সত্যান্বেষী কবির সত্যোচ্চারণ | অনিতা রানী পাল

সব ঠিক, ঠিক কি, ঠিকটা কী :
কালের প্রেক্ষণে সত্যান্বেষী কবির সত্যোচ্চারণ
🌱
অনিতা রানী পাল

বাংলাদেশের কবিতার বিশাল ক্যানভাসে নিজস্ব কাব্যপ্রতিভা, মনন এবং প্রজ্ঞা দিয়ে স্বীয় স্থান গড়ে তুলতে দৃঢ় প্রত্যয়ী কবি মাওলা প্রিন্স (জন্ম : ১৯৮৩)। কবির কৈশোর থেকে কাব্যভূমিতে পদচারণা কবিতার প্রতি তাঁর হৃদয়ের গূঢ় অনুভূতিরই বহিঃপ্রকাশক। তাঁর কবিতার সহজ-সরল ব্যঞ্জনাধর্মী ভাষা, সূক্ষ্ম অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সময় ও সমাজকে বিশ্লেষণ এবং কবিতায় প্রয়োগকৃত নিজস্ব দর্শন পাঠককে করে আকৃষ্ট। সময়, সমাজ এবং আধুনিকতার জরায় আক্রান্ত বিকৃত মানুষের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচনের প্রয়াস তাঁর কবিতার শরীরে স্পষ্টরূপে প্রতিভাসিত। এ পর্যন্ত তাঁর চারটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে; যথা : ‘নিশীথপ্রদীপে শঙ্খঝিনুকের চাষ’ (২০১৩), ‘দিবারাত্রি প্রেমকাব্য’ (২০১৪), ‘সব ঠিক, ঠিক কি, ঠিকটা কী’ (২০১৯) এবং ‘আবার বছর কুড়ি পর’ (২০২০)। এরমধ্যে ‘সব ঠিক, ঠিক কি, ঠিকটা কী’ কাব্যগ্রন্থে সমসাময়িক সমাজের রূঢ়বাস্তবচিত্র কবির নিজস্ব দর্শনে শৈল্পিকভাবে হয়েছে সুষমামণ্ডিত।

সচেতন কবি মাত্রই সময়কে ধারণ করেন তাঁর কবিতায়। কবির কবিতা সময়ের সত্য স্বাক্ষর। সমকালের সমাজের দুস্থরূপ, মানুষের বিকৃত মস্তিষ্ক, সভ্য নামধারী মানুষের মুখোশের অন্তরালে ভয়ংকর লেবাসধারীর চিত্র মাওলা প্রিন্সের কবিতায় ফুটে উঠেছে। বর্তমান সময়ে সত্য হচ্ছে ভূলুণ্ঠিত। স্বার্থের পায়তারায় সত্যের হচ্ছে অপমৃত্যু। এমন স্পষ্ট চিত্র পাই কবির চেতনায় :

মানুষ সে তো প্রশংসা করে সিংহের, ভালোবাসে গর্দভ!
[হারিণ শাবকের মানুষজ্ঞান ও শিল্পবোধ]

অথবা,

প্রশ্নের দৃষ্টিতে নয়, বিস্ময়ের চোখে দেখছি পৃথিবীকে
একই মানুষ একই মঞ্চে কীভাবে দুই কথা বলে সময়ের ব্যবধানে;
চোখে চোখ রেখে কীভাবে মুহুর্মুহু মিথ্যে বলা যায়, তারই পাঠ শেখানো হয়
হাটে-বাজারে, মাঠে-ঘাটে, সভা-সেমিনারে, সভ্যতার সভ্যতম আসরগুলোতে!
[নতুজানু প্রকৃতি ও খর্বাকৃতি মানুষ]

আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার চাপে প্রকৃতি তার নিজস্বতাকে হারাচ্ছে। ধূসর এই যান্ত্রিক জীবন মানুষকে করছে খর্বাকৃতি। ক্রমাগত স্বার্থের পেছনে ছোটার নেশায় মানুষ রপ্ত করছে তোষামোদের নিত্য নতুন কৌশল এবং হারাচ্ছে ব্যক্তিত্বকে। মানুষের এই বামন-রূপ কবিকে করেছে মর্মাহত। তাইতো ব্যথিত হৃদয়ে কবি বলেছেন : ‘বর্ধিত হয়োছো মানুষ বেড়ে ওঠো নি রোদে-রসে।’ [হরিণ শাবকের মানুষজ্ঞান ও শিল্পবোধ] মাওলা প্রিন্সের এ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো পাঠকের মর্মমূলকে স্পর্শ করে যায়। তাঁর কবিতার প্রতিটি সত্য উচ্চারণ যেন পাঠকের হৃদয়েরই প্রতিধ্বনি। বিশেষত তিনি যখন উচ্চারণ করেন :

আমি তো জানি, পৃথিবীতে সব মানুষের সব প্রশংসাই উদ্দেশ্যমূলক
—আরো জানি, প্রশংসিত পদ্ম অবিরত বৃন্তচ্যুত হয় দেবীর নৈবেদ্যে!
[সব প্রশংসা উদ্দেশ্যমূলক]

অথবা,

যে তুমি ভালো ভালো ভালো বলে কাফনের কালো রঙে লেপে দিলে
এক হীরকসম্ভাবী সবুজ জীবন!
[আত্মহননের নান্দীপাঠ]

এই পঙক্তিগুলো পড়ে পাঠক যেন কবির সঙ্গে লীন হয়ে যায় বাস্তবতার রূঢ় সত্য অনুধাবনে। মাওলা প্রিন্সের কবিতায় প্রকৃতিপ্রীতির চিত্রও পরিলক্ষিত হয়েছে। তবে, সেখানেও বাস্তবতার কঠোর অভিঘাতে ব্যথিত কবি-হৃদয়ের আর্তনাদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যে প্রকৃতির জল-হাওয়ায় বেড়ে উঠেছে মানুষ, সেই প্রকৃতিকেই অবাধে ধ্বংস করছে সে। ফলে, প্রকৃতির বিরূপ প্রভাব পড়ছে সেই মানুষেরই উপর। কবির ভাষায় :

যেখানে মাটির গন্ধে নাক লুকায় মাটিপুত্র—
যেখানে জলের স্বাদে পরিতৃপ্ত হতে পারে না জলদাস—
যেখানে অরণ্যের সবুজতাকে হত্যা করতে উদ্যত হয় অরণ্যমানব—

চেয়ে দেখো, সেখানে প্রজাপতি উড়ে না, ঊষাকন্যা মুছে ফেলে কপালের সিঁদুর
চেয়ে দেখো, সেখানে চাঁদ প্রেয়সী হয়ে হাসে না, হাওয়াপরির নেই উদামনৃত্য
চেয়ে দেখো, সেখানে গাদাগাদি করা বেঢপপুতুলের হাঁপানিধরা হাঁসফাঁস!
[ঈশ্বর এখন বস্তিবাসী]

কবি তাই মানুষকে সহজ, স্বাভাবিক, নিজস্বতায় ফিরে আসতে আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন : ‘শিশুর ছায়ায় পৌঢ় পৃথিবীতে ফিরে আসে সবুজ শৈশব সহজ খেলনা।’ [সবুজ শৈশব সহজ খেলনা] প্রত্যেক কবিই তাঁর চিন্তা, চেতনা এবং নিজস্ব দর্শনের দিক থেকে স্বতন্ত্র। মাওলা প্রিন্সের কবিতায় আমরা তাঁর বেশ কিছু দার্শনিক চিন্তা-ভাবনার পরিচয় পাই। এই পৃথিবীতে নিরঙ্কুশ ঠিক বলে কোন কিছুই নেই। আমার কাছে যা ঠিক, অন্যের কাছে তা তা সঠিক নাও হতে পারে। ঠিক ও বে-ঠিকের এই দ্বন্দ্বে বিস্ময়াভিভূত কবি বলেছেন :

সব ঠিক, ঠিক কি, ঠিকটা কী!
পৃথিবীতে নিরঙ্কুশ ঠিক বলে কিছু নেই
আছে শুধু নিজ মত, নিজ পথের যুক্তি, আর আছে আজ্ঞে জ্বি!!
[সব ঠিক, ঠিক কি, ঠিকটা কী]

