আবদুল্লাহ আল মুক্তাদিরের দুনিয়া | উম্মে ফারহানা

আবদুল্লাহ আল মুক্তাদিরের দুনিয়া | উম্মে ফারহানা

আবদুল্লাহ আল মুক্তাদিরের দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ দুনিয়া গল্পপাঠকের জন্য এক অনন্য সুখকর অভিজ্ঞতা। তাঁর প্রথম গল্প সংকলন বছরের দীর্ঘতম রাত
(২০১৮) এর সঙ্গে তুলনা করলে লক্ষ্য করা যাবে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।

এই দুই গ্রন্থের মাঝখানের ব্যবধানে লেখকের কলমে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ আখ্যান, উপন্যসের নাম ছিল গডেস অব অ্যামনেশিয়া (২০২১) । সম্ভবত উপন্যাসের মহাকাব্যিক যাত্রা সম্পন্নন করে আসার ফলেই, তিনি চরিত্রচিত্রনে অর্জন করেছেন আরো বেশি দক্ষতা। আগের গ্রন্থের গল্পগুলোতে ভাষাটি ছিল অপ্রচলিত, অনেকটা যেন গদ্য পদ্যের মিশেল। এবারে তাঁর ভাষা এবং বর্ণনা দুটিই গদ্যের উপযোগী।

আবদুল্লাহ আল মুক্তাদির মূলত কবি। তাই তাঁর গদ্যভাষাও খুব বেশি কাঠখোট্টা হওয়া কখনো সম্ভব নয়। তাহলে পরিবর্তন বলতে আমি আসলে কী বলতে চাইছি? চিত্রকল্প কি আগে ছিলো না তাঁর গল্পে? কিংবা এখন কি নেই অনুভূতির বয়ান? লেখকস্বত্বার আগ্রাসী গতিশীলতা কি চাপা দিয়েছে মুক্তাদিরের কবিস্বত্তাকে? না, তেমন কিছুই ঘটেনি। নিজস্ব স্টাইল থেকে খুব বেশি সরে
আসেননি তিনি, ভাষায় তাঁর সিগনেচারটুকু অপরিবর্তিতই রয়েছে। পালটে গেছে শুধু তাঁর দেখবার ভঙ্গিটুকু। এই গ্রন্থে তিনি অনেক বেশি দেখেছেন মানুষ, দেখেছেন বাস্তব জীবন, বলেছেন অনেক বেশি ঘটনা। অন্য কথায় বললে, গল্পের ভেতর গল্পগুলি আরো বেশি ঘটনাবহুল হয়েছে।

গল্পের শিরোনামে আগে তিনি ব্যবহার করতেন বাক্য বা বাক্যাংশ। এই গ্রন্থে দুই শব্দের বেশি কোন শিরোনামেই নেই। সংকলনটির নামও রেখেছেন খুব ছোট্ট সাধারণ শব্দে। সাধারণ হলেও, নামগল্পটি পড়লে বোঝা যায়, সে শব্দ আসলে ইঙ্গিত দেয় অন্য এক অসাধারণের। এই গ্রন্থেও একটি গল্পের চরিত্র মানুষ নয়, বরং একটি ফুল। বসন্তবাহার শিরোনামের গল্পের একজন কথক একটি গন্ধরাজ ফুল। যে সিগনেচারের কথা তখন বলছিলাম, মুক্তাদিরের আগের গ্রন্থে একটি গল্পের মূল চরিত্র ছিলো একটি কর্পূর গাছ। সে হিসেবে কাহিনি বর্ণনার নিজস্ব অভিনবত্ব ত্যাগ করে জনপ্রিয় আর বোধগম্য ধারার দিকে ঝুকেছেন তিনি, এমন কথা বলা যাবে না।

