ্চারিত হয়েছে। কবি সে-কথাই প্রেয়সীকে একটিবার কান পেতে শুনতে আর্তি জানাচ্ছেন :

১.
শোন্ রে সখা শোন্— মন আমার গগনশিরীষ বন;
বুকের ভেতর মোমের পুতুল— অহর্নিশ করি যতন।

২.
শোন্ রে সখা শোন্— মন আমার গগনশিরীষ বন;
বুকের ভেতর মোমের পুতুল— দিবারাত্রি করি স্মরণ।

৩.
শোন্ রে সখা শোন্— মন আমার গগনশিরীষ বন;
বুকের ভেতর মোমের পুতুল— দিবারাত্রি চলছে ক্ষরণ।

৪.
শোন্ রে সখা শোন্— মন আমার গগনশিরীষ বন;
বুকের ভেতর মোমের পুতুল— দিবারাত্রি সে যে চেতন।

৫.
শোন্ রে সখা শোন্— মন আমার গগনশিরীষ বন;
বুকের ভেতর মোমের পুতুল— দিবারাত্রি তারই কথন।

নানা নামে প্রেয়সীকে সম্মোধন করেছেন কবি। মেঘবালিকা, জলদেবী, চলন্তিকা, রাধা, অনামিকা, শেফালিকা, লজ্জাবতী, মিতা, সখা, প্রেয়সী, সুমিতা, বিজিতা প্রভৃতি নানা নামে উপমায়িত করেছেন। যার মিলনে উদ্গ্রীব কবি। বিরহে বিষাদগ্রস্ত। যার শুন্যতায় কবি-হৃদয় ‘খাঁ-খাঁ প্রান্তর— মন্থন-মন্থর-মর আর মরীচিকা—!’

রঙের ব্যবহারে সুনিপুণতার পরিচয় দিয়েছেন কবি। বিচিত্র রঙে-ঢঙে প্রেমের প্রকাশ ঘটেছে :

প্রেম তুমি এমন কেন
বুঝি না আমি তোমার রঙ—।
প্রভাতবেলায় উজ্জ্বল-গাঢ়
গোধূলি লগনে বেজায় ঢঙ—।।

ভর দুপুরে নীল-সবুজে
পাখা মেলো তুমি রঙিন—।
বিকেল-রোদে হলদে প্রভা
সন্ধ্যায় হয়ে ওঠো সঙিন—।।

কবির বাউল মনের পরিচয় মেলে কিছু অংশে :

সই, তুমি কান্দো ক্যান্
কাইন্দো না বিচ্ছেদে—।
কান্দে কান্দুক তোমার আল্লা
রাখলো না যে নসিবে—।।

প্রেম শিক্ষার মুরিদ আমি
মুর্শিদ আমার সিরাজী—।
আঁখিজলে পদ্ম হইলো
জানেন আমার আল্লাজী—।।

কবির প্রতিটি প্রার্থনা মেঘবালিকার মঙ্গলকামনায় উৎসর্গিত হয়। তাইতো, কবি অরণ্যদেবী আর্টেমিস, প্রেমদেবী আফ্রোদিতি, অথবা রংধনুদেবী আইরিসকে মিনতি জানায় মেঘবালিকাকে যেনো দেখে রাখে, সুখে রাখে, রাঙিয়ে রাখে। পৌরাণিক নানা চরিত্র তাঁর শব্দভাণ্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ। সেইসাথে তাঁর কবিতায় সমাজ, সমকালচেতনা, জীবনবোধ, বিষয়বৈচিত্র্য, চিত্রময়তা, ব্যঞ্জনাময় প্রতীক, চিহ্নায়কের ব্যবহার প্রকরণশৈলীতে নিয়ে আসে নান্দনিকতা।

নির্মোহ স্বপ্ন আর বাস্তবের সংমিশ্রণ ঘটেছে মাওলা প্রিন্সের কবিতায়। অগ্রজ কবিদের কাব্যরস পান করেছেন তিনি। তাঁদের কবিতা হৃদয়ে লালন করেই কাব্যতরীতে নিজের আসন চিহ্নিত করেন। তবে, জীবনানন্দের অতীব প্রভাব কবির অজান্তেই প্রবেশ করেছে কবির কবিতায়। জীবনানন্দীয় ঢঙ এবং প্রকাশরীতি জানান দেয় জীবনানন্দের কবিতার দীর্ঘদিনের লালনকৃত রূপ এটি। তবে, একেবারে আত্মভোলা হননি তিনি। একেবারে ‘শুদ্ধতম কবি’র আখ্যা কবিকে দেয়া যায় না। তাঁর মধ্যে ভালোমন্দের সংমিশ্রণ থাকে। কবি হাজার মানুষের আনন্দ, দুঃখ, বেদনা, প্রেমের হৃদস্পন্দন আপন হৃদয়ে অনুভব করেন। আর, সেগুলোই শব্দমাল্যে গাথা একটি দীর্ঘকবিতায় রূপ-পরিগ্রহ

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

সত্যান্বেষী কবির সত্যোচ্চারণ | অনিতা রানী পাল

Fri Dec 24 , 2021
সব ঠিক, ঠিক কি, ঠিকটা কী : কালের প্রেক্ষণে সত্যান্বেষী কবির সত্যোচ্চারণ 🌱 অনিতা রানী পাল বাংলাদেশের কবিতার বিশাল ক্যানভাসে নিজস্ব কাব্যপ্রতিভা, মনন এবং প্রজ্ঞা দিয়ে স্বীয় স্থান গড়ে তুলতে দৃঢ় প্রত্যয়ী কবি মাওলা প্রিন্স (জন্ম : ১৯৮৩)। কবির কৈশোর থেকে কাব্যভূমিতে পদচারণা কবিতার প্রতি তাঁর হৃদয়ের গূঢ় অনুভূতিরই বহিঃপ্রকাশক। […]