জাদুবাস্তব, পরাবাস্তব, রহস্যে ঠাসা উপন্যাস পশ্চিমের হাওয়ায় প্রাণ | আবু হেনা মোস্তফা ফরহাদ

জাদুবাস্তব, পরাবাস্তব, রহস্যে ঠাসা উপন্যাস পশ্চিমের হাওয়ায় প্রাণ | আবু হেনা মোস্তফা ফরহাদ

রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ফুরফুরে মনে চা নাস্তা খাওয়ার সাথে পত্রিকার পাতায় চোখ বোলানো হয় তো আপনার? খুনখারাবি, ধর্ষণ, আগুনে পুড়ে কয়লা হওয়া নিরীহ মানুষের আর্তনাদ আর সাথে থাকা একঘেয়ে রাজনৈতিক ক্যাচাল নিশ্চয় সকালের স্নিগ্ধ আমেজটাকে মুহূর্তেই উধাও করে দেয়। তাই ভাবলাম আজ আপনাদের এই একঘেয়ে, বিরক্তিকর অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে একটা গল্প শোনাই। সে অনেক অনেক দিন আগের কথা। একটা জঙ্গলে এক নেকড়ের ফাগুন মাসের জোছনা ভোজন ছিল। জোছনা ভোজন মূলত ফাগুন মাসের জোছনা রাতে দেবতাকে খুশি করার জন্য ভোজের আয়োজন। দেবতার প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে জঙ্গলের সবাই সেই ভোজে কমবেশি অবদান রাখত। নেকড়ে পরিবারের কর্তা বলল, ‘দেখি কে কী আনতে পারে, কার খাদ্য এবার কত তাজা আর সুস্বাদু হয়।’ এই নেকড়ের পরিবারের সঙ্গে সবসময় একটা শেয়াল থাকত। বুদ্ধি, পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করতো নেতার পরিবারকে, আর সঙ্গে খানাপিনা করত। শুধু রাতে থাকতো নিজের পরিবারের সাথে, বাকি সময়টা দিত নেকড়ে পরিবারকে। এদিকে কর্তা নেত্রীর বৃদ্ধ পিতা অনেকদিন ধরে কোন শিকার করে না, দলবেঁধে শিকারে ও যায় না, শরীরের জন্যেই বসে বসে কত খাবে। আজ একটা মোরগ, পাখি বা অন্য কিছু ধরে আনার চিন্তা করল। বৃদ্ধ নেকড়ে ভাবল কি শিকার ধরতে পারে তা নিয়ে শিয়াল পন্ডিতের কাছে বুদ্ধি নেবে। এদিকে আইলস্যার গুরুঠাকুর নেকড়ে পরিবারের বড়ো ছেলেরও শিকার করতে ভালো লাগে না। সে ভাবলো এবার শিয়াল পন্ডিতের পরামর্শ নিবে। অন্যদিকে পরিবারের কর্ত্রী নেকড়ে মনে করলো তার পোলাপান মানুষ করতে হয়, রান্নাবান্না করতে হয়, কত কি করতে হয়; কীভাবে একটি শিকার ধরা যায় সহজে, যাই আজকে শিয়াল পণ্ডিতের কাছে জেনে আসি। সেই রাতে টগবগে জোছনা উঠল, সেই জোছনার আলোয় সবাই এসে বিভিন্ন সুস্বাদু মাংস জমা দেয়। বৃদ্ধ পিতা, ছেলে আর বউ এসে একই রকম মাংস জমা দেয়। কর্তা নেকড়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে এটা কিসের মাংস? সবাই আমতা আমতা করে বলে ইয়ে মানে শিয়াল পণ্ডিতের। বুদ্ধিমান নেকড়ে সবই বোঝে, ভোজসভা চলতে থাকে।

