স্নায়ুর সমুখে মুখের সমুখে গুঞ্জনমালা | অমিত রেজা চৌধুরী

স্নায়ুর সমুখে মুখের সমুখে গুঞ্জনমালা | অমিত রেজা চৌধুরী

কবিতা বিভিন্ন রকমের হয়। তা শৈলী এবং প্রকরণগত ভাবে যেমন, তেমনি স্বভাব-লক্ষণের দিক থেকে, বোধ-ভাব-চেতনার দিক থেকেও ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির কবিতা পরিলক্ষিত হয়, আর তার উল্লেখ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বাংলা কবিতার দীর্ঘ ইতিহাস জুড়ে। তা যতটা না দেশীয় ঐতিহ্য-ভাষা-সংস্কৃতি কেন্দ্রিক, তারও অধিক মনে হয় অন্য ভূমণ্ডল থেকে প্রধানত ইউরোপ, আরবি-ফারসি, ল্যাটিন আমেরিকা এবং কিছুটা আফ্রিকা ও পূর্ব এশিয়া জাত বলে ঠাওর হয় আজকাল। বিশেষকরে ফর্ম ও টেকনিক, বিভিন্ন ইজম, কাব্য-আন্দোলনের দিক থেকে আজকে আমরা অনেকটাই পশ্চিমা নির্ভর হয়ে আছি যেন-বা। আবার ছন্দ ও অলংকারের দিক থেকে বিচার করলে আমরা অনেকটা এদেশীয়ই, (যদিও সংস্কৃত ছন্দের ব্যবহার ততটা ডানা মেলে নি, অজানা কারণেই)। তো এতসব মাথায় রেখে বা না রেখেও যখন শুভ্র সরকারের নতুন কবিতার বই ‘সূর্যঘরের টারবাইনে’ হাতে নেই, দেখি তা একপ্রকার লুপ্তস্বরে চোরা উত্তেজনায় ঠাঁসা, আলতো করে শিল্পীর তুলির স্ট্রোক! কখনো বেদনাবিধুর, গোধূলিরাঙা, হঠাৎ ফুরিয়ে যাওয়া পথের গল্প, কখনো-বা ভেজা ফুলের নির্জনতা, পুরনো রাজবাড়ির সিঁড়ি, লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের ইশারা। কবি বলছেন—
“যখন একজোড়া পা নিয়ে
না থাকার দিকে হেঁটে যেতে হয়”

“সৌরসুরভিত কলার কান্দায় যেন
ফুলে উঠছে হাওয়া”

“মনে কর— আমার মন
ঝিঁঝি পোকার মতো”

তার কবিতার বিষয়, আধেয় যে খুব বৈচিত্র্যময়, অনুঘটনাপূর্ণ, তা নয়, বরং আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যেই। ফলে সেই চেনা বাস্তবতার মধ্যে কুহক, বিবিধ স্তর, জাল, ম্যাজিক তৈরি করতে গেলে সাধারণত যে যে আবহ ও আলোকক্ষেপণর প্র‍য়োজন হয়, অনুপস্থিতির উপস্থিতি দরকার— কেন জানি না তা তিনি একরকম এড়িয়েই গেছেন এই সকল কবিতা-প্রবাহে! এবং তার ভাষা সহজ, ঋজু, খানিকটা আটপৌরেও। তৎসম শব্দের আকসার ব্যবহার নেই, নেই যতিচিহ্নের অতিশাসন। বরং তার ভাষাভঙ্গি অনেকটাই গীতিময় হয়ে উঠবার অভিযাত্রা, সবুজাভ, চেনা ব্যক্তিময়তার ছোপ, অপার বাংলার ফ্ল্যাশ। আবার খুব যে নতুন লিরিক সৃষ্টি করেছেন, তাও বোধকরি অভিপ্রায় নয় তার। যেমন ঝোঁক কম মেমরেবল স্পিস তৈরি করাতেও। এই একই অনুশ্বাস, মৃদু অভিযোগ দেয়া যায় তার চিত্রকল্প সৃষ্টির ক্ষেত্রেও। ঠাঁসবুননে গাঁথতে গাঁথতেও কোথায় জানি লাটাইয়ের সুতো আলগা করে দেন তিনি। ফলে তার ইমেজ নিজস্বতার বাইরে ব্যপ্তি পায় কিছুটা কম।
“এই বিশাল ধানের খেতজুড়ে বাতাসের যে সুর
ভাষার আকার
কোনো দিনও জানা হবে না আমার”

“মানুষের আগুনহিমে
তবে কোন দেশের ফুল বিঁধে থাকে কাঁটাতারে”

কিছু বিষয়, শব্দ-ভাবনা, অনুষঙ্গ তার কবিতায় ঘুরেফিরে আসে নতুন প্রত্যাঘাত, উপলব্ধির সৃষ্টি তেমন একটা না করেই, পুরনো বাড়ির ঘ্রাণের মতো অনেকটা। যেমন পাখি, মানুষ, বৃষ্টি, ফুল, মায়া, চিহ্ন, হাওয়া, বৈশাখ ইত্যাদি। তবে পাঠকের কাছে কখনো কখনো তা ক্লিশে, ক্লান্তিকর মনে হতে পারে কবিতায় ঐ সংশ্লেষ বা শব্দটির একাধিক রূপক বা অর্থময়তা সৃষ্টি হয় না বলে।

