‘জল মানুষের চোখে’ মাটির ঘ্রাণে বাংলা কবিতা | অর্পিতা দে

জল মানুষের চোখে’ মাটির ঘ্রাণে বাংলা কবিতা | অর্পিতা দে

জল মানুষের চোখইটির নামে সহজ স্নিগ্ধ একটা ঘ্রাণ পাওয়া যায়, মাটির ঘ্রাণ। হাওর থেকে ফেরার পথে ধানক্ষেতের আল বেয়ে আসা কৃষকের পায়ে লেগে থাকা মাটির ঘ্রাণ। নীল আর বাদামী বর্ণের মিশেলে প্রচ্ছদে যেন আকাশ আর মাটির মিতালি। ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দেচৈতন্য প্রকাশনীথেকে  প্রকাশিত এই ইটিতে ৬০ টির অধিক কবিতা রয়েছে। শিশুদেরকে উৎসর্গকৃত ইটির মাধ্যমে নবীনদের ওপর কবির বিশ্বস্ততা ও আশাবাদেই প্রকাশ পেয়েছে।

কবি বিশ্বাস করেন শিশুদের আহ্বানে সুন্দর হয়ে ওঠবে সবকিছু। ইটির প্রথম কবিতাবাংলা ভাষা মায়ের মুখে গল্প শুনে শুনে রূপকথার রাজ্যে ঘুরে বেড়ানো ছোট্ট খোকা মনে স্বপ্ন বুনে। স্বপ্ন বুনে র।  রূপকথার গল্পের মতোই রঙিন বর্ণগুলোকে সে পৌঁছে দিতে চায় পৃথিবীর কোনায় কোনায়, পরিচয় করিয়ে দিতে চায় মিষ্টি মধুর বাংলা ভাষাকে। ছোট্ট খোকা বড় হয়, বোঝে স্বপ্নের মূল্য দিতে হবে রক্ত দিয়ে। রক্ত দিয়ে স্বাধীন করে ভাষা, স্বাধীন করে দেশ।স্বাধীন বাংলাদেশকবিতায় তাই তো তিনি বলেছেন

শোকের মাঝেও ভূলে রলাম
মনের দুঃখ ক্লেশ,
সব হারিয়েও পেলাম যখন
স্বাধীন বাংলাদেশ।’

কবি আবুল হোসাইনকে কবি না বলে শিল্পী বলাই ভাল। ভূমিজ সন্তান হয়ে শিল্পী গ্রামবাংলার ছবি এঁকেছেন তাঁর কবিতায়। সেই ছবিতে ফিঙে আছে, আছে নৌকা, ছাগল বুড়ি, শাপলা, শালুক। বর্ষায় ভরা গাঙ্গে ঢেউ যেমন পাড়ে উছলে পড়ে তেমনি শাপলাশালুকঢেঁপ কুড়িয়ে পল্লী মেয়ে হাসিতে খলখল করে।

ইটিতে বাংলার ষড়ঋতুর বর্ণনা মোহনীয়। শিমুলের তুলো উড়া গ্রীষ্মকালে হঠাৎ চিলের ডাক যেন উদাস দুপুর বয়ে আনে। আবারবর্ষাকালকবিতায় দেখা যায়, ভরা বাদলে কদমকেয়া লুকোচুরি খেলে পাতার আড়ালে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা দিয়ে শরৎ পালায়, সঙ্গে নিয়ে যায় তুলোর মত কাশফুল। হেমন্তের সকালেশিশির ভেজা দূর্বাঘাসসূর্যের রশ্মিতে ঝিলমিল করে আবার শেষ বিকেলে লেবু ফুলের সুবাসে বিমোহিত করে আঙিনা। বাংলার শীত যেন শীত নয়, এক উৎসব।পৌষপার্বণকবিতায় বাংলার চিরায়ত পৌষের বর্ণনা করেছেন কবি। কুয়াশা মোড়ানো শীতের সকালে রোদ পোহাতে পোহাতে গরম গরম ভাপা আর পুলি পিঠার জুড়ি মেলা ভার, সাথে নাড়ু, মোয়ামুড়কি তো আছেই। বসন্তে রং বেরঙের ফড়িং আর প্রজাপতির মেলা বসে। প্রকৃতি যেন খুশিতে নেচে উঠে

 

‘ঝিঙ্গে দেখে ফিঙ্গে নাচে
নাচে কুমড়ো কলি,
ওদের সবার নাচন দেখে
নাচে বুলবুলি।

পারিজাত‘, ‘মায়া‘, ‘পল্লী শিশুসহ বেশ কিছু কবিতায় শিশুদের প্রতি তাঁর স্নিগ্ধ দরদ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। শিশুদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য বেশ কিছু বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন কবি। তিনি পাঠাভ্যাসকেসদভ্যাসআখ্যা দিয়ে পড়তে উৎসাহিত করেছেন। আবার, ‘সদিচ্ছাকবিতায় একজন ভালো মানুষের গুণাবলী ব্যাখা করেছেন। আবারসংশয় সংকটে‘, ‘কেরাতকেরামতিএবংক্ষুদ্রবৃহৎকবিতাগুলোর মাধ্যমে রূপক অর্থে মনুষ্য জীবনের দোষত্রুটির বিষয়টিও চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
সর্বোপরি, ছোট ছোট ছন্দে গাঁথা প্রান্তজীবনের কাহিনীজল মানুষের চোখ হাওড় বাওড়ের নিত্যদিনের গল্পকথাই যেন এই কাব্যের মূলকথা। আঞ্চলিক ভাষার প্রতি মমত্ববোধ তাঁর কবিতায় স্পষ্ট। ভাবগাম্ভীর্যে এবং বিষয়বস্তুর নিরিখে ইটির নামকরণ তাই যথার্থ।

 

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

ভাষা শিক্ষায় সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ খান | সরওয়ার কামাল

Sat Apr 22 , 2023
ভাষা শিক্ষায় সাম্প্রদায়িকতা প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ খান | সরওয়ার কামাল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতে সাম্প্রদায়িকতার একটি নতুন রূপ দেখা দেয়, যা সমকালীন সমাজ ও রাজনীতি ছাড়িয়ে বাঙলা সাহিত্য অবধি বিস্তার লাভ করেছিল। এই সাম্প্রদায়িকতার বীজ রোপিত হয়েছিলো ঔপনিবেশিক যুগের ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে, যখন প্রাচ্যবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলতা দ্বারা তাড়িতে হয়ে উইলিয়াম জোনস, […]
Shares