আবার, কবি যখন বলেন : ‘খুব বেশি ভালো থাকতে নেই’; অথবা, ‘সবুরে মেওয়া ফলে যেমন ঠিক, তেমনি তো ঠিক সবুরে মেওয়া পচে’; অথবা, ‘ভাগ্যবানের ভার ভগবান বয়’ —এই বাস্তব উক্তিগুলো স্পর্শ করে যায় পাঠ-হৃদয়কে। চারদিকে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং মনুষ্যত্ববিহীন মানুষের ক্রমাবনতি সত্তে¡ও পরমতত্তে¡ বিশ্বাসী কবি মনে করেন, সত্য একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই। পৃথিবীতে পুনরায় ফিরে আসবে আলোর দিশা; যা মানুষের ছানিপরা চোখকে করবে আলোকিত। কবি এখানেই সাধারণ থেকে স্বতন্ত্র। বাস্তবতার চরম সত্য কবিকে ব্যথিত করলেও তিনি হতাশার বাণী না শুনিয়ে শুনিয়েছেন আশার বাণী :

যে তুমি মানুষের পরিচর্যা করবে—
যে তুমি মানুষের পরিচর্যার ব্রত পালনে বিচারকের আসনে বসবে—
যে তুমি মানুষের বুকে কান পেতে দীর্ঘ দংশন নীল জ্বালার ধ্বনি শুনবে—
সে তুমি নৈতিক গডো কিংবা অনৈতিক দুঃশাসন অপেক্ষা বেশি প্রিয় বেশি শ্রেয়।
গডোর মৃত্যু হবে পৃথিবীতে, দুঃশাসন টেকে না বেশি দিন—
প্রতিশ্রæত প্রেম, শুধু প্রতিশ্রæতিবদ্ধ প্রেমই বেঁচে থাকে অমলিন।

গগনশিরীষ বনে— জনম নিবিড় ধ্যানে— পড়ে আছি পরম বিশ্বাসে।
[নষ্ট জ্যোৎস্নার ক্যরাভানে]

সময়, সমাজ এবং বাস্তবতার রূঢ় সত্য অনুধাবনে পাঠক যখন গম্ভীর ভাবাবেগে মগ্ন হয়ে যায় তখন সহজ, সরল, সজীবতার স্পর্শ দিয়ে যায় সংযুক্তি অংশের কৈশোরের কবিতাগুলো। কবি এই অংশের কবিতাগুলোতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অথবা বিশেষ মুহূর্তের অনুভূতিগুলোকে প্রকাশ করেছেন। প্রেমিক কবির অবর্ণনীয় প্রেম যেমন কবিতার প্রতি, তেমনি ভাষাহীন প্রেম তাঁর প্রেয়সীর প্রতিও এবং এই প্রেমের পূর্ণতা স্মৃতির গহ্বরে আপন মনের বিশ্লেষণে :

সুদূরিকা ঊর্মি, তোমার সঙ্গে আমার সাক্ষাতের সময়
ঘণ্টার কাঁটায় বেশি নয়;
স্মৃতির সাঁতারে সীমাহীন সাগর!
[এক রাতের সহবাস]

কবিতা হচ্ছে কবির মনের খোরাক। কবিতায় প্রয়োগকৃত শব্দ, কবির বানচভঙ্গি, নিজস্ব কৌশল, তাঁর ব্যবহৃত ভাষা প্রভৃতি মিলিয়ে যখন কোন কবি কোন সৃষ্টি সম্পন্ন করেন, তখন তাঁর মনে অপার্থিব আনন্দের সঙ্গে জন্ম নেয় টিকে থাকা আকাঙ্ক্ষা। কালের স্রোত এমনই এক স্রোত, যার তীব্র টানে কে থাকবে কে ভেসে যাবে, তা মনুষ্যের অজ্ঞাত। তবুও সাময়িকভাবে প্রত্যক্ষ কবির টিকে থাকার মাপকাঠি হচ্ছে তাঁর স্বতন্ত্র প্রজ্ঞা ও শিল্পকৌশল। মাওলা প্রিন্সের কবিতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করলে সে স্বতন্ত্র প্রজ্ঞার পরিচয় আমরা পাই। তাঁর কবিতার গঠন-কৌশলে এমন কিছু স্বাতন্ত্র্য চোখে পড়ে, যা পাঠকের মনে দাগ কেটে যায়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে চূর্ণকের ব্যবহার। কবি তাঁর উদ্দিষ্ট বক্তব্য ছান্দসিক ভঙ্গিতে বলতে বলতে এমন একটি পঙক্তি বা পঙক্তি-সম্প্রসারণের সম্মুখে পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেন, যা পাঠককে স্পর্শ করে যায়, সচেতন পাঠককে ভাবনার জগতে নিক্ষেপ করে। যথা :

