মাসানুবোফুকোওকা এবং কবি মামুন খানের- বরুণতলার বাওয়ানি|রাজীব আর্জুনি

মাসানুবোফুকোওকা এবং কবি মামুন খানের-
বরুণতলার বাওয়ানি|রাজীব আর্জুনি

মাসানুবো ফুকোওকা। জাপানি দার্শনিক। ‘দ্য ওয়ান স্ট্র রেভ্যুলেশন’ তাঁর বিখ্যাত বই। প্রাকৃতিক চাষাবাদ বিষয়ক তাঁর দর্শন এবং তিনি শিখিয়ে গেছেন কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। কবি কফিল আহমেদের
‘মাসানুবো ফুকোওকা ‘ নামে বিখ্যাত একটি গানও আছে। মামুন খানের ‘বরুণতলার বাওয়ানি’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে লিখতে গিয়ে হঠাৎ এই গানটাই কেন মাথায় দুলতে লাগলো বুঝতে পারলাম না।

মাসানুবো ফুকোওকা
মাসানুবো ফুকোওকা!!

এনিওয়ে। কবিতায় আসি।
সমকালীন বাংলা কবিতার বৃহদংশের লড়াদশা এই সে আধুনিক হয়ে উঠতে চায়! উত্তর আধুনিক তো পরের কথা। আধুনিক হওয়া না হওয়া নয় কথা হলো কবিকে দিন শেষে কবিতাই লিখতে হয়, যেতে হয় মগ্নতায়। যাপনের ও লেখার যৌথ সমন্বয়ে তাঁকে পাড়ি দিতে হয় দুনিয়া।

দুনিয়াদারির বিহবলতায় মামুন খান
পাড়ি দিয়ে চলেছেন কবিতার পথ।
সেই পথ কী ফুল জলে ভরপুর কুসুমিত পথ, কন্টকাকীর্ণ নাকি বহু কাঠ খড়ে পোড়া দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পোড়োবাড়ির মতো মায়াময় মোহময়? যা কিনা প্রলুব্ধ বা আকৃষ্ট করে আমাদের।
প্রলুব্ধ যদি করেই সেটা কীরকম?

মামুন বলছেন :

“যতটা বাউলাগান আমি ততটা বাউল নই”

আমি/ পাঁচ

তিনি বাউল নন অথচ তিনি বাউলাগান। যিনি বাউলাগান তিনি তাহলে বাউলের অধিক আর যিনি বাউল সেও তো তাঁর অধিকই, নাকি? কবি এই প্যারাডক্সিকাল বচন দিয়ে একটা প্যারাডাইমে শিফট হতে চান। এটা মামুনের মুন্সিয়ানা।

আবার যখন তিনি বলেন :

“তোমাদের ওয়েদার অনুযায়ী চেঞ্জ হওয়া মাল আমি না।

আমি, মামুন খান। ”

আমি/ তিন

চমৎকার। এই জায়গায় তিনি আমাদের প্রলুব্ধ করছেন না। বরং নিজে একটা ওনারশীপ নিয়ে প্রলুব্ধ বা

সম্মোহন বাদ দিয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন মাথা উঁচু করে।এটা সাহস আর বিশ্বাস নাকি তারও অধিক?নিজের উন্মোচন? এরকম বলনের শক্তি ইন্সপায়ার করে, আলোড়ন করে কি?

আচ্ছা কবিতার আলোড়ন ইন্সপায়রেশন

এগুলো বাদ দেন, এই যে কবিতা নিয়ে আপনাদের এত বিসম্বাদ আলোচনা

তাহলে পৃথিবীতে কবিতার প্রভাব কোথায়? নেই বুঝি!?

পৃথিবীর যা কিছু আপনি দেখেন সেটা যে কবিতাপূর্ন সেটা মনে হয় না? খন্ড খন্ড আকারে কবিতার সৌন্দর্য ছড়িয়ে ছিটিয়েই অখন্ড এই বিপুলা পৃথিবী। রবীন্দ্রনাথ বলছেন : “বিপুলা এই পৃথিবীর কতটুকু জানি”। তো পৃথিবীটা দেখুন! একটু সামনে আগিয়ে আরেকটু পেছনে গিয়ে সময়ের শব্দ প্রতিশব্দ নিয়ে বলুন :

” বেবিলনে একা একা এমনই হেঁটেছি আমি রাতের ভিতর কেন যেন ;

আজো আমি জানি নাকো হাজার হাজার ব্যস্ত বছরের পর। ”

পথ হাঁটা/জীবনানন্দ দাশ

অথবা বলছেন ওয়াল্ট হুইটম্যান :

“I am not the poet of goodness only, I do not decline to be the poet of wickedness also.”

Song of myself, 22.

