‘ডুমুর ফুলের পেখমে’ কালের মানবিক বয়ান | আসমা জেরিন

‘ডুমুর ফুলের পেখমে’ কালের মানবিক বয়ান | আসমা জেরিন

কবিমাত্রেই ভাষা, কল্পনায় স্বাতন্ত্রিক স্বর ও দৃষ্টিকে প্রকাশ করেন। চিন্তায়,মননে,কর্মে একে অন্যের চেয়ে ভিন্ন। কবি ও গবেষক আল মাকসুদও ‘ডুমুর ফুলের পেখম’ কাব্যগ্রন্থে সমকাল ও প্রকৃতিকে একান্তভাবে উপলব্ধি করেছেন। স্বকীয় দৃষ্টিভঙ্গির ব্যবহার করেছে। তার কাব্য ভাবনা,কাব্য বিশ্বাস ও কাব্যকৌশলে তার কবি প্রতিভার স্বাক্ষর-এই গ্রন্থ।

কবি আল মাকসুদ জীবনকে উপলব্ধি করেছেন ভিন্ন মাত্রায়। তিনি নিমগ্ন চিত্তে প্রবেশ করেছেন জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে। প্রত্যেক বিশিষ্ট কবিই তার যুগ ও সমাজ সম্বন্ধে সচেতন থেকে যখন কবিতা লিখতে থাকেন, তখন তার কবিতার আঙ্গিক ও ভাষায় বিচিত্রতা আসে। সময় ও জনসচেতনতার অভিনিবেশ এই গ্রন্থ। সমসাময়িক কালের চীনের উহান নগরী থেকে উদ্ভব করোনা ভাইরাসের যে ব্যাধি সারাবিশ্বের মানুষকে আন্দোলিত করেছে কবি তার চিত্রায়ন করেছন ‘ডুমুর ফুলের পেখম’ কাব্যগ্রন্থে। কোভিডকে কেন্দ্র করে তার অনেকগুলো কবিতা রয়েছে। যেমন- ‘মৃত্যু ও মৃত্তিকা’, ‘পানকৌড়ি সুখ’, ‘ভ্যাকসিন ডিপ্লোম্যাসি ও ব্যক্তিগত আন্তর্জাতিকতা’, ‘বিশ্বায়ন’, ‘মানুষ ভুলে যাচ্ছে স্পর্শ’ প্রভৃতি।

এই কাব্যগ্রন্থের অধিকাংশ কবিতায় কবি মৃত্যুভাবনা, স্মৃতিকাতরতা, ব্যক্তিচৈতন্যের স্বরূপ ও সমকালীন সমাজব্যবস্থাকে তুলে ধরেছেন নিপুন ভাবে। তাঁর কবিতায় মানুষের সুখ দুঃখ ও দ্রোহ সহজ সুন্দর ও সাবলীলভাবে প্রকাশিত। তার কবিতা পড়তে পড়তে মানবিকতার গহীনে যাত্রা করি।

।দুই।
‘ডুমুর ফুলের পেখম’ কাব্যগ্রন্থের ‘মৃত্যু ও মৃত্তিকা’ কবিতায় কোভিডের ভয়াবহ রূপকে তুলে ধরে কবি দেখিয়েছেন মৃত্যুই চরম সত্য, সহজ ও শাশ্বত-সুন্দর। এখানে কবি দেখান মৃত্যুর কাছে মানুষ অসহায় এবং মৃত্যুর কাছে কোনো শ্রেণিচিহ্ন নেই। তাইতো কবি বলেন-

“কলকারখানার শ্রমিক,গায়ের কৃষক,আদালত পাড়ার প্রবীণ উকিল
খ্যাতনামা জজসাহেব দাঁড়িয়ে যান এক কাতারে-”
(মৃত্যু ও মৃত্তিকা )
মৃত্যুর কাছে ছোট-বড়,ধনী-দরিদ্র সবকিছু এক হয়ে গেছে। কবি আরো দেখান জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মানুষ কীভাবে উদ্ভান্তের ন্যায় ছুটোছুটি করে। মৃত্যুতেই মানুষ লীন হয়ে যায় এই কথা তার মর্মে নিয়ে চৈতন্যস্নাত মানুষ সংশোধিত হয়। মানব রূপেই ফিরে আসতে চায়।