বর্ধিত হয়েছো মানুষ বেড়ে ওঠো নি সুষম রোদে-রসে—
কী এক অসীম মনস্তাপে তোমাকে ছেড়ে তোমাকে ভুলে তোমারই পথ চাহি
ভীরু চঞ্চল হরিণ শাবক এক অতি সন্তর্পণে।
[হরিণ শাবকের মানুষজ্ঞান ও শিল্পবোধ]

অথবা,

নষ্ট হওয়ার অনুরাগে—
সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে—
লোহার যদি ভেসে থাকার ইচ্ছে জাগে!
[বেড়ে ওঠার আশৈশব গল্প]

অথবা,

খুব বেশি ভালো, ভালো নয়— খুব বেশি ভালো থাকতে নেই।
[খুব বেশি ভালো থাকতে নেই]

অথবা,

পৃথিবীতে এখন বিষগন্দম ফলের রাঙাচাহিদা—
পৃথিবীতে এখন বিষগন্দম ফল বেচাকেনা হয় গিনি স্বর্ণমুদ্রায়!
[পৃথিবীতে এখন বিষগন্দম ফল]

অথবা,

কখনো কখনো মৃত্যুও জীবন— আত্মহত্যাও হয়ে ওঠে জীবনমুদ্রা
—বেঁচে থাকার নৃত্য মায়াভরা ভীষণ!
[ডাইনোসরপুরাণ]

কবি এই চূর্ণক কখনও কবিতার প্রারম্ভে ব্যবহার করেছেন; আবার, কখনও করেছেন শেষোক্ত পঙক্তি বা স্তবকে। এই চূর্ণকগুলোতে জগৎ-জীবন সম্পর্কে কবির সুগভীর ভাবনা দীপ্যমান এবং সেইসঙ্গে ব্যক্তিগত দর্শন প্রকাশমান। যথা : ‘যদিওবা হাসিখুশি— ভদ্রপাড়ায় ঈশ্বর এখন বস্তিবাসি!’ [ঈশ্বর এখন বস্তিবাসি]; অথবা, ‘ভগবানের লীলা বোঝা বড় দায়— ভাগ্যবানের ভার স্বয়ং ভগবান বয়!’ [ভাগ্যবানের ভার ভগবান বয়]; অথবা, ‘ভীরুরা পালায়— পালিয়ে বেঁচে যায়— ফিরে আসার অভীপ্সায়।’ [ফিরে আসবার অভীপ্সায়]; অথবা, ‘দৃষ্টি অপলক— ভূলোক-দ্যুলোক-গোলক— সব প্রশংসা উদ্দেশ্যমূলক—!’ [সব প্রশংসা উদ্দেশ্যমূলক] কবির কবিতার আরেকটি বিশেষ দিক হচ্ছে কবিতার সৌষ্ঠব নির্মাণে মাওলা প্রিন্স নিপুণতার পরিচয় দিয়েছেন। শব্দপ্রয়োগ, বাক্যগঠন এবং অলংকরণে সচেতন কবির বৌদ্ধিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। গদ্যচ্ছন্দে রচিত প্রায় প্রতিটি কবিতাতেই এক বা একাধিক স্তবকে কিছু শব্দের পুনরাবৃত্তি করেছেন; যা তাঁর বক্তব্যের বিষয়কে শুধু জোরালোই করেনি, প্রকাশ করেছে কবির কাব্যরচনার নিজস্ব কৌশলকে। এই পুনরাবৃত্তি কবির কাব্যভাষাকে করেছে শ্রুতিমধুর :