কাব্যে আর গদ্যে, দুইভাবেই লিখবার সময় মুক্তাদির প্রকৃতি দ্বারা অনুপ্রানিত হন। যমুনা পাড়ের প্রাকৃতিক গ্রামীণ জীবন থেকে গ্রহণ করেন লেখার নানান উপাদান। এই গ্রন্থে সেটিং হিসেবে যুক্ত হয়েছে তাঁর বর্তমান আবাসস্থল ময়মনসিংহ শহর। প্রায় আগন্তুক গল্পে এই শহরের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য বিবরণ দিয়েছেন তিনি। নাম গল্পেও রয়েছে তাঁর বর্তমান যাপনের ছাপ। আঞ্চলিক সংলাপ ব্যবহারের সময় মনোযোগ দিয়েছেন ডায়ালেক্টের দিকে। যা কারণে এই শহরের একটি চরিত্রকে পরিষ্কারভাবে আলাদা করা যায় সিরাজগঞ্জের একটি চরিত্র থেকে । ময়মনসিংহ শহরকে সেটিং হিসেবে ব্যবহার
করার ক্ষেত্রে বেশ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন বলতে হবে।

আবদুল্লাহ আল মুক্তাদিরের গল্পে যে ব্যাপারটি অপরিবর্তিত আছে বলে পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে তা হলো, গল্প বলার সময় তাঁর নিজস্ব স্টাইল। বোধগম্য হবার জন্য অহেতুক গদ্যময়তা চাপিয়ে দেবার চেষ্টা এই গ্রন্থেও অনুপস্থিত। অনেক পাঠকের কাছে এটিকেই তাঁর দুর্বলতা বলে মনে হতে পারে। মুক্তাদির গদ্য ভাষায় পরিণত হয়ে উঠেছেন বটে, কিন্তু সম্পূর্ন ত্যাগ করেননি তাঁর কাব্যময়তার ঝোঁকটুকুকে। অনেকের কাছেই এই কাব্যিক ভাষা ব্যবহারকে গদ্য লেখার ত্রুটি বলে মনে হয়। সে হিসেবে যে সকল পাঠক গদ্যে কাব্যিকতা পছন্দ করেন না, তাঁদের কাছে মুক্তাদিরের দুনিয়া অত বেশি সমাদৃত হবে না বলে আশংকা করি। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি এটি কোন লেখকের দুর্বলতা নয়। যেহেতু কবিতা হচ্ছে শিল্পের বিশুদ্ধতম রূপ, সকল শিল্পই শেষ পর্যন্ত কবিতা হয়ে উঠতে চায়। মুক্তাদিরের আগের গল্পগ্রন্থে বছরের দীর্ঘতম রাতে তিনি সফলভাবে ভেঙে দিয়েছিলেন গদ্যপদ্যের মধ্যবর্তী সীমানা রেখাটুকুকে।

দুনিয়ার প্রসঙ্গে ফিরে আসি। দুনিয়া গ্রন্থে গল্পের সংখ্যা মোট দশটি। এর মধ্যে কয়েকটি গল্পের উল্লেখ না করলেই নয়। ‘পোড়া সাইকেল’ শিরোনামের গল্পের মূল চরিত্র একজন কিশোর। অল্পবয়সী মানুষের দৃষ্টি থেকে জগত আর জীবনকে দেখার এক অনবদ্য প্রয়াস দেখা যায় এই গল্পে।’কণ্ঠ-পিপাসা’ গল্পের সেটিঙকে বলা যায় ডিস্টোপিয়ান। আবার ‘নগর পরিকল্পনা’তে বয়ানকারী একজন নারী, বিচ্ছেদ পরবর্তী মানসিক সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় তিনি বন্ধুদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে রেখেছিলেন, রাজধানী থেকে দূরে গুটিয়ে নিয়েছিলেন
নিজের জীবন। কী মনে করে নগরে ঝটিকা সফরের পরিকল্পনা করেন। ‘বোধহয় আগন্তুক’ গল্পের ন্যারেটর প্রায় অচেনা এক নারীর জবানিতে শোনেন তাঁর শাশুড়ির প্রয়াণের গল্প আর পাঠক দেখেন মৃত্যুর দৃশ্যকল্প, যা সাধারণ হলেও চমকপ্রদ। ‘যমদূত’ আর ‘বসন্তবাহার’ গল্পেও আছে মৃত্যুর কথা, বলা বাহুল্য নয়, মৃত্যুর সেই উপস্থাপনগুলিও অভিনব।