গল্পটা পড়ে কেমন লাগলো আপনাদের? হ্যাঁ, গল্পটা বেশ মজার। কিন্তু এর মর্মার্থ বুঝতে আরও গভীরে যেতে হবে। একবার ভেবে দেখেছেন শিয়াল পণ্ডিতের কী অবস্থা হলো? আমরা সমাজের সেই শিয়াল পণ্ডিত যারা সারা জীবন নিজেদের শিক্ষা, শ্রম, কষ্ট একাকার করে দিয়ে সামান্য জীবিকার তাগিদে লড়াই করে যাচ্ছি। তৃতীয় বিশ্বের একটা অনগ্রসর দেশে পেটপূজার বাইরে আমাদের আর কিছুই করার থাকে না। এসব বঞ্চনা, বৈষম্য, শোষণ, নিপীড়ন নিয়ে যদি অন্যরকম একটি বই পড়তে চান তাহলে আপনাদের নিয়ে যাব আরও একটা গল্পের জগতে। সে গল্পের বাঁকে বাঁকে আছে আমাদের নিজেদের জীবনের কথা, আমাদের অস্তিত্বের কথা, আমাদের বেঁচে থাকার সংগ্রামের কথা। তাহলে চলুন ঘুরে আসি মেহেদী ধ্রুব’র পশ্চিমের হাওয়ায় প্রাণে।

পূর্বকথা : পশ্চিম আসমান লাল হয়ে উঠলে লোকটা পথ চলে; গাছ-পালা,লতা-পাতা ও বন-জঙ্গলের ভিতর দিয়ে, ঘুমন্ত মাটি মাড়িয়ে, চুপিচুপি উকুনের মতো পিলপিল করে, লাঠিতে ভর দিয়ে, টুকটুক শব্দ করে। তার ক্লান্ত পা, ঢুলুঢুলু চোখ ও অসাড় দেহ চেয়ারম্যানের বাড়ির সামনে পৌঁছে। তারপর একটানা কড়া নাড়ে করাতের শব্দের মতো; যা চেয়ারম্যান সাহেবের বউয়ের কানে তীরের মতো বিঁধে। চেয়ারম্যান সাহেবের বউ নরম মনের মানুষ, লোকটার অবস্থা দেখে মায়া হয় তার। তাই উঠোনে মাদুর পেতে দেন। লোকটা ইশারায় খাবার চায়, বেচারা বউ মানুষের দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে পারেন না। বউয়ের কলিজা ফেটে যেতে চায়, হায় কেউ না খেয়ে এভাবে থাকে! লোকটার অবস্থা দেখে মায়া হয় তার, উঠোনে একটা মাদুর পেতে দেন। অনেকদিন পর নতুন ফুলকপি দিয়ে লসলসা ঝোলের তরকারি, চিংড়ি দিয়ে পুঁইশাক, কালো কবুতর ভুনা আর জলপাইয়ের ঘন ডাল পেয়ে লোকটা গোগ্রাসে গিলতে থাকে। এই দৃশ্য দেখে বউয়ের শান্তি লাগে লোকটার মুখের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকেন। এই বউয়ের এই এক স্বভাব; মানুষের দুঃখেও কাঁদেন, সুখেও কাঁদেন। লোকটার খাওয়া শেষ করে ডান হাতের মধ্যমা দিয়ে ইশারা করে বউকে ডাকে। তারপর শূন্যে থাবা দিয়ে কিছু একটা ধরতে চায়, বউকে মুঠি খুলে দেখায় একটা পয়সা; স্বর্ণের মতো মনে হয় তাতে ইগলের ছবি। তারপর লোকটা চামড়ার ব্যাগ থেকে খাতা বের করে পরিষ্কার বাংলায় লেখা শুরু করে,’আমার নাম নেই ঘর বাড়ি নেই,এই পথঘাট বন জঙ্গলে আমার ঠিকানা। কেউ কিছু খেতে দিলে খাই না দিলে খাই না,আমি এসেছি একটা বিশেষ কাজে। কিছুদিনের মধ্যে এখানে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। একটা অশুভ হাওয়া বয়ে যাবে এই পরিবারের উপর দিয়ে।’