কবি চান মানুষ তার অন্তরকে বিকশিত করুক। সময়কে ভাগ করে পরের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখুক। পরের মঙ্গল কামনার মধ্যেই আপনার জীবনের মহত্ত্ব লুকায়িত। প্রকৃতির নিয়মে পৃথিবীতে আসা যাওয়ার মাঝে জীবনের তরে মহৎ কিছু করা। দুঃখবোধ থাকবেই। প্রকৃতিই মানুষের শেষ গন্তব্য। কবি লেখেন-

‘মানুষ মৃত্তিকা বই কিছু নয়।
মৃত্যু তার করুন-পাঠ- মৃত্তিকায় পড়ে থাকে সজল স্মৃতি আর স্বপ্নায়ুর বিজন সমর্পণ।’

।তিন।
কবি তার ‘মৃত্যু এক কর্পোরেট সুখ’ কবিতায় মরমীবাদকেও হাজির করেছেন। আত্মাই মরমীবাদের প্রধান কথা। মানুষের আত্মা যখন পরিশুদ্ধ থাকে মৃত্যুও তখন সুখকর মনে হয়। আত্মা কলুষিত থাকলে কোনো নীতিই বোধগম্য হয় না। তখন খসে পড়ে নৈতিক মানদণ্ড । কবি বলেন-
‘ভাঁড়ের পৃথিবীতে মৃত্যু এক কর্পোরেট সুখ;
রাজনীতির নীতি খসে পড়লে হাসে দুষ্ট মেকুর।’
(মৃত্যু এক কর্পোরেট সুখ)

কবি আল মাকসুদ এই কবিতায় মনসুর হাল্লাজের সুফিদর্শনকে দেখিয়েছেন। তিনি আত্মোপলব্ধির সাধক। কবি বলতে চেয়েছেন পরমেশ্বরকে নিজের দুঃখ দুর্দশার ভেতর দিয়ে উপলব্ধি করা যায়। যেভাবে মনসুর হাল্লাজ চেয়েছিলেন নিজেকে ইশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ করে মুক্তির পথ খোঁজে নিতে। কবি জীবনের জন্য জীবন-এই বাণী সকলের দ্বারে পৌঁছাতে চেয়েছেন। তিনি সাধারণ মানুষকে মুক্তির পথ দেখাতে চেয়েছেন। তাই তো মনসুর হাল্লাজের ভাষায় বলতে চেয়েছেন-

‘আমায় হত্যা করো হে আমার বিশ্বস্ত বন্ধুজন
আমার মৃত্যুতেই যে আমার জীবন।’

‘পানকৌড়ি সুখ’ কবিতায় কবি জীবনের প্রতি গভীর হতাশা এবং সুখ নামের অলীক বস্তুর প্রতি আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন। কবি দুঃখবোধকে জাগিয়ে তোলে সন্ধান করেছন সুখের। সময় বহমান নদীর মতো ছুটে চলে। কবি চান, এই ক্ষুদ্র জীবনের সময় ফুরাবার আগেই নিজের কর্তব্য পালন করতে। কবি বলেন-

‘ঘন্টা বাজে সময়ের- তার আগেই ফুরিয়ে যায় আমাদের সময়। কে বলে কাটে না সময়? সময়ই তো নেই- সময়ের মতো।
উদাস ব্যস্ত সময়ের এক টুকরো যদি নিতে পারতাম করে – ‘জীবনের সঞ্চয়’ ।’

( পানকৌড়ি সুখ)

গভীর আফসোসের সঙ্গে কবি এই ক্ষুদ্র জীবন থেকে সঞ্চয় হিসেবে মহৎ কিছু কর্ম নিতে চান যা তাকে দেবে অমৃতলাভের মতো সুখ। কবি আরো বলেন-

‘সমগ্র পৃথিবী পোড়োজমি।
তবুও খোঁজো ‘পানকৌড়িসুখ’
নিজেই জ্বলে ওঠো সমুদ্রবহ্নি;
কোথাও ফুটবে না হৃদয়ের মতো কুসুমকলি।’

পানকৌড়ির মতো সুখ না খুঁজে হৃদয় নামের জমিতে ভালোবাসা চাষ করে মানুষ হয়ে ওঠতে পারে। মহত্বই চির অম্লান। যা তাকে প্রকৃত সুখের সন্ধান দেবে।

