হেলাল হাফিজ, জার্সি নং ৭৫ | মোঃ তানভীর হায়াত খান

হেলাল হাফিজ, জার্সি নং ৭৫ | মোঃ তানভীর হায়াত খান

🌱

কেবিন নং 603,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটি, বয়স ৭৪, নিজেই গ্লাসে পানি ঢেলে পান করছেন, সুগারের  মাত্রা ১৬ থেকে ২০ এ উঠানামা করছে, কয়েকদিন শেভিং না করায় গালে কুচিকুচি সাদা দাড়ি,চোখ হালকা লাল,ড্রপ দেওয়া হয় নিয়মিত,কাঁচা হলুদ রংয়ের শার্টে ছোটছোট ফুল শোভা পাচ্ছে, মায়ামিশানো চাহনি নিয়ে তাকিয়ে আছেন,চোখে চশমা নেই।

বেড থেকে উঠে এক প্যাকেট বিস্কিট বের করে দিয়ে বললেন,” এটা খাও, আমিও খাবো”। সবাই জমায় টাকা আর উনি জমান মানুষ এ কথাটা উনার সংস্পর্শে না আসলে বুঝা যাবেনা, মহূর্তেই আপন করে নিতে পারেন তিনি।যার কবিতায় টগবগিয়ে ছুটে চলা যৌবনের দেখা মিলে,

মা, মাটি, ভালোবাসা, হরেক রকম কষ্টের গন্ধ পাওয়া যায় আজ তাঁর ৭৫ তম জন্মদিন, শুভ জন্মদিন কবি,নেত্রকোনার সন্তান হেলাল হাফিজ। 

কবিকে বললাম আপনি আপনার শৈশবের মগড়া নদীর রুপ ধারণ করেছেন, একসময় যে নদীর বুকে স্রোত ছিলো,যৌবন ছিলো, ট্রলারের শব্দে সকাল হতো সে নদী দখল,দূষণে খালে পরিনত হয়েছে কিন্তু ছুটে চলা থামেনি।শৈশবের মগড়া নদীর এমন বিবরণ শুনে কবি খানিকটা চুপ থেকে বললেন ” তোমরা কিছু বলো না? দেখার কেউ নেই?”

শৈশবে মা’কে হারান কবি, বাবা খোরশেদ আলী তালুকদার ছিলেন নেত্রকোনার দত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের সুপরিচিত শিক্ষক, কবির ভাষ্যমতে  মা  হারিয়ে যাওয়ায় বাবার সাথে স্কুলে থাকতেন,এখানেই তিনি স্কুলজীবন পার করেন আর মগড়া নদীর সাথে সখ্যতা, প্রেম,বন্ধুত্ব করেন।

মহান এ কবির প্রতিটি কবিতা ই আমাদের ভাবতে শেখায়,,অত্যাচার -নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ,যুদ্ধ করতে শেখায়,আবার কখনো ভালোবাসতে শেখায়,কষ্টকে উপভোগ করতে শেখায়।

” এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময় “

কবিতার এ লাইন দুটো যৌবনে উদ্দীপ্ত প্রাণে প্রেরণা দিবে,রাইফেল তাক করে স্বৈরাচারের মাথার খুলি উড়িয়ে দিবে। কবিকে এই কবিতা সৃষ্টির প্রেক্ষাপট জানতে চাইলে কবি বলেন 

” আমিতো মূলত যুদ্ধবিরোধী লোক,’৬৯ এ কবিতা না লিখে কোন উপায় ছিলোনা কারণ আমার অস্তিত্বের প্রশ্ন এখানে জড়িত, এ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যে, সজীব রাখার জন্যেই এ পঙক্তি “

আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের, সশস্ত্র সংগ্রামের আহবান এ কবিতাতেই প্রথম জানানো হয়।এ কবিতা মূলত তখন সাড়ে সাত কোটি মানুষের মনের কথা,অন্তরের কথা।এ কবিতা সর্বকালের জন্যে ই প্রাসঙ্গিক, যেখানেই অত্যাচার,নিপীড়ন, শোষণ সেখানেই এই কবিতা রক্তচক্ষুকে উপড়ে ফেলার প্রয়াস যোগাবে। 

নেত্রকোনার এ সন্তান নেত্রকোনাকে ধারণ করেছেন মনেপ্রাণে,  হাসপাতালের কেবিনে শুয়ে থেকেও নেত্রকোনার কথা স্মরণ করেন,নেত্রকোনার জন্যে তাঁর মন সত্যি কাঁদে।শৈশবের মগড়া নদী,ভালোবাসার হেলেন তাঁর  চোখের সামনে স্থিরচিত্র হয়ে ভাসে। কবি তাঁর কবিতায় নেত্রকোনাকে বোন বলে সম্বোধন করেছেন।কবির ভাষায় –

” কতোদিন তোমাকে দেখিনা,তুমি ভালো আছো, সু্খে আছো?বোন নেত্রকোনা। ”

বোন বলে সম্বোধন করার কারন জানতে চাইলে কবি বলেন ” কেউ ভালোবেসে স্বদেশকে মা বলে ডাকে, প্রিয়তমা বলে ডাকে,আমি বোন বলে ডেকেছি কারণ বোনেরা ভাইেদেরকে অনেক ভালোবাসে,ভাইদের প্রতি বোনদের ভালোবাসার ঘনত্ব  বেশি”