নিঃসাড় পড়ে থাকা মানে তো রক্তের জমাট বাঁধা নয়, মৃত্যু নয়, স্বপ্নহীন নয়
নিঃসাড় পড়ে থাকা মানে তো প্রেমে প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক কিংবা প্রেমিকার
শুচি ও সৌন্দর্য চেতনার চির অবসান নয়।

যে বালক সেবার ব্রত পালনে চিকিৎসক হতে চায় সে-ও রক্ত দেখে ভয় পায়
যে যুবক যুদ্ধে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়েছে সে-ও দোয়েলের শিস শুনে থমকে দাঁড়ায়
যে বৃদ্ধ মৃত্যুর প্রহর গুনছে প্রত্যহ সে-ও মালিক-উল-মৌতের নাম শ্রবণে শিউরে উঠে
—যা তার জীবনবোধেরই মুদ্রা।
[ফিরে আসবার অভীপ্সায়]

অথবা,

মিথ্যা আজ মিথ্যা নয়, যেন নাব্য-ইমিটেশন—
মিথ্যা আজ মিথ্যা নয়, যেন কাব্য-অলংকরণ—
মিথ্যা আজ মিথ্যা নয়, যেন সভ্যতার শ্রেষ্ঠ বস্ত্রভূষণ—
[নতজানু প্রকৃতি ও খর্বাকৃতি মানুষ]

অথবা,

আমি তো জানি, পৃথিবীতে সব নদীর সব জলই পবিত্র
আমি তো জানি, পৃথিবীতে সব শিশুর সব বোলই শ্রুতিমধুর
আমি তো জানি, পৃথিবীতে সব মানুষের সব প্রশংসাই উদ্দেশ্যমূলক
—আরো জানি, প্রশংসিত পদ্ম অবিরত বৃন্তচ্যুত হয় দেবীর নৈবেদ্যে!
[সব প্রশংসা উদ্দেশ্যমূলক]

আবার, কখনও কবি একই শব্দ একাধিকবার একই পঙক্তিতে ব্যবহার করে ব্যক্তব্য বিষয়ে অধিকতর জোর প্রকাশ করেছেন। আর, এ প্রকাশভঙ্গিটি কবির একান্তই নিজস্ব। যেমন : ‘যে তুমি ভালো ভালো ভালো বলে কাফনের কালো রঙে লেপে দিলে/ এক হীরকসম্ভাবী সবুজ জীবন!’ [আত্মহননের নান্দীপাঠ]; অথবা, ‘কেউ কেউ তো কাজ কাজ কাজ করে জীবনটাই ব্যর্থ করে তোলে—!’ [ডাইনোসরপুরাণ]; অথবা, ‘তবুও আমি কবি হব— কবি হব— কবি হব— কইবো কথা সংগোপনে—/ তবুও আমি কবি ছিলাম— কবিই রব— চাইনে বর আর এই জীবনে—’ [রক্তঢেউ] কবি তাঁর আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে বিবিধ অলংকারে সজ্জিত করেন কবিতার কাব্যশরীর। এই কাব্যশরীর নির্মাণে ধরা পড়ে কবির নিজস্বতা, শিল্পপারঙ্গমতা। কবি যে বোধের জগতে বিচরণ করেন, সেই বোধের সজ্জিত বহিঃপ্রকাশই কবির শিল্পসফলতার পরিচায়ক। মাওলা প্রিন্স তাঁর কবিতাকে সাজিয়েছেন বিবিধ অলংকারে। তন্মধ্যে চিত্রকল্পের বহুল প্রয়োগ লক্ষণীয়। চিত্রকল্পের ইন্দ্রিয়জ ব্যবহার বক্তব্য বিষয়কে করেছে স্পষ্ট এবং কবিতাকে দিয়েছে সজীব প্রাণ। যথা :

দর্শনেন্দ্রিয় চিত্রকল্প :