নতুন শব্দ, শব্দবন্ধও তৈরি করেন তিনি। যেমন পাখিরহস্য, বৃষ্টি-মুদ্রিত, দহনিনাদ, বক্রছায়া, সৌরসুরভিত, জানালাপোষা ইত্যাদি। কিন্তু এই শব্দবন্ধগুলোকে কেন্দ্র করে যে ঘন ভাব, গভীর বোধ বা প্রতীকী ইমেজ দাঁড়াচ্ছে তার লেখায়, তা খুব একটা পরিলক্ষিত হয় না। কিংবা এক্ষেত্রে কবির ভিন্নতর প্রয়াস থাকতে পারে। আবার কবি পরক্ষণেই বলছেন—
“টোল পড়া পুকুরের জলে
বড়ই ফুলগুলো
ফুটে থাকা যেন
এক একটা ফুলস্টপ”

“আমার যাওয়া থেকে দূরে
যে গাছ, সঙ্গত বিকেল
মানুষেরা তার কাছে চিরকাল
ছোট হয়ে যায়!”

আবার এসময়ে কবিতা নিয়ে প্রকরণগত, টেকনিকের দিক থেকে, নতুন ভাষার খোঁজে সমসাময়িক অনেকেই যেমন নানা নিরীক্ষা করছেন, কেউ-বা বিভিন্ন ছন্দে উদ্ভাসিত হচ্ছেন, কেউ কেউ গদ্য ও পদ্যের ডার্ক স্পেসটুকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছেন, আমাদের অভিনিবেশের বাইরে গিয়ে নতুন কবিতা নতুন কাব্যভাষার অন্বেষণ করছেন— সেইসব ন্যারেটিভ শুভ্রর এই কাব্যগ্রন্থে খুব একটা দেখা যায় না। বরং তার কবিতা ক্ল্যাসিক ঘরানার, চিরায়ত, চেনা ফরম্যাটে। তবু পড়তে গেলে কোথায় জানি আরাম লাগে, স্মৃতি ঘনিয়ে আসে!
“বহু মানুষ বহু মানুষের ভেতর
দিচ্ছে টহল”

“বৃষ্টি পড়ছে বৃষ্টি…
কেবল পা-হীন লোকটার ভেতর
আমি কোন বৃষ্টি দেখি নাই”

“একটা উগ্র কাক নেচে যাচ্ছে ভিন্ন নজরে
যেই দিক থেকে সংসারহারা লোকজন আসে”

কখনো-বা নিত্যদিনের নানা অনুবন্ধ, বর্ণনা, আবহ, দৃশ্য চিরন্তন হয়ে উঠতে চায় তার কবিতায় আকারে, বিকারে এমনকি চিরচেনা মোচরে, বাক্-বিভঙ্গে—
“এমন সন্ধ্যায় একটা বেশ্যা
লুকিং গ্লাসের সামনে
মনোযোগ নিয়ে কেবল
নিজেরেই দেখতাছে”

“জননী ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির
মালবোঝাই ট্রাক এসে দাঁড়ায়ে বলতেছে
নাও আমারে খালি করো
চাপ কমাও, দেশ আগাও
মিছা কথা ছাড়া…
কী আছে তোমাদের?”

কখনো মনেহয় প্রচলিত দর্শনের, মূর্ততার, পুরাণের আবহমান বিশ্বাসের ডিকন্সট্রাকশন, আবছায়ার ছড়িয়ে পড়া, পাঠকের অবচেতন হয়ে—
“যেখানে এক ভগবতীর ত্রিনয়না গাঁথা আছে
শিবের ত্রিশূলের পাশে
সে তো সম্পর্ক, বরফ গলা থেকে জল
নীল জড়িয়ে পড়ছে আকাশে”

“ঝরাপাতা ছায়ায়, চার্চের সামনে লেখা—
যীশুনা রাসং
দেখেই হয়তো আমি হয়ে যাব চুপ”

তবে এইটা স্পষ্ট যে তিনি তার পূর্বতন ভাষাভঙ্গি, ফর্ম, শৈলী থেকে ক্রমশ অনেকখানি সরে এসেছেন এই কাব্যগ্রন্থে। এবং তার ব্যক্তিজীবন ও কাব্য-অভিযাত্রা থেকে আহরিত অভিজ্ঞতা, অভিক্ষেপ, যতি… সেসব লুপ্তস্বরে যেন উঁকি দেয় এই কালক্রমের কবিতাগুলোয়। এবং তখন চেনা প্রতিবেশ যেন হয়ে ওঠে রূপকময়, মেঘবাহী, দূরগামী। পাঠক তার কবিতার পাঠে, হিচহাকিং-এ ব্যাহত হন না, বরং তা মেদুর, স্মুথ, পাশের কলোনি থেকে ভেসে আসা অজানা যন্ত্রধ্বনির মতো। তার এবং তার কাব্যতৃষার উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করি আমরা।

🌱

লেখক পরিচিতি:

অমিত রেজা চৌধুরী

কবি ও গদ্যকার

অনুধ্যান

Leave a Reply

Shares