কবি হেলাল হাফিজের প্রতিটি কবিতাই যেন মনে হয় সমসাময়িক, সময়ের সাথে খুবই প্রাসঙ্গিক, মনে হয় যেন এ আমার মনের জমানো কথা,কবি আমার মনের কথাগুলো বের করে নিয়ে তাঁর কবিতায় উপস্থাপন করেছেন। 

কবি হেলাল হাফিজের   অস্ত্র সমর্পণ কবিতা কেউ পাঠ করলে অনেকে মনে করবেন তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, মনে হবে সশস্ত্র সংগ্রামে যুদ্ধ করেছেন।কবিকে এ কবিতা সৃষ্টির প্রেক্ষাপট জানতে চাইলে কবি বলেন,” নেত্রকোনা থেকে আমার বন্ধু হায়দার এসেছিলো বঙ্গবন্ধুর ডাকে অস্ত্র জমা দিতে, আমি তখন ইকবাল হলের ছাত্র, হায়দার আমার রুমেই এসেছিলো, সারারাত স্মৃতিচারণ, যে অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করেছে, শতশত শত্রুকে পরাজিত করেছে সে অস্ত্র জমা দিয়ে দিবে,প্রিয় অস্ত্রের প্রতি তার মায়া, ভালোবাসা এসব অনুভূতি আমাকে খুব স্পর্শ  করেছে, সেই অনুভূতি থেকেই আমি এ কবিতা লিখেছি।”

সাদামাটা জীবন,স্বনির্ভর, ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এ কবির কবিতায় আমরা  কবিতার যে  শক্তি আছে,কবিতার যে আবেদন আছে, সে সম্পর্কে অামরা অবগত হতে পারি৷ কবির ভাষায়- ” কবিতা কি কেবল শব্দের মেলা, সংগীতের লীলা?  

কবিতা কি ছেলেখেলা, অবহেলা রঙিন বেলুন?  

কবিতা কি নোটবই, টু-ইন-ওয়ান, অভিজাত মহিলা -সেলুন?  “

একজন কবি উদার, বড় মনের অধিকারী হবেন, সমগ্র বিশ্বের মানুষের কথা তার হৃদয়ে ঠাঁই হবে,যেখানেই অত্যাচার, নিপীড়ণ সেখানেই কবি তাঁর ভাষায় কথা বলবেন,কবি হেলাল হাফিজ সেই মাপের ই একজন কবি। তিনি একইসাথে শোষণ, নিপীড়নের বিরুদ্ধে মিছিলে,যুদ্ধে যাবার কথা বলেছেন, আবারো সর্বগ্রাসী যুদ্ধের বিভীষিকার বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন, কবি এক লাইনে সমগ্র বিশ্বের  ক্ষমতাগ্রাসীদের বিপক্ষে গিয়ে  সাধারণ মানুষের কথা বলেছেন।কবির ভাষায়- 

” নিউট্রন বোমা বোঝো মানুষ বোঝো না”

বৃহৎ মনমানসিকতার এ কবি শৈশব,কৈশোর, জীবন-যৌবনের পাওয়া না পাওয়ার হিসেব করেননি বরং নিজের না হোক তবু অন্যের হোক সে কামনা করেছেন।কবিকে যারা কষ্ট দিয়েছেন কবি তাদেরও মঙ্গল কামনা করেছেন,কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।কবির ভাসায়

” আজন্ম মানুষ আমাকে পোড়াতে পোড়াতে কবি করে তুলেছে  

মানুষের কাছে এওতো আমার এক ধরনের ঋণ।  “

কবি আজ বেশ ক্লান্ত, জার্সি নাম্বার  75 নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন রোগশোক, ক্লান্তি আর নিঃসঙ্গতার সাথে।মানুষকে ভালোবেসে আপন করেছেন বিনিময়ে ভালোবাসাই পেয়েছেন যা তাঁর পথচলাকে করেছে আনন্দের।

 মহান এ কবি সুস্থ হয়ে উঠুন, জন্মভূমি নেত্রকোনার  মাটিতে  শিশিরস্নাত কাঁচা ঘাষের স্পর্শ পাক সে কামনা করছি।

🔅

মোঃ তানভীর হায়াত খান, 

সাবেক শিক্ষার্থী, 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

‘জল মানুষের চোখে’ মাটির ঘ্রাণে বাংলা কবিতা | অর্পিতা দে

Sat Apr 22 , 2023
‘জল মানুষের চোখে’ মাটির ঘ্রাণে বাংলা কবিতা | অর্পিতা দে ‘জল মানুষের চোখ’ ব‌ইটির নামে সহজ স্নিগ্ধ একটা ঘ্রাণ পাওয়া যায়, মাটির ঘ্রাণ। হাওর থেকে ফেরার পথে ধানক্ষেতের আল বেয়ে আসা কৃষকের পায়ে লেগে থাকা মাটির ঘ্রাণ। নীল আর বাদামী বর্ণের মিশেলে প্রচ্ছদে যেন আকাশ আর মাটির মিতালি। ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে […]
Shares