কবিতা কখনো মন্ময় কখনো তন্ময় কখনো ভাবের কখনো অ-ভাবের কখনো কবিতা নিজেই জানে না সে শেষ পঙক্তির পর শেষ হতে পারলো কিনা।

যাঁরা কবিতার শেষ অ-শেষ বা গল্প অ-গল্পের বা প্রথাগত ছন্দ- অছন্দের বিষয় নিয়ে বাংলা কবিতার খোল নলচে পাল্টে দিতে চান বা নিজের রাশি রাশি ছিঁড়বেন বলে এখনো বাসনা নিয়ে আছেন তাঁদের জন্য করুণা বা একটা বিগ থাম্বস আপ রইলো, কেমন!

মামুন খান বরুণতলার বাওয়ানিতে স্বরাট, সাব্জেক্টিভ, ঈষৎ শ্লেষ ও বিদ্রুপের সমন্বয়ে খানিকটা সমকালীন সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ভাবালুতা এবং চিন্তার নিগোশিয়েন ঘটানোর প্রয়াস

করেছেন। এটি আমাদের আশাবাদ করে যে কবি প্রকৃতির সাথেই আছেন।

তিনি বলছেন :

” জানা কথা, জগতে প্রাণ বধ করেই যজ্ঞ করেন ধনবানেরা! ”

যজ্ঞ

অথবা তিনি বলছেন :

“দেশ ও রাষ্ট্রের

এই পার্থক্য যেদিন থেকে বুঝেছি

রাষ্ট্রপতির মতো সেদিন থেকে আমিও চুপ। ”

দেশ ও রাষ্ট্র

তিনি বলেন :

“আমি ‘ ভাইসা আসে নাই ‘

তখন অরুপস্বরুপকণাপন্থীদের নিয়ে গোলে পড়ে যাই ”

সৌরের আত্মখাদক

কবি মামুন খান। শূন্য দশকের কবি। মৃদুভাষী, বিনয়ী। জীবনকে অসম্ভব ভালবাসেন, তাঁর মাটি জনপদ দেশ কেন্দ্রিক যে ভালবাসা সেটাকে তিনি জাদুবাস্তবতা না দিয়ে মাটিতে পা রেখে কিশোর বালকের ঘুড়ি উড়ানোর উচ্ছ্বাস সমেত জীবনটাকে এগিয়ে নিতে চান, শান্তি ও শুভ্রতায় জীবনের উদযাপন শেষ করে চলে যেতে চান । তিনি বলেন:
“দীর্ঘ দীর্ঘ চর পরে যাওয়া কোনো এক নদীপাড়ে
ঘাসের মুছলা পেতে
একরাত জোছনাশরাব পান করে মরে যেতে চাই আমি।”

জোছনাশরাব
মামুন জীবনকে ভালবেসে পানকৌড়ির মতো উবু হয়ে পান করে যেতে চান জীবন সুধা ও প্রসাদ, জীবনের আরতিতে মুগ্ধ হয়ে অপার এক জীবনারতি রেখে যেতে চান তাঁর কবিতায় যাপনের সুবর্ণ রেখায়। জীবনবাদী সে, আমল করেন জীবনের তাই তো বলেন :
“প্রাণ তবু মাঝে মাঝে বেজে উঠতে চায়
শূন্য এক অসীম -উচ্চ মেরুদন্ডের কাছে আনত হয়ে বলতে চায় – ফিরো, ব্যাক করো। ……………
আহা! মনে হয় শূন্য নয়, জীবনেই তো আছি ”

জীবনে অসম্ভব ভাবে থাকা তীব্র ভাবে থাকা জগতব্রহ্মকে প্রদক্ষিণরত মানুষের ঘূর্নিবায়ূই যে জীবনবাদীতা বা জীবন উদযাপনের হিরন্ময় পথ, সে আমরা বুঝতে পারি তাঁর আশাব্যঞ্জক এফারমেশনে – “জীবনেই তো আছি”

আধুনিক কবিতা আরো কত আধুনিক
হলো আমরা আধুনিক কতটুকু হলাম পৃথিবী আদতে প্রগতিশীল হলো কতদূর সে সব প্রশ্ন রেখেও মানুষ এখনো কবিতা লেখে কবিতা পড়ে
এ-ও এক বিস্ময়! আনন্দম!

চিয়ার্স বরুণতলার বাওয়ানি ! চিয়ার্স কবি মামুন খান!

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

পুস্পদাহকাল: এই সময়ের নিগূঢ়তা ও সান্ধ্যে কবিতার নতুন ইশারা | ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

Mon Apr 24 , 2023
পুস্পদাহকাল: এই সময়ের নিগূঢ়তা ও সান্ধ্যে কবিতার নতুন ইশারা | ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ সৌন্দর্য বিনাশের দিনে, ফুল পোড়ানোর দিনে লেখা হলো ‘পুষ্পদাহকাল’। নাকি নিতান্তই তাপদাহে ও খরায় পুস্প পুড়ে যায়? নিতান্তই প্রাকৃতিক এক দাহকালে? কীভাবে কোথায় পুড়ছে পুস্প সে ব্যাখা কি দিতেই হবে সখী? না মনে হয়, না মনে হয়, কিন্তু […]
Shares