এই উপন্যাসের কাহিনীটা বেশ বড়ো। তিন পর্ব : পিঁপড়া, ইঁদুর,পঙ্খিরাজ পর্বে বিভক্ত এই বিশাল প্লটে লেখা উপন্যাসের কাহিনি বোঝার সুবিধার্থে আগে এই তিন পর্ব সম্পর্কে অল্প বিস্তর আলোচনা করা যাক।

পিঁপড়া পর্ব : কাহিনির শুরু পূর্বে আলোচিত সেই অপরিচিত লোককে নিয়েই। অদ্ভুত এই লোকের সাথে কথা বলতে গিয়ে এই পর্বে ফেল করা চেয়ারম্যান আমজাদ খানের বর্ণনায় গল্পের কাহিনি উঠে এসেছে। সহজ সরল মনের একটা মানুষ, যার পছন্দ গান-বাজনা করা আর এলাকার মানুষের সাথে গল্প করে সময় কাটানো। জনগণের সাথে একাত্ম হওয়া, সাধারণ মানুষের সাথে মিশে তাদের সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়ার গুণ যদি আমাদের সমাজে চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলীর তালিকায় থাকত; তাহলে নিঃসন্দেহে আমজাদ খানকে চেয়ারম্যানের চরিত্রে আদর্শ মানা যেত। কিন্তু সমাজের চিত্র বিপরীত। এখানে আমজাদ খানের মতো মানুষ চেয়ারম্যান হতে পারে না, তাদের কেউ মূল্যায়ন করে না। এজন্যই তার বুদ্ধিমান ছেলে আওলাদ খান একবার দাঁড়িয়ে জনপ্রিয় চেয়ারম্যান হয়ে যায়, এমনকি এমপি হওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। এতটাই নিষ্ঠুর একজন মানুষ যে তার নিজের জীবনসঙ্গীকেও মায়া করে না নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য। আওলাদের ভাই আরাফ খান উচ্চশিক্ষিত, তবে সবকিছু বুঝেও সে পরিবারের স্বার্থে লুকিয়ে রাখে। তবে দুই ভাইয়ের একদিকে ভালোই মিল আছে। আবার ভেবে বসবেন না এই মিল কোনো গুণের, আদতে সে মিল তাদের চরিত্রের দোষে। পিঁপড়া পর্বে এই পরিবারের বাইরে আরো আছে স্কুল শিক্ষকের পরাজয়, চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক উত্থান, খুন, গ্রাম্য যৌনতা।

ইঁদুর পর্ব : এই পর্বের ঘটনা কোভিড মহামারি শুরু হওয়ার পর। এখানে বাবার ভূমিকা দেখা যাবে গত পর্বের শক্তিশালী চেয়ারম্যান আওলাদ খানকে। যিনি বর্তমানে অন্ধ এবং বয়সের ভারে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে ক্ষমতায় আছেন তার বড়ো ছেলে মেয়র আরজু খান। অতীতের ঘটনার মতো পরিবারের মানুষকে ব্যবহার করে কীভাবে পাবলিক সিমপ্যাথি আদায় করতে হয় সেটা খুব ভালোভাবে জানা ছিল আরজু খানের। আরজু খানের ছেলে শুভ খান বাপের প্রতিপত্তি ও ক্ষমতায় বিপুল বাণিজ্য সম্পদের মালিক হয়ে যায়। তবে টাকা দিয়ে সবসময় সম্মান কেনা যায় না সেটা শুভ খান বেশ ভালোই বুঝত। সেজন্য নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা, অনলাইন বিজনেস মার্কেটিং দিয়ে তরুণদের সহযোগিতা করে বিভিন্ন ভাবে মানুষের সমর্থন আদায় করা ছিল তার অন্যতম লক্ষ্য। আর এসব তরুণ-তরুণীদের মাঝে যদি কোন সুন্দরী মেয়ে এসে হাজির হয় তবে তো কথাই নেই। সুন্দর সাজানো অফিসের পার্সোনাল রুমে তরুণীদের সাথে তার কাটে আনন্দঘন মুহূর্ত। এই পর্বে মহামারি, কলেজ শিক্ষকের পরাজয়, মেয়রের রাজনৈতিক উত্থান, খুন, অর্থ পাচার, যৌনতা, প্রেম প্রধান অনুসঙ্গ।

