চরু হকের শ্রেষ্ঠ কবিতা | জলজ জসিম

চরু হকের শ্রেষ্ঠ কবিতা | জলজ জসিম

বইটি ঝুড়ি বোনার মতো চমৎকার একটি কবিতার বই।কবির প্রকাশিত কাব্যগুলি থেকে
বেহুলা বাংলার পছন্দ করা ছয়ত্রিশ টি কবিতার ওমের মধ্য দিয়ে বইটি জগতের
অক্ষরে দেহ লাভ করে। বইয়ের প্রতিটি কবিতায় জীবনকে জুঁইফুলের গন্ধের মতো
উড়তে দেখা যায়।কবিতাগুলির ক্রম বিন্যাস এমন ভাবে সাজানো যেন পরমের উঠানে
লীলাবতীর দোতারা বসেছে।

কবিতাই হলো চরু হকের জীবন।জগতের নদী কে নির্জনতার সবুজ দিয়ে সাজাতে
সাজাতে জীবনকে যাপন করেন।এবং অমর দুঃখজলে স্নান করে নিজেকে মানুষ করে
তুলেন। বলেন,

এক অমর দুঃখজলে, স্নান করবো বলে
একদিন নেমে এসেছিলাম
এই পৃথিবীতে।  স্নান/পৃষ্ঠা :৫

মানুষের ভেতরে মাঠ আছে, নদী আছে, আছে হাওয়া,নবচরাচর,পাখির সুর ও সুরের
ঢেউ কিন্তু মানুষ তার সৌন্দর্যের কিছুই জানলো না।এমন কি ভেতরের আয়নাটুকু
যে ময়লা হয়ে গেছে তাও একটু ধ্যানের হাত দিয়ে পরিষ্কার করলো না।মানুষ মূলত
নিজ ব্যাপারে এতোই অলস।বলেন,

তুমি তো ভীষণ সুন্দর
অথচ সারা জীবনেও তা তো জানতে পারলেনা
আয়না কে আর কি দোষ দেবো বলো
আসল দোষী তোমার অলস দুইটি হাত।
আয়না/পৃষ্ঠা:৬

জলে বসবাস করেও যেমন রাজহংস গায়ে জল লাগায় না,তেমনি সংসারজলে নেমেও কবি
অসংসারী। প্রকৃতির সুরে নিজেকে উড়িয়ে দিয়েছেন মহাজগতের বৃক্ষ ছায়ায়।পাখির
জীবনকে নিজের ভেতর যাপন করতে করতে হয়ে ওঠলেন প্রকৃতির হৃদয়।জগতের সমস্ত
অনুভূতি ও ভাষা কবির আত্মস্থ। ফুলের পাপড়ি কিংবা নির্জন বাতাসের সাথেও
কবির কথাবার্তা হয়।

একটা ফুলের পাপড়িও যদি আমার উপর এসে পড়ে
আমি অবশ হয়ে পড়ে থাকি
একটা নির্জন বাতাসও যদি
আমার কানের কাছে কিছু বলতে চায়,
আমি কান পাতি।  পাখিযাপন/পৃষ্ঠা:১০

মা বাবা কে পর্দার আড়ালে হারিয়ে কবির এক নতুন জন্ম হয়।গাছ থেকে সবুজ ও
হলুদ পাতারা যখন বাবা মা হারা শিশুদের মতো ব্যালকনিতে এসে পড়ে, তখন কবির
পূর্বজন্মের কথা মনে পড়ে যায়।যাকে চন্দ্রস্মৃতির মতো মনে হয় কবির।

শহুরে চাতালে আলো আসে কখনো সখনো
দু একটা পাতা পড়ে টাইলসের ব্যালকনিতে
সবুজ হলুদ
তখন আমার খুব পূর্বজন্মের কথা মনে পড়ে
মায়ের ক্লান্ত মুখ,বাবার মধুক্ষরা সৌম্য দৃষ্টি,
চন্দ্রস্মৃতি/পৃষ্ঠা:১১