নষ্ট জ্যোৎস্নার সফেদ ক্যারাভানে
কর্কশ রৌদ্রের রক্তচোখে কি তাকে আটকানো যায়!
[নষ্ট জ্যোৎস্নার ক্যারাভানে]

স্পর্শেন্দ্রিয় চিত্রকল্প :

আঙুলের চাষ দিতে অক্ষম হয়ে কেটে ফেলে যে প্রেমিক ওর স্বর্ণলতাচুল
পবিত্র ভালোবাসার সহজ প্রতারণায় কামড়ে দিতে চায় যে মানুষ ওর গোলাপস্তন
তাকে প্রচÐ বিরক্তি ভরে করুণা করে বিদ্রƒপ করছি;
[কবিতাকে কবিতার মতো থাকতে দাও]

স্বাদেন্দ্রিয় চিত্রকল্প :

সে বিলে যায়
সে তো চাঁদে যায়
সে নোনাজলে ডুব দিয়ে নীলকে স্পর্শ করে
সে তো সহস্রবার পিছলে গিয়েও দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
[নষ্ট জ্যোৎস্নার ক্যারাভানে]

ঘ্রাণেন্দ্রিয় চিত্রকল্প :

রৌদ্রের উৎকট গন্ধে বিবর্ণ পড়ে থাকা বিগত ওরা মাছ পায়, মাছ-ভাত খায়—
পুরোদস্তুর সৃজনী-মানুষ!
[এই সময়ই]

কর্ণেন্দ্রিয় চিত্রকল্প :

কান পাতলে শোনা যায়, লাল যন্ত্রও কাঁদে—
সাদা-কালো মানুষগুলোর হুকুমে হুকুমে তারও হয়
গোলাপি ক্ষয়রোগ,
ফোঁটা ফোঁটা ফিরোজা রক্তক্ষয়!
[গোলাপি ক্ষয়রোগ ও ফিরোজা রক্তক্ষয়]

জৈবিক চিত্রকল্প :

যার আছে পদ্মনারী নিমগাছবৌ— তারও বুকপিঞ্জরে বিতৃষ্ণাপাখি পাখা ঝাপটায়!
যার আছে কাব্যকুমারী রাজপুত্রের মতন বিশাল দিঘি— সেও বিকৃতিনদীতে ভাসে!
[পৃথিবীতে এখন বিষগন্দম ফল]

চিত্রশিল্পে রঙের ব্যবহার যেমন শিল্পীর ভাবনাজগতের এবং সৃষ্ট শিল্পের অভ্যন্তরীণ ভাবব্যঞ্জনার পরিচায়ক, তেমনি কবিতায় রঙের ব্যবহার প্রায়োগিক সৌন্দর্যের জন্য ব্যবহৃত জগৎ, জীবন ও তার বাস্তবতা সম্পর্কে কবির সূক্ষ্ম ভাবানুভ‚তির পরিচায়ক। কবি মাওলা প্রিন্স তাঁর কবিতায় এই রঙের র‌্যবহার করেছেন সচেতনভাবেই। সময় ও যুগের বিদীর্ণ অবস্থা, সময়ের তীক্ষ্ম আঁচড়ে কঙ্কালরূপ মানুষ এবং এসব সম্পর্কে কবির ব্যক্তিক অনুভ‚তি রঙের ছোঁয়ায় বুদ্ধিদীপ্ত শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে উঠে এসেছে কবিতায়। যেমন :

শীর্ণ চাঁদের মতো ক্ষয়ে গেছে কি তোমার শৈশবের সবুজ রোদ—
হঠাৎ বন্যার মতো ধুয়ে গেছে কি তোমার কৈশোরের কমলা কবিতা—
মৃদু স্মৃতির মতো মুছে গেছে কি তোমার যৌবনের প্রাণপ্রপাত জলরাশি—
[সবুজ শৈশব সহজ খেলনা]

অথবা,

নষ্ট করলে সবুজ নারী
নষ্ট করলে হলুদ নদী
নষ্ট করলে
নীল নিসর্গ— যত—!