পঙ্খিরাজ পর্ব : ‘পঙ্খিরাজ’ পর্বটি ২০৫০ খ্রিষ্টাব্দ বা তার আশেপাশের সময়ের গল্প। বর্তমানে প্রবল ক্ষমতাশালী মন্ত্রী শুভ খান তার পৈতৃক বসতভিটায় নির্মিত বাংলোতে প্রতি মঙ্গলবারে জলসার আয়োজন করেন। এটা এমন একটা সময়ের ঘটনা যখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত পৃথিবীতে পানি নিয়ে মারামারি, জ্বালানি নিয়ে কাড়াকাড়ি। যখন পৃথিবী কাবু হয়ে গেছে মহামারি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে; যখন মানুষের মনে বিশ্বাস বলতে কিছুই নেই; যখন ধর্ম নিয়ে খুনাখুনি অহরহ ঘটতে থাকে। এসব ঘটনা সামাল দিতেই মন্ত্রী মহোদয় রেগুলার এই জলসার আয়োজন করেন ।সেখানে গান বাজনা হয়, গল্পের আসর জমে তারপর সবার হাতে উন্নত মানের খাবার তুলে দেওয়া হয়। এসব ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়ায় সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, এইভাবে দেশের গরিব অভাবী মানুষকে বোঝানো হয় সরকার, মন্ত্রী তাদের সাথে আছে। এরপর এক অজানা শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে মন্ত্রী মহোদয়ের ছেলে আরণ্যক দাঁড়িয়ে যায়। একজন অসৎ ও দুর্নীতিপরায়ণ লোকের ছেলে হয়েও সে এতিমদের জন্য একাডেমি করে দেয় আর বৈষম্যহীন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখে। এখানে শুভ খানের মন্ত্রী হিসেবে উত্থান, শিক্ষার পরাজয়, অবাধ যৌনতার গল্প আছে।

এই উপন্যাসটার পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখাটা বেশ কঠিন ছিল। লেখক খুব সহজভাবে কাহিনি এগিয়ে নিয়ে গেলেও বিশাল, বিস্তৃত এই উপন্যাসের স্বাদ আহরণ করা এতটা সহজ ছিল না। আমার মনে হয়েছে সবচেয়ে ভালো হয় কাহিনির সাথে সাথে গল্পটা কেমন লেগেছে শুধু এতটুকু জানানো। পাঁচ প্রজন্মের পাঁচজন পুরুষের জীবন কাহিনি উঠে এসেছে এখানে। এসব কাহিনির সাথে জড়িত তাদের প্রেমিকা, বউ, ছেলে, মেয়ে আরো অন্য মানুষের ঘটনাগুলো একের পর এক চলে এসেছে একই ধাঁচে প্রত্যেকের মৌখিক বর্ণনায়। উত্তম পুরুষের জবানিতে লেখা এরকম উপন্যাস পড়তে ভালই লাগে। এ ধরনের উপন্যাস পড়ার সময় মনে হয় নিজেই যেন কথকের সামনে বসে শুনছি তার বলা গল্প। কথকের বাচনভঙ্গি, প্রতিক্রিয়া সব যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এই উপন্যাসের ক্ষেত্রেও সেটার ব্যতিক্রম হয়নি। কয়জন নিজের বুকে হাত রেখে সত্যি বলতে পারবেন টাকা আর অবাধ ক্ষমতার লোভে আপনি নিজেও অসৎ পথে ধাবিত হবেন না? অবশ্যই হওয়ার কথা। কারণ আমরা মানুষ; আর মানুষ মাত্রই ক্ষণিক আনন্দের জন্য সবসময়ই সহজ পথ খোঁজা এক দিশেহারা পথিক।