জীবন একটি উপহার।তাই কবি জীবনকে ফুলের মতো আনন্দময় করে তুললেন,প্রজাপতি
হয়ে বাতাসে দুলিয়ে দিলেন সমগ্র হৃদয়।ফুলের মন নামক কোন এক পরমের কাছে
নিজেকে সঁপে দিলেন সযত্নে।

আমি এক প্রজাপতি
দুলছি বাতাসে
যাচ্ছি ঢেউ কেটে
ফুলের মনের কাছে।   ফুলজীবন/পৃষ্ঠা:১৪

জীবনের সুগন্ধ থেকে মানুষকে সরিয়ে রাখে পার্থিব জীবনের আশা
আকাঙ্ক্ষা।আমাদের দেহপাত্রটি কাম ক্রোধ লোভ হিংসা নিন্দায় ভরাট।এই দুষ্ট
প্রবৃত্তিগুলিকে নৈঃশব্দের হাত দিয়ে সরিয়ে নিলেই সমস্ত পাত্রটা শূন্য
হবে,আর সেই শূন্যস্থানে ফুটবে জীবনের আশ্চর্য গোলাপ।কবি বলেন,

শূন্যতার মধ্যে ফোটে সবচেয়ে আশ্চর্য গোলাপ
শূন্য মাটিতে পুঁতে দাও ডাল ও মুসাফির
ফেরার দিনে সঙ্গী হবে,সেই জেনো।   ফোটে/পৃষ্ঠা:১৬

মানুষ নিজেই একটি আশ্চর্য বই,যে বইটি সারা জীবন পাঠ করেও শেষ করা যায় না
জগতের ডানায়।

নিরিবিলি নিজেকেই পাঠ করি বারবার
তবু পাঠ না ফুরায়,না ফুরায়,
আর।
নির্জনতা/পৃষ্ঠা:৩২

কবি ঘরের নির্মল কোনে বসে শুঁয়োপোকার মতো জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে
কবিতায় তুলে নেন।

ঘরের নির্মল কোনে
আমি যেনো এক শুঁয়োপোকা
আমার কানের কাছে যে গানগুলো বয়ে যায়
তাই দুই হাত ভরে তুলে নেই।
শুঁয়োপোকার জার্নি/পৃষ্ঠা:৩৩

পাখিরা স্বাধীন,নেই নিয়মের এতো বাধা।প্রকৃতির সুরে নিজেদেরকে ভাসিয়ে দেন
জীবনের গোলাপি আকাশে।হঠাৎ কবি নিজেকে আবিষ্কার করলেন পাখিদের মধ্যে।

আমি যে একটা পাখি
তা জানতেই বুঝি একটা জনম
পার হয়ে গেলো।
জনম পার হয়ে গেলো/পৃষ্ঠা:৩৭

প্রেমই জীবনের অন্তর্গত ভাষা।তাই কবি সমস্ত ভ্রমণ শেষ করে জীবনকে
স্বর্ণলতার মতো প্রেমময় করে তুললেন।

প্রেম স্বর্ণলতার মতো দুলছে
আমার জীবন বৃক্ষে।
জীবনবৃক্ষ/পৃষ্ঠা:৪০

আমি বলব বইটিতে চমৎকার সব কবিতার বসবাস।
তবে দুঃখ কথা বইয়ের বাঁধন ও মলাট চমৎকার হয়নি,যা আরো ভালো হতে পারতো।তবে
এই অপূর্ণতাটুকুই সমগ্র কবিতাগুলোকে এক ধরনের ঈশ্বরত্ব দান করেছে।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

ধ্যান : অন্তর্জীবনের অতল গাঁথা | হাসান ইকবাল

Mon Apr 24 , 2023
ধ্যান : অন্তর্জীবনের অতল গাঁথা | হাসান ইকবাল রানা নাগের সবগুলো কবিতা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। সবগুলো কবিতা বলতে তার প্রথম কাবগ্রন্থ ‘ধ্যান’-এর সবগুলো কবিতা। কবিতা পাঠের পর আমার কাছে মনে হয়েছে তার কবিতা জীবনেরই অংশ। এককথায় তার কবিতা সময়ের এক অভিজ্ঞান। কবিতার বিষয়বস্ত আত্মা থেকে উৎসারিত দীর্ঘ বোধের সরব […]
Shares