পুস্পদাহকাল: এই সময়ের নিগূঢ়তা ও সান্ধ্যে কবিতার নতুন ইশারা | ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

পুস্পদাহকাল: এই সময়ের নিগূঢ়তা ও সান্ধ্যে কবিতার নতুন ইশারা | ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ

সৌন্দর্য বিনাশের দিনে, ফুল পোড়ানোর দিনে লেখা হলো ‘পুষ্পদাহকাল’। নাকি নিতান্তই তাপদাহে ও খরায় পুস্প পুড়ে যায়? নিতান্তই প্রাকৃতিক এক দাহকালে? কীভাবে কোথায় পুড়ছে পুস্প সে ব্যাখা কি দিতেই হবে সখী? না মনে হয়, না মনে হয়, কিন্তু হ্যাঁ, কিন্তু হা। এই যে তোমার না না, এর আড়ালের হা’য়ের মতো সত্যি হলো—পুস্প পোড়ে, পুস্প পোড়ায় কেউ। আচ্ছা পুস্প পোড়ালে কি সুবাস হয়? কবি জানেন আর জানেন রাধুনীরা।
তুমি তো রাধুনী ভালো। যত পুস্প মসলা হলো, তাদের বলো, পোড়ানোর অনিবার্যতা মানুক তারা। মানবে না কি? মানবে না কেন? না পোড়ালে সুস্বাদ হয় না তোমার রান্না, তোমার কান্না। তোমার কান্না আমার কান্না। অনেক কান্নার জল ঢেলে যে গাছ হলো, এই পুস্প কি তাতেই ধরে?
পোড়ানোর অনিবার্যতায় পোড়ে কিছু পুস্প, আর কিছু পোড়ে অযথা নির্মমতায়। সেই নির্মমতা কার? নিতান্ত কি প্রকৃতির, নাকি ঈশ্বরের, নাকি মানুষের-মানবের? কবিতায় কবি কি অযথা নির্মমতায় পোড়ানো পুস্পের গান ও ঘ্রাণ আমাদের নাকে তুলে দিতে চান? সে ঘ্রাণ, ও হো, শশ্মানের চন্দনে আড়াল পেল কি শব পোড়া?
এই আড়াল তেমন আড়াল যে আড়াল রচনা করেন কবি এহসান হাবীব, তাঁর পুস্পদহকাল কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতায়? যেখানে পুস্পদাহের কথা কিছুই বলেন না সরাসরি, শুধু একবার বলেন, ‘তুমি ভাষাহীন একটা শাদা ফুল’ আর বলতে থাকেন:
‘হয়তো তোমার প্রেমিক প্রাণপণ আটকে রাখছে তোমাকে
যেন আমার দিকে আসতেই দিচ্ছে না
তোমার স্বামী অনবরত ফোনে আড়ি পেতে বসে আছে
আমাদের হড়বড় কথার মাঝে একটা বোবামাছি
মৌন করে দিয়েছে আমাদের প্রান্তর।
তবু অজস্র জন্ম ধরে আমি কথা বলছি তোমার দিকে
তুমি ভাষাহীন একটা শাদা ফুল।’
কবি এহসান হাবীবের এই কবিতাগুলো এসব এলোমেলো ও আলুথালু প্রশ্ন জাগায় আমাদের মনে। কবিও কি এমন সব প্রশ্নের ভিড় ব্যাখ্যা করতেই রচনা করেছিলেন নিজস্ব প্রস্তাবনা কাব্যে? যে কারণেই কবিতাগুলো রচিত হয়ে থাকুক না কেন, কবি এহসান হাবীবের কবিতা দহনের ও অন্তর্দহনের; অভিনব ও অভিগ্রস্ত। যেমন, ধরা যাক ‘সুইসাইড নোট’ কবিতাটি। যেখানে ‘ঘোর কালি সন্ধ্যায়’ আত্মহত্যার ইচ্ছা ও পরিকল্পনার লিখছেন একজন, লিখছেন:
‘যত স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক
গুলির মুখে
ক্রসফায়ারে
গুমে হারিয়ে যাওয়া মানুষ
রাষ্টে্র সমূহ ইতরামির বিপরীতে
প্রতিটি মৃত্যুই আত্মহত্যা’
‘পুস্পদাহকাল’-এর কবিতায় কবি একটা আড়াল নিয়েছেন বটে। এই আড়াল নিতে নিয়েছেন একটা চরিত্রও। সেই চরিত্র কিছুটা স্কিৎজোফ্রেনিকও। চরিত্রটি অধিকাংশ কবিতায় ব্যক্তিগত আক্ষেপ-প্রক্ষেপ এবং স্বগত সংলাপ-প্রলাপের মধ্যে থেকে কথা বলে যাচ্ছেন। বলে যাচ্ছেন নিজের মতো করে, নিজেকে কেন্দ্র করে, মন্ময় কথার ভিড় তার। সেই ভিড়ের মধ্যে হয়তো তার চিত্তবিক্ষেপও হচ্ছে। যে কারণে আড়াল ভেঙে বিক্ষোভে ফেটে গিয়ে বলেও উঠছেন কখনো কখনো এভাবে:
‘গোপনে গোপনে সত্য ছড়িয়ে পড়েছিল।