কাহিনিটা মূলত একজন জাদুকর টাইপের লোকের আগমনের মাধ্যমে শুরু হয়েছে। একটা পরিবারের সবার সাথে তার কথোপকথনের মাধ্যমে কাহিনির বাকি অংশ এগিয়েছে। প্রত্যেকবারই লোকটা নতুন নতুন মানুষকে ডেকে তাদের অতীত এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বলে এবং সেই মানুষটাও নিজ থেকেই যত পাপ, অন্যায়-অবিচার অতীতে করেছে সব গড়গড় করে বলে দেয়। মানুষ সব সময়ই নিজের ভালো কাজ দিয়ে খারাপ কাজগুলো ঢেকে রাখতে চায়। কিন্তু সমাজের কাছ থেকে, বাইরের মানুষের নজর নিজের পাপের কলঙ্ক ঢেকে রাখতে পারলেও নিজের কাছে কি তা আড়াল করা যায়? হয়ত সাময়িক আত্মতুষ্টির জন্য পুণ্যের এক স্বচ্ছ পর্দা তৈরি করা যায় নিজের ভেতর। কিন্তু সেই স্বচ্ছ পর্দা ভেদ করে পাপের কালো পর্দার আভা ঠিকই মনের গহিনে ছায়া ফেলে। নিজের পাপের কাহিনি বলে যাওয়ার এই ব্যাপারটা কিছুটা ফ্যান্টাসির মতো মনে হলেও এটাকে আমি পরাবাস্তব ও রহস্যময় ঘটনার সাথে তুলনা করব। এই ঘটনাগুলো উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মুখে বর্ণনা করার সময় অপরিচিত লোকটির মাধ্যমে লেখক ছোটো ছোটো শিক্ষামূলক গল্পের অবতারণা করেছেন। রূপকথা ও ঈশ্বপের গল্পের মতো এগুলা উপন্যাসের মধ্যে পড়তে বেশ ভালোই লাগবে।

উপন্যাসটি মূলত বিউপনিবেশায়ন (Decolonization) নিয়ে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ধরন নিয়ে, তৃতীয় বিশ্বের মানুষ নিয়ে। বিউপনিবেশায়ন হলো উপনিবেশায়ন থেকে সামগ্রিক মুক্তির প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে স্বাধীনতা অর্জিত হলেও এখানে বিউপনিবেশায়ন আজও টিকে রয়েছে। অবাক হয়ে যাচ্ছেন? আপনার সুস্থ মগজ এই তেতো সত্য নিতে চাইবে না; কিন্তু এটাই বাস্তবতা। একবার আমাদের সমাজব্যবস্থা নিয়ে ভেবে দেখুন। এই নিপীড়ক শাসন ব্যবস্থা, প্রশাসনিক বিচার ব্যবস্থা, পুলিশি ব্যবস্থা কথা বাদই দিলাম মশাই; এমনকি রাজস্ব, রেল ও ডাক বিভাগ পর্যন্ত ব্রিটিশদের তৈরি করে যাওয়া। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের রেখে যাওয়া এই সিস্টেম বরাবরই শাসনের নামে শোষণ আর শোষণে জর্জরিত করতে নিরীহ, অসহায় মুক্তিকামী ১৬ কোটি মানুষকে দমিয়ে রাখার চাবিকাঠি ছিল। আলোচ্য উপন্যাসে তিন প্রজন্মের কলংকিত জীবনের কাহিনি অংকিত হয়েছে যারা সবাই ছিল চরিত্রহীন, ধান্দাবাজ ও পরনারীতে আসক্ত। কিন্তু এদের দোষ ছাপিয়ে যে বিষয়টা সূক্ষ্মভাবে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন সেটি হলো বাইরের সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি কীভাবে আমাদের মানসিকতাকে কলুষিত করে নিজ স্বার্থসিদ্ধি করে।