।চার।
কবি ‘প্রিয় বাংলা ভাষা’ কবিতায় প্রকাশ করেছেন একুশের চেতনাকে। ভাষা শহীদেরাই রক্ত দিয়ে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে নাম খোদাই করে গেছেন। এই ইতিহাস চিরচৈতন্যের প্রতীক। কবি বলতে চান, একুশের ফুল শুকালেই একুশের চেতনাকে ভুলে যাওয়া নয় এই চেতনাকে অন্তরে ধারণ করা প্রয়োজন। ভাষা শহীদদের স্মরণে ফুল দিয়ে, সভা কিংবা সেমিনার করে চেতনাকে বহন করা যায় না । এই চেতনার বীজ হৃদয়ে বপন করে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে হবে। একুশে ফেব্রুয়ারি মর্মন্তুদ ও গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিবিজড়িত একটি দিন। তাই কবি বলেন-
“রেখে যায় ইতিহাসের সোনালি শাঁস।
রক্ত ও প্রেমের বিনিময়ে পাওয়া
ভাষা বাংলার আদিগন্ত বিলাস।”
( প্রিয় ভাষা বাংলা)

‘পুরুষ ও আমি’ কবিতায় কবি তুলে ধরেছেন সংসারে কবির আড়ষ্টতা। মূলত কবি এখানে সমাজের বিরূপ অবস্থাকে তুলে ধরেছেন এখানে। ধর্ষকদের বিকৃত মন থেকে যখন শিশু থেকে নারী কেউ রেহাই পায়না তখন তার ভয় হয়। ধর্ষকদের মতো কবিও পুরুষ তাই কবি পত্নীর মনে সন্দেহের বাসা। কবির মনে সংসারের সুখ নিয়ে টানাপোড়েন। ধর্ষক থেকে কবি যে আলাদা পুরুষ-তা বোঝাবার চেষ্টায় কবি ভালোবাসার রুমাল বুনেন। মূলত কবি অবিশ্বাস আর ভয়কে স্থায়ী করতে চান না। কবি পুরুষ বলে এতো সন্দেহ। কবি জানেন এই সন্দেহ আসলে ভয়; ভয়ের ভেতরে দূরত্ব ও কষ্ট। কবি দেখাতে চেয়েছেন পুরুষ শাসিত এই সমাজে নষ্ট চোখের মিছিলে তার লজ্জিত চোখ নত হয়ে থাকে। পুরুষের অসুস্থ মস্তিষ্কের তাড়নায় পাগলিটারও ছাড় নেই। তাই কবি আক্ষেপ করে বলেন-
‘অবিশ্বাসী হয়ে উঠছি পৃথিবীর জল-বাতাসে;
ভাঙন,কাম,রতি,জিঘাংসার কালবাজারে মূর্খ পুরুষ আমি।’
( পুরুষ ও আমি)

পাঁচ
কোভিডকালে মানুষের অসহায়ত্বের চিত্রকে আমরা দেখতে পাই ‘বিশ্বায়ন’ কবিতায়। পৃথিবীজুড়ে মৃত্যুর মিছিলে মানুষের বিরূপ মনের অবস্থাকে কবি তুলে এনেছেন এখানে। চারদিকে অগনিত মৃত্যু। মৃত্যুর হিসেব কেউ আর করে না। মাঝে মাঝে কিছু মহৎ মৃত্যু পত্রিকার প্রধান শিরোনামে আসে। মানুষ যখন তার জীবনের তল হারিয়ে ফেলে তখন সে জাত,ধর্ম, বর্ণ ভুলে যায়। কবি দেখান হাসপাতালে সারি সারি লাশ যেখানে ধর্ম বর্ণের কোনো ভেদ নেই। সব একাকার। সবার তখন এক পরিচয় সে মানুষ। ধর্ম আলাদা হলেও ইশ্বর এক, শুধু ভিন্ন নামে হৃদয়ে তার বাস। তাই কবি বলেন-
‘ইসা যিশু ভিন্ন নামে করে একই ঘরে সংসার।’
( বিশ্বায়ন)
কোভিড সারাবিশ্বকে বিচ্ছিন্ন করলেও অন্যদিকে যুক্ত করেছে। মানুষ মানুষের প্রতি সহৃদয়বান হয়ে ওঠেছে। জীবনবোধ তাদের করেছে একীভূত। তাই তো কবি বলেন-
‘এই-ই আমার শেষ নিবেদন
এই-ই আমার বিশ্বায়ন।’

যা কিছু সুন্দর, শুভ ও বিশুদ্ধ কবি তাকে পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন ‘বিজয় ও ৫১টি বিশুদ্ধ গোলাপ’ কবিতায়। আমরা বিজয় অর্জন করেছি ৫১ বছর হলো কিন্তু মানবিক মানুষ হয়ে উঠতে পারিনি। তাইতো কবি ৫১ টি বিশুদ্ধ গোলাপ চান এমনকি কিশোরীর উড়ে যাওয়া ফ্রকে খুঁজেছেন নতুন কোনো সৃষ্টি-যা তাকে বিজয়ের আনন্দ দেবে।