পাড়ার খসে যাওয়া পাতাটি থেকে শুরু করে
সঙ্গিন উচিয়ে হেঁটে যাওয়া সান্ত্রী
বিকেলের অলস বুদ্ধিজীবী
ঝানু তার্কিক
ধাড়ি অধ্যাপক
বেশ্যা মিডিয়াজীবী
কেঁচো
সাপ
ব্যাঙ
গ্রামের কৃষক
ন্যুব্জ বিদ্যার্থী
আর অণ্ডকোষ ফেটে যাওয়া বিশাল অপজিশন।
আমরা সবাই জানতাম
আসলে কী ঘটেছিল, আর কী ঘটতে যাচ্ছে।
এ এক অত্যাশ্চর্য ঘটনা যে
সত্য নিজ গরজে ছড়িয়ে পড়েছিল প্রান্ত পর্যন্ত
আর পৃথিবী তার ভবিষ্যৎ ঘটনাপুঞ্জকে আগাম উন্মুক্ত করে দিয়েছে।’
‘পুস্পদাহকাল’-এর অনেক কবিতাই যেন খুব নিভু নিভু গলায় নিরাক সময়ে নিদুলি ও নিমখুনের স্বগত-কথন। গান নয়, গুনগুন নয়, কবিতাও নয়; নিতান্ত নিজের মনের বিড়বিড়। এখানে যেমন ধরা যাক ‘শালুক ও শালগম’ সিরিজের কোনো একটি কবিতাকে। এই সিরিজের কবিতাগুলো আদল নিয়েছে এক ধরনের রূপকথার। গল্প বলার আদল নিয়ে কবি এগিয়েছেন একেবারে ‘শালুক ও শালগম’ সিরিজ পর্যন্ত। এই সিরিজের এসে কবি সেই আদলকে আরও পোক্ত করেছেন, নিয়েছেন রূপকথার আবরণ ও আভরণ। এই সিরিজের ষোলোতম কবিতায় আমরা দেখি ‘এক অনন্ত ডুবসাঁতার খেলা’, যে ‘খেলায় ছিটকে পড়ে যাচ্ছে মনুষ্যজন্ম’, দেখুন কীভাবে তা হচ্ছে:
‘এক অনন্ত ডুবসাঁতার খেলায় মজে আছে মন। দীর্ঘ জলপথে এ রকম ডুবসাঁতার ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও আমরা এই লুকোচুরিতে নেমেছি। যখন পরস্পরের হাত সরে যায় দূরে। অতল সুপ্তির ভেতর আমরা পৃথক হয়ে যাচ্ছি। শুধু অনুসরণগামী পা দুটো জানে কতটা ভারী হয়ে ওঠে এই পদচ্ছাপ। আঙুরলতার পিছু পিছু মায়া সভ্যতার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে একটু বেখেয়াল হতেই ছিটকে যাচ্ছো তুমি। এই লুকোচুরিতে কী কী ছেড়ে যাচ্ছে মন? ছিঁড়ে যাচ্ছে কি শিরা-উপশিরা? রক্ত, মাংস, কলিজা? হৃদয়? এই অনন্ত ডুবসাঁতার খেলায়, সোনা, তোমার হৃদয় থেকে ছিটকে পড়ে যাচ্ছে চিরবিরহের মনুষ্যজন্ম।’
‘পুস্পদাহকাল’-এ যেন নিরুদ্দেশ সন্তানের শোক কাটিয়ে নিত্যদিনের কাজে নেমেছেন এক মা। দুখে দুখে নিদুখ সেই মায়ের আর অনুযোগ ও অনুতাপ নেই, আছে কাজের মাঝে থেকে থেকে ছেলেকে হঠাৎ মনে পড়া, আছে অস্ফুট আক্ষেপ ও প্রলাপ। যেন এইকালের আরেক মাৎস্যন্যায়ে চর্যার সেই নিগূঢ়তা ও সান্ধ্যে নতুন নতুন সংকেতে এই সময়ের ইতিহাসহীনতার ইতিহাস লিখছেন কোনো এক কবি অনৈতিহাসিক। লিখতে গিয়ে তাঁর নির্মোহতার খোলস পড়ছে খসে, ফুড়ুৎ করে বেরিয়ে পড়ছে প্রেম, ফুচকি মারছে ক্ষোভ। গণমনোযোগের বাইরে দাঁড়িয়ে এইভাবে এমন কবিতাও লিখছেন কেউ কেউ। আর তাদেরই একজন এহসান হাবীব।

——————-

বিশেষভাবে জ্ঞাপন:

কবিতার বই: পুষ্পদাহকাল
কবি: এহসান হাবীব
প্রকাশনা: উজান
মুদ্রিত মূল্য: ১৭৫ টাকা
পাবেন: উজান ও রকমারিতে

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

কবি ফারজানা জামানের 'তোমার সঙ্গ শোকে' | নুসরাত জাহান আনিকা

Mon Apr 24 , 2023
কবি ফারজানা জামানের ‘তোমার সঙ্গ শোকে’ | নুসরাত জাহান আনিকা ‘তোমার সঙ্গ শোকে’ কাব্যগ্রন্থের লেখক কবি ফারজানা জামান । মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য মানুষের রয়েছে তীব্র আকাঙ্খা । ভাষা ও ছন্দে সেই মনের ভাব আরও সৌন্দর্যমন্ডিত হয়।  মানুষ যখন ভাষা  বা ছন্দে মনের ভাব প্রকাশ করে তখন তাকে কবিতা […]
Shares