উপন্যাসের প্রথম দুই পর্বে জাদুকরের আবির্ভাব ঘটে যে বিভিন্ন উচ্চাভিলাষী গল্প শোনায়, মানুষের লোভকে শতগুনে বাড়িয়ে তোলে, তাদেরকে পরামর্শ দেয় আর সাহায্যের কথা বলে। আদতে সে এভাবে প্রত্যেকটা মানুষকে একে অন্যের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, একে অন্যের বিরুদ্ধে লেলিয়ে নিজ ফায়দা হাসিল করে। গল্পের শুরুতেই সবচেয়ে শিক্ষিত আরাফ খানকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে কারণ সে হয়ত একটা সময় অনেকটাই ঘটনা ধরতে সক্ষম হতো। জাদুকর টাইপের লোকটা কখনও বোবা, কখনও অন্ধ কিংবা কখনও হলোগ্রাম হয়ে সবার মনের কথা বলে দেয়, সবার ইতিহাস জানে। একসময় পুরো দেশটাকে নিয়ন্ত্রণে নেয়, নতুনভাবে নতুন কৌশলে। তার এই এই শোষণের বা নিয়ন্ত্রণের অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে প্রযুক্তি। রূপকের ছলে লেখা এই প্রযুক্তি আসলে মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও হতে পারে, ধর্মের দোহাই দিয়ে মানুষে মানুষে বিভেদ করাও হতে পারে, কখনওবা ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে তাদের পুতুলের মতো নাচাতেও পারে।

উপন্যাসটি বোঝার জন্য আসলেই বেগ পেতে হয়েছে। রূপকের ভিতরে যেন রূপকের অন্য আরেক পরত ছিল এখানে। কাহিনিতে প্রচুর ১৮+ ঘটনার বর্ণনফ রয়েছে যেগুলা অনেকের কাছে অসহনীয় লাগতে পারে। লেখকের ভাষায় অবাধ যৌনতার ব্যবহার লক্ষ করা যায় যেটা অপ্রাসঙ্গিক নয় মোটেও, কাহিনির প্রয়োজনের বেশিরভাগ চরিত্রই এমন নটি ছিল। কিছু জায়গায় আপনার অধৈর্য লাগতে পারে, একটি চরিত্রকে সবাই পছন্দ করে, সবাই তার সাথে পরকীয়া করে আর সবাই তাকে নিয়ে বেডে যায়। প্রত্যেক পর্বেই পরিবারের কাউকে বলি দিয়ে রাজনৈতিক সহানুভূতি পাওয়ার বিষয়টাও একই রকম লেগেছে। একই সাথে একটি পরিবারে ২/৩ জন গর্ভবতী হয়ে যায়, আবার একই দিনে তাদের সন্তান হয়। এইরকম কাকতালীয় বিষয়গুলো বাদ দিয়ে যদি পড়েন তাহলে নিঃসন্দেহে মেহেদী ধ্রুব একজন অসাধারণ গল্পকথক। আর এই গল্প বলার ধরনটাই ছিল এই উপন্যাসের আসল প্রাণ, পশ্চিমের হাওয়ায় প্রাণ।

রিভিউয়ার : আবু হেনা মোস্তফা ফরহাদ
ডেন্টাল সার্জন।
সম্পাদনা : ফাতেমা তুজ জোহরা
এমবিএ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।
ফিডব্যাক : [email protected]

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

মাসানুবোফুকোওকা এবং কবি মামুন খানের- বরুণতলার বাওয়ানি|রাজীব আর্জুনি

Sun Apr 23 , 2023
মাসানুবোফুকোওকা এবং কবি মামুন খানের- বরুণতলার বাওয়ানি|রাজীব আর্জুনি মাসানুবো ফুকোওকা। জাপানি দার্শনিক। ‘দ্য ওয়ান স্ট্র রেভ্যুলেশন’ তাঁর বিখ্যাত বই। প্রাকৃতিক চাষাবাদ বিষয়ক তাঁর দর্শন এবং তিনি শিখিয়ে গেছেন কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। কবি কফিল আহমেদের ‘মাসানুবো ফুকোওকা ‘ নামে বিখ্যাত একটি গানও আছে। মামুন খানের ‘বরুণতলার বাওয়ানি’ কাব্যগ্রন্থ […]
Shares