নষ্ট করলে সোনালি কথা
নষ্ট করলে কমলা ভাষা
নষ্ট করলে
ধূসর পত্র— শত—!
[গোলাপি ক্ষয়রোগ ও ফিরোজা রক্তক্ষয়]

কবির অধিকাংশ কবিতা গদ্যচ্ছন্দে রচিত হলেও ছন্দের সুর-লহরী থেকে নিজেকে বিরত করেননি তিনি। তাইতো, তিনি গদ্যচ্ছন্দকে প্রাধান্য দিলেও কখনও স্বরবৃত্ত আবার কখনও মাত্রাবৃত্ত ছন্দেও কবিতা রচনা করেছেন। যেমন :

আলতা রঙিন নগ্ন পা
কাঁচল পাখি উড়ে যা

মুঠো চাঁদে জোছনা ঘ্রাণ
ওতেই পদ্য ওতেই প্রাণ

মেঘবালি নরম ভুঁই
চাঁদের রেণু একটু ছুঁই

মেঘে জমা বরফকুচি
জলে হলো পদ্মশুচি
[পদ্মশুচি]

আবার,

আমার ললাটে কী আছে ভাগ্যরেখা।
জানি না আমি কেবল জানে বিধাতা।।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে করছি যতো পুণ্য সঞ্চয়।
তার কোমল স্পর্শে যেন ব্যর্থ হয় ক্ষয়।।
[অর্থনা]

আধুনিক গদ্যকবিতার কঠিন, দুর্বোধ্য এবং গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাষার পথ না মাড়িয়ে সহজ-সরল অথচ মাধুর্যমণ্ডিত শৈলী ব্যবহার করে পঙক্তির পর পঙক্তি সাজিয়েছেন কবি মাওলা প্রিন্স। তিনি উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প, অনুপ্রাস প্রভৃতি অলংকারে করেছেন কবিতার অঙ্গসজ্জা। শব্দ ব্যবহারে দেখিয়েছেন পারঙ্গমতা। বিশেষ করে তাঁর সৃষ্ট বেশ কিছু নতুন শব্দ যেমন : আতুমি, সবুজ শৈশব, কমলা কৈশোর, জ্যোতিষ্মান যৌবন, গোলাপি ক্ষয়রোগ, ফিরোজা রক্তক্ষয়, পদ্মনারী নিমগাছবৌ, ডানাঅলা পায়রাশব্দ, বিরামবিবেক, বিষমবৃক্ষ, নাঙা নীলবাষ্প, গোয়ালিচোখ, নদীগাত্র, স্বর্ণলতাচুল, গোলাপস্তন, মাটিপুত্র, জলদাস প্রভৃতি পাঠককে করে অভিভূত। কবিতার নামকরণে কবির বুদ্ধিদীপ্ততার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর ‘সব ঠিক, ঠিক কি, ঠিকটা কী’ কাব্যগ্রন্থের প্রত্যেকটি মননশীল কবিতাই শিল্পবোধসম্পন্ন কবির সৃজনশীল প্রজ্ঞা ও শিল্পচৈতন্যের দ্যোতক। মোটকথা, শিল্পমানসমৃদ্ধ তাঁর এই কবিতাগুলো যে বাংলাদেশের সমকালীন কবিতার ধারায় আদৃত হবে, অনাগত কবিতাপিয়াসী পাঠকের কাছে হবে আদরণীয়, তা বলা যায় উচ্চকণ্ঠে, দ্বিধাহীনভাবেই।
…………………………………………………
অনিতা রানী পাল
গবেষক : আবু হাসান শাহরিয়ারের কবিতা

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

হেলাল হাফিজ, জার্সি নং ৭৫ | মোঃ তানভীর হায়াত খান

Sat Oct 8 , 2022
হেলাল হাফিজ, জার্সি নং ৭৫ | মোঃ তানভীর হায়াত খান 🌱 কেবিন নং 603,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটি, বয়স ৭৪, নিজেই গ্লাসে পানি ঢেলে পান করছেন, সুগারের  মাত্রা ১৬ থেকে ২০ এ উঠানামা করছে, কয়েকদিন শেভিং না করায় গালে কুচিকুচি সাদা দাড়ি,চোখ হালকা লাল,ড্রপ দেওয়া হয় নিয়মিত,কাঁচা হলুদ রংয়ের শার্টে […]
Shares