যে গল্পটির কথা না বললেই নয় সেটি হল ‘জহরত’। এই গল্পের প্লটকে আমি অবাস্তব বলতে রাজি নই, আবার সত্যিকারে এমন কোন ঘটনা ঘটতে পারে তা বিশ্বাস করতে, আমার ধারণা, অনেক পাঠকের কষ্ট হবে। গল্পকার তাঁর কুশলী বর্ণনায় এমনভাবে বলেছেন যে অবিশ্বাস্য পরিস্থিতি আর অবিশ্বাস্য থাকেনি। শেষ এবং নাম গল্প ‘দুনিয়া’ আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ চেনা জগতের গল্পই শোনায়। কিন্তু আসলে এই গল্প ইঙ্গিত দেয় অন্য এক দুনিয়ার অস্তিত্বের দিকে। নাম হিসেবে দুনিয়া শব্দটিকে বেছে নেওয়াও খুব লাগসই হয়েছে। শব্দ হিসেবে এটি বহুমাত্রিক, এই শব্দ দ্বারা বোঝায় বিশ্বভ্রম্মান্ডকে, একই সঙ্গে কারো নিজস্ব ছোট পরিসরের জগতকেও- সেটি হতে পারে কারো গৃহকোণ, হতে পারে কারো আগ্রহের স্থান, পৃথিবী নামের গ্রহ, বা কখনো কখনো ইহলৌকিক সকল কার্যক্রমকেও। দুনিয়া গ্রন্থের গল্পগুলিও তেমনি, খুব ছোট ছোট ব্যাপার, কলাভবনের উঠানে ফোটা গন্ধরাজ ফুল থেকে শুরু করে শব্দদূষণের ফলে কোন নগরের শ্রুতিযোগ্যতা হারানোর মতন ভয়াবহ সম্ভবনা পর্যন্ত ব্যাপ্তি এই গল্পগুলোর। আমার মতে এই সংকলনটি সমসাময়িক সময়ে সৃষ্ট গল্প সংকলনগুলোর মধ্যে বিশিষ্ট স্থান দখল করবে। কেননা, আবদুল্লাহ আল মুক্তাদিরের লেখায় যে চমক আছে তা স্বতস্ফূর্ত, সাবলীল এবং একেবারেই তাঁর নিজস্ব।

লেখক পরিচিতি: কথাশিল্পী, প্রাবন্ধিক, শিক্ষক, ইংরেজি বিভাগ, জাতীয় কবি
কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়।

অনুধ্যান

Leave a Reply

Next Post

বেঁচে থাকাই যুদ্ধ এবং শান্তি : নিমগ্ন-চেতনায় শব্দযাত্রা | শামীমা হামিদ

Sat Apr 29 , 2023
বেঁচে থাকাই যুদ্ধ এবং শান্তি : নিমগ্ন-চেতনায় শব্দযাত্রা | শামীমা হামিদ পৃথিবী কি ধ্বংস হয়ে যাবে? হয়ত এখনই নয়; তবুও সময়ের স্থবিরতা আমাদের ভেতরে এমন কোনো রুদ্ধশ্বাস অনুভূতির জন্ম দেয়— আমরা গ্রাসাচ্ছাদিত হই; অপরিজ্ঞাত, অজানিত, অনিশ্চয়তার রুদ্ধশ্বাস চূড়ায় আরোহণ করতে করতে হতশূন্য হয়ে পড়ি। আমাদের কাতর প্রার্থনা পৌঁছে দিতে চাই […]
Shares