দেশের স্বাধীনতা কবির মনে শান্তি আনলেও বিজয় অর্জিত দেশের প্রতি সাধারণ মানুষের যে আকাঙ্ক্ষা তা পূরণ করতে না পারায় কবি মর্মাহত হন। কবি বলেন-
‘সুবাসিত প্রান্তর…নিষ্ফলা মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষক তবুও স্বপ্ন দেখে।’
( বিজয় ও ৫১টি বিশুদ্ধ গোলাপ)
আমাদের বিজয় আসলেও আমরা অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হতে পারিনি। তাই কবি বার বার ব্যথিত হয়েছেন এবং এই বেদনাকে এই কবিতায় ফুটিয়ে তোলেছেন।

।ছয়।

কবি ‘ডুমুর ফুলের পেখম’ কাব্যগ্রন্থে প্রকৃতি, সময়, সমাজ আর সময়ের বিরূপ আবর্তনকে ফুটিয়ে তোলেছেন। কবি কবিতার শুরুতেই মানুষের ক্ষুধা আর শিল্পের মধ্যে একটা ঐক্যতান দেখিয়েছেন। মানুষের মৃত্যু ও প্রকৃতির যে গভীর সাদৃশ্য তা ফুটে ওঠে তার কবিতার লাইনে। তিনি বলেন-
‘যেদিন আব্বা চলে গেলেন সেদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি ছিল কেঁদেছিল আকাশ।”
( ডুমুর ফুলের পেখম)
প্রকৃতির সাথে মানব জীবনের গভীর যোগসূত্র তা তিনি নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। বর্তমান সময় যে প্রতিকূল, প্রতি পদে পদে বাঁধা আর সুখ খসে পড়া প্রতিটি মুহূর্তেই তিনি উপলব্ধি করেছেন। তিনি লিখেছেন-
‘সেখানে মৎস দম্পতি হানিমুনে গেলে
আমাদের বিস্ময় কোনো ইতিহাস তৈরী করে না।’

প্রকৃতি যেমন আশীর্বাদ তেমনি প্রকৃতির রৌদ্র রূপ আমাদের আহত করে। মানব মনের আক্ষেপ এই যে কারোরই মনের মতো কিছু হয়না। প্রকৃতির পরই তিনি স্মৃতিকাতরতা প্রকাশ করেন। মায়ের বকুনিতে তিনি আশ্রয় খোঁজেছেন। ভালোবাসাকে তিনি ডুমুর ফুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই ভালোবাসা যেন পৃথিবীর এক অলীক বস্তু তা ধরার আগেই হারিয়ে যায়। তাই হয়তো কবি মায়ের অদম্য সন্তান হিসেবে নিজেকে মেনে নিয়েছেন। অশ্রু খরায় পরিণত হয়, শুষ্ক হয়ে যায় আবেগ অনুভূতি গুলো।

কবি নিজ দৃষ্টিতে পূর্বপুরুষের জীবনের দিকে তাকিয়ে দেখেন এই জীবনে কিছুই নেই। মানুষ আপন কাজে ভুলে যায় অতীত। কবির মনে প্রশ্ন জাগে কিসের জন্য এতো ছুটোছুটি, কিসের জন্য এই অমরতার লোভ? মূলত অমরতা ডুমুর ফুলের মতোই দূর্লভ বস্তু। তাকে সহজেই পাওয়া যায় না। তবে কেউ কেউ কি পায় কঠিন সাধনায়?

‘গুরুর বারামখানা’ কবিতায় আত্মাতিক চিন্তাভাবনার প্রকাশ পায়। পরমাত্মার সন্ধান করতে চাইলে সাধকের কাম,ক্রোধ,অহং,বিষয়-বাসনা বিসর্জন দিতে হয়। আত্মাকে শুদ্ধ রাখা তার প্রধান ধর্ম। কারণ আত্মাকে কেন্দ্র করেই তার সকল সাধনা। কবি বলেন-
‘ভবে মানুষ-গুরু নিষ্ঠা যার, সর্বসাধন হয় তার।’
( গুরুর বারামখানা)
অর্থাৎ মানুষের প্রতি ভালোবাসা রেখে, নিষ্ঠার সাথে গুরুর দীক্ষা গ্রহণ করে মানুষ তার সাধনার ফল লাভ করতে পারে। আপনাকে চেনা বড় দায়। তাই সহস্র মানুষের ভিড়ে মানুষ নিজেকে খুঁজতে বেরিয়ে পরে অজানার উদ্দেশ্যে। কেন-কোথায়-কতদূর তার উত্তর একমাত্র সাধকের আত্মাই জানে।

