কবি ফারজানা জামানের ‘তোমার সঙ্গ শোকে’ | নুসরাত জাহান আনিকা

কবি ফারজানা জামানের ‘তোমার সঙ্গ শোকে’ | নুসরাত জাহান আনিকা

‘তোমার সঙ্গ শোকে’ কাব্যগ্রন্থের লেখক কবি ফারজানা জামান । মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য মানুষের রয়েছে তীব্র আকাঙ্খা । ভাষা ও ছন্দে সেই মনের ভাব আরও সৌন্দর্যমন্ডিত হয়।  মানুষ যখন ভাষা  বা ছন্দে মনের ভাব প্রকাশ করে তখন তাকে কবিতা বলে । কবিতায় সুখ- দুঃখ , আনন্দ বেদনা , প্রকৃতি ছন্দে প্রকাশ  পায় । মানুষের স্বপ্ন ও অনুপ্রেরণার একান্ত আশ্রয় হলো কবিতা । ‘তোমার সঙ্গ শোকে’ কাব্যগ্রন্থে সময় ও আত্মযাপনের অনুভবে চিরায়ত রোমান্টিক অভিজ্ঞানকেই প্রকাশ করেছেন। তাঁর কবিতা প্রভাত থেকে শুরু করে দ্বিপ্রহর , বিকেল, প্রদোষ ও নিশি অবধি  স্বপ্নজাত অভিজ্ঞাতাগুলো মনের দরজায় টোকা দেয় । যে কবিতা পড়ে পাঠক চিত্তের পিপাসা মেটাতে চায় সেই পিপাসার্ত মনের খোরাক যোগাবে ‘তোমার সঙ্গ শোকে’ কাব্যগ্রন্থ।

‘তোমার সঙ্গ শোকে’  বইটি ফ্রেবুয়ারি ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয় । বইটি চারটি অংশে বিভক্ত । প্রথমে ভাগে হলো স্তুতি  ২য় ভাগে হলো কুঞ্জিকা , ৩য়  ভাগে হলো অনুকাব্য ও ৪র্থ  ভাগে কানন কুহেলি ।
১ম অংশে স্তুতি। স্তুতি যার অর্থ প্রশংসা , প্রশস্তি, গুণবাদ, তারিফ প্রভৃতি । এই অংশের কেন্দ্রীয় বিষয় মহিমার্কীতন করা । তিনি গুণবর্ণনা ও বন্দনা করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে নিয়ে । এই অংশের তিনি যুক্ত করেছেন  মায়ের আর্শীবাদকে  ও বাবার রণক্ষেত্রের বীরত্ব । এই অংশে কবির ভাষায় দেখি ,
পিতা! তুমি কোথাও যাওনি তো ।
আজ এই লাল সবুজের বুকেই !
কোনো বুলেট আজো পারেনি তোমায়
ষোলো কোটি হৃদয় হতে ছিনিয়ে নিতে !
কোনো রক্তচক্ষু পারেনি আজো একাত্তরের –
মানচিত্র দ্রষ্টার স্বপ্ন কেড়ে নিতে ।
তেমনি স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার অসীম প্রত্যয়ে
অগনিত নির্বীক কর্মবীরের হৃদয়ে ।
(পিতা!তুমি এখানেই আছ)
মাগো তোমার সকর আশা সত্যি হবে পূরণ
ছোট্র আমায় কোলে নিয়ে দেখেছিলে স্বপন ।

তুমি যখন করলে দোয়া আমার মাথায় ছুঁয়ে
এই পৃথিবীর সকল বাধা পড়ল যেন নুয়ে
সফলতার মালা এনে দিলাম তোমায় তুলে ।
(মায়ের দোয়া )

কামাল পুরের রণাঙ্গনে সেদিন জানি তুমি
পাক হানাদার লুটিয়ে দিয়ে
দখল করলে ভূমি ।

তোমার কথায় গর্বে মোরা করেছি আজ পণ ,
দেশের তরে নিজেকে সদা করব সমার্পণ ।
( রনাঙ্গনে বাবা)
এই অংশে কবি শেখ মুজিবের সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখিয়েছেন । তিনি ব্যক্ত করতে চেয়েছেন তিনি এখনো এই বাংলার সবকিছুর সাথে মিশে আছেন । কোনো কিছু তার স্বপ্নকে বাধা দিতে পারেনি । সোনার বাংলা গড়ার অসীম প্রত্যয়ে তিনি সবার হৃদয়ে আছেন  মায়ের যে আশা এবং জীবনের ভাল মন্দের সাথী মা এবং আর্শীবাদের সফলতা , বাবার রণক্ষেত্রের তেকে জিতে আশা কবি সব কিচু এই অংশে ব্যপ্ত করেছেন ।