কবি আল মাকসুদ তার ‘বোধ কবিতায় আত্মা, মন ও দেহের অবস্থান একটির সাথে অন্যটির যোগসূত্র ফুটিয়ে তোলে এক অবয়ব মূর্তিমান জীবনবোধকে হাজির করেছেন। প্রেম,হতাশা,চাওয়া-পাওয়া বা না-পাওয়ার দ্বন্দ্বে মানবমনে এক বোধ কাজ করে। কবি তা স্বতন্ত্রভাবে দেখেননি। তিনি দেখিয়েছেন বোধ মানবমনের এক সুপ্ত চিন্তা যা কোনো কঠিন পদার্থে দেখা মেলে না।

বোধহীন চিত্তে কখনো পরিশুদ্ধি আসে না। মূলত বোধহীন মানবমনকে কবি মাতাল বলেছেন। মানুষের জীবনে যে চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে তার জন্ম বোধ থেকে। কবি এটাও বলেছেন বোধ আর অনুভূতি একসাথে থাকতে পারে না। বোধ আমাদের ভালো মন্দের নানা দিক নির্দেশনা দেয় আর অনুভূতি এসবের উর্ধ্বে। তিনি বলেন-
‘অপচয়হীন একটি বোধকে ভীষণ দামি মনে করি..’
( বোধ)
একটি সুন্দর বোধ একটি সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ‘বোধ’ কবিতায় কবি নিজ স্বার্থে নিমগ্ন না থেকে সাধারণের জন্য আত্মত্যাগকেই ধর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

‘অমানুষ’ কবিতায় কবি সমাজের মানুষ ও অমানুষদের চিত্র তুলে ধরেন। সমাজে অসংখ্য মানুষ রয়েছে যারা নিজেকে মানুষ বলে দাবি করে। অমানুষেরা দেখতে অবিকল মানুষের মতো তাই যখন কবি অমানুষ খুঁজতে অনুরোধ জানায় তখন একজন অমানুষও খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ মুখোশের আড়ালে সবাই মানুষের রূপ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কবির এমন প্রস্তাবে সবাই তাঁকেই এখন এলিয়েন ভাবছে এবং অমানুষ বলে আখ্যায়িত করেছে। তিনি বলেন-
‘আমি এখন ভীষণ বিখ্যাত যদ্যপি অমানুষ আমি।’
(অমানুষ)

কবি বুঝিয়েছেন যেখানে অসংখ্য অমানুষের সংখ্যা বেশি সেখানে একজন সৎ ও মানবিকতা সম্পন্ন মানুষ বেশিদিন মানুষ হয়ে থাকতে পারে না।

কবি আল মাকসুদের কবি মানস সংবেদনশীল, মানবপ্রেম, সমাজচেতনা প্রভৃতি বিষয়ে ঘূর্ণায়মান এবং তারই সুস্পষ্ট প্রতিফলন তাঁর এই কাব্যগ্রন্থ। শিল্পগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে তিনি অত্যন্ত সচেতন শিল্পী। সময়ের ধারাক্রমে হতাশার ভেতরেও স্বপ্ন দেখেন এবং লেখেন। স্বপ্ন ও শান্তিতে বসানোই কবির কাজ।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

জাদুবাস্তব, পরাবাস্তব, রহস্যে ঠাসা উপন্যাস পশ্চিমের হাওয়ায় প্রাণ | আবু হেনা মোস্তফা ফরহাদ

Sat Apr 22 , 2023
জাদুবাস্তব, পরাবাস্তব, রহস্যে ঠাসা উপন্যাস পশ্চিমের হাওয়ায় প্রাণ | আবু হেনা মোস্তফা ফরহাদ রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ফুরফুরে মনে চা নাস্তা খাওয়ার সাথে পত্রিকার পাতায় চোখ বোলানো হয় তো আপনার? খুনখারাবি, ধর্ষণ, আগুনে পুড়ে কয়লা হওয়া নিরীহ মানুষের আর্তনাদ আর সাথে থাকা একঘেয়ে রাজনৈতিক ক্যাচাল নিশ্চয় সকালের স্নিগ্ধ আমেজটাকে […]
Shares