বইটির দ্বিতীয় অংশে আসে কুঞ্জিকা যার অর্থ মূল বুনিয়াদি,প্রধান সুঁরধারা , মুখ্য প্রভৃতি । এই অংশেই বইটির কেন্দ্রীয় বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে । এখানে কবির অনুসঙ্গ শোককে বলেছেন । সঙ্গী করেছেন শোক । কবি নৃশংঙ্গ একাকীত্বকে সঙ্গী করেছেন । তার ভালবাসার  সময়কেও একা নীরবে অনুভব করেছেন । তিনি  সুখকে শোকের মাঝে খুজেঁছেন । ভালো স্মৃতিগুলোকে এনেছেন । কবি  বলেছেন ,
গভীর নিমগ্নতায় নিঃসঙ্গ দুপুর যার তুবে
উদাস একাকী আলাপনে
( তোমার সঙ্গ শোকে)

মেয়েদের নির্বাক সংসার
যে সংসারে কোনো একদিন নিশ্চিত আসবে বলে
                      মেয়েদের স্তুপে মরীচীকার মতো হাসে রাজুক কিরণ
(ভালবাসার আকাশ )

শরৎতের বৃষ্টিতে
ভিজে খুন দৃষ্টিতে ,
সেই চেনা চোখে
তবু মরি সৃষ্টিতে ।
(শরৎতের বৃষ্টিতে)

একটা আকাশ ছিলো আমার
একটা মনের নীল
আমি সেথায় উড়ব বলে
ছিলেম গাঙছিল
(গাঙছিল)

আমার সকাল, দুপুর, গোধূলি স›ধ্যা সমস্থ প্রহরে
একান্ত আগন্তুকের মতো শিহরণ তোলে অজানা অনুববে ( বৃষ্টি)

অততি যেদিন প্রসব বেদনার্ত হয়েছিলে
কেবল আমারই জন্য !
তোমার আদ্যোপান্ত রক্ত ধারায় নাড়ির বন্দনে
জড়িয়ে আগলে ছিলে আমায় ।
( এক জননী জল )

কোথায় কত দূরে যেতে হবে
জানি না কেউ তবুও ছুটে যায় ! ( গন্তব্য)
বিজয় তুমি আমার প্রানের প্রতিশ্রুতির গান
বিজয় তুমি ইতিহাসের চির অম্লান । (বিজয় তুমি)

    বছর ঘুরে অপরূপ রুপে দাড়াঁও তুমি বারেবার ,
হে প্রিয় অক্টোবর ! তোমায় স্বাগত জানাই । ( অক্টাবর)

এই অংশে কবিকে  মায়ের ভালবাসা , দেশের প্রতি ভালবাসা , প্রকৃতির সব হারোনো ভালবাসাকে একাকী অনুভব করতে চেয়েছেন । মায়ের প্রতি ভালবাসার কথা ‘এক জননী জল’ কবিতায় দেখতে পাই । বিজয় তুমিতে দেশপ্রেম দেখি । প্রকৃতি দেখি গাঙছিল অক্টোবরে ।  জীবনের ঠিকানা খুঁজতে দেখা যায় গন্তব্য কবিতায়।  এই সবগুলো ব্যক্ত করতে চেয়েছেন কবিতায় ।

বইটির তৃতীয় অংশে আসে অনুকাব্য যার অর্থ দাঁড়ায় অন্তরালে , পিছনে প্রভৃতি । অনুকাব্য মানে চিত্রানুগত ক্ষুদ্র কবিতা।  এখানে কবির পশ্চাতের স্মৃতি এক থেকে শুরু করে চল্লিশ পর্যন্ত ধাপে ধাপে উন্মোচন করেছেন। এখানে দেখা যায় কবি শৈশবকে-কৈশরকে, অতীতকে , বর্তমানকে, প্রকৃতিকে, গবীর স্মৃতিকে মনে করেছেন ।
যতদূর চোখ মেলে দিগন্ত পথে যাই
তারও চেয়ে বহুদূর অদেখারে পাই ।  (তেরো)

কি বিশাল সমুদ্দুরে
মেঘ কাঁদে অবিরাম ( পনেরো)

আমি বার বার ফিরে যাই কৈশোরে –
প্রকৃতির বুকে অবারিত সমুদ্র সুখে ; ( আঠারো )

এখানে কবি স্মৃতিকে হারানো ,কাটানো দিনগুলোকে ক্ষুদ্র আকারে বর্ণনা করেছেন । আনন্দ,বেদনা, প্রকাশের একটির পন্থা হচ্ছে কবিতা ।  কবিতায় বস্তু ও মানব জীবনের বাহ্য-জগতের কাহিনি প্রকাশ পায় । কবিতায় ভাবের মধ্যদিয়ে আসল অর্থ তাকে লুকায়িত । সত্য-অসত্য কাল্পনিক রূপে কবিতায় প্রতিফলিক হয় । কবি ও তার এই কাব্যে নিজেকে খুঁজেছেন অতীতে ।
বইটির চতুর্থ বা শেষ অংশে একটি ভিন্নতা যোগ করেছেন । এখানে একটি ভাগ যুগ করেছেন যা পদ্য আকারে নয় এখানে গদ্য আকারে  কানন কুহেলি কাব্যটি সংযুক্ত করেছেন। কানন অর্থ পায়ে পায়ে সৃষ্ট পথ , অয়ন, গতিপথ , প্রভৃতি । আর কুহেলী অর্থ কুয়াশা ,ধোঁয়া প্রভৃতি । অংশটি সংলাপ আকারে তৈরি করেছেন।  কবিতার বাক্যের সাথে কাল্পনিক চিত্রকর্ম অঙ্কন করা হয়েছে। আমার মতে, প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে কবি তার একাকী সময়ের বিষন্নতার কানন পথে কুয়াশার সাহচার্যের কথা বলেন ।  যে কুয়াশার ধোঁয়ার কবি তার অতীতের স্মৃতিকে স্মরণ করেন । কবি এখানে কুহেলীতে হারিয়ে যাওয়া  অনেক সময়কে খোঁজে । প্রকৃতির এক সুন্দর রূপ কুয়াশা।কুয়াশা যেন কবির সাথে কথা বলে । এখানে কানন পথে কুহেলি ও কানন দুটি চরিত্রের রূপ নেয় । কবি এখানে শীতের সুন্দর কুয়াশার বর্ণনা দিতে চেয়েছেন । এই প্রকৃতি কবির জন্য প্রেরণাময়।
তিরানব্বইটি কবিতা ও চল্লিশটি অনুকাব্য এবং একটি সংলাপ ধর্মী গদ্যসহ বইটিতে ফারজানা জামান ভাষায় ও লেখনিতে নতুনত্ব রেখেছেন । এখানে কবি ব্যক্ত করেছেন নিজের সঙ্গকে । বইটি এক সাথে পদ্য ও গদ্যের সংমিশ্রণ রয়েছে । সব কিছুতে শোক খুঁজেছেন । কবির বইটিতে জাতির জনক প্রিয় বঙ্গবন্ধুকে দেশপ্রেম , মাতৃত্ব, প্রেম ও প্রকৃতির নিত্যতাই ফুটে ওঠেছে  । কিন্তু কবি বারে বারে কাকে চেয়েছেন , কাকে হারিয়েছেন , যাকে খুঁজেছেন তা-কি দেশপ্রেম ,না-কি প্রকৃতি প্রেম না-কি মাতৃত্বের চিরায়ত অনুভবকেই খুঁজেছেন। কবি যে প্রেমকে খুঁজতে চান কবি তা আত্মার কাছেই আছে। মূলত প্রেম, স্মৃতি, রোমান্টিকতা এবং পুর্বপুরুষের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধার এক নিখুঁত কাব্যগ্রন্থ ‘তোমার সঙ্গ শোকে’।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

চরু হকের শ্রেষ্ঠ কবিতা | জলজ জসিম

Mon Apr 24 , 2023
চরু হকের শ্রেষ্ঠ কবিতা | জলজ জসিম বইটি ঝুড়ি বোনার মতো চমৎকার একটি কবিতার বই।কবির প্রকাশিত কাব্যগুলি থেকে বেহুলা বাংলার পছন্দ করা ছয়ত্রিশ টি কবিতার ওমের মধ্য দিয়ে বইটি জগতের অক্ষরে দেহ লাভ করে। বইয়ের প্রতিটি কবিতায় জীবনকে জুঁইফুলের গন্ধের মতো উড়তে দেখা যায়।কবিতাগুলির ক্রম বিন্যাস এমন ভাবে সাজানো